মেরিনের মাথায় সোনালী শালের লম্বা ঘোমটা টানা ছিল। তীব্র বাতাস ছুঁটে এসে মাত্রই তা ফেলে দিলো। ছোট ছোট চুলের অসহ্য যন্ত্র-ণায় ছটফট করলো মেরিন। রুক্ষভাবে চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজলো। অথচ কাজের কাজ কিছুই হলো না। তথাকথিত ঠ্যাটার মতো গুটি কয়েক চুল লেপ্টে রইলো সফেদ, মসৃণ গালের একপাশ ঘেঁষে। সেই গুটি কয়েক চুল বড্ড বাজে ভাবেই তারফানের চোখে বিঁধলো। মেয়েটা রেগে কি যেন বলছে। বার বার কি যেন জানতে চাইছে তার কাছে। কিন্তু তারফানের সেদিকে খেয়াল নেই। ছোট্ট কপালের দৈর্ঘ্যপ্রস্থ, ঘন ভুরুদ্বয়, পিটপিট করে চেয়ে থাকা হরিণের মতো ছোট চোখদুটো, রাগে লাল হয়ে থাকা নাক-গাল, অবশেষে দুরন্ত ব্যস্ততা নিয়ে ছুটতে থাকা ওই ঠোঁটদুটো— একে একে সব কিছুতে চোখ বুলালো তারফান। কি বুঝে মেরিনের গরম গালের যেখানটায় দুষ্টু চুলগুলো লেপ্টে ছিল? মেরিনকে বিরক্ত করছিল? সেথায় বুড়ো আঙুলের সাহায্যে অল্পসল্প স্পর্শ আঁকলো তারফান। চোখের দৃষ্টি ক্ষণেই পাল্টালো, ফের স্বাভাবিক হলো। চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে খুব ধিমে আওড়ালো, “হু?”
মেরিন আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে ছিল। পরক্ষণেই তারফানের স্পর্শ থেকে গাল সরিয়ে নিলো সে। বেজায় বিরক্তি নিয়ে শুধালো, “আপনি জানতেন আমার সঙ্গে আপনার বিয়ে ঠিক হয়েছে, তাই না?”
তার সরে যাওয়ায় তারফান ক্ষীণ রুষ্ট হলো বোধহয়। গলায় অস্পষ্ট আওয়াজ তুলে কণ্ঠ পরিষ্কার করলো। সবসময়কার গাম্ভীর্যতা এঁটে বললো, “জানতাম না। এই মাত্র তোমার থেকে জানলাম।”
মেরিন বিশ্বাস করলো না, "আপনি মিথ্যা বলছেন।"
"না, মেরিন।"
"আপনি বললেই হলো? আপনি একটা মিথ্যুক! আমি জানি।" একটা প্রকান্ড দম নিয়ে মেরিন ফের বললো, "আপনি এই বিয়েতে মানা করে দেবেন।"
"কেন?"
মেরিন চোখ ছোট ছোট করে তাকালো। চোখে-মুখে বিরক্তি উপচে উঠতে চাইলেও দমালো খুব কষ্টে, "কেন মানে? আপনার আক্কেল নেই? আপনি আমাকে দুই চক্ষে দেখতে পারেন না, ভুলে গেছেন?"
মেরিনের পরনে গোলাপি পাতলা কামিজ। রঙটা মেয়েটার গায়ে খুব ফুঁটেছে। স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে। তারফান না চাইতেও কিছুপল চোখ আটকে মেরিনের দিকে তাকিয়ে রইলো। গমগমে গলায় বললাম, "কই, মেরিন? আমি তোমাকে স্পষ্ট আমার দুই চোখ দিয়ে দেখছি। তোমার থুতনিতে একটা ছোট্ট বাদামি তিল আছে। আমি তাকালেই চোখে পরে।"
আশ্চর্য মেরিন হড়বড়িয়ে গেল। গোটা এক মিনিট সে কথা বলতে পারলো না। রয়েসয়ে, কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে শুধালো, "আপনার মাথা ঠিক আছে?"
এদফায় উত্তর মিললো না আর। মেরিন তাকিয়ে দেখলো, বিশাল দেহের তারফানকে একটু মলিন লাগছে। উজ্জ্বল রঙের চকচকে ভাবটা আজকে অনুপস্থিত। আশ্চর্যভাবে মেরিনের সঙ্গে দুর্ব্যবহারও সে করছে না। ব্যাপার কি? ভালো কথা! এই লোক এখানে এসেছেই-বা কেন?
মেরিন চটপট প্রশ্ন ছুঁড়লো, "আপনি এখানে এসেছেন কেন? ঠিকানা পেয়েছেন কোথায়?"
