স্নিগ্ধ সকাল। নরম আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারপাশ, গাছের পাতায় জমে থাকা শিশির রোদের ছোঁয়ায় ঝিলমিল করছে। হালকা বাতাসে দুলছে ডালপালা, দূরে কোথাও পাখিদের কোলাহল। সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন তার সবচেয়ে কোমল রূপে ধরা দিয়েছে।
তবু এই সৌন্দর্যের মাঝেও একরাশ শূন্যতা জমে আছে ফারিসের মনে। পাখিদের সেই মিষ্টি ডাক আজ তার কানে বেসুরো, কর্কশ লাগে। দূরে একটা কাকের কর্কশ ধ্বনি সে বেসুরো শব্দের অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে দিলো।
বাতাসের মোলায়েম ছোঁয়াও এনে দেয় না কোনো স্বস্তি। অথচ এই প্রকৃতির টানেই তো সে ছুটে বেড়িয়েছে দেশ-বিদেশ। দুর্গম পাহাড়, নির্জন বন, অচেনা উপত্যকা। প্রকৃতির আরও কাছে যাওয়ার নেশায় নিজের জীবনটাকেই করে তুলেছিল এক দীর্ঘ ভ্রমণ।
জবাকে হারানোর পর তো সে নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দিয়েছিল প্রকৃতির কাছে। প্রকৃতি আর ফিরনাস ছাড়া তো কিছু ছিল না জীবনে।
ভাবছিল, এই বিশালতা, এই নিসর্গই হয়তো তার ভাঙা মনটাকে জোড়া লাগাবে।
এতদিন তাই হয়েছিলও। প্রকৃতি আর ফিরনাস নিঃসঙ্গতার সঙ্গী হয়ে বাঁচিয়ে রেখেছিল তাকে। কিন্তু আজ...!
সবকিছু বদলে গেছে। এই সবুজ, এই আলো, এই পাখির গান। কিছুই আর তাকে ছুঁতে পারছে না। সবকিছু কেমন বিষাদময়, কেমন নির্জীব মনে হচ্ছে।
জবা আর ওর বিচ্ছেদের আসল কারণ জানার পর থেকে বুকের ভেতর জমে থাকা শূন্যতা যেন আরও গভীর আরও ভারী হয়ে উঠেছে।
হালিমা খাতুনের ওপর রাগ করেও লাভ, নেই। মৃত মানুষের প্রতি ক্ষোভ তো আর কোনো উত্তর দেয় না। তবু অভিমানটা গিয়েও যায় না। আটকে থাকে মনের অন্তরালে।
আর মোস্তফা হোসেন, তার প্রতি এই অভিমান যেন আরও তীব্র হচ্ছে। যেন হালকা কালো মেঘ ক্রমে ক্রমে কালো মেঘে ঘনীভূত হচ্ছে। সব জানতেন তিনি। সবকিছু! তবু চুপ ছিলেন। কেন? কেন একবারও সত্যিটা বলেননি? বললে হয়তো আজকের এই ভাঙনটা হতো না।
জবা আর ফারিসের পথ আলাদা হয়ে যেত না। ওদের জীবন এমন দিশেহারা, এমন ছন্নছাড়া হয়ে উঠত না।
ভাবনাগুলো একটার পর একটা এসে ফারিসকে গ্রাস করতে থাকে। চারপাশের সেই সুন্দর সকালটা যেন ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায় ওর চোখে।
চায়ের কাপে চুমুক দিতেই মুখ বিকৃত করে ফেলে ফারিস। তিক্ত, কষা একেবারেই অরুচিকর। মনে হয়, আজ সবকিছুই যেন স্বাদ হারিয়ে ফেলেছে। প্রকৃতি, স্মৃতি, ভালোবাসা সব।
কাপটা নামিয়ে রেখে ফারিস ভ্রু কুঁচকে ফেলল। এই জঘন্য চা কে বানিয়েছে?
জানতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু প্রশ্নটা মুখে আনার আগেই থেমে গেল। কারণ ভেতরে ভেতরে ও জানে, আজ শুধু চা-ই তিক্ত নয়, ওর পুরো জীবনটাই যেন এক অদৃশ্য তিক্ততায় ডুবে গেছে।
চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে বাগানের অন্যপাশে তাকাল। ফিরনাস আর ওর ছোটোভাই ইনান ক্রিকেট খেলছে। ফিরনাসকে এমন হেসে খেলতে দেখে ফারিসের মনটা একটু ভালো হলো।
ফারিসকে ওদের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ইনান বলল,
'ভাই এমন করে তাকিয়ে আছিস যে?'
'এমনি তোদের দেখছি।'
'কেন?'
'দেখতে ভালো লাগছে তাই। কেন তোদের দেখতে ট্যাক্স লাগবে।'
'তা তো লাগবেই। আমাকে আর আমার ভাতিজার মতো হ্যান্ডসাম ডুডকে দেখতে হলে অবশ্যই ট্যাক্স দিতে হবে।'
'কত?'
