মেঘবন - পর্ব ১৯ - ঈশানুর তাসমিয়া মীরা - ধারাবাহিক গল্প

মেঘবন - ঈশানুর তাসমিয়া মীরা
‘মাই নেইম ইজ তারফান ওয়াহাজ।’

মা যতই তারফানকে শিখিয়ে পড়িয়ে দিক, তোমার নাম তারফান হায়দার। তারফান হায়দার বলবে সবাইকে। অথচ ছ'বছরের তারফান সে কথা মানতে নারাজ। কেউ নাম জিজ্ঞেস করলেই একবাক্যে উত্তর দেবে, 'মাই নেইম ইজ তারফান ওয়াহাজ।' তার দেখাদেখি তামজিদও হায়দার নামটা দেখতে পারতো না। চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলতো। ভাইয়ের মতো সেও নিজের জন্য পছন্দসই এক নাম রাখলো, ‘তামজিদ স্পন্দন।’ রজনী হায়দার তাই বাধ্য হয়ে ওদের বার্থ সার্টিফিকেট পাল্টালেন। তারফানের সে কি খুশি তখন! সবে সবে স্কুলে ভর্তি হয়েছে সে। ক্লাস ওয়ানে পড়ে। বস্তি থেকে উঠে এসে বিরাট বাসায় থাকছে, খাচ্ছে, ঘুমাচ্ছে। সেই বাসায় সিঁড়ি আছে, লিফট আছে। শুনেছে, এসব বাসাকে ফ্ল্যাট বলে। বস্তির মতো এখানে ছেঁড়া কাপড়চোপড় কারো নেই। কি সুন্দর সুন্দর জামা পরে ওরা! তারফানের নতুন বাবাও অবশ্য নতুন নতুন শার্ট-প্যান্ট কিনে দিয়েছেন তাকে। তারফান ওগুলো প্রতিদিন একটা একটা করে পরে। যেমন আজ স্কুল থেকে এসেই প্রথমে গোসল সেড়েছে। পরেছে গাঢ় সবুজ রঙের একটা শার্ট, হাফ-প্যান্ট। 
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখলো তারফান। ছোট্ট একটা গোলগাল মুখ। হাসলে বাম গালে টোল পরে। সামনে দুটো তিন'টে দাঁত নেই। তারফান ওই ফোকলা দাঁতেই খিলখিল করে হাসলো। মায়ের চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়ালো আস্তে আস্তে। মা বলেন, চিরুনি করে ফিটফাট থাকলে তারফানকে গুড বয় লাগে। তাই সর্বদা বুজ হওয়ার পর থেকেই নিজেকে পরিপাটি রাখার চেষ্টা করে তারফান। আজও তার কমতি নেই। 

চিরুনি দিয়ে একপাশে সিঁথি করতে করতে তারফানের হাত হঠাৎ থমকে গেল। একটু আগে কলিংবেলের শব্দ এসেছিল। এখন ভাংচুরের শব্দ হচ্ছে। পরপরই তালহা আর তামজিদ ছোট ছোট পায়ে দৌঁড়ে এলো ওর কাছে। তাদের চোখ টলমলে। অশ্রুজলে কপোল জোড়া স্যাঁতসেঁত করছে। তালহা ক্ষণেই চিৎকার করে উঠলো, ‘মা.. মাকে মারে! নতুন আব্বু মাকে মারে!’

কান্নার ফলে কণ্ঠ অস্পষ্ট। বাচ্চা গলায় তা আরও কঠিন শোনায়। তবুও কিভাবে যেন কথাগুলো বুঝতে পারলো তারফান। বিশাল বেডরুমের দরজার দিকে নজর পরতেই দেখলো, মা দৌঁড়ে আসছেন। শাড়ি এলোমেলো, কপালের তাজা ক্ষ-ত থেকে র-ক্ত ওই অতদূর থেকে দেখা যায়। মায়ের চোখের দৃষ্টি, গভীরতা— উজ্জ্বল দ্যুতির একছটা বেদনা শিরশির করে নিস্তেজ হচ্ছে। মা কাঁদছেন। কি ভীষণ আর্তনাদ চাপিয়ে রেখেছেন মনে মনে। ব্যস! ঐটুকুই৷ ঘোলাটে নজরে ওইটুকুই দেখতে পেল তারফান। রজনী হায়দার সশব্দে দরজা লাগিয়ে দিয়েছেন। দরজার ওপাশ থেকে শেষ একবার হুসিয়ারি দিলেন, ‘দরজাটা দ্রুত ভেতর থেকে আটকে দে তারফান। খবরদার আমি না বলা পর্যন্ত খুলবি না, খুলবি না!’

মায়ের কণ্ঠ কাঁপছে। খুব কষ্ট হচ্ছে মায়ের কথা বলতে। দরজার নিচের ছিটকিনি লাগাতে গিয়ে তারফান খুব কাছ থেকে শুনলো, মা ওই কাঁপা কাঁপা কণ্ঠেই চিৎকার করছেন। তার হু হু করে কান্নার প্রতিধ্বনি তারফানের বুক খামছে ধরেছে। ব্যথা হচ্ছে। ব্যথা! ব্যথা! ব্যথা!

হালকা গোঙানোর শব্দে তারফানের ঘুম ভেঙ্গে গেল। ঘোলাটে দৃষ্টি স্পষ্ট হলো ভীষণ রয়েসয়েই। নজরে এলো, অকৃত্রিম আঁধারের কিঞ্চিৎ আলো। পাশ ফিরে দুই ভাইকেও দেখলো। চেয়ারে বেঁধে রাখা কুঁচকুঁচে কালো বর্ণের এক লোককে বেধরম পেটাচ্ছে। মুখে সাদা রুমালের বাঁধা, চোখে একটুখানি বাঁচবার আশা আর ক্ষণে ক্ষণে গোঙানোর শব্দ। আহ্! এত শান্তি ঠিক কবে পেয়েছিল তারফান? মনে নেই। আদৌ শান্তি পেয়েছিল কোনোদিন? মস্তিষ্কে একটু জোড় প্রয়োগ করতেই মনে পরলো, শেষবার তিন ভাই যখন মায়ের কোল ভাগাভাগি নিয়ে ঝগড়া করলো? ওই ময়লা, কুৎসিত বস্তিতে? ঠিক ঐ শান্তির পুন:পুন সুখ এই মুহূর্তে অনুভব হচ্ছে তার। ডান হাতের পাঁচ আঙুল ভীষণ উত্তেজনায় নিশপিশ করছে। 

তালহা যেন তারফানের মনোভাব নিমিষেই বুঝতে পারলো। জ্বলজ্বলে চোখে চেয়ে ঠোঁটে বিরাট হাসি এঁটে জিজ্ঞেস করলো, ‘মারবি?’

উত্তরে সাথে সাথেই মাথা দুলালো তারফান। এগিয়ে এসে একদম আচমকা ঘুষি মেরে বসলো গুঙাতে থাকা লোকটার নাকে। পরপর তিনবার! শরীর হাঁপাতে লাগলো। হাত তখনো চুলকাচ্ছে, সামান্য কাঁপছে। বুকের ওঠবস লাগাতার। তামজিদ পাশ থেকে রুমাল এগিয়ে দিলো। বোতলের মুখা খুলে পানি পান করতে করতে বললো, ‘কি করবি? এভাবে মারতে থাকলে তো মরে যাবে।’

কপালের বিস্তর ঘাম মুছতে মুছতে তারফান কেমন উন্মাদের মতো আওড়ালো, ‘স্যুড আই কিল হিম?’

‘হু? সত্যিই?’ 

তারফানকে দেখতে অপ্রকৃতস্থ লাগছে। বহুদিন পর প্রত্যাশিত কিছু পাওয়ার লোভে হিতাহিত হারিয়ে ফেলেছে সে। তালহা সাবধান করে বললো, ‘এখনো ইমন আর হায়দার বাকি।’

তামজিদ সায় জানালো, ‘হ্যাঁ। এখন মারা ঠিক হবে না। আবার আইনের হাতেও দেওয়া যাচ্ছে না। আফটার অল, ইমনের জিগরা দোস্ত আয়মান বলে কথা! জেল থেকে চুটকি মেরে বের করে ফেলবে।’

তারফানের কপালে অল্প চিন্তার ভাঁজ পরলো, ‘মে-রে মাটিতে পুতে দেই? কেউ জানবে না।’

‘গুড আইডিয়া!’ তামজিদ এবারও সায় জানালো। তালহা হতবিহ্বল হয়ে গেল যেন। এদের মাথা কি সত্যিই গেছে? বিরক্ত হয়ে 'তিক' শব্দ করলো সে। ম-রো ম-রো প্রাণ আয়মানের মুখ থেকে রুমাল খুলে প্রচন্ড বিতৃষ্ণা নিয়ে বলল, ‘তোর কোনো শেষ ইচ্ছে থাকলে বল বুড়ো। তোকে কিছুক্ষণ পর মে-রে ফেলবে।’

ধোঁয়া ধোঁয়া চোখে তাকিয়ে খুব কষ্টে নিশ্বাস নিতে লাগলো আয়মান। কথা বলার শক্তি নেই, তবুও কোনোমতে কণ্ঠস্বর গলিয়ে শব্দ বেড়োলো, ‘ই..ইমনের ঠিকানা... আমি দিব না।’

তালহা যেন আরেকদফা বিরক্ত হলো। আগের চেয়ে একটু বেশিই।

‘তোর কাছে কেউ চেয়েছে?’

আতঙ্কে শুকনো মুখ যেন আরও শুকিয়ে গেল আয়মানের। অবিশ্বাস নিয়ে বলল, ‘তোরা ইমনের ঠিকানা জানিস?’

তামজিদ ছটপটে গলায় হেসে ফেলল, ‘তোকে যখন পেয়েছি ইমনকে পেতে কতক্ষণ?’

কথা শেষ হতে না হতেই দুরন্ত গতিতে একটা শক্ত ঘুষি ফের পরলো গালের বাম পাশটায়। আয়মানের বয়স বেড়েছে। কম করে বললেও পঞ্চাশ তো হবেই! চুলে পাঁক ধরেছে, গায়ে বার্ধক্যের করুণ ধকল। এত মা-র বুঝি শরীরে সয়? ওই শেষ সময়ে নিজের একটা অন্যায়ের কালো পর্দা চোখের সামনে যেন অজান্তেই ভাসলো। মনে পরলো, সে আর ইমন মিলে ওই ছোট্ট রজনীকে নির্দয়ের মতো পতিতালয়ে ফেলে এসেছিল। তখন বুক কাঁপেনি। অথচ এখন থরথর করে কাঁপতে থাকা বুকের কাঁপন ঠিক টের পাচ্ছে আয়মান।

—————

তালহার নাটকের শুটিং প্রায় শেষের পথে। রাঙামাটিতে আর একটা মাত্র দৃশ্য ধারণ করার পরপরই প্রডাকশন এডিটিং-এর কাজে লেগে পড়বে। ঈদে পাবলিশড হবে নাটক। অথচ এই শেষ সময়ে রিদিমা ঝামেলা পাকাচ্ছে। সেদিন শুটিং স্পটে বেহায়ার মতো তালহাকে জিজ্ঞেস করে ফেললো, ‘আপনি কি কাউকে পছন্দ করেন, ডিরেক্টর সাহেব?’

তালহা সহজ-সরল উত্তর দিয়েছিল, ‘নো।’

‘আমাকেও না?’ 

কণ্ঠে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস। তালহা নাক-মুখ কুঁচকে ক্ষণেই বললো, ‘ওয়াই উড আই লাইক ইউ?’

ব্যস! ওইদিনের পর থেকে না রিদিমা কল ধরছে না রিদিমার এসিস্ট্যান্ট। প্রডাকশনের কাজ বন্ধের আজ দু'দিন হতে চললো। নাটকের নায়ক বিরক্ত হয়ে কল করছে লাগাতার। এখন কি তালহাকে রিদিমার বাসায় গিয়ে স্যরি বলে আসতে হবে? বলতে হবে, ‘আই এম রেইলি স্যরি রিদিমা। আমার তোমাকে পছন্দ করা উচিত ছিল। আমি এখন থেকে শুধু তোমাকেই পছন্দ করবো।’ কি মুসিবত! কথাগুলো ভেবেই তালহার আলসেমি লাগছে। প্রচন্ড ঘুমে হামি আসছে বারবার। প্লেট থেকে পরোটা নিয়ে মুখে পুরতে নিলেই চোখ গেল রজনী হায়দারের পানে। তিনি কি যেন ইশারা করছেন। ভ্রু কুঁচকে তালহা প্রথমে মুখের পরোটা চিবিয়ে নিলো। ইশারা বুঝতে খানিক বেগ পেতে হলো তার। পরপরই তারফানকে শুধালো, ‘বিয়ে কি তুই সত্যিই করবি না? মা কিন্তু টিউলিপ আন্টি থেকে সময় চেয়ে রেখেছেন। উনাকেও তো ঠিকঠাক করে কিছু বলতে হবে, তাই না?’

তারফান পানি পান করছিল। পানিটুকু গিলে ভীষণ ঠান্ডা গলায় উত্তর দিলো, ‘মানা করে দিতে বল।’

তালহা কিছু বলার পূর্বেই রজনী হায়দার গম্ভীর গলায় বললেন, ‘কেন? মেরিনের মধ্যে কি সমস্যা? তোর কি অন্য কাউকে পছন্দ? মাকে বল। আমরা নাহয় ওই মেয়েকে দেখবো।’

‘তুমি হঠাৎ আমার বিয়ের পেছনে লেগেছ কেন? তালহা, তামজিদকে বিয়ে দাও।’

‘ওরা তোর মতো বখে যায়নি, তারফান। তাছাড়া তুই ওদের বয়সে বড়।’

তারফান যেন অল্প হাসলো। ঠোঁটের কোণা কিঞ্চিৎ প্রসারিত হয়ে আবার মিলিয়ে গেল। খাওয়ার রুচি চলে গেছে। হাত দিয়ে মৃদু ধাক্কায় কাঁচের প্লেট ঠেলে দিলো তারফান। রোষপূর্ণ গলায় বলল, ‘আমি বিয়ে করবো না।’

‘কেন?’

‘তুমি কি সত্যিই সবকিছু ভুলে গেছ, মা? সবকিছু ভুলে থাকা এতই সহজ? মিথ্যা বেশিদিন টেকে না। তোমার কি মনে হয়, বিয়ের পর মেরিন সত্য জানবে না? আমার, তালহার, তামজিদের সত্য কি বেড়িয়ে আসবে না? আমরা পিতৃ পরিচয়হীন মা! আমরা... আমরা জারজ! আমাদের কে মেনে নেবে? কে চাইবে?’

তারফান হাঁপাচ্ছে। খুব কষ্টে দলা পাকানো কিছু গলায় কাঁটার মতো বিঁধছে। মায়ের দিকে তাকানোর সাহস হলো না তার। মায়ের ওই টলমল চোখ তারফানকে দূর্বল করে দেয়, কাঁদায়।
কথায় আছে, পুরুষেরা কাঁদে না। কাঁদে না? অথচ তারফান সারাটা জীবন কেঁদে এসেছে। চোখের অশ্রু হিসেবে নয়, হৃদয়ের রক্তক্ষরণ। 

সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় একটু অন্যমনস্ক হয়ে ছিল তারফান। এদিক-ওদিক খেয়াল নেই। রাজ্যের ক্লান্তি ভর করেছে চোখদুটোয়। টকটকে লাল চোখ ধোঁয়ার আগুনের যন্ত্রণায় কাতরে উঠছে৷ আকস্মিক! বুকে ধাক্কা লাগলো। অল্পসল্প জোরেই। হাতদুটো আপনাআপনিই আঁকড়ে ধরলো কিছু। সামনে ভাসলো, ম্লান এক মুখ। চোখে তীব্র বেদনার রেশ আর একটুখানি জল। ব্যথায় নীল রঙ ধারণ করেছে মুখটা। সহসাই ভ্রু বাঁকালো তারফান। গমগমে গলায় হালকা ধমকের সুরে বললো, ‘কাঁদছো কেন?’

‘আপনি আমাকে ধমকাচ্ছেন কেন?’

কণ্ঠস্বর ওতোপ্রোতো ভাবে কান্নায় মোড়ানো। অনেক্ষণ ধরে আটকে রাখা অশ্রুকণা এবার গাল ভিজিয়ে দিলো। দেখে, দীর্ঘশ্বাস ফেললো তারফান। রয়েসয়েই। গাম্ভীর্যতা এড়িয়ে নমনীয় গলায় শুধালো, ‘কাঁদছো কেন, মেরিন?’

‘আপনার তাতে কি?’

তারফান আরেকদফা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই মেয়ে এত ত্যাড়া! কান্নার কারণ নিজেই খুঁজতে গিয়ে টের পেল, হাত কেঁটে ফেলেছে মেরিন। ডান হাত থেকে বিন্দু বিন্দু রক্ত ঝড়ছে। নিশ্চয়ই গাছের সঙ্গে কোনো আকাম করছিল? হাত টেনে ধরার পূর্বে ওই স্নিগ্ধ চেহারার মলিনতা আরও একবার মস্তিষ্কে গাঁথল তারফান। মুখে বললো, ‘চলো, ব্যান্ডেজ করে দিচ্ছি।’

মেরিন হাত ছাড়াতে চাইলো, ‘আমি নিজেই করতে পারি।’

‘না।’

মেরিন রেগে গিয়ে নখের আঁচড় কাটলো তারফানের বলিষ্ঠ হাতে। তারফান টু শব্দটিও করছে না। সে তার কাজে বহাল। মেরিন অধৈর্য হলো, ‘কি না? আমার হাত ছাড়ুন আপনি।’

‘তুমি অনেক বেশি অবাধ্য, মেরিন। এক্ষুণি একটা আছাড় মারলে সিঁড়ির শেষ গোড়ায় গিয়ে পড়বে। তুমি কি চাচ্ছো আমি তোমাকে তুলে আছাড় মারি?’

মেরিন শুকনো ঢোক গিললো। সত্যিই আছাড় মারবে? ধুর! এমন হয় নাকি? তবুও কল্পনার মানস্পটে ওইযে? তারফান পি-শাচ তার টব ছাদ থেকে ফেলে দিলো? হঠাৎই ওই ঘটনা মনে পরলো তার। মিনমিনে গলায় বললো, ‘আমার হাতে ব্যথা। আপনি আমাকে সত্যিই আছাড় মারবেন?’

‘ডিপেন্ডস্ অন ইউর বিহেভিয়ার।’

মেরিন আবারও আলতো গলায় বিড়বিড়ালো, ‘নিজের আচরণ যেন খুব ভালো। খবিশ একটা!’

চিলেকোঠার দরজা খুলতে গিয়ে সামান্য ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ হলো। কাঠ ভালো না। খেয়াল করলে বোঝা যায়, ঘুণ আস্তানা গেড়েছে। মেরিন চিলেকোঠায় এ প্রথম এসেছে। কি ছোট্ট একটা ঘর অথচ এত গুছিয়ে রাখা! সবকিছু নজর কারছে। বিশেষ করে ওই হ্যান্ড পেন্টিংটা! পুরো কালো রঙের মাঝে একটা নদী। শুধুমাত্র একটা নদী।

মেরিনের অবাক নয়নে চিলেকোঠার এপাশ-ওপাশ পরখ করার মাঝেই সেভলন, ব্যান্ডেজ আর তুলা নিয়ে হাজির হলো তারফান। রাশভারি গলায় বললো, ‘বসো।’

এখানে চেয়ার নেই। মেঘের মতো নরম বিছানায় বসতে বসতে মেরিন বিরক্ত গলায় বললো, ‘আপনার ব্যবহার জঘন্য।’

তারফান সঙ্গে সঙ্গে স্বীকার করলো, ‘হু। প্রয়োজনে আরও জঘন্য হয়।’

বলতে বলতে কোনো আগাম সতর্কসংকেত ছাড়াই সেলভনে চুইয়ে থাকা তুলো হাতের ক্ষততে চেপে ধরলো তারফান। মেরিন ব্যথায় চোখ বড় বড় করে ফেললো। আরেকটুর জন্য গলা কাঁপিয়ে চিৎকার বেড়িয়ে আসেনি!

‘আপনি প্রতিশোধ নিচ্ছেন, তাই না?’

অভিমান নাকি রাগ? বোঝা গেল না। মেরিনের ক্রন্দনসুরে তারফান অচিরেই নরম হলো। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে তাকালো মেরিনের দিকে। জানতে চাইলো, ‘বেশি ব্যথা পেয়েছো?’

উত্তর পাওয়া গেল না। মেরিন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ক্ষত হাতে ফুঁ দিতে দিতে তারফান ফের বললো, ‘অভিমান তার কাছে মানায় যে অভিমানের কদর করে।’

‘আমি কেন অভিমান করবো?’ 

অথচ স্পষ্ট অভিমানের সুবাস খুব কাছ থেকে টের পাওয়া যাচ্ছে। তারফান না চাইতেও একটু হাসলো, ‘করছো না?’

‘না।’

‘সত্যি?’

‘আমি আপনাকে মিথ্যা কেন বলবো?’

তারফান মাথা দুলালো। আসলেই! কেন বলবে? যদিও তার ঠোঁট থেকে হাসি সরছেই না। লহু লহু হাসির মিলমিশে একাকার হচ্ছে মেরিনের হৃদয়, মন। বুক ডিপডিপ করছে। লজ্জা লাগছে। আশ্চর্য!
মেরিন আমতা গলায় বললো, ‘এমন ছোট ঘরে থাকেন কিভাবে?’

ব্যান্ডেজ লাগানো শেষ। তারফান উত্তর দিলো, ‘অভ্যাস আছে।’ 

চঞ্চল মেরিন এবার অভিমান ভুলেছে। সারা ঘরময় ঘুরতে থাকা চোখদুটোর এক দন্ড শান্তি নেই। অস্রুজলে সিক্ত কপোল জোড়া। বুড়ো আঙুলের সাহায্যে পানিটুকু মুছে তারফান মোলায়েম স্বরে আদেশ করলো, ‘দু'দিন হাতে পানি লাগাবে না। গাছের কাছে তো একদমই যাবে না। দরকার হলে আমি হস্পিটাল যাওয়ার আগে আর আসার পরে একবার একবার দু'বার পানি দিয়ে যাবো। বুঝেছ কি বলেছি? হু, মেরিন?’
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp