হৃদয়ে রহো প্ৰিয় - পর্ব ১৩ - রাই কথা - ধারাবাহিক গল্প

হৃদয়ে রহো প্ৰিয় - রাই কথা
          মাঘের রাতগুলো খুব দ্রুত নিঝুম হয়ে আসে। চিলেকোঠার ছাদমুখী জানালার ওপাশে ঘন কুয়াশা চাদরের মতো লেপ্টে আছে। শেষ শৈত্যপ্রবাহের সংকেত কিনা কে জানে! মাহির ঠান্ডা বাতাস রোধ করার জন্য ঘুমানোর আগে মোটা মোটা চাদর টাঙিয়ে দেয় সেখানে। 

আয়না বিছানায় বসে ল্যাপটপে তার কাজগুলো শেষ করার চেষ্টা করছিল। ঘর আধো অন্ধকার, ল্যাপটপের নীলচে আলো আয়নার তীক্ষ্ণ চেহারায় এসে পড়ছে। তখনই সিঁড়িতে সেই চেনা পদধ্বনি শোনা গেল। গম্ভীর, মন্থর আর ছন্দবদ্ধ। মাহির অফিস থেকে ফিরেছে।

​আয়না কেন জানি এই মুহূর্তে মাহিরের মুখোমুখি হতে চাইল না। দ্রুত ল্যাপটপটা বন্ধ করে সাইড টেবিলের ওপর রাখল। তারপর কম্বলটা টেনে গা ঢেকে শুয়ে পড়ল। চোখের পাতা বন্ধ করে সে গভীর ঘুমের ভান করল। 

​মাহির ঘরে ঢুকল। আয়না চোখ বুজে থাকলেও তার প্রতিটি ইন্দ্রিয় এখন সজাগ। সে শুনতে পেল মাহির তার ব্যাগটা টেবিলের ওপর রাখল। তারপর ঘড়ি খুলে খট করে রাখল ড্রেসিং টেবিলে। গলার টাই আলগা করে ঝুলিয়ে রাখল। মাহির খুব শব্দহীনভাবে চলাফেরা করে, যেন ঘরের ঘুমন্ত মানুষটার কোনো ব্যাঘাত না ঘটে। আয়না অনুভব করল মাহির গ্লাসে পানি ঢালছে। ঢকঢক করে পানি খাওয়ার শব্দটাও নিস্তব্ধ রাতের কারণে তার কানে পরিষ্কার বাজছে।

​রুটিনমাফিক কাজগুলো শেষ করে মাহির বিছানার দিকে এগিয়ে এল। আয়না পাথর হয়ে পড়ে আছে। হঠাতই সে চমকে উঠল। কম্বলের নিচ সুরক্ষিত থাকা তার পায়ের পাতায় কেউ স্পর্শ করল!

মাহিরের বলিষ্ঠ আঙুলগুলো আয়নার পায়ের কনিষ্ঠার কাছে খুব আলতো করে ছোঁয়া দিল। সেই অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শে আয়নার শরীরের ভেতর দিয়ে এক সূক্ষ্ম শিহরণ বয়ে গেল। সে আর স্থির থাকতে পারল না, চোখের পাতা আপনাতেই খুলে গেল।

​বিছানার এক প্রান্তে মাহির বসে আছে। তার গায়ে এখনো অফিসের এলোমেলো শার্ট, তবে কয়েকটা বোতাম খোলা ও হাতাগুলো গোটানো। আয়না উঠে বসে তাকাতেই মাহির খুব স্বাভাবিক গলায় প্রশ্ন করল, জেগে গেছো?

​মাহিরের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্টুমি ভরা হাসি। সেই হাসি বলে দিচ্ছে, আয়না যে এতক্ষণ ঘুমের অভিনয় করছিল, সেটা তার কাছে একদম পরিষ্কার। অথচ সে সেটা নিয়ে কোনো টিপ্পনী কাটল না বা আয়নাকে লজ্জিত করল না। মাহির যেন আয়নার নির্লিপ্ত ছদ্মবেশের আড়ালের ছোট ছোট লুকোচুরিগুলো বেশ উপভোগ করে।

​সে পকেট থেকে ছোট একটা প্যাকেট বের করল। আয়না না চাইতেও উঁকি দিয়ে দেখল। ভেতর থেকে বের হয়ে এল একজোড়া মোজা। একদম ছোটদের মতো কিউট কার্টুন আঁকা মোজা, সামনে গোলাপি রঙের ছোট বিড়ালের কান আছে।

​-তোমার হাত-পা সবসময় ঠান্ডা হয়ে থাকে আয়না। এই শীতের খালি পায়ে থাকলে তো অসুখ বাধাবে, স্লিপার ও তুমি ঠিকমতো পরো না!

