মাহিরের খামখেয়ালীর জন্য আয়নাকে চট করে গোসল করে নিতে হলো। ভেজা চুলগুলো গামছায় পেছিয়ে খোপা করে মাহিরকে দেখতে গেলো। ভদ্রলোক ফোনে কথা বলছিলেন। বাড়িতে ফেরার পর থেকেই থেমে থেমে ফোন আসছে। আয়নাকে আড়াল করে যতটা পারা যায় সে গম্ভীর মুখে কথা বলছে। আয়না যা শুনতে পেয়েছিল তা নিয়ে কোনো কথা বলেনি এখন পর্যন্ত। অন্তত কিছু জিনিস মাহিরের ওতো নিজে থেকেই তাকে বলা উচিত।
আয়না ছোট টেবিলটার কাছে দাঁড়িয়ে দিনার রেখে যাওয়া বাটিটা তুলে নিল। সে মাহিরের দিকে ফিরল।
-স্যুপ খেয়েছো? ঠিক হয়ে বসো।
সরাসরি ওর দিকে না তাকিয়েই বলল আয়না,
পিঠের ওপর প্রেশার দেওয়া ঠিক হবে না। আর প্লাস্টার করা হাত এতো বেশি নাড়াবে না। প্রপার রেস্ট দিলে দ্রুত সেড়ে যেতে পারে।
মাহির নিজেকে একটু মানিয়ে বসার চেষ্টা করল। ওইটুকু নড়াচড়াতেও সামান্য মুখ কুঁচকে উঠল ওর, আবেশে জলকেলি আর দৌড়াদৌড়ির সময় টের পায়নি। এখন কড়ায়-গণ্ডায় মাশুল দিতে হচ্ছে।
দুপুরে কী খাবে? - সে জিজ্ঞেস করল।
মাহির একটু থতমত খেল, মনে হলো প্রশ্নটা ওর মাথায় ঠিকমতো ঢোকেনি।
-যেকোনো কিছু হলেই হবে।
সে অভ্যাসবশত বলে ফেলল, খামোখা কষ্ট বাড়ানোর দরকার নেই।
আয়নার ভ্রু সামান্য কুঁচকাল,
আমি জানতে চাইনি যে কী হলে চলবে, আমি জিজ্ঞেস করেছি তুমি কী খেতে চাও।
মাহির একটু অসহায় ভঙ্গিতে হাসল,
আসলেই, যা রান্না করবে তা-ই খাব। আমার একদম কোনো প্রেফারেন্স নেই।
আয়না হাত বুকে ভাঁজ করে টেবিলের সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল। একটা সরল উত্তর এই বান্দার ভেতর থেকে বের করা যায় না!
-ভাবো তো একবার, তোমার কী খেতে ইচ্ছে করছে?
মাহির অন্যদিকে দিকে তাকিয়ে রইল, খুবই সাধারণ একটা প্রশ্ন। তবুও ওর মাথাটা কেমন যেন ফাঁকা হয়ে গেল। ওর ইচ্ছে শেষ কবে জানতে চাওয়া হয়েছিল? ওর কাজ তো সবার ইচ্ছে পূরণ করা।
-আমি... ঠিক জানি না। আসলে গরম তো লাইট কিছুই সবার খাওয়া উচিত। মানে আমারো। ডাল, ভাজি যা আছে তাই। যেটা ইজি হয়। বেশিক্ষণ যেন আগুনের কাছে থাকতে না হয়।
সে নিচু স্বরে স্বীকার করল। দু'দিন সে বাজার করেনি। কি যে বিপদ হলো!
আয়নার চেহারার ভাব বদলে গেল। সে স্বর নরম করে বলল, ঠিক আছে। তাহলে আমাকে এটা বলো, তুমি কী মাছ পছন্দ করো?
মাহির মাথা তুলে তাকাল। আয়না বিষয়টাকে এত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে দেখে সে একটু অবাক হয়।
-মাছ?
-হ্যাঁ, মাছ। অথবা মাংস। যেটাই হোক শুধু মনে যা আসে, উত্তর দাও।
মাহির লম্বা শ্বাস ছাড়ল,একটু সময় নিয়ে ভাবল সে, শিং, কই, রুই এই তো।
আয়না মাথা নাড়ল, খুব মন দিয়ে শুনল সবটা, আর?
মাহির ইতস্তত করে যোগ করল, মাঝে মাঝে গরুর মাংস। তবে খুব একটা ঝাল না।
আয়না কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর খুব সহজভাবে জিজ্ঞেস করল,
-চিংড়ি পছন্দ করো? নিশিখালিতে দেখেছিলাম।
এই একটা প্রশ্নে মাহির পুরোপুরি থেমে গেল। সে উত্তর দিল, হ্যাঁ কিন্তু... বাড়িতে সবাই এটা খুব একটা পছন্দ করে না। তাই রান্নাও হয় না।
আয়না কোনো উত্তর দিল না। কিন্তু কথাটি সে মনে রাখল। সে শুধু সামান্য মাথা নাড়িয়ে ঘুরে দাঁড়াল এবং বলল, চোখ বন্ধ করে রেস্ট নাও।
তারপর সে হন্তদন্ত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
—————
আয়না যখন ফিরে এল তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে। সে টেবিলের ওপর খাবারের ক্যারিয়ারটা রাখল এবং নিঃশব্দে সবকিছু গোছাতে শুরু করল।
মাহির অবাক হয়ে বলে, আমি নিচে যেতে পারতাম তো। নিয়ে এসেছো সব?
-হ্যাঁ। খেয়ে নিতে হবে দ্রুত। ঔষধের সময় মিস হয়ে যাবে।
সে মাহিরের সামনে একটা প্লেট রাখল এবং ভাত বেড়ে দিতে শুরু করল।
মাহির একটু নড়েচড়ে বসল, আমি পারব।
আয়না ওর ব্যান্ডেজ করা হাতের দিকে ইশারা করল। মাহির আর কোনো কথা খুঁজে পেল না।
আয়না তরকারি বাড়ল। তারপর একটু থামল,
আমি কি মাখিয়ে দিব? চামচ দিয়ে খেতে সুবিধা হবে তাহলে।
মাহির উত্তর করল না। আয়না ইতস্তত করে বলল, নাকি...খাইয়ে দিব?
-কি বললে?
-আমি মানে আমি কি খাইয়ে দিব? মানে বাকিরা তো সবাই ব্যস্ত। তাই বললাম আর কি!
কথাটা ঘরের বাতাসে থমকে রইল। মাহির এবার ওর দিকে মুখ তুলে তাকাল। তাকাল একদম সরাসরি এবং তার দৃষ্টিতে কোনো উপহাস বা অস্বস্তিও নেই।
আয়না খুব দ্রুত যোগ করল, কি হলো? বলো?
মাহির কিছু না বলে মৃদু হাসল। আয়নাকে তার পাশে বসতে ইশারা করল। মানে ভদ্রলোক সম্মতি দিয়েছেন।
আয়না আর কিছু বলল না। সে পাশে বসে ভাত আর তরকারি ভালো করে মাখাতে লাগল।
ওর চোখ প্লেটের দিকে নেমে এল। ভাতের সাথে মাখানো ওটা চিংড়ির মালাইকারি। সে আবার সেদিকে তাকাল। তারপর আয়নার দিকে।
-তুমি এটা নিয়ে এসেছ? - সে ভীষণ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
আয়না উত্তর দিল না। সে শুধু লোকমা তুলে ওর সামনে বাড়িয়ে ধরল। মাহির সেটা সাথে সাথে নিল না।
-বাজারে গিয়েছিলে এই ভর দুপুরে? একা? আমি বললাম দেখেই কি তুমি বাইরে গিয়েছিলে?
মাহির দেখল যা যা রেঁধেছে সবই ওর পছন্দের, কথায় কথায় সে যা বলেছে, আয়না তা-ই হাজির করেছে।
মাহিরের বয়স দশ ছিল যখন সে জানতে পারে তার পছন্দের আর কোনো গুরুত্ব নেই খাবার টেবিলে। মা-বাবার উপস্থিতি হলো সন্তানের জীবনে এক টুকরো মেঘের মতো৷ গ্রীষ্মের দাবদাহে ছায়া দেয়, বৃষ্টি দিয়ে জীবনের সঞ্চালন করে।
তাদের অনুপস্থিতিতে মাহিরের জীবন বাতাসের তীব্রতায় গাছ থেকে হারিয়ে যাওয়া সেই কচি পাতার মতো হয়ে গেল যা আর কখনো পূর্ণতা পায়নি।
খাবারের টেবিলে বসে সে দেখল চিংড়ি মাছ ভুনা। চোখ আটকে গেল সেখানেই। আগে বাসায় প্রায়ই বাবা তার জন্য নিয়ে আসতেন, কোনোদিন বলতে হয়নি৷ একটুখানি দিয়েই সে পুরো প্লেট ভাত খেতে পারে, এতো মজা করে মা রানে করে তাদের জন্য!
বাবা বলেছিলেন ভালো একটা রেস্ট্রুরেন্টে নিয়ে গিয়ে লবস্টার খাওয়াবে তাকে। কক্সবাজারে যাওয়ারও একটা প্ল্যান ছিল।
মাহিরের দাদী তাকে বসিয়ে প্লেটে মাছ তুলে দিয়ে বলল, খাও নাতি। তোমার চাচারে কওয়া মাত্রই আইনা দিছে তোমার জন্য।
মাহির চাচার প্রতি কৃতজ্ঞতায় নত হয়ে গেল। এই বাড়িতে তাকে ভালো রাখার বেশি মানুষ নেই। যারা আছে তাদের প্রতি তার অনেক আশা, প্রতিদিন কিছুটা ভাঙ্গে, কিছুটা গড়ে। এভাবেই চলছে তার জীবন।
রায়হান নাক কুঁচকে বলল, বাবাকে আমি যেটা বলি সেটা তো কখনো আনতে চায় না।
রায়হানের রাগ বেশি। দাদী দ্রুত তার পাশে গিয়ে তাকে ভালোমন্দ বোঝাতে লাগলেন। মাহিরের তো মা বাবা নেই। তাদেরকেই তো এখন তাকে দেখে রাখতে হবে। নাহলে মাহিরের কি হবে?
কথাগুলো মাহিরের কানে বিষের মতো লাগে। আচ্ছা দাদীর তো ভালো কথাই বলে, তবে সে মেনে নিতে পারে না কেন? আত্মীয়তা দয়ার মতো মনে হয় কেন?
শারমিন আরা টেবিলে এসে বসলেন। আজকে তার ডাবল শিফট ছিল। রান্নাঘরের কাজের জন্য একটা ছুটা বুয়া রাখা আছে। অন্য সময়ে সাহেরা বানু কাজের লোকের রান্না খাওয়া নিয়ে তুলকালাম করলেও এইবেলা আর টু শব্দ করেন না।
সে টেবিলের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি তো অন্য কিছু নামিয়ে রেখে গিয়েছিলাম। সেগুলো রান্না করল না কেন?
সাহেরা বানু বললেন, মাহিরের চিংড়ি মাছ খেতে শখ হইছিল। তাই মনসুর বাজার থেকে নিয়া আসছে। খাইতে বসো বউ।
শারমিন আরা ঠান্ডা স্বরে বললেন, মাহিরের শখ হয়েছে? ভালো তো।
মাহিরের শরীর হিম হয়ে গেল। সে ছোট্ট হাতে ভাত মাখতে লাগল, কিন্তু লোকমা মুখ দিতে পারল না। মা তো মা, মাহিরকে আগে বাবাও ভাত খাইয়ে দিতেন।
রায়হান আবার ঘ্যান ঘ্যান করল। মনসুল আলম বিরক্ত হয়ে বললেন,
কি এক আজাব হয়েছে! তোর চাওয়া পাওয়ার তো কোনো লিমিট নাই। হাতির মতো হচ্ছিস। কেমন লাগে দেখতে? আর রেজাল্ট? আগে মাহিরের ধারের কাছে পজিশন নে পরে কথা বলিস হারামজাদা।
রায়হানের তার বাবার কাছে আসলে কিন্তু চাওয়া লাগে না। তার তিন মামা কলিজা কেটে দেওয়া ছাড়া বাকিসব আদরযত্ন ভাগ্নের জন্য বরাদ্দ রাখে। কিন্তু মাহিরকে তার খুব বিরক্ত লাগে। তার জন্য মনসুর আলম তাকে কথা শোনানো ছাড়ে না।
শারমিন আরা বললেন, দুই শিফট কাজ করে এসেছি। তোমার এতো চেঁচামেচির কারণ কি? কথায় কথায় ছেলেকে এইসব বলবে না।
রায়হানের প্লেটে খাবার তুলতে গেলে শারমিন আরা তাকে থামিয়ে দেয়। শুধু ডাল দিয়ে দেয়। রায়হান মার বিরুদ্ধে কিছু বলার সাহস পায় না। সাহেরা বানু অবাক হয়ে বলে, এই কি! হেরে মাছ দাও।
-সে খাবে না আম্মা। আপনারা খান।
-তুমিও নিবা না? খালি ডাল দিয়ে খাইতেছো কেন?
-আমার এলার্জি। মাহিরকে দেন। ওর চাচাকে দেন।
শেষমেশ মাহিরকে ছাড়া আর কেউ সেদিন চিংড়ি মাছ খায়নি। এরপর কেন যেন আর কখনো রান্নাও হয়নি।
আয়না বলল, কি ভাবছো? ঠান্ডা হওয়ার আগেই খেয়ে নাও।
মাহির তার দিকে তাকিয়ে রইল। বিয়ের খুব বেশিদিন হয়নি কিন্তু ইতিমধ্যেই মেয়েটা তাকে অসংখ্যবার নির্বাক করে দিয়েছে।
আয়না হাল ছেড়ে বলল, গিয়েছি বাজার করতে তো কি হয়েছে? এইটুকু কি আমি পারি না? ননীর পুতুল নাকি আমি? হা করো?
মাহির হাসল। বারবার চোখ পিটপিট করে নিজেকে সংযত করল। তারপর স্ত্রীর হাতে দুপুরের ভোজল সারল।
—————
দুইদিন ধরে রামিন ইউনিভার্সিটি যায় না। এর মাঝে এসে একবার আয়নার কাছে ফ্রিল্যান্সিং সম্পর্কে জেনে গেছে। নিজেকে থেকে জিজ্ঞেস করায় আয়নাও সুন্দর করে বুঝিয়ে বলেছে।
আজ আয়না রামিনকে বলল, তোমার ফ্রেন্ড ল্যান্ডলাইনে কল করেছিল। আমি বলেছি বাড়িতে নেই।
রামিন চমকে বলল, কেন?
-কল ব্যাক করে বলব যে আছো?
-না না! একদম না। আমি এখন ওদের সাথে ইন্টারেক্ট করতে চাইনা।
-সেটাই ভেবেছিলাম। টেইক টাইম! যেখানে থাকলে আত্মবিশ্বাস, সময়, পজিটিভিটি, মোটিভেশন ড্রেইন হয়ে যায় সেখান থেকে সরে আসা বেটার।
রামিন মাথা নিচু করে রইল।তারপর বলল, বাই দ্যা হয়ে, মাহির ভাইয়ার কলিগ এসেছে কিন্তু। ভাইয়া ডাইরেক্ট চিলেকোঠায় নিয়ে গেছে।
আয়না জিজ্ঞেস করল, কখন এসেছে?
-আপনি বাইরে যাওয়ার পরপরই, এক ঘন্টা তো হবে।
আয়না দ্রুত চায়ের ট্রে হাতে নিয়ে চিন্তিত মুখে উপরে উঠল। ঘরের বাইরে দাড়িয়েই তাদের উত্তেজিত কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে। সম্ভবত মাহিরের সাথে তাদের বনিবনা হচ্ছে না। শরীর এখন কিছুটা ভালোর দিকে, এরমধ্যে আয়না মোটেও চায়নি এইসব নিয়ে তার এতো দুশ্চিন্তা করতে হোক।
আয়না নক করে ঢুকে টেবিলে চা রাখতেই তারা থমথমে মুখে উঠে দাঁড়াল। শফিক সাহেব বললেন, ভাবীর ওনাকে একটু বুঝাবেন প্লিজ!
-একটু চা-
-সম্ভব না। আমরা উঠলাম।
আয়না মাহিরের বিধ্বস্ত মুখাবয়বের দিকে তাকাল। মাহির কোনো কথা না বলে ছাদে চলে গেল।
আয়না ইতস্তত করে সেখানে চা নিয়ে গেল।
মাহির মানা করার আগেই বলল, ভালো লাগবে, নাও।
মাহির এবার আর না করল না। চুপচাপ কাপটা হাতে নিল, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে চা খেল না। কিছুক্ষণ শুধু ধোঁয়া ওঠা চায়ের দিকে তাকিয়ে রইল যেন সেখানে কোনো উত্তর খুঁজছে।
আয়না কিছু বলল না। দাঁড়িয়ে রইল। তারপর একদম সরাসরি জিজ্ঞেস করল, কি হয়েছে?
কোনো ঘুরপাক নেই, কোনো নরম ভূমিকা নেই। তাদের সম্পর্কের বোঝাপড়াটা বেশ অদ্ভুত। বেশিরভাগ সময় নীরবতা রাজ্য করে আর যখন ভাষা প্রয়োগ করে, তা হয় একদম কঠোর ও স্পষ্ট।
মাহির নাক দিয়ে একটা ছোট শ্বাস ছাড়ল, অফিসের ঝামেলা। আমার ধারণা তুমি শুনে ফেলেছো।
আয়না বলল, হয়তো। তবে তোমার জানানো উচিত না?
আয়নার তীব্র দৃষ্টি মাহিরকে আর চুপ থাকতে দিল না।
সে বলল, যে টাকাটা আমি সেদিন ক্যারি করছিলাম, ম্যানেজমেন্টের ওরা বলছে সেটা ঠিকভাবে রিপোর্ট করা হয়নি। আমি নাকি ঠিকমতো সেফটি মেইনটেইন করিনি। সবটা আমার অবহেলা।
আয়নার ভ্রু কুঁচকে গেল, মানে?
-মানে কেউ একটা অ্যানোনিমাস কমপ্লেইন করেছে।
ওরা ইঙ্গিত দিচ্ছে পুরো ব্যাপারটা আমি নিজেই সাজিয়েছি। ভিতরের লোক না হলে এত সহজে নাকি সম্ভব না।
কথাটা বাতাসে ভারী হয়ে ঝুলে রইল।
আয়না হতভম্ব হয়ে বলল, মানে বলছে যে তুমি ইচ্ছা করে এই ছিনতাই করিয়েছ? নিজে আহত হয়েছো!
মাহির ঠোঁটের কোণে হালকা তাচ্ছিল্যের হাসি টানল, খুব সুবিধাজনক না?
আয়নার মুখ শক্ত হয়ে উঠল, প্রমাণ ছাড়া এসব কিভাবে বলতে পারে তারা!
মাহির শান্ত গলায় বলল, তাদের প্রমাণ লাগবে না আয়না, শুধু একটা এক্সকিউজ লাগবে। টাকাটা আমার দায়িত্বে ছিল। এখন সেটা নেই। এইটুকুই ওদের জন্য যথেষ্ট।
আয়না এবার একটু এগিয়ে এল, এখন ওরা কী চায় আমাদের কাছে?
হতাশাগ্রস্ত মাহির উত্তর দিল,
আজকে যারা এসেছিল ম্যানেজমেন্টের হয়ে তারা বুঝাতে এসেছে। বলেছে যে আমি যদি কোঅপারেট করি তাহলে নাকি ভেতরেই ম্যানেজ হয়ে যাবে।
আয়নার চোখ সরু হলো, কিভাবে?
-একটা স্টেটমেন্টে সাইন করতে হবে।
-কিসের স্টেটমেন্ট?
-আমি নেগলিজেন্ট ছিলাম। টাকাটা ঠিকমতো সিকিউর করতে পারিনি। আর আমি ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি।
আয়না স্থির হয়ে গেল, ওরা চায় তুমি টাকা দাও?
-কমপক্ষে অর্ধেক এবং এখনই।
বাকিটা?
মাহির হালকা কাঁধ ঝাঁকাল, পরে অ্যাডজাস্ট করবে।
আয়না ধীরে শ্বাস নিল, এটা অ্যাডজাস্ট না। এটা জোর করে দোষ চাপানো। নিশ্চয়ই কোন বিগফিশকে বাঁচাতে চাইছে। চরম সন্দেহজনক লাগছে সব কিছু।
মাহির কিছু বলল না কারণ কথাটা ভুল না।
একটু পর সে নিজেই বলল,
আর যদি আমি না করি তাহলে লিগ্যাল প্রসিডিং শুরু করবে। কোনোরকম তদন্তের ও সময় দিবে না।
মাহির এবার দৃষ্টি সরিয়ে নিল। দূরের দিকে তাকাল, পরিবারের সবাই সাফার করবে। পাবলিক হিউমিলেশন সহ্য করতে হবে। কর্পোরেট চাইলে অনেক নিচে নামতে পারে।
মাহিরের ন্যায়পরায়ণতা বোধ প্রখর। কিন্তু নিজের জন্য অন্যদের কষ্ট করতে হবে তা মানা প্রায় অসম্ভব।
আয়না ধীরে ধীরে বলল, তোমার টিম?
মাহিরের মুখে হালকা একটা টান পড়ল, ওদের ও রিভিউ, অডিট করা হবে।
আয়না বুঝতে পারল, মানে ওদের চাকরি যেতে পারে। সেটাই তোমাকে জানিয়ে গেল।
মাহির মাথা নিচু করল,তিন-চারজনকে বাদ দিতে হতে পারে। আমার সুপারভিশনে হয়েছে বলে।
মাহির ধীরে শ্বাস ছাড়ল, ওদের পরিবার আছে।
আয়না এবার সরাসরি বলল, তুমি কী করবে?
মাহির এক মুহূর্তও দেরি করল না, আমি কিছুতেই সাইন করব না।
আয়না তাকিয়ে রইল, আর টাকা?
মাহির বলল, সেটা আমি জোগাড় করব।
-কোথা থেকে?
কোনো উত্তর নেই।
-মাহির!
সে এবার একটু বিরক্ত শ্বাস হয়ে বলল, বলেছি না, ম্যানেজ করব।
আয়নার গলায় এবার হালকা দৃঢ়তা এলো, তোমার কাছে এমুহূর্তে ওই পরিমাণ টাকা নেই। বাড়িতে চাচাকে বলবে?
-না!
কথাটা সরাসরি গিয়ে লাগল। মাহির এবার তার দিকে তাকাল। তার চোখে এক ঝলক তীব্র আত্মসম্মানবোধ দেখতে পেল আয়না।
আয়না ধীরে এগিয়ে এল। খুব শান্ত গলায় বলল, শুনো? একটা কথা বলি?
মাহির কিছু বলল না। শুধু ভ্রু সামান্য কুঁচকাল।
-টাকাটা আমি দিতে পারি।
এইবার মাহির পুরোপুরি ঘুরে তাকাল তার দিকে। চোখে পরিষ্কার অবিশ্বাস।
তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, কি?
-আমার কাছে কিছু টাকা আছে। সেভিংস হিসেবে। নিশিখালির টাকা না।
তাও মাহির যেন কথাটা হজম করতে পারছিল না। রফিক সরকারের না হোক, স্ত্রীর সেভিংসে সে হাত দিবে!
আয়না স্পষ্টভাবে বলল,
এখানে বাইরে গিয়ে ব্যাংক, অফিস, কারও কাছে গিয়ে সময় নষ্ট করার দরকার নেই। এত কম সময়ের মধ্যে কেউই দেবে না। আর তুমি যেটা ভাবছো সেটা, মানে এই ধরনের লোকের কাছ থেকে ধার নেওয়া ওটা কোনো সুস্থ অপশন না।
-আয়না! আমি জানি তুমি তুমি দুশ্চিন্তা করছো। আমি ব্যাপারটা সামলে নিব একদম।
-কেন অন্যদের-
-আমি তোমার জমানো টাকা নিতে পারি না!
আয়নার মুখে খুব হালকা একটা পরিবর্তন এল।
সে শান্ত গলায় বলল, এটা আমার টাকা হলেও, সমস্যাটা আমাদের।
মাহির চোখ মুখ শক্ত করে বলল, এই নিয়ে আর কথা শুনতে চাইছি না। এটা আমার ব্যাপার। তুমি ভেতরে এসো, ঠান্ডা লাগবে।
এই মানুষটা কখনো কারো কাছে হাত পাততে জানে না এটা সে অনেক আগেই বুঝেছে।
কিন্তু আজ পরিস্থিতিটা এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে না চাইলেও তাকে হয়তো হাত বাড়াতেই হবে।
আয়না একটা দীর্ঘশ্বাস নিল। বুকের ভেতরটা কেন জানি বড্ড ভারী হয়ে উঠছে। রাগ আর অসহায়ত্বের এই মিশেলটা আজ বড্ড অসহ্য লাগছে।
এতটা একা হয়ে কেন যে মানুষটা সব সামলাতে চায়! নিজের ছোট একটা কষ্টও কি সে কারো সাথে ভাগ করে নিতে পারে না? সব যন্ত্রণা পাথরের মতো ভেতরে চেপে রাখে।
তার হতাশাগ্রস্থ অসুস্থ শরীরটাকে মাথা নিচু কর এগিয়ে যেতে দেখে আয়নার বুকের ভেতরটাকে ভারী করে তুলতে লাগল।
·
·
·
চলবে……………………………………………………