মেঘবন - পর্ব ২২ - ঈশানুর তাসমিয়া মীরা - ধারাবাহিক গল্প

মেঘবন - ঈশানুর তাসমিয়া মীরা
          অন্ধকারছন্ন আকাশে হঠাৎ একটা আতশবাজি ফুটে উঠলো। লাল-নীল-হলুদ আগুনে এদিক-ওদিক ছড়িয়ে কি ভীষণ সুন্দর দেখালো! একটা অস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি ভেসেই রইলো চোখে। ঠোঁটে দুর্বোধ্য হাসি, মুখ জুরে খুশির ঝিলিক। আগে কখনো আতশবাজি দেখেনি তিনভাই। আনন্দে লাফিয়ে উঠতে গিয়েও ভয় পাচ্ছে, ভয়ে শিউরে উঠছে আবার অপ্রত্যাশিত খুশিতে মন আনচান ওদের। তারফান ঢোক গিলে পুলকিত গলায় বললো, ‘মা… এগুলো কি? আকাশে এত সুন্দর আলো কিসের?’

রজনী হায়দার জবাব দেওয়ার পূর্বে তারফানকে আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। তার তারফানটা একটু মন নরম। মায়ের সঙ্গ ভালোবাসে বেশি। সুযোগ পেলেই মায়ের কোল ঘেঁষে বসে থাকে। ভয় পেলে পেটে মুখ ডুবিয়ে জড়োসড়ো হয়, কখনো-বা খুব কাঁদে। এইযে এখন? রজনী হায়দারকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে সে। পৃথিবীর সবচে’ নিরাপদ আশ্রয়ে নিজেকে লুকিয়ে ক্ষণে ক্ষণে উঁকি দিয়ে দেখছে ওই বিশাল আকাশ। আকাশের বিরামহীন আশ্চর্য।
ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে রজনী হায়দার বললেন, ‘এগুলোকে আতশবাজি বলে। তুমি আতশবাজি ফোঁটাবে?’

তারফান উত্তর দিতে সময় নেয়। টুপটাপ চোখে আকাশে এইমাত্র মিইয়ে যাওয়া আতশবাজির শেষ অস্তিত্ব দেখে, ভাইদের উল্লাসে আত্মহারা লাফালাফি দেখে, এলাকার ছেলেপেলেদের হৈ-হুল্লোড় শুনে। প্রশ্ন করে, ‘আতশবাজি কেন ফোঁটায় মা?’

‘এমনি— আনন্দ করতে। তুমি ফোঁটাবে?’

মুখ উঁচিয়ে মায়ের মায়াবী মুখপানে তাকায় তারফান। তার মা এত সুন্দর! চেয়ে থেকে অবুজ গলায় শুধায়, ‘আতশবাজি ফোঁটাবার সময় তুমি আমার পাশে থাকবে?’

উত্তরে রজনী হায়দার সায় দিতেই তারফানের ঠোঁট ঘেঁষে তৃপ্ত হাসি ফুঁটে উঠে। ঝিলমিলিয়ে বলে, ‘তাহলে আমিও আর ভয় পাবো না।’

‘ঠিকাছে, ভয় পেতে হবে না। এখন ভাইদের সঙ্গে মজা করো। আমি তোমার জন্য আতশবাজি নিয়ে আসছি।’

‘কোত্থেকে আনবে?’