বলতে বলতে মাহির আবার আয়নার পায়ের পাতা নিজের হাতের মুঠোয় নিল।

​আয়না চরম আড়ষ্ট হয়ে গেল। মাহিরের হাতের তালু তার তুলনায় অনেক গরম, সেই উষ্ণতা আয়নার শীতল রক্তে এক ধরণের অস্বস্তি ও উষ্মা দুটোই মিশিয়ে দিচ্ছে। মাহির তার স্ত্রীর খামখেয়ালির বিবরণ দিতে দিতে অসংকোচে আয়নার পায়ে ম্যাসাজ করতে শুরু করল। তার আঙুলগুলো এমনভাবে নড়ছে যেন সে অনেক আগে থেকেই এই অধিকারটুকু নিজের করে নিয়েছে।

এখানেই থমকে আয়না ও তার সকল পরিকল্পনা। রাগ হয় তার। দিশেহারা হয়ে নড়বড় হয়ে পড়ে তার ভিত্তি। ভদ্রলোক নিজের কাজকর্মে তটস্থ রাখে তাকে। নিজের নায্য অধিকার ফলাবে না কিন্তু দায়িত্ব পালন করবে চরম অধিকারবোধ নিয়ে। 

​আয়না মোজার ডিজাইনটা দেখে ভুরু কুঁচকাল। বাচ্চাদের মতো এই কার্টুন মোজাগুলো তার ব্যক্তিত্বের সাথে যায় না। একদমই যায় না!

সে কিছুটা পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে বলল, 
এটা আনার কোনোই দরকার ছিল না। সবসময়ই আমার হাত-পা ঠান্ডা থাকে।

-সবসময় ছিল বলে এখনও থাকতে হবে এমন কোনো কথা কি আছে?

 -আর ডিজাইনটাও কেমন জানি...

​-উহু! ডিজাইন দিয়ে কী হবে? আরামটাই আসল।

-এটা তো বেবিদের!

-তাতে কি হয়েছে? জেদ করে না আয়না!

মাহির যেন আয়নার আকুল অভিযোগ শুনতেই পেল না। সে আয়নার কোনো আপত্তির তোয়াক্কা না করে নিজ হাতে মোজা জোড়া পরিয়ে দিতে লাগল।

আয়নার নিজেকে ছোট খুকি মনে হলো। কেমন বেখাপ্পা লাগছে খয়েরি শাড়ির সাথে এই মোজা জোড়া! বদলোক আপাদমস্তক তাকে দেখে আবার হেসে বলল, গুড গার্ল!

আয়নার বলতে ইচ্ছে হলো, তোমার গুড গার্লের গুষ্টি কিলাই!

কিন্তু তাতে ইনি আবার দুঃখ পেতে পারেন। আয়নার রাগে গা জ্বলে গেল। তাও সে কিছু বলল না কারণ গুষ্টি কিলাই বলাও তার সাথে যায় না। 

​আয়না এই নৈকট্যে প্রচণ্ড বিচলিতভাব সে দেখে না। মাহির তার পায়ের কাছে বসে এমনভাবে কাজটা করছে যেন এটি কোনো নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এখনো পর্যন্ত তাদের মধ্যে চুড়ান্ত শারীরিক ঘনিষ্ঠতার উদ্যোগ নেয়নি, কিন্তু তার ছোট ছোট এই আচরণগুলো বলে দেয় সে মোটেও কোনো সন্ত নয়। তার স্পর্শে এক ধরণের শান্ত দখলদারিত্ব আছে। মাহির যেন খুব ভালো করেই জানে, এই মানুষটার ওপর তার সর্বময় অধিকার আছে এবং সে সেটা প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে জাহির করতেও জানে।

​মোজা পরানো শেষ করে মাহির আয়নার পায়ের পাতার ওপর একবার আলতো চাপ দিল। এই স্পর্শটা অর্থহীন নয়। আয়না দেখল মাহির আবার সেই অদ্ভুত শান্ত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। মাঘের শীতের মাঝেও আয়নার তখন মনে হলো, এই ঘরের তাপমাত্রা হুট করেই অনেকটা বেড়ে গেছে।

সে মাহিরকে কাছে আসার সুযোগ দিল না।​ আগের অভিজ্ঞতা থেকে ঢের শিক্ষা হয়েছে তার! আয়না মুখ ঘুরিয়ে নিল। মাহির ও বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল না। সে আধশোয়া হয়ে বসে আয়নার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখেমুখে অদ্ভুত প্রশান্তি।

​-সারাদিন কেমন কাটল তোমার? নিচের সবাই কি ঠিকঠাক ব্যবহার করছে তোমার সাথে?

​আয়না একটু নড়েচড়ে বসল। সে জানে, এই বাড়িতে শারমিন আরা বা সাহেরা বানুর সাথে তার সমীকরণ মাহিরের সম্পূর্ণ অজানা নয়। কিন্তু সে চায় না মাহিরের সামনে নিজেকে একজন অভিযোগকারী হিসেবে তুলে ধরতে। পৃথিবীর কোনো পুরুষই নিজের পরিবারের বিরুদ্ধে নেতিবাচক কথা মেনে নিতে পারে না। ঘটনা বিন্দু থেকে সিন্ধুতে গড়ায় ও স্ত্রীর জীবন কঠিন হয়ে যায়।

 সে ছোট করে উত্তর দিল,
খুব একটা খারাপ না। তোমার চাচী নিজের ঘর-সংসার নিয়ে খুব সচেতন, আমি খুব একটা ওনার কাজের মাঝখানে যাই না। তাই অশান্তির খুব একটা সুযোগ নেই।

​আয়নার স্বরে নির্লিপ্ততা। মাহির শুনে কিঞ্চিৎ হাসল। সে বোধহয় বুঝে নিয়েছে আয়না এই বাড়িতে কিছুটা ব্রাত্য হয়ে টিকে আছে। সে হয়তো আশা করেছিল আয়না তাকে পাল্টা কিছু জিজ্ঞেস করবে। তার দিনটা কেমন কাটল, অফিসে কোনো ধকল গিয়েছে কি না।

​কিন্তু আয়না নিশ্চুপ। তার মাহিরের ব্যক্তিগত বা পেশাগত জীবন নিয়ে নূন্যতম কৌতূহলও নেই। সে কেবল জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। মাহির কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল ফিরতি প্রশ্নের জন্য। যখন দেখল আয়না পুরোপুরি মৌনব্রত ধারণ করেছে, তখন সে নিজের ভেতরের এক চিমটি হতাশা চাপা দিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠল। 

​-ঠিক আছে, ঘুমানোর চেষ্টা করো। অনেক রাত হলো।

 মাহিরের গলার স্বর এবার কিছুটা গম্ভীর। ​সে ড্রয়ার থেকে টাওয়াল আর কাপড় নিয়ে বাথরুমের দিকে এগুলো। আয়না দেখল মাহির বাথরুমে যাওয়ার আগে একবারও পিছন ফিরে তাকাল না। সে ভাবল এগারো দিন বিশ ঘন্টা হয়ে গেছে। তাও মেয়েটা স্বাভাবিক হওয়ার নাম নিচ্ছে না!
​বাথরুমের দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দে আয়নার তন্দ্রা ছুটে গেছে। মাঘের মধ্যরাতে সে পানির শব্দ শুনতে লাগল।

—————

 আয়নার সকাল-বিকেল কাটে ছাঁদ মুখী জানালার ধারে বসে বই পড়ে। বেশ কিছু বই সে নিশিখালি থেকে সাথে করে এনেছে। এছাড়া মিনি তার সংগ্রহ থেকে তার রোজ কিছু না কিছু পড়তে দেয়। দিনার পাঠ্য বইয়ের বাইরে তেমন রুচি না থাকায় মিনা বই পড়ে কারো সাথে মেয়েলি আলোচনা করার সুযোগ পেত না। এখন সে আয়নাকে নিজের কল্পনা জল্পনার কথা শুনায়। আয়না বেশিরভাগ নীরব থাকলেও মিনার কথা শুনে, তার আগ্রহ-শখ বা আবেগের অলীক কল্পনাকে তাচ্ছিল্য করে অপমান করে না। এতেই তার মন ভরে যায়।

আয়না মিনিকে একদিন জিজ্ঞেস করে, 
তোমার আম্মা কিন্তু আমাকে তোমার জন্য এখন আরো বেশি অপছন্দ করেন।

মিনি হতবাক হয়ে বলল, একদমই না। কে বলেছে এ কথা!

-কারো বলা লাগে না। এতটুকু সহজেই অনুমান করা যায়। শত বারণ সত্ত্বেও তুমি বারবার উপরে আসো। মাঝে মাঝে আমার জন্য তর্কও করে ফেলো। বোনের সাথেও ঝগড়া করছো এ নিয়ে।

মিনি তীব্র প্রতিবাদ করে বলল, 
ভাবী তোমাকে নিয়ে মোটেও না। দিনার সাথে সবসময়ই আমার ঝামেলা হতো। সে নিজেকে মনে করে সর্বগুণ সম্পূর্ণ আর আমাকে ভাবে অষ্টরম্ভা! স্কুলেও এমন নাক উঁচু করে চলতো! আমাকে নিয়ে শুধু বিচার দিয়ে বেড়ায়! মা'র রাগ কমছে না হয়তো এটা দেখে যে অন্য আর কেউই এ ব্যাপারে রেগে নেই। সব স্বাভাবিকভাবে মেনে নিয়েছে। বাড়ির মানুষরা তার সাথে সহমত না হলে মা রেগে যায়। বাবা তো আছেই, এমনকি দাদী বুড়িটাও এখন তোমাকে পছন্দ করে। সে তো আর সরাসরি বলবে না। তবে মাহির ভাইয়া ছাড়া আর যাকেই তার ভালো লাগে তার সাথেই খ্যাক খ্যাক করে সারাদিন। 

আয়না কৌতুহলী হয়ে প্রশ্ন করল, কেন? তোমার ভাইয়ার জন্য ব্যতিক্রম কেন?

-শুধু মাহির ভাইয়া দাদী বুড়ির কাছে স্পেশাল। ইভেন রায়হান ভাইয়া বা রামিনকেও সমান গুরুত্ব দেয় না। এটা নিয়েও সবসময় মা রেগে থাকে।

-কিন্তু কেন?

-কি জানি! রায়হান ভাইয়া বলে চাচ্চু নাকি দাদী বুড়ির প্রিয় ছেলে ছিল তাই দেখে। আমার মনে হয়৷ মেইবি মাহির ভাইয়া অরফ্যান এরজন্য। সবারই তো অরফ্যানদের জন্য মায়া হয় তাই না?

আয়না কিছুক্ষণ চুপ থাকল। এতিম শব্দটির ভার অনেক। মাথায় বটবৃক্ষের মতো মা-বাবার ছায়া না থাকলে জীবন পর্বতের মতো ভারী মনে হয়। গলার কাছে সারাজীবনের মতো দুঃখগুলো দলা পাকিয়ে থাকে। মাহিরের জীবন ও কি তাহলে এভাবেই কেটেছে?

আয়না বেশি প্রশ্ন করে না। মিনি যেতে দেয়। সে টুকটাক ঘর গুছাতে থাকে। একটা ফুলদানি হলে বেশ হতো। বিছানার মাথার উপরের দেয়ালটা ফাঁকা, সেখানে কিছু ফটো ফ্রেম লাগালে চমৎকার হতো। ধীরে ধীরে চিলেকোঠায় পুরোটা সময় কাটানো কিছুটা কঠিন হয়ে পড়ে আয়নার জন্য। মাহির তাকে ফোন কল করে মাঝে সাঝে। মুখস্থ বুলি আওড়ানোর মতো জিজ্ঞেস করে কিছু লাগবে কিনা। আয়নাও যান্ত্রিকভাবে নেতিবাচক উত্তর দেয়। 

নিয়মিত একান্তের একঘেয়েমি থেকে অবসাদ জন্ম নেয়। আয়না তখন চোখ বুজে কল্পনা করে তার ফেলে আসা নিশিখালিকে। 

​কল্পনায় সে দেখতে পায় সেই কপতী নদীটাকে। এখনো নিশ্চয়ই কুয়াশার পাতলা চাদর সরিয়ে নদীটা অলসভাবে বয়ে চলছে। ঘাটে বাঁধা ডিঙি নৌকাগুলোর গায়ে ঢেউয়ের মৃদু ছলাৎ-ছলানি শব্দ শোনা যাচ্ছে। নদীর পাড়ে মাইলের পর মাইল সাদা কাশবনের দোলার নান্দনিক দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। আয়নার স্মৃতিতে গোধূলির আলোয় যখন আকাশটা আবির রঙের হয়ে যেত, তখন সাদা কাশফুলগুলো রুপোলি আভা ছড়াতো।

মাঝে মাঝে আয়নার মনে হয়, সে যেন এখনো বাড়ির কাছের পুকুরঘাটের শ্যাওলা ধরা সিঁড়িতে পা ডুবিয়ে বসে আছে। পানির সেই হিমশীতল স্পর্শ তার সারা শরীরে এক অদ্ভুত প্রশান্তি ছড়িয়ে দিচ্ছে। বাড়ির পেছনের সেই অন্ধকার বাঁশঝাড়, যেখান দিয়ে বাতাস বয়ে গেলেই বাঁশির মতো শব্দ হতো। আর গভীর রাতে হাজার হাজার জোনাকির সেই মিটিমিটি আলো, যা দেখে মনে হতো আকাশটাই যেন নিচে নেমে এসেছে। শহরে সেসব দেখা আর সম্ভব কোথায়?

​নিশিখালিতে মেঠোপথ ধরে উত্তরে কিছুক্ষণ দিগন্তজোড়া সরষে ক্ষেত ছিল। এতো সুন্দর ছিল যে মনে হতো হলুদ রঙের সেই সমুদ্র রোদের সাথে পাল্লা দিয়ে হাসছে। বাতাসের ঝাপটায় যখন সেই হলুদের ঢেউ খেলে যায়, তখন তার ঝাঁঝালো সুবাসে নাক ভরে ওঠে। নিশিখালির সোঁদা মাটির ঘ্রাণ, যা শহরের এই কংক্রিটের ধুলোয় হারিয়ে গেছে।

শেষমেশ ​সে মনে করে সেই মেঠো পথটার কথা। দুপাশে ঘন ঘাস আর শিশিরভেজা ধুলো। ভোরের সূর্য পুব আকাশে উঁকি দিত আর তালগাছের দীর্ঘ ছায়াগুলো আলপথের ওপর লম্বা হয়ে শুয়ে থাকত। ডালিম তলায় দাঁড়িয়ে যখন সে আকাশ দেখত, সেই নীলটা ছিল আদিগন্ত, কোথাও কোনো দালানের বাধা ছিল না।

প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে মেয়েদের জীবনটা যেন অনেকটা বনসাইয়ের মতো, এক মাটি থেকে উপড়ে নিয়ে অন্য মাটিতে রোপণ করা হয়। বিয়ের লগ্নটি আসার সাথে সাথেই তাদের আজন্ম লালিত শিকড়গুলো টেনে হিঁচড়ে উপড়ে ফেলতে হয়। নিয়ম হলো, নতুন ডালপালায় অন্য এক উঠানকে ছায়া দিতে হবে, সমৃদ্ধির বরদান দিয়ে আজীবন সবুজ করে রাখতে হবে অচেনা এক গৃহকোণকে। কিন্তু শিকড় উপড়ে ফেলার সেই রক্তক্ষরণ শব্দহীন হয়। ​আয়না সম্ভবত তার শিকড়টা নিশিখালির উর্বর মাটির গভীরেই ফেলে এসেছে।

—————

পরদিন সকালে যখন আয়নার ঘুম ভাঙলসে অভ্যাসবশত বিছানার অন্যপাশে হাত বাড়াল, তার আশানুরূপ জায়গাটা খালি। মাহির কি তবে সকালেই বেরিয়ে পড়েছে? আয়না উঠে বসল। ঠিক তখনই সে নিজের পায়ের পাতায় এক অদ্ভুত ওম অনুভব করল। নিচের দিকে তাকাতেই গতরাতের সেই মোজা জোড়া চোখে পড়ল।

​আয়না কিছুক্ষণ স্থির হয়ে মোজা দুটোর দিকে তাকিয়ে রইল। পরতে আরামদায়ক হলেও ডিজাইনটা তার কাছে এখনো চরম হাস্যকর আর অনর্থক মনে হচ্ছে। তার মনে মনে বিরক্তি দানা বাঁধল। মানুষটা কেন যে এমন অদ্ভুত দরকারি-অদরকারি জিনিস কিনে আনে! অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিরক্তি সত্ত্বেও সে মোজা জোড়া খুলে ফেলল না। অবলীলায় ওভাবেই পা ফেলে সে বিছানা থেকে নামল।

​ঘরটা আজ নিস্তব্ধ। সাধারণত এই সময়ে মাহির অফিসে যাওয়ার পথে থাকে। আয়না খেয়াল করল আজ শনিবার, মাহির আজ একটু দেরিতেই বের হয়। তার বিশ্বাস পোক্ত হলো টেবিলে পিরিচ দিয়ে ঢেকে রাখা চায়ের কাপ দেখে। এটা নিশ্চয়ই মহাশয়ের কাজ।

​আয়না নিজের অগোছালো কাপরগুলো গোছাতে শুরু করল। আলমারির পাশে রাখা তার বড় স্যুটকেসটা ঘরের অনেকটা জায়গা দখল করে আছে। নিশিখালি থেকে আসার সময় এতে করেই সে তার সমস্তটা ভরে নিয়ে এসেছিল। 
এখন ঘরটাকে একটু পরিপাটি দেখানোর জন্য সে স্থির করল স্যুটকেসটা আলমারির ওপর তুলে দেবে।
​কিন্তু আলমারিটা বেশ উঁচুতে। আয়না প্রথমে একটা টুল টানল, তাতেও নাগাল না পেয়ে চেয়ারের ওপর একটা ছোট মোড়া রাখল। অতি সাবধানে ওপর উঠে সে ভারী স্যুটকেসটা দুহাতে তুলে আলমারির মাথায় ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করল।

​তখনই বাথরুমের দরজা খুলে মাহির বেরিয়ে এল। তোয়ালে দিয়ে ভেজা চুল মুছতে মুছতে আয়নার এই ঝুঁকিপূর্ণ কাণ্ড দেখে সে থমকে গেল। মাহিরের চোখেমুখে মুহূর্তেই বিরক্তি আর উদ্বেগ ফুটে উঠল। সে গলা খাঁকারি দিয়ে ঘরণীর মনোযোগ আকর্ষণ করল।  

​-আয়না! কি করছো তুমি? 

মাহিরের গলার স্বর স্বাভাবিকের চেয়ে একটু চড়া। আয়না বলল, 
স্যুটকেস রেখে দিচ্ছি এখানে।

-ধন্যবাদ, তা আমি দেখতেই পাচ্ছিলাম। আমাকে একবার ডাকলে কী হতো? এভাবে টুলের উপর টুল দেওয়া বিপদজ্জনক না? 

​আয়না স্যুটকেসটা আলমারির কোণায় সেট করতে করতে ঘাড় ঘুরিয়ে শান্ত একগুঁয়ে গলায় বলল, আমি ঠিক আছি। এটুকু কাজ আমি নিজেই করতে পারি। সবসময় তোমাকে ডাকার প্রয়োজন দেখি না।

​আয়নার গলায় সেই চিরচেনা রক্ষণাত্মক সুর। সে কিছুতেই মাহিরের ওপর নির্ভরশীল হতে চায় না। মাহির তোয়ালেটা কাঁধে রেখে অপ্রসন্ন মুখে দাঁড়িয়ে রইল। আয়না যখন কাজ শেষ করে নামার উপক্রম করল, ঠিক তখনই তার আত্মবিশ্বাসের বারোটা বাজিয়ে অঘটনটা ঘটল। টুলের ওপর থেকে পা নামাতে গিয়ে হঠাতই তার ভারসাম্য খানিকটা বিগড়ে গেল। নিচে থাকা টুলটা সামান্য নড়ে উঠতেই আয়না শূন্যে হাতড়াল।

​মাহির চোখের পলকে এগিয়ে এল। আয়না মেঝের কাছে আগেই মাহির তাকে দুহাতে শক্ত করে ধরে ফেলল। আয়নার কোমরের নিচে চলে গেল মাহিরের বলিষ্ঠ দুই হাত। পতনটা ঠেকানো গেলেও মাহির তাকে তৎক্ষণাৎ ছেড়ে দিল না। সে আয়নাকে সাবধানে মেঝেতে দাঁড় করিয়ে দিতে কয়েক মুহুর্ত সময় নিল। কতটা অবলীলায় তাকে মেঝে থেকে ইঞ্চিখানিক শূন্যে তুলে রেখেছে। যেন চোখে আঙুল দিয়ে আয়নার ভূল দেখিয়ে দিচ্ছে। এরচেয়ে পরে গিয়ে হাত পা ভাঙলেও খুব খারাপ হতো না।

ভদ্রলোক আবার নামিয়ে দিয়েও তার কোমর থেকে নিজের দু-হাত সরাল না।

​পুরো ঘরটা এক লহমায় নিথর হয়ে গেল। মাহিরের ভেজা চুলের জলবিন্দু আর শরীরের উষ্ণতা আয়নার স্নায়ুতে এসে বিঁধছে। আয়নার হৃৎপিণ্ড তখন দ্রুত লাফাচ্ছে, তবে সেটা কি কেবল আকস্মিক পড়ে যাওয়ার ভয়ে নাকি এই অনাকাঙ্ক্ষিত নৈকট্যে তা বোঝা দায়। মাহিরও এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে রইল। 

​কেউ কোনো কথা বলল না। এই নৈকট্য, এই নীরবতা মাঝে দু'জনের নিশ্বাসের শব্দ সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত ঘনীভূত টানটান উত্তেজনা তৈরি হলো। কেউ সরে গেল না, আবার কেউ এগিয়েও এল না। 

আয়না নিজেকে ছাড়িয়ে পিছিয়ে এলো। মাহিরের দিকে পিঠ দিয়ে বলল, চা? চা দিব?

মাহির বেশ উপভোগ করে এই অস্বস্তি। সে কপট অভিযোগের সুরে বলে, আমি-ই তো বানালাম! সেটাই সাধছো? 

আয়না অপ্রস্তুত হয়ে বলে, তাহলে নাস্তা এনে দিব?

মাহির কিছু বলার আগেই সে নিচের দিকে চলে যায়।

—————

মাহির সেদিকে তাকিয়ে মনে করে সদ্য ঘুম থেকে ওঠা আয়নার চেহারায় অগোছালো শ্রী ছিল। আয়না সাধারণত সবসময় নিজেকে শক্ত খোলসের নিচে গুটিয়ে রাখে, কিন্তু সেই মুহূর্তে তার রক্ষণাত্মক দেয়াল খানিকটা দুর্বল হয়ে পড়েছিল।

​মাহিরের আয়নার চোখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে একটা বিচিত্র অনুভূতির শিকার হতে হয়েছিল। আয়নার কাজলহীন চোখদুটো ঘুমের আবেশে তখন খানিকটা ফোলা এবং রক্তাভ। অবাধ্য কয়েকটা চুল তার কপালের একপাশ বেয়ে গালে এসে ঠেকেছে।

মাহিরের মনে একটা প্রবল ইচ্ছা হলো আয়নার ওই অবাধ্য চুলগুলো কানে গুঁজে দিয়ে খুব নিচু স্বরে জিজ্ঞাসা করতে যে এত জেদ কেন করে সে!

​কিন্তু সে নিজেকে সংবরণ করল। না করে যে উপায় নেই। সে রাতের পর তাদের মাঝে সবটাই বদলে গেছে।

মাহির অফিস থেকে ফিটে খেয়াল করল আয়না অনেকক্ষণ ধরে বিছানায় আড়ষ্ট হয়ে বসে আছে। মাহির ঘরে ঢোকার পর থেকেই সে নিজেকে এক মানসিক প্রস্তুতিতে ব্যস্ত রেখেছে।

গত কয়েকদিন ধরে নিরাসক্ত অথচ সমর্পিত আচরণ মাহিরকে চিন্তা করার সুযোগ দিয়েছিল, তবে এ নিয়ে সরাসরি কথা বলার কোনো পরিকল্পনা ছিল না।
 অপরদিকে মাহিরের যত্নশীল আচরণ আয়নাকে অস্থির করে তুলছিল। মাহির তাকে আগলে রাখছে, তার স্বাচ্ছন্দ্যের খেয়াল রাখছে, অথচ প্রতিদানে আয়নার কাছ থেকে কিছুই দাবি করছে না। মাহিরের এই দিয়ে যাওয়া আর বিনিময়ে কিছু না নেওয়া আয়নার ভেতর এক ধরণের সূক্ষ্ম অপরাধবোধের জন্ম দিয়েছে। সে নিজেকে অপরাধী মনে করছে কারণ সে জানে, মাহিরের এই নীরব ত্যাগের বিপরীতে বিশেষ কিছু দেওয়ার মতো নেই। অপরদিকে সারা জীবনকে পরিকল্পনার ছকে সাজানোর আয়নার মনে যেকল অপ্রত্যাশিত অনুভূতি জন্ম নিচ্ছিলো তাও তার কাছে ভীতিকর ছিল। কেন মাহির তাকে বারবার চমকে দিচ্ছে? আচরণে আর দশটা স্বামীর চেয়ে ভিন্নতা কেন?
 এক পর্যায়ে আয়নার মনে হয়েছে, মাহির হয়তো তার পক্ষ থেকে কোনো সংকেত বা সম্মতির অপেক্ষায় আছে। তাই আজ সে মনস্থির করেছে। 

​মাহির গোসল করে এসে ঘরের আলনায় তার তোয়ালেটা রেখেছে। আয়না আড়চোখে দেখল মাহিরের প্রতিটি গতিবিধি। আজ সে অন্যদিনের মতো ল্যাপটপ খুলে বসেনি বা বই পড়ার ভান করেনি। সে বিছানার চাদরটা বারবার ঠিক করছে, মাহিরের উপস্থিতিতে নিজেকে একটু সহজ করার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। শাড়িটা কিছুটা এলোমেলো। এতেই লজ্জায় তার দমবন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা! তবে এই ব্যাপারটা আর সে ঝুলিয়ে রাখতে চায় না। দায়িত্ব পালন করে মানসিকভাবে মুক্তি চায় মাহিরের কাছে, তার জন্য জন্মানোর অসহ্য অনুভূতিগুলোর কাছে।

কিন্তু তার শরীরের আড়ষ্টতা মাহির চোখ ফাকি দিতে পারে না। কাঠের মতো শক্ত হয়ে বসে থাকাটা স্পষ্ট জানান দিচ্ছ সবটা।

​মাহির তোয়ালেটা রেখে আয়নার দিকে তাকাল। আয়নার এই অস্বাভাবিক আচরণ তার নজর যেন আর চেয়েও এড়ানো না। সে দেখল আয়না কেমন পাথুরে মুখ করে বসে আছে, যেন কোনো অসাধ্য সাধনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। মেয়েটা হয়তো নিজেও বুঝতে পারছে না। মাহির নিজের মতো নিঃশব্দে বিছানার অপর প্রান্তে এসে বসল, কিন্তু আয়নার দিকে কোনো বিশেষ ইঙ্গিত করল না। সে কেবল নিজের ফোনটা হাতে নিয়ে কয়েকটা মেইল চেক করতে শুরু করল।

​মিনিট পনেরো পার হয়ে গেল। ঘরের নীরবতা ক্রমেই অসহ্য হয়ে উঠছে আয়নার কাছে। মাহির কেন এগিয়ে আসছে না? কেন সে এই সুযোগটা নিচ্ছে না? আয়নার মনে হলো মাহির ইচ্ছা করেই তাকে এই অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলে রেখেছে। সে ভেবেছিল মাহির তাকে কাছে টানলে সে নিজেকে সমর্পণ করে দায়মুক্ত হবে, কিন্তু মাহিরের এই নিষ্ক্রিয়তা তার ধৈর্য পরীক্ষা করছে।

​অবশেষে নীরবতা ভাঙল আয়না। তার গলা শুকিয়ে আসছিল, তবুও সে বেশ রুক্ষ আর সোজাসুজি কণ্ঠে প্রশ্ন করল, তুমি কি আমার অনুমতির অপেক্ষায় আছো?
​মাহির ফোন থেকে চোখ সরিয়ে আয়নার দিকে তাকাল। তার চোখের দৃষ্টিতে এক ধরণের তীক্ষ্ণ কৌতূহল তাও মনোক্ষুণ্ণতা ঢাকা যাচ্ছে না। সে সোজা হয়ে বসে শান্ত গলায় পালটা প্রশ্ন করল, অনুমতি? কিসের অনুমতি আয়না?

এতোটা অজ্ঞাত সাজায় আয়নার রাগ হয়। ​আয়না নিজেকে বাস্তববাদী আর দায়িত্বশীল প্রমাণ করার জন্য একটু জোর দিয়ে বলল, তুমি যদি আমার সম্মতির অপেক্ষায় থেকে থেকে থাকো তবে তোমার তা আছে।

-তাই নাকি!

আয়নার মাহিরের শুষ্ক তাচ্ছিল্য ধরতে পারল না। সে বলতে লাগল, আমি জানি স্ত্রী হিসেবে আমার কিছু নির্দিষ্ট দায়বদ্ধতা আছে। আমি কখনোই তাতে বাধা দেব না।

মাহিরের কাছে ​আয়নার কথাগুলো বরফের মতো শীতল। তার কণ্ঠে কোনো অনুরাগ নেই, নেই কোনো আকাঙ্ক্ষা। সে যেন এক চুক্তিনামা পাঠ করছে, যেখানে সে নিজেকে মাহিরের কাছে সঁপে দিতে রাজি কেবল কর্তব্য পালনের খাতিরে। তার এই অনুমতি দেওয়াটা অনেকটা করুণার মতো শোনাল।

​মাহির কয়েক মুহূর্ত একদম চুপ করে রইল। সারাদিনের ধকলের সাথে দোতালার পারিবাবিক সালিশি ঝামেলা! সব মিলিয়ে তার চোয়াল শক্ত হয়ে এল, কিন্তু সে রাগে চিৎকার করল না। বরং এক ধরণের শান্ত অবজ্ঞা নিয়ে সে হাসল। মাহির আয়নার দিকে একটু ঝুঁকে এসে বলল, 
তা বুঝতে আমার কোনো সমস্যা হচ্ছে না।

আয়না অবাক হয়ে বলল, মানে?

-তুমি যেভাবে কোনো বলিপ্রদত্ত শিকারের মতো আচরণ করছো তাতে যাই হোক না কেন কর্তব্য পালন তুমি পিছ পা হবে না তা নিশ্চিত। 

​আয়না অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। মাহিরের বিরক্তির কারণ সে ধরতে পারল না। সে তো সজ্ঞানে তার অধিকার মেনে নিচ্ছে, তবে মাহির কেন এমন করছে? সে ধরা গলায় বলার চেষ্ট করল, আমি তো….বৈবাহিক জীবনে তো এটাই স্বাভাবিক নিয়ম…

​-নিয়ম!

 মাহির বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার স্বরে এবার স্পষ্ট ক্ষোভ ফুটে উঠল। আয়না, তুমি নিজের চারপাশে একটা কাঁচের দেয়াল তুলে রেখেছ। তুমি আমাদের এই সম্পর্কটাকে একটা অফিসের ডিউটির মতো দেখছো। কিন্তু আমি কোনো পাথর নই যে তোমার এই প্রাণহীন নিস্পৃহতা নিয়ে তৃপ্ত হবো।

​সে ঘরের মাঝে পায়চারি করতে করতে বলতে লাগল, তুমি আজ যা করছো তাকে বলে সহ্য করা, গ্রহণ করা নয়। আমি এটা চাই না আয়না। আমি চাই যেদিন তুমি আমাকে কেবল কর্তব্য ভেবে নয়, বরং নিজের মানুষ ভেবে কাছে টানবে, সেদিনই আমি তোমার কাছে আসব। তার আগে তোমার এই জবরদস্তিমূলক উৎসর্গ আমার কাছে চরম অপমানের সমান।

​আয়না মাথা নিচু করে বসে রইল। তার কানে মাহিরের প্রতিটি কথা সজোরে বাজছিল। মাহির যেন আয়নার মনের গহীন গোপন দিকটা আয়নার সামনেই মেলে ধরল।
​মাহির আয়নার খুব কাছে এসে নিচু হয়ে তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, আই’ম সরি টু সে বাট তুমি চরম স্বার্থপর। এই সম্পর্কের প্রতি তুমি কখনো অনেস্ট ছিলে না।
আয়না তীব্র প্রতিবাদ করে বলল, মোটেই না!
-তাহলে তোমার আর আমার অনস্টির ডেফিনেশন ভিন্ন। এরকম মনোভাব হয়তো অন্য কারো ভালো লাগতো তবে আমার না।
 
​মাহির আর দাঁড়াল না। সে আলমারি থেকে নিজের বালিশটা টেনে নিয়ে যাওয়ার সময় শুধু বলে গেল, আর ইউ শিওর তোমার কোনো প্রেমিক ছিল না? নট ইভেন দ্যাট রাহাত?

বলেই সে উত্তর শোনার অপেক্ষা না করে চলে গেল। সে ঘটনার পর আয়নার সকালে ও রাতে তার জন্য অপেক্ষা করা বন্ধ হয়েছে। স্বল্প কথাবার্তা আরো সীমিত হয়েছে। মাহির নিজের উপর নিজেই বিরক্ত হয়, হতাশ হয়। 
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp