প্রচণ্ড জ্বর আসল ফারিসের। শরীর যেন পুড়ে যাবে এমন জ্বর। যে-ই ওর গায়ে হাত দেয় আৎকে উঠে। সবাই বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ল। এত বছর পর দেশে ফিরেই ছেলেটা জ্বর বাঁধিয়ে ফেলল। ফারিসের বাবা মোস্তফা হোসেন বললেন,
'অনেক বছর পর আবহাওয়ার পরিবর্তনে হয়তো এমন হয়েছে।'
ফারিসও বাবার কথায় সম্মতি জানাল। নয়তো শুধু জবার স্পর্শে জ্বর কীভাবে আসে? ও কি ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জা যে, ও ছোঁয়ার সাথে সাথে জ্বর হবে।'
ফারিসের ছেলে ফিরনাস বাবার কাছ থেকে সরছে না। যখন থেকে শুনেছে ওর বাবার অনেক জ্বর। তখন থেকে বিছানায় বসে ফারিসের হাত ধরে রেখেছে। মুখে চিন্তার ছাপ। চোখে পানি টলমল করছে। জারা ফিরনাসের কাছে এসে বলল,
'চিন্তা করো না, তোমার বাবা ঠিক হয়ে যাবো।'
জারার কথার প্রতিউত্তরে ফিরনাস কেবল চুপ করে রইল। ও মনোযোগ দিয়ে বাবার মাথায় হাত বুলাতে লাগল। কপালে চুমু খেলো। ফারিস ছেলের উদ্বেগ বুঝতে পেরে বলল,
'বাবা আমি ঠিক আছি৷ সামান্য জ্বর৷ ঠিক হয়ে যাবে। জাস্ট রিলাক্স বাবা।'
ফিরনাস তা-ও ওর মাথায় হাত বুলাতে লাগল।
ফারিসকে ডাক্তার দেখে গেলেন। সাথে কিছু টেস্টও দিয়ে গেলেন আগামীকাল গিয়ে করানোর জন্য। বললেন,
'তেমন ভয়ের কিছু না৷ ওষুধ দিয়েছি ঠিক হয়ে যাবে। তা-ও বেটার হয় টেস্ট গুলো করিয়ে নিলে।'
ডাক্তার যাওয়ার পর ফিরনাস বাবার বুকে মাথা রেখে বলল,
'তোমার কি খুব কষ্ট হচ্ছে বাবা?'
'না বাবা।'
'আমাদের মা থাকলে ভালো হতো তাই না বাবা?'
'কেন বাবা?'
'তাহলে সে তোমার দেখাশোনা করতে পারত। আমাকে আদর করত।'
'আমার দেখাশোনার জন্য তো তুমি আছো বাবা।'
'তা-ও মা থাকলে ভালো হতো। আমি তো ছোটো।'
'তোমার মা চাই বাবা?'
'চাইলেই কী সব পাওয়া যায় বাবা? চাইলেই কি আমি মা পাব?'
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ফারিস বলল,
'ঠিক বলেছো। চাইলেই সব পাওয়া যায় না৷ যদি যেতো তাহলে তোমার মা থাকতো।'
ফিরনাস বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
'তুমি আমার না হওয়া সেই মাকে খুব মিস করো বাবা?'
'ভীষণ।'
'মা কেমন বাবা?'
'ভীষণ ভালো।'
'দেখতে কেমন?'
'খুবই সুন্দরী। চোখে মুখে রানীর মতো আভিজাত্য। চাল চলন কথা বার্তায় বুঝায় সে যেন কোনো রাজ্যের রানী। অবশ্য সে রানীই। পুরো একটা রাজ্য, রাজা, রাজকুমারী, দাস দাসি সব আছে তার। নক্ষত্রের মতো প্রজ্জ্বলিত সে। প্রখর তেজ তার। তবে আমি কেবল দূর থেকে তাকিয়ে দেখতে পারি৷ কাছে যেতে পারি না। ছুঁয়ে দিতে পারি না। ভাবি যদি তার আগুনে জ্বলে পুড়ে ছাড়খার হয়ে যাই। তার তেজে ছাই হয়ে যাই।'
ফিরনাস ফারিসের উপমাযুক্ত কথা তেমন কিছুই বুঝল না। তবে এতটুকু বুঝল ওর মা অনেক সুন্দরী।
—————
রাতে জ্বরের ঘোরে ফারিস স্বপ্ন দেখল, জবা ওর খুব কাছে এসেছে। ওকে জড়িয়ে ধরেছে। এটা দেখার কিছুক্ষণ পর ঘাম দিয়ে ফারিসের জ্বর ছাড়ল। ঘুম ভেঙে দেখল, সারাশরীর ঘামে ভেজা।
ফারিস উঠে শার্ট খুলল। শার্ট ঘামে ভিজে গেছে৷ এসি অন করা দরকার, কিন্তু পারছে না। এই ঠান্ডা আবহাওয়ায় এসি চালালে ফিরনাসের ঠান্ডা লাগবে৷
ফারিস খালি গায়ে রুমের বাইরে গেল৷ ভাবল একটু হাঁটাহাঁটি করলে, বাইরের হাওয়া লাগলে ভালো লাগবে। রুম থেকে বের হয়ে করিডোরে গিয়ে আচমকা থমকে গেল একটা ছায়া মুর্তি দেখে।
ফারিস মৃদু শব্দে ডাকল,
'কে ওখানে?'
জবা খানিকটা হতচকিত ভঙ্গিতে বলল,
'আমি।'
ভারি কণ্ঠে ফারিস বলল,
'আমি কে?'
জবা আড়াল থেকে বেরিয়ে আলোয় আসল। মৃদু হেসে বলল,
'আপনার জ্বর কমেছে, ফারিস ভাই?'
ফারিস হালকা ধাক্কা খেল জবাকে দেখে। পরণে ঢোলা প্লাজু আর শার্ট। চুল দুই পাশে বেনী করা। কানে হীরার টপ। গলায়ও হিরার লকেট। নাকে ছোট্ট বিন্দুর মতো নাকফুল। হাতে ঘড়ি। ওকে দেখে মনে হচ্ছে না ও বিবাহিত কোনো মহিলা। মনে হচ্ছে সেই কিশোরী জবা। যাকে দেখে ফারিস হাজারবার ক্ষণে ক্ষণে প্রেমে পড়ত। জবা আবার জিজ্ঞেস করল,
'আপনার জ্বর কমছে?'
ফারিস সান্নিধ্যে ফিরে পেয়ে বলল,
'হ্যাঁ। এই শেষ রাতে তুই এখানে?'
'ঘুম আসছিল না। তাই ভাবলাম একটু হাটি।'
'ইরফান সাহেব কোথায়?'
'ও বাড়িতে '
'আচ্ছা।'
'আপনার ছেলে ঘুমাচ্ছে? '
'হ্যাঁ।'
'মিষ্টি ছেলে আপনার৷ খুব লক্ষী আর বুদ্ধিমান। এমন স্মার্ট আর গোছানো বাচ্চা আমি খুব কম দেখেছি।'
'হ্যাঁ, আলহামদুলিল্লাহ। আমার ফিরনাস খুব গোছানো।'
জবা হালকা হেসে বলল,
'চা খাবেন?'
'এখন চা কে বানাবে?'
'আমি বানাব? আমি ভালো চা বানাই। ইরফান বলে পৃথিবীর বেস্ট চা আমি বানাই।'
জবা চা বানাবে শুনে খেতে ইচ্ছা করলেও ইরফানের নাম শুনে মুহূর্তেই সে ইচ্ছা গায়েব হয়ে গেল। বলল,
'না। এত রাতে চা খেলে ঘুম হবে না।'
জবা বলল,
'আচ্ছা। আপনি প্লিজ শার্ট পরে আসুন। এমন খালি গায়ে আপনাকে দেখে আমি অভ্যস্ত না।'
ফারিসের মনে পড়ল ও খালি গায়ে বের হয়েছিল। জবাকে দেখে এতটাই বিভার হয়েছিল যে বিষয়টা ভুলে গিয়েছিল।
ফারিস চট করে রুমে গিয়ে পাতলা শার্ট পরে নিলো। শার্ট পরে বের হয়ে দেখল জবা সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে। ফারিসকে দেখে বলল,
'একটা কথা বলি?'
'বল?'
'এই হালকা আকাশী কালার শার্টে আপনাকে চমৎকার লাগছে ভাইয়া। আপনি সত্যি অনেক হ্যান্ডসাম।'
ফারিস হালকা হাসার চেষ্টা করল। কিন্তু ওর গম্ভীর মুখে হাসি কেন যেন ফোটে না। জবাকে হারানোর পর তো একদমই ফোটে না। ফারিস বলল,
'এখন কি তুইও ঢপ মারা শিখেছিস?'
'মোটেও না। আপনি সত্যি অনেক হ্যান্ডসাম। আপনার যে বউ হবে সে খুব লাকি হবে?'
'সে লাকি হতো কি না জানি না, তবে তাকে পেলে আমি হতাম।'
'ও হ্যাঁ সবার কাছে শুনলাম আপনি কাউকে ভালোবাসতেন। হু ইজ দ্যা লাকি গার্ল?'
'জেনে কি হবে?'
'আমরা জানতে পারি না?'
'যে কখনো আমার জীবনে আসার নয়, তাকে নিয়ে কথা বলে, তার কথা সবাইকে বলে তার সম্মানহানি আমি করতে পারব না।'
'কেন সে আপনার জীবনে আসার নয়?'
'তার বিয়ে হয়েছে অনেক আগে। সে স্বামী, সংসার, সন্তান নিয়ে খুব খুশি। এখন তার নাম বলে সবার কাছে তাকে হেয় করতে চাই না।'
'বাহ্। তা সে তো বিয়ে করেছে, তাহলে আপনি কেন করছেন না?'
'আমি তার স্থান কাউকে দিতে পারব না। সে কারণে চিরকুমার থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।'
'এটা কেমন কথা? সে তো বিয়ে করে সুখে আছে, তাহলে আপনি কেন জীবনে কষ্ট পাবেন?'
'আমি তো কষ্টে নেই। আমার ফিরনাসকে নিয়ে ভালো আছি। শুধু ক্ষণে ক্ষণে বুকের ভিতরটা কে যেন চেপে ধরে! মনে হয় কেউ শ্বাসনালী আটকে রেখেছে।'
'মেয়েটা কী হারিয়েছে সে হয়তো জানে না।'
'সে কি হারিয়েছে জানি না, কিন্তু আমি আমার জীবনের সকল রঙ হারিয়েছি।'
'ইশ মেয়েটার জন্য আফসোস হচ্ছে৷ এত ভালোবাসার মানুষটাকে পেলো না। সে কি আফসোস করে?'
'কীভাবে আফসোস করবে? সে হয়তো জানতোই না আমি তাকে ভালোবাসি?'
'সে কি! আপনি বলেননি?'
'সুযোগ হয়নি। হয়তোও বা সে জেনেও প্রতারণা করেছে।'
'কেন বলেননি?'
'যখন সুযোগ ছিল তখন অনেক কিছু ভেবে বলতে পারিনি। আর যখন বলতে চাইলাম তখন সে অন্য কারও।'
জবা বিমর্ষ কণ্ঠে বলল,
'ওহ৷ তা তো অনেক বছর আগের কথা। এবার আপনি বিয়ে টিয়ে করে নিজের জীবন সুন্দর করে পরিচালনা করুন।'
'বিয়ে..! এ জীবনে বিয়ে আর সম্ভব নয়।'
'মানুষ ভালোবাসে। সে ভালোবাসা কখনো কখনো হারিয়ে যায়। তারপর কিন্তু মানুষ আবার নতুন করে ভালোবাসে। জীবন সাজায়। সুন্দর ভাবে বাঁচে।'
'আমি ভালোবেসেছি, কিন্তু তাকে হারিয়ে ফেলেছি। তবে আমার জীবন অগোছালো নয়। খুব সুন্দর একটা জীবন হয়েছে আমার। আমার ছেলেকে নিয়ে আমি খুবই ভালো আছি। এখন আর জীবন গোছানোর জন্য কাউকে দরকার নেই।'
জবা আফসোস করে বলল,
'ইশ! মেয়েটা কী হারালো নিজেও জানে না। আচ্ছা আপনি মেয়েটাকে সরাসরি বলেননি কেন?'
'সাহস হয়নি।'
'কেন? আপনি তো এত সাহসি। কত নির্ভীক কাজ করেছেন লাইফে। স্কুবা ডাইভিং, স্কাই ডাইভিং, আমাজন জঙ্গলে গিয়ে তিনমাস থাকলেন। কত সাহসী ছবি তুলে পুরুষ্কার পেলেন। এত সাহসী কাজ করতে পারলেন, অথচ একটা মেয়েকে মনের কথা বলার মতো সাহস জোটাতে পারলেন না?'
'আমার মতে নিজের সুপ্ত অব্যক্ত অনুভূতি ভালোবাসার মানুষের কাছে ব্যক্ত করার মতো নির্ভীক কাজ আর কিছু নেই। এর চেয়ে মাঝ সমুদ্রে ঝাপ দিয়ে স্কুবা ডাইভিং করা সহজ। অথবা দশহাজার ফিট উপর থেকে ঝাপ দিয়ে স্কাই ডাইভিং করাও অতি সহজ। আমাজন বনে গিয়ে মাসের পর মাস থাকা সহজ।'
জবা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
'মনের ভাষা ব্যক্ত করা অতি সহজ ফারিস ভাই। স্কুবা ডাইভিং, স্কাই ডাইভিং করা বা আমাজন বনে গিয়ে থাকায় প্রাণের ভয় থাকে। মনের ভাষা ব্যক্ত করায় প্রাণের ভয় থাকে না।'
'তার চেয়ে বেশি থাকে জবা৷ এসব করতে গিয়ে প্রাণের ভয় থাকলেও বেঁচে ফেরা যায়, কিন্তু ভালোবাসার মানুষটাকে নিজের অনুভূতি বলার পর বেঁচে ফেরা যায় না। সে হ্যাঁ বললে আনন্দে মরে যেতে হয়, না বললে দুঃখে মরে যেতে হয়। মৃত্যু নিশ্চিত এখানে। তার চেয়ে নিজের অনুভূতি নিজের মাঝে চেপে রেখে বেঁচে থাকাই শ্রেয় নয় কি?'
জবা ফিচেল হেসে বলল,
'আপনার যুক্তির কাছে হার না মেনে পারছি না। তবে কি জানেন, নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করার পর, ভালোবাসার মানুষকে সম্পূর্ণ নিজের করে পাওয়ার পর যে খুশি পাওয়া যায়, সে খুশির অনুভূতি পৃথিবীর বাইরের কোনো অনুভূতি। স্বর্গীয় অনুভূতি।'
বিমর্ষ কণ্ঠে ফারিস বলল,
'সেই অনুভূতি থেকে আমি সারা জীবনের মতো বঞ্চিত হয়েছি। আচ্ছা এসব কথা বাদ দে। তোর জীবন কেমন চলছে?'
'এই তো স্বামী, সন্তান, সংসার নিয়ে বেশ চলে যাচ্ছে।'
'ভালো। যা ঘুমা গিয়ে। রাত অনেক হয়েছে।'
জবা চলে গেল। ফারিস একাকি বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইল। চোখের কোণের অশ্রু মুছে মুচকি হাসার চেষ্টা করল। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার ও হাসতে পারে না। হাসতে ভুলে গেছে কবেই। জবাকে হারনো, নিজের মায়ের বেইমানি, আবার সেই মায়ের মৃত্যু সব মিলিয়ে ওর হাসি হারিয়ে গেছে।
পকেট থাকা ফোনটা ভাইব্রেট করছে৷ ফারিস কল রিসিভ করল৷ অপর পাশ থেকে ওর পার্টনার হ্যারি ইংরেজিতে বলল,
'হেই ব্রো কী খবর তোমার?'
ফারিসও ইংরেজিতে বলল,
'ভালো।'
'নেক্সট মান্থ তুমি যে সাইবেরিয়ার চুকোটকা যেতে চেয়েছিলে সেটার জন্য এজেন্ট তোমাকে না পেয়ে আমাকে কল করল। তুমি যাবে? তারা সব কনর্ফম করতে চায়।'
'অবশ্যই যাব।'
'তোমার মা...!'
রূঢ় কণ্ঠে ফারিস বলল,
'যে মারা গেছে তার জন্য জীবিত মানুষগুলো তো আর তাদের সব কাজ ছেড়ে দিবে না! আমি যাব। তুমি সব কনর্ফম করে দাও।'
'ওকে।'
' আচ্ছা চুকোটকা থেকে আলাস্কা কাছে। যাওয়ার ট্রাই করব নাকি? শুনেছি ছোটো বোটে যেতে ৬ ঘন্টার মতো সময় লাগে।'
'মাথা খারাপ তোমার? একটা রাশিয়া তো আরেকটা আমেরিকা। ভিসা প্রসেসিং এর ব্যাপার আছে। এসব বাদ তুমি বোটে যেতে চাই। ওহে বন্ধু প্রেমে ছ্যাকা খেয়েছো জানি, তা বলে মরার জন্য এমন ভয়ংকর পথ খুঁজবে? মরার অনেক অপশন আছে পৃথিবীতে।'
শব্দ করে হাসার চেষ্টা করে ফারিস বলল,
'কেন?'
'বোটে চুকোটকা থেকে আলাস্কা যাওয়া মানে মৃত্যুকে সাথে নিয়ে যাওয়া। মাথা থেকে পাগলামি ছাড়ো হে। ভুলে যেও না তোমার ছেলে আছে। আর তুমি শখ করে ঘোরাঘুরি আর ফটোগ্রাফি করো। তোমার প্রফেশন ব্যবসায়৷ সো ব্যবসায়ীর মতো ভাবো। লাভ ক্ষতি নিয়ে ভাবো। অন্তত নিজের ছেলের কথা ভাবো।'
'আমার কিছু হয়ে গেলেও ফিরনাসের লাইফে কোনো কষ্ট করতে হবে না। আমি সে ব্যবস্থা আগেই করে রেখেছি। আই লাভ নেচার। আমি প্রকৃতির মাঝেই মিশে যেতে চাই। ভালোবাসার মানুষের ভালোবাসা তো পেলাম না, কিন্তু প্রকৃতির অসীম ভালোবাসা পেয়েছি। তার মাঝে আর ফিরনাসের মাঝেই ভালো থাকতে চাই।'
হ্যারি বলল,
'তুমি অনবদ্য বন্ধু আমার।'
আরও কিছু কথা বলে ওরা ফোন রাখল। লন্ডনে ফারিস আর হ্যারি পার্টনারশীপে ব্যবসায় করে। ব্যবসায় বেশ সফল ওরা। দুজনার দুই রকম শখ। হ্যারি নিজের অর্জিত টাকা দিয়ে গাড়ি কিনে। নতুন নতুন গাড়ি কেনা ওর প্যাশন। আর ফারিস বছরে দুইবার বিভিন্ন দেশের দুর্গম সব স্থানে ভ্রমন করে, ফটোগ্রাফী করে। সেসব ফটোগ্রাফি বিভিন্ন বড়ো বড়ো পত্রিকা স্থান পায়। ফটোগ্রাফির জন্য কয়েকটা পুরুষ্কারও পেয়ে ফারিস।
ফিরনাস লন্ডনের বোডিং স্কুলে থেকে পড়ালেখা করে। তাছাড়া যখন ফারিস থাকে না, তখন হ্যারি নিয়মিত ফিরনাসের খোঁজ খবর রাখে, সে কারণে ফিরনাসকে নিয়ে বেশি চিন্তা করতে হয় বা ফারিসের। ফারিস চায় ফিরনাস স্বাধীনভাবে বেড়ে উঠুক। নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে শিখুক। শূন্য লতার মতো কারও উপর নির্ভরশীল না হোক।
তাছাড়া হ্যারি তো আছেই৷ ও খুবই ভালো মানুষ। ফারিসের এই বন্ধুটিকে ফারিস চোখ বন্ধ করে ভরসা করতে পারে।
—————
জবা আজ এসেছে মন্ত্রী এহসান সাহেবের বাড়িতে। এসে প্রথমেই তার স্ত্রী রত্নার সাথে কথা বলল। রত্না জবার চেয়ে বয়সে ছোটো বই বড়ো হবে না। মন্ত্রী সাহেব পঞ্চাশ বছর বয়সে খুঁজে খুঁজে কম বয়সী রত্ন ঘরে তুলেছেন। এ মেয়েটিকে জবা ভালো করে চিনে। মন্ত্রীর অগোচরে সে কি কি করে তাও খোঁজ নিয়েছে জবা।
মন্ত্রীকে শায়েস্তা করতেই জবা তার সকল বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ খবর জেনে এসেছে। আফসোস জবা ঘরের চেয়ে পরের খবর বেশি রাখে। ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে স্বামীর বিষয়ে খোঁজ নেওয়াই বন্ধ করে দিয়েছে। তো যা বলছিলাম, জবা রত্নার দিকে তাকিয়ে কিঞ্চিৎ রহস্যময় হেসে বলল,
'কেমন আছো, রত্না?'
একটা মহিলা মন্ত্রীর বউকে নাম ধরে সম্বোধন করছে। বিষয়টা রত্নার মোটেও ভালো লাগেনি। অহংকার দেখিয়ে রত্না বলল,
'আমি ভালো আছি। তবে কিছু মানুষকে তাদের ওকাত বুঝাতে হবে?'
জবা হেসে বলল,
'ওকাত মানে কি? সরি আমি হিন্দি বুঝি না।'
'অবস্থান। যে যেই অবস্থানের তাকে সেটা দেখাতে হবে।'
জবা আবারও হেসে বলল,
'একদম ঠিক বলেছো। সেটা দেখাতেই এলাম। তা তোমার বুড়ো স্বামীটি কোথায়? সরি টু সে দ্যাট, বাট রোমান্স করার সময় তোমার অকোয়ার্ড লাগে না? আমার তো ভাবতেই গা গুলায়।'
রত্না বলল,
'আপনি লিমিট ক্রোস করছেন।'
জবা হেসে বলল,
'শোনো মেয়ে এখন আমি যা বলি তা শোনো। তোমার বুইড়া বর এখন আমাকে দেখলে ভয়ে সিঁটিয়ে যাবে। তুমি তাকে সামলাবে বুড়োর যেন কোনো অ্যাটাক ফ্যাটাক না হয়। আর হ্যাঁ আমি যাওয়ার পর বুঝাবে আমার সাথে যেন না লাগে৷ না হয় মিরাজের কথা আমি তোমার চিনিবাবা মানে বুড়ো স্বামীকে বলে দিব। বুঝেছো পিচ্চি মেয়ে?'
মিরাজের নাম শুনে রত্ন হতভম্বের সাথে সাথে বেশ ভয়ার্ত হয়ে পড়ল। ঢোক গিলে কিছু বলতে যাবে অমনি মন্ত্রী সাহেব আসলেন।
জবাকে দেখেই এহসান সাহেব ঘেম নেয়ে একাকার। জবা বেশ শান্ত ভঙ্গিতে তার সামনে বসল। জবার পরনে মিষ্টি কালারের এক রঙের জরজেট শাড়ি। পায়ে দামি হিল। জবা মন্ত্রী মহাদয় এহসান সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল,
'আমাকে চিনতে পেরেছেন মন্ত্রী সাহেব?'
কপালে জমা বিন্দু বিন্দু ঘাম মুছে এহসান সাহেব বলল,
'তোমাকে কীভাবে ভুলি মা!'
জবা পায়ের হিলটা খুলে ওর সামনে থাকা টি টেবিলে স্ব-জোরে আঘাত করল। মুহূর্তেই টেবিলটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।
উপস্থিত যে কজন ছিল তারা স্তম্ভিত হয়ে গেল। রত্না তো রিতিমতো কাঁপতে লাগল।
জবা তবুও বেশ শান্ত ভঙ্গিতে বসে বলল,
'ইরফান চৌধুরী আমার স্বামী। তার কাছে ঘুষ চাইবার আগে আমার কথা মনে পড়েনি আপনার?'
'আমি জানতাম না ইরফান চৌধুরী তোমার স্বামী।'
'এখন জেনেছেন?'
'হ্যাঁ।'
'তাহলে সে অনুসারে কাজ করুন। ভুলে যাবেন না আমি জয়নুল আবেদিন চৌধুরীর একমাত্র কন্যা জবা চৌধুরী। আমার এক কথায় আপনাকে মন্ত্রীত্ব থেকে সরানো একটা ফোনের ব্যাপার জাস্ট।'
জবা যেমন শান্ত ভঙ্গিতে এসেছিল। তেমন শান্ত ভঙ্গিতে চলে গেল।
—————
ইরফানের নগ্ন বুকের সাথে লেপ্টে আছে সিনথিয়া৷ ও নিজেও বস্ত্রহীন। ইরফান গভীর ঘুমে বিভোর। সিনথিয়া নিজের হাতের দামি ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,
'ইরফান দেখছি আমার জন্য পাগল প্রায়। এ পাগলকে সামলানো এখন সহজ হয়ে যাবে।'
সিনথিয়া ইরফানের কপালে চুমু খেতেই ইরফান ঘুমের ঘোরে বলল,
'জান প্লিজ ঘুমাও।'
সিনথিয়া ভাবল ইরফান ওকে জান ডাকছে। অথচ ইরফান জবাকেই কেবল জান ডাকে। ইরফানের ফোন বাজল। সিনথিয়া ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল জান নামে সেইভ করা ফোন নাম্বার। সিনথিয়া বুঝতে পারল না কে? কিছুটা আন্দাজ করল জবা হতে পারে। সিনথিয়ার মনে কুবুদ্ধি আসল। ভাবল কল রিসিভ করবে। কল রিসিভ করলেই জবা ইরফানকে সন্দেহ করবে। দ্রুত ওদের সম্পর্ক ভাঙবে। দ্রুত ও ইরফানকে বিয়ে করে রানীর মতো থাকতে পারবে।
সিনথিয়া রিসিভ করতেই যাবে, ওমনি ইরফান ছো মেরে ফোন নিয়ে অন্যহাতে সিনথিয়ার মুখ চেপে ধরে ফোন রিসিভ করল। বলল,
'হ্যাঁ জান বলো।'
জবা বলল,
'ঘুমাচ্ছিলে?'
'হুম। তোমার বিজনেস ট্যাুর কেমন গেল?'
'বোরিং৷ এই কক্সবাজার সমুদ্রে তুমি আর জারা ছাড়া ভালো লাগে বলো?'
'নেক্সট টাইম আমরা তিনজন একসাথে যাবো।'
'ওকে জান। জারা কোথায়?'
'ঘুমাচ্ছে।'
'তুমিও ঘুমাও। অনেক রাত হয়েছে জান।'
'ওকে। গুড নাইট।'
'গুড নাইট।'
কল কেটে ইরফান মুখ ছাড়তেই সিনথিয়া কাশতে লাগল। ইরফান সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে ধমকের সুরে বলল,
'আমার ফোনে হাত দেওয়ার সাহস হলো কী করে? তারউপর কল রিসিভ করতে যাচ্ছিলে। হোয়াই?'
সিনথিয়া কাশতে লাগল খুব। কিছু বলতে পারল না। ইরফান তখনও ওর দিকে খেয়াল না করে বলল,
'টেল মি হোয়াই? কী করতে চাচ্ছিলে তুমি?'
সিনথিয়া কাশতে কাশতে বলল,
'ইউ আর এ হার্টলেস ডগ ইরফান। আমি এখানে মরে যাচ্ছি আর তুমি উত্তর চাইছো?'
ইরফান পানির গ্লাস সিনথিয়ার হাতে দিল। পানি খেয়ে খানিক ধাতস্ত হতেই সিনথিয়া বলল,
'কল রিসিভ করলে কী হতো? আজ নাহয় কাল আমরা তো বিয়ে করবোই। তখন জবা তো সব জানবেই। তাহলে আগে জানুক। আগে আমাদের জীবন থেকে বিদায় হোক কুত্তিটা।'
ইরফান ডান দিয়ে সিনথিয়ার গাল অনেক জোরে চেপে ধরে বলল,
'খবরদার যদি জবাকে একটা বাজে কথা বলো। আর তোমাকে কে বলছে আমি তোমাকে বিয়ে করব?'
'মানে?'
'সিরিয়াসলি সিনথিয়া? তোমার ধারণা আমি তোমার মতো বাজারের মেয়েকে বিয়ে করব? ও কামঅন। আই লাভ জবা। তোমার সুন্দর শরীর ব্যতিত আমার আর কিছুতে আগ্রহ নেই। আমাদের সম্পর্ক গিভ এন্ড টেইকের সম্পর্ক। আমি তোমায় দামি উপহার দি বিনিময়ে তুমি আমাকে তোমার সুন্দর শরীরটা দাও। এটা জাস্ট একটা বিনিময় সম্পর্ক। নাথিং এলস সুইটহার্ট।'
প্রচণ্ড অপামানিত হয়ে সিনথিয়া বলল,
'ইরফান তুমি আমায় অপমান করছো।'
'ও কাম অন সুইটহার্ট। এত সিরিয়াস হওয়ার কিছু নেই। জাস্ট চিল৷ এখন কাছে আসো তোমাকে নিয়ে ঘুরতে যাব।'
·
·
·
চলবে……………………………………………………