রজনী হায়দার সে কথার উত্তর দেন না। শুধু বলেন, ‘আনছি, অপেক্ষা করো।’

রজনী হায়দার ঠিক কোত্থেকে আতশবাজিটা আনলেন, তারফান জানে না। সে মায়ের হাতে হাত রেখে আতশবাজিতে আগুন ধরালো। সাই করে রকেটের মতো ওটা ধেয়ে চলে গেল আকাশের বুকে। এক সেকেণ্ড! দুই সেকেণ্ড! তিন সেকেণ্ড! বিরাট শব্দে একটা লাল রঙা বল ফুঁটে গেল ক্ষণেই। ফের একবার লাল-নীল-হলুদ আগুনে আলোকিত হলো গোটা আকাশ। তারফানের মনে হলো, এমন সুন্দর আতশবাজি বুঝি আর কেউ ফোঁটায় নি! চোখে ঘোর লেগে গেল তার। মন দুললো, নিশ্বাস এত ধীরে ধীরে নিচ্ছে! তারফান বলতে চাইলো, ‘স্কুলের ম্যাম বলেছেন, কেউ তোমাকে খুশি করলে তাকে বিনিময়ে থ্যাংকিউ বলতে হয়। মা… আমি তোমাকে থ্যাংকিউ বলি?’

অথচ বলা হলো না। আকস্মিক শব্দে ধরাম করে ছাদের ভিড়িয়ে রাখা দরজা খুলে গেল। ফোঁসফাঁস শব্দে সুমন হায়দার এগিয়ে আসছেন। হাত শক্ত করে মুঠ করা। চোখে অসহনীয় ক্ষ্রোধ, ক্ষোভ! দ্রুত কদমে এগিয়ে এসেই তিনি রজনী হায়দারকে একটা শক্ত চড় মারলেন। কয়বার? পরপর তিনবার! ছাদে আরও মানুষ ছিল। বিল্ডিংএর প্রত্যেকে আতশবাজি দেখতে এসেছিল ছাদে। কেউ কেউ ফোঁটাচ্ছিল। সেদিন নিউ ইয়ার ছিল তো! লজ্জায়, অপমানে রজনী হায়দার হু হু করে কেঁদে উঠলেন। ছোট্ট তারফান কিছু বুঝতে পারছিল না। বাকিদের মতোই সেও নিশ্চুপ, স্তব্ধ। কিছুতেই ঠাওর করতে পারছিল না, তার মাকে মা রলো কেন? 
সুমন হায়দার রজনীকে টেনে নিয়ে যেতে যেতে কুৎসিত গালি দিলেন, ‘ঘরের বাতি সব জ্বালায়া রাইখা তুই এনে পিরিত মারাছ! **** বাচ্চা! তোরে আমি আইজকা কাঁচা খামু! রঙ করতে আসো আমার লগে?’

তারফান অনুভব করলো, তার বুক চিঁড়ে যাচ্ছে। দেখলো, মা শক্ত করে তার ছোট হাত ধরে রেখেছিলেন। এখন ছেড়ে দিয়েছেন। তার অশ্রুজলে সিক্ত চোখগুলো কি অসহায় হয়ে তাকালো তখন! তামজিদ, তালহা ইতোমধ্যে মায়ের পেছন পেছন দৌঁড়াচ্ছে। কেবল তারফান নড়তে পারল না। স্তব্ধ হয়ে উচ্চারণ করলো, মা! আমার প্রিয় মা! 

গরমের রেশ কমাতে হঠাৎই রোদ লুকিয়েছে মেঘের আড়ালে। ঝড়ো হাওয়া শুরু হয়েছে। কপালের ঘাম শুকিয়ে একটা স্নিগ্ধ পরশে মন আনচান। দূরের শিউলি ফুলের ঘ্রাণে নিশ্বাস নিতে কষ্ট হলো তারফানের। মুঠোয় থাকা ওড়নার কোণ ছেড়ে এবার মেরিনের হাতটাই ধরলো। শক্ত করে, দৃঢ় অধিকারে। মেরিন একবার পাশে থাকা তালহাকে আড়চোখে দেখলো। ফিসফিসিয়ে বললো, ‘আপনি ভীষণ বেয়াদব।’

তারফান শুনলো না যেন। মাথা খানিক ঝুঁকিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই মেরিনের বরাবর হলো। হালকা করে শুধালো, ‘হু?’

মেরিন মুখ গোমড়া করলো। বললো, ‘আপনি বেয়াদব।’

‘তুমি বেয়াদবির প্রশ্রয় দিচ্ছ কেন?’

মেরিন মিনমিনিয়ে বলতে চায়, ‘ক..কোথায়? দিচ্ছি না।’

তারফান সোজা হয়ে দাঁড়ালো এবার। মেরিনের মাথার ঘোমটা পড়ে যাচ্ছে। তেজি বাতাস ছুঁয়ে ছুঁয়ে বিরক্ত করছে খুব৷ সযত্নে ঘোমটা-টা গুছিয়ে দিয়ে একফাঁকে মেয়েটার লাজে রাঙা মিষ্টি মুখ পরখ করে নিলো তারফান। খোঁচা মেরে বললো, ‘হাত ছাড়িয়ে নাও তাহলে।’

শুনে, মেরিন ঠিক ঠিক ছাড়াতে নিলো। অথচ তারফান ছাড়লো না। শক্ত করলো বাঁধন। মেরিন কোণা চোখে চেয়ে বললো, ‘এখন হাত ছাড়ছেন না কেন?’

তারফান কেমন নিষ্পাপ গলায় উত্তর দিলো, ‘তুমি তো চাচ্ছো না, মেরিন। তুমি চাও, আমি যেন তোমার হাত এভাবেই ধরে রাখি। সারাজীবন। বলো, চাও না?’

‘চাই না!’ কণ্ঠ নড়বড়ে হয়। কঠিন ভাবনায় একটু একটু করে হারিয়ে যায় মেরিন। অবাক হয়, তার মনের খবর এই মহাশয় বুঝলো কেমন করে? কিন্তু দমে গেলে তো চলবে না। মেরিন ঠোঁটে ঠোঁট চেপে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে। থমথমে গলায় বলে, ‘আপনাকে আমি মোটেও পছন্দ করি না।’

‘মিথ্যা।’

‘সত্য। আপনাকে দেখলে আমার ইচ্ছে করে একগাদা ফুলের মাঝখানে বসিয়ে রাখি।’

হাসির শব্দ হলো। খিলখিল হাসিতে নিশ্বাস নিতে কষ্ট হলো তালহার। এতক্ষণ সে তারফান আর মেরিনের সব কথাই শুনছিল। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে লজ্জায় হাঁসফাঁস করলো মেরিন। কিন্তু বুঝতে দিলো না। চট করে তারফান থেকে হাত ছাড়িয়ে ব্যস্ত গলায় বলল, ‘আমার ফ্রেন্ডের বাসা চলে এসেছে ভাইয়া। আমি যাই।’

মেরিন চলে যেতেই তারফানের কাঁধে হাত রাখলো তালহা। আনন্দিত গলায় বলল, ‘তুই তো মেরিনের প্রেমে কঠিন ভাবে হাবুডুবু খাচ্ছিস, তারফান। এখনো অস্বীকার করবি?’ 

মেরিনের যাওয়ার পথে এক দৃষ্টে চেয়ে থেকে তারফান অস্পষ্ট জবাব দেয়, ‘মিথ্যা বলি?’

‘বল।’

‘আমি মেরিনের প্রেমে পড়িনি।’

—————

নক্ষত্র তালুকদারের বড় ভাই, ইমন তালুকদার। বর্তমানে দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী। কয়েকদিন আগেই সিংগাপুরে ফ্যামিলি নিয়ে ঘুরতে গিয়েছিলেন। কথা ছিল বউ, বাচ্চা, ছেলে-মেয়ে নিয়ে দশ-বারোদিনের একটা লম্বা ট্যুর দেবেন। কিন্তু হলো কই? দেশে তার একাধিক অসাধু কারবার আছে। অনৈতিক ভাবে হাজার পণ্য-সামনী গোডাউনে মজুদ রেখেছেন। এই এত বছরে কেউ গোডাউনগুলোতে হাত দেওয়ার সাহস পায়নি। ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি কখনো। কিন্তু এখন? একে একে তার সব গোডাউন এমন পুড়ে যাচ্ছে কিভাবে? প্রায় সব কারবারে পুলিশের রেট। একেকটা নিউজের যন্ত্রণায় টিভি দেখা যাচ্ছে না। ইমন তালুকদার পাগলের মতোন দেশে ছুটে এলেন। ব্যাপারটা এখন তার হাতের নাগালের বাইরে চলে গেছে। টাকা দিয়ে মদন পুষেছেন তিনি। একটা যদি একটু জাতের হতো! রাগে কাঁপতে কাঁপতে বিশ্বস্ত লোক জামশেদকে ঠাটিয়ে চড় লাগালেন ইমন। ভয়ানক চ্যাঁচিয়ে উঠলেন, ‘কার কাজ এটা! বল কার কাজ **** বাচ্চা! তোদেরকে মাগবা পুষি আমি? বল ***! কে করেছে এটা?’

জামশেদ ভয়ে সিঁটিয়ে গেল, ‘আমি কিছু জানি না ভাই। আপনার ভাই… নক্ষত্র তালুকদার জানে।’

ক্ষণিকের জন্য থমকালেন ইমন। কি যেন ভাবলেন। পেছন থেকে বারংবার নিউজে সাক্ষাৎকারের জন্য মাথা পাগল করে দিচ্ছে। প্রথমে আগে দেশকে ভুজুংভাজুং বোঝাতে হবে। বাকিটা পরে দেখা যাবে।
জোরে জোরে শ্বাস ফেলে বুকের বাম পাশটা একহাতে চেপে ধরলেন ইমন। দাঁতে দাঁত চেপে শাসালেন, ‘আমার কিছু হলে তোরা সবাই মরবি। মনে রাখিস।’

—————

টিভির পর্দায় ইমন তালুকদারের নিউজ চলছে। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে একের পর এক মিথ্যের বুলি এঁটে যাচ্ছে সে। তালহা টিভির সাউন্ড একটু বাড়িয়ে মায়ের ঘরের দরজার দিকে তাকালো। আটকানো। যাক! ঘুমাচ্ছে তাহলে! টিভির দিকে চেয়ে তালহা বিড়বিড়িয়ে উঠলো, ‘শালা বেজন্মা!’

ধপ করে তালহার পাশে বসে তারফান ক্লান্ত গলায় বললো, ‘ওটা আমরা।’

তারফানের পরনে সাদা এপ্রোন৷ হাতে তখনো স্টেথোস্কোপ। ডাক্তারি ভাবসাব। মুখ ম্লান। তালহা ভ্রু কুঁচকে বললো, ‘কি ব্যাপার! আজকাল এখানে এত কি তোর? এ ঘর না বয়কট করেছিলি?’

তারফান উত্তর দিলো না। সোফায় মাথা এলিয়ে ঘন ঘন নিশ্বাস নিলো। হালকা চোখ মেলে টিভির পর্দার নিউজ দেখলো কিয়ৎক্ষণ। জিজ্ঞেস করলো, ‘মা কই?’

‘ঘুম, কেন?’

‘কথা ছিল।’

তালহা জহুরি চোখে তাকায়৷ প্রশ্ন করে, ‘কি কথা?’

‘মেরিনের সঙ্গে আমার বিয়ের কথা বলবো।’

তালহার চোখ বড় বড় হয়। সোফায় প্রায় লাফিয়ে উঠে বসে সে। হতবাক হয়ে শুধায়, ‘কি বললি?’

ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসছে। ঘুম পাচ্ছে প্রচুর। ওভাবেই, ওখানেই ঘুমের তাড়নায় অতিষ্ঠ হয়ে তারফান কেমন মুখস্তের ন্যায় আওড়ায়, ‘মেরিনকে বিয়ে করবো।’
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp