আয়না অবসরে নিচতলায় ভাড়াটিয়া মেয়েটিকে দেখতে যায়। প্রচুর গল্পবাজ মেয়েটি পাঁচ মাসের গর্ভবতী। আয়নার সাথে ইরার প্রথম পরিচয় হয় ছাঁদে কাপড় শুকাতে এসে। ছাঁদে কাপড় মেলা ভাড়াটিয়াদের জন্য নিষেধ তবে মাহির এতোদিন এ নিয়ে কিছু বলেনি।
একপ্রকার নীরব অনুমতি যাকে বলে। তবে আয়নার ব্যাপারে ইরার সন্দেহ ছিল। এবং তা মিথ্যে ছিল না। বেশ দেমাগি মেয়ে। কঠিন মুখে শীতল চোখ।
তাও কিভাবে কিভাবে যেন এক কথা-দু কথায় ইরা সহজ হয়ে উঠে। টপাটপ গল্প জমিয়ে ফেলে। লুডো খেলার আসর জমায়। নিজের গ্রামের গল্প শোনায়। তার স্বামী চাকরির সুবাদে অন্য শহরে থাকে। বদলির চেষ্টা করছে অনেকদিন ধরে, কিন্তু কোনো লাভ হচ্ছে না। এই দেশে ঘুষ ছাড়া কিছু হয় নাকি!
আয়না বলেছিল, তুমি গেলেই তো পারো।
-ওখানে দেখে রাখার তো কেউ নেই। কষ্ট হবে দেখে নেয় না।
-এখানেও বা কে দেখে রাখে? দু-একজন আত্মীয় মাঝেমধ্যে আসাকে দেখে রাখা বলে?
ইরা আনন্দে ঝলমল করতে করতে বলে, ভালো ব্যবস্থা করে নিবে বলেছে। বাবুর ভবিষ্যতের ব্যাপার আছে। উনি বুঝেশুনে সিদ্ধান্ত নিবেন। ওনার ও তো দূরে থাকতে কষ্ট হচ্ছে।
আয়না শুকনো স্বরে বলল, তাই নাকি?
ইরা হাসে। সে জানে এই মানুষগুলোর বুক-পিঠ আছে। মনে যা, মুখেও তা থাকে। এবং বাইরের আবরণ কঠিন হলেও অন্তরটা মোমের মতো নরম। উষ্ণতায় পাওয়া মাত্রই নিজের সবটা উজার করে দান করে।
সে বলল, আচ্ছা তুমি সবসময় শাড়ি পরো কেন বলোতো? শাশুড়ি কড়া বুঝি?
আয়না বলল, নাহ! আমার ভালো লাগে, এগুলো সব আমার মায়ের। গায়ে জড়ালে মনে হয় এখনো তার পরশ লেগে আছে।
খুব অদ্ভুত কারণে সেলোয়ার-কামিজের থেকে শাড়ি ঝামেলাহীন লাগে তার কাছে। সামলাতে তার সমস্যা হয় না। ব্যাপারটা সম্ভবত বাড়ির মালকিনের পছন্দ নয়। আজ পর্যন্ত শারমিন আরা তার সাথে সরাসরি কথা না বললেও অপছন্দ জাহির করতে ভুলেননি। ভদ্রমহিলার চালচলনে বংশীয় গরিমা আছে। পৈতৃক সম্পত্তি থেকে নিজস্ব আয় ও হয়। সমাজে দান-দক্ষিণার জন্য সুনাম আছে। তবে আয়নার প্রতি কেন এতদিনেও তার ক্ষোভ কমছে তার রহস্যময় ব্যাপার।
আয়না খেয়াল করল তার হাত থেকে মাসিক খরচের টাকা নিতেও তার ভীষণ আপত্তি। মাহিরকে ডেকে আলাদা করে বলে দিলেন,
তোমার যদি প্রচন্ড ব্যস্ততা থাকে তবে আমি নিজেই তোমার কাছে গিয়ে খুঁজে আনব মাসের খরচ, তবুও অন্যের হাতে দিয়ে হিউমিলেট করো না।
মাহিরের অফিসে প্রচুর ব্যস্ততা আসলেই যাচ্ছে। এসব পারিবারিক ঝামেলা নিয়ে যতবার তাকে ডাকা হচ্ছে সে সন্তোষজনক সমাধান করতে না পেরে আরো অস্থির হয়ে যাচ্ছে। যারা সমাধান চায় না, তাদের সাথে ফয়সালা করা সম্ভব হয় না এটা বুঝতে মাহিরের বেশ সময় লেগে যায়।
আয়না ইরাকে বিদায় জানিয়ে বাড়িতে ঢুকে দেখে শারমিন আরা দিনার সাথে ড্রইংরুম বসে আছে। চেহারা থেকে শুরু করে বসার ভঙ্গি দেখেও বলতে হয় যে পুরো কার্বন কপি। দিনা সম্ভবত তার মায়ের হয়েই বলল,
কিছু মনে করবেন না। ভারাটিয়াদের সাথে বাড়ির আমরা কেউ অপ্রয়োজনীয় কথা বলি না।
আয়না বলল, আমিও না।
দিনা বলল, আপনি প্রায়ই তার সাথে কথা বলেন। বুয়া অনেকবার দেখেছে।
-সেগুলো মোটেই অপ্রয়োজনীয় নয়। রহিমন বুয়া এসব অকাজে সময় ব্যয় করছে দেখেই হয়তো চিলেকোঠা পরিষ্কারের সময় পাচ্ছে না। সব ঠিক থাকে শুধু উপরের কাজের বেলায় তার সময় হয় না কেন আজ জানতে পারলাম।
দিনা মুখ কালো করে তাকিয়ে রইল।
আয়না বলল, বড়ো চাচী! দিনা আমার বয়স ও সম্পর্কে বেশ ছোটো। তাকে দিয়ে না বলিয়ে, আপনার মতামত নিজে বললেই বোধহয় ভালো হবে।
নাহলে আমি ওর মতো উত্তর দেওয়া শুরু করলে আবার সে মনে কষ্ট পাবে।
দিনা রাগে লাল হয়ে উঠল। আয়না আর অপেক্ষা না করে চলে এলো। তবে পেছনের কথোপকথন স্পষ্ট শুনতে পেল, আস্ত বেয়াদব, বেতমিজ! আরেকটা মায়মুনা এসে জুটেছে আমার ঘরে।
আয়না কোনো উত্তর দিল না, সংসারে সব কথা ধরতে হয় না।
—————
রাত তখন বেশ খানিকটা গড়িয়েছে। নিচতলায় বসার ঘরে হালকা শোরগোল চলছে। টেলিভিশনের শব্দের সাথে পাল্লা দিয়ে মনসুর আলম কলে গল্প করছেন। মিনা আধো ঘুমে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে, তার একটা সিরিয়াল থাকে এ সময়ে।
সদর দরজায় চাবির শব্দ হলো। দরজা খুলে ভেতরে পা রাখল মাহির। এক পলক তাকালেই বোঝা যায়, দিনটা তার ওপর দিয়ে চরম ধকল দিয়ে গেছে। ঘামে ভেজা শার্টটা গায়ের সাথে লেপ্টে আছে, বিশেষ করে কাঁধের দিকের কাপড়টার তো ঘামে ভিজে রঙ বদলে আরো গাঢ় হয়ে গেছে। কপালে লেপ্টে থাকা চুলগুলো অবিন্যস্ত। চোখের নিচে ক্লান্তির গাঢ় ছায়া।
তবুও সে ভদ্রতা ভুলল না। ঘরে ঢুকেই ক্লান্ত গলায় সবাইকে উদ্দেশ্য করে সালাম দিল।
-এই ভাইয়া!
রামিন সোফা থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠল, এত দেরি করলা কেন? আমি যা বলছিলাম মনে আছে? বিএফসি’র চিকেন ফ্রাই এনেছো তো?
মাহির তখন জুতার ফিতা খুলছে। সে কথা না বাড়িয়ে পাশে রাখা ব্যাগটার দিকে আঙুল দিয়ে ইশারা করল।
-ওইখানে।
রামিন এক ছুটে গিয়ে ব্যাগটা টেনে খুলল, কিন্তু পরক্ষণেই তার মুখটা তেতো হয়ে গেল, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই কই? সব কিছু কি আমাকে আলাদা করে বলে দিতে হবে ভাইয়া?
মাহির ওর দিকে একবার তাকাল। রামিন বিরক্তি নিয়ে ব্যাগটাসহ গটগট করে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
আয়না এতক্ষণ চুপচাপ বসে সবটা দেখছিল। সে এবার উঠে দাঁড়াল। মাহিরের কাছাকাছি গিয়ে খুব নিচু গলায় বলল, চা-নাস্তা দিবো?
-নাহ! এখন দিও না।
-তাহলে আগে ফ্রেশ হয়ে নেওয়া বেটার। অনেক ক্লান্ত দেখাচ্ছে।
মাহির ওর চোখের দিকে তাকাল। ওর দৃষ্টিতে সামান্য বিস্ময় খেলে গেল, এই চরম ক্লান্তির মুহূর্তে কেউ তার দিকে খেয়াল করবে এমনটা সে আশা করেনি। এক লহমা থেমে সে মাথা নেড়ে সায় দিল, হ্যাঁ... আগে গোসলটাই করি।
সে ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। নিজের ঘরে ঢুকেই সে সরাসরি বাথরুমে ঢুকে শাওয়ারটা ছেড়ে দিল।
নিচে আয়না কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ ওর মনে হলো সে মাহিরকে চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে ছিল, যার মানে তার মাথা ধরেছে। আয়না কি ভেবে যেন আর দেরি করল না। দ্রুত পায়ে রান্নাঘরের দিকে গেল। চুলায় তখনো বড় ডেকচিতে গরম পানি বসানো ছিল। হয়তো রহিমন বুয়া রাতের কাজের জন্য রেখে গেছে। আয়না একটা বালতিতে সেই ধোঁয়া ওঠা পানি ঢেলে নিল। তারপর শাড়ির আঁচল কোমড়ে গুঁজে বালতিটা হাতে নিয়ে সে তিনতলায় উঠতে শুরু করল।
সিঁড়ির প্রতিটি ধাপে পানিটা ছলকে পড়ার ভয় ছিল, আবার দেড়ি করলে ভদ্রলোক ঠান্ডা পানিতই কাজ সেড়ে নিতে পারে। বালতির ভারে ওর হাতটা একটু একটু কাঁপছিল, সে থামল না। দরজার সামনে এসে সে থমকে দাঁড়াল। ভেতর থেকে অবিরাম পানির পতনের শব্দ আসছে।
সে কিছুটা ইতস্তত করে দরজায় আলতো করে টোকা দিল।
-শুনো?
ভেতর থেকে মাহিরের সংক্ষিপ্ত উত্তর এল, হ্যাঁ? কিছু হয়েছে? লাগবে কিছু?
বেচারা হয়তো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে। আয়না গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, দরজা খুলো। গরম পানি এনেছি। ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করলে মাথা ব্যথাটা আরও বাড়তে পারে।
ভেতরে কয়েক সেকেন্ডের নিস্তব্ধতা। তারপর দরজাটা খুব সামান্য ফাঁক হলো। মাহির ভেজা হাতে দরজা ধরে বালতিটার দিকে তাকাল, তারপর সরাসরি আয়নার চোখের দিকে। ওর চোখে স্পষ্ট অবিশ্বাস আর বিস্ময়।
শীতকালের রাতে ট্যাংকির পানি হাড়কাঁপানো ঠান্ডা। আজ সারাদিন বাইরে ফিল্ড সুপারভাইজ কাজ করার পর মাথাটা দপদপ করছে। সে জানতো এই ঠান্ডা পানি মাথায় দিলে অবস্থা আরও খারাপ হবে। তবুও সে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ভাবছিল এই মাঝরাতে এখন আবার গরম পানির ঝক্কি কে সামলাবে! তার চেয়ে গোসল করে নেয়া ভালো।
তুমি এটা টেনে এনেছ! - মাহির কোমল স্বরে প্রশ্ন করল।
আয়না ওর চোখের দিকে সরাসরি তাকাল না। বালতিটা এগিয়ে দিয়ে ছোট করে শুধু বলল, হ্যাঁ।
মাহির বালতিটা টেনে নিল। একটু কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, এত ভারি বালতি! গরম পানি ছলকে হাত পুড়ে গেলে কী হতো?
আয়না নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলল, আমি সাবধানেই এনেছি।
সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। মাহিরকে কোনো ধন্যবাদ দেওয়ার সুযোগ না দিয়েই সে দ্রুত ঘরে ঢুকে গেল। মাহির দরজার সামনে বালতি হাতে আরও কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল, তারপর নিঃশব্দে ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল।
—————
গোসল শেষে মাহির ফুরফুরে মেজাজে ঘর এলো। তোয়ালে দিয়ে ভেজা চুলের পানি মুছতে মুছতে সে আলমারির দিকে যেতে চাইল, কিন্তু মাঝপথে থেমে গেল। বিছানার একপাশে খুব সুন্দর করে ভাজ করে রাখা তার পরিষ্কার ঘরোয়া কাপড়। পাশের টেবিলের ওপর এক গ্লাস পানি ও মাথা ব্যাথার ঔষধ। সব কিছু নিখুঁতভাবে সাজানো।
মাহির অপলক সেদিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে দৃষ্টি সরাল জানালার দিকে। আয়না ওখানে দাঁড়িয়ে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছে, যেন ঘরে কী হচ্ছে সেদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই।
মাহির কথা বাড়াল না। কাপড় পাল্টে চুল মুছতে মুছতে সে হঠাৎ ড্রয়ার থেকে কিছু টাকা বের করল। আয়নার দিকে এগিয়ে গিয়ে টাকাগুলো বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ভুলে যাওয়ার আগে এটা রাখো।
আয়না শান্ত স্বরে বলল, কিছু কিনতে হবে?
মাহির হেসে বলল, তোমার হাত খরচ। সামান্যই আছে যদিও। তোমার নিজের জন্য লাগতে পারে।
আয়না ভ্রু কুঁচকে ওর দিকে তাকাল, ধন্যবাদ কিন্তু আমার কাছে টাকা আছে। এটা লাগবে না।
জানি আছে, - মাহির খুব শান্ত কিন্তু অটল স্বরে বলল, তবুও রাখো। নিজের কাছে সব সময় কিছু বাড়তি হাতখরচ রাখা ভালো। আমি তো দিবোই সেটা।
আয়না কয়েক মুহূর্তের জন্য টাকাগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকল। এই আদান-প্রদানের ব্যাপারটা বড়ই স্বাভাবিক, সবকিছু নিয়ে জল ঘোলা করা খুব বাড়াবাড়ি হবে। সে কোনো কথা না বলে টাকাটা নিয়ে নিল।
নিচের সিড়ি থেকে মনসুর আলমের হাকডাক শোনা গেল,
মাহির! ওপরে গেলে কি আর নামার নাম থাকে না? তোর দাদীর ওষুধ তো শেষ, গেটের একটা বাল্বও নেই! হারামজাদা পোলাপানরা ক্রিকেট খেলে সব ভেঙে নষ্ট করেছে। এখনই না গেলে কিছু খোলা পাবি না। ব্যাপারটা একটু দেখ তো বাপ!
মাহির তোয়ালেটা পাশে রেখে সে আবার শার্টটা তুলে নিল। আয়না অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, এখনই আবার যাবে?
মাহির তার ক্লান্ত দুচোখে ম্লান হাসি ফুটিয়ে তুলল।,
যেতে হবে। কালকের জন্য জমিয়ে রেখে লাভ নেই। আমি আসছি, খেয়ে নিও।
সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
রাত আরও গভীর হলো। মাহির যখন দ্বিতীয়বার ঘরে ফিরল, তখন পুরো বাড়ি নিঝুম। সে দরজা খুলে ঘরে ঢুকল, হাতের ব্যাগটা একপাশে নামিয়ে রাখল। দেখল আয়না তখনো ঘুমায়নি, বিছানায় বসে ছিল।
-আলমারির ওপর থেকে সরঞ্জাম বের করে বলল, আমি মেইন গেটের বাল্বটা একবারে লাগিয়ে আসি।
আয়না বলল, তুমি পারো সেটা?
মাহির বুক ফুলিয়ে বলল, আলবাত! একদম সহজ কাজ।
না পারলে শিখে নিতো, মরে গেলেও স্বীকার করত না নিজের অপারগতা। প্রতিটি স্বামী চায় নিজের স্ত্রীর চোখে মুগ্ধতা দেখতে, তা তুচ্ছ কারণেই হোক না কেন।
—————
গেটের দুটো বাল্বটা নষ্ট হয়ে আছে। সেটা ঠিক করতে মাহির একটা লম্বা মই এনে দেয়ালের পাশে দাঁড় করাল। রাত অনেকটা নেমে গেছে, আশেপাশে আলো খুব বেশি নেই। গেটের দিকটা প্রায় অন্ধকারে ডুবে আছে, শুধু মাহিরের হাতে ধরা ছোট্ট টর্চের আলোটা মাঝে মাঝে দপদপ করে উঠছে।
সে মইয়ে উঠে এক হাতে টর্চ লাইট ও আরেক হাতে হোল্ডারটা ঠিক করার চেষ্টা করছে। আলো ঠিকমতো না পড়ায় তাকে বারবার থামতে হচ্ছে। কখনো টর্চটা কাঁধের সঙ্গে চেপে ধরে কাজ করছে, কখনো নিচে নামিয়ে আবার ধরছে। কাজটা স্পষ্টই বিরক্তিকর, তবুও সে ধৈর্য ধরে করে যাচ্ছে।
ওদিকে কি মনে করে জানো বিছানা থেকে নেমে ছাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছিল আয়না। প্রথমে সে কেবল তাকিয়ে কোনো ভাবনা ছাড়াই দেখছিল। কিন্তু মাহিরকে দেখে অজান্তেই তার ভ্রু একটু কুঁচকে গেল।
তার মনে হলো, সে যদি নিচে গিয়ে একটু টর্চটা ধরে দিত, তাহলে কাজটা অনেক সহজ হয়ে যেত। ভাবনাটা এসেই থেমে গেল। পা এগোল না। সে নিজেও বুঝল না, কেন এইটুকু কাজ করার ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল।
নিচে মাহির আবার একটু নেমে টর্চটা ঠিক করল, তারপর আবার উঠে কাজ শুরু করল। আলো-অন্ধকারের ফাঁকে ফাঁকে তার হাতের শিরাগুলো হয়তো স্পষ্ট হয়ে উঠছে, ভেজা চুল ও হয়তো গোড়া থেকে এখনও পুরো শুকায়নি। শরীরে ক্লান্তির ছাপ আছে, কিন্তু কাজে কোন গড়িমসি নেই।
আয়না তাকিয়েই রইল। এত ক্লান্ত থাকার পরও সে থামছে না এই জিনিসটা তার নজর এড়াল না।
ঘরের ভেতর থেকে ফোনের রিংটোন ভেসে এলো। আয়না একটু চমকে ফিরে তাকাল। বিছানার পাশে মাহিরের ফোনটা পড়ে আছে, স্ক্রিনে আলো জ্বলছে। সে এগিয়ে গিয়ে ফোনটা হাতে নিল। স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে - ম্যানেজার।
সে কোনো বিশেষ চিন্তা না করেই ফোনটা হাতে নিয়ে নিচে নেমে গেল।
আয়না গেটের কাছে পৌঁছাতেই মাহির নিচে তাকাল। তাকে দেখেই তার মুখের ভাব মুহূর্তে বদলে গেল।
-তুমি এখানে কেন এসেছো? - তার গলাটা অস্বাভাবিক রকম কড়া শোনাল।
আয়না একটু থমকে গেল, কিন্তু ফোনটা এগিয়ে দিয়ে বলল, ফোন… ম্যানেজার কল করছিল।
-বাজুক!
মাহির কোনো দ্বিধা ছাড়াই বলল, তুমি ভেতরে যাও। এখনই।
আয়না ভ্রু কুঁচকাল, কিন্তু অফিসে…
-যেতে বলেছি আমি?
কঠিন পুরুষালী স্বরে কোনো ব্যাখ্যা নেই, কোনো নমনীয়তা নেই। শুধু স্পষ্ট নির্দেশ।
কয়েক সেকেন্ড আয়না তার দিকে তাকিয়ে রইল। ভেতরে কোথাও হালকা বিষন্নতা জমে উঠল। সে আর কিছু না বলে ঘুরে দাঁড়াল।
সিঁড়ির দিকে কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেল। কেন থামল, সে নিজেও বুঝতে পারল না। হয়তো কথাগুলোর ধাক্কাটা পুরোপুরি কাটেনি।
অজান্তেই সে একবার পেছনে তাকাল।
এইবার তার চোখে পড়ল গেটের একটু বাইরে, অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন ছেলেপেলে। আলো কম হলেও বোঝা যাচ্ছে, তাদের দৃষ্টি এই দিকেই। একজন হালকা মাথা ঘুরিয়ে পাশের জনকে কী যেন বলল, তারপর মৃদু হাসির শব্দ ভেসে এলো।
আয়নার চোখ একটু সংকুচিত হলো।
সে আবার তাকাল মাহিরের দিকে। মাহির ইতিমধ্যে মইয়ে উঠে গেছে, আগের মতোই কাজ করছে, যেন কিছুই হয়নি।
আয়না আর দাঁড়াল না। চুপচাপ ভেতরে উঠে গেল।
—————
মাহিরের কাজ শেষ হতে হতে প্রায় আধাঘণ্টা কেটে গেল। চিলেকোঠায় ফিরে দরজা বন্ধ করার শব্দটা জোরে ছিল না। কিন্তু তবুও আয়নার আধো-ঘুম ভাঙার জন্য সেটুকুই যথেষ্ট হলো।
সে পুরোপুরি ঘুমিয়ে পড়েনি শরীরটা শিথিল হয়ে এসেছিল, চোখ দুটো বন্ধ করেছিল মাত্র।
দরজা লাগিয়ে মাহির কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল, যেন অন্ধকারে চোখ মানিয়ে নিচ্ছে। তারপর খাটের দিকে এগিয়ে এলো। খাটে উঠতেই হালকা শব্দ হলো, আর সেটাতেই আয়না চোখ খুলে উঠে বসল।
-ঘুমিয়ে পড়েছিলে?
মাহির স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করল।
আয়না মাথা নেড়ে বলল, না… এইমাত্র শুয়েছিলাম।
মাহির ফোন পাশে রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল তারপর হঠাৎই কিছু মনে পড়ল। বলল,
ওই গেটের কাছে কয়েকটা বখাটে ছেলে দাঁড়িয়ে ছিল। নেশাখোর টাইপের মনে হলো। এর আগেও দেখেছি ওদের। দু-একবার বলে সরিয়েছি, কিন্তু খুব একটা কাজ হয়নি। কাল আবার দেখব ব্যাপারটা।
কিছুটা নিজেকে ব্যাখ্যা করার মত শোনালো কথাগুলো। আয়না সব চুপচাপ শুনল।
তার ভেতরে আগে যে বিষাদ জমে ছিল, সেটা আর আগের মতো তীক্ষ্ণ লাগল না। বরং ইতিবাচক কিছুতে বদলে গেল।
মাহির জিজ্ঞেস করল, তুমি খেয়েছো?
হ্যাঁ! - আয়না শান্তভাবে উত্তর দিল।
কথাটা বলার পর এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হালকা একটা টান অনুভূত হলো। সে জানত, এটা স্বাভাবিক যে অপেক্ষা করে থাকা, একসাথে খাওয়া। কিন্তু সে নিজেকে অনেক আগে থেকেই অন্যভাবে তৈরি করে নিয়েছিল। কোনো প্রত্যাশা, কোনো নির্ভরতা এই জিনিসগুলো থেকে দূরে থাকাই তার জন্য নিরাপদ।
অপেক্ষা করা মানে অভ্যাস তৈরি হওয়া। আর অভ্যাস মানেই একসময় ভাঙার সম্ভাবনা।
তবুও আজ কেন যেন মনে হলো, সে চাইলে অপেক্ষা করতে পারতো। মন খচখচ করতে লাগল।
মাহির টেবিলের ল্যাম্প লাইট জ্বালিয়ে অফিস ব্যাগ থেকে কিছু কাগজ বের করে দেখছিল।
আয়না কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে বলল,
তুমি খাবে না?
মাহির চোখ না তুলেই বলল, না। খুব একটা ক্ষুধা নেই।
আয়না এবার একটু সোজা হয়ে বসল। তুমি খাওয়া-দাওয়া একদম সিরিয়াসলি নাও না, তাই না?
মাহির এবার তাকাল তার দিকে, কি বললে?
-নিজের খাওয়া-দাওয়া। এত কিছু সামলাও, কিন্তু এই জিনিসটা অবহেলা করো। ভের্যি ইররেস্পন্সিবল!
তার কথাগুলো অভিযোগের মতো শোনালো। মাহির হালকা হাসল, আসলে তা না। এগুলো ব্যাপার না।
আয়না কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, যেন ভেবে দেখছে কথাটা বিশ্বাস করা যায় কি না। তারপর হঠাৎ উঠে দাঁড়াল।
-উদ্ভট কথাবার্তা! তুমি বসো। আমি গরম করে দিচ্ছি।
-না, দরকার নেই।
মাহির দ্রুত বলল, আরে আমি সত্যিই….
কথা শেষ হওয়ার আগেই আয়না দরজার দিকে হাঁটা দিয়েছে। সে আর থামল না।
চুল খোঁপা করতে করতে নিচতলায় এসে সে দেখল সব আলো নিভে গেছে। চারপাশে রাতের নীরবতা। সে নিজে সুইচ টিপে আলো জ্বালাল।
ডাইনিং টেবিলের দিকে তাকিয়ে একটু থামল।
কোনো কিছু সাজানো নেই। সে কিচেনের দিকে গেল। মিটসেফ খুলে একে একে দেখল ভাত আছে, কিন্তু ভাজি নেই, তরকারি প্রায় শেষ। একটু ডাল আছে, সেটাও অল্প। মাংস নেই বললেই চলে, খানিকটা ঝোল আর কয়েকটা আলু।
সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল।
মাথার ভেতর দ্রুত হিসাব চলল হয়তো খাওয়া হয়ে গেছে, হয়তো খেয়াল করা হয়নি।
এখন সে কি করবে?
ঠিক তখনই পেছনে কারও উপস্থিতি টের পেল।
চমকে ঘুরে তাকাতেই দেখল মাহির কিচেন কাউন্টারের পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাত দুটো বুকের কাছে ভাঁজ করা, মুখে ম্লান কিন্তু চঞ্চল হাসি।
আয়না দেখল মাহির হাসলে বা গালের একপাশে ছোট্ট একটা টোল পড়ে। খুব চোখে পড়ার মতো না, কিন্তু খেয়াল করলে এড়িয়ে যাওয়ার মতোও না।
আয়না এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল।
তারপর চোখ সরিয়ে নিল।
মাহির বলল, দেখেছো? মনে হয় আজ আমার রিজিক নেই।
কথাটা সে মজা করে বললেও, কিন্তু আয়নার মুখে অজান্তেই থমথমে হয়ে গেল, বিষাদের ছাপ ফুটে উঠল।
মাহির সেটা খেয়াল করল ও সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
“আরে, এসব নিয়ে ভাবার কিছু নেই। আমি সত্যিই তেমন ক্ষুধার্ত না। তুমি এসো, চলো উপরে যাই। রাত অনেক হয়েছে।
সে বিষয়টা এখানেই শেষ করতে চায়, তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু না। কিন্তু আয়না স্থির দাঁড়িয়ে রইল।
একটু দাঁড়াও?
সে বলল, আমি ডিম ভেজে দিচ্ছি। শুধু দুই মিনিট লাগবে।
মাহির অবাক হয়ে বলল, এখন!
-হ্যাঁ, এখনই। সমস্যা কী? খাও না?
আয়নার গলায় একধরনের সোজাসাপ্টা দৃঢ়তা, যেন মাহিরের মতো এই ঘটনায় সে কোনো অস্বাভাবিকতা খুঁজে পাচ্ছে না।
মাহির একটু থেমে হালকা হেসে বলল,
“সমস্যা কিছু না। কিন্তু দরকার নেই তো। চলে এসো? রাতের বেলা রান্নাঘরে থাকার কোন প্রয়োজন নেই।
সে আয়নাকে হাত ধরে টানতে গেলে সে তাকে দূরছাই করে তাড়িয়ে দেয়।
-তুমি উপরে যাও।
আয়না বলল, আমি নিয়ে আসছি।
সে ইতিমধ্যেই কড়াই নামিয়ে ফেলেছে। প্রথমে সে ডিম ভাজার কথা ভেবেছিল।
কিন্তু ভাতটা হাতে নিয়ে বুঝল এভাবে দিলে খেতে একদম ভালো লাগবে না। একটু নরম হয়ে গেছে।
সে চুপচাপ কড়াইতে তেল দিল। তেল গরম হলে ডিম ভেঙে নেড়ে ভাজল, তারপর ভাতটা দিয়ে দিল। পাশে যা ছিল, সেগুলো দিয়েই দ্রুত মিশিয়ে নিল। পেঁয়াজ কুচি, একটু লবণ, সামান্য মসলা।
মাঝে মাঝে সে তাকে প্রশ্ন করছিল, তোমার কোনো খাবারে অ্যালার্জি আছে?
“না,” মাহির দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে উত্তর দিল, ভালোই লাগছে তার।
-ঝাল?
“মাঝামাঝি, তোমাদের মত অতটা পারিনা। আয়না মাথা নেড়ে আবার কাজে মন দিল।
তাতে মাহিরের খুব সুবিধা হলো। নির্বিঘ্নে সে আয়না কে দেখে যেতে লাগলো। মেয়েটার কোমড়ের কাছের শাড়ি সরে মসৃণ ত্বক চিকচিক করছে। তার কপালের কাছে চুল নেমে এসেছে, আর নাকের নিচে হালকা ঘাম জমেছে। সে নিজেও হয়তো খেয়াল করেনি। মাহিরের খুব ইচ্ছে হলো আলতো করে সেটা মুছে দিতে। কিন্তু তাতে গরম তেলের ছিটা খাওয়ার ক্ষীন সম্ভাবনা থাকায় সে আর ওদিকে এগোলো না।
এগ ফ্রাইড রাইস তৈরি হলে আয়না প্লেটে তুলে ডাইনিং টেবিলে রাখল। চোখের ইশারায় মাহিরকে ডাকল।
মাহির চেয়ার টেনে বসল। প্রথমে একবার খাবারটার দিকে তাকাল, তারপর আয়নার দিকে।
ক্ষীণ স্বরে বলল, থ্যাংক ইউ আয়না। আই এপ্রিসিয়েট ইট।
তারপর খেতে শুরু করল। খাবারটা গরম ধোয়া উঠছে। তবুও সে থামল না।
আয়না আতঁকে উঠে বলল, গরম তো… ধীরে খাও।
মাহির হেসে খাবার মুখে নিয়েই বাচ্চাদের মত বলল,
অনেক টেস্টি হয়েছে।
তারপর সত্যিই মন দিয়ে খেতে লাগল একদম শেষ পর্যন্ত।
আয়না পানি এগিয়ে দিয়ে চুপচাপ পাশে দাঁড়িয়ে রইল।
তার ভেতরে হঠাৎ একটা অদ্ভুত অনুভূতি জন্ম নিল। মাহিরের জন্য কিছু বানানো, আর তাকে সেটা এমনভাবে খেতে দেখা এতে এমন এক ধরনের তৃপ্তি আছে, যা সে আগে কখনও অনুভব করেনি।
·
·
·
চলবে……………………………………………………