আয়না শীতল চোখে রামিনের কান্ডকারখানা দেখছে। ঘড়ির পেন্ডুলামের মতো বেয়াড়া ছেলেটা একবার এদিক যাচ্ছে তো একবার সেদিক যাচ্ছে।
এই প্রথমবার আয়নার সাথে তার বাকবিতন্ড হয়েছে এমনটা না। উপেক্ষা করে যাবে করে যাবে ঠিক করেও আয়না মৌন থাকতে পারেনি। পিএস ফাইভ প্রো কিনে দেওয়ার জন্য বাড়িতে অশান্তি করতে আর কিছু বাদ রাখেনি। পিএস ফোরে তার আর কোনোভাবেই চলছে না, নতুন একটা কন্ট্রোলার ও লাগবে। ভার্সিটির বন্ধুদের আছে ইত্যাদি ইত্যাদি।
শারমিন আরা বাকিদের সাথে যতটা কঠোর তার সিকিভাগও নিজের পেটের ছেলেদের সাথে পারেন না। নরম সুরে কথা বলতে বলতে অনুনয় করেও লাভ হয়নি। ঠিক এইবেলায় সাহেরা বানু কুটিল সন্তুষ্টি পায়। এই এক জায়গায় এসেই উচ্চবংশের দাম্ভিক শারমিন আরা নাস্তানাবুদ হন। ছেলেরা মাতৃভক্ত তো নয়ই বরং সময়ের সাথে তিনি হয়েছেন ধৃতরাষ্ট্রের মতো পুত্রপ্রেমে অন্ধ ও অসহায়।
রামিনের ব্যবহারে অতিষ্ঠ হয়ে আয়না সত্যি আর চুপ থাকতে পারল না। সে কড়া স্বরে বলল,
তোমার মা বাইরে গেছে। দুইদিন ধরে এ নিয়ে অশান্তি করেছো, আপাতত থামো। তিনি আসলে আবার কান্নাকাটি শুরু করো।
রামিন আক্রমনাত্মক ভঙ্গিতে আছে দুদিন ধরে। বাবাকে বলে কোন লাভ হবে না জানে। তিন মাস পরপর সেমিস্টারে ফী দেওয়া নিয়ে মনসুর সাহেব গড়িমসি করেন। এই কয়েকদিন উনি কানে তুলা দিয়ে ঘুরছেন, বাড়ি ভেঙে ফেললেও তিনি টু শব্দ করবেন না। এই প্রতিক্রিয়া আজকের না, বিয়ের পর থেকেই শান্তির জন্য ধারণ করেছিলেন তিনি।
রামিন তাই বাপকে বিশেষ গুরুত্ব দেয় না। তার ধারণা আরেকটু চাপ দিলেই মা রাজি হবে। সবসময় হয়। উঠতি বয়সের ছেলের বদমেজাজী বাড়িতে থমথমে পরিবেশ করে রাখে। কিন্তু এই মহিলার কথায় সে হতভম্ব হলো। যেখানে কেউ তাকে ঘাটানোর চেষ্টা করছে না এই মহিলা অপমানজনক কথা শুনিয়ে যাচ্ছে।
-এই আপনি আমাকে কি বললেন? কান্নাকাটি কে করছে?
-সঠিক বলেছি। বাচ্চারা শপিংমলে হুট করে খেলনার জন্য যেমন মাটিতে গড়াগড়ি করে চেঁচামেচি করে, ঠিক সেরকম ট্যানট্রামস তোমার।
-অতিরিক্ত করছেন আপনি। আমাদের বাড়ির ব্যাপারে মোটেই নাক গলাবেন না। ইউ আর এন আউটসাইডার!
আয়না শীতল স্বরে বলল, তাই নাকি?
-অবশ্যই।
-ইনসাইডার কে? তুমি?
রামিন ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। আয়না তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,
জন্মসূত্র ছাড়া ইনসাইডার হওয়ার যোগ্যতা কী তোমার? এই বাড়ির কোনো একটা বেসিক কাজে কি তোমার হাত পড়ে? বাড়ি বাদ দাও, তোমার ঘরটার যে অবস্থা ওটাকে আর ঘর বলা যায় না, ওটা একটা আস্ত গোয়ালঘর। সারাদিন শুধু মানুষকে অর্ডার দিয়ে আর অভদ্রতা করে বেড়াও। কাল রাতে যখন জরুরি কিছু গ্রোসারি দরকার ছিল, তখন তো তোমার টিকিটাও পাওয়া যায়নি। মুদির দোকানে পর্যন্ত তুমি যেতে পারো না। কিছু বললেই শুধু চেঁচামেচি। খবরদার চোখ রাঙাবে না! নতুন গজানো টেস্টোস্টেরনের দাপটে সবাইকে ভয় দেখিয়ে কবজায় রাখতে চাও, এই তো তোমার দৌড়?
রামিন কিছু বলতে চাইল, কিন্তু আয়না তাকে থামিয়ে দিয়ে বলতে থাকল,
তোমার বাবা-মা যে কতটা কষ্ট করে তোমার প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির ফি জোগাড় করছেন, সে সম্পর্কে তোমার কোনো কৃতজ্ঞতাবোধ তো বাদ ধারণাও নেই। উল্টো এমন সব বিলাসিতার দাবি করছ যার কোনো প্রয়োজন নেই। তোমার বয়সী ছেলেরা এখন হন্যে হয়ে টিউশনি বা ছোটখাটো পার্ট-টাইম জব খুঁজছে যাতে পরিবারকে একটু সাহায্য করা যায়, আর তুমি আছ নিজের শখ আর জেদ নিয়ে। নিজের দিকে তাকিয়ে দেখেছ কখনো? গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে এই মেজাজ নিয়ে রাস্তায় বের হলে কেউ তোমাকে পিয়ন হিসেবেও চাকরি দেবে না, যদি পাশ করতে পারো আর কি!
রামিন মাহিরের স্ত্রীর মুখে এসব শুনবে কোনোদিন কল্পনাও করেনি। আয়নার কথাগুলো বোমার মতো ফেটে তার দম্ভকে ধুলোয় মিশিয়ে দিল। সে কোনোমতে ফুঁশে বলল, হাউ ডেয়ার ইউ! আপনার স্বামীরও তো কোনদিন আমাকে এসব কথা বলার সাহস হবে না।
-এটা অবশ্যই আমার স্বামীর ব্যর্থতা। তুমি আমার বংশের ছেলে হলে কবেই চড়িয়ে চড়িয়ে একদম কান গরম করে দিতাম। তাতে যদি মগজের জং কিছুটা পরিষ্কার হতো।
রামিন স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। উচ্চস্বরে কথাবার্তা শুনে দিনা ও মিনা তাদের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। তাদের সাথে রান্নাঘর থেকে উঁকি দেওয়া রহিমন বুয়াও বিস্মিত। প্রথমবার আয়নার এই রূপ দেখল তারা।
—————
সংঘাতের পর থেকে আহমেদ নিবাসের বাতাস থমথমে হয়ে আছে। চেঁচামেচি যে সবার কানে গেছে, যারা উপস্থিত ছিল না তারাও এতোক্ষণে অবগত সেটা আয়না ভালোই বুঝতে পারে। সে নিজের সাফাই গাইতে গেল না, কিংবা কারো কাছে গিয়ে তর্কের ব্যাখ্যাও দিল না। মাহির ব্যতিক্রম।
দুপুরে নিয়ম করে অফিসের লাঞ্চ ব্রেকে সে আয়নার খোঁজ নেয়। খবর যেহেতু সে জানবেই তাই আয়না নিজেই জানিয়ে দিল। মাহির বিরক্ত ও হতাশ হলো রামিনের কর্মকান্ডে। ভার্সিটিতে ভর্তির পরই ছেলেটার এতো অধঃপতন আসলে মেনে নেওয়ার মতো না। এবার তো আলাদা করে না বসা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। আয়না তাকে ভাবুক দেখে বলল, তুমি ওর সাথে কথা বলার ব্যাপারে ভাবছো?
-হুম। এভাবে তো চলা যায় না।
-আমি বলি? তোমার এখন এ ব্যাপারে কথা বলার প্রয়োজন নেই। আমি অলরেডি যথেষ্ট বলেছি, তুমি বললে ব্যাপারটা অন্যদিকে মোড় নিতে পারে।
অত্যন্ত শান্তভাবে সে নিজেকে ড্রয়িংরুম থেকে সরিয়ে নিজের ঘরে চলে এল। নিজের গাম্ভীর্য সে এক চুলও টাল হতে দিল না।
খানিক বাদে সাহেরা বানুর ঘর থেকে ডাক এল। আয়না যখন ঘরে ঢুকে দেখল দাদী তখন বিছানায় ঠেস দিয়ে আয়েশ করে বসে আছেন। পানভর্তি চিকন সুপারি আর ঘণ জর্দা। বৃদ্ধা পুরোটা মুখে নিয়ে বলল,
খুঁচি লাগাইও না কইলাম নাতবৌ! তুমি সব বিষয়েই প্রচুর বাঁধা দাও।
আয়না বলল,
টাল হয়ে পড়লে আমারে না ডাকলেই হবে। মাথা ঘুরালে নাকি সুরে কান্নাকাটি ও করা যাবে না।
সাহেরা বানুর মুখ বেজার হলো। এটা কেমন ধারার মেয়ে মানুষ তিনি ভেবে পান না। আজকের ঘটনা সবটা তিনি চোখে না দেখলেও কানে তার ঠিকই গেছে। শারমিন আরা আর তার পোলাপানদের একটু বাড়ি দেওয়া সত্যি প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। যা হয়েছে ভালোই হয়েছে, তবে তাতো আর বলা যায় না।
তিনি খুব স্বাভাবিক গলায় কথা শুরু করলেন,
বাইরে বেশ চিল্লাপাল্লা হুনলাম। পোলাডারে তো কড়া শাসনই করলা।
আয়না কথা বাড়াল না। শুধু ছোট করে বলল, শাসন করার ইচ্ছা ছিল না তবে ও চুড়ান্ত বাড়াবাড়ি করছিল।
সাহেরা বানু মাথা নাড়লেন। রামিনের বেয়াদবি আর উচ্ছন্নে যাওয়া যে পরিবারের জন্য মাথাব্যথার কারণ, সেটা তিনি মানেন। কিন্তু পরক্ষণেই তার গলার স্বর বদলে গেল। একটু অনুযোগোর সুরে বললেন, তাও... এতডা বলা তোমার ঠিক হয় নাই নাতবৌ।
আয়না কোনো প্রতিবাদ করল না, যেন সে মন দিয়ে সব শুনছে। সাহেরা বানু তার অভিজ্ঞতার ঝুলি খুলে বসলেন,
দাওয়াত-মজলিশ হোক বা ঘর সম্মানটা বজায় রাখা লাগে। তিতা কথা কইলেও উপরে একটু মধু রাখা ভালো।
তিনি আসল আশঙ্কার কথা পাড়লেন,
ধরো তুমি ওরে অত অপমান করলা, ও যদি পাল্টা মুখে কিছু কইয়া বসত? পোলাপানের রাখ ঢাক আছে? এমন কুনু কথা যারে আর ফিরাইয়া আনা যায় না? তখন তুমি কী করতা?
আয়না শান্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে জবাব দিল, আমি পরিস্থিতি অতদূর গড়াতে দিতাম না।
সাহেরা বানু এক মুহূর্ত আয়নার দিকে তাকিয়ে রইলেন। সেও তার মাথাব্যথার কারণ। সব মাতব্বর গুলো তার সংসারে জুটেছে।
আয়নার আত্মবিশ্বাস তার অভিজ্ঞ মন বলছে পরিস্থিতি সবসময় হাতের মুঠোয় থাকে না। তিনি আয়নাকে সাবধান করে দিলেন,
একটা কথা মনে রাইখো! হেরা কিন্তু মাহিরের আপন ভাই না। চাচতো ভাই।
তিনি কিছুক্ষণ থামলেন যাতে আয়না এই পার্থক্যের গুরুত্বটা বোঝে।
-একটা দূরত্ব তো আছে না? তোমার এত সরাসরি এসবের মধ্যে পড়ার দরকার নাই।
সাহেরা বানুর ইঙ্গিতে স্পষ্ট ছিল যে সম্পর্ক যখন রক্তের নয়, তখন শাসনের অধিকারটাও অতটা খাটে না। আয়না শুনল কিন্তু তার মনে হলো না এক বাড়িতে থেকে এই আপন-পরের পার্থক্যটা খুব জরুরি। বিশেষত যখন এটা একপাক্ষিক রয়ে যায়। সে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না।
সাহেরা বানু বড় বউয়ের চিরাচরিত ছাঁচে ফেলে উপদেশ দেওয়া শুরু করলেন, রায়হান কবে বিয়া করব কে জানে? তুমি এহন এই প্রজন্মের বাড়ির বড় বউ। এই পদের সাথে মেজাজ না,নীরবতা মানায়।
সব কথায় উত্তর দেওয়া মানেই শক্তি নয়। বরং কখন চুপ থাকতে হয় সেটা জানলেই পরিবারে কর্তৃত্ব ধরে রাখা যায়।
-এইসব ঝগড়াঝাঁটির মইধ্যে না গিয়া নিজের সোয়ামির দিকে খেয়াল দাও। ওরে দেখভাল করো। আর শারমিন আরার লগে আস্তে আস্তে খাতির জমানোর চেষ্টা করো। সেবা-যত্ন করো।
আয়না বুঝে দাদী তাকে রণকৌশল শেখাচ্ছেন। সামনাসামনি লড়াই না করে নিঃশব্দে নিজের প্রভাব বাড়ানো। কিছুক্ষণ চুপ থেকে সাহেরা বানু গলাটা একটু খাদে নামিয়ে নিলেন,
প্রথমটা তো তোমার হইয়া গেছে আগেই। সোয়ামি তো চোখে হারায়। মাগো মা! অফিস থেকে আইসা উপরে উঠলে আর নামার নাম নাই। বুড়ি যে আছে একটা, হের কিছু লাগবো নি, এডি জানার প্রয়োজন ও নাই। বউরে সুনু-ক্রিম দেওয়া চলে ঠিকই! নতুন কিছু না। দেখতেছি তো সব গুলো পোলা বউয়ের আঁচলের তলায় থাকে। তোমাগো দাদারে যদি খোদা বাঁচায়া রাখতো, তো সবগুলারে পিডায়া সোজা করতো।
আয়না মৃদু হাসল।
-আর শোনো নাতবৌ সব কাজে তাড়াহুড়ো করতে নাই।
আয়না কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে তার দিকে তাকাল। সাহেরা বানু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বললেন, সবকিছু একটু থিতু হইতে দাও। পোলাপানের কথা আরো পরে ভাইবো।
তিনি নিজের যুক্তিতে বললেন, মাহিরডার অবস্থা এহনো পুরোপুরি গুছানো না। ওর কাঁধে এহন দায়িত্ব অনেক বাড়ছে।
তিনি একটু থেমে যোগ করলেন, এইসব ব্যাপারে মেয়েগো খুব সাবধানে বিচার-বিবেচনা করা লাগে। পোলারা অত কিছু বুঝে না। সংসারের কোনো চিন্তা বুঝে না।
কথাটার ইঙ্গিত আয়নার কাছে একদম পরিষ্কার। মাহিরের উপার্জিত টাকা এখন কয়েক ভাগে ভাগ হচ্ছে, সংসারের স্থিতি এখনো নড়বড়ে। এই অবস্থায় বাচ্চার মতো বড় কোনো দায়িত্ব মাহিরকে আরও চাপে ফেলে দেবে। সাহেরা বানুর মতে এটা স্ত্রীর দায়িত্ব যে সে সামনে কী আসছে সেটা ভেবে সময় বুঝে পা ফেলবে।
আয়না বিষয়টির গুরুত্ব বুঝল, হয়তো পরিবারে শান্তি রাখতেই এ কথা বললেন তিনি। বা হয়তো মাহিরের মাঝে অপ্রত্যাশিত পরিবর্তনে তার এইদিকে আয়নাকে সাবধান করতে হলো। সে জানত মনসুর আলমের ব্যবসায় ঘাটতি ও মাহিরের আয় সীমাবদ্ধ এবং এই পরিবারের চাহিদা অনেক। তবে সে এটা নিয়ে আবেগপ্রবণ হলো না। অত্যন্ত নির্লিপ্তভাবে উত্তর দিল, আমি বুঝেছি।
কথার মোড় ঘুরিয়ে সাহেরা বানু এবার শারমিন আরার প্রসঙ্গে এলেন, আমি জানি শারমিন আরা মানুষটা সহজ না। তোমার পেরেশানি হইতেছে।
আয়না নীরব রইল, সবাই তা জানে।
-ওরে খুশি করা কঠিন। আর হ্যাঁ ওর মুখটা খুব তিতা। মাঝে মাঝে আমার লগেও তো খুব কড়া গলায় কথা কয়। কিন্তু ও খারাপ মানুষ না।
সাহেরা বানু শারমিন আরার অতীতের কথা বলতে শুরু করলেন। এক সময় এই সংসারের সব ভার ছিল শারমিন আরার কাঁধে। সে যদি শক্ত হাতে হাল না ধরত, তবে এই বাড়ি নির্ঘাত ভেসে যেত। তার গলায় অনিচ্ছাকৃত শ্রদ্ধার রেশ পাওয়া গেল।
তিনি বললেন,
ওর এই হুকুম দেওয়ার স্বভাব আর অহংকারী মেজাজ আমারও পছন্দ না। কিন্তু ওইটা ওর বাপের বাড়ির থেইকা আসা। বড় ঘরের বেটি না? আভিজাত্য তো রক্তে থাইকা যায়। কিন্তু জোয়ান বয়সে বড়বৌ আমাদের খুব যত্নআত্তি করত। নিজের দায়িত্ব একদম পাই পাই কইরা পালন করছে এইডা সত্য।
তিনি বর্ণনা দিতে লাগলেন কীভাবে শারমিন আরা শ্বশুরবাড়ির সবার সেবা করত, অক্লান্ত পরিশ্রম করত। সাহেরা বানুর বর্ণনায় মনে হয় শারমিন আরা যেন সেবিকার মতো সব কাজ করত আর আয়না এর থেকে কিছু শিখলেও পারে। আয়না চুপ করে সব শুনছিল। তার মনে হচ্ছিল বর্ণনায় হয়তো কিছুটা রং চড়ানো আছে, কিন্তু সে দাদীকে থামাল না।
সবশেষে আয়না খুব ধীরস্থিরভাবে একটা প্রশ্ন করল, তারপর কী হলো?
-কি কও?
-আপনাদের দুইজনের মধ্যে দূরত্বটা আসলো কেন?
সাহেরা বানু চুপ হয়ে গেলেন। সাথে সাথে কোনো উত্তর দিলেন না। তারপর খুব ধীরে ধীরে মেপে মেপে বললেন, সংসারে যখন নতুন কেউ আসে তখন আগের জনের জায়গাটা নড়বড়ে হইয়া যায়।
এর বেশি তিনি আর কিছুই বললেন না।
—————
শুক্রবার অপরাহ্নের স্নিগ্ধ আলো চিলেকোঠার বড় জানালাটা দিয়ে ঘরের ভেতর এসে পড়েছে। সেই আভা মেঝের ওপর দিয়ে গড়িয়ে, নিচু কাঠের টেবিলটায় এসে স্থির হয়েছে, যেখানে মাহির কাজ করছিল।
পাঁচটা ফাইলের কারেকশনের কাজ করে শুক্রবার কাটাতে হচ্ছে। নিজের কাজ সময়মতো শেষ করাও মাঝেমধ্যে বিপদ। কাল সাবমিট করে রিভিউ নিতে হবে। তারপর ম্যানেজার ফিটফাট হয়ে তা হাইকমান্ডকে দেখাতে নিয়ে যাবে। কার্টেসীর জায়গায় নাম থাকবে ওনার। কর্পোরেট কালচার হতাশাজনক, ধৈর্য পরীক্ষার শেষ নেই। শুরুর কয়েকবছর চোখ বুজে কাজ করা ছাড়া উপায় নেই। সেটাই সে করছে।
অন্তত টেবিলে বসার সময় নিজেকে সে এটাই বুঝিয়েছিল। যদিও কাগজগুলো এখনো ওখানেই পড়ে আছে, হাতের কলমটা স্থির। তার মনোযোগ অনেক আগেই দিক হারিয়েছে।
সে এখন ওর দিকে তাকিয়ে আছে।
আয়না জানালার ফ্রেমের একপাশে হেলান দিয়ে বসে ছিল। এক হাতে ধরা খোলা বই, মনোযোগ তাতেই নিবদ্ধ। দমকা হাওয়া খুব সন্তর্পণে ওর সবুজ আঁচলটা আলতো করে উড়িয়ে দিচ্ছিল, আবার কখনো অবাধ্য কয়েকটা চুল মুখের ওপর এসে পড়ছিল।
পাতা রঙের শাড়ি পরেছে আজ আয়না। এটা মাহির বরিশাল থেকে এনেছিল। সহজে নয়, গতকাল আকার ইঙ্গিতে মাহির শীতল অভিযোগ করার পরই ভদ্রমহিলা এটাকে পরিধান করে ধন্য করেছে এই পৃথিবীকে! এতেই মাহিরের সর্বনাশ হয়েছে।
শাড়ির জমিনে বিশেষ কোনো কারুকাজ নেই, কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতোও কিছু নেই। অথচ, রোদ যতবার ওকে ছুঁয়ে যাচ্ছে, ততবার স্ত্রীর দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নেওয়া দায়। আলোর ছটা ওর গালের ধার দিয়ে নেমে চিবুক পেরিয়ে গলার মোহনীয় খাঁজে গিয়ে থেমেছে। আচ্ছা রোদ থেকেও কি কারো হিংসা হতে পারে?
মাহির বেশ কিছুক্ষণ লক্ষ্য করার পর দেখল, বেশ কিছুক্ষণ ধরে বইয়ের পাতাটা উল্টানো হয়নি। আয়না ঠিক পড়ছে না। ও আসলে প্রাণপণে মাহিরকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।মাহিরের বুক চিরে একটা শ্বাস বেরিয়ে এলো যার মধ্যে উপলব্ধি আর মৃদু কৌতুক দুই-ই মেশানো ছিল।
সে কলমটা শব্দ করে টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখল।
চেয়ারটা সামান্য শব্দ করে মেঝের ওপর সরে গেল। এবার আয়না নড়েচড়ে বসল। সে বই থেকে চোখ তুলল না, কিন্তু মাহিরের এগিয়ে আসছে তা তার স্নায়ু ঠিকই ধরে ফেলেছে। ওর পরনে কালো ঢিলেঢালা ফতুয়া, হাতাগুলো গুটিয়ে রেখেছে। বাজার সেরে দেরিতে গোসল করায় ভেজা অগোছালো চুলগুলো ওর কপালে এসে পড়েছে।
মাহির প্রশ্ন করে, কি পড়ছো?
আয়না বইয়ের পাতায় চোখ রেখেই বলল, সাতকাহন।
-একই পাতায় দশ মিনিট ধরে? খুব ইন্টারেস্টিং কিছু হচ্ছে?
-তুমি কি করে জানলে পাতা পাল্টাইনি? তাকিয়ে ছিলে বুঝি? কাজ শেষ?
-করতে পারলাম আর কই?
আয়নার আঙুলগুলো বইয়ের পাতায় শক্ত হলো,
আমি সময় নিয়ে ধীরে ধীরে পড়ি।
মাহির একটু হাসল, কি হচ্ছে এখন? দীপার বরটা মরেছে?
আয়না অবাক হয়ে বলল, তুমি পড়েছো? উপন্যাস পরো তুমি?
মাহির ভ্রু উচিয়ে তাকিয়ে রইল। উত্তর দিল না। তার মুখে রহস্যময় হাসি।
সে বলল, আচ্ছা ফর আ চেঞ্জ একটু পরিণীতা, দিঘির জলে কার ছায়া গো পড়তে পারো না?
-পিওর রোম্যান্স অতটা পছন্দ না।
মাহির গজগজ করে বলল, তা আর বলতে? সুখপাঠ্য ভালো লাগবেই বা কেন? শেখরকে ফেলে আলোক বাবুকে পড়তে থাকো আর তার জন্য মাহির আহমেদ ভুগতে থাকুক।
আয়না মুখ তুলে তাকাল, আমি একদম বুঝতে পারছি না তোমার কথা।
-উহু, তুমি ভালো করেই জানো!
মাহির নিচু স্বরে বলল। তার দৃষ্টি সরাসরি আয়নার চোখের ওপর। আয়না কিছু বলার আগেই মাহির আবার অপ্রাসঙ্গিক কথা বলে উঠল,
জানো? আমার এক কলিগ মুজতবা সাহেবের একটা ছোট মেয়ে বাবু আছে। খুব জেদি। কোনো কিছু হুট করে হয়ে যাওয়া সে একদম পছন্দ করে না। মানিয়ে নিতে সময় লাগে আর না হলে ও ট্যানট্রামস থ্রো করে নিজেকে গুটিয়ে নেয়।
আয়না শুনছিল তার গল্প। মাহির বলতে বলতে আরও কাছে ঝুঁকে এলো,
তাই তার মা-বাবা ওকে সময় বেঁধে দেয়। বলে দেয় যে পাঁচ-দশ মিনিটের মধ্যে এটা হতে যাচ্ছে। যাতে সে নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করে নিতে পারে। নিজেকে গুছিয়ে নিতে পারে।
আয়না উপন্যাসের বইটা বন্ধ করল, আর তুমি আমাকে এটা কেন বলছো?
মাহির অকপটে বলল, কারণ তুমিও ঠিক তাই করো। যেকোনো কিছু ঘটার আগে তুমি নিজের চারপাশে একটা দেয়াল তুলে নাও। যাতে কিছুই তোমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করতে না পারে।
আয়নার নিশ্বাস ভারী হয়ে এল। মাহির বলতে বলতে এখন এতটাই কাছে যে তার গায়ের হালকা সুবাস, শরীরের উষ্ণতাও আয়না অনুভব করতে পারছে।
-সুতরাং এখন আমি যদি তোমাকে আগে থেকেই বলে দিই......
-কি বলবে? হেঁয়ালি করো না মাহির!
মাহির তার উত্তর না দিয়ে স্বর খাদে নামিয়ে বলল,
তবে নিশ্চিত তুমি নিজের প্রিয় লোহার বর্ম পরে যুদ্ধংদেহী রুপে তৈরি হবে। কিন্তু ডোন্ট ওর্যি! আমি তোমাকে সময় দিবো আয়না। তবে সময়টা খুব অল্প হবে।
আয়নার হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল, সময়? কিসের জন্য?
মাহির সাথে সাথে উত্তর দিল না। তার তীর্যক দৃষ্টি একবার মুহূর্তের জন্য আয়নার অধরের ওপর গিয়ে স্থির হলো। তারপর আবার ফিরে এল ওর চোখে। আয়নার মনে হলো তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। সে ঘোরের মধ্যে আটকে পড়েছে।
-আমি যেহেতু জেন্টলম্যান তাই তোমাকে সময় দিচ্ছি, বুঝলে?
আয়না আমতা আমতা করে বলতে চাইল, মানে! আমি তো-
মাহিরের স্বরে আদিম টানটান উত্তেজনা,
কিন্তু দিনশেষে আই'ম আ ম্যান আফ্টার অল! আমি চাই না তুমি তোমার যুদ্ধের প্রস্তুতি নাও। তখন আমার খুব রাগ লাগে। তাই তিন সেকেন্ড দিব। ঠিক আছে?
হতভম্ব আয়নার মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দিল। সে শুধু বিড়বিড় করে বলল, কী!
-তিন!
-মানে শোনো-
-দুই!
-মাহির!
-এক!
মাহির আর অপেক্ষা করল না। তার বলিষ্ঠ এক হাত আয়নার কোমরে স্থির হলো।অন্য হাতটা খুব মায়াবী ভাবে ওর ঘাড়ে চলে গেল। আয়নার শরীর অস্থির হলেও, কিন্তু মাহিরের বাঁধন নিশ্চিত।
সে দূরত্বটুকু ঘুচিয়ে দিল।
মাহিরের অধর যখন প্রথমবার আয়নাকে স্পর্শ করল, আয়না শিউরে উঠল। তার সারা শরীরে তীব্র বৈদ্যুতিক তরঙ্গ বয়ে গেল। সে ভেবেছিল নিজেকে শক্ত করে রাখবে, কিন্তু মাহিরের স্পর্শ ছিল অভাবনীয়। রুক্ষ না, ছিল প্রচণ্ড তীব্র আর সংবেদনশীল। ভদ্র মাহিরের চরম শান্ত দখলদারিত্ব।
মাহির আরও নিবিড়ভাবে ওকে কাছে টেনে নিল,আয়নার হাতের বইটা মেঝেতে পড়ে গেল। তার জ্ঞানত সে মাহিরের ফতুয়া খামচে ধরল। মাহিরের স্পর্শের গভীরতা বাড়ে আর প্রতিটি মুহূর্তে আয়নার মাঝে এক নতুন ধরণের তৃষ্ণা জন্ম নেয়।
পুরুষালী নিঃশ্বাসের উষ্ণতা আয়নার ত্বকে এসে বিঁধছে। তার স্বামীর স্পর্শে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, স্থির সংকল্প আছে। সে দীর্ঘদিনের জমানো কোনো এক না বলা কথা এখন আয়নার প্রতিটি কোষে ছড়িয়ে দিচ্ছে।
আয়নার মনে হলো সে কোনো এক অতল সমুদ্রে তলিয়ে যাচ্ছে। তার সেই আজন্ম লালিত রক্ষণাত্মক দেয়াল বালির বাঁধের মতো ভেঙে পড়ছে। সে অনুভব করল মাহিরের আঙুলগুলো তার চুলের গভীরে খেলছে, ওর শরীর মাহিরের বুকের সাথে মিশে যাচ্ছে। মাহিরের প্রতিটি ছোঁয়ার গভীর নির্ভরতা আয়নাকে অবশ করে দিচ্ছে।
নিজেকে জড়বস্তু মনে করা আয়নার বুকের ভেতর হাজার হাজার প্রজাপতি ডানা ঝাপটাচ্ছে। এমন এক শিহরণ সে আগে কখনো কল্পনাও করেনি।
মাহির আলতো করে সরে এলো। দুজনের মাঝখানের নিস্তব্ধতা বেশি মুখর। আয়না চোখ খুলতে পারছে না। তার ঠোঁট তখনো থরথর করে কাঁপছে, নিশ্বাস দ্রুত। মাহির স্ত্রীর কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে রাখল।
আয়নার বুকের ভেতরটা তখনো কামারের হাপরের মতো ওঠানামা করছে, ঠোঁট দুটোয় একটা চিনচিনে শিহরণ।
কিন্তু মাহির কিছুই করল না।সে কেবল স্থির হয়ে আয়নার চোখের গভীরে তাকিয়ে রইল।
কয়েক শতাব্দীর জমানো কিছু একটা আজ বলে ফেলবে সে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই বলল না।
শুধু খুব নিচু গভীর স্বরে বিড়বিড় করল, ইয়া খোদা!
আয়নার কপাল মুহূর্তেই কুঁচকে গেল।
ইয়া খোদা? মানে কী এর?
সে বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইল। মাহির আর একটি শব্দও উচ্চারণ করল না। তার সেই দৃষ্টিতে ঘোরলাগা অসহায়ত্ব ছিল, যেন কোনো এক নিষিদ্ধ সৌন্দর্যের সামনে সে নিজেকে সামলে নেওয়ার শেষ চেষ্টা করছে। কোনো ব্যাখ্যা না দিয়েই, প্রায় যান্ত্রিকভাবে সে আয়নার পাশ কাটিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
আয়না ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল। এক মুহূর্ত আগের সেই প্রজাপতি ওড়া অনুভূতিগুলো এখন একরাশ বিভ্রান্তিতে রূপ নিয়েছে। ওর ভ্রু কুঁচকে গেল আরও।
ইয়া খোদা এখন এভাবে বলার মানে কী?
এতটাই কি খারাপ ছিল ব্যাপারটা?
আয়নার মুখটা এবার অভিমানে শক্ত হয়ে এল। নিজের অজান্তেই তার মনে এক ধরণের জেদ চেপে বসল।
এই লোকটা কি সিরিয়াসলি এখন আল্লাহর কাছে তাকে নিয়ে নালিশ করল নাকি!
·
·
·
চলবে……………………………………………………