অন্ধকার নেমে এসেছে। সন্ধ্যা তার ঝাঁপি থেকে অন্ধকার নিয়ে এসে ঝপ করে রাত নামিয়ে দিল। বিদ্যুৎও চলে গেল। পদ্মজা হারিকেন জ্বালিয়ে প্রেমার ঘরে এলো। প্রেমা পড়ছিল। পূর্ণা শুয়ে আছে। পদ্মজাকে দেখে প্ৰেমা এগিয়ে এসে হারিকেন নিলো। বলল, ‘আপা সন্ধ্যার নামাজ পড়েনি।’
‘তুই পড়। আমি দেখছি।’
পদ্মজা পূর্ণার শিয়রে বসে কাশি দিল পূর্ণার মনোযোগ পেতে। পূর্ণার সাড়া পাওয়া যায়নি। বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। সেদিনের ঘটনার ছয় দিন কেটে গেছে। পূর্ণার স্বাভাবিক হতে দুইদিন লেগেছিল। এই দুইদিন ঘর থেকে বের হয়নি। কিন্তু কাঁধের ক্ষতটা শীতের কারণে পেকেছে। খুব জ্বালাতন করে। আপা, আপা করে কাঁদে। পদ্মজার ভালো লাগে না সেই কান্না শুনতে। কষ্ট হয়। বুক ভারি হয়ে আসে। সে পূর্ণার গায়ে লেপ জড়িয়ে দিয়ে মাথায় কিছুক্ষণ বিলি কাটল। প্রেমাকে প্রশ্ন করল, ‘প্রান্ত কোথায়?’
‘লাহাড়ি ঘরে।’
‘কী করে ওখানে?’
কী হিবিজিবি বানায়। বিজ্ঞানী হয়ে যাবে দেখো।’
‘মজা করে বলছিস কেন? হিবিজিবি বানাতে বানাতেই একদিন চমকে দেয়ার মতো কিছু বানিয়ে ফেলবে। বিরক্ত করিস না। ওকে ওর মতো সময় কাটাতে দিস।’
‘কে যায় ওরে বিরক্ত করতে? আমি আমার পড়া নিয়েই আছি।’ কথা শেষ করেই প্রেমা পড়ায় মনোযোগ দেয়। পদ্মজা মুচকি হাসল। প্রেমাকে খুব ভালো লাগে তার। মেয়েটা শুধু লাজুক নয় ভীষণ বুদ্ধিমতীও বটে। চাল চলন আকর্ষণ করার মতো।
বাসন্তী এই রাতের বেলা হারিকেন জ্বালিয়ে কাঁথা সেলাই করছেন। পদ্মজা রাগী স্বরে বলার চেষ্টা করল, ‘রাতের বেলা কী করছেন আপনি? বিশ্রাম নিন এখন।’
বাসন্তী পদ্মজার দিকে চেয়ে হাসলেন। বললেন, ‘কিছুক্ষণ আগেই তো সন্ধ্যা হলো।’
‘সারাদিন কাজ করেন। এখনও করবেন? বিকেলে এতসব রান্নাও করলেন। যতদিন গ্রামে আছি আমি এই সেলাই-টেলাই যেন আর না দেখি।’
বাসন্তীকে আর কিছু বলতে না দিয়ে পদ্মজা কাঁথা কেড়ে নিলো। বাসন্তীর কোনো কথা শোনেনি। আলমারির ভেতর কাঁথা, সুতা, সুঁই রেখে বলল, ‘যতদিন আমি আছি এগুলো বের করবেন না। বুঝেছেন?’
‘আমার কী আর কিছু বলার আছে?’
পদ্মজা হেসে ফেলল। সঙ্গে বাসন্তীও। আমিরের আগমন ঘটে তখনি। পরনে বেশ দামি জ্যাকেট। পায়ে বুট। সে বাইরে গিয়েছিল হেমলতার মিলাদের ব্যবস্থা করতে। পদ্মজা এগিয়ে এসে প্রশ্ন করল, ‘সব ঠিক হয়েছে? আর একদিন পরেই কিন্তু — ‘
‘কোনো চিন্তা করো না। সব ঠিক হয়ে গেছে। পেটে ইঁদুর দৌড়াচ্ছে। খেতে দাও।’
বাসন্তী বিছানা থেকে দ্রুত নামলেন, ‘দিতেছি বাবা।’
‘আমি যাচ্ছি তো।’ বলল পদ্মজা।
‘তুমি জামাইকে নিয়ে কলপাড়ে যাও। দেখ, জুতায় কাদা লাগিয়ে আসছে।’
সঙ্গে সঙ্গে পদ্মজা আমিরের পায়ের দিকে তাকাল। আমিরও তাকাল। পদ্মজা আক্ষেপের সুরে বলল, ‘এত কাদা নিয়ে ঘরে ঢুকলেন কেন?’
আমির তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে দরজার সামনে দাঁড়াল। অপরাধী স্বরে বলল, ‘দুঃখিত আমি।’
‘আসুন কলপাড়ে।’
কুয়াশায় চারিদিক ঝাপসা হয়ে আছে। কুয়াশার স্তর এতই ঘন যে পাঁচ- ছয় ফুট দূরের কিছু দেখা যাচ্ছে না। পদ্মজা কল চাপছে,
আমির জুতার কাদা পরিষ্কার করছে। কলের পানি কুসুম গরম। শীতের সময় কল থেকে গরম পানি আসার ব্যাপারটা দারুণ। আমির বলল, ‘পূর্ণা কী ঘুমিয়ে গেছে?
‘হু।’
‘ঘুমাবেই তো। প্রতিদিন সন্ধ্যার আজান পড়তেই ঘুমিয়ে পড়ে। আর ফজরের আজানের আগ থেকে উঠে পকপক শুরু করে। ঘুমাতে পারি না।’
পদ্মজা শব্দ করে হাসল। বলল, ‘ঠিকই তো করে। ফজরে কীসের ঘুম?’
‘বোনের পক্ষই তো নিবে।’
ক্ষণকাল পিনপতন নীরবতা। আমিরের জুতা ধোয়া শেষ। পদ্মজা শুকনো কণ্ঠে বলল, ‘ওই বাড়ির মানুষদের আসতে বলেছেন?’
ওই বাড়ির নাম উঠতেই আমির জ্বলে উঠল। গম্ভীর কণ্ঠে বলল, ‘ওই বাড়ির নাম নিতে নিষেধ করেছি।’
‘তবুও…’
‘না বলিনি। আর বলবও না।’
আমির পায়ে গটগট শব্দ তুলে চলে যায়। পদ্মজা আমিরের যাওয়ার পানে তাকিয়ে থাকল। সে রাতের পর ওই বাড়িতে তারা তিন দিন ছিল। তারপরই আমির চাপ দিতে থাকে, হাওলাদার বাড়ি ছাড়তে। সে সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকে। এভাবে আতঙ্ক নিয়ে বাঁচা যায় না। আমির রাতে ঘুমায় না, ছটফট করে। ভয় পায়, এই বুঝি পদ্মজার কিছু হয়ে গেল। পদ্মজা খেয়াল করেছে, আমির রাতে কপালের ওপর হাত রেখে চুপচাপ শুয়ে থাকে। তাছাড়া এইভাবে লাশ অদৃশ্য হয়ে গেল!
পর পর তিন দিন কেটে যায় তবুও কেউ কিছু বলেনি। কারো মধ্যে কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। ব্যাপারটা ভয়ংকর। পূর্ণার ওখানে থাকা বিপজ্জনক। পদ্মজা বিপদকে ভয় পায় না। কিন্তু পূর্ণার কিছু হলে সে মানতে পারবে না। আবার পূর্ণা একা এই বাড়িতে আসবেও না। তাই বাধ্য হয়ে তিনজন একসঙ্গে চলে এসেছে। তবে পদ্মজা আবার যাবে ওই বাড়িতে। যেতে তাকে হবেই। হাওলাদার বাড়ির প্রতিটি কোনার রহস্য সে নিজের নখদর্পণে আনবেই।
এটা তার শপথ।
অনেক রাত হয়েছে। রাতের খাবারের সময় পূর্ণাকে ডেকে তোলা হয়। একবার ঘুম ভেঙে গেলে পূর্ণা আর ঘুমাতে পারে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার হয়ে যায়। প্রেমা এখনও পড়ছে। পূর্ণা বিরক্তি নিয়ে প্রেমার দিকে তাকাল। মনে মনে বলে, এই মেয়ে কী বিশ্ব জয় করে ফেলবে পড়ে? এত তো আপাও পড়েনি।
‘বাত্তিডা নিভিয়ে এসে ঘুমা। অনেক পড়ছস।’ কিড়মিড় করে বলল পূর্ণা।
প্রেমা গুরুজনদের মতো করে বলল, ‘বাত্তিডা না বাতিটা হবে।’
‘আমাকে কিছু শেখাতে আসলে থাপ্পড় দিয়ে দাঁত গাছে তুলে দেব।’
প্রেমার মুখে আঁধার নেমে আসে। সে থমথমে মুখ নিয়ে বই বন্ধ করে ঝিম মেরে বসে থাকে। পূর্ণা সন্তুষ্ট হয়ে বলল, ‘এবার হারিকেনের আগুন নিভা। এরপর শুয়ে পড়।’
প্রেমা হারিকেনের আগুন নিভাতে প্রস্তুত হতেই, পূর্ণা বলল, ‘না, থাক নিভাতে হবে না। ভয় করে। তুই শুয়ে পড়।
প্রেমা বাধ্যের মতো এসে শুয়ে পড়ে লেপের ভেতর। তার ঠান্ডা পাজোড়া পূর্ণার পায়ে লাগতেই, পূর্ণা হইহই করে উঠে, ‘ও মাগো কী ঠান্ডা! দূরে যা।’
প্রেমা রাগী চোখে তাকাল। পূর্ণা ধমক দিয়ে বলল, ‘কী হইছে? এমনে তাকাস কেন? খেয়ে ফেলবি?’
পূর্ণার সঙ্গে কথা বলে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারতে ইচ্ছে হচ্ছে না প্রেমার। পূর্ণার কথাবার্তাকে পাত্তা দিলে প্রেমার ঘুম নষ্ট হবে, সকালে উঠে নামাজ পড়াও হবে না, বই পড়াও হবে না, এটা ভেবে প্রেমা পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়েও যায়।
পূর্ণা মাথা তুলে দেখে প্রেমা ঘুমাল নাকি। যখন বুঝল ঘুমিয়ে গেছে, তখন লেপ দিয়ে ভালো করে ঢেকে দিল প্রেমাকে। এরপর জড়িয়ে ধরল। যাতে দ্রুত প্রেমার ঠান্ডা শরীর গরম হয়ে আসে। এই বোনটাকে সে ভীষণ ভালোবাসে। খুব বেশি। শুধু ভালোবাসাটা প্রকাশ করতে পারে না কেন জানি! প্রেমার ঘুম খুব পাতলা। পূর্ণা তাকে জড়িয়ে ধরতেই তার ঘুম ছুটে যায়। ঠোঁটে ফুটে উঠে মুচকি হাসি। প্রায় এরকম হয়। সে ঘুমালে পূর্ণা তার কপালে চুমু দেয়, চুলে বিলি কেটে দেয়। হাত-পায়ের নখ কেটে দেয়। ভালোবাসার অনেক রূপ হয়! এই দুই বোনের ভালোবাসাটা অন্যরকম। লুকিয়ে একজন আরেকজনকে ভালোবাসে। প্রাণের
প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসে। দুজনই টের পায়। কিন্ত প্রকাশ্যে সাপে-নেউলে যুদ্ধ চলে!
পূর্ণার কিছুতেই ঘুম আসছে না। হারিকেনের আলো নিভু নিভু। সে উঠে বসে। আবার শুয়ে পড়ে। নিভু নিভু আলোর দিকে চেয়ে মৃদুলের কথা ভাবে। মানুষটার কথা ইদানীং উঠতে বসতে মনে পড়ে তার। কাঁধে আঘাত পাওয়ার পর পূর্ণা দুইদিন ঘর থেকে বের হয়নি। তাই মৃদুল বার বার পূর্ণার ঘরে উঁকি দিত। পদ্মজা সারাক্ষণ থাকত তাই ঢোকার সাহস পায়নি। দুই দিন পর পূর্ণা ছাদে যায়। পিছু পিছু মৃদুলও আসে। পূর্ণার পেছনে দাঁড়িয়ে কাশে। পূর্ণা ফিরে তাকায়। মৃদুলকে দ্বিধাগ্রস্ত দেখায়। পূর্ণা প্রশ্ন করে, ‘কিছু বলবেন?’
মৃদুল বলল, ‘কেমন আছো? হুনলাম, রাইতে রান্নাঘরে নাকি পইড়া গেছিলা।’
‘হু। ভালো আছি।’
‘তোমার কি ধপাস কইরা পইড়া যাওয়ার ব্যামো আছে?’
পূর্ণা কিছু বলেনি। পদ্মজা নিষেধ করেছে, সেদিনের রাতের ব্যাপারে কাউকে কিছু বলা যাবে না। মৃদুল দেখল: পূর্ণা কপাল কুঁচকে, কাঁধে হাত বুলাচ্ছে। সে বিচলিত হয়ে জানতে চাইল, ‘বেদনা করে? দায়ের উপর পড়ছো, কত্তটা কাটছে কে জানে! তার ওপরে শীতের দিন এই ঘা সহজে ভালা হইব না। এইখানে তো বাতাস হইতাছে। ঘরে যাও। ঘা বাড়াইও না।’
‘না। এইখানেই থাকব।’
মৃদুল আর জেদ ধরেনি। পূর্ণা যতক্ষণ ছিল, সে-ও ছিল। পরদিন একটু পর পর পূর্ণার খোঁজ নিয়েছে। পূর্ণা খুব সুন্দর একটা অনুভূতির সাক্ষাৎ পেয়েছিল। শুরুতে মৃদুলকে দেখে শুধুই ভালো লাগলেও, আস্তে আস্তে মৃদুলের বিচরণ শুরু হয়েছে তার পুরো অস্তিত্ব জুড়ে। মৃদুলের কথা বলা, দুষ্টুমি, হাসি সব ভালো লাগে। মনের অনুভূতিগুলো হাঁটি হাঁটি পা পা করে গুরুতর সম্পর্কের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এমনকি মৃদুলও যে তার ব্যপারে আগ্রহী, তা পূর্ণা টের পায়। এই বাড়িতে আসার পরদিন মৃদুল আমিরের সঙ্গে দেখা করার অজুহাতে পূর্ণার সঙ্গে দেখা করতে আসে। সবার অগোচরে বলে যায়, তার সঙ্গে পরের দিন দুপুরে উত্তরের ঘাটে দেখা করতে। পূর্ণা বলেছিল যাবে। কিন্তু সে দুপুরে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম ভাঙে সন্ধ্যায়। তাই আর যাওয়া হয়নি। গতকাল পদ্মজা বের হতেই দিল না।
পূর্ণার মন কেমন কেমন করছে। খুব মনে পড়ছে মৃদুলকে। হারিকেনের আলো নিভে গেল, আর ঠিক তখনই টোকা পড়ল জানালায়। পূর্ণা ভয় পেয়ে গেল। কে যেন তার নাম ধরে ডাকছে। ভূত এলো নাকি! পূর্ণা ধড়ফড়িয়ে বিছানা থেকে নামল। আবারও সেই ডাক ভেসে এলো, কণ্ঠটা পরিচিত পূর্ণা ভ্রুকুঞ্চন করে টিনের দেয়ালে কান পাতে। আবারও ভেসে আসে চেনা স্বর, ‘এই পূর্ণা।’
কণ্ঠটা চেনার সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণা জানালা খুলল। দেখা গেল মৃদুলের মুখটা। পূর্ণার বুক ধক করে উঠল। সর্বাঙ্গে একটা উষ্ণ বাতাস ছুঁয়ে যায়। সে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘পাশের ঘরে আপা, ভাইয়া। আপনি ঘাটে যান। আমি আসছি।’
‘আচ্ছা।’
মৃদুল চলে গেলে পূর্ণা তাড়াহুড়ো করে সোয়েটার পরে নিলো। শাল দিয়ে ঢাকল মাথাটা। তারপর হারিকেনে নতুন আগুন জ্বালিয়ে, হারিকেন নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। ভালোবাসার কথা বলা হয়নি। কোনো সম্পর্ক নেই দুজনের। তবুও পূর্ণা কোনো এক বশীকরণের জাদুতে ছুটে যাচ্ছে মৃদুলের কাছে। কলপাড় অবধি গিয়ে আবার ছুটে এলো ঘরে। আয়না, কাজল বের করে কাজল দিলো চোখে; তারপর বেরিয়ে পড়ল। ব্যস্ত পায়ে চলে এলো ঘাটে। চারিদিকে জোনাকিপোকা, জ্বলজ্বল করে জ্বলছে; একটু দূরেই দাঁড়িয়ে আছে মৃদুল। পূর্ণার হাঁটার গতি কমে গেল, সে অকারণে লজ্জা পাচ্ছে। এগিয়ে এলো মৃদুল, তার গলায় মাফলার; মাথায় টুপি আর পরনে সোয়েটার। শীতল জলোবাতাসে শীত আরো বেশি জেঁকে ধরছে। পূর্ণা মৃদুলের দিকে না তাকিয়ে, বিনিদ্র আরক্ত চোখে হারিকেনের মৃদু আলোয় নদীর অশান্ত জলরাশির দিকে চেয়ে বলল, ‘কেন ডেকেছেন?’
‘কেমন আছো?’
পুরুষালি ভরাট কণ্ঠটি কাঁপিয়ে তুলল পূর্ণাকে। অন্য কখনও তো এমন হয় না। এখন এরকম হওয়ার কারণ কী। রাতের অন্ধকার এবং নির্জনতা?
পূর্ণা বলল, ‘ক্ষতস্থান পেকেছে। তাই একটু যন্ত্রণা হয়। আপনি কেমন আছেন?’
‘ভালো নেই।’ মৃদুলের কণ্ঠটি করুণ শোনায়।
মৃদুলের দিকে চোখ তুলে তাকাল পূর্ণা, চোখাচোখি হলো দুজনের। হারিকেনের আলোয় পূর্ণার কাজল কালো চোখ দুটি তিরের বেগে ঘায়েল করে মৃদুলকে। পূর্ণা সাবধানে প্রশ্ন করল, ‘কেন?’
‘জানি না।’
‘এত রাতে আসা ঠিক হয়নি।’
‘এত রাইতে আমার ডাকে তুমি কেন সাড়া দিলা?’
‘জানি না।’
দুজনের কেউই কথা খুঁজে পাচ্ছে না। দুজনের কেউই জানে না তারা কেন দেখা করেছে। মৃদুল জানে না সে কেন এত রাতে, তীব্র শীতে এখানে ছুটে এসেছে। পূর্ণা জানে না সে কেন পরপুরুষের ডাকে সাড়া দিল। শুধু এইটুকু জানে, তাদের অশান্ত মন শান্ত হয়েছে। খালি খালি জায়গাটা পূর্ণ হয়েছে। হৃৎস্পন্দন ছন্দ তুলে নৃত্য করছে। পূর্ণার কাঁধের ব্যথা বাড়ছে, তাই বেঁকে গেল তার ভ্রু দুটি। কাঁধে এক হাত রাখল সে। মৃদুল ব্যথিত স্বরে জানতে চাইল, ‘আবার বেদনা করে? দেখি কেমনে কী হইছে।’
মৃদুল দুই পা এগিয়ে আসতেই, পিছিয়ে গেল পূর্ণা। লাজুক ভঙ্গিতে বলল, ‘অবিবাহিত মেয়ের কাঁধ দেখতে চাওয়া অন্যায়।’
‘সে তো দেখা করাও অন্যায়। সব অন্যায় কী মানা যায়?’
‘অনেকে তো মানে।’
‘আমি পারি না।’
‘আপনি অন্যরকম।’
‘ব্যথা কমেছে?’
‘হু, হুট করে ব্যথা বেড়ে যায়। আবার সঙ্গে সঙ্গে কমেও যায়।’
‘পাকলে এরকম হয়।’
‘হু।’
‘ভয় হচ্ছে না?’
পূর্ণা কেমন করে যেন মৃদুলের দিকে তাকাল। মৃদুল থমকে যায়। পূর্ণা বলল, ‘কার ভয়? আপনার?’
‘আমার আর সমাজ—দুইটারই।’
‘আপনাকে ভয় পেলে আসতাম না। আর সমাজের ভয় অনেক আগেই কেটে গেছে।’
উত্তরে বলার মতো কিছু পেল না মৃদুল। ঝিঁঝিপোকারা ডাকছে। আলো দিচ্ছে। কী সুন্দর দেখাচ্ছে। তার মাঝে দুজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও নারী দাঁড়িয়ে আছে বুকে ভালোবাসার উথালপাতাল ঢেউ নিয়ে। অনেকক্ষণ পর মৃদুল বলল, ‘আমি আসতে চাইনি।’
পূর্ণা আবারও সেই মন কেমন করা দৃষ্টি নিয়ে তাকাল। বলল, ‘তাহলে কেন এসেছেন?’
‘মনে হইতাছে কোনো বশীকরণ তাবিজের জোরে এখানে আইসা পড়ছি।’
পূর্ণা হেসে ফেলল। হারিকেনের মায়াবী আলোয় সে হাসি কী যে ভালো দেখাচ্ছিল। তার প্রশংসা করার মতো যোগ্য শব্দ মৃদুলের ভাষার ভাণ্ডারে মজুদ নেই। সে গাঢ় স্বরে বলল, ‘পিরিতির মায়া বড়ো জ্বালা।’
কপাল ঈষৎ কুঁচকে পূর্ণা প্রশ্ন করল, ‘কার পিরিতের দহনে জ্বলছেন?’
‘তোমারে কইতে হইব?’
‘না।’
‘ঘরে যাও।’
পূর্ণা তার মুখের ধারে হারিকেন ধরে মৃদুলের দিকে চেয়ে বলল, ‘আমি কাজল দিয়েছি।’
পূর্ণা ভেবেছে তার কাজল কালো চোখ মৃদুল দেখেনি। মৃদুল তো শুরুতে দেখেই ঘায়েল হয়েছে। সে হেসে পূর্ণার চোখ, মুখ আবার দেখল। হারিকেনের হলদে আলোয় পূর্ণার তেলতেলে ত্বক চিকচিক করছে। মৃদুল বলল, ‘দেখেছি। ভালো লাগছে।’
মৃদুলের এইটুকু প্রশংসায় পূর্ণার মন নেচে উঠল। সে ঠোঁটে হাসি রেখে বলল, ‘সাবধানে বাড়ি যাবেন।’
·
·
·
চলবে……………………………………………………