'ও কাম অন সুইটহার্ট। এত সিরিয়াস হওয়ার কিছু নেই। জাস্ট চিল৷ এখন আরেকবার কাছে আসো তো। আই অ্যাম ফিলিং হট। তারপর বিকালে তোমাকে নিয়ে ঘুরতে যাব।'
রাগে অপমানে সিনথিয়ার চোখ বেয়ে জল পড়তে লাগল। ও বিছানা ছেড়ে উঠে সোজা বাথরুমে চলে গেল। ঝরনা ছেড়ে অনেক্ষণ রাগে নিজের মাথার চুল টানল। নিজে নিজে ভাবতে লাগল,
'কিসের ভিত্তিতে আমি ভাবতে লাগলাম, ইরফানের মতো পারভার্ট আমাকে বিয়ে করবে। যে নিজের স্ত্রী সন্তানকে ধোঁকা দিতে পারে, সে আমাকে ধোঁকা দিবে না তার কি গ্যারান্টি আছে? নো সিনথিয়া এত সহজে তুই হারতে পারিস না। ভাব... ভাব...! ভাবলে তুই পারিস না এমন কিছু নেই। এত সহজে আমি আমার দেখা স্বপ্নগুলো ভাঙতে দিব না। নো নেভার৷ আমি রানির মতো বাঁচতে চাই। যে জীবন জবা কিংবা কথা লিড করছে সে জীবন আমার চাই।'
সিনথিয়া অনেকটা সময় ঝর্নার নিচে বসে বসে ভাবল। কীভাবে কি করা যায়৷ চট করে ওর মাথায় আসল, ইরফানকেই কেন বিয়ে করতে হবে? বিয়ের জন্য নিহাদ স্যার ইরফানের চেয়ে বেটার অপশন। তাকে ফাঁসানোর প্রথম চাল সিনথিয়া কবেই চেলে রেখেছে। তবে এতদিন ভেবেছিল ইরফান ওকে বিয়ে করবে। তাই কথাকে বিষয়টা জানায়নি। এখন কৌশলে আগে কথার মনে সন্দেহ ঢুকানোর কাজ করতে হবে। তারপর ওদের সংসার ভাঙতে হবে। আর জবা চৌধুরীর মতো কথা এত চতুর না। ওকে ভুলিয়ে সংসার ভাঙা আরও সহজ হবে। আমাকে এখন নিহাদের দিকে ফোকাস করতে হবে।
তবে ইরফারও অলটারনেটিভ হিসাবে হাতে থাকবে। ওর থেকে যা পাব সেটাই বোনাস। এখন ওর থেকে আমায় ভাঙতে হবে। অনেক নিতে হবে শুয়ারটার কাছ থেকে। তবে তার জন্য ওর সাথে স্বাভাবিক ব্যবহার করতে হবে।
অনেকক্ষণ সিনথিয়ার কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে বাথরুমের দরজায় টোকা দিয়ে ওকে ডাকল ইরফান। সিনথিয়া নোংরা হেসে দরজা খুলল। বিবস্ত্র দাঁড়িয়ে আছে। ইরফান বাঁকা হেসে বলল,
'সামনে যেন সাক্ষাৎ কাম দেবি দাঁড়িয়ে আছে। নেশা করার জন্য এখন ওয়াইনের দরকার হবে না।'
সিনথিয়া হাত বাড়িয়ে আবেদনময়ী ভঙ্গিতে ডাকল ইরফানকে। ভুবনমোহিনী এ সুন্দরীর আবেদনময়ী ডাক উপেক্ষা করার কলিজা সব পুরুষের হয়নি।
—————
বেঁচে থাকার মতো একঘেয়েমি পৃথিবীতে আর কিছু আছে কিনা ফারিস জানে না। বহু বছর ধরেই ওর মনে হয়, মানুষ আসলে বাঁচে না, কেবল বেঁচে থাকার অভিনয় করে। শ্বাস নেয়, হাঁটে, কথা বলে, হাসে অথচ ভেতরে ভেতরে মৃত হয়ে থাকে। ও বেঁচে আছে কেবল বেঁচে থাকা বাধ্যতামূলক বলে
ফারিসও ঠিক তেমনই। জবাকে হারানোর পর থেকেই নিজেকে নিঃস্ব ঘোষনা করেছিল ফারিস। এই একটা মানুষ যে ফারিসের জীবনে না এসেও ওকে পুরোপুরি নিঃস্ব করে দিয়ে গেছে। যেন ফারিসের যা ছিল তার শেষ বিন্দু পর্যন্ত ও নিয়ে গেছে।
কিছু কিছু মানুষ জীবনে আসে না, তবুও পুরো জীবনটা দখল করে নেয়। জবা ছিল ঠিক তেমন।
ফারিস আজও বুঝতে পারে না, ঠিক কোন মুহূর্তে মেয়েটাকে ভালোবেসে ফেলেছিল। ভালোবাসার পেছনে সাধারণত মানুষ একটা কারণ খোঁজে। রূপ, গুণ, আচরণ, মায়া কিংবা অভ্যাস। অথচ জবাকে ভালোবাসার কোনো নির্দিষ্ট কারণ আজও খুঁজে পায় না সে।
মেয়েটা ছিল ঠিক বসন্তের বাতাসের মতো। কখন এসে হৃদয়ে লেগেছিল, টেরই পায়নি।
তবুও অনেক ভেবে একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে ফারিসের। হয়তো সেদিনই প্রথম হৃদয়ের ভিতর অদ্ভুত কিছু জন্ম নিয়েছিল।
সেটা ছিল বৈশাখী মেলার দিন।
তপ্ত রোদের দুপুর। চারদিকে মানুষের ভিড়। বাতাসে ভাজাপোড়ার গন্ধ, মাটির বাঁশির সুর, ঢোলের শব্দ, আর রঙিন কাগজের ঘুড়ির মতো উড়ে বেড়ানো শিশুদের হাসি।
ও জবাকে প্রথম ভালোবাসা শুরু করে তখন জবা নাইনের ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে ক্লাস টেনে উঠবে।
সেবার জবা পরীক্ষার পর ছুটিতে ফুপু বাড়ি বেড়াতে আসল। চঞ্চল হরিণীর মতো ছুটে বেড়াত। সেই চঞ্চল হরিণীকে কীভাবে যেন ফারিস ভালোবেসে ফেলল। এখনও ফারিস সেটা বুঝতে পারে না। জবাকে ভালোবাসার কোনো একক কারণ পায়না ফারিস। অনেকগুলো কারণ খুঁজে বিচার বিশ্লেষণ করে জবাকে ভালোলাগার একটা পাকাপোক্ত ঘটনা মনে পড়েছে ওর।
প্রথম ভালোলাগা শুরু হয়, বৈশাখী মেলার এক তপ্ত গরমে। তখন জবা নাইনে পড়ে। কৈশোরে পা দিয়ে ফুলের কলির মতোই অস্ফুট ছিল সে। তখনও ওর মনে প্রেমের হাওয়া লেগে মন বাগানের ফুল প্রস্ফুটিত হয়নি।
১লা বৈশাখের তপ্ত সে গরমে ওর ঘুরতে গিয়েছিল বৈশাখী মেলায়। জবা, ফারিস, হাফিজা, ফরহাদ, ইনান। সব ভাইবোন মিলে একসাথে ঘুরতে গিয়েছিল। ফারিসরা চার ভাইবোনের বয়সের তারতম্য খুবই কম। সব ভাইবোন পিঠাপিঠি। হাফিজার দুই বছরের ছোটো ফারিস, ফারিসের দেড় বছরের ছোটো ফরহাদ। ইনান অবশ্য অনেক ছোটো। ফরহাদের জন্মের দশ বছর পর জন্ম ওর। অনেকটা অসতর্কতায় জন্ম হয়েছি ইনানের। ইনান ফারিসের চেয়ে বারো বছরের ছোটো। সবার ছোটো হওয়ায় খুবই আল্হাদে বড়ো হয়ছে ইনান। ফলফল সে বেশ বিগড়ে গিয়েছে।
যাক সেসব গল্প পরে বলবো।
মেলায়,কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করার পর সবাই বায়না ধরল নাগর দোলায় উঠবে। ছোটোবেলা থেকে গম্ভীর স্বভাবের ফারিস নিষেধ করল। গম্ভীর ভাবে বলল,
'মেয়েরা নাগর দোলায় উঠে টিকতে পারে না।'
কথাটা হাফিজা আর জবার গায়ে খুব লাগল। ফলাফল ওরা জিদ ধরল নাগর দোলায় চড়বেই চড়বে। জবা বেশ জেদ করে বলল,
'ভাইয়া আজ আপনাকে দেখিয়ে দিব, মেয়েরা নাগর দোলায় উঠতে পারে।'
জিদ করে দু'জনেই উঠল। সাথে ফারিস, ফরহাদ আর ইনানও উঠল। নাগর দোলা একবার ঘুরানোর পর হাফিজা এমন চিৎকার দিলো যে বাধ্য হয়ে ওকে নামিয়ে দেওয়া হলো। ফারিস জবাকেও নামতে বলল। জবা ভাব দেখিয়ে নামল না।
নাগর দোলা যখন ঘুরছিল জবা তখন ভয়ে দুহাতো শক্ত করে ফারিসকে জড়িয়ে ধরে ছিল। তৃতীয় বার ঘোরার সময় জবা নরম তুলতুলে বিড়ালের ন্যায় গুটিসুটি মেরে ফারিসের বুকের মধ্যে ঢুকে পড়েছিল।
এমন অস্থির দিশেহারা অনুভূতির সাথে ফারিস পরিচিত ছিল না। কোনো মেয়ের এত কাছে প্রথম আসল ও। ওর হৃৎস্পন্দন এত বেশি ছিল যে মেলার এত কোলাহলের মাঝেও ও নিজের হৃৎস্পন্দনের শব্দ শুনতে পাচ্ছিল। ফারিস কাঁপছিল খুব। নাগর দোলায় না থাকলে হয়তো ওর কাঁপুনী সবাই দেখত।
পাঁচটা ঘোরা সম্পূর্ণ করল ওরা। নাগর দোলা থামার পর ফারিস নেমে জবার হাত ধরে নামাল। কিন্তু নাগরদোলা থেকে নামার পরমুহূর্তেই ওয়াক করে বমি দিয়ে নাগর দোলার পরিচালনা করা চাচাকে একদম ভাসিয়ে দিল জবা।
জবার অবস্থা দেখে চাচা প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে সাথে সাথে চিল্লানি দিয়া তার সাথের ছেলেটাকে বলল,
' ঐ ছগির এখানে বোর্ড লিখ, নাগর দোলায় মাইয়ামানুষ ওঠা মানা।'
ফারিস আরেকদিকে দিকে তাকিয়ে রইল। বিষয়টায় ওর অদ্ভুতভাবে হাসি পাচ্ছিল। কিন্তু নিজের হাসি লুকাতে ফারিসের চেয়ে দক্ষ কেউ আছে বলে সন্দেহ। জবা দূরে গিয়ে আরেকদফা বমি করল। হাফিজা গিয়ে ওকে ধরল। কিন্তু জবা নিজেকে বেশিক্ষণ সামলাতে পারল না। বেহুশ হয়ে গেল। ফারিস দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হাফিজকে বলল,
