মেঘবন - পর্ব ২১ - ঈশানুর তাসমিয়া মীরা - ধারাবাহিক গল্প

মেঘবন - ঈশানুর তাসমিয়া মীরা
          কালো গাড়ির প্রতিটা জানালা আটকে রাখা। এসির দমবন্ধ মসৃণ সুবাস নাকে ওতোপ্রোতো ভাবে লেপ্টে আছে। খুবই মৃদু আওয়াজে গান চলছে, 

এই অবেলায় তোমারি আকাশে 
নিরব আপোষে ভেসে যায় 
সেই ভীষণ শীতল ভেঁজা চোখ 
কখনো দেখাই নি তোমায়…

গাড়ির ড্রাইভিং সীটে তালহা বসে আছে। পাশে তারফান। পেছনের সীটে তামজিদ আর ইখতিয়ার। ওরা দুইজন ফোনে গেমস খেলছে। কিসব গোলাগুলির গেম। আগামাথা নেই। যাকে পারো তাকে মা'রো। গেমের সন্ধানটা মূলত ইখতিয়ার দিয়েছে। তামজিদ খেলতে পারে না। চেষ্টা করেও পারছে না। গুহা থেকে বের হলেই ইখতিয়ার উড়ে এসে গুলি করে দিচ্ছে। ওমনি, ‘গেম ওভার।’ পঞ্চমবারের মতো হেরে এবার বেশ বিরক্তই হলো তামজিদ। রাগে রি রি করে উঠলো গোটা শরীর। ফোনটা অবহেলায় সীটে ছুঁড়ে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বললো, ‘খেলবো না এই বা*লের গেম।’

অত:পর রিয়ারভিউ মিররে তালহার দিকে চেয়ে ধমকের সুরে বলল, ‘আর কতক্ষণ বসে থাকবো? ওই পোলায় আসে না ক্যান?’

তালহা আড়চোখে তাকালো মাত্র। তামজিদের শুধু শুধু বিরক্ত হওয়ার বাতিক আছে। ধৈর্য ধরতে পারে না। এখন তাকে শান্তি মতোন গানও শুনতে দিচ্ছে না। হাহ্! একটা লম্বা নিশ্বাস ফেলে চিপসের এক টুকরো স্লাইড মুখে পুরলো তালহা। ওটা চিবুতে চিবুতে নির্বিকার কণ্ঠে উত্তর দিল, ‘তোর বিয়ে হওয়ার পর আসবে।’

পেছন থেকে তক্ষুনি একটা জোরেসোরে গাট্টা পরলো মাথায়। তালহা রেগে তাকাতেই হাত থেকে চিপসের প্যাকেট কেড়ে নিলো তামজিদ। রাক্ষরের মতো পাঁচ-ছ'টা স্লাইড মুখে পুরে বিশ্রী হেসে বললো, ‘তুই একটা বলদ।’

‘তুই শয়'তান।’

ইখতিয়ার তখনো গেমে ডুবে আছে। এতক্ষণ অফলাইনে তামজিদের সাথে খেললেও এখন অনলাইনে বন্ধুদের সাথে খেলছে সে। চট করে একটা সৈনিকের মাথায় গু'লি মেরে ভীষণ উচ্ছ্বসিত গলায় বললো, ‘তোরা ইবলিশ।’

নিরব তারফান আওয়াজ তুললো তখন, ‘আমি ছাড়া।’

সরু রাস্তা। পাশেই নক্ষত্র তালুকদারের কালো টাকায় গড়া বিশাল দু'তলা ভবন দেখা যাচ্ছে। আসতে-যেতে সকল পথচারীই ওই ভবনের দিকে লোভাতুর চোখে তাকায়। কিন্তু তারফান, তামজিদ আর তালহা তাকালো হিংস্র চোখে। সাদা রঙের লোহার গেইট মাত্রই খুলেছে। একটা রোগা-পাতলা ছেলে বেড়িয়ে এলো দুর্বার আলস্য নিয়ে। মুখে ফুটফুটে হাসি। দারোয়ানের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় ঢং-য়ে কি যেন বলছে, হাসছে। পরপরই উলটো রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগলো। তামজিদ উত্তেজনায় লাফিয়ে উঠলো প্রায়, ‘গাড়ি স্টার্ড দে, তালহা! পিছু নে কু'ত্তাটার!’

কাঠফাটা রোদ্দুর। দুপুরের শেষভাগ। বোধকরি এ সময়টাতে বাঙালিদের বোম মেরেও বাসা থেকে বের করা দায়। ভাতঘুমেরও তো একটা ব্যাপার আছে, তাই না? নির্জন, জনমানবহীন রাস্তায় তখন শুধু ওই রোগা ছেলে আর কালো গাড়িটা। মনের সুখে গুনগুনিয়ে হাঁটছিল সে। হাতে মোটাসোটা খামভর্তি টাকা। নক্ষত্র সাহেব বড়ো বিশ্বাস করে টাকাটা দিয়েছেন তাকে। পুরো এক লক্ষ টাকা! খাম খুলে আরেকবার ভেতরটায় উঁকি দিলো মৃন্ময়। নাহ্! কচকচে এক হাজার টাকার নোট মুখ উঁচিয়ে তাকিয়ে আছে। আহা! সুখ, সুখ, সুখ!

অথচ সেই সুখ মিনিটের বেশি টিকলো না। আকস্মিক গা ঘেঁষে একটা গাড়ি থেমে মুহূর্তেই দরজা খুলে টেনে ভেতরে ঢুকালো তাকে। চিৎকার করার সময় পেল না, এলোপাথাড়ি কিছু চড় গাল জ্বালিয়ে প্রশ্ন করল, ‘ভালো আছেন ছোট ভাই? শরীর-স্বাস্থ্য ঠিক?’

মৃন্ময়ের মাথা ঘুরছে। দৃষ্টি ঝাপসা, ঘোলাটে। পিটপিট নয়নে তাকাতেই দেখলো, একই রকম তিনটে মানুষ তার দিকে চেয়ে আছে। মাথাটা আবারও ঘুরালো। ভনভন শব্দে দুলে উঠল মন, শরীর। জ্ঞান হারাতে নিলেই বাম গালে আরেকদফা চড় পরলো, ‘আপনাকে এখানে ঘুমাতে আনিনি, ছোট ভাই৷ যা প্রশ্ন করলাম উত্তর দিন।’

হুবহু তিনটে মানুষের মাঝে একজন মৃন্ময়ের খুব কাছে বসে আছে। মিষ্টি হাসিতে ঠোঁট বাঁকানো। অথচ এই লোক একটু আগেও তাকে জল্লাদের মতো চড় মারছিল! ভয়ে জোরে জোরে নিশ্বাস নিলো মৃন্ময়। অশ্রুজলে গালদুটো ভিঁজে গেছে। ঠোঁট কামড়ে, ভীষণ আতঙ্ক নিয়ে সে প্রশ্ন করলো, ‘আমনেরা কে? আরে মারেন ক্যান?’

হাত বাড়িয়ে মৃন্ময়ের গাল টেনে ধরলো তামজিদ। ভীষণ জোর খাটিয়েই। মনে হলো, গালের চামড়া পিষে যাচ্ছে। অসহনীয় যন্ত্রণা। তামজিদ হেসে বললো, ‘আমরা বন্ধু হই আপনার। চিনতে পারেননি?’

মৃন্ময় মাথা নাড়ালো। অর্থাৎ, না, সে চিনতে পারেনি। গাড়িতে তখনো মৃদু আওয়াজে গান চলছে। তালহা সেই গানের সঙ্গে গা ভাসিয়ে বলল, ‘আপনাকে আমাদের খুব পছন্দ হয়েছে ছোট ভাই। লাভ এট ফার্স্ট সাইড। আপনার আমাদেরকে পছন্দ হয়েছে তো?’

মৃন্ময় উত্তর দিতে পারল না। হতবিহ্বল চোখে চেয়ে হাঁসফাঁস করলো শুধু। তার গাল জোড়া এখনো জ্বলছে। ফেঁটে গেছে কি? সম্ভবনা আছে। ভালো মানুষের মতোন তো আর মারেনি।
মৃন্ময়ের হাত থেকে চট করে খামটা নিয়ে নিলো তারফান। খাম খুলে একপলক চোখ বুলালো টাকাগুলোয়। গম্ভীর গলায় শুধাল, ‘কত টাকা দিয়েছে তোকে?’

সামান্য তোতলে উত্তর এলো, ‘এক লাখ।’

‘আমরা দুই লাখ দেব। কিন্তু আমাদের একটা কাজ করতে হবে। করবি?’

‘ক-কি, কি কাজ?’

রীতিমতো ভয়ে কপাল বেয়ে ঘাম ঝড়ছে মৃন্ময়ের। ইখতিয়ার বড়ো আদর করে সেই ঘাম মুছে দিলো। আদর আদর গলায় বললো, ‘আগুন লাগাতে হবে।’

‘হো-হোনাই?’

‘নক্ষত্র তালুকদারের গোডাউনে। যেই গোডাউনের দায়িত্ব শালা তোকে দিয়েছে। অবৈধ তেল-পেঁয়াজের গোডাউন।’

‘অসম্ভব!’ কথাটা বলতে গিয়েও যেন শিউরে উঠলো মৃন্ময়। এ গোডাউন একা নক্ষত্র তালুকদারের নয়। তার বড় ভাই, এদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রীরও। আগুন লাগলে তাকে কাঁচা চিবিয়ে ফেলবে। রয়েসয়ে তিন-চারবার ঢোক গিললো মৃন্ময়। অনুরোধ করে কিছু বলতে নেবে ওমনি! শক্ত হাতের চড় পড়ল ডান গালে। এবারের চড়টা তারফান মেরেছে। গলার মেরুন টাই শক্তপোক্ত হাতে ঢিলে করে সে ফের একবার গম্ভীর গলায় শুধাল, ‘কি?’

ভয়ংকর শ্বাসকষ্টে থেমে থেমে নিশ্বাস নিলো মৃন্ময়। বলতে চাইলো, ‘ভাই… আমারে মাইরা ফেলবো…।’

‘আগুন না লাগালে আমরা মারবো।’

‘ভাই…’ কথা শেষ হলো না। খামটা একপ্রকার ছুঁড়ে পরলো মৃন্ময়ের কোলে। তামজিদ যত্ন করে মৃন্ময়ের ভেঁজা গাল টিস্যু দিয়ে মুছে দিলো। এলোমেলো চুল গুছিয়ে মুখে হাত বুলিয়ে দিলো। শান্ত গলায়, নরম আহ্লাদে হুমকি দিলো, ‘কাজটা কাল বিকালের মধ্যে করবেন। নয়তো… আপনি রহমানবাগ থাকেন, তাই না? ঘরে বৃদ্ধ মা আছে, স্ত্রী আছে, সন্তান আছে! ওদের কথাও তো ভাবতে হবে ছোট ভাই।’

মুখে আর রা রইলো না। মাঝরাস্তায় মৃন্ময়কে ফেলে কালো গাড়িটা একটানে চলে গেল সুদূর। মৃন্ময়ের মনে হলো, তার শরীর গরম হয়ে আসছে। প্রচন্ড অস্বস্তিতে বুক কাঁপছে, ধরপর! ধরপর! সুখের দিন বুঝি এভাবেই ধোঁকা দিল? ধূলিসাৎ হলো চোখের পলকে?

—————

শূন্য আকাশে সহস্র শুভ্র মেঘ, উড়ন্ত কালো পাখি। পূব দিকে সাত রঙা লম্বা রংধনু দেখা যায়। তবুও কি শূন্য আকাশ? মস্ত বড় মাঠের দূর্বাঘাসে গা এলিয়ে দিলে চোখে অচিরে ভাসে বাদামি গাছ, লাল-সবুজ-হলুদ পাতাদের ছোটাছুটি। তবুও, তবুও কি শূন্য আকাশ? উত্তর মেলে না। একটা তীব্র বেদনাময় দীর্ঘ নিশ্বাস থেমে থেমে বেরিয়ে আসে। ভাবায়, এ পৃথিবী আসলে কতটুকু নিজের? কতটুকু স্বস্তির? ধীরে গড়িয়ে পরা কপালের ঘাম ওড়নার এককোণ দিয়ে মুছলো মেরিন। ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে চুমুক দিলো একবার, দু'বার, তিনবার! আজ যা গরম পড়েছে! সে আরও কালো জামা পরে বের হয়েছে। 
চিপচিপে অসহ্য অনুভূতিতে মেরিন মুখ কুঁচকালো। ধীরে ধীরে কদম ফেলতেই পেছন থেকে ভরাট কণ্ঠের ডাক এলো, ‘মেরিন!’

দাঁড়িয়ে গেল মেরিন। পেছন ফিরে দেখলো, একটা দৈত্যের ন্যায় আবছা মানুষ দৌড়ে আসছে। মুখে ফুটফুটে হাসি। মাথায় আগুন রঙা চুল। তালহা! পেছন পেছন তালহার মতোই একজন। তামজিদ না-কি তারফান, তা আর ঠাওর হলো না। 
মেরিন কিঞ্চিৎ হেসে বলল, ‘আপনারা এখানে ভাইয়া?’

তালহা হাঁপালো একটু। জোরে জোরে নিশ্বাস টেনে বলল, ‘তারফানের সঙ্গে একটু কাজে এসেছিলাম। তুমি এই এলাকায় কি করছো?’

‘বান্ধবীর বাসায় এসেছিলাম ভাইয়া। এক গলি পরেই। রিকশা এদিকে যাচ্ছে না বলে হাঁটতে হচ্ছে।’

বলতে বলতে তীক্ষ্ণ নয়নে পেছনের মানুষটাকে পরখ করলো মেরিন৷ রূঢ় ব্যক্তিত্বের তাকে কখনো কি সিগারেট ছুঁতে দেখেছে সে? উহু, মনে পড়ছে না। অথচ এখন দিব্যি সিগারেট ঠোঁটে ছুঁইয়ে রাখা, একেকটা সুখটান শেষে ধোঁয়া উড়াচ্ছে ওইতো! মেরিনকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভ্রু উঁচিয়ে এবার হাতের সিগারেট-টা বাড়িয়ে দেওয়ার ঢং করলো তারফান। ঠোঁট নাড়িয়ে বোঝাতে চাইলো, ‘খাবে?’

সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি সরিয়ে ফেলল মেরিন। ভয়ানক ক্ষ্রোধে চোখ-মুখ বিকৃত করে নিমিষেই বিড়বিড়ালো, ‘বেয়াদপ!’

তালহার বোকা চোখ একবার তারফানের দিকে ঘুরে এরপর মেরিনের দিকে স্থির হলো। অবুজ কণ্ঠে সে আমতা আমতা জিজ্ঞেস করলো, ‘কি হয়েছে মেরিন? শরীর খারাপ করছে তোমার?’

মেরিন নিশ্চুপ। বেহায়ার মতোন সে তবুও আড়চোখে তারফানের দিকে তাকাচ্ছে। লোকটা এবার সিগারেট ফেলেছে। পা দিয়ে পিষে প্যান্টের পকেট থেকে সেন্টারফ্রেশ বের করে চিবুচ্ছে ওটা। তাতে কি সিগারেটের বাজে গন্ধ মিলিয়ে যাবে? মেরিন রয়েসয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আস্ত একটা বজ্জাত লোক। একে কেমন করে মেরিনের ভালো লাগলো? ইছ!
মেরিন শুষ্ক ঢোক গিলে বললো, ‘আমি যাই ভাইয়া। দেড়ি হয়ে যাচ্ছে।’

গমগমে গলায় ক্ষণেই তারফান কেমন আদেশের সুরে বলল, ‘আমরা পৌঁছে দিচ্ছি।’

তারফান আর তালহার কানে দুটো এয়ারবার্ড লাগানো। তামজিদ নক্ষত্র তালুকদারের বাড়ি গিয়েছে। ওর শার্টের তিন নম্বর বোতামে খুবই সূক্ষ্ণতার সঙ্গে একটা স্পিকার লাগানো। ওখানে কি কথা হচ্ছে, না হচ্ছে সব শোনা যায়। মেরিনের ওড়নার এক টুকরো কাপড় ছন্নছাড়া ভাবে আঙুলে পেচাল তারফান। ভীষণ আনমনা ভাবে। মেরিনের চকচকে ঘর্মাক্ত উজ্জ্বল তক, গোলাপি পাতলা ঠোঁট, অল্প বোঁচা নাক আর সমুদ্রের মতো গভীর চোখের বিপরীতে ওই সর্বনাশি সৌন্দর্য তাকে ধাপে ধাপে বিধস্ত করলো। চূর্ণবিচূর্ণ করে মনে করিয়ে দিলো কবির বলা সেই উক্তিটি,

“তোমার চোখের আলোয় দেখেছিলেম আমার সর্বনাশ।”

মেরিন চমকায়। দৈবাৎ ওড়নার টানে হকচকায় খুব। কটমট নয়নে তারফানের দিকে তাকাতেই বুঝে, লোকটা ইচ্ছে করে করছে এমন। মেরিনকে বিরক্ত করাই তার মূল উদ্দেশ্য। মেরিন তেঁত গলায় আস্তে আস্তে ধমকায়, ‘আপনাকে আমি একদিন চড় মারবো!’

তারফান ফিসফিসিয়ে উত্তর দেয়, ‘দ্যাট উইল বি মাই অনার, মেরিন খন্দকার।’

সুপ্ত আশ্চর্য মেরিন ধরে রাখতে পারছে না। আজ তারফানের হলো কি? এত খুশি কেন? তালহাকেও দেখা যাচ্ছে মেরিনের পাশে হাঁটতে হাঁটতে ঠোঁট চোখা করে বাঁশি বাজাচ্ছে। কখনো-বা গুনগুনিয়ে গান গাইছে। কিন্তু কেন? প্রশ্নের উত্তরেরা অবাধ্য হয়ে লুকিয়ে রইলো। ওড়নার টান গাঢ় হলো। এবার হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরেছে তারফান। কানে অনবরত তামজিদের কথা ভাসছে, ‘আপনাকে দেখার অনেক সাধ ছিল মিস্টার তালুকদার। অবশেষে দেখা করতে পেরে ভালো লাগছে।’

কণ্ঠে প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় মধু। অতিরিক্ত ভদ্র নক্ষত্র তালুকদারের পছন্দ নয়। এরা ভেতরে আস্ত বদের হাড্ডি হয়। খুঁকখুঁক করে কেঁশে আড়নয়নে একবার তুবার দিকে তাকালেন তিনি। বার্ধক্যের গম্ভীর গলায় বললেন, ‘সম্পর্কে তোমার বড় হই। নাম ধরে ডাকবে না।’

তামজিদ মিষ্টি হেসে বলল, ‘মাই মিস্টেক, কিন্তু আপনাকে আমি ডাকবো কি?’

পাশ হতে তুবা আহ্লাদে গদগদ হয়ে বলল, ‘বাবা ডাকো। বিয়ের পর তো আমার বাবা তোমার বাবাও।’

নক্ষত্র তালুকদার অস্পষ্ট আওয়াজ করলেন। এই মেয়েটা! জ্বালা একটা! তিনি ফের একবার গলা খাঁকিয়ে বললেন, ‘তা তোমার নাম কি? বাপ-মায়ের নাম কি? কি কাজ করো? স্যালারি কতো তোমার?’

জিভ দিয়ে একবার ঠোঁট ভেঁজালো তামজিদ। উষ্ণ দু'তালু পরপর ঘঁষে আরেকটু উষ্ণ করলো। ঠোঁটের রগরগে হাসি বজায় রেখে বলল, ‘আমি তামজিদ স্পন্দন। মা, রজনী হায়দার। পেশায় সিটি হস্পিটালের একজন সার্জন। বেতন আলহামদুলিল্লাহ, ডাক্তারদের যা হয় তার চেয়ে একটু বেশিই।’

নক্ষত্র তালুকদার সূক্ষ্ণ খোঁচা দিয়ে বললেন, ‘বাপের নাম কি? বাপ নেই?’

‘আছেন।’

‘নাম বলতে সমস্যা?’

তামজিদের মুখাবয়ব যথাসম্ভব শান্ত, স্বাভাবিক। এই একটুখানি খুঁত নেই ওতে। সেকেণ্ডের নিরবতা পালন করে সে উত্তরে বলল, ‘আমার বাবার নাম স্বপন হায়দার।’

‘স্বপন? নাম শুনিনি কখনো।’

‘জি, উনি আপনাদের মতো এমন ধনাঢ্য ছিলেন না। আপনার বড় ভাই তো আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী, তাই না?’

গর্বে নক্ষর তালুকদারের বুক উঁচু হলো। গৌরব আর আত্মমর্যাদায় পরপর নিশ্বাস ফেললেন তিনি, ‘হ্যাঁ, এদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ইমন তালুকদার আমার বড় ভাই।’ 

ফোন বাজছে৷ এমন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা, বিশেষ করে নিজের শান জাহির করবার মুহূর্তে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ফোন কলে বড্ড মেজাজ খারাপ করলেন নক্ষত্র তালুকদার। ফোন রিসিভ করে কানে চেপে রুক্ষ এক ধমক দিলেন, ‘কি হয়েছে?’

ওপাশ থেকে ভীষণ হৈ-হুল্লোড়ের মাঝে স্পষ্ট গলায় কেউ আহাজারি করল, ‘ছার, সব শেষ হইয়া গেছে। আমনার গোডাউনে আগুন লাগছে ছার। সব পুইড়া গেছে। জলদি আহেন ছার, জলদি আহেন।’

শরীর কাঁপলো, গলায় এক অচেনা ঝাঁঝে নক্ষত্র সাহেব কথা বলতে পারলেন না। চোখ লাল হয়ে এলো ক্রমশ। দেখলেন, তার সামনে পায়ের ওপর পা রেখে আয়েশি ভঙ্গিতে বসা তামজিদ তখনো হাসছে। এতক্ষণ সেই হাসি পরোয়া না করলেও এবার ওই হাসিতে গায়ে জ্বর জ্বর অনুভব হলো তাঁর। 
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp