রুমের বাতি নেভানো। ঘুটঘুটে অন্ধকার কেটেছে ল্যাম্পপোষ্টের মৃদু হলুদ রঙা আলোতে। সোফার সামনের টি-টেবিলের কালো কাচের ওপরে ছড়িয়ে আছে অনেকগুলো ইদ সালামির খাম। সাদা রঙের সালামির খাম গুলো তন্ময়ের ম্যানেজার কাস্টোমাইজ করে বানিয়েছে। প্রত্যেকটা খামের ওপরে সম্পর্ক অনুযায়ী শ্যাডো ছাপানো। পাশেই একটা চাঁদ, আরবিতে লেখা ‘ইদ মোবারক’। টেবিলের সামনের সোফায় তন্ময় বসে আছে। ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোর মিশ্রণটা স্বপ্নের মতো ঠিক তার গম্ভীরমুখের ওপরে পড়েছে। মুখে হাসির ছোঁয়া না থাকলে আপদমস্তক তাকে গুরুগম্ভীরই দেখায় বটে। এই রুমের দরজাটা আপাতত আধো খোলা। তা অবশ্য তন্ময় স্বেচ্ছায় রেখেছে। এতে করে নিচ থেকে পরিবারের কথোপকথন, হাসির আওয়াজ ভেসে আসতে পারছে সহজে। ফায়াজ কিছু একটা নিয়ে হয়তোবা হতাশ। কী ভীষণ হট্টগোল করছে! মোস্তফা সাহেব অত্যন্ত শান্ত গলায় বাচ্চাকে শান্ত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কী নিয়ে ওমন করছে ছেলেটা? ভাবতে ভাবতে তন্ময় শেষ খামটায় টাকা ভরা শেষ করল। খাম গুলোকে একত্রে ড্রয়ারে রেখে অবশেষে উঠে দাঁড়াল। বিকেল থেকে সে অনলাইন মিটিংয়ে ছিলো বিদেশি কিছু ক্লায়েন্টদের সাথে। মিটিং সেরে উঠতে উঠতে সন্ধ্যা পেরোয়। এরপরেই তো আগামীকাল— ইদের জন্য খামগুলোতে টাকা ভরায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কাল আর হাতে সময় থাকবে না। ইদের নামাজ শেষ করে ফিরতে না ফিরতেই তাকে চেপে ধরা হবে সালামির জন্য। আগে একটা গা ছাড়া ভাব থাকলেও, ছেলে-মেয়ের জন্য আর ওই ভাবটা নেই। ফায়াজ আর ফাইজা বেশ সালামির রীতিনীতি বুঝে নিয়েছে। টাকা ওদের লাগুক আর না লাগুক, সালামি চাই-ই চাই। দুজনেই বেশ শোরগোল করে পা ছুঁয়ে সালাম করবে বড়োদের মতো। হাত পেতে বলেই যাবে, ‘পাপা, সালামি দাও, সালামি দাও।’ এই পা ছুঁয়ে সালাম করাটা আবার রপ্ত করেছে তাদের মায়ের থেকে। অরুকে পা ছুঁয়ে সালাম করা থেকে তো শোধরানো গেলোই না উল্টো ছেলে-মেয়েকে নিজের সাথে বেশ সঙ্গী করে নিয়েছে। তন্ময় রুম ছেড়ে বেরিয়ে এসে দাঁড়াল করিডোরের রেলিং ঘেঁষে। গ্রাউন্ডফ্লোরের লিভিংরুমের কার্পেটের ওপরে বসে আছে অরু, শাবিহা, রুবি, মারজি সহ কয়েকটি মেয়েমানুষ। তারা মেহেদি পরছে হাতে। আর্টিস্ট এসেছে সেই বিকেলে। ঘড়ির কাঁটা ইতোমধ্যে ছুঁয়েছে নয়টা। অথচ মেহেদি দেয়া বুঝি এই রাতে আর শেষ হবে না। ওদিকে ফায়াজ আহত গলায় বলে যাচ্ছে -
‘তুমি কথা রাখোনি, দাদু। তুমি বলেছো আমায় মেহেদি দিয়ে দেবে।’
মোস্তফা সাহেব বোঝাতে চাইলেন, ‘দাদুভাই, মেহেদি ছেলেরা পরে না। মেয়েদের জন্য এটা।’
ফায়াজ তা মানতে নারাজ, ‘মাম্মা দিচ্ছে। ফাইজা দিচ্ছে। ফুপুরা দিচ্ছে, সবাই দিচ্ছে যখন আমিও দেব। মাম্মা, আমাকে দিয়ে দাও। আমাকে দিয়ে দাও মেহেদি।’
অরুর তখন একহাতে মেহেদি পরা হয়েছে। এবার অন্যহাতে পরছে। ওর পরনে খাঁটি কাঁচা মেহেদি রঙের একটা কামিজ। চুলগুলোতে একটা লম্বা ফ্লাওয়ার বিনুনি গেঁথেছে। কেমন বিনুনির ভেতরে ছোটো ছোটো ফুল গুঁজে দেয়া। মুখের সামনের ছোটো চুলগুলো বারবার চোখের সামনে আসায় ও যে বেজায় বিরক্ত তন্ময় ঠিক বোঝে। ফায়াজের ঘ্যানঘ্যানানিতে এবারে বেশ ধমকেই ওঠে কোকিলা স্বরে -
‘এই ছেলে, যাও পাপার কাছে যাও। কখন থেকে জ্বালাচ্ছো। তোমার পাপাকে জ্বালাও না কেনো? সে তো দিব্যি ওপরে বসে আছে। এসেছে একবারও? দেখেছে কিছু! একটুও আগ্রহ নেই। থাকবে কীভাবে! পুরাতন যে।’
শেষের কথাটুকু অবশ্য আস্তে করে বলেছে। তারপরও অস্পষ্ট ভাবে তন্ময় ঠিক বুঝতে পারল। শব্দহীন হাসলও। ওখানে বসা শাবিহা, রুবি, মারজি সহ প্রত্যেকে মুখ চেপে হাসছে। চাপা কণ্ঠে কিছু বলছেও। এতে অরুর মুখের অবস্থা আরও করুণ হচ্ছে। তন্ময় ওই অভিমানী মুখের দিকে চেয়ে থেকেই ওপর থেকেই ডাকল -
‘ফায়াজ! এদিকে আসো, বাবা!’
তার কণ্ঠ শুনে অরুর শরীরটা কেমন মিইয়ে গেলো মুহূর্তে। থতমত খেয়েছে নিশ্চয়ই! কিছুক্ষণ হাঁসফাঁস করে অবশেষ মাথা তুলে তাকাল আড়চোখে। চোখে চোখ মিলতেই চোরের মতো দৃষ্টি লুকিয়ে ফেলল দ্রুতো। বাচ্চাদের ধমকানো নিয়ে তন্ময়ই ওকে ধমকেছে গতকাল। তার ওপর অভিমান করে বাচ্চাদের ধমকানো বরাবরই তন্ময়ের অপছন্দের বিষয়। কিছুদিন বুঝিয়েও কাজের কাজ হয়নি। তাই সেদিন কিছুটা গম্ভীর গলাতেই ধমকাতে হয়েছিল। এতে অবশ্য তন্ময়ও ধমক খেয়েছে তার বাবার হাতে। মোস্তফা সাহেব তো সুযোগ খুঁজে বেড়ান অরুর হয়ে ওকালতি করার। অরুকে ধমকানোর শাস্তি স্বরুপ তিনি বলেছিলেন -
‘অরুকে নিয়ে আমি সুইজারল্যান্ড যাবো বেড়াতে। মাস খানেক ঘুরে আসব।’
মাথা খারাপ নাকি! তন্ময় দেবে কখনো? জীবনেও না। কাজ থেকে ফিরে যাকে সাথে সাথে না দেখলে বুকের ভেতরে অস্থির লাগে, তাকে নাকি একমাসের জন্য সুইজারল্যান্ড যেতে দেবে ঘুরতে! ইতোমধ্যে ফায়াজ নালিশ করতে করতে সিঁড়ি বাইছে টুকটুক করে। ওর পরনে জিন্সের হাফপ্যান্ট আর সাদা রঙা টি-শার্ট। মাথায় একটা ক্যাপ পরে আছে কার্টুনের। এই কার্টুন বর্তমানে ওর ভীষণ পছন্দের। মাহিন গত শুক্রবারে কিনে দিয়ে গিয়েছে পুরো এক সেট। সেটে ছিলো, ক্যাপ, হাত ঘড়ি, টি-শার্ট, জুতো। ফায়াজ অবশ্য শুধু ক্যাপটাই ওদিন থেকে নিয়মিত ক্যাপ পরে বেড়াচ্ছে। অর্গানিক মেহেদির কোন হাতে নিয়ে আসতে আসতে বলছে -
‘পাপা, দেখো মাম্মাম আমাকে মেহেদি দিয়ে দিচ্ছে না। কেমন ধমকাল, শুনলে? ফাইজা তো দিচ্ছে। আমাকে কেনো দিয়ে দিচ্ছে না?’
তন্ময় কয়েক কদম এগিয়ে এসে ছেলেকে কোলে তুলে নিলো। বাম হাতের বাহুতে বসিয়ে তাকাল মুখের দিকে। চোখমুখ ছোটো করে রেখেছে। র ক্তিম ঠোঁট জোড়া ফুলে আছে। ফায়াজ বাবার কোল থেকে নিচে তাকাল। একদম সোজা নিচেই অরু। আড়ে আড়ে তাকাচ্ছে। ফায়াজ সরল গলায় বলে -
‘পাপা, জানো মাম্মাম কতো বোকা? মাম্মামের নামের প্রথম অক্ষর তো ‘এ’, তাই না বলো? অথচ মাম্মার হাতে ‘টি’ লেখা।’
তন্ময় দেখল অরু মাথাটা আরও নুইয়ে ফেলেছে। ছেলেমেয়েরা ওকে যে বেশ লজ্জা দেয় তা আজ আবারও প্রমাণিত। তন্ময় ওর কানের কাছে ফিসফিস করে কিছু বলতেই ফায়াজ কোল থেকে নেমে গেল হুড়মুড়িয়ে। সিঁড়ি বেয়ে নেমে ফের গিয়ে দাঁড়াল অরুর পাশে। অরু তাকাতেই ফায়াজ চোখ পিটপিট করে মিষ্টি করে বলল -
‘মাম্মাম, আমি মেহেদি দিব না। আমার হাতে তোমার নাম লিখাব মেহেদি দিয়ে। ইজ ইট ওকে? উইল ইট বি ওকে? হুম? হুম?’
এবারে আর অরুর উত্তরের অবশ্য অপেক্ষা করেনি শাবিহা। তখুনি ফায়াজকে কোলে বসিয়ে ওর হাতের তালুতে অরুর নামটা লিখে দিলো ছোটো ছোটো অক্ষরে। ব্যস, এতটুকুতেই ছেলেটা ভীষণ খুশি। হাতটা অরুর দেখাদেখি অবিকল উঁচু করে রেখেছে। ওভাবেই কেমন করে হেঁটে হেঁটে এসে অরুর কোলে বসল। হাত সামনে ধরে দেখাল। অরু তৎক্ষণাৎ ছেলের ফুলো গালে চুমু খেলো। ফাইজার বাম হাতের ওপরে তখনো একজন মেহেদি আর্টিস্ট ছোটোখাটো একটা ডিজাইন আঁকছে। মেয়েটা চুপচাপ পুতুলের মতন বসেই আছে। নড়চড় নেই, কথাবার্তা নেই। অরু যতবার মেয়ের দিকে চায়, ততবারই মনে হয় সাক্ষাৎ শাহজাহান তন্ময় বসে আছে! তবে ফাইজা নিজের বাবাকে দেখলে বেশ পরিবর্তন হয়। এইযে যেমন এখনই কেমন চিকমিক চোখে ওপরে তাকিয়ে আছে। তন্ময় যখন বলে -
‘মেহেদি দেয়া শেষ করে এসো, মামণি।’
গাল ভরে হাসল বাচ্চাটা। হাত উঁচিয়ে দেখাতে চাইল ওর হাতের মেহেদি। যখন দেখল দূর থেকে দেখানো যাচ্ছে না তার পাপাকে হার মানল। মেহেদি দেয়া শেষ হতেই সোজা চলে গেলো দোতলায়।
—————
রাত প্রায় দুটো। মেহেদি দেখাতে অরু এলো না পুরোটা সময়। ও যে ইচ্ছে করে নিচে ঘুরঘুর করছে ঠিক বুঝেছে। জানে, তন্ময় সবার সামনে ওকে ডাকবে না। তার ফায়দা তুলছে। আজ আর যে তন্ময়ের ধৈর্য্যতে কুলোলো ভদ্র থাকার। অবশেষে পুনরায় রুম থেকে বেরিয়ে দাঁড়াল করিডোরের রেলিং ঘেঁষে। অরু দু-হাত আগলে রেখে বসে আছে সোফায়। মুভি দেখছে বাকিদের সাথে। তন্ময় ডাকল -
‘এই, ওপরে আয়। কাজ আছে।’
মোস্তফা সাহেব এমনভাবে চোখ রাঙিয়ে তাকালেন যেন তুইতোকারি করাটা বিশাল বড়ো অপরাধ। তন্ময় চটজলদি নিজেকে শুধরে নিলো -
‘আসুন ওপরে, ম্যাডাম। দরকার আছে।’
অরু সম্ভবত এইভাবে সবার সামনে যে সে ডাকবে তা কল্পনা করেনি। ফ্যালফ্যাল করে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছে। মুখ চেপে সবাই হাসছে যে! বিয়ের এতো গুলো বছর চলে গেল। দুটো বাচ্চা হলো। তারপরও এই বাড়িতে তন্ময় - অরু পাশাপাশি দাঁড়ালেই পরিবারের সবার মধ্যে কেমন চোখাচোখি আর হাসার ব্যাপারটা অনন্তকাল থেকে যাবে মনে হয়। সুমিতা বেগম বরাবরই তন্ময়ের দিকের লোক। মুহুর্তে তাগাদা দিয়ে ওঠেন -
‘এখনো বসে আছিস যে? ছেলেটা ডাকল তো। কানে শুনিসনি? যা শুনে আয়।’
অরু জুবুথুবু মেরে উঠল। তন্ময় ততক্ষণে রুমে ফিরে এসেছে। দাঁড়িয়ে আছে দরজার কাছেই। ওতটুকু পথ আসতে মিনিট দুয়েকও লাগার কথা না। অথচ অরু সময় নিলো গুনেগুনে পাঁচ মিনিট। ও যখন দরজা ঠেলে ঢুকবে ততক্ষণে তন্ময়ের ধৈর্য্যের ‘ধ’ টুকুও আর অবশিষ্ট নেই। মেয়েটা কাল থেকে তাকে এড়াচ্ছে। গতকাল রাতে বেডরুমে ফেরেনি। রুবিদের সাথে শুয়েছে। আজও বুঝি সেই প্ল্যান করেছিল? তা তন্ময় হতে দিলেতো! দরজা থেকেই ওকে এক ঝটকায় কোলে তুলে নিলো। মেয়েটা ভয়ে চাপা কণ্ঠে সীৎকার করে উঠল। তন্ময় ততক্ষণে দরজাটা লক করে ফেলল। অরু হতবিহ্বল -
‘কী করছেন! বা-বাচ্চারা…’
তন্ময় বিছানার দিকে কদম বাড়াতে বাড়াতে বলে, ‘ওরা ঘুমিয়েছে নিচে।’
অরু তারপরও বাহুতে মুষড়ে গেলো, ‘নিচে কাজ আছে। নামান।’
তন্ময় ওকে বিছানায় শুইয়ে ওর ওপরে নিজের ভারি শরীরটা ছেড়ে দিলো। অরু তৎক্ষণাৎ ঘুরিয়ে রাখল মাথাটা। তন্ময় তখুনি ওকে মানানোর চেষ্টা করল না। হাত দুটো ধরে চোখের সামনে এনে ভালোভাবে দেখল। বা-হাতের তালুর মধ্যে ইংরেজিতে একটি অক্ষর লেখা। ‘টি’। ‘টি’-তে তন্ময়। আর ডান-হাতের তালুতে ছোটো করে আরবিতে তন্ময় লেখা। দু-হাতের এপাশ-ওপাশ… দু-পাশেই দিয়েছে। তন্ময় মুখ নামিয়ে শুকিয়ে আসা মেহেদিতে ঠোঁট ছোঁয়াল। এরপরে হাত ছেড়ে ধরল ওর মুখটা। নিজের মুখ বরাবর এনেও কাজের কাজ হলো না। চোখ বুজে রেখেছে। তন্ময় অসহায় বটে -
‘তাকা।’
অরু এযাত্রায় তাকাল ভাসা ভাসা চোখে। মুখে জুড়ে লেখা, ‘আমি অভিমান করে আছি। ভাঙান আমার অভিমান।’
তন্ময় মুহুর্তে ডুবে গেলো অরুর কাজল রাঙানো চোখের অতলে। অরু যদি এখুনি বলে, ‘আকাশ থেকে চাঁদটা এনে দেন।’ অসম্ভব জেনেও তন্ময় চলে যেতো আনতে। এইমুহূর্তে ও পৃথিবী চাইলে তন্ময় তাই ওকে দিয়ে দিতো তার দ্বারা সম্ভব হলে। সেখানে অভিমান ভাঙানো তো ভীষণ ছোটো বিষয়। তন্ময় মাথা নুইয়ে ছুঁলো অরু ঠোঁট। এরপর দু-চোখ। মনের কথাগুলোই আওড়ে দিলো -
‘এ প্রণয়ে কথা দিলাম,
সূর্য চন্দ্র, তারা….
সাক্ষী থেকো মর ন যেনো,
হয় না তোমায় ছাড়া….
ইদ মোবারক, জান।’
অরুর অভিমান ভেঙে গুড়িয়ে কোথায় যে পালাল! ও ঝড়ের বেগে দু-হাতে তন্ময়ের গলা জড়িয়ে ধরল। গালে গাল ঘষে আবদার করে গেলো -
‘এখন থেকে আমি প্রত্যেকদিন অভিমান করব।’
তন্ময় নিঃশব্দে হাসল, ‘আচ্ছা। করিস।’
‘এভাবেই অভিমান ভাঙাবেন।’
‘আচ্ছা। ভাঙাব।’
‘গান শোনাবেন সাথে এই শব্দটায় ডাকবেন।’
‘আচ্ছা, ডাকব।’
অরুর চোখদুটো ছলছল করে উঠল সুখে। ও তন্ময়কে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখল।
‘ইদ মোবারক, তন্ময় ভাই। সারাজীবন আপনি আমার সাথে ইদ করুন।’
তন্ময় আদরের সাথে ওকে বুকে আগলে নিলো। বারান্দার দরজা খোলা। পর্দাগুলো উড়ছে। ফাঁকে ফাঁকে দেখা যাচ্ছে আকাশ ভরতি তারা আর চাঁদ রাতের সুন্দর চাঁদটা।
—————
ফাইজাকে পাশে নিয়ে অরু এসে দাঁড়িয়েছে তন্ময়ের সামনে। দুজানাই শুভ্রতে মোড়ানো। অরুর পরনে শুভ্র রঙা কারচুপির কাজ কামিজ। মাথায় ওড়না টানা। ওর হাতে পিরিচ, তাতে সেমাই। এটা তন্ময়কে ধরিয়ে দিয়েছে খেতে। ও নিজে রান্না করেছে বেশ বোঝা গেলো। তন্ময় কিছুক্ষণ আগেই ইদের নামাজ শেষ করে বাড়িতে ফিরেছে বাবা-চাচাদের সাথে। পরনে শুভ্র রঙা পাঞ্জাবি। সোফায় বসেছেন মোস্তফা সাহেব, আনোয়ার সাহেব, ওহী সাহেব। তারা এসে সেমাই খাচ্ছেন। বিয়ের আগে সর্বপ্রথম অরু বড়োদের থেকে সালামি চাইলেও, এখন তন্ময়ের থেকেই চায়। এতে অবশ্য বাকিরা দ্বিগুণ খুশি। আগে লুকিয়ে চাইলেও গতবছর থেকে সাহস বেড়েছে। সবার সামনেই চেয়ে ওঠে। যেমন এইযে এখুনি ঝুঁকে পা ছুঁয়ে সালাম করে ফর্সা হাতটা পেতে দিলো -
‘দিন, সালামিটা দিন আমার।’
অরুর পাশেই ফায়াজ আর ফাইজা দাঁড়ানো। ফায়াজ তন্ময়ের সাথে নামাজে গিয়েছিল। বাবার মতো পাঞ্জাবি পরেছে। আপাতত মায়ের পাশে। মায়ের পরে তারা দু-ভাইবোন সালামি চাইবে। তন্ময় মৃদু হেসে পকেট থেকে মোটা খামটা বের করে অরুর হাতে দিলো। মুহূর্তে হৈচৈ পড়ে গেলো শাবিহা, রুবি ওদের। ওদের হট্টগোলে হাসছে বড়োরাও। শাবিহা তখন ভিডিও করছিল। দ্রুতো বলল -
‘অরু, একটা ছবি তুলি। দাঁড়া ভাইয়ার পাশে।’
অরু একপলক তাকাল তন্ময়ের মুখের দিকে। তারপর সোফার দিকে। বাবা-চাচারা অন্যদিকে ফিরে আলাপ করছে। ওমনি সাহস পেলো মেয়েটা। জড়িয়ে ধরল তন্ময়ের হাতটা। শাবিহা তখুনি ছবি তুলে ফেলল চটজলদি। অরু সালামি, ছবি বুঝে নিয়ে বাবা-চাচাদের দিকে ছুটেছে। ফায়াজ-ফাইজা টুকটুক করে মায়ের কপি করে হাত পেতেছে -
‘পাপা, দাও সালামিটা দাও আমার।’
বাচ্চা বাচ্চা কণ্ঠে হেসে ওঠেন মোস্তফা সাহেব। হাসে তন্ময়ও। ওদের কোলেই তুলে ফেলল সে। গালে চুমু খেয়ে অবশেষে দুজনকে সালামির খাম ধরিয়ে দিলো। ফায়াজ সালামি পেয়ে মায়ের মতন ছুটে চলে গেলেও ফাইজা রয়ে গেলো। তন্ময় সোফায় গিয়ে বসতেই সালামি হাতে ও কোলেই বসে থাকল।
·
·
·
……………………………………………………