'আপা, তোদের মেয়েদের সাহস দেখে আমি আবেগে আপ্লূত। সর এই বাচ্চা হাতিটাকে কোলে নিয়ে নিরিবিলি কোথাও বসি। তারপর ওর জ্ঞান ফেরাতে হবে।'
জবার বমি আর অজ্ঞান হওয়ায় মেলার ঐ স্থানে রিতিমতো লোকজনের একটা জটলা পেকে গেছে। ফারিস সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল,
'আপনারা চিন্তিত হবে না। এটা আমার বোন। বেশি সাহস দেখাতে গিয়ে নাগর দোলায় উঠে এখন বমি করে অজ্ঞান হয়ে গেছে। এ জন্যই বলে মেয়েদের সাহস আর বুদ্ধি কোনোটাই ভরসা করতে নেই।
আশে পাশের কিছু লোক ফারিসের কথায় সম্মতি জানাল। হাফিজা খানিক রেগে ফারিসের পিঠের মাঝ বরাবর কিল বসিয়ে বলল,
'গাধা। চল আগে ওর জ্ঞান ফেরাই।'
ফারিস জবাকে কোলে নিয়ে মেলার সবচেয়ে নির্জন কোণায় গেল। চারদিকে বিকেলের আলো নরম হয়ে এসেছে। দূরে বাঁশির সুর বাজছে। মেলার কোলাহল এখানে এসে অনেকটাই ম্লান।
ফারিস চোখে মুখে পানির ছিটা দিল। জবা জ্ঞান ফিরতেই বলল,
'ফারিস ভাই দেখলেন আমি নাগর দোলার সবকয়টা ঘোরা কমপ্লিট করেছি। আমার অনেক সাহস।'
ফারিস রাগ করে বলল,
'হ্যাঁ তোর সাহসে মেলা উদ্ধার হয়েছে। এবার বল কেমন লাগছে?'
'মনে হচ্ছে সারা দুনিয়া ঘুরছে। আমার পেটের মধ্যে পাক দিচ্ছে। আবার বমি করব।'
ফারিস আরও রাগ করে বলল,
'আয় আমার কোলে বমি কর। নয়ত আমি হাত পাতি সেখানে কর। সেই বমি আমি তোকে আবার গিলাব।'
কথাটা বলতে দেরি হলো জবার বমি করতে দেরি হলো না। ফারিস ছিটকে দূরে গেল। এবার বমি গিয়ে পড়ল ফরহাদের গায়ে। ফরহাদ রাগে গজগজ করতে করতে বলল,
'ভাই এই হারামজাদিকে নদীতে ফেলে বাড়ি চল তো।'
জবা আর ফরহাদ সমবয়সী৷ জবা কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল,
'ফরহাদ তুই তোর বেস্ট ফ্রেন্ড প্লাস বোনকে এমন বলতে পারলি?'
ফরহাদ নিজের গায়ের বমির স্থানে পানি ঢালতে ঢালতে বলল,
'চুপ ছাগল। খাচ্চর দিলি তো আমার নতুন পাঞ্জাবির বারোটা বাজিয়ে। আজই কেবল নতুন পাঞ্জাবির ভাজ ভেঙেছিলাম। দাম জানিস এটার? পুরো বারোশ টাকা নিয়েছে দোকানদার। এই পাঞ্জাবির দাম যদি আমি তোর থেকে উসুল না করেছি তবে আমিও ফরহাদ জোমাদ্দার না।'
জবা অসহায় ভঙ্গিতে ফারিসকে বলল,
'ফারিস ভাই, দেখেন আপনার ভাই কী বলে?'
'তো খারাপ কি বলেছে। ও বেচারার এত দামি পাঞ্জাবি তুই নষ্ট করলি কেন?'
নাক ফুলিয়ে জবা বলল,
'আমি টাকা দিয়ে দিব।'
ফারিস গম্ভীর হয়ে বলল,
'তোর বাবার টাকার গরম দেখাচ্ছিস? ভুলে যাস না আমাদেরও কম নেই।'
'আমি সেটা কখন বললাম?'
করুন কণ্ঠে জবা বলল। ফারিস বলল,
'এখন ওঠ দেখ ইনান তোর জন্য লেবুর শরবত আনছে। এটা গিলে সুস্থ হয়ে বাড়ি গিয়ে আমাদেরকে উদ্ধার কর।'
'এমনে বলতে পারলেন ভাইয়া?'
'হ্যাঁ পারলাম। এবার চল বাড়ি। মেলায় তো তুই একাই মেলা বসিয়ে দিলি। এখন বাড়ি চল।'
'মেলা ঘুরব না?'
'আর ঘুরতে হবে না। নাগর দোলায় যা কান্ড করেছিস তারপর তোকে নিয়ে ঘুরতেও ভয় করছে। আবার কোথায় বমি দিয়ে ভাসিয়ে দিস তার ঠিক নেই।'
জবা মন খারাপ করে আরেকদিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,
'পাথর পুরুষ। তবুও আমি তোমাকেই পছন্দ করি।'
জবার ওমন মন খারাপ দেখে হাফিজা বলল,
'আবার কাল আসব। আজ চল সোনা। জবা উঠতে নিয়ে বুঝল মাথায় এখনও চক্কর দিচ্ছে। ফারিস ওর কাঁধে শক্ত করে হাত রেখে বলল,
'হেঁটে যেতে পারবি না কি কোলে নিব?'
জবা মনে মনে বলেছিল,
'কোলে নাও আমায়। মিশিয়ে ফেলো তোমার মাঝে।'
মনের কথা অন্তপূরে রেখে মুখে বলল,
'এভাবে ধরলেই হবে।'
ফারিস যখন জবাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল তখন জবার কী যে ভালো লাগছিল। ও মনে মনে ভেবে ফেলেছিল ফারিসও ওকে পছন্দ করে। এদিকে জবার কাঁধে হাত রেখে ফারিসের বুকের ভিতরও কাল বৈশাখী ঝড় শুরু হয়েছিল। সে ঝড় আজও থামেনি। যেন অন্ততঃ কাল ধরে চলবে সে ঝড়।
সেই ছিল জবার প্রতি ফারিসের মনে তৈরি হওয়া প্রথম ভালোলাগা। সে ভালোলাগা কবে ভালোবাসায় রূপান্তরিত হয়েছিল আজও ফারিস জানে না।
তবে ভালোবাসার উষ্ণতা অনুভব করেছিল ডিসেম্বরের এক কনকনে শীতের রাতে।
সেবার ডিসেম্বরের তীব্র শীত পড়ছিল । সবাই যে যত পারছে গরম কাপড় পরছে। সেই শীতকে উষ্কে দিতে সেদিন সন্ধ্যার পর মুষলধারে বৃষ্টিও হয়েছিল। সবার অগোচরে অসময়ের সে বৃষ্টিতে ভিজেছিল জবা।
রাতে ওর গা কাঁপিয়ে জ্বর আসল। ভয়ে হালিমা বেগমকে কিছুই বলতে পারল না। কাঁপা কাঁপা শরীরে ফারিসের রুমে গিয়ে বলল,
'ভাইয়া আমার শরীর প্রচণ্ড খারাপ লাগছে। জ্বরের ওষুধ এনে দিন।'
উদ্বীগ্ন হয়ে ফারিস বলল,
'কী হলো?'
অসুস্থ বেসামাল কণ্ঠে জবা বলল,
'সন্ধ্যার বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম। এখন বোধ হয় জ্বর আসছে। প্লিজ ফুপু বা বাবা মাকে জানাবেন না। প্লিজ।'
কথাটা বলে জবা অসুস্থ অবস্থায় ফারিসকে জড়িয়ে ধরে বলল,
'আমাকে রুমে দিয়ে আসুন। আমার প্রচণ্ড মাথা ঘুরাচ্ছে।'
ফারিস জবাকে কোলে তুলে নিতেই ওর মনে হলো এমন স্বর্গীয় অনুভূতি ও কখনো অনুভব করেনি। জবাকে রুমে নিয়ে শুইয়ে মাথায় জলপট্ট দিল। ওষুধ খাইয়ে দিয়েছিল। হা পা টিপে দিয়েছিল। সারারাত জবার সেবার করেছিল।
তখন জ্বরের ঘোরে জবা এটাও বলেছিল ফারিস ওর প্রথম পছন্দ। ফারিসকেই ও নিজের লাইফ পার্টনার করবে। সেই থেকে ফারিসের মনে শুরু হলো তাণ্ডব, সে তাণ্ডব আজও চলমান। অথচ সেই জবা নিজের কিশোরী কালের ভালোবাসা ভালোলাগা ভুলে দিব্যি ইরফানের সংসার করছে। ইরফানের বাচ্চার মা হয়েছে। অথচ এককালে এই জবাই জ্বরের ঘোরে ফারিসকে বলেছিল,
'আপনাকে আমার খুব ভালো লাগে ফারিস ভাই। ফুপুকে রাজি করে আমাকে বিয়ে করে নিন। আমি সারাজীবন আপনার সাথেই থাকতে চাই।'
সেই জবা কি করে ইরফানকে ভালোবেসে ফেলল আজও বুঝে উঠতে পারে না ফারিস। সব তো ঠিক ছিল, ঠিক চলছিল। মনে মনে ঠিক করেছিল জবার গ্রাজুয়েশন হলেই বিয়ে করবে। ওর মাকে সব ঠিক করেও রাখতে বলেছিল। ওর মনের কথা জবাকে বললে ওর পড়ালেখায় ক্ষতি হবে ভেবে বলেনি ও। কিন্তু ওর মাকে বলেছিল বিয়ের কথা পাকা করে রাখতে, যাতে অন্য কোথাও জবার বিয়ে না হয়।
অথচ একদিন দুপুরে শুনল জবা ইরফান নামের কাউকে বিয়ে করেছে। তাও ভালোবাসার বিয়ে। মুহুর্তেই ফারিসের সকল স্বপ্ন শেষ হয়ে গিয়েছিল। জবাকে গিয়ে বারবার প্রশ্ন করতে ইচ্ছা করছিল,
'কেন প্রতারনা করেছিল ওর সাথে? ওকে ভালোবাসার কথা বলে কেন ইরফানকে বিয়ে করেছিল? কিন্তু পারেনি প্রশ্ন করতে৷ চাইতে পারেনি কোনো জবাবদিহিতা। কীভাবে চাইবে দোষ তো ওরই ছিল। ও কেন নিজ ভালোবাসা নিজে মনে লুকিয়ে রেখেছিল। পরোক্ষণে মনে পড়ল ওর মা তো জানত। তিনি কেন জবাদের কিছু জানায়নি?
ফারিস ওর মা হালিমাকে যখন প্রশ্ন করল কেন জানায়নি জবার পরিবারকে ফারিসের মনের কথা?
তার সোজাসাপ্টা উত্তর ছিল, তিনি চান না জবা এ বাড়ির বউ হোক। তবুও তিনি ফারিসের কথা ভেবে ভেবেছিলেন জবাকে পুত্রবধূ করবেন, কিন্তু জবা নিজেই তো লাভ ম্যারেজ করেছে। সেখানে সে কী করবে?
ফারিস বেশ শক্ত কণ্ঠে বলেছিল,
'মা তোমার যুক্তি আমার কাছে যথাযথ মনে হচ্ছে না৷ সঠিক কারণ বলো? তুমি মামা মামিকে কেন বলোনি আমি জবা একে অপরকে পছন্দ করি? তোমাকে তো বলেছিলাম আপাতত ক্যাজুয়াল কথাবার্তা বলে বিয়ে ঠিক করে রাখো। জবার গ্রাজুয়েশন শেষ হলে বিয়ে হবে।'
হালিমা বেগম ফারিসের প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে সে স্থান থেকে প্রস্থান করেছিলেন। তারপর ফারিস যতবার তার কাছে উত্তর জানতে চেয়েছে তিনি এড়িয়ে গিয়েছেন। ফলাফল ফারিসও ওর মাকে এড়িয়ে চলা শুরু করে। মা ছেলের মধ্যে বিশাল দূরত্ব তৈরি হয়। সে দূরত্ব এতটাই বেড়ে যায় যে হালিমা বেগমের মৃত্যুও তাদের দূরত্ব কমাতে পারেনি।
জীবন নামক যাত্রাটা তখন থেকেই একঘেয়ামিতে পরিণত হয়েছিল ফারিসের৷ যেদিন প্রথম বুঝেছিল, সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে চাইলেই পাওয়া যায় না। কিছু মানুষকে শুধু দূর থেকে ভালোবেসে যেতে হয়, ঠিক আকাশে ঝুলে থাকা চাঁদের মতো। দেখা যায়, ছোঁয়া যায় না।
বহু বছর ধরে পৃথিবীর এক দেশ থেকে আরেক দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে ফারিস। বরফে ঢাকা পাহাড়, উত্তাল সমুদ্র, মরুভূমির একাকী রাত, ইউরোপের ব্যস্ত শহর কিংবা আফ্রিকার দূর্গম অঞ্চল। কোথাও শান্তি খুঁজে পায়নি ও। মানুষ ভাবে ভ্রমণ নাকি মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। অথচ ফারিস জানে, ভিতরটা মৃত হয়ে গেলে পৃথিবীর কোনো সৌন্দর্য আর মন ছুঁতে পারে না।
দুজন নারী ওর জীবনটাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। একজন জন্ম দিয়েছে, আরেকজন বাঁচতে না দিয়েও বাঁচিয়ে রেখেছে। এ জন্যই হয়তো মানুষ বলে, নারী কখনো আশ্রয়, কখনো প্রলয়।
নিজের গোপন কক্ষের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ফারিস একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল বিশাল এক ক্যানভাসের দিকে। আট ফুট লম্বা সেই ছবিতে জবার মুখ পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। কিশোরী জবা কোনো এক কারণে চোখ-মুখ চেপে হেসেছিল। সেই মুহূর্তে লুকিয়ে ছবিটা তুলেছিল ফারিস।
আর সেই চুরি করে রাখা মুহূর্তটাই পরে এক বিখ্যাত চিত্রকর দিয়ে বিশাল ক্যানভাসে আঁকিয়েছিল। ছবিটার দিকে তাকালেই মনে হয়, হাসছে একটা মেয়ে, আর ধ্বংস হচ্ছে একটা পুরুষের জীবন।
আট ফুট সাইজের ছবিটা ছাড়াও রুমটির পুরো দেয়াল জুড়ে জবার অসংখ্য ছবি। সবই ফারিসের তোলা ছবি। কিছু ছবি লুকিয়ে তোলা তো কিছু সামনে থেকে। জবা নিজেও জানে না ফারিস ওর জন্য কোন পর্যায়ের পাগল।
ফারিসদের এ বাড়িটি যখন বানানো হয় তখন ফারিস নিজের রুমের সাথে একটা গোপন রুমও তৈরি করে। সবাই এ গোপন রুমের কথা জানলেও কেউ তেমন ঢুকত না। কিশোরবেলায় সব ভাইবোন ঢুকলেও জবার বিয়ের পর কেউ ঢুকতে পারিনি। আধুনিক প্রযুক্তির লক ব্যবহার করা হয়েছে এর দরজায়। আগে পাসওয়ার্ড ছাড়া খুলত না। আর বিগত কিছু বছর যাবত ফারিসের হাতের ছাপ ছাড়া খুলে না।
সবার কৌতুহল এ রুমটিকে ঘিরে। কিন্তু ভিতরে প্রবেশের সাহস কেউ করেনি।
ঘরটা যেন ওর ভালোবাসার কবরস্থান।
ফারিস যখন দেশে আসে তখন ঘন্টার পর ঘন্টা এই রুমে সময় কাটায়। এক ধ্যানে জবার ছবির দিকে তাকিয়ে থাকে। যেন ধ্যান করছে জবার ভালোবাসা পাওয়ার জন্য।
অথচ পেল একরাশ হতাশা।
এই হতাশা নিয়েই দেশ ছেড়েছিল তখন ফারিস। আজও সেই হতাশা নিয়েই দেশ ছাড়ছে। ফিরনাসের পরীক্ষা কদিন পর। এখন না গেলেই নয়। তাছাড়া ওর কাজেরও ক্ষতি হচ্ছে খুব। কদিন পর আবার লম্বা সময়ের জন্য ব্যবসায় থেকে দূরে থাকবে। তো না চাইতেও দেশ ছাড়তে হলো ওকে।
কিন্তু ফারিস কি জানে শীঘ্রই ওকে দেশে আসতে হবে জবার টানে। ভালোবাসার টানে। নয়তো আমার গল্প এগোবে না। প্রতিশোধের গল্প ভালোবায় পরিণত হবে না। ফারিসদের মতো প্রেমিকদের ভালোবাসার একটা গতি হওয়া জরুরি। খুবই জরুরি।
—————
সিনথিয়া, নিহাদকে দেখে সামনে গিয়ে সালাম করল,
'আসসালামু আলাইকুম স্যার।'
বিরক্তি মাথা কণ্ঠে নিহাদ জবাব দিল, 'ওয়ালাইকুম আসসালাম।'
'স্যার, কি বাসায় যাচ্ছেন?'
'কেন?'
'আমাকে একটু লাইব্রেরীর সামনে লিফ্ট দিতেন।'
নিহাদ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
'বেশি বাড়াবাড়ি করছো কিন্তু।'
'শুরুটা কে করেছিল? প্লিজ স্যার লিফট দিন।'
'অসম্ভব!'
'কথাকে তো রোজ লিফ্ট দেন।'
'কথা স্টুডেন্ট শুধুমাত্র ভার্সিটিতে। বাকি সময় ও আমার স্ত্রী, ওর সাথে যা ইচ্ছা করার অধিকার আছে আমার।'
'একদিন হয়তো আমিও আপনার সাথে যা খুশি করার অধিকার রাখব।'
'সেদিন জীবনে আসবে না। সবসময় নিজেকে লিমিটের মধ্যে রাখো।'
'আমার লিমিট আমি জানি। কথার চেয়ে বেশি।'
'কোথায় বিশাল সমুদ্র আর কোথায় পচা ডোবা? তোমার পাশে দাঁড়ালেও গন্ধ আসে। খবরদার নিজেকে আমার কথার সাথে তুলনা করবে না। আমার কথা বিশাল সমুদ্র আর তুমি পৃথিবীর সবচেয়ে র্নিলজ্জ প্রাণী শুকরের চেয়েও অধম আমার নিকট।'
নিহাদ আর সেখানে দাঁড়াল না। বাইক নিয়ে চলে যায়। বিড়বিড় করে বলতে থাকে, 'হে সৃষ্টিকর্তা আমাকে রক্ষা করো এই মেয়ের যন্ত্রণা থেকে।'
—————
তূবা, কথাকে ওর ভাইয়ের করা মেসেজগুলো দেখাচ্ছিল। শ্রাবণের মেসেজ পড়ে কথা হাসতে হাসতে বলল, 'বাহ্! ভাই দেখছি আমার খুব বুদ্ধিমান? এমন করে বললে তো যে কোনো মেয়ে পটে যেত তুই কেন পটছিস না বলতো?'
তূবা রাগ করে বলল, 'আমি যে কোনো মেয়ে?'
'ওরে গাধি আমি বলতে চেয়েছি অধিকাংশ মেয়েরা এমন টাইপ কথায় গলে যায় তুই কেন গলছিস না?'
'আমি কি মোমবাতি আর তোর ভাই আগুন যে কিছু বললে বা কাছে আসলে গলে যাব?'
'আমার ভাই আগুন-ই তো? দেখছিস না কেমন দেখতে। লম্বা, ভীষণ ফর্সা, একটু চিকনা বাট বিয়ের পর ঠিক হয়ে যাবে। বিয়ের পর চিকনা ছেলে মেয়ে মটু হয়ে যায়। কথাটা বলে কথা চোখ টিপল।'
তূবা দুম করে কথার পিঠে কিল বসিয়ে বলল,
'কি সব অশ্লীল ইশারা দিচ্ছিস।'
কথা নিজের পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বলল,
'আরে অশ্লীল কী বলছি? আমাকে আর নিহাদকে দেখ বিয়ের আগে আমি কত শুকনা ছিলাম, গায়ের রঙও তখন শ্যামলা লাগত। এখন দেখ একটু গলুমলু হয়েছি, সাথে বেশ ফর্সাও। আর নিহাদও তো চিকন ছিল, এখন স্বাস্থ্য দেখ কত ভারী। ওকে দেখলেই আমার গায়ে কাটা দেয়।'
তূবা রাগ করে বলল, 'ব্যাপারটা তোর আর ভাইয়ার না। ব্যাপারটা হচ্ছে তুই আমাকে ঐ গাধাটাকে বিয়ে করতে বলছিস। বিয়ের পর মোটা হবারও কথা বলছিস। তোরা বিয়ে করে মোটা হয়েছিস ভালো কথা, আমাকে কেন তোর ভাইয়ের সাথে টানছিস?'
'একটু টানলাম না হয় কী সমস্যা?'
'আমার কিন্তু রাগ উঠতাছে, কথা?'
'আচ্ছা সরি রাগ করিস না। চল ক্লাসে। আজ আমার জামাইর ক্লাস আছে।'
'হ্যাঁ, তোমার জামাই তো তোমারে ক্লাসে বসে চিনেই না।'
'আর বাড়ি বসে কাছ ছাড়া করে না। ইদানিং যা বিরক্ত করে তা কী বলব?'
'কেনরে?'
'কে জানে? সারাক্ষণ ফেবিকলের মতো চিপকে থাকে। ইদানিং র্নিলজ্জও হয়েছে বেশ। বাবা-মা এর সামনে বসে হুটহাট জড়িয়ে ধরে, চুমু খায়। লজ্জায় আমার তখন প্রাণ যায় যায় অবস্থা।'
তূবা হেসে বলল,
'আহা! দুলাভাই আমার কত্ত রোমান্টিক।'
'রোমান্টিকতার এ হ্যাপা তো সবসময় নেওয়া যায় না।'
তূবা হেসে বলল, 'বিয়ের পর তো এমনি এমনি তুই মোটা আর ফর্সা হোসনি? আমার তো মনে হয় এই রোমান্টিকতার বদৌলতে হয়েছি।'
কথার গাল লাল হয়ে গেল। লজ্জায় লাল হয়ে বলল, 'চুপ।'
পিছনে বসে সিনথিয়াও ওদের কথা শুনছিল। কথাকে বলল, 'নিহাদ স্যার বুঝি, অনেক রোমান্টিক?'
কথা, তূবা ওর দিকে তাকিয়ে বলল,
'সিনথিয়া, তুমি কি আমাদের কথা শুনছিলে?'
'একটু আধটু। সরি ফর দ্যাট। তোমরা নিহাদ স্যারকে নিয়ে বলছিলে তো তাই।'
কথা হেসে বলল, 'আমারা মোটেও নিহাদ স্যারকে নিয়ে বলছিলাম না, আমরা কথা বলছিলাম আমার বরকে নিয়ে।'
সিনথিয়া বলল, 'একই কথা হলো।'
তূবা বলল, 'একই কথা কীভাবে?'
'স্যার আর কথাকে কখনও ক্লাসে বা ভার্সিটিতে বসে তেমন কোনো আচরণ করতে দেখেছো কখনও?'
'না। তবে যতই স্যার ছাত্রী হোক ওরা স্বামী স্ত্রী এটা তো সত্যি?'
কথা বলল, 'তা অবশ্য ঠিক।'
সিনথিয়া বলল, 'কথা তোমাদের লাভ ম্যারেজ নাকি অ্যারেঞ্জ?'
'দুটোই। নিহাদের লাভ, আমার অ্যারেঞ্জ।'
'কীভাবে?'
'তূবা যখন ইন্টারে পড়ত তখন নিহাদ স্যার ওকে প্রাইভেট পড়াতেন ওদের বাসায় এসে। ওদের বাসায় আমার সবসময় যাওয়া আসা হতো। সেখান থেকেই নিহাদ আমাকে ভালোবেসে ফেলে তারপর সোজা নিজের পরিবার নিয়ে আমাদের বাসায় প্রস্তাব নিয়ে আসে। আমার পরিবারেরও নিহাদকে পছন্দ হয়। তার কিছুদিন পর বড় অনুষ্ঠান করে বিয়ে হয়।'
সিনথিয়া বলল, 'একটা কথা বল কথা, তূবাকে তুখোর সুন্দরীদের কাতারে অনায়াসে ফেলা যায়। আর সেখানে তুমি শ্যামলা গরনের মেয়ে। তো নিহাদ স্যার তূবার মতো ভুবন ভোলানো সুন্দরী ছেড়ে তোর মতো মেয়েকে কেন ভালোবাসলো?'
তূবা বলল, 'এটা কোন ধরণের নীচু কথা সিনথিয়া? পৃথিবীতে সৌন্দর্যই সব না। মানুষের মন চরিত্রেরও একটা ব্যাপার আছে। আর তুই যে চোখে কথাকে দেখছিস সে চোখে স্যার দেখেননি। তিনি কথাকে ভালোবেসেছেন মন থেকে, মন দেখে। স্যার আর কথার সংসার, সম্পর্ক তোর আমার ধারণার বাইরে সুন্দর। আর নিহাদ স্যার সর্বদা আমাকে ছোটো বোনের নজরে দেখেন। আমি এত সুন্দর বলেও কখনও শালীকার মতো দুষ্টুমি করেননি। সবসময় বোনের মতো স্নেহ করেন, শিক্ষক হলেও অভিবাবকের মতো শাসন করেছেন। বড় ভাইয়ের মতো যে কোনো বিপদে পাশে থেকেছেন। তার চোখে কখনও আমার জন্য বাজে কোনো কিছু দেখিনি। আমার দেখা অনেক ভালোমানুষের মধ্যে তিনি একজন।'
সিনথিয়া তাচ্ছিল্য হেসে বলল, 'স্যারের প্রশংসায় দেখছি তোরা পঞ্চমুখ।'
'তো প্রশংসা করার মতো মানুষের প্রশংসা করব না?'
সিনথিয়া বেশ রাগ করে বলল, 'শোন, মানুষ নিজেকে যতটা ভালো প্রদর্শন করে ততটা ভালো হয় না। তার মনটা কেবল সে-ই জানে।'
কথা বেশ রাগ করে বলল, 'নিহাদকে নিয়ে তোর প্রবলেম কী বলতো? সবসময় দেখছি উল্টা পাল্টা কথা বলছিস?'
'আমার কী প্রবলেম হবে? আমি তো জাস্ট বলছি মানুষকে চেনা এতটাও সহজ না।'
কথা বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল, 'একজন স্ত্রীর কাছে তার স্বামীকে চেনা অতটাও কঠিন না।'
'ওহ আচ্ছা।'
সিনথিয়া যেতে নিলে তূবা বলল, 'সিনথিয়া, নিহাদ স্যারকে নিয়ে তোর প্রবলেম কী?'
'আমার আবার কী প্রবলেম হবে?'
'তুই তার বিষয়ে খুব কৌতুহলী। সেদিনও নাকি কথার সাথে কি কি বলেছিস, আজ আবার বলছিস। মানে সব কিছু ঠিক আছে তো?'
'ঠিক থাকবে না তো কী হবে?'
তূবা খোঁচা মেরে বলল, 'স্যারের প্রেমে পড়ে যাসনি তো আবার?'
সিনথিয়া খানিকটা রাগ করে বলল, 'কী যা তা বলছিস?'
তূবা ঠোঁট টিপে হেসে বলল, 'না মানে যেভাবে সবসময় স্যারের কথা জানতে চাস। তাই আরকি বললাম।'
সিনথিয়া কিছুটা সময় চুপ রইল। তারপর বলল, 'তেমন কিছু না। আমি এমনি জানতে চাই। স্বামী-স্ত্রী, স্যার আর ছাত্রী, তা-ও একই ভার্সিটির এমন খুব কম দেখা যায়। তাই কিউরিসিটি হচ্ছিল। তাছাড়া মিথ্যা বলব না, নিহাদ স্যারকে আমার ভালো লাগে। তিনি দেখতে তো হিরোর চেয়ে কম না। চোখে ভালো লাগে এমন সুন্দর। তো তাকে সাধারণভাবে ভালোলাগাটা নিশ্চয়ই অন্যায় কিছু না?'
কথা বলল, 'অন্যায় কেন হবে? যার যার ভালোলাগা তার তার কাছে। তবে ব্যাপারটা ভালোলাগা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ রাখিস। কারণ শত হোক স্যার বিবাহিত।'
'হুম জানি।'
সিনথিয়া চলে যেতেই তূবা বলল, 'ওর দিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে। ওর কার্যকলাপ ভালো ঠেকছে না।'
কথা বলল, 'আরে বাদ দে।'
—————
মন্ত্রী এহসান সাহেবের স্ত্রী রত্না বসে আছে জবাদের ড্রয়িং রুমে। জবা তাদের বাড়ি যাওয়ার পর থেকে ও এক মুহূর্তও শান্তিতে কাটাতে পারেনি। মাথার মধ্যে বারবার ঘুরছে জবা চৌধুরী কীভাবে মিরাজের কথা জানল! মিরাজের কথা তো ও ব্যতিত কারও জানার কথা না! তাহলে জবা চৌধুরী কীভাবে জানল?
মিরাজ রত্নার পুরাতন প্রেমিক। সাথে মন্ত্রী এহসান সাহেবের বর্তমান হিসাব রক্ষকও। মিরাজকে চাকরিটা পাওয়ার ব্যবস্থা রত্নাই করে দিয়েছিল।
রত্না মধ্যেবিত্ত ঘরের মেয়ে হলেও অনবদ্য সুন্দরী। মন্ত্রী এহসান সাহেবের বাড়ির পাশের বাড়িতেই থাকত রত্মারা। এহসান সাহেব বিপত্মীক লোক। এক ছেলে সে লন্ডন কলেজে পড়ে। তার একাকি জীবনে একজন সঙ্গীনীর খুব প্রয়োজন ছিল। তখন তার নজর পড়ে সুন্দরী যুবতী রত্নার উপর।
একই এলাকায় থাকার সুবাদে রত্নার সাথে প্রায়ই তার দেখা হতো। রত্নার বয়স তখন মাত্র চব্বিশ বছর। মন্ত্রী এহসান সাহেব ওর বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব রাখলেন। মন্ত্রী এহসান সাহেবের বয়স তখন উনপঞ্চাশ বছর। বেশ ফিট এবং নিজেকে তিনি চিরযৌবনা যুবক ভাবেন।
মন্ত্রীর বাড়ি থেকে বিয়ের প্রস্তাবকে হাতছাড়া করতে চায়নি রত্মার বাবা মা, রতন এবং আলেয়া। তারা তৎক্ষনাৎ রাজি হয়ে গেল। বেঁকে বসল রত্মা। ও মিরাজকে ছাড়া কাউকে বিয়ে করবে না। ঐ বুড়োকে তো একদমই না।
ওর বাবা মা অনেক বুঝিয়েও ওকে রাজি করতে পারল না। রত্না মিরাজকে বলল,
'চলো পালিয়ে বিয়ে করি।'
তখন মিরাজের মাথায় দারুণ বুদ্ধি আসল। ও রত্নাকে বুঝালো,
'মন্ত্রীর থেকে পালিয়ে, এ দেশে থেকে আমরা বাঁচতে পারব না। তার চেয়ে টাকা পয়সা জুটিয়ে বিদেশ সেটেল হব।'
রত্না বলল,
'বিদেশ সেটেল হতে তো অনেক খরচ। এত টাকা কোথায় পাব?'
মিরাজ বলল,
'আমার কাছে দারুণ একটা আইডিয়া আছে। তুমি মন্ত্রী সাহেবকে বিয়ে করো। তারপর তার সাথে কিছুদিন থেকে টাকা পয়সা গয়নাগাটি, সম্পত্তি হাতিয়ে বিদেশ পালিয়ে যাবে। ততদিনে বিদেশ সেটেল হওয়ার সকল গোছগাছ করে ফেলবে।'
রত্না প্রথমে রাজি না হলেও পড়ে মিরাজের কথা মেনে নিলো। ধুমধাম করে বিয়ে হলো মন্ত্রী এহসান সাহেবের সাথে।
এহসান সাহেব রত্নাকে ভালোবাসে তবে সে ভালোবাসা রত্মার কাছে বিষের মতো লাগে। এহসান সাহেবের স্ত্রী হলেও রত্না মিরাজের সাথে ওর সম্পর্ক আজও বজায় রেখেছে। সে সম্পর্ক সকল সীমা অতিক্রম করে গিয়ে রত্মাকে সন্তান সম্ভবা করেছে। রত্না মিরাজের সন্তানকে এহসান সাহেবের সন্তান বলে সবার কাছে যত্ন নিচ্ছে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………