পবনপত্র - পর্ব ১২ - তাসনুভা আহম্মদ - ধারাবাহিক গল্প

পবনপত্র
          আজকে প্রতিযোগিতার তৃতীয় দিন। মৌমিতা ভেবে রেখেছিলো, তিনটা পিরিয়ড পরেই বাড়ি চলে যাবে। কিন্তু তামান্না তা হতে দিলো না। কলেজ ছুটি হওয়ার আগে সে কোথাও যাবে না, মৌমিতাকেও যেতে দেবে না। এখন যে সেই তামান্না কোথায় আছে, খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

ভিড়ের মধ্যে থেকে বেরিয়ে ফাঁকা জায়গায় অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলো মৌমিতা। কিছুক্ষণ পর বুঝতে পেরেছে, এই স্থানটা ফাঁকা কেন। রোদের তাপে এখানে দাঁড়িয়ে থাকা অসম্ভব। সে পুরাতন ভবনের বারান্দায় ওঠে, সিঁড়ির দিকে একটু এগিয়ে থেমে যায়। মনে একটু দ্বিধা কাজ করলো এক মুহূর্তের জন্য। সে ছোট একটা শ্বাস ফেলে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করে। লাইব্রেরিতে ঢুকেই প্রথমে দূর থেকে নিজের আসনটা পর্যবেক্ষণ করলো, ফাঁকাই আছে। মেয়েটা সামনে এগিয়ে যেতে শুরু করে। তবে তার এই স্বস্তিটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। ছেলেটা যেন কোথা থেকে উড়ে এসে জুটলো! বামহাতটা আলমারির উপর রেখে পথরোধ করে দাঁড়ালো, “কী খবর?”

তারপর আবার ঐ হাসি! মৌমিতা চোখ সরিয়ে ফেলে, উত্তর দেয় না।

“তবু ঐ সিটেই যাচ্ছিলেন, তাই না?”

মেয়েটা এবারও নিরুত্তর। বাদল কোনো কথা খুঁজে পেলো না, এরপর কী জিজ্ঞেস করা যায়? বইয়ের আলমারি থেকে হাত সরিয়ে তা পকেটে গুঁজলো সে, “যাই হোক, আমার নাম বাদল। আপনি... তো সেকেন্ড ইয়ারে? না?”

মেয়েটা ভ্রু কুঁচকে উপর নিচে মাথা নাড়ে। তবে তার চোখ এখনও আশেপাশে ঘুরছে। বাদল খেয়াল করলো, লাইব্রেরির মানুষগুলো তাদের দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে আছে। এ কারণেই হয়তো এভাবে অপ্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে মেয়েটা। বাদল তার সমস্ত মনোযোগ নিজের দিকে টানতে গলা খাঁকারি দেয়। কৃত্রিম বিরক্তি নিয়ে এক পা এগিয়ে আসে, “আপনি কি কথা বলতে পারেন না?”

“না!”

কর্কশ স্বরে জবাব দিয়ে মৌমিতা এক পা পিছিয়ে যায়, তারপর আর থামে না। ঘুরে দাঁড়িয়ে দ্রুতগতিতে হাঁটতে শুরু করে। বাদল দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে চেয়ে রইলো। তারপর মেয়েটার পিছু নিলো।
মৌমিতাও হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিয়েছে। সিঁড়ি থেকে নামার সময়েই সে তামান্নার দেখা পায়।

“তুই লাইব্রেরিতে ছিলি?”

তামান্নাকে দেখে বাদল আর এগোয় না, কিছুক্ষণের জন্য একটু বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। তারপর কী যেন ভেবে আবার দোতলায় ফিরে যায়। তামান্না সেদিকে তাকিয়েই বিড়বিড় করলো, “বাদল না?”

“হুম।”

মৌমিতার দিকে চোখ ফেরায় তামান্না, “তুই ওর নাম জানিস? ছেলেটা আমাদের সাথের না।”

“হ্যাঁ, জানি। লাইব্রেরিতে হঠাৎ সামনে এসে বললো, কী খবর? আমার নাম বাদল! আপনি কিসে পড়েন?”

“তাই নাকি! আমি এতোবার জিজ্ঞেস করলাম, কিছুতেই নাম বললো না। তোকে আবার যেচে নিজেই বললো?”

মৌমিতা হতাশ ভঙ্গিতে বলে, “বাদ দে। আমি বাসায় গেলাম।”

“এতো তাড়াতাড়ি যাবি? আর কিছুক্ষণ থাক।”

“না, আমি থাকতে পারবো না। মাথা ব্যথা করছে।”

“ও হ্যাঁ। তোকে বলা হয়নি। আমি একটা দারুণ বই পেয়েছি, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের। তুই যদি চাস, দিতে পারি।”

মৌমিতা হাসলো, “বইয়ের ব্যাপারে কখনো 'না' করেছি আমি?”

“তাহলে আজকে আমাদের বাড়িতে চল। বইটা রেখে এসেছি।”

“কালকে দিলেও হবে।”

“কাল আমি কলেজে আসবো না। তুই চল তো। সেই তিন বছর ধরে বলছিস যাবি। এখন পর্যন্ত একদিনও আসিসনি আমাদের বাসায়।”

“আজকে থাক। আরেকদিন—”

তামান্না মৌমিতার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলো, “এখন না গেলে আর কখনোই যাওয়া হবে না। পরীক্ষা কাছে আসছে। তারপর কে কোথায় চলে যাবো...”

মৌমিতা আর কিছু বললো না। কথা বলার চাইতে কিছুক্ষণ এসব অত্যাচার সহ্য করা সহজ। যদিও নতুন কোনো জায়গায় যাওয়ার কথা ভাবতেই তার জীবনীশক্তি অর্ধেক কমে এসেছে!

তামান্নাদের বাড়িটা চারতলা, ওরা থাকে তিনতলায়। নিচে গাড়ি রাখার জন্য বিশাল একটা জায়গা বরাদ্দ। বাইরের দিকে ফুলের বাগান।
দরজার সামনে গিয়ে মৌমিতা সংকুচিত হয়ে দাঁড়ালো। তামান্নার মা আয়েশা দরজা খুললেন। মিষ্টি হেসে ভেতরে আসার আহ্বান জানালেন। ভেতরটাও বেশ সুন্দর, সাজানো-গোছানো। তামান্না পরিবারের একমাত্র সন্তান। তার ঘরটা সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখা, পড়ার টেবিলের পাশে একটা বড় বুকশেলফ। পরিবারের সদস্যগুলো নিশ্চয়ই খুব শৌখিন।
মৌমিতা বইয়ের তাকে চোখ বুলাতে লাগলো, বেশিরভাগই নতুন বই। আয়েশা হাসিমুখে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছেন, “তোমার নাম মৌমিতা, না? তামান্না তো অনেক গল্প করে তোমাকে নিয়ে।”

মেয়েটা অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে হাসে। তামান্না আলমারি থেকে পোশাক বের করে তার উদ্দেশ্যে বললো, “মৌ তুই দ্যাখ, কোন কোন বই নিবি। আমি একটু কাপড় বদলে আসছি।”

মৌমিতা মাথা কাত করে। মেয়ে অন্য ঘরে যেতেই আয়েশা আবার তার দিকে তাকালেন, “তোমার সাথে কি আগেও দেখা হয়েছিলো? খুব চেনা চেনা লাগছে।”

মেয়েটা কিছু মনে করার চেষ্টা করে, “হয়তো, দেখা হয়েছিলো।”

“দাঁড়িয়ে আছো কেন? বসো। তোমারই বাসা মনে করো। আমি দেখি, কী দেয়া যায়... তুমি কি চা খাও?”

“না না, আমি কিছু খাবো না, খেয়েই এসেছি—”

“সেটা তো হবে না, প্রথমবার এসেছো। বসো।”

তামান্নার মা ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে একটা ছোট টেবিল এনে বিছানার সামনে রাখলেন। তখনই মৌমিতা তার মুখটা ভালোভাবে খেয়াল করলো। ভদ্রমহিলার কপালে আঘাতের চিহ্ন। হয়তো কোথাও থেকে পড়ে গিয়েছিলেন। তিনি চলে যাওয়ার পর মৌমিতা ঘরটা আরও ভালো করে দেখতে লাগলো। টেবিলের উপরে একটা কাচের বোতল। বোতলের তলায় পাথর, আর উপরে স্বচ্ছ পানিতে একটা ছোট্ট গাছ।
তামান্না ঘরে ঢোকে, “আজকে দুপুরে এখানেই খেয়ে যা।”

মৌমিতা মাথা নাড়ে, “উঁহু! বাড়িতে তো কিছুই জানিয়ে আসিনি।”

তামান্না বুকশেলফের সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসলো, নিচের তাকে কিছু একটা খুঁজতে খুঁজতে বললো, “তোকে আরেকটা জিনিস দেখাই। আমার চাচা একটা নোটবুক এনেছিলেন জাপান থেকে...”

দরজার দিকে তাকালো মৌমিতা। আয়েশা বড় একটা ট্রে-তে করে খাবার আনছেন। সেটা তিনি সামনের টেবিলে রাখলেন, “তোমার বাড়িতে জানলে দুপুরে এখানেই খেতে বলতাম।”

মৌমিতা কোনো কথা বললো না। ভদ্রমহিলা আবার বেরিয়ে গেলেন। তিনি যেসব খাবার রেখে গেছেন, তা খেতে গেলে মৌমিতা আজ দুপুরে কিছুই খেতে পারবে না। সে ঘড়ির দিকে তাকায়। কলেজ ছুটি হওয়ার সময় হয়ে গেছে। এখন বের হওয়া উচিত। তামান্নার মা এক কাপ চা হাতে ঘরে ঢুকলেন, “আরেকদিন দাওয়াত থাকলো আমাদের বাসায়। কেমন? তোমার বাবার নাম কী?”

“মারুফ খন্দকার—”

আয়েশার ডান পা অসতর্কতাবশত টেবিলের সাথে হোঁচট খায়, হাত থেকে চায়ের কাপটা পড়ে গেলো। মৌমিতা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে রইলো, যখনই সে বিছানা থেকে নামতে উদ্যত হয়, আয়েশা হাত তুলে থামতে বললেন, “ওখানেই থাকো। পায়ে কাচ ঢুকে যাবে।”

তামান্না ছুটে এসে ভাঙা কাচের টুকরোগুলো হাতে তুলে নিতে থাকে। বাকি দুইজন মানুষই সেদিকে তাকিয়ে থাকে, উভয়েই হতবাক।

—————

ছুটির ঘণ্টা বেজে গেছে। বাদল তার ক্লাসের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। রাশেদ নেই। সে হয়তো আগেই চলে গেছে। বাকিরা এখন ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে আসছে। শিক্ষার্থীদের সেই স্রোতের দিকে বাদল কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তারপর ঘুরে মাঠে চলে আসে। হোস্টেলে যাওয়ার ইচ্ছে করছে না। পেছনের গলিতে যাওয়া যায়। আজ সকালে কুকুরগুলোকে খাওয়ানো হয়নি। বাদল গাছতলার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। পকেটে হাত ঢুকিয়ে বুঝতে পারে, টাকা নেই। হাঁটা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে পড়লো সে। ব্যাগের ভেতর টাকা খুঁজতে শুরু করলো।

“অ্যাই... মৌমিতা?”

ছেলেটা বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো পেছনে তাকায়। এই জনসমুদ্রে কে কাকে ডাকলো—বোঝার উপায় নেই। সে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলো, তার চঞ্চল চোখজোড়া ব্যাকুলভাবে শব্দের উৎস খুঁজতে লাগলো।
একটা মেয়ে দৌড়ে গিয়ে প্রশাসনিক ভবনের সামনে দাঁড়ায়, “মৌমিতা, নে—” আরেকটা মেয়ের হাতে একটা খাতা এগিয়ে দেয়। তাকে পেছন থেকে দেখলো বাদল। তারপর ছুটতে শুরু করলো জনস্রোতের বিপরীতে। মেয়েটা নিজের ব্যাগে খাতাটা ঢুকিয়ে রাখছে। পরনে সালোয়ার-কামিজ, ওড়নাটা এক কাঁধে ঝুলিয়ে রেখেছে, চুল ঘাড়ের সামান্য নিচ অবধি লম্বা। ডায়েরির কথাগুলো আর কল্পনার সাথে খুব একটা মিল পাওয়া গেলো না। সে যাই হোক! বাদল একটা শুকনো ঢোক গিলে তাড়াহুড়ো করে ডেকে উঠলো, “আপুউউ?”

কোনোভাবে মেয়েটা বুঝে গেলো, তাকেই ডাকা হয়েছে। সে পেছনে ঘুরলো, চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ। বাদল থামে, একটু নিরাপদ দূরত্বে। হাঁপাতে শুরু করে এই সামান্যতেই। কাঁপা স্বরে প্রশ্ন করে, “আ... আপনার নাম মৌমিতা?”

মেয়েটা ভ্রু কুঁচকায়, রুক্ষ স্বরে বলে, “আপনি কে? আমার নাম আপনাকে বলতে যাবো কেন?”

বাদল হাত নেড়ে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করলো, “ভুল বুঝবেন না। আমার—” সে দ্রুত ব্যাগের ভেতর উঁকি দিয়ে দেখে, ডায়েরিটা আনতে ভুলে গেছে!

“আপনি কি আমাকে ফলো করছেন? আমার নাম জানলেন কীভাবে?”

“আমি, ঐ—”

“আমি কিছু শুনতে চাই না। এইভাবে মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে একটা মেয়েকে বিরক্ত করার মানেটা কী?”

বাদল কয়েক কদম এগিয়ে আসে, “আপু, আমি... শুধু একটা কথা বলি? আমার কাছে একটা জিনিস আছে আপনার, আমি ওটাই—”

মেয়েটা চেঁচিয়ে উঠলো, “কথা কি কানে যায় না?”

আশেপাশের মানুষগুলো সবাই কৌতূহলী চোখে তাদের দিকে তাকাতে লাগলো। মেয়েটার চোখ থেকে যেন আগুন ঝরছে। বাদলের হৃদস্পন্দন বেড়ে গেছে কয়েকগুণ, কারণটা অদ্ভুত। হঠাৎ করেই খুব ভীতি কাজ করছে তার মনে। ভিড়ের মধ্যে থেকেই একজনের গলা ভেসে এলো, “কী হয়েছে মৌমিতা?”

মৌমিতা নামের মেয়েটা আঙুল তুলে বাদলকে দেখায়, “এই ছেলেটা আমার সাথে বেয়াদবি করছে...” শীতল চোখে তাকিয়ে ঝাঁঝালো কণ্ঠে অভিযোগ তোলে সে, “গায়ে হাত দেয়ার চেষ্টা করেছে!”

বাদল নির্বাক হয়ে মাথা আরও নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। দুর্নাম? তার অভ্যেস আছে। কিন্তু সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার নিক্ষেপ করা তীরটাকে সামাল দেওয়ার অবস্থায় নেই সে। কেন এমন মিথ্যে অভিযোগ করলো মেয়েটা? এই কি সেই অসামাজিক মৌমিতা? যার বাইরে শান্ত জলধারা, ভেতরে উত্তাল ঢেউ? এই মেয়েটাই কি সেই মৌমিতা খন্দকার, যার দৃষ্টিতে পৃথিবী দেখতে গিয়ে বাদল নিজেকে ভাঙতে চেয়েছে, নতুন করে গড়তে চেয়েছে? এই মানুষটাকেই একবার দেখার জন্যে সে অস্থির হয়ে উঠেছিলো?

ভিড়ের মধ্যে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, তবে ছেলেটার কানে আর কিছুই ঢুকছে না। অপমান হজম করার অভ্যাস থাকলেও আজ সবটা বুকের ভেতর বিঁধে যাচ্ছে। কথা বলতে গিয়েও বলা যাচ্ছে না কিছুই, মাথাটাও কোনোমতে উঁচু করা সম্ভব হচ্ছে না।
হুট করেই একটা দৃঢ় হাত তার কব্জি চেপে ধরে টেনে নিয়ে যায়। বাদল পড়ে যেতে গিয়ে নিজেকে সামলে নেয়। আমজাদ হাত ছাড়ে না, হাঁটতে হাঁটতেই পেছনে ঘোরে, “আবার ঝামেলা করেছিস?”

বাদল কথা বললো না।

রাশেদ গোসল সেরে এসে ঘরের এক কোণে কয়েল জ্বালিয়েছে। মশা এতো বেড়ে গেছে! দিনের বেলাতেও স্থির হয়ে থাকা যায় না কোথাও। সে জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। কলেজ মাঠটা এখান থেকে একটু একটু দেখা যায়।
আমজাদ ঠাস করে দরজাটা খুলে ভেতরে ঢোকে। রাশেদ সেই বিকট আওয়াজ শুনে পেছনে তাকায়। বাদলও ঘরে আসে, শ্রান্ত ভঙ্গিতে, মেঝের দিকে তার দৃষ্টি নিবদ্ধ। ব্যাগটা আস্তে আস্তে খুলে চেয়ারের উপর রাখে। তারপর কলেজের পোশাকেই বিছানায় শুয়ে পড়ে।

রাশেদ একটু অবাক হয়, “বাদল?” আমজাদের দিকে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, “কী হয়েছে?”

আমজাদ তার হাত ধরে টেনে দূরে নিয়ে যায়, নিচু স্বরে বলে, “আমিও জানি না। হলে আসছিলাম। দেখলাম, ঐদিকে অনেক ভিড়, অফিসের ঐদিকে। গেলাম, দেখি বাদলও দাঁড়ায় আছে। সামনে একটা মেয়ে কথা বলছিলো—”

আমজাদ চুপ করলো। রাশেদ সরু চোখে তাকায়, “তারপর? কী বলছিলো?”

আরও ক্ষীণ কণ্ঠে বলে আমজাদ, “বাদল নাকি তার গায়ে হাত দিয়েছে।”

রাশেদের ভ্রুজোড়া বিদ্রূপে আরও কুঁচকে যায়, সে কিছু একটা বলতে গিয়েও বলে না। বাদল এমন করতে পারে না, তা সে জানে। তবে বাদলের আচরণ খুব অদ্ভুত হয়ে যাচ্ছে—এটা অস্বীকার করারও উপায় নেই। মেজাজ ঠিক না থাকলে সে যেকোনো কিছু করে ফেলতে পারে। আবেগ দ্বারা চালিত ব্যক্তির কাছে এমনটাই আশা করা যায়। ছেলেটা যদি সত্যিই এমন কিছু করে থাকে, তাহলে তাকে আর হালকাভাবে নেয়া উচিত হবে না।
রাশেদ বাদলের দিকে এগিয়ে গেলো। ছেলেটা হয়তো ঘুমানোর ভান করছে। চোখের পাতাদুটো কাঁপছে অনবরত। ভ্রুযুগল বাঁকা হয়ে আছে, যেন কোনো গোপন বিষাদকে গোপনেই রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চলছে। রাশেদ নিঃশব্দে সরে আসে।

দুপুর গড়িয়েছে। বাদল কিছু খায়নি। আমজাদ বা রাশেদ, কেউই তাকে জাগায়নি। চোখ খুলে জানালার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো বাদল। তারপর তার চোখ যায় টেবিলের একপাশে যত্ন করে তুলে রাখা নীল ডায়েরিটাতে। সে চোখ সরিয়ে নেয় বিতৃষ্ণায়, হাতে ভর দিয়ে উঠে বসে। ঘরের ভেতর একবার চোখ বুলিয়ে নেয়। আমজাদ ভাই ঘরে নেই। রাশেদ চেয়ারে বসে কিছু একটা লিখছে। বাদলকে উঠতে দেখে সে স্বাভাবিকভাবে বলে, “টিউশন ক্লাসে যাবি আজকে?”

বাদল চোখ কচলায়, তার হাত মুখ এখনও ধূলোময়। সে ক্লান্ত স্বরে বলে, “কয়টা বাজে?”

“পৌনে চারটা।”

রাশেদ উঠে এসে বাদলের পাশে বসলো। কিছুক্ষণ নীরবতা পালনের পর সে বলে উঠলো, “তোর ঐ ডায়েরির কী অবস্থা? মৌমিতার খোঁজ পেয়েছিস?”

“বালের ডায়েরি, বালের মৌমিতা!”

রাশেদ নির্বিকার হয়ে বলে, “মাঝখান থেকে 'দ' বাদ গেলো কেন?”

“মানে?”

“বাদলের মৌমিতা থেকে বালের মৌমিতা? গিরগিটিও এতো দ্রুত রং বদলায় না!”

বাদল রাশেদের দিকে তাকালো। মুখখানা অভিব্যক্তিহীন। রাশেদ দমে যায়, খাট থেকে উঠে আবার টেবিলের দিকে পা বাড়ায়। বাদলও উঠে দাঁড়ায়, ব্যাগ কাঁধে নেয়। রাশেদ বিস্ময় প্রকাশ করে বলে, “ক্লাসের এখনও দেরি আছে তো। কাপড় বদলে নে, হাত মুখ ধো।”

বাদল কোনো কথা শুনলো না।

—————

মাথার উপরে ফ্যান ঘুরছে সর্বোচ্চ গতিতে। মৌমিতা ভেজা চুলগুলো ফ্যানের নিচে মেলে দিয়ে খাটের এক কোণে বসে আছে। আজকেও হয়তো সে দেরিতে পৌঁছাবে। মার্জিয়া বই হাতে বিছানায় শুয়ে পা দোলাচ্ছে। মৌমিতা বললো, “ঐ বইটা নিলি কেন? বললাম যে আমার পড়া শেষ হয়নি এখনও।”

“ঐ পৃষ্ঠা ভাঁজ করে রেখেছি। তোমার না ক্লাস আছে?”

“হুম।”

“এতো দেরিতে গোসল করলা কেন? ভেজা চুল নিয়েই যাবা? সত্যি সত্যি জ্বর আসবে।”

“যাওয়ার ইচ্ছা করছে না আজকে।”

“তাহলে যেও না। একদিন না গেলে কিছু হবে না। তুমি তো মেধাবী ছাত্রী!”

“তেল দেওয়া বন্ধ কর।”

“তোমাকে তেল দিয়ে আমার কী লাভ? তুমি কি পানির মোটর?”

মৌমিতা কথা বললো না, চুল আঁচড়াতে শুরু করলো। মার্জিয়া কিছুটা সরে এসে আবদারের সুরে বললো, “আজকে ক্লাসে যেও না তো। বাদ দাও।”

জানালার বাইরে তাকায় মৌমিতা। বাইরের আবহাওয়া মন্দ না। স্নিগ্ধ, রৌদ্রোজ্জ্বল একটা দিন। পাখিরা ডাকাডাকি করছে। বাহিরটা শান্ত। মেয়েটা তবু ভেতরের ঝড় সম্বন্ধে উদাসীন নয়। বাড়িতে বসে বিশ্রাম নিতে খুব ইচ্ছে করছে তার। তবু এখন সে ক্লাসে যাবে, ঝড়টার মুখোমুখি হবে আবার। মৌমিতা আধভেজা চুলের ওপরেই ওড়না জড়িয়ে নেয়।

রিকশা পেতে দেরি হলো না। মেয়েটা একটু তাড়াহুড়ো করলো, রিকশায় উঠে রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলো। অসংখ্য যানবাহন আর অপরিচিত মানুষের ভিড়ে চেনা মুখটা আজ দেখা দিলো না। আসলেই হয়তো মৌমিতা দেরি করে ফেলেছে। কিংবা যা আশা করেছিলো, তা হয়নি। না হওয়াটাই স্বাভাবিক ঘটনা।
রবিউল মাস্টারের বাড়ির সামনে রিকশা থামে। মৌমিতা ধীরপায়ে ক্লাসে ঢোকে, নিজের আসনের সামনে এসে দাঁড়ায়। বেঞ্চে পানি।

মৌমিতার ক্যালকুলাস অপছন্দ। স্যার আজকে সেটাই পড়াচ্ছেন। বোর্ডের দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগছে না বলেই হয়তো দৃষ্টি বারবার জানালার বাইরে যাচ্ছে! স্যার অঙ্ক কষতে দিয়েছেন। মেয়েটার বামহাতে ধরে থাকা কলম কাগজের উপর খুব ধীরে ধীরে চলতে থাকে। একসময় তার মনে হয়, আজকে না এলেই ভালো হতো। সময় কাটছে খুবই মন্থর গতিতে। কিন্তু সময় যতো পেরিয়ে যাচ্ছে, নিজের উপর মৌমিতার বিরক্তিও বাড়ছে। সে যে ভুল দিকে পা বাড়িয়েছে, তা সে নিজেও জানে ভালোভাবে। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ এবং গুরুতর ব্যাপার— যাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে, তার সম্পর্কে শক্তপোক্ত কোনো ধারণা নেই মেয়েটার। মৌমিতা এটাও জানে না, ছেলেটা কী চায়। এভাবে পেছনে পড়ে আছে কেন—এগুলোর উত্তর পাওয়া যায়নি। তবু আজ নতুন একটা তথ্য পাওয়া গেছে, ওর নাম বাদল। সায়েন্সে পড়ে অবশ্যই, যেহেতু উচ্চতর গণিতের টিউশন ক্লাসে আসে।

মৌমিতা জানালার বাইরে তাকায়। ছেলেদের জটলা দেখেই সে পেছনে সরে, দেয়ালের আড়ালে চলে আসে। বাদলকে সে স্পষ্টভাবে দেখেনি, তবুও কিসের আশঙ্কায় যেন নিজেকে আড়াল করে।
সোজা হয়ে বসে লেখা কঠিন, মৌমিতা সাত পাঁচ না ভেবে জানালার একটা কপাট লাগিয়ে দিলো! এতোক্ষণ সে যেটার জন্য অপেক্ষা করছিলো, সেটাকে গ্রহণ করতে হঠাৎ দ্বিধা কাজ করছে। সে আবার খাতার উপর রাখে কলমটা। এদিকে অনেকেই খাতা জমা দিতে শুরু করেছে। মেয়েটার কাছে সবকিছু খুব অস্বস্তিকর ঠেকলো হঠাৎ।

বাদল মনোযোগ সহকারে মাটির উপর জুতোর ডগা দিয়ে গুঁতাগুঁতি করছে, এবড়োথেবড়ো নকশা আঁকছে। কোলাহল শুনে সে মাথা তোলে। আগের ব্যাচের ছুটি হয়েছে। বাদল তাদের ভিড়ে একজনকে খুঁজতে শুরু করে। কাঙ্ক্ষিত মানুষটা সবার শেষে বের হলো। বাদলের দিকে ভুল করেও তাকালো না। কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে গিয়ে দাঁড়ালো সে।
রাস্তা পার হয়ে ডানে গেলে স্যারের ক্লাসরুম। বামে ঐ কৃষ্ণচূড়া গাছ। বাকিদের সাথে বাদল রাস্তা পার হয়। অন্যরা ডানদিকে গেলেও, সে হাঁটে বামদিকে। মেয়েটা যদিও রিকশা খুঁজতে ব্যস্ত, তবু তার দিকে ধেয়ে আসা ঝড়টাকে অনুভব করতে তার অসুবিধা হয় না। সে চোয়াল শক্ত করে রাস্তার দিকেই তাকিয়ে থাকে। বাদল যখন তার খুব কাছাকাছি, তখন রাশেদ ডেকে উঠলো, “বাদল!”

আতঙ্ক যেন উস্কে যায় এবার, মৌমিতা বিস্ফারিত দৃষ্টিতে বাদলের দিকে তাকায়। ব্যস, ছেলেটা আর সামনে এগোয় না, খুব সহজ ভঙ্গিতে ঘুরে আবার টিউশন ক্লাসের দিকে পা বাড়ায়।
রাশেদ হয়তো মনে করে, সে ডাকাতেই বাদল ওদিক থেকে ফিরে এসেছে। তার ধারণা ভুল।
ওদিকে আরেকজন মানুষ বিনা কারণে বারবার উপেক্ষা করে চলেছে তাকে! আর বাদল সেই উপেক্ষার দেয়াল না ভেঙে ক্ষান্ত হয় না।
কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে মৌমিতা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তার কাছে এখন যেটাকে কেবল একটি শুষ্ক ঝরা পাতা মনে হচ্ছে, তা যে কখনো গোটা বনভূমিতে রূপ নিতে পারে, মেয়েটার এ ব্যাপারে কোনো ধারণাই নেই। জীবনের পরবর্তী ভয়ানক সব মোড় নিয়ে ভাবার ফুরসত নেই তার। সে শুধু মুখ ফেরালো, ভ্রু কুঁচকে বিড়বিড় করলো, “অসভ্য!”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp