পদ্মজা - পর্ব ৩৭ - ইলমা বেহরোজ - ধারাবাহিক গল্প

পদ্মজা - ইলমা বেহরোজ
          মদন পদ্মজাকে রেখে কিছুতেই যাচ্ছে না। আবার পদ্মজাও অন্দরমহলের ভেতর ঢুকতে চাইছে না। সে বার বার বলছে, ‘আমি একটু হাঁটব এদিকে। আপনি যান।’

‘রাইতের বেলা একলা থাকবেন! আমার কামই আপনারারে দেইখা রাখা।’

‘এদিকে তো আলো জ্বলছে। উনিও এখন আসবেন। আপনি যান। আর আপনার পা তো কাদায় মাখা। বেশিক্ষণ এভাবে না থেকে ধুয়ে আসুন।’

মদন পায়ের দিকে তাকাল। লুঙ্গি হাঁটু অবধি তুলে বেঁধে রাখা। সে হেসে বলল, ‘আইচ্ছা তাইলে আমি ধুইয়া আইতাছি। বেশিখন (বেশিক্ষণ) লাগব না।’

‘আচ্ছা, আসুন।’

মদন চলে যেতেই পদ্মজা ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলল। গলার মাঝে যেন এতক্ষণ কাঁটা বিঁধে ছিল। বাড়ির পেছনে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই দেখলে পেল আমিরকে। আমির আলগ ঘর পেরিয়ে এদিকেই আসছে। পদ্মজা আর ঘুরে দাঁড়াতে পারল না, আলগ ঘরের দিকে চেয়ে রইল। পদ্মজাকে দেখতে পেয়ে লম্বা করে হাসল আমির। বলল, ‘পদ্মবতী কী আমার জন্য অপেক্ষা করছে?’

‘বোধহয় করছি।’

আমির ভ্রুকুটি করে বলল, ‘বোধহয় কেন?’

‘ঘরে একা ভালো লাগছিল না। তাই হাঁটতে বের হয়েছিলাম। আপনি

নামাজ পড়েছেন?’

‘এই যে মাথায় টুপি। মসজিদ থেকে আসলাম।’

পদ্মজা আড়চোখে অন্দরমহলের ডান দিকে তাকাল। ভাবছে, রানি আপা কোথায় গেল? উসখুস করতে থাকল সে।

ঠিক তখনই পদ্মজাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল আমির। স্বামীর কাজে পদ্মজা হতভম্ব হয়ে দ্রুত এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল, কেউ আছে নাকি! এরপর আমিরের হাতের বাঁধন ছুটানোর চেষ্টা করতে করতে বলল, ‘ছাড়ুন, কেউ দেখবে।’

‘কেউ দেখবে না। এদিকে কেউ নেই,’ আমিরের কণ্ঠ মোহময়। সে পদ্মজার ঘাড়ে থুতনি রাখল। ওর ঠোঁটের ছোঁয়া লাগাতেই পদ্মজার গা জুড়ে শুরু কাঁপুনি এলো। জোর করে আমিরের হাতের বাঁধন থেকে ছুটে গিয়ে বলল, ‘আপনি ঘরে যান।’

আমির হতাশ ভঙ্গিতে বলল, ‘আচ্ছা চলো।’

‘আপনি যান আমি আসছি।’

‘কেন? তুমি কোথায় যাবে?’

পদ্মজা নিচের ঠোঁট কামড়ে কিছু ভাবল। বলল, ‘আলগ ঘরে যাব। আপনি ঘরে যান। নয়তো আম্মা আমাকে খুঁজবে। আমি কিছুক্ষণের মধ্যে চলে আসব। এরপর সব বলব।’

‘আরে, কী করবে বলবে তো।’

‘আপনি যান না।’

পদ্মজা ঠেলে আমিরকে অন্দরমহলের দিকে পাঠিয়ে দিল। আমির অসহায় মুখ করে জিজ্ঞাসা করল, ‘আমিও থাকি?’

‘আপনি ঘরে গিয়ে বসেন, আমি যাব আর চলে আসব।’

পদ্মজার অনুরোধ ফেলা যাচ্ছে না। আমির না চাইতেও অন্দরমহলে চলে গেল। সেই সুযোগে এক নিশ্বাসে দৌড়ে অন্দরমহলের ডান পাশে চলে এলো পদ্মজা। সঙ্গে সঙ্গে সামনে পড়ল রানি। দুজন দুজনকে হঠাৎ চোখের সামনে দেখে চমকে উঠল, অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। রানিই আগে কথা বলল, ‘রাইতের বেলা এমনে ছুটতাছো কেন?’

পদ্মজার মাথা থেকে ঘোমটা পড়ে গেছে সেই কখন। দৌড়ে আসাতে চুলের খোঁপাও খুলে গেছে। গাছ-গাছালির বাতাসে তিরতির করে তার চুল উড়ছে। তবুও সে ঘামছে। আমতা আমতা করে বলল, ‘আ…আমি তো হাঁটতে বের হয়েছি। জোনাকি দেখলাম এদিকে। তাই নিতে এসেছি।’

‘ওহ। কই জোনাকি। নাই তো।’

‘একটু আগেই ছিল।’

‘এহন তো নাই। রাইতের বেলা একলা থাকবা কেন? আসো ঘরে যাই।’

‘তুমি কোথায় গিয়েছিলে আপা? সন্ধ্যার আগে তোমার ঘরে গেলাম কিন্তু পেলাম না। এদিক দিয়ে কোথাও ছিলে? কিন্তু এদিকে তো ঝোপঝাড়, জঙ্গল।’

পদ্মজার প্রশ্নে রানির মুখ রক্তিম হয়ে উঠল, কেমন অস্বাভাবিক দেখাল তার চাহনি; হাসল অপ্রস্তুতভাবে। কী বলবে খুঁজছে যে তা স্পষ্ট। পদ্মজা অপেক্ষা করছে, রানি কী বলে শোনার জন্য।

পদ্মজা ডাকল, ‘আপা?’

‘আরে আমি ওষুধ খুঁজতে আসছিলাম।’

‘কী ওষুধ?’

‘তুমি চিনবা না। আসো বাড়িত যাই। মেলা রাইত হইয়া গেছে।’

পদ্মজাকে পিছনে রেখেই রানি চলে যাচ্ছে। এটাকে পালিয়ে যাওয়া বলে। পদ্মজা আর থেকে কী করবে! সেও রানির পিছু পিছু অন্দরমহলে চলে আসে।

ঘরে ঢুকতেই আমির হামলা করে, ‘কাহিনি কী বলো তো।’

‘বিশ্বাস করবেন?’

‘তোমার কথা বিশ্বাস করব না, এ হয়?’

‘রানি আপা প্রায় জঙ্গলের ভেতর যায়। আমি জানালা থেকে দেখি। এমন ভাবে যায় যেন চুরি করতে যাচ্ছে।’

আমির শুনে অবাক হলো। চাপা স্বরে প্রশ্ন করল, ‘সত্যি! প্রায়ই যায়?’

‘আমি সত্যি বলছি।’

আমির চোখেমুখে ছড়িয়ে পড়ে দুশ্চিন্তা, কপালের চামড়া পর্যন্ত কুঁচকে গেছে। গভীর ভাবনায় বিভোর সে। পদ্মজা বলল, ‘আমি আজ অনুসরণ করে জঙ্গল অবধি গিয়েছিলাম। মদন ভাইয়ার জন্য ভেতরে ঢুকতে পারিনি। এরপর আপনি এলেন। পরে আবার যেতে চেয়েছি। কিন্তু ততক্ষণে রানি আপা চলে এসেছে। সরাসরি প্রশ্নও করেছি, কেন জঙ্গলে গিয়েছিল। বলল, ওষুধ আনতে। মানে কোনো ঔষধি পাতা। কিন্তু আমার বিশ্বাস হয়নি। প্রায়ই কেন কেউ ঔষধি পাতা আনতে যাবে? তাও আবার ভোরে আর রাতে।’

পদ্মজা এক দমে কথাগুলো বলল। আমির জবাবে বলল, ‘আব্বাকে বলতে হবে।’

‘আগে আমার কথা শুনুন।’

‘বলো?’

‘এখন কাউকে বলবেন না।’

‘বলা উচিত। ব্যাপারটা জটিল মনে হচ্ছে।’

‘আমরা আগে বের করি, কী হয়েছে…আপা কী করতে যায়? এরপর নিজেরা সমাধান করতে পারলে করব। নয়তো বড়োদের বলব। যদিও আমরা নিশ্চিত না কোনো সমস্যা আছে।’

‘অবশ্যই সমস্যা আছে। তুমি জানো, ওদিকে কোনো মহিলা ভয়ে ভুলেও যায় না। অথচ রানি যায়। বড়ো কোনো কারণ নিশ্চয়ই আছে।’

‘সেটা আমরা দুজন মিলে বের করি?’

‘কীভাবে?’

‘আমার মনে হচ্ছে আবার যাবে, কাল-পরশুর মধ্যে। আমরা পিছুপিছু যাব।’

‘খারাপ বলোনি।’

‘কাউকে বলবেন না এখন, অনুরোধ।’

আমির হাসল। পদ্মজার কোমর পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘বলব না।’

‘আপনি কারণে-অকারণে ছোঁয়ার বাহানা খুঁজেন।’

‘এতে পাপ তো নেই।’

‘খাওয়ার সময় হয়েছে, চলুন। ঠিক সময়ে না গেলে আম্মা রেগে গিয়ে চেঁচামেচি করবেন।’

‘আম্মারা চেঁচামেচি করেই। তোমাকে একটা কথা বলার ছিল।’

‘কী?’

‘তোমাকে খয়েরি রঙে বেশি সুন্দর লাগে।’

‘আমি তো খয়েরি শাড়ি পরিনি।’

‘পুরো কথা বলতে দাও।’

‘আচ্ছা, বলুন।’

আমির পদ্মজার কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘আর কালো রঙে আবেদনময়ী লাগে।’

পদ্মজার কানে-ঘাড়ে আমিরের নিশ্বাস ছিটকে পড়ে। সে ঘুরে আমিরের দিকে তাকাল। আবার চোখ সরিয়ে নিয়ে বলল, ‘কিন্তু আপনি সবসময় আকর্ষণীয়।’

আমির হইহই করে উঠল, ‘সত্যি? কত…কত দিন পর একটু প্রশংসা করলে। ইয়া আল্লাহ!’

পদ্মজা মৃদু আওয়াজ করে হাসল। বলল, ‘প্রশংসা শুনতে খুব ভালোবাসেন?’

‘অবশ্যই। তবে বউয়ের প্রশংসা করতে আরো বেশি ভালোবাসি।’ আমির আরো শক্ত করে পদ্মজার কোমর আঁকড়ে ধরল। আমিরের দুই হাতে ধরে পদ্মজা বলল, ‘আপনি সবসময় এত শক্ত করে ধরেন কেন? গায়ের জোর দেখান?’

‘কেন? ভালো লাগে না?’

‘মোটেও না। আদর করে ধরবেন। ‘

আমির হাতের বাঁধন কোমল করে দিয়ে বলল, ‘লজ্জার ছিটেফোঁটাও গিলে ফেলেছ দেখছি।’

‘বিয়ের এতদিন পরও কোন মানুষটা লজ্জা পায়, তা আমাকে দেখাবেন। আমি অত ভং ধরতে পারব না।’

‘কী ঝাঁঝ কথায়!’

‘এবার ছাড়ুন

‘ইচ্ছে হচ্ছে না।’

‘আবার শক্ত করে ধরেছেন।’

‘যদি দৌড়ে পালাও?’

‘পালিয়ে আর কোথায় যাব?’

আমির পদ্মজাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে এক হাতে কোমর চেপে ধরে অন্য হাত গালে রাখল। তখনই হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল লতিফা। পদ্মজা, আমির দুজন দুদিকে ছিটকে গেল। আমির ধমকে উঠল, ‘লুতু কতবার বলেছি না বলে ঘরে ঢুকবি না। আমাদের তো নতুন বিয়ে হয়েছে, নাকি?’

পদ্মজা খেয়াল করল আমির কথাগুলো রাগে বলার চেষ্টা করলেও, ঠিক রাগত শোনাল না। হাসি পেল তার। ওদিকে লতিফার মুখের অবস্থা দরজার চিপায় পড়ার মতো। সে আমিরকে ভীষণ ভয় পায়। কাঁচুমাচু হয়ে বলল, ‘খালাম্মা খাইতে যাইতে কইছে।’
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp