পদ্মজা ঘরের চৌকাঠে পা দিয়েছে মাত্র। আমির রিদওয়ানকে টেনে হিঁচড়ে তুলে বলল, ‘তোকে না করেছিলাম। বার বার না করেছি। তবুও শুনলি না।’
রিদওয়ান দুই হাতে আমিরকে ধাক্কা মেরে দূরে ছুঁড়ে ফেলে। আমির আলমারির সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে আরো হিংস্র হয়ে রিদওয়ানের দিকে তেড়ে আসে। নুরজাহান দৌড়ে এসে পথ রোধ করে দাঁড়ান। চিৎকার করে বললেন, ‘কী অইছে তোদের? তোরা এমন করতাছস কেন?’
‘দাদু, সরে যাও। মাদা** বাচ্চারে আমি মেরে ফেলব।’
‘তুই কি ভালা মানুষের বাচ্চা?’ তেজ নিয়ে বলল রিদওয়ান।
আমির নুরজাহানকে ডিঙিয়ে রিদওয়ানকে আঘাত করতে প্রস্তুত হয়।
তখন মজিদ হাওলাদারের কর্কশ কণ্ঠ ভেসে আসে, ‘যে যেখানে আছো, সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকো।’
আমির মজিদ হাওলাদারকে এক নজর দেখে শান্ত হওয়ার চেষ্টা করল। পরেই জ্বলে উঠে বলল, ‘আব্বা আপনি জানেন না ও কী করছে? পদ্মজা গোসল করছিল আর ও লুকিয়ে লুকিয়ে সেটা দেখছিল।’ আমিরের কণ্ঠ থেকে যেন আগুন ঝরছে।
ফরিনা, আমিনা, রানিসহ হাওলাদার বাড়িতে কাজ করা দুজন মহিলা ছি ছি করে উঠল। রিদওয়ান সাবধানে প্রশ্ন করল, ‘তোর কাছে কী প্রমাণ আছে?’
‘প্রমাণ লাগবে? আমি জানি এটা তুই ছিলি। বিয়ের রাতেও তুই পদ্মজার কাছে গেছিলি।’
‘অপবাদ দিবি না।’
‘তুই ভালো করেই জানিস আমি অপবাদ দিচ্ছি না।’
‘তুমি কী করে নিশ্চিত যে, ছেলেটা রিদওয়ানই ছিল? পদ্মজা দেখেছে? নাকি তুমি?’ বললেন মজিদ।
‘কেউ দেখেনি। কিন্তু আমি নিশ্চিত ওই চরিত্রহীনটা রিদু। কারণ, আমার আগে থেকে ও পদ্মজাকে পছন্দ করত।
পদ্মজা বিস্ময়ে তাকাল। কী হচ্ছে, কী সব শুনছে? ফরিনার দুই ঠোঁট হাঁ হয়ে গেল। মুখে হাত দিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। আমিনা বললেন, ‘আপা, আমি আগেই কইছিলাম এই ছেড়ি বিনাশিনী। এই ছেড়ির রূপ আগুনের লাকান। এই ছেড়ির জন্য এখন বাড়ির ছেড়াদের ভেজাল হইতাছে।’
আমির আমিনার কথা শুনেও না শোনার ভান করল। মজিদকে বলল, ‘আব্বা, আপনি এর বিচার করবেন? না আমি ওরে মেরে ফেলব? আর আম্মা, এরপরও বলবা পদ্মজাকে এই বাড়িতে রেখে যেতে? আমাকে তো ফিরতেই হবে ঢাকা। মনে রেখো, পদ্মজাকে রেখে আমি কিছুতেই যাব না। আব্বা, তুমিও কথাটা মনে রেখো, আমি তোমার ব্যবসায় আর নেই…যদি পদ্মজা আমার সঙ্গে ঢাকা না যায়।’
‘তুমি যেখাবে যাবা তোমার বউ তো সেখানেই যাবে। বউ রেখে যাবা কেন? আর রিদওয়ান তুমি আমার সঙ্গে আসো। তোমার সঙ্গে আমার বোঝাপড়া আছে।’
মজিদ হাওলাদার ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যান। আমির পদ্মজার হাতে ধরে বলল, ‘কসম, আর কখনো তোমাকে এমন পরিস্থিতিতে পড়তে দেব না।’
খুশিতে পদ্মজার চোখের তারায় অশ্রু জ্বলজ্বল করে উঠে। সে আমিরের এক হাত শক্ত করে ধরে বোঝায়, ‘আমি আপনাকে ভালোবাসি। বিশ্বাস করি।’
—————
সন্ধ্যার ঠিক আগমুহূর্ত। এমন সময় হাওলাদার বাড়ির রাতের রান্না করা হয়। মগা এক ব্যাগ মাছ দিয়ে গেছে। লতিফা মাছ কাটছে। লতিফা এই বাড়ির কাজের মেয়ে। সবাই ছোটো করে লুতু ডাকে। ফরিনা ভাত বসিয়েছেন। আর অনবরত বলে চলেছেন, ‘আমি এই বাড়ির বড়ো বান্দি। দাসী আমি। বাবুর বাপ দাসী পুষে রাখছে। দাসী পালে। সারাদিন কাম করি। অন্যরা হাওয়া লাগাইয়া ঘুরে। মরণ হয় না কেন আমার? মরণই আমার একমাত্র শান্তি।’
পদ্মজা গুনগুন করে গান গাচ্ছে আর রান্নাঘরের আশপাশে ঘুরছে। ফরিনার সব কথাই তার কানে আসছে। তার গায়ে লাগছে না। বরং হাসি পাচ্ছে। সে বহুবার রান্নাঘরে গিয়েছে কাজ করার জন্য। ফরিনা তাড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, কাজ করতে হবে না। আর এখন বলছেন, কেউ সাহায্য করে না! পদ্মজা পা টিপে টিপে রান্না ঘরে ঢুকে বলল, ‘আম্মা, আমি সাহায্য করি?’
‘এই ছেড়ি তুমি এত বেয়াদব কেরে? কতবার কইছি তোমার সাহায্য করতে হইব না।’
‘না…মানে আপনি বলছিলেন, কেউ সাহায্য করে না।’
‘তোমারে তো বলি নাই। তোমার গায়ে লাগে কেন?’
‘মেঝে ঝাড়ু দিয়ে দেই?’
‘তোমারে কইছি আমি? তুমি যাও এন থাইকা। যাও কইতাছি।’
অগত্যা পদ্মজা বেরিয়ে যায়। বাসায় লাবণ্য নেই, আমির নেই। কার কাছে যাবে? রানি আছে! রানির কথা মনে হতেই পদ্মজা রানির ঘরের দিকে এগোল। যাওয়ার পথে কানে সন্ধ্যার আজান ভেসে আসে। তাই আর সেদিকে এগোল না, ফিরল নিজের ঘরে। নামাজ আদায় করতে হবে।
প্রার্থনা সম্পন্ন করে সুরা ইয়াসিন পড়ল একবার। জানালা লাগাতে গিয়ে দেখতে পেল রানিকে, সেদিনের মতো জঙ্গলের ভেতর ঢুকছে। আর কিছুক্ষণ পরেই চারিদিক রাতের গাঢ় অন্ধকারে তলিয়ে যাবে। এমন সময় রানি আপা কী করতে ওখানে যাচ্ছে? এত সাহসই কী করে হয়? পদ্মজা হুড়মুড়িয়ে ঘর থেকে বের হয়। আজ সে এর শেষ দেখে ছাড়বে। লাবণ্য সবে মাত্র সদর ঘরে ঢুকেছে।
পদ্মজাকে তাড়াহুড়ো করে কোথাও যেতে দেখে বলল, ‘কী রে, কই যাস?’
পদ্মজা চমকে উঠল। বলল, ‘এই তো…এইখানেই। কোথায় ছিলি? আচ্ছা, পরে কথা বলব। আসি এখন।’
লাবণ্য ঠোঁট উলটে পদ্মজার যাওয়ার পানে তাকিয়ে থাকে। মনে মনে ধরে নেয়, পদ্মজা দুই তলা থেকে হয়তো দাভাইকে আসতে দেখেছে তাই এগিয়ে আনতে যাচ্ছে। সে নিজ ঘরের দিকে চলে গেল। পদ্মজা কখনো বাড়ির পেছনের দিকে যায়নি, এই প্রথম। বাড়ির ডান পাশে বিশাল পুকুর। কালো জল। কিন্তু বাড়ির সামনের পুকুরের জল স্বচ্ছ।
দুই মিনিট লাগে শাক-সবজির খেত পার হতে। বাড়ির পেছনে এরকম শাক-সবজির বাগান আছে সে জানত না। এরপর পৌঁছাল জঙ্গলের সামনে। সেখান থেকে অন্দরমহলের দিকে তাকাল। ওই তো তাদের ঘরের জানালা দেখা যাচ্ছে। আরেকটা জানালাও দেখা যাচ্ছে। পদ্মজা কপাল কুঁচকে খেয়াল করল, সেই জানালার গ্রিল ধরে কেউ তাকিয়ে আছে। পদ্মজা ঠাওর করার চেষ্টা করল এটা কার ঘর। মনে হতে বেশি সময় লাগল না—রূম্পা ভাবির! তবে কী তিনিই তাকিয়ে আছেন? পদ্মজা আবার তাকাল। রূম্পা জানালার পর্দা সরিয়ে হাত নাড়াল, মৃদু হেসে পালটা হাত নাড়াল পদ্মজাও। দূর থেকে রুম্পার মুখটা দেখে মনে হচ্ছে, সে কিছু বলতে চায় পদ্মজাকে। তার ভেতর লুকানো আছে কোনো এক রহস্যময় গল্প।
—————
‘ভাবি এইনে রাইতের বেলা কী করেন?’
ভূমিকম্পে ভূমি যেভাবে কেঁপে উঠে, পদ্মজা ঠিক সেভাবেই কেঁপে উঠল। তাকিয়ে দেখল মদনকে। সে জঙ্গলের ভেতর থেকে এসেছে। পদ্মজা আমতা আমতা করে বলল, ‘হাঁ…হাঁটতে এসেছিলাম।’
‘এই রাইতের বেলা?’
‘বিকেল থেকেই। এখন ফিরে যাচ্ছিলাম।’
‘চলেন এক সঙ্গে যাই। জায়গাডা ভালা না ভাবি। আপনি হইছেন সুন্দর
মানুষ। জিন, ভূতের আছর পড়ব।’
‘আপনি যান। আমি আসছি।’
‘আর কী করবেন এইহানে?’
পদ্মজা জঙ্গলের দিকে তাকাল। শিরশিরে অনুভূতি হলো একটা! সব জঙ্গল অযত্নে বেড়ে উঠলেও এই জঙ্গল যেন যত্নে বেড়ে ওঠা। সে অন্ধকারে খোঁজার চেষ্টা করল রানিকে। পেল না। এদিকে মদনের সঙ্গে না গেলে সে বাড়িতে যদি বলে দেয়! তাহলে অনেকের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। আর একটার পর একটা মিথ্যে বলতে হবে। পদ্মজা মনে মনে পরিকল্পনা করে, মদনের সঙ্গে বাড়ি অবধি গিয়ে আবার চলে আসবে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………