এ প্রশ্নের উত্তর তারফান দেবে না— মেরিন তা জানে। লোকটা সদা কিছু না কিছু লুকিয়ে রেখেছে। রহস্য রহস্য খেলায় মেরিন কতশত বার যে হারালো!
তারফানের সঙ্গে মেরিনের প্রথম দেখা ওই ছাদে নয়। এর বোধহয় দু'তিন দিন আগে একরাতে মেরিন তারফানকে দেখেছিল। অস্পষ্ট, আবছা আলোয় বিল্ডিংএর পেছনে যে ছোটখাটো বাগান আছে? মাটিতে এলোমেলো হয়ে শুয়ে ছিল একটা মানুষ। ক্ষণে ক্ষণে শরীর নড়ছে। বারান্দা দিয়ে এই দৃশ্য দেখে মেরিন কি যে ভয় পেল! তার বুক ধক করে উঠেছিল প্রচন্ড আত-ঙ্কে। তবে কাউকে ডাকার কিংবা সেখানে যাওয়ার সাহস হয়নি। মুখ দেখা না গেলেও ওই আধো আধো ল্যাম্পপোস্টের আলোয় স্পষ্ট একটা রক্ত মাথা হাত জ্বলজ্বল করছিল। বাহুর দিকটায় কি ভয়া'নক ক্ষ'ত! মেরিন তাকিয়ে দেখলো, তার সামনে সঠান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তারফানের পরনে সাদা হাতাকাটা স্পোর্টস গেঞ্জি। ডান বাহুর একদম মধ্যিখানে কুৎ'সিত কাঁ'টা দাগ।
ট্রাউজারের পকেট হাতড়ে কি যেন খুঁজছে তারফান। পেয়ে যেতেই হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরলো তা। মেরিনের দিকে বাড়িয়ে বললো, "ধরো।"
মেরিন একপলক হাতের দিকে তাকিয়ে তারফানের মুখপানে তাকালো, "কি?"
নিরুত্তর তারফান দৃষ্টি পাল্টালো হঠাৎ। থমথমে অথৈ নদীর নিরিবিলি মিইয়ে গিয়ে একচিমটি তেজস্ক্রিয়তা উদয় হলো। সেখান অবশ্য রাগ নেই। অচেনা কিছু ঝিলমিল করছে। মেরিন শুকনো ঢোক গিললো। হাত বাড়িয়ে দিলো নেওয়ার জন্য। অবাক হলো, সে কি তারফানকে ভয় পাচ্ছে?
হাতের তালুতে পাঁচ-ছ'টা মোচড়ানো নয়নতারা আর গোলাপের পাপড়ি নজরে আসতেই মেরিনের শ্বাস আটকে গেল যেন। শ্বাস আটকেই তারফানের দিকে তাকিয়ে হতভম্ব কণ্ঠে বললো, “আপনি আমার গাছের ফুল ছিঁড়েছেন!”
ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসির রেখা দেখা দিলো কি? দিলো বোধহয়। বোধহয় মেরিনকে রেগে যেতে দেখে তারফান বেশ খানিকটা সুখই পেল। প্রশ্ন ছুঁড়লো, “তোমার কি মনে হয়?”
মেরিন তারফানের হাসির ধার ধারলো না। রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে বললো, “আপনি কোন সাহসে আমার ফুল ছিঁড়েছেন?”
“সাহসকে কাল রাতে চিঠি পাঠিয়েছিলাম। সাহসের জাতটা বোধহয় মেরিন সাহস।”
মেরিন চোখ-মুখ খিঁচে ফেললো। এই চূড়ান্ত বেয়াদব লোকটার সঙ্গে সে আর একটা কথাও বলবে না। কিভাবে পারলো এই লোক তার গাছের এত সুন্দর সুন্দর ফুল ছিঁড়ে ফেলতে? ছেঁড়ারও তো একটা সৌন্দর্য আছে, তাই না? গোলাপের পাপড়ি আছে, কিন্তু গোলাপ নেই। আস্ত নয়নতারা এনেছে, কিন্তু এদিক-সেদিক মোচড়ানো, যাচ্ছে তাই অবস্থা! হাতের মুঠোয় থাকা ফুলগুলো শক্ত করে ধরে মেরিন চলে যেতে লাগলো। এই লোকের ওপর বো'মা ফেললেও এই লোক এখন একটা কথারও উত্তর দেবে না। সুতরাং তারফানের পেছনে সময় নষ্ট করে লাভ নেই।
মেরিন হনহনিয়ে চলে যেতে লাগলো। ওর কোমড়ের মাঝখানে দুলতে থাকা বেণির দিকে অপলক চেয়ে রইলো তারফান। চেয়ে থাকতে থাকতে মেয়েটা অদৃশ্য হতেই বাইকের ওপর শরীর ছেড়ে দিলো সে। মাথা পেছনের দিকে হেলিয়ে চোখ বুজলো, গলার ওই উঁচু হাড়টা ওপর-নিচ হলো। লম্বা একটা নিশ্বাস ফেলে তারফান বিড়বিড়ালো, “শান্তি খুঁজতে এসেছিলাম… তুমি আমাকে এ কি অস্থিরতা দিলে, মেরিন…”
—————
রজনী হায়দার এখনো ঘুমাচ্ছেন। মায়ের শান্ত, মলিন মুখটার দিকে অনুভূতিহীন হয়ে তাকিয়ে আছে তামজিদ। ফোনে রিং হচ্ছে। নিশ্চিত তালহা? বুক চিঁড়ে দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে এলো তামজিদের। এদিক-ওদিক ঘাড় ঘুরিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলো সে। ফোন রিসিভ করলো, “কি হয়েছে? কল দিচ্ছিস কেন?"
ওপাশ থেকে তালহার ত্যাক্ত, বিরক্ত, অসহায় কণ্ঠ, “কার্ডিওমায়োপ্যাথি জিনিসটা কি? কি করে এটা দিয়ে? আমার মনে পরছে না।"
তামজিদ আরও দ্বিগুণ বিরক্তি নিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “ওইটা দিয়ে তোর কাজ কি? তোকে না বললাম ডিউটির নামে শুধু ঘুমাবি?”
“হাসপাতাল কি তোর বাপের? একের পর এক রোগী আসছে। আমি এগুলা বুঝি? নিজে তো খুব সুন্দর তারফানের নামে ছুটি নিয়ে ঘরে বসে আছিস। আমাকে তোর জায়গায় না পাঠিয়ে নিজে ডিউটি-টা অন্তত করতি!”
তামজিদ বিশ্রীরকম মুখ কুঁচকে বললো, “মায়ের সঙ্গেও তো কাউকে থাকতে হবে। তারফান আসুক। আমি তারপর আসবো।”
“আমার চুলগুলো থেকে কালার উঠাবো কিভাবে আমি? কি বাজে লাগছে আমাকে তুই জানিস? আমি…”
কথা পুরো হলো না। তার আগেই খট করে লাইন কেটে দিলো তামজিদ। সদর দরজা থেকে হালকা শব্দ আসছে। মায়ের ম্লান মুখের দিকে আরেকদফা চেয়ে বসারঘরে এগোলো সে। দেখলো, তারফান চলে এসেছে। আগের রুক্ষ মুখের অবয়ব স্থির হয়েছে অনেকটা। স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে।
তামজিদ অচিরেই জিজ্ঞেস করলো, “মেরিনকে দেখতে গিয়েছিলি?”
তারফান ছোট্ট করে উত্তর দিলো, “হু।”
“ওই হারামিকে দেখেছিস?”
“নাহ্, নজরে পরেনি। নয়তো একটা খু'ন করে তবেই ফিরতাম।”
তারফান মায়ের ঘরে যেতে নিচ্ছিল। কি বুঝে আর গেল না। কদম পিছিয়ে তালহার ঘরে যেতে যেতে বললো, “আমি বিয়ে করছি।"
"কি বললি?"
তামজিদ যেন ঠিকঠাক শুনতে পেল না। প্রশ্নবোধক নজরে চেয়ে রইলো।
তারফানের ঘুম পাচ্ছে। প্রচন্ড, প্রচন্ড ঘুম! অনেকটা আধো আধো বুলিতেই সে উত্তর দিলো, “ঘুম পাচ্ছে। ঘুমিয়ে নেই? তারপর একসঙ্গে মায়ের কাছে শুনবো।"
বলতে বলতে তালহার ঘরে ঢুকে দরজা লাগালো তারফান। বিছানায় গা এলালো। পাশের টি-টেবিলে একটা হলদে বাতি জ্বলছে। কেমন আবছায়া আবছায়া ঘোর। সেই ঘোরে তারফান একটু একটু করে তলিয়ে গেল। তন্দ্রাঘোর তখন মাথায় উপচে উঠেছে। চোখের দৃষ্টি ঘোলাটে, অন্ধকার। নাকে এয়ারফ্রেসনারের কটু গন্ধ ঘুরঘুর করছে শুরু থেকেই। তারফান ট্রাউজার থেকে ফোন বের করলো। মেরিনের নম্বরে টাইপ করলো,
“Let’s Just Get Married, Merin.”
·
·
·
চলবে……………………………………………………