পার্টির ঘটনাটা কোনোভাবে আমান সাহেব ধামাচাপা দিতে পেরেছেন। কিন্তু ছেলের এমন আচরণে তার মাথা যেন নত হয়ে গেছে। সেদিনের পর দু’দিন কেটে গেছে, তবুও অভ্র এখনো বাসায় ফেরেনি। বাড়ির সবাই এখন বেশ চিন্তিত। আসান সাহেবও একটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ের জন্য ঢাকার বাইরে আছেন।
আফসানা বেগম ছেলের চিন্তায় প্রায় ভেঙে পরছেন। মুখটা ফ্যাকাশে, চোখে ঘুম নেই।
নিচে সবাই যখন অভ্রকে নিয়ে চিন্তায় ডুবে আছে, রাহা চুপচাপ সবার দিকে একবার তাকিয়ে শিফার ঘরে চলে যায়।
দরজায় দাঁড়িয়ে সে ধীরে ডাকে—
— “আপু আছো?”
শিফা মাথা তুলে বলে,
— “হ্যাঁ, আয়। বস।”
— “অ্যাসাইনমেন্ট করছো?”
— “হুম, কাল জমা দিতে হবে।”
শিফা খেয়াল করে রাহার মুখটা ভারী, অস্থির।
— “কি রে, মুখটা এমন কেন? বাংলার পেঁচার মতো করে রেখেছিস কেন?”
— “না… কিছু না তো।”
শিফা উঠে এসে রাহার হাত ধরে টেনে বিছানায় বসায়।
— “বোন আমার, বল তো আপুকে কী হয়েছে?”
রাহা একটু চুপ করে থেকে নিচের কথা বলে—
— “নিচে সবাই… অভ্র ভাইয়ার জন্য অনেক চিন্তায় আছে।”
শিফা দীর্ঘশ্বাস ফেলে,
— “চিন্তা তো আমারও হচ্ছে। দুই দিন হয়ে গেল… এখনো বাসায় ফিরেনি।”
শিফা রাহার মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত গলায় বলে,
— “তুই চিন্তা করিস না। ভাইয়া ঠিকই ফিরে আসবে। ও ছোট মানুষ না।”
কথাটা বললেও শিফার ভেতরেও অস্থিরতা জমে থাকে।
রাহা আবার বলে,
— “আপু, তোমার তো কাল অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে হবে। আমারও পরীক্ষা নেই… আমাকে তোমার সাথে ভার্সিটিতে নিয়ে যেও প্লিজ।”
শিফা একটু হেসে বলে,
— “আচ্ছা, ১০টায় রেডি থাকবি।”
রাহা খুশিতে উঠে শিফাকে জড়িয়ে গালে একটা চুমু দিয়ে বলে,
— “তুমি আমার বেস্ট আপু!”আচ্ছা, এবার যাও, কাজ শেষ করো। আমি যাই”।
—————
নিচের ঘরে তখন কথার তীব্রতা বাড়ছে।
— “তোমার মনে হয় না তোমার ছেলে একটু বেশি করছে?”
— “আপনার কি মনে হয় না? আপনিও একসময় বেশি করেছিলেন। যার জন্য আমার ছেলে আজ এই অবস্থায়।”
আফসানা বেগম হঠাৎ চিৎকার করে ওঠেন,
— “তুমি এটা বলতে পারলে?”
— “হ্যাঁ, পারলাম। সেদিন আপনার একটা সিদ্ধান্তের কারণে ৯টা বছর আমার ছেলে আমার থেকে দূরে ছিল।”
ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
আমান খান বলেন,
— “শুধু কি তোমার ছেলে? আমার ছেলে না?”
এই কথায় তিনি থেমে যান। চোখে পানি জমে আসে। আমি জানি আমি কঠোর হয়েছিলাম। কিন্তু আমি তখন তার ভবিষ্যতের কথাই ভেবেছিলাম… বাধ্য হয়েই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আজ তুমিও আমাকে দোষী ভাবছো?”
— “আমি আপনাকে দোষ দিচ্ছি না।আমি শুধু ভেঙে পড়েছি। নিজের ছেলেটাকে এমন অবস্থায় দেখলে কে ঠিক থাকে বলো?”
আমান খান পরিস্থিতিটা বুঝে কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন। হয়তো ছেলের শোকে আফসানা বেগম নিজের অজান্তেই কঠিন কথা বলে ফেলেছেন। না হলে এত বছরের সম্পর্কের ভেতরে এমন তিক্ততা জমে ওঠার কথা নয়।
তিনি আর কথা না বাড়িয়ে ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
ঘরের ভেতরটা আবারও ভারী হয়ে গেল।
আফসানা বেগম একা দাঁড়িয়ে রইলেন, কিছুক্ষণ চুপচাপ। তারপর হঠাৎ করেই চোখের পানি আর আটকাতে পারলেন না কান্না ভেঙে পড়লেন।
—————
শিফা ও রাহা তৈরি হয়ে বসার রুমে আসতেই—
আফসানা বেগম
“মাশাআল্লাহ! আমার মেয়ে গুলোকে একদম পরির মতো লাগছে দেখতে।”
রাহা একটা আকাশী রং এর চুড়িদার পড়েছে, সাথে সাদা চুড়ি, পাজামা ও সাদা উড়না।
আর শিফা পড়েছে লাল চুড়িদার, সেটার সাথেও সাদা পাজামা ও উড়না।
“আচ্ছা মা, যাচ্ছি।”
“সাবধানে যাবি, আর রাহা কে দেখে রাখবি।”
রাহা মুখ বাঁকিয়ে বলল—
“আরে বড় আম্মু! আমি কি এখনও ছোট আছি নাকি, যে দেখে দেখে রাখতে হবে?”
এদিকে আফসানা বেগম, হাসির সহিত বলেন,
“মায়েদের কাছে কি সন্তানেরা কখনও বড় হয় রে মা”।
যাওয়ার সময় দেখলো, ইভান ও বের হচ্ছে—
সে ঢাকা মেডিকেল যাবে, প্রফেসরের সাথে দেখা করতে। কুমিল্লা থেকে তার প্রফেসর বলেছে, তার সাথে দেখা করতে। উনি ইভানকে ৫ দিনের একটা ট্রেনিং দিবেন।
ইভান খুবই ব্রিলিয়ান্ট। মেডিকেল সেক্টরে সে টপ অফ দি স্টুডেন্ট।
তাকে তার ভার্সিটির সবাই একটু আলাদা চোখেই ট্রিট করে।
ইভানও তাদের দেখলো, তারাও বের হচ্ছে।
রাহা বলল— “আরে ভাইয়া!”
ইভান তাদের দিকে চোখ ফেলতেই তার চোখে মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ল।
এক ধ্যানে তাকিয়ে থাকতে দেখে রাহা বলল—
“এই ইভান ভাইয়া, কি হয়েছে? এভাবে তাকিয়ে আছো কেন..!”
ইভান থতমত খেয়ে মুখ ঘুরিয়ে—
“মাশাআল্লাহ…” বলে আবার তাকিয়ে বলল, “কই..? কিছু না তো।”
“হ্যাঁ, বলো কিছু বলবে?”
“তুমি ও তো ভার্সিটি যাচ্ছ… আমরাও সেখানেই যাব। চলো একসাথে যাই।”
রান্নাঘর থেকে সাথী বেগম বললেন—
“হ্যাঁ ইভান, একসাথে যা। আর সাবধানে যাবি।”
তারা তিনজন একসাথে বেরিয়ে পড়ল।
বাড়ির গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছে।
ইভান ড্রাইভারের পাশে সিটে, আর শিফা ও রাহা পিছনের সিটে।
গাড়ি চলাকালীন সামনের মিররে ইভান বারবার তাকাচ্ছে।
হঠাৎ শিফাও তাকালে—চোখাচোখি হতেই দুজনই চোখ নামিয়ে মুখ ঘুরিয়ে ফেলল।
ইভান মনে মনে বলল—
“ধ্যাত! এগুলো কি হচ্ছে আমার ধারা… আমি তো এমন টাইপের না!”
ভার্সিটিতে সে এ পর্যন্ত অনেক প্রপোজাল পেয়েছে, কিন্তু সবগুলোই রিজেক্ট করেছে।
সে এসব জিনিসে জড়াতে চায় না। তার লক্ষ্য—সে ডাক্তার হবে। ডিগ্রি শেষ হলেই মাস্টার্সের জন্য বাইরে চলে যাবে।
এসব ভাবতে ভাবতেই গাড়ি এসে পৌঁছালো ঢাকা মেডিকেলের সামনে।
তারা তিনজন নামতেই—
রাহা সামনে একটা ফুচকার স্টল দেখে চিৎকার করে উঠল—
“মনে হচ্ছে! কতজনম খায় না!”
শিফা বলল—
“আস্তে বল পাগলি… খাওয়াবো তো। আগে কাজটা সেরে আসি।”
রাহা বায়না ধরলো—
“না! আগে খাবো, তারপর যাবো!”
অগত্যা শিফা হার মেনে নিল। অসহায় চোখে ইভানের দিকে তাকালো।
ইভান আগে থেকেই ভ্রু কুঁচকে দেখছিল তাদের।
হঠাৎ বলল—
“এসব আনহাইজেনিক খাবার না খাওয়াই ভালো।”
রাহা বলল—
“এহ্! আসছে আমার এখানেও ডাক্তারগিরি করতে!”
শিফা বলল—
“থাক না… অল্প খেলে কিছু হবে না। আপনার সময় না হলে যেতে পারেন।”
ইভান বলল—
“সমস্যা নেই। তোমরা এখানে দাঁড়াও, আমি নিয়ে আসছি। পরে পেট ব্যথা করলে বুঝবে ঠেলা।"
ইভান এসবে অভ্যস্ত নয়—সে কঠিন হাইজিন মেইনটেইন করে। কিন্তু ওদের ফিরাতে পারলো না।
ভিড় ঠেলে দুই প্লেট ফুচকা নিয়ে এসে ওদের সামনে দিতেই—
রাহা মুহূর্তেই ঝাঁপিয়ে পড়ে খেতে লাগলো।
আর শিফা ধীরে ধীরে খাচ্ছে।
তাদের খাওয়া দেখে ইভানের ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ফুটে উঠল।
খাওয়া শেষ হতেই রাহা প্লেট দিতে গেলে—
ইভান বলল—
“কোনো দরকার নেই। এই ভিড় ঠেলে যাওয়ার… আমি প্লেটসহ কিনে এনেছি।”
রাহা ও শিফা একে অপরের দিকে বিস্ময়ে তাকালো।
মনে মনে হয়তো একটাই কথা—
“এ আবার কেমন ছেলে! ভিড়ে যেতে হবে বলে
প্লেটসহই কিনে এনেছে!”
খাওয়া শেষে তারা মেডিকেলের ভিতরে চলে গেলো।
তারা দোতলায় যাবে, আর ইভান তিনতলায়।
সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময়—
রাহা ও শিফা সামনে, ইভান পিছনে।
হঠাৎ করে শিফার উড়না পায়ে বেঁধে যায়।
যেই না আরেক সিঁড়িতে পা দিবে—অমনি পিছনে হেলে পড়ে… আর ফট করে ইভান ধরে ফেলে।
রাহা চিৎকার করে উঠল— “আপু!”
শিফা ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলেছে।
কয়েক মুহূর্ত পর বুঝতে পারলো—সে পড়েনি… হেলে আছে।
চোখ খুলেই এই অবস্থায় নিজেকে দেখে।
ইভান দুই হাত দিয়ে সামনের দিকে ঠেলে দেয়, রাহা হাত ধরে টেনে নেয়—শিফা সোজা হয়ে দাঁড়ায়।
ভয়ে হাঁপাতে থাকে।
ইভান তার ব্যাগ থেকে পানির বোতল এগিয়ে দিলে
সে না বোঝায়।
রাহা বলল—
“এই আপু, ভয় পেয়ো না… ভাইয়া ধরে ফেলছিলো। অনেক অনেক ধন্যবাদ ভাইয়া!”
ইভান বলল—
“ইটস ওকে…”
তারপর শিফার দিকে তাকিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে যেতে বলল—
“কাজ শেষ হলে সাবধানে বাসায় চলে যেও।”
রাহা ভদ্র মেয়ের মতো মাথা নাড়ল।
আর শিফা… এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ইভানের যাওয়ার দিকে।
রাহাকে বসিয়ে শিফা গেলো এসাইনমেন্ট জমা দিতে।
রাহা বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল।
একটু দেরি হচ্ছে ভেবে করিডোরে হাঁটছিল—
ঠিক তখনই পিছন থেকে অচেনা কণ্ঠ—
“আসসালামুয়ালাইকুম…”
রাহা না ঘুরেই বলল—
“ওয়ালাইকুমুসসালাম…
রহমতের কালাম…
আমি যার বান্দা, আপনি তার গোলাম…”
বলেই পিছনে তাকাতেই—
ছেলেটি বেবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।
রাহা মুচকি হেসে বলল—
“অচেনা মানুষ কে সালাম দেয়ার শখ গুছেছে? নাকি এখনও আরও বাকি?”
ছেলেটি রাহার মুখ দেখেই যেন থমকে গেল—
“হ্যায়… মে মারজাওয়া…”
রাহা ভ্রু কুঁচকে ভাবল—
“আমি বললাম কি… আর এই কি শুরু করলো!”
রেগে বলল—
“এই! সামনে থেকে সরেন তো! যত্তসব… কোথা থেকে এসে পরে বুঝি না!”
ঠিক তখনই শিফা সামনে থেকে আসতেই—
কাছে এসে বলল—
“আরে মাহাদী ভাইয়া! আপনি?”
রাহা সাথে সাথে—
“উহ্ লো! এই মেহেদী পাতা আবার কে!”
ছেলেটি বলল—
“এক্সকিউজ মি, মিস…
আম নট মেহেদী পাতা…
ইটস মাহাদী—আইজান শিকদার মাহাদী। ওকে?”
রাহা মুখ ভেংচি কাটল।
শিফা বলল—
“ভাইয়া, আপনি এখানে?”
“বাবার সাথে দেখা করতে এসেছিলাম।
এসেই দেখি এক পরী দাঁড়িয়ে আছে… সালাম দিলাম—এমন উত্তর দিয়েছে, মনে হলো রহমতের বৃষ্টি পড়ছে!”
শিফা কিছুই বুঝতে পারছে না।
রাহা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে আছে।
শিফা বলল—
“আরে রাহা, উনি হচ্ছেন—
আমাদের এই মেডিকেলের সভাপতি ও প্রফেসরের একমাত্র ছেলে।”
রাহা বলল—
“তাতে আমার কি!!”
বলেই সামনে চলে গেল।
শিফা বলল—
“ও আমার মেজো আব্বুর মেয়ে… একটু উড়নচন্ডী। প্লিজ কিছু মনে করবেন না ভাইয়া, ওর হয়ে আমি সরি বলছি।”
মাহাদী হেসে বলল—
“উফস কথার কি তেজ, আই লাইক ইট”।
(ফিসফিসিয়ে)
“দুর শিফা! কি যে বলো… কোনো সমস্যা নেই। আশা করি এখন থেকে প্রায় প্রায় দেখা হবে…”
“জ্বি ভাইয়া, কিছু বললেন?”
“কিছু না… যাও তাহলে।”
“ঠিক আছে।”
তাদের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মাহাদী বলতে লাগল—
“শুভ্রের চেয়ে শুভ্রতর তুমি…
আসমান থেকে নেমে আসা পরি
মেয়ে তুমি ধন্য—
শুধু আমারই জন্য…”
বলেই মুচকি হাসতে হাসতে চলে গেল।
·
·
·
চলবে……………………………………………………