'তোর মানিব্যাগ দে আমরা নিয়ে নিচ্ছি।'
ফারিস কোনো কথা না বলে মানিব্যাগটা টেবিলে রাখল। ইনান ব্যাগ খুলে কয়েক হাজার টাকা নিল। তারপর ফিরনাসকে বলল,
'চল ভাইস্তা আজ পার্টি হবে। বল কোথায় যাবি? কী খাবি?'
'আই লাভ বিরিয়ানি।'
'ওকে। চল।'
ফারিস দুজনকে থামিয়ে বলল,
'এই সাতসকালে পার্টি কে করে? আর সকালে বিরিয়ানিই-বা কে খায়?'
ইনান বলল,
'ও হ্যাঁ। ফিরনাস আমরা রাতে যাব।'
'ওকে চাচ্চু। এখন আমি একটু দাদাভাইয়ের কাছে যাই। সে বলছে আজ সকালে আমার সাথে দাবা খেলবে।'
'ওকে, গো।'
ফিরনাস যেতেই ইনান বলল,
'দেবদাস ভাই।'
ফারিস চোখ তুলে তাকাল। খানিকটা কঠর চোখে। ইনান বলল,
'ইয়ে মানে ফারিস ভাই।'
'বল।'
'এখনও সেই মেয়েকে ভালোবাসিস?'
'কোন মেয়ে?'
'যার কারণে বিয়ে করলি না। ফিরনাসকে নিজের ছেলে করলি।'
'হ্যাঁ বাসি। আর সারাজীবন তাকেই ভালোবাসব।'
'সে হয়তো সুখের সংসার করছে।'
ফারিস ফস করে নিঃশ্বাস ফেলল। আসলে কি জবা সুখের সংসার করছে? ওর মতো দুঃখী এখন কে আছে?
'ভাই, মেয়েটা কে? আজও জানালি না।'
'জানালে কী হবে?'
'চিনে রাখতাম কো সেই ছলনাময়ী?'
'সে আমার সাথে প্রতারণা করেনি বরং পরিস্থিতি আমাদের সাথে প্রতারণা করেছে। ওসব বাদ দে। সায়নীর কী খবর?'
'ব্রেকাপ হয়ে গেছে।'
'কেন?'
'বিয়ে বিয়ে করে মাথা খাচ্ছিল।'
'তো বিয়ে করে নে। বয়স তো কম হলো না।'
'দূর। বিয়ে টিয়েতে মন নেই আমার। বিন্দ্যাস আছি এখন।'
'মেয়েটার কথা একবার ভাব।'
'ওমন সায়নী কত আসবে যাবে।'
ফারিস তাচ্ছিল্য হাসি হেসে বলল,
'একটু আগে আমায় দেবদাস বললি না? একদিন না তুই তার মতো হোস।'
'কখনো না। আমি ছাড়া ওর জীবন না চললেও, ও ছাড়া আমার জীবন সুন্দরভাবে চলে যাবে।'
ফারিস হেসে বলল,
'দেবদাসও তাই ভেবেছিল তাকে ছাড়া পারু মরে যাবে অথচ তার জ্বরটুকু অব্দি আসেনি৷ আমার অবস্থাই দেখ। মেয়েটাকে নিজের মনের কথা না বলে ভেবেছিলাম ফারিস হোসেন তালুকদারকে কোনো মেয়ে প্রত্যাখান করতে পারবে না। সারাজীবন অপেক্ষা করবে। মনে একটা অহংকারবোধ তৈরি হয়েছিল।
অথচ সে মেয়ে সুখে সংসার করে বাচ্চা ফুটিয়ে ফেলেছে। আর আমাকে দেখ দেবদাস হয়ে আছি। কবে যেন পারুর বিশাল জমিদার মহলের সামনে গিয়ে মুখ থুবরে মরে থাকি। তাই বলি মনে অহমিকা বোধ কমা। আমাদের এ তালুকদার বংশের লোকদের মনে প্রচুর অহংকার। ফলাফল তারা তাদের গোয়া ভরা অহংকার নিয়ে শূন্য হাতে বসে থাকে। ভালো থাকার মাধ্যম তারা খুঁজে পায় না।'.
ফারিসের কথায় ইনান কিছুটা ভাবুক হয়ে উঠল। মনে মনে যেন বিভ্রান্তিতে পড়ে গেল।
ফারিস উঠে যাওয়ার আগে বলল,
'আজ চা কে বানিয়েছে?'
ইনান বেশ গর্ব করে বলল,
'আমি। অনেক ভালো হয়েছে?'
'কেউ জঘন্য চা বানাতে চাইলে তোর কাছে ট্রেনিং নেওয়া উচিত। চায়ের প্রাণ থাকলে তোর নামে মান হানির মামলা করত তার টেস্টের ইজ্জত হরন করার জন্য।'
ইনান চোখ মুখ বাঁকাল। ফারিস হালকা হেসে চলে গেল। ইনান নিজে নিজে বলল,
'আমি অত জঘন্য চা তো বানাই না।'
তাই ও ফারিসের রেখে যাওয়া চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে থু থু করে ফেলে বলল,
'এটা কি বিষ! ইয়াক ছি!'
ঘরে এসে ফারিস দেখল ফিরনাস আর মোস্তফা হোসেন দাবার কোট সাজিয়ে বসেছে। ফিরনাস দাবায় অসম্ভব ভালো। ওর স্কুলে ও কয়েকবার দাবায় ফার্স্ট এবং সেকেন্ড প্রাইজ জিতেছে। মোস্তফা হোসেনও দাবায় ভালো। ফারিসের ইচ্ছে করল তাদের খেলা দেখতে কিন্তু সময় নেই। জবা জরুরি ভিত্তিতে দেখা করতে বলেছে।
—————
জারার জন্য জবা যেন এক অদৃশ্য দুর্গ গড়ে তুলেছে। একজন ফুল টাইম বডিগার্ড রেখেছে। যে জারাকে পড়াবে এবং ওকে রক্ষাও করবে। সারাক্ষণ জারার সাথেই থাকবে। আরেকজন মেইড রাখল যে জারা এবং জারার বডিগার্ডের সকল কাজ করবে।
জারার বডিগার্ডের নাম কমলা সুন্দরী। বয়স ত্রিশ, পাঁচ ফুট এগারো ইঞ্চি লম্বা, কুচকুচে কালো গায়ের রঙ, গড়নে শক্ত, চোখে অদ্ভুত এক স্থিরতা। তার উপস্থিতি এমন, যেন সে দাঁড়িয়ে থাকলেই চারপাশে একটা অদৃশ্য সীমানা টেনে যায়।
তাকে দেখে বাড়ি লোকজন থমকে গেল। কেউ বিস্মিত, কেউ অস্বস্তিতে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ভয়ের ছায়া নেমে এলো সিনথিয়া আর ইরফানের মুখে।
জবা সবার সামনে দাঁড়িয়ে কমলা সুন্দরীর হাতে লাইসেন্স করা গান দিয়ে বলেছে,
'যেই জারার ক্ষতি করতে চাইবে তাকে জাস্ট গুলি করে মেরে ফেলবে। তারপর বাকিটা আমি দেখব।'
কথা শেষ হতেই ঘরে আবার নীরবতা নেমে এলো। কিন্তু সেই নীরবতা আর আগের মতো ছিল না। এবার সেখানে মিশে আছে ভয়, সতর্কতা, আর একরাশ অজানা ইঙ্গিত।
প্রফেশনাল বডিগার্ড হায়ার করা কোম্পানি থেকেই এসেছে কমলা সুন্দরী। শিক্ষিত, মার্জিত, কাজের প্রতি নিষ্ঠাবান। কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে আছে আরও কিছু।
একটা নিঃশব্দ শক্তি, এক ধরনের দায়বদ্ধতা।
মাত্র কদিনেই জারার সঙ্গে তার অদ্ভুত এক বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। যে বন্ধুত্বে কোনো ভান নেই, কোনো দূরত্ব নেই। অকপট, স্বচ্ছ ভালোবাসা।
জবা জারাকে মানুষ করছে নিজের মতো চমৎকার শিক্ষা দিয়ে। শুধু নিরাপত্তা না, মানসিক শক্তিতেও। জারা জানে, মানুষের গায়ের রঙ শুধু একটা পেইন্ট। ভেতরের সৌন্দর্যটাই আসল। একদিন হেসে হেসে জারা বলল,
'অরেঞ্জ আন্টি, তুমি কত কিউট! কত লম্বা!
আমি ঠিক তোমার মতো লম্বা আর শক্তিশালী হতে চাই।'
কথাগুলো শুনে থমকে গিয়েছিল কমলা।এতদিনের জীবনে কেউ তাকে এভাবে দেখেনি। কেউ তাকে সুন্দর বলেনি, কিউট তো দূরের কথা।
এক মুহূর্তে তার শক্ত মুখটা নরম হয়ে এলো।
সে জারাকে বুকে জড়িয়ে ধরল। সেই আলিঙ্গনে ছিল অবাক হওয়া, ছিল কৃতজ্ঞতা, ছিল অচেনা এক ভালোবাসা।
চোখের কোণে অদৃশ্য জল চিকচিক করল।
মনে মনে সে প্রতিজ্ঞা করল। এই শিশুটাকে আর তার মাকে সে নিজের প্রাণ দিয়ে হলেও রক্ষা করবে। কখনো কখনো একটা ছোট্ট ভালোবাসার স্পর্শই সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা হয়ে ওঠে। মাত্র দুদিনেই কমলা জারার কাছের বন্ধু হয়ে গেছে।
কমলার নিজের বলতে শুধু ও মা আছে। ওর বাবা তো কবেই ওকে আর ওর মাকে ত্যাগ করেছিল। কারণটা ছিল ওদের গায়ের রঙ। কমলার মায়ের গায়ের রঙও কুচকুচে কালো। কমলার জন্মের পর ওর বাবা যখন দেখল ওর গায়ের রঙও মায়ের মতো কালো, তখনই তিনি মা মেয়েকে ত্যাগ করেন। অতি কষ্টে কমলাকে বড়ো করেছেন তিনি। লেখা পড়া করে, প্রশিক্ষণ নিয়ে বডিগার্ড এজেন্সিতে জয়েন করে কমলা।
এ সংসারে টিকে থাকতে হলে মেয়েদের যুদ্ধ করতে হয়। কমলা সে যুদ্ধটা অন্যকে রক্ষা করার জন্য করতে চায়।
কমলাকে জবা বারবার বলে দিয়েছে ওর অনুপস্থিতিতে সিনথিয়া যেন কোনোভাবেই জারার আশে পাশে না আসে।
কমলা জবাকে যত্ন করে পড়াচ্ছে। নতুন মেইড শিউলিকে জারার জন্য নাস্তা নিয়ে আসতে দেখে সিনথিয়া তাকে বলল,
'আমাকে দিন আমি নিয়ে যাচ্ছি।'
শিউলি একদম কঠিন কণ্ঠে বলল,
'জবা ম্যাডাম বলেছেন জারার খাবার আমি ব্যতিত কেউ ছোঁবে না। এমনকি জারার বাবাও নয়। সেখানে আপনি সামান্য চাকর।'
কথাটা সিনথিয়ার গায়ে খুব লাগল। বলল,
'ইউ ইস্টুপিট। কাল এসে আজই আমাকে চাকর বলছো? এই মুহূর্তে আমি ইরফানকে বলে তোমাকে চাকরি থেকে বাইরে বের করতে পারি।'
শিউলি ফিচেল হেসে বলল,
'যে বাল ফালানের ফালান গিয়ে। এ বাড়িতে আমি জবা ম্যাম ছাড়া কারও কথা শুনব না। আসছে ইংরেজি মারাইতে।'
শিউলি নাস্তা নিয়ে আসলে প্রথম লোকমা কমলা খেয়ে চেক করে জারাকে দিল। জারা কমলা আর শিউলিকে নিজ হাতে খাইয়ে দিয়ে বলল,
'মা বলেছেন তোমরা তার বোনের মতো। তোমাদের যাতে আমি আমার খালামনির মতো সম্মান করি।'
শিউলি আর কমলা দুজনেই আপ্লুত হলো জারার কথায়। এই নিস্পাপ শিশুটির উপর মৃত্যুর ছায়া। সে জন্যই ওকে রক্ষা করার দায়িত্ব ওদের দিয়েছে জবা।
জবা জারাকে ওর বাবার বাড়িতেই রাখত। কিন্তু জবা চায় জারা আরও কিছুদিন ওর বাবার সাথে সময় কাটাক। কদিন পর ইরফান কোথায় থাকবে, জবা কোথায় থাকবে তার ঠিক নেই! সে কারণেই ও চায় জারা ওর বাবার সাথে কিছু বিশেষ সময় কাটাক।
—————
আজ এ বাড়ির কর্মরত সবার বেতনের দিন। জবা একে একে সবাইকে বেতন দিলো। সিনথিয়ার হাতে বেতনের খাম দিল।
মাথা নিচু করে সিনথিয়া টাকা বের করে দেখে, অসহায় চোখে জবার দিকে তাকাল। জবা টাকাটা ছোঁ মেরে টাকাটা নিয়ে বলল,
'গত সাত মাসে পাঁচ হাজার আর এ মাসের পাঁচ হাজার টাকা মিলিয়ে চল্লিশ হাজার শোধ হলো তোমার। তোমার কাছে আমি এখনও পাই সাত লক্ষ টাকা পাই। এ বাড়িতে তুমি ততদিন কাজ করবে যতদিন না তুমি আমার দেনা শোধ করতে পারো।'
'আমার কাজ করার সকল টাকা আপনি নিয়ে নেন। আমার পারসোনাল ও তো কিছু খরচ আছে।'
জবা হেসে বলল,
'থাকা খাওয়া তো পাচ্ছোই। তারপর আবার কিসের খরচ?'
'একটা মেয়ের অনেক খরচ থাক। আপনি বোঝেন না নাকি?'
'ওহ রিয়েলি? এ বাড়িতে যে কয়টা মেয়ে কাজ করে তাদের প্রত্যের মাসিক পারসোনাল খরচ আমি বহন করি। প্যাড, কসমেটিকস ইত্যাদি। তিতলির কাছে চাইলেই তুমি মেন্সট্রুয়ালে ব্যবহৃত সকল কিছু পেয়ে যাও। আমার ঘরে এগুলো তিন মাস মাস পর পর ডজন ডজন আসে। আর কসমেটিকস? তুমি কসমেটিকস ব্যবহার করে কী করবে? আবার নতুন কাউকে ফাসাবে? তা আর তুমি এ জন্মে পারবে না। সে ব্যবস্থা আমি করব।'
সিনথিয়া হতাশ হয়ে চলে গেল। জবার ঠোঁটের কোণে হাসি। কেন যেন সিনথিয়ার এ অবস্থা দেখে ও মনে মনে শান্তি পায়।
—————
অফিস রুমে পিনপতন নীরবতা। যেন শব্দ পর্যন্ত এখানে ঢুকতে ভয় পাচ্ছে। দেয়ালের ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দটুকুও আজ অস্বাভাবিক ভারী শোনাচ্ছে। এসির ঠান্ডা হাওয়া বইছে ঠিকই, কিন্তু সেই শীতলতায় স্বস্তি নেই বরং একটা অজানা চাপা উত্তেজনা ছড়িয়ে আছে চারদিকে।
ডেস্কের ওপাশে চুপচাপ বসে আছে ইরফান। মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। না রাগ, না বিস্ময়, না প্রতিবাদ। যেন সবকিছু মেনে নেওয়ার এক নিঃশব্দ সিদ্ধান্তে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। তার সামনে ফাইলগুলো পড়ে আছে, কিন্তু সেগুলোর ওপর তার আর কোনো অধিকার নেই।
এক এক করে তার সব দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে জবা। কোনো উচ্চস্বরে ঘোষণা নয়, কোনো নাটকীয়তা নয়, শুধু নিখুঁত, ঠান্ডা, হিসেবি পদক্ষেপ। যেন আগেই ঠিক করে রাখা ছিল প্রতিটি চাল।
চারপাশের সহকর্মীরা তাকিয়ে আছে। কেউ সরাসরি, কেউ আড়চোখে। ফিসফাস নেই, তবু নীরবতার আড়ালে চলছে হাজারো প্রশ্ন, অজস্র কল্পনা। কে যেন ভাবছে ক্ষমতার লড়াই, কেউ ধরে নিচ্ছে ব্যক্তিগত প্রতিশোধ, আবার কারও মনে জন্ম নিচ্ছে গোপন কোনো কাহিনী। কিন্তু সত্যিটা...! সেটা কেউ জানে না।
তবু একটা ব্যাপার সবাই বুঝতে পারছে; এই পরিবর্তন শুধু অফিসের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে যে নীরবতা, তার প্রতিধ্বনি বেজে উঠছে আরও গভীরে একটা সংসারের ভেতর।
অদৃশ্য কোথাও ভাঙনের সুর ধীরে ধীরে বাজছে। এখনো সেটা পুরোপুরি শোনা যাচ্ছে না, কিন্তু যেভাবে সবকিছু বদলে যাচ্ছে তাতে বোঝা যায়, ঝড়টা আর খুব দূরে নেই। কাছে খুব কাছে।
ফাইলের শেষ পাতায় কলমের আঁচড় টানতেই ঘরটা যেন আরও নিস্তব্ধ হয়ে উঠল।
সইয়ের শব্দটুকুও কানে লাগল ভারী, চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তের মতো। জবা ধীরে কলমটা নামিয়ে রাখল। ওর চোখে কোনো দ্বিধা নেই, কণ্ঠে নেই কোনো কম্পন, অস্পষ্টতা বরং অদ্ভুত এক স্থিরতা, যা আশপাশের সবাইকে অস্বস্তিতে ফেলছে। ও উঠে দাঁড়াল। চারপাশে বসে থাকা সবাই যেন নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে আছে ওর দিকে।
'জেন্টেলম্যানস…।'
জবার কণ্ঠ ভেসে উঠল, ঠান্ডা, স্পষ্ট আর দৃঢ়তা। তারপর বলল,
'আকস্মিক এ সিদ্ধান্তে আপনারা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন না, কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবেন।'
কেউ কথা বলল না। নীরবতাই যেন তার কথার উত্তর হয়ে রইল। জবা এক মুহূর্ত থামল, তারপর ধীরে ধীরে প্রতিটি শব্দ উচ্চারণ করল,
'আজ থেকে কোম্পানির সকল দায়িত্ব আবার আমি গ্রহণ করলাম।'
ঘরের ভেতর অদৃশ্য এক তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ল।
কেউ চমকালো, কেউ চোখাচোখি করল। কিন্তু কেউ প্রতিবাদ করল না। জবা বলল,
'ইরফান সাহেবের হাতে এখনও দুটো প্রজেক্ট আছে। সেগুলোর কাজ শেষ হলে, তার দায়িত্বও আমি নিয়ে নেব।'
কথাটা যেন সরাসরি গিয়ে আঘাত করল ইরফানের বুকে। তবু সে চুপ। অস্বাভাবিকভাবে চুপ। জবা থামল না। বলল,
'এখন থেকে কোম্পানি এবং তার সকল দায়িত্ব আমি এবং আমার বাবা পালন করব।
আর আমাদের লিগ্যাল অ্যাডভাইজার হিসেবে থাকবেন, আমাদের নতুন সহকারী অ্যাডভোকেট, জোসেফ রোজারিও।'
নতুন নামটা ঘরের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল।
অচেনা, অথচ গুরুত্বপূর্ণ। তারপর সে যেন আরেক ধাপ এগিয়ে গেল।
'আমার এবং আমার বাবার অবর্তমানে
আমার সকল সম্পত্তি এবং আমার কন্যার দায়িত্ব বহন করবে আমার ফুপাতো ভাই, ফারিস তালুকদার।'
এক মুহূর্তে যেন সময় থমকে গেল। ফারিস চমকে উঠল। তার চোখে বিস্ময়, অবিশ্বাস। আজ সকালে এখানে আসার আগ পর্যন্ত জবা ওকে কিছু বলেনি। কিছু বুঝতে দেয়নি।মনে মনে শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে,
'এটা কেন করল জবা? এভাবে কেন বেঁধে ফেলল নিজের সাথে?'
অন্যদিকে ইরফান...! তার মুখে জমে উঠেছে কঠিন এক ছায়া। সে যেন কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। কীভাবে, কখন, আর কেন
ফারিস এই খেলার অংশ হয়ে গেল? ফারিসের সাথে জবার সম্পর্ক এত গভীর হলো কবে? ইরফানকে কখনোই জবা ফারিস সম্পর্কে কিছু বলেনি। এর পিছনে জবার একটা যুক্তি ছিল। যে অতীতকে ও আর কোনোদিন ফিরিয়ে আনবে না, তাকে বলে কেন নিজের ভবিষ্যৎ নষ্ট করবে।
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। নীরবতা আর আগের মতো নিস্তরঙ্গ নয়। এখন তা ভরপুর প্রশ্নে, অস্বস্তিতে, আর অঘোষিত দ্বন্দ্বে।
জবা শেষবার চারপাশে তাকাল। তার চোখে অদ্ভুত এক দৃঢ়তা। যেন সে জানে, আজকের এই ঘোষণাই শুধু শুরু। কিছু সিদ্ধান্ত শুধু ক্ষমতা বদলায় না। সম্পর্কের ভেতর লুকিয়ে থাকা সব ফাটলকেও প্রকাশ করে দেয়। জবা না বলেও যেন চিৎকার করে বলে দিল ইরফান আর ওর মধ্যে সব শেষ।
অফিস ম্যানেজার মোক্তার সাহেব জিজ্ঞেস করলেন,
'আমাদের কাউকে না জানিয়ে হঠাৎ এত বড়ো একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ জানতে পারি ম্যাডাম?'
'অবশ্যই জানতে পারবেন। কদিন পর আপনাদের সবাইকে লিখিতভাবে কারণ পাঠানো হবে। আর কোনো প্রশ্ন?'
ইরফানের পারসোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট কোয়েল বলল,
'কিন্তু ম্যাম ইরফান স্যার...।'
জবা হাত উঁচু করে থামিয়ে বলল,
'কোয়েল মিটিং শেষে তুমি আমার সাথে দেখা করবে।'
কোয়েল ভয়ে ঢোক গিলল৷ মনে মনে বলল,
'তবে কি ম্যাডাম জেনে গেল আমার আর ইরফানের সম্পর্কের কথা!'
জবা ইরফানের দিকে তাকিয়ে বলল,
'আপনার কিছু বলার আছে ইরফান সাহেব?'
ইরফানের কণ্ঠেস্বর কাঁপছে। গলা শুকিয়ে কাঁঠ হয়ে গেছে। শুকনো গলায় বলল,
'না।'
'ওকে। আজকের মিটিং আপাতত শেষ। পড়ের মিটিং এর সময় জানিয়ে দেওয়া হবে। এবং সবার কাজের নতুন সিডিউলও দিয়ে দেওয়া হবে।'
ইরফান নিঃশব্দে সব মেনে নিয়ে, গলার টাই ঢিলা করে বের হয়ে গেল। মেনে নেওয়া ছাড়া ওর দ্বিতীয় কোনো উপায় নেই। মার্কেটে নব্বই কোটি টাকার লোন। যার পুরোটাই ওর করা৷ পঞ্চাশ কোটির কথা সবাই জানে। সেটা ব্যাংক থেকে নেওয়া। সেটা নিয়ে ঝামেলা হবে না। ব্যাংক মাসে মাসে তা কোম্পানি থেকে উসুল করে নিবে। কিন্তু বাকি চল্লিশ কোটি মাফিয়াদের কাছ থেকে নেওয়া। সে লোন শোধ না করা মানে ওর প্রাণটা যাওয়া। এ সব টাকা ও ওর স্বপ্নের প্রজেক্টে ঢেলেছিল। প্রজেক্ট সম্পূর্ণ না হলে টাকা উঠবে না। আর তারা জবার সহায় সম্পত্তি দেখেই লোনটা দিয়েছি।
যখন মার্কেটে এ কথা ছড়িয়ে যাবে জবা ইরফানকে কোম্পানি থেকে বেদখল করেছে। তখনই তারা ইরফানকে মেরে ফেলবে। এই চল্লিশ কোটি টাকার কথা ইরফান ব্যতিত কেউ জানত না৷ জবা কি করে জানল ইরফালন তা বুঝতে পারছে না। জবা শর্ত দিয়েছে ওকে স্ব-ইচ্ছায় কোম্পানির সকল কিছু ছেড়ে দিলে জবা লোনটা চুকিয়ে দিবে। এবং ইরফান ততদিন পর্যন্ত জবার চাকর হয়ে থাকবে যতদিন জবা চাইবে।
—————
মিটিং শেষ হওয়ার পরও অফিসের ভেতরের ভারী পরিবেশটা কাটেনি। করিডোর জুড়ে এক অদৃশ্য চাপা ভয় ঘুরে বেড়াচ্ছে, যেন সবাই কিছু বুঝেছে, কিন্তু কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না।
কোয়েল ধীরে ধীরে জবার কেবিনের সামনে এসে দাঁড়াল। হাত কাঁপছে, বুকের ভেতর ধুকপুকানি বাড়ছে প্রতি সেকেন্ডে। একটু থেমে দরজায় নক করল। ভিতর থেকে জবা বলল,
'কাম ইন।'
ভেতরে ঢুকতেই ঠান্ডা বাতাসের মতো এক দৃষ্টি এসে আটকাল তার ওপর। আপাদমস্তক চাইল ওর দিকে। জবা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে, চোখ দুটো স্থির, তীক্ষ্ণ, ভেদ করা।
কয়েক সেকেন্ড কেউ কিছু বলল না। তারপর, জবার ঠোঁটে হালকা এক বাঁকা হাসি ফুটল।
'কোয়েল...!'
কণ্ঠটা অদ্ভুতভাবে মোলায়েম, অথচ ভেতরে লুকিয়ে আছে কাঁটা। জবা বলল,
'যেমন সুন্দর তোমার নাম, তেমন সুন্দর তুমি দেখতে। তবে চরিত্রটা এমন পঁচা কেন?'
কোয়েলের গলা শুকিয়ে গেল। ঢোক গিলে কাঁপা স্বরে বলল,
'কেন ম্যাডাম…!'
জবা সামান্য ঝুঁকে এল সামনে। চোখ দুটো সরাসরি গেঁথে দিল কোয়েলের চোখে।
'ইরফানের সাথে এ পর্যন্ত কয়বার শুয়েছো তুমি?'
প্রশ্নটা যেন বজ্রপাতের মতো পড়ল। কোয়েলের শরীর কেঁপে উঠল, ঠোঁট শুকিয়ে এল। কথা বের হলো না। জবা হালকা হেসে উঠল। সে হাসি উষ্ণ নয়, বরং শীতল হিসেবি।
'ডোন্ট ওরি, তোমার চাকরি যাবে না।'
একটু থামল জবা। তারপর ধীরে, স্পষ্টভাবে বলল,
'তবে তোমার জন্য আমি অন্য একটা জায়গা ঠিক করে রেখেছি।'
কোয়েলের বুকের ভেতর হিম শীতল একটা ভয় ছড়িয়ে পড়ল। জবার কণ্ঠ এবার আরও নিচু, আরও ধারালো।
'জানো কোয়েল, আমাদের সমাজে এক ধরনের মানুষ আছে, যারা বাইরে থেকে ভদ্র, শিক্ষিত, স্মার্ট। কিন্তু ভেতরে তারা নিজের স্বার্থের জন্য সবকিছু বিকিয়ে দিতে পারে।'
এক পা এগিয়ে এল জবা। বলল,
'এরাও পতিতাদের মতো। তবে তারা ব্রোথেলে থাকে না অফিসে থাকে, বাড়িতে থাকে।মানুষের বিশ্বাস নিয়ে খেলে।'
জবার চোখে এবার নিখুঁত নির্মমতা। বলল,
'জাস্ট লাইক ইউ।'
কোয়েল পিছিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু পা যেন আটকে গেছে। ঘরের দেয়ালগুলোও যেন ধীরে ধীরে কাছে চলে আসছে। জবা সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার কণ্ঠে কোনো চিৎকার নেই, তবু প্রতিটি শব্দ যেন রায় ঘোষণা করছে। বলল,
'নিজের জীবনের ধ্বংসটা দেখার জন্য প্রস্তুত হও।'
তারপর কিছু সময় নীরবতায় কেটে গেল।কিন্তু সেই নীরবতা আর শান্ত নয়। সেটা ভয়ে ভারী আর অনিবার্য এক পতনের পূর্বাভাস।
—————
বাড়ি ফিরে ইরফান জবাকে ছোট্ট করে প্রশ্ন করল,
'আমায় ছেড়ে কেন দিচ্ছো না, জবা? এভাবে কেন আটকে রাখছো?'
জবা হাসল। রহস্যময় হাসি। বলল,
'ছেড়ে দিলেই বেঁচে গেলে তা তো হবে না। তোমায় আমি ছাড়ব ইরফান। হয়তো শীঘ্রই ছাড়ব। কিন্তু হাসরের ময়দানে আমি তোমার পথ আটকে দাঁড়াবো৷ হিসাব চাইব। উত্তর চাইব কেন আমার সাথে প্রতারণা করলে? সেদিন কী করবে?'
ইরফান মাথা নিচু করে রইল।
—————
ফারিস অস্থির হয়ে আছে জবার সাথে কথা বলার জন্য। সকালে অফিসে সবার সামনে চেয়েও কিছু বলতে পারিনি। এখনও জবা কল রিসিভ করছে না। জবা এমন কেন করল জানাটা খুব জরুরি ওর। যতক্ষণ না জানতে পারবে অস্থিরতা কমবে না।
—————
কথা গাড়িতে করে কোথাও যাচ্ছিল। যেতে যেতে হঠাৎ সিনথিয়ার মতো কাউকে দেখে দ্রুত গাড়িটা থামাতে বলল ড্রাইভারকে। গাড়ি থামিয়ে কথা গাড়ি থেকে নেমে সিনথিয়াকে পিছন থেকে ডাকল, 'সিনথিয়া!'
সিনথিয়া পিছু ফিরে তাকাতেই দেখল কথা ওর দিকে আসছে। কথা ওর কাছে আসতেই ছোটো খাটো একটা ধাক্কা খেলো। এ কোন সিনথিয়াকে দেখছে কথা! কোথায় সেই আগের মতো উপছে পড়া সৌন্দর্য? শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে মেয়েটা। গায়ের রঙ আগের চেয়ে অনেক শ্যামলা হয়ে গিয়েছে। রুক্ষ শুষ্ক চেহারা, চুলগুলোও রুক্ষ, গায়ের জামাটা, জুতা দেখলেই বোঝা যায় খুব সস্তা। চেহারায় নেই আগের সে কোমলতা, মলিন মুখটা দেখলেই যেন মায়া লাগে। কথা কী বলবে ভেবে পেল না না।
তাই জিজ্ঞেস করল,
'কেমন আছিস?'
দীর্ঘশ্বাস ফেলে সিনথিয়া বলল,
'এইতো ভালো আছি। তুই?'
'হ্যাঁ, ভালো আছি। তুই তো যেন গায়েবই হয়ে গেলি। হুট করে ভার্সিটি ছেড়ে দিয়ে কোথায় চলে গেছিল? গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করেছিলি? আর চেহারার এমন অবস্থা কেন?'
কথার কথাগুলো সিনথিয়ার জন্য যেন কাটা ঘা'য়ে লবনের ছিটা দেওয়ার মতো। সিনথিয়া স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
'আমার মতে তুই সবই জানিস। না জেনে পারিস না। কারণ তোর সাথে ঐ সব করার পর আমার ধারণা, তুই আমার সব খবরই রাখতি।'
কথা বিদ্রুপ হেসে বলল,
'আমার তো খেয়ে দেয়ে কাজ নেই তোর খোঁজ রাখতে যাব! যার জন্য আমার জীবনটাই ওলট পালট হয়ে গেছে, তার খোঁজ রাখতে যাব! আমি কী তোর খোঁজ রাখার জন্য টাকা পাই? জানিস তোর জন্য আমার জীবনে কত ঝড় গেছে।'
সিনথিয়া স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
'আমিও জাহান্নামেই আছি। আর তোর কথা শোনার সময় নেই আমার। আমার কাজ আছে।'
সিনথিয়া চলে যেতেই কথা বিড়বিড় করে বলল,
'আমার তো সময় অঢেল। যত্তসব। আল্লাহ ওকে ক্ষমা করো না, কখনো না।'
সিনথিয়া যেতে যেতে একা একা বলল, 'আমার সুখের জীবনটা যারা নষ্ট করেছে তাদের আমি ছেড়ে দিব ভাবছিস কথা? তোর সকল খোঁজ আমি রাখতাম। তোকেও একটা মোক্ষম শাস্তি দিতে চেয়েছিলাম কিন্তু তার আগে তুই নিজেই শাস্তি পেলি। তোকে তাই ছেড়ে দিলাম।
এখন আছে জবা চৌধুরি। তাকে তো খুন না করা অব্দি আমি শান্তি পাব না। আমার আর ইরফানের জীবনটাকে নরক বানিয়ে দিয়েছে কুত্তিটা। ওর জীবনে আর বেশি দিন বাকি নেই। প্রথমে ওকে মারব তারপর ওর মেয়েকে। তারপর ওরই সম্পত্তিতে আমরা রাজ করব। জবা চৌধুরিকে মারার লম্বা ছক কষা হয়ে গেছে। জাস্ট প্ল্যানমাফিক কাজ করা বাকি। কথা, মজার কথা শুনবি? আমারও পরিকল্পনা ছিল তোর বাচ্চাদের মারা৷ কিন্তু ভেবে পাচ্ছিলাম না কীভাবে মারব? আমার ভাবার আগেই তোর দূর্ঘটনাটা হয়ে গেল। কুল না!
রিভেঞ্জ অফ ন্যাচার কথাটা মিথ্যা প্রমাণিত হলো। যেখানে প্রকৃতি আমাকে শাস্তি দিবে, তা না দিয়ে তোকে আর নিহাদ স্যারকে দিয়েছে। প্রকৃতি আমার সাথে যা খারাপ করার তা তো করেই ফেলছে। এখন আমার সাথে যারা খারাপ করেছে, তাদের অবস্থা খারাপ করার পালা। বাদ যাবে না আমার বাবা-মা, বোনও।'
সিনথিয়া ভয়াবহ ভঙ্গিতে হাসল। ওর ঐ বিভৎস হাসি দেখলে হয়তো সুস্থ মানুষের গায়ে ভয়ে কাটা দিতো। হাসতে হাসতে সিনথিয়া বলল,
'বাই দ্যা ওয়ে তোর নিহাদকে ছাড়ার পরিকল্পনা আমার এখনও নেই। নিহাদের কাছে আর একবার হলেও যাব। হি ইজ টু গুড!'
·
·
·
চলবে……………………………………………………