ভাঙা আয়নার আলো - পর্ব ১১ - শারমিন আক্তার সাথী - ধারাবাহিক গল্প

ভাঙা আয়নার আলো - শারমিন আক্তার সাথী
বিকাল চারটা....
জবা কেবল অফিস থেকে ফিরেছে। এখন কাপড় পাল্টায়নি। ইরফান ওর পিছু পিছুই ঘরে ঢুকল। মাথা নিচু, চোখে মুখে রাজ্যের চিন্তা। জবা এসে টিকলিকে বলল,
'টিকলি আমার গ্রিন টি দিস তো। মাথা ভার হয়ে আছে।'

তখন দরজায় কলিং বেল বেজে উঠল। জবা বলল,
'টিকলি দরজা খোল।'

টিকলি দরজা খুলে দেখল সিনথিয়া দাঁড়িয়ে। বিধস্ত চেহারা। চোখে জল। টিকলির দেখে এত মায়া লাগল যে বেশ জোরেই বলে উঠল,
'টিচার আপা, আপনার এ কী অবস্থা?'

টিচার আপা নাম শুনেই চমকে উঠল জবা, ইরফান। টিকলি সিনথিয়াকে টিচার আপা ডাকে। সিনথিয়া ভিতরে প্রবেশ করল। জবা এক নজর ওর আপাদমস্তক দেখল৷ তারপর হালকা হেসে বলল,
'কী খবর টিচার ম্যাডাম? শিক্ষা দিলেন না কি নিলেন?'

সিনথিয়া অসহায় চোখে তাকিয়ে রইল। জবা সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে উপরে চলে গেল। সিনথিয়ার দিকে এক নজর তাকিয়ে ইরফান প্রস্থান করল। টিকলি অবাক হলো। কদিন যাবত এ ঘরের পরিবেশ স্বভাবতই ওকে বিস্মিত করছে। যে জবা ইরফানকে ছাড়া কিছু বুঝত না, সে ইরফানের সাথে কথা বলে না৷ আলাদা রুমে থাকছে দুজন। বললেও ঠেস মারা সব কথা। প্রশ্ন আর উত্তর এমন যেন কাঁটা ঘায়ে নুন মরিচের ছিটা। জবা যেন ইরফানের উপর কথার বোমা বিস্ফোরণ করছে। আর ইরফান নীরবে সব সয়ে যাচ্ছে।

টিকলি সিনথিয়াকে বলল,
'টিচার আপা, আপনার এ অবস্থা কেন? শরীর খারাপ? নাকি কোথাও পড়ে গিয়েছিলেন?'
'বলছি। তার আগে আমাকে পানি আর কিছু খাবার দাও। আমার প্রচণ্ড খিদা পেয়েছে।'

টিকলি কিছু নাস্তা আর পানি নিয়ে আসল। সিনথিয়া হামলে পড়ল সে সবের উপর। যেন কত কালের ক্ষুদার্ত। টিকলি তাতেও বেশ হতভম্ব। মনে মনে বলল,
'এমন হাভাতের মতো খাচ্ছে কেন? তার খাবার কি আমি চুরি করে খাব? আজব!'

জবা রুমে গিয়ে লম্বা শাওয়ার নিলো। টিকলী গ্রিন টি দিলো। আয়েশ করে তা পান করে বিছানায় গা এলিয়ে ফোন টিপতে লাগল। তারপর একটা মেসেজ পড়ল, মেসেজটা এমন,
"ম্যাডাম আপনার কথা মতো আমরা সিনথিয়ার দিকে নজর রেখেছি। আজ তার দিনটা খুবই খারাপ কেটেছে। সকালে সে বাড়ি থেকে বের হয়ে তার বান্ধবীর বাসায় যায়। ভিতরে কী কথা হয়েছে আমরা শুনিনি। কিন্তু কিছুক্ষণ পর সিনথিয়া ভয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে বের হয়েছে। সেখান থেকে সে তার ভার্সিটিতে যায়৷ সেখানে নিহাদ স্যারের সাথে কথা হয়। কী কথা হয়েছে তা আপনাকে ভিডিও করে পাঠিয়েছি। ভার্সিটি থেকে সে কয়েকটা ফ্রেন্ডের কাছ থেকে টাকা ধার নেয়। 

তারপর সে ভার্সিটি থেকে দূরে কারও সাথে দেখা করতে যায়। লোকটার পরিচয় জানি না। তবে রাতের মধ্যে জানাব। লোকটা সিনথিয়াকে কোথাও নিয়ে যায়। সেখানে আরও তিনটা লোক মিলে তাকে রেপ করার চেষ্টা করে, কিন্তু আমি কৌশলে তাকে বাঁচিয়ে দি। সে পালিয়ে আসে। তবে সম্ভবত তার সকল টাকা নিয়ে গেছে। 

রাস্তায় এসে সিনথিয়া অনেকক্ষণ বসে থাকে। পাগলের মতো কান্না করেছিল। নিজের গালে নিজে চড় মারছিল। তারপর অনেক সময় পর আপনাদের বাড়ি যায়। এখন সে আপনাদের বাড়ির ভিতরে।"

মেসেজ পড়ে জবা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
'তোমার এবং ইরফানের শাস্তি এখনও শেষ হয়নি সিনথিয়া। ইরফানের শাস্তি তো এখনও শুরুই হয়নি। অবশ্য এখনও আমি তোমাদের কাউকেই শাস্তি দেওয়া শুরু করিনি। তোমাকে এতক্ষণ তোমার কৃতকর্ম শাস্তি দিয়েছে। আমার শাস্তি এখনও বাকি। তোমাদের দুজনকে আমি এমন শাস্তি দিব যে তোমাদের রুহ পর্যন্ত শরীর থেকে বের হওয়ার জন্য ছটফট করবে।

জবা ইন্টারকমে উপরে নাস্তা দিয়ে যেতে বলল। জবার পছন্দের নাস্তা। ঘিয়ে ভাজা মুচমুচে পরোটা আর ঘন দুধ চা। আজ জবার হেলদী ডায়েটকে ধোঁকা দিবে। সারা পৃথিবী ওকে ধোঁকা দিয়েছে ও একটু খাবারের সাথেও চিট করবে না!

অনেকক্ষণ বিশ্রাম নিলো জবা। ইরফান এর মধ্যে অনেকবার ওর দরজার কাছে এসে ফিরে গেছে। ভিতরে যাওয়ার কিংবা দরজায় আওয়াজ করার সাহস হয়নি ওর। নিচে সিনথিয়ার কাছে যাওয়ার সাহসও হচ্ছে না। অনেকবার সিনথিয়াকে দেখে গেছে।

সিনথিয়া খেয়ে সোফায় গুটিসুটি মেরে বসে আছে। ইরফানের ওকে দেখে হালকা মায়া লাগল। কেন লাগল জানে না ইরফান! ও তো সিনথিয়াকে ভালোবাসে না। তবে অনেকবার শারীরিক সম্পর্ক করার দরুণ হয়ত একটা মায়া জন্মেছে৷ তবে সেসব মায়া মানুষ পোষা ককুরের জন্যও করে। ইরফানের মতে সব মায়াই ভালোবাসা নয়। তবে ইরফান হয়তো জানে না, ভালোবাসার মোহ কাটে কিন্তু মায়ার মায়া কাটে না।

তবে ও এখন সিনথিয়ার কথা বেশি ভাবতে পারল না। মস্তিষ্ক অনুমতি নিচ্ছে না। মস্তিষ্ক ওকে নিজের প্রাণ বাঁচার উপায় বের করতে বলছে। ইরফান প্রাণপণে ভেবে যাচ্ছে কীভাবে জবাকে কনভিন্স করবে! আগে তো এক তুড়িতে মাথায় নতুন নতুন পরিকল্পনা আসত, কিন্তু জবার কাছে ধরা খাওয়ার পর মাথার বুদ্ধি গুলো যেন বুদ্ধির দরজা বন্ধ করে তালা দিয়ে দিয়েছে। ইরফান চেয়েও সে তালা খুলতে পারছে না। কীভাবে জবাকে আবার নিজের ভালোবাসায় আসক্ত করবে সেটাই ওর মাথায় আসছে না!

ইরফান রাগে নিজের মাথার চুল নিজে ছিড়তে লাগল।

পরোটা রোল করে চায়ের মগে চুবিয়ে মুখে পুরল জবা। ওর এত পছন্দের খাবারটাও ওর কাছে বিস্বাদ লাগছে। মনে চাচ্ছে উগড়ে ফেলে দিবে। জবা খেল না। খাবারটা পাশের টেবিলে রেখে আবার বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসল। তখন রুমে জারা আসল,
'মাম্মা।'
'ইয়েস সুইটহার্ট।'
'কি করছো?'
'চা পরোটা খাচ্ছিলাম। তুমি খাবে?'
'এটা খুবই আনহেলদী খাবার। তুমিই বলেছো? তাহলে তুমি কেন খাচ্ছো?'
'এমনি মা। মন চাইল তাই।'
'তোমার মন খারাপ, মাম্মা? '
'কেন?'

'প্রতিদিন এ সময় তুমি নাটস আর এক কাপ গ্রিন টি খাও আজ এসব খাচ্ছো? তুমি তো রুটিন পরিবর্তন করো না?'
'জীবনে না চাইতেও অনেক কিছুই পরিবর্তন করতে হয় মা। সো হাউ ইজ ইউর ডে?'
'সো বোরিং।'
'হোয়াই?'
'নানাভাই আজ আসার কথা ছিল কিন্তু আসতে পারবে না বলল।'
'তুমি তার কাছে যেতে চাও।'
'ইয়েস। নানির হাতের আচার খেতে ভীষণ ইচ্ছে করছে। '
'ওকে গেট রেডি। আমি তোমায় দিয়ে আসছি।'

জারা তৈরি হতে চলে গেল। জবাও একটা হালকা গোলাপি রঙের শাড়ি পরল। সাথে ম্যাচিং ডায়মন্ডের হালকা পেন্ডেন্ট এবং কানে হীরার টপ। কপালে ছোট্ট একটা লাল টিপ। সব মিলিয়ে জবাকে দেখে যে কেউ মুগ্ধ হবে। যেন সাদা জবা রঙ পাল্টে গোলাপ হয়েছে। হাতে দামি ঘড়ি পরে জারাকে তৈরি করে জবা রুম থেকে বের হলো।

জবা আর জারাকে দেখে ইরফান খানিক ধাক্কা খেল। দুজনকে কী সুন্দর লাগছে! যেন ফুটন্ত গোলাপের পাশে তার ছোট্ট কলি। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল ও। হুট করে মাথায় একটা কথা ঘুরতে লাগল,
'এই সুন্দর সংসার, এত সুন্দরী স্ত্রী কন্যা রেখে ও বাইরে একটা বাজে মেয়ের চক্করে পড়ে নিজের সোনার সংসারে আগুন লাগিয়েছে। আর এ আগুণ এমন আগুণ যে পানিতেও নিভবে না। আগুনটাকে একা ছাড়লে সব পুড়িয়ে শেষ করবে আর তাকে বেশি পানি দিয়ে নেভাতে গেলে ভয়ংকর ঝড় বইয়ে যসব তছনছ করবে।'
ইরফান নিজের জানে না ও কতটা ভয়ংকর অন্যায় করেছে। এবং এর ফল কতটা ভয়াবহ হতে পারে।

জারা ইরফানকে দেখে ওর কাছে গিয়ে কোলে উঠল। ইরফান বলল,
'কোথাও যাচ্ছো মামনি?'
'ইয়েস পাপা। নানির কাছে।'
'কে নিয়ে যাবে?'
'মা নিয়ে যাবে।'
'আমাকে নিবে না?'
'না। মা তো বলল আমাকে রেখেই চলে আসবে '
'ওকে।'
জবা ইরফানের দিকে না তাকিয়েই বলল,
'আমি জারাকে মায়ের কাছে রাখতে যাচ্ছি।আজ রাতে ও সেখানেই থাকবে। বাড়ি ফিরে আমি যেন আমার ড্রয়িং রুম পরিষ্কার দেখি। কোনো জঞ্জাল আবর্জনা এসে যেন না দেখি।'

জবা ইরফানের উত্তরের তোয়াক্কা না করে জারার হাত ধরে চলে গেল। নিচে গিয়ে সিনথিয়াকে দেখে জারা বলল,
'আসসালামু আলাইকুম মিস।'
সিনথিয়া শুকনো কণ্ঠে সালামের জবাব দিয়ে জবার দিকে ঘুরে বলল,
'আপনার সাথে আমার কথা আছে।'
জবা ওর দিকে শুধু এক নজর তাকিয়ে বলল,
'জারার সামনে কোনো নাটক করার চেষ্টাও করো না। ফলাফল ভীষণ খারাপ হবে। আমি বাড়ি ফিরে যেন তোমায় না দেখি।'
সিনথিয়া দৃষ্টি নত করে রইল। জারা প্রশ্নবোধক চাহনিতে দুজনার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

জবা চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর ইরফান নিচে এসে সিনথিয়াকে বলল,
'চলে যাও।'
'কেন?'
'অনেক ঝামেলা করেছো। আর নয়।'
সিনথিয়া তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
'আমার জীবন নষ্ট করে এখন নিজের গা বাঁচাতে চাইছো। আমি তা হতে দিব না ইরফান। আমাকে সেইরকম মেয়ে ভাবলে ভুল করবে। আমি যদি মরি তাহলে তোমাকে নিয়ে মরব।'
'সে মইরো মাইরো যা খুশি করো। নাউ গেট লস্ট।'

'ইরফান শোনো, জবার সাথে কথা না বলে আমি কোথাও যাব না। তুমি যদি আমাকে যেতে বাধ্য করো তাহলে আমি বাইরে গিয়ে চেঁচামেচি করে বলব তুমি রেপ করার চেষ্টা করেছো, অথবা বিয়ে প্রলোভন দেখিয়ে আমাকে ইউস করেছে।'
'বাট এসব মিথ্যা।'
'সেটা তুমি আমি জানি বাকিরা নয়। আর একটা মেয়ে যখন কারও উপর অভিযোগ করে তখন মানহানি আগে হয়। ভুল-সঠিক প্রমাণ পরে হয়। সো তুমি তোমার কাজ করো আমাকে আমার মতো থাকতে দাও।'

রাগে ইরফানের গা জ্বলছে, কিন্তু কিছু বলতে পারছে না। সিনথিয়াকে ও এক পারসেন্টও বিশ্বাস করে না। ইরফান ওখান থেকে প্রস্থান করল।

—————

জবা বাড়ি ফিরল রাত আটটায়। ফিরে দেখে সিনথিয়া এখনও সোফায় বসে ঘুমাচ্ছে। জবা অনেকটা তীক্ষ্ণ নজরে ওর দিকে তাকাল। গভীর মনোযোগ দিয়ে ওর তাকিয়ে ভাবতে লাগল,
'ও সুন্দরী! ভয়ংকর সুন্দরী! তার জন্যই কি ইরফান আমাকে চিট করল? সৌন্দর্যই কী সব? আমার এত ভালোবাসা, যত্ন, লয়্যালেটি সব দু পায়ে ফেলে ও ওর কাছে গেল। সুন্দর নারীর সাথে শারীরিক সম্পর্কে কি আলাদা শান্তি? জানি না আমি। আমি কেবল জানি আমার সেই স্বামী আমাকে ঠকিয়েছে যাকে আমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি।'

নিজের অজান্তেই জবার চোখ বেয়ে জল পড়তে লাগল। চোখের জল মুছে কণ্ঠ রুক্ষ করে হুংকারের মতো ধ্বনি ছেড়ে চেঁচিয়ে বলল,
'তুমি এখনও যাওনি?'
সিনথিয়া হুরমুর করে উঠে দাঁড়াল। হঠাৎ ঘুম ভাঙায় শরীর থরথর করে কাঁপছে। কিছু মুহূর্ত লাগল নিজেকে ধাতস্থ করতে। জবা শব্দ করে ইরফানকে ডাকল,
'ইরফান...! ইরফান...!'

কিছু মুহূর্তেই ইরফান নিচে আসল। জবা শক্ত কণ্ঠে বলল,
'তোমাকে বলেছিলাম আমি ফিরলে যেন এই জঞ্জাল আবর্জনা আমার ঘরে না থাকে। তাহলে এখনও এখানে কেন ও?'
সিনথিয়া বলল,
'আমার কিছু কথা ছিল। প্লিজ শুনুন। জবা কী ভেবে যেন বলল,
'ওকে বলো? এখানে কী মনে করে? আমার টাকার ব্যবস্থা হয়ছে?'
সিনথিয়া জবার পা জড়িয়ে ধরে বলল,
'আমায় ক্ষমা করে দিন। আমি এখন বড্ড একা কেউ নেই আমার। এখন মরা ছাড়া আমার কোনো রাস্তা নাই।'

জবা বিদ্রুপ করে বলল,
'তো মরে যাও। আমি কী করব?'
'আমাকে ক্ষমা করুন। টাকার ঋণ থেকে মুক্ত করুন।'
'প্রশ্নই ওঠে না।'
'প্লিজ ম্যাম। আমার বাড়ির লোক আমাকে বের করে দিয়েছে। আমার বেস্ট ফ্রেন্ড আমাকে ধোঁকা দিয়েছে। কিছু লোক আমাকে রেপ করতে চেয়েছিল। আমি বহু কষ্টে পালিয়ে এসেছি। আমার কাছে বিষ খাওয়ার মতোও টাকা নেই।'

জবা অনুভূতিহীন কণ্ঠে বলল,
'তো রেপটড হতে। তোমার নতুন অভিজ্ঞতা হতো। অনেক পুরুষের সাথে মেলামেশা তোমার জন্য নতুন নয়। তোমার তো এক্সাইটেড হওয়া উচিত ছিল। আর বিষ কেনার টাকা লাগবে? ওয়েট আমি দিচ্ছি।'

জবা পার্স থেকে অনেকগুলো টাকা বের করে সিনথিয়ার মুখে ছুড়ে বলল,
'নাও এটা থেকে বিষ কিনে খেও। ভালো ব্রান্ডের বিষ কিনো। নয়তো দেখা যাবে বিষ খেলে অথচ মরলে না। নাউ গেট লস্ট।'

ইরফান খানিক ভীত কণ্ঠে বলল,
'ওকে ক্ষমা করা যায় না?'
জবা হেসে বলল,
'তুমি নিজের চিন্তা করো। এখনও ঐ স্ল্যাটটার টান টানছো? আচ্ছা ওর কাছে এমন বিশেষ কি ছিল যা আমার ছিল না? যাই হোক পুরোনো কাসুন্দি ঘেটে লাভ নেই। সিনথিয়া ইউ জাস্ট গেই আউট ইন মাই হাউস।'

ইরফান কী বলবে ভেবে পেল না! সিনথিয়া বিদ্রোহী কণ্ঠে বলে উঠল,
'শাস্তি আমি একা কেন পাব? আপনার হ্যাজবেন্ডও সমান দোষী। তো শাস্তি আমাদের দুজনার সমান হওয়া উচিত। ও তো ঠিকই আপনার রাজকীয় ভবনে থাকছে খাচ্ছে, চিল করছে। অথচ দোষ ওর বেশি বই কম না।'

জবা এবারও বিদ্রুপ হাসি হেসে বলল,
'সিরিয়াসলি! তোমার মনে হয় ওকে আমি শাস্তি দিব না? ওকে এমন শাস্তি দিব যে ওর রুহ পর্যন্ত শরীর থেকে বের হওয়ার জন্য ছটফট করবে। তবুও ওকে আমি শান্তি দিব না। তোমাকেও এত সহজে ছাড়ব না আমি।'

ইরফান সিনথিয়া উভয়ই ভয়ে ঢোক গিলল। সিনথিয়া তবুও বলল,
'আরাম আয়েশে রেখে আপনি আপনার স্বামীকে কী শাস্তি দিতে চান? আরামে রেখে কখনো কাউকে শাস্তি দেওয়া যায়? আমি তো শুনিনি।'

জবা হেসে বলল,
'যায়। ডু ইউ ওয়ান্ট টু সি?'
সিনথিয়ার গলা শুকাতে লাগল। শুকনো গলায় তবুও বলল,
'হ্যাঁ।'

জবা হাসল। ভয়ংকর শীতল সে হাসি। সে হাসির গভীরতা সিনথিয়া বুঝতে না পারলেও ইরফান বুঝল। এবং ভয়ে ওর শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত বইতে লাগল। জবা বলল,
'দ্যান স্টে উইথ আস। এখানে আরাম আয়েশে থাকো।'

সিনথিয়া খানিক অবাক হলো। জবা বলল,
'তুমি বললে না ঘরের লোক তোমাকে বের করে দিয়েছে যাওয়ার স্থান নেই। ঠিক আছে এ বাড়িতেই থাকো। কিন্তু কিছু শর্ত মতে।'
'কী শর্ত?'
'তুমি এ বাড়ির কাজের লোক হয়ে থাকবে। ঘরের কাজ করবে। থাকা খাওয়া আমার। বেতন পাঁচ হাজার। রাজি?'

সিনথিয়া জবার পরিকল্পনা বুঝতে পারছে না। ওর অদ্ভুত লাগছে। ভয়ও করছে অনেক, কিন্তু এ ছাড়া ওর কাছে কোনো উপায় নেই। বর্তমানে যাওয়ার জায়গা তো দূরে থাক একটা চকলেট কেনার দুই টাকাও নেই। আগে থাকার একটা ব্যবস্থা হোক, তারপর সবাইকে বুঝিয়ে দিবে সিনথিয়া কি জিনিস! যারা যারা ওর সাথে অন্যায় করেছে প্রত্যেকে শাস্তি দিবে। আগে নিজে একটু ঠিক হোক তারপর...!

ইরফান জবার চাল বুঝতে পারছে না। কিন্তু মনে মনে ওর বেশ শঙ্কিত। ওর অস্থির লাগছে। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ভয়ংকর কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইরফান প্রতিবাদের সুরে বলল,
'ও এখানে কেন থাকবে? ময়লাকে ডাস্টবিনে মানায়। বের করে দাও ওকে।'

জবা হালকা হেসে বলল,
'তুমি নিজের দিকে দেখো। এ বাড়ি আমার। আর কোন ময়লাকে কোন ডাস্টবিনে ফেলে পুড়িয়ে ফেলতে হয়, কিংবা মাটি চাপা দিতে হয় তা আমি জানি। তুমি নিজের চরকায় তেল দাও।'

মিইয়ে গেল ইরফান। বলার মতো তো কিছু নেই ওর। সকল পথ তো জবা বন্ধ করে দিয়েছে। জবা সিনথিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
'তোমার কাপড় চোপড় কোথায়?'
'আমার কাছে বর্তমানে পরনের কাপড় ব্যতিত কিছু নেই।'

জবা হেসে টিকলিকে ডাকল।
'টিকলি! টিকলি!'
টিকলি এসে বলল,
'জি আফা।'
'তোর পুরাতন কিছু কাপড় সিনথিয়াকে দে। তোকে আমি কাল নতুন কয়েকটা ড্রেস কিনে দিব।'

টিকলি অবাক হয়ে বলল,
'আমার কাপড় টিচার আফামনি পরবে কেন?'
জবা হেসে বলল,
'তোদের হাইট সেইম। আর এখন থেকে ও এ বাড়ির চাকর। তোর সহকারি। তোর আর রুমার যাতে কাজের চাপ কম হয় সে কারণে ওকে রাখা। ও তোদের চাকর৷ তোদের কাজ করবে। তোদের কাপড় ধোঁয়া থেকে শুরু করে যাবতীয় কাজ ও করবে। আর ঘুমাবে তোর রুমের মেঝেতে।'

বিস্ময়ে টিকলির মুখ হা হয়ে ঝুলে যাওয়ার উপক্রম হলো। চোখ যেন কোটর থেকে বেরিয়ে আসবে। বলল,
'এ কী বলছেন আফা? টিচার আফা আমাদের কাজের লোক হবে? কেন? এত লেহা পড়া করে যদি মাইনষের বাড়ি কাজের লোক হতে হয় তাহলে লেহা পড়ার কী দরকার? হুদাই কষ্ট আর টাকা খরচ।'

জবা স্মিত হেসে বলল,
'কথা তুই খারাপ বলিসনি। আসলে আমরা সবাই কারও না কারও কাজ করি। কেউ লেখা পড়া করে কাজ করে; তো কেউ না করে। লেখাপড়া করে যোগ্যতা অনুসারে যে কাজ করে সে অনেক সম্মানীত হয়। আর লেখা পড়া করে নিজের যোগ্যতায় কাজ না খুঁজে, শিক্ষিত প্রস্টিটিউট হলে তার স্থান পাতালের চেয়েও নিচে। তো তোর টিচার আফামনি পড়া লেখা করে নিজের মেধা ভালো কাজে না খাঁটিয়ে পোংটামি করছে। এখন তার ফল ভোগ করবে।'

এত অপমানে সিনথিয়ার মরে যেতে মন চাইলেও ও মরবে না। কারণ ও এখন সুযোগের অপেক্ষায় আছে। যে সুযোগে ও জবাকে ধ্বংস করবে। জবা বলল,
'টিকলি ওকে তোর রুমে নিয়ে যা।'

টিকলি সিনথিয়াকে রুমে নিয়ে যেতে যেতে বলল,
'চিটার আফা। থুক্কু টিচার আফা আপানি কী পোংটামি করেছিলেন? আমাকে বলেন। আল্লার কিরা আমি কাউরে কমু না।'

সিনথিয়া চুপ করে রইল। টিকলি আবার বলল,
'নিশ্চয়ই এমন কোনো পোংটামি করছেন যাতে জবা আফা ক্ষেপছে। নয়তো সে তো মানুষকে এমন শাস্তি দেওয়ার লোক নয়। দোষ আপনারই হবে। নয়তো জবা আপা মাইনসেরে কত ভালা পায়। কত অসহায় মানুষের জীবন সুন্দর করে দিয়েছ। আপা যারে ভালোবাসে তারে কইলজা কাইট্টা খাওয়ায়। কিন্তু যার উপ্রে ক্ষেপে তারে একদম শ্যাষ করে দেয়। সুযোগ বুঝে আপার পা ধরে ঝুইল্লা থাকবেন। দেখবেন আপনারে ক্ষমা করবে।

এহন কন নিচে শুইবেন নাকি আমার লগে বিছানার উপ্রে? জবা আফায় নিচে শুইতে বললেও আপনি আমার বিছানা শেয়ার করতে পারবেন। আমার আপত্তি নেই। তয় বিছানায় শুইলে শর্ত আছে আমার গায়ে হাত পা দিতে পারবেন না। কেউ আমার গায়ে হাত পা দিলে আমার মেজাজ গরম হয়। ঘুমের মধ্যে তারে লাত্থি দি।'

সিনথিয়া মাথা চেপে বিছানায় বসে পড়ল। জীবন ওকে কোথায় এনে দাঁড় করিয়েছে। এখন ও একজন চাকরানীর চাকরানী৷ ও লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
'ব্যাপার না। কাউকে ছাড়ব না। সবাইকে দেখে নিব।'

—————

জবা রুমে আসল। ইরফানও ওর পিছু পিছু রুমে আসল। জবা ওর দিকে ঘুরে বলল,
'ইরফান আমার প্রচণ্ড রাগ লাগছে। আমার রাগ কমানোর টেকনিক বলো তো?'

ইরফান ঢোক গিলল। জবা ড্রয়ার থেকে ওর পিস্তল বের করে ওটা সুন্দর করে মুছতে মুছতে বলল,
'জানো আগে যখন আমার রাগ লাগত আমি শুটিং প্রাকটিস করতাম। আমার নিশানা সহজে মিস হতো না। অনেকদিন হলো প্রাকটিস করি না। আজ প্রাকটিস করব।
জবা পিস্তলে বুলেট সেট করতে করতে বলল, তবে শুটিং বোর্ডে নয়। বোর্ডের রক্ত বের হয় না। আমার এত রাগ লাগছে যে রক্ত না দেখলে রাগ কমবে না। জবা পিস্তলে সাইলেন্সার লাগাতে লাগাতে বলল, এখন আমি তোমার বাম পায়ে শুট করব। নড়বে না জান, তাহলে অন্য কোথাও লেগে ক্ষতি বেশি হবে। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকো।'

ইরফানের মুখটা পাংশু বর্ণ ধারণ করল। চোখে মুখে ভয়েট স্পষ্ট ছাপ। ভয়ে পা দুটোও জমে গেছ। যেন কেউ লিকুইড নাইট্রোজেন দিয়ে পা দুটো বরফের মতো শক্ত করে দিয়েছে। ইরফান কিছু বলার আগেই একটা তীব্র আর্তনাদ হলো। ইরফান নিচে বসে পড়ল। পা থেকে গলগল করে রক্ত পড়ে ফ্লোর ভেসে যাচ্ছে। ইরফান হাত দিয়ে চেপে ধরেছে।

জবা পিস্তল ওর চিবুকে ঠেকিয়ে মুখ উঁচু করে শান্ত ভঙ্গিতে বলল,
'ব্যথা লাগছে জান? ওওও জান তোমার চোখ থেকে জল ঝড়ছে। এতটুকু ব্যথায় এমন করছো তাহলে ভাবো তুমি তো আমার হৃদয় লক্ষ কোটি গুলি করেছো যার ব্যথা তুমি বুঝবে না জান! তবে এখন থেকে বুঝবে রোজ বুঝবে। ওয়েট জান আমি ড্রেসিং করে দিচ্ছি রক্ত পড়া কমে যাবে। আর ওষুধ দিব ব্যথা ও ঘা কমে যাবে। আমি এসব প্রশিক্ষণ নিয়েছি।'

ইরফানের মুখ ব্যথায় নীলবর্ণ ধারণ করেছে। কষ্টময় কণ্ঠে বলল,
'গুলি বের করতে হবে।'
'নো জানো। গুলি অলরেডি বের হয়ে গেছে। গুলিটা জাস্ট তোমার পায়ের মাংস ছিড়ে বের হয়ে পাশের কেবিনেটে লেগে আটকে গেছে। সি দ্যাট। সেফটিক হবে না। ডোন্ট ওরি আমার কাছে এসবের সকল ওষুধ আছে।'

জবা ইরফানকে খাঁটে বসিয়ে গুলি লাগা স্থানটা দক্ষ হাতে ড্রেসিং করে সুন্দর করে ব্যান্ডজ করে দিলো৷ তারপর ইরফানকে ওষুধ খাইয়ে ওর কপালে একটা চুমু খেয়ে বলল,
'এখন ঘুমাও জান। কাল থেকে তোমার জীবনে ব্যথার দিন শুরু। তার জন্য প্রিপারেশন নিতে হবে তো। এখন সাউন্ড স্লিপ নিয়ে নাও।'

—————

অনেকদিন পর ফারিসের সাথে জবার দেখা হলো৷ কিছুদিন আগেই ফারিস দেশে ফিরেছে। জবা আজ একটা কাজে ওর ফুপার সাথে দেখা করতে গেছে। কাজ শেষে ফারিসের রুমে গেল ওর সাথে দেখা করতে।

জবাকে দেখে ফারিস বেশ বিস্মিত হলো। জবার চেহারায় সেই উজ্জ্বল জ্যোতি কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। হাজারো কষ্টের ভীর জবার সারাটা জুড়ে। এ জবাকে ফারিস কখনো দেখতে চায়নি, চিনে না, জানে না। ও যে জবাকে চিনে তার চেহারা থেকে তো আত্মবিশ্বাসের নূর উঁপচে পড়ে। তাহলে এমন কেন?

ফারিস তো জানে না, ভালোবেসে জবা জীবনে কেবল প্রত্যাখান আর ধোঁকাই পেয়েছে। ভিতরে ভেঙে চুড়ে চুরমার হলেও বাহিরে তা দেখাচ্ছে না। কিন্তু প্রিয় মানুষটার ভেতরটা যখন ভেঙে গুড়িয়ে যায় তখন অপরপাশের মানুষটা তা বুঝতে পারে। যেমন ফারিস পারছে। ভালোবাসে তো, না বুঝে যাবে কোথায়! জবাকে দেখেই ফারিসের প্রথম প্রশ্ন ছিল,
'কী হয়েছে তোর? এমন দেখাচ্ছে কেন? চেহারার উজ্জ্বলতা কমে গেছে কেন? চোখের জ্যোতি, মুখের তেজ কম কেন? যেন বিলীন হয়ে যাচ্ছে? '

জবা একটু অবাক হলো সাথে অপ্রতিভ হলো খানিকটা। ফারিস এ ধরনের প্রশ্ন ওকে কখনো করে না। জবা নিজকে স্বাভাবিক রেখে স্বাভাবিক কণ্ঠেই বলল,
'কী হবে? আমি ঠিক আছি। বিন্দ্যাস আছি।'

ফারিস জবার চোখে চোখ রেখে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
'এই লুকোচুরি অন্য কারও সাথে করিস। এই চোখের ছল আমার সাথে নয়। বল কী হয়েছে?'
জবা তাও শক্ত কণ্ঠে বলল,
'কিছু হয়নি।'

ফারিস কিছু না বলে জবার চোখের পানে তাকাল কেবল। জবার ভিতরটা কেমন নড়ে উঠল। এ চোখের চাহনিই তো ওর জীবনে প্রেমের প্রথম বসন্ত এনেছিল। আর আজ সে চোখ আবার ওর দিকে সে পুরাতন অভিব্যক্তি নিয়ে তাকাচ্ছে। এ চাহনিতে জবা ভিতরে ভিতরে ভেঙে চুরে চুরমার হচ্ছে। কিন্তু ভেতরটাতো জ্বলছে। কী করে বলবে তা! বলা কি আদৌ উচিত হবে? তবে বলা উচিত কাউকে। না বললে কষ্টটা ভিতরে ভিতরে ওকে মেরে ফেলবে। কারও কাছে সমাধান চাওয়া দরকার। কারও পরামর্শ দরকার।

জবা চেয়েও চোখের জল আটকাতে পারছিল না। চোখের জল লুকাতে পালিয়ে যেতে চাইলে ফারিস চরম সাহস নিয়ে জবার হাত শক্ত করে চেপে ধরে বলল,
'বল কী হয়েছে?'

জবা লম্বা নিঃশ্বাস নিলো। ওর কয়েকফোটা চোখের জল গাল বেয়ে পড়তেই জবা দ্রুত সেটা মুছে ফেলল। ফারিস ওর কণ্ঠ যথাসম্ভব নরম ও মোলায়েম করে বলল,
'বল আমায়? কী হয়েছে?'
'প্রতারণার কাছে আমার ভালোবাসা হেরে গেছে। পর পর দুইবার ভালোবেসে গো হারান হেরে আমি ক্লান্ত।'
'তুই কেন হারবি? তুই জীবনে যা চেয়েছিস তাই পেয়েছিস। তাহলে হারলি কীভাবে? আর ইরফান সাহেবও তো তোকে অনেক ভালোবাসে। তাহলে?'

জবা চুপটি করে সোফায় বসল। তারপর বলল,
'ইরফান জারার প্রাইভেট টিউটরের সাথে পরকীয়া করেছে।'
হতভম্ব হয়ে ফারিস চেয়ে রইল জবার পানে। জবা সবটা খুলে বলল। ফারিস কী বলবে ভেবে পেল না! ছোটোবেলা থেকে যে শক্ত জবাকে ও চিনতো, ভালোবাসার কাছে হেরে সে মেয়েটা কেমন ভেঙে নরম হয়ে গেছে।

ভিতটে এতটা ভেঙেও বাইরে কতটা শক্ত আবরণ তৈরি করে রেখেছে। এমন অনবদ্য রমনী কোথাও আছে কি?
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp