রাহা কোনো কথা না বলে খাবার স্পর্শ না করেই সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগল। বুকের ভেতরটা কেমন অস্থিরতায় কেঁপে উঠছে, তাই কারও মুখোমুখি হওয়ার সাহস পেল না। ঠিক শেষ ধাপটিতে পা রাখতেই নিচ থেকে অভ্রের গম্ভীর অথচ রহস্যময় কণ্ঠ ভেসে এলো—
"ইট স্মেলজ লাইক সামথিং ইজ বার্নিং। দ্যাটস আ টেরিবল স্মেল! "
— "কোথাও যেন পোড়া পোড়া গন্ধ পাচ্ছি..."
মুহূর্তেই সবাই চমকে উঠল।
— "পোড়া গন্ধ?" বিস্মিত স্বরে বলে চারপাশে তাকাতে লাগল সবাই।
এক নিমিষে ডাইনিংয়ের স্বাভাবিক পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ল উৎকণ্ঠা। কে কোথায়, কী পুড়ছে তা খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল সকলে। কেউ রান্নাঘরের দিকে ছুটল, কেউ জানালার পাশে গিয়ে উঁকি দিল, আবার কেউ ঘরের কোণায় কোণায় অনুসন্ধানী দৃষ্টি বুলাতে লাগল।
রাহার খালা আর খালু তো আর এক মুহূর্তও নষ্ট করলেন না। দু'জন দু'দিকে ছুটে গেলেন সবকিছু খতিয়ে দেখতে। ইভানও দ্রুত সামনের অংশের দিকে এগিয়ে গেল, কোথাও আগুনের কোনো উৎস আছে কি না তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য। শিফা ও ইভানের পিছু পিছু গেলো।
আর অভ্র?
সে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুর্বোধ্য হাসি ঝুলিয়ে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সিঁড়ির শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা রাহার দিকে। যেন তার বলা কথার প্রকৃত অর্থ আগুন নয়, অন্যকিছু বুঝাচ্ছে।
সে মুচকি হেসে মনে মনে বলল,
"এখনও আগের মতোই... রাগ হলে চোখ দুটো জ্বলে ওঠে।"
রাহার পদযুগল আচমকাই থমকে দাঁড়াল। ক্ষোভে তার মুখাবয়ব রক্তিম আভায় জ্বলে উঠেছে, চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। তবুও একবারও পশ্চাতে দৃষ্টি নিক্ষেপ না করে দৃপ্ত পদক্ষেপে নিজের কক্ষের দিকে অগ্রসর হলো।
অন্যদিকে অভ্র হাতে খাবারের প্লেট তুলে নিয়ে মুহূর্তমাত্র বিলম্ব না করে দ্রুতগতিতে রাহার পিছু নিল। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তখনও রাহার সরে যাওয়া অবয়বের ওপর নিবদ্ধ।
এদিকে জায়ান আর জারিফ ঠিকই বুঝেছিল ‘পোড়া গন্ধ’-এর আসল রহস্য। তাই তারা নির্বিকার ভঙ্গিতে ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে দৃশ্য উপভোগ করছিল।
ঠিক তখনই হাঁপাতে হাঁপাতে অবন্তিকা সেখানে এসে হাজির। উত্তেজনায় চারপাশে কী আছে, সেদিকে বিন্দুমাত্র খেয়াল না করেই ধপাস করে জারিফের পায়ের ওপর বসে পড়ল। তারপর আরাম করে হেলান দেওয়ার চেষ্টা করতেই বিপত্তি বাঁধল। পেছনে ভর পাওয়ার আশায় বারবার মাথা ঠুকতে ঠুকতে শেষমেশ এমন এক ধাক্কা দিল যে মনে হলো জারিফের নাকটাই বুঝি জায়গা থেকে সরে গেল!
“উফফ...!” জারিফের চাপা আর্তনাদে অবন্তিকার ঘোর কাটল।
দ্রুত ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতেই দেখতে পেল জারিফ হাত দিয়ে নাক ঘষছে। পরক্ষণেই নিজের অবস্থান চোখে পড়তেই তার চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল। লজ্জা আর বিস্ময়ে তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়াতে গিয়েই আবারও ভারসাম্য হারিয়ে সোজা জারিফের বুকের ওপর আছড়ে পড়ল।
জারিফ মুহূর্তেই তাকে সামলে নিল। আর অবন্তিকা ভয়ে-অপ্রস্তুতিতে দুহাতে জারিফের গলা জড়িয়ে ধরে বড় বড় চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
এদিকে জারিফের অবস্থা করুণ। নাকের আগা টকটকে লাল হয়ে উঠেছে, যেন সদ্য কোনো বক্সিং ম্যাচে অংশ নিয়ে এসেছে। মুখভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে ব্যথা, বিস্ময় আর অসহায়ত্ব—তিনটাকেই একসঙ্গে সামলানোর চেষ্টা করছে সে।
জারিফ বিরক্ত চোখে অবন্তিকার দিকে তাকিয়ে আছে। এই মেয়েটা যেন কাছে এলেই কোল ছাড়া আর কিছু বোঝে না। কখনো ধাক্কা খেয়ে, কখনো হোঁচট খেয়ে, কখনো লাফ দিয়ে নয়তো কোনো না কোনো অজুহাতে ঠিক তার কোলেই এসে হাজির হয়।
পাশেই যে জায়ান বসে ছিল, অবন্তিকা বোধহয় সেটাও ভুলে গিয়েছিল। ঠিক তখনই—
— উহু... উহু…
কারো কাশির শব্দে দু'জনেরই সম্বিত ফিরে আসে।
জায়ান এক ভ্রু উঁচু করে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি।
জারিফ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
— এই মেয়ে, কোল ছাড়া আর কিছু বোঝেন না নাকি? যখনই দেখি কোনো না কোনোভাবে আমার কোলেই বসতে হবে আপনার!
অবন্তিকা তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়াল। মুখ লাল হয়ে গেছে লজ্জায়।
— আমি কি ইচ্ছে করে বসেছি নাকি? না দেখে বসে পড়েছি। আপনিও তো আর বসার জায়গা পাননি!
— ও আচ্ছা! এখন আবার আমার দোষ?
— অবশ্যই আপনার দোষ!
— বাহ! নিজে এসে আমার পা ভেঙে দেওয়ার অবস্থা করেছে, এখন আবার বিচারক সেজে রায়ও দিয়ে দিলেন!
— নাটক কম করেন। আপনার পা কিছুই হয়নি।
— হুম, ভেতরে ভেতরে কত বড় ক্ষতি হয়েছে সেটা আপনি বুঝবেন না।
অবন্তিকা চোখ ছোট ছোট করে তাকাল।
— কি ক্ষতি হয়েছে শুনি?
জারিফ কিছুক্ষণ চুপ থেকে গম্ভীর মুখে বলল,
— সম্মানের।
কথাটা শুনে জায়ান হো হো করে হেসে উঠল।
— সম্মান নাকি! ভাই, তোর সম্মান যদি এতোই নাজুক হয় তাহলে আলাদা করে বীমা করিয়ে রাখ।
— তুই চুপ কর।
— আমি তো চুপই আছি। কিন্তু দৃশ্যটা বেশ উপভোগ করছি।
অবন্তিকা বিরক্তিতে পা ঠুকে সরে যেতে নিলেই জারিফ আবার বলে উঠল,
— আজব মেয়ে তো! নিজেই ধপাস করে আমার ওপর এসে পড়ল, এখন আবার সব দোষ আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিল। তুমি কি কানা নাকি!
— কি বললেন?
— কিছু না। নিজের সাথে কথা বলছিলাম।
— শুনেছি আমি!
— শুনলে তো ভালোই।
দু'জনের খুনসুটি দেখে জায়ানের হাসি আরও চওড়া হয়ে গেল।
ঠিক তখনই সাফা হাঁপাতে হাঁপাতে সেখানে এসে পৌঁছাল।
— সারাবাড়ি খুঁজলাম! কোথাও আগুন নেই।
বলেই কোমরে হাত রেখে হাঁপাতে লাগল সে।
সাফাকে দেখে অবন্তিকা একটু হেসে ফেলল। কিন্তু সাফার চোখ তখন অন্যদিকে।
জারিফের উপর গিয়ে আটকে আছে তার দৃষ্টি।
মুহূর্তের জন্য যেন আশেপাশের সবাইকে ভুলে গেল সে। জারিফের এলোমেলো চুল, বিরক্ত মুখ আর কপালের ভাঁজ দেখে তার চোখ দুটো অদ্ভুতভাবে চকচক করে উঠল।
মুগ্ধতা লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করেও পারল না।
অন্যদিকে জায়ান চুপচাপ তাকিয়ে আছে সাফার দিকে।
সাফার সেই ঝলমলে চোখ, লাজুক হাসি আর জারিফকে দেখলে বদলে যাওয়া অভিব্যক্তি— সবকিছুই তার দৃষ্টি এড়াল না।
জায়ানের বুকের ভেতর কেমন একটা খচখচে অনুভূতি হলো। কারণটা সে নিজেও বুঝতে পারল না। শুধু এটুকু বুঝল, সাফার চোখে অন্য কারও জন্য এতটা আলো দেখা তার মোটেও ভালো লাগছে না। আবার সেটিকে বেশি পাত্তাও দিলো না
সেদিকে অবশ্য কারোই খেয়াল নেই।
জারিফ তখনও অবন্তিকার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করছে,
— আল্লাহ জানে, এই মেয়েটা কোনদিন আমার হার্ট অ্যাটাক করিয়ে ছাড়বে।
— কি বললেন আবার?
— বললাম, দূরে দাঁড়ান। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন।
— অসভ্য!
— দুর্যোগপ্রবণ!
– আপনি সাইকো
বলেই অবন্তিকা সোজা হাটা দেয় রান্নাঘরে যাবে।
মুহূর্তের জন্য চারপাশে নেমে এলো অস্বস্তিকর নীরবতা। সেই নীরবতা ভাঙল অবন্তিকার কণ্ঠ।
— “বরফটা লাগিয়ে নিন।”
জারিফ নির্বিকার মুখে তার দিকে একবার তাকিয়েই দৃষ্টি সরিয়ে নিল। যেন কথাটা তার জন্য বলা হয়নি। উদাস ভঙ্গিতে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে রইল।
জায়ান এগিয়ে এসে অবন্তিকার হাত থেকে বরফটা নিয়ে হালকা হেসে বলল,
— “থ্যাঙ্কস।”
তারপর কোনো ভণিতা না করেই জারিফের ফোলা নাকের উপর বরফ ঘষতে শুরু করল।
সাফা এতক্ষণ সবকিছু অবাক হয়ে দেখছিল। ভ্রু কুঁচকে উদ্বিগ্ন স্বরে জিজ্ঞেস করল,
— “কি হয়েছে উনার?”
জায়ান কিছু বলতে মুখ খুলতেই জারিফ ঠান্ডা গলায় বলে উঠল,
— “একটা বিশাল মৌমাছি কামড় দিয়েছে।”
‘মৌমাছি’ শব্দটা কানে যেতেই অবন্তিকার চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল। সে অবিশ্বাস নিয়ে জারিফের দিকে তাকিয়ে রইল। অন্যদিকে জায়ান ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করছে।
কিন্তু সাফার মুখে হাসির লেশমাত্র নেই। বরং তাকে বেশ চিন্তিতই দেখাচ্ছে। সে এগিয়ে এসে নাকটা দেখবে, এমন সময় অবন্তিকা তার হাত চেপে ধরে টেনে সরিয়ে নিল।
— “তোর দেখতে হবে না।”
তারপর জারিফের দিকেই তাকিয়ে কটাক্ষ ছুঁড়ে বলল,
— “তেমন কিছু হয়নি। একটা মৌমাছির কামড়ই তো! উনি যে পালোয়ান মানুষ, এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে।”
কথাটা শেষ হতেই জারিফের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একচিলতে হাসি ফুটে উঠল। ক্ষণিকের সেই হাসি জায়ানের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়াল না।
সুযোগ বুঝে সে শয়তানি হাসি হেসে বলে উঠল,
— “বন্ধু, অবস্থা তো ভালো না। মনে হচ্ছে কেউ প্রেমে পড়েছে!”
জারিফের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
জায়ান থামল না।
— “মন দিতে গিয়ে উল্টো গুঁতো খেয়েছিস, তাই না?”
কথাটা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জারিফ ধীরে ধীরে তার দিকে মুখ ফেরাল। চোখদুটো অস্বাভাবিক রকম শান্ত, অথচ সেই শান্তির আড়ালে ছিল স্পষ্ট হুমকির ঝলক।
তীক্ষ্ণ, ধারালো দৃষ্টিটা জায়ানের উপর পড়তেই তার মুখের হাসি মুহূর্তেই উধাও হয়ে গেল।
— “চুপ।”
একটা মাত্র শব্দ।
কিন্তু সেই এক শব্দেই জায়ান ঠোঁট সেলাই করে ফেলল। আর অবন্তিকা মুখ ফিরিয়ে থাকলেও নিজের অজান্তে ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠা হাসিটা আর লুকিয়ে রাখতে পারল না।
—————
খাবারের প্লেট হাতে নিয়ে রুমে প্রবেশ করতেই অভ্র ভ্রু কুঁচকে চারপাশে তাকাল। রাহা কোথাও নেই।
রাহা আশপাশে থাকলে অভ্র ঠিকই বুঝে যায়।
তার একান্ত ব্যক্তিগত নারীটির উপস্থিতি ঠিকই টের পায়। মুহূর্তের মধ্যেই তার দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো খোলা বারান্দার দরজার দিকে।
প্লেটটা টেবিলের উপর নামিয়ে রেখে ধীর পায়ে সেদিকে এগিয়ে গেল সে।
বারান্দার এক কোণে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে রাহা। দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলেও তার দৃষ্টি যেন কোথাও নেই। দু'চোখ বেয়ে অবিরাম লবণাক্ত অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ছে। চোখের জল মুছে ফেলতে চাইলেও পরমুহূর্তেই নতুন করে ভিজে উঠছে তার গাল। নিজেকে সে কতভাবেই না বুঝিয়েছে! বারবার বলেছে— অভ্র তার কেউ নয়, তার জীবনে কাকে নিয়ে হাসবে, কার দিকে তাকাবে, কার সঙ্গে কথা বলবে তাতে রাহার কী-ই বা আসে যায়? কিন্তু হৃদয় কি কখনো যুক্তির ভাষা বোঝে?
খাবার টেবিলের সেই দৃশ্যটা বারবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। আয়াতের দিকে অভ্রের নিবিড় দৃষ্টি, ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা মুগ্ধ হাসি, দু'জনের স্বাভাবিক খুনসুটি— প্রতিটি মুহূর্ত যেন তীক্ষ্ণ শূল হয়ে বিদ্ধ করছে তার হৃদয়। যতই নিজেকে সংযত করতে চাইছে, ততই বুকের ভেতরের দহন প্রবল হয়ে উঠছে।
অদ্ভুত এক কষ্ট তাকে গ্রাস করে ফেলেছে। মনে হচ্ছে বুকের গভীরে কেউ নিঃশব্দে আগুন জ্বেলে দিয়েছে। সেই আগুনে ধীরে ধীরে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে তার সমস্ত স্থিরতা, সমস্ত আত্মসংযম।
সবচেয়ে বেশি রাগ হচ্ছে নিজের উপর। কেন এত কষ্ট হচ্ছে? কেন অভ্রকে অন্য কারও সঙ্গে হাসতে দেখলে তার ভেতরটা এলোমেলো হয়ে যায়? কেন অভ্রের সামান্য উদাসীনতাও তাকে এভাবে ভেঙে দেয়?
গভীর নিশ্বাস নিয়ে চোখ বন্ধ করল রাহা। কিন্তু তাতেও লাভ হলো না। চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রু যেন আজ কোনো বাধাই মানতে রাজি নয়। অভিমান, ঈর্ষা, ভালোবাসা আর অপ্রাপ্তির যন্ত্রণা মিলেমিশে তার হৃদয়টাকে অসহনীয় ভারে আচ্ছন্ন করে রেখেছে সপ্তদশীর হৃদয়টাকে।
ঠিক তখনই তার পেছনে ক্ষীণ পায়ের শব্দ ভেসে এলো। রাহা দ্রুত চোখের জল মুছে স্বাভাবিক হওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করল। কিন্তু তার কাঁপতে থাকা কাঁধ আর লাল হয়ে ওঠা চোখ তাকে স্পষ্টই ধরিয়ে দিচ্ছে।
অভ্র কয়েক মুহূর্ত নীরবে তার দিকে তাকিয়ে রইল। মুখে কোনো কথা নেই, অথচ সেই নীরব দৃষ্টিতেই যেন হাজারো প্রশ্ন লুকিয়ে আছে।
রাহা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। এই মুহূর্তে অভ্রের চোখের দিকে তাকানোর সাহস তার নেই। কারণ সে জানে, একবার চোখে চোখ পড়লে বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত অভিমান হয়তো অশ্রুর সঙ্গে বেরিয়ে আসবে।
বারান্দার নিস্তব্ধ বাতাসে দু'জনের মাঝখানে নেমে এলো এক অদ্ভুত নীরবতা। এমন নীরবতা, যেখানে শব্দের প্রয়োজন হয় না; হৃদয়ের অস্থির স্পন্দনই সব কথা বলে দেয়।
নিজেকে ধমকিয়েও কোনো লাভ হচ্ছে না। বারবার নিজেকেই বোঝানোর চেষ্টা করছে—এই খারাপ লোকটা যা ইচ্ছে করুক, তাতে তার কী? সে তো দূরেই থাকতে চায়। তাহলে কেন বুকের ভেতরটা এমন মোচড় দিয়ে উঠছে? কেন অন্য কারও সঙ্গে তাকে দেখলেই হৃদয়ের কোথাও তীব্র এক জ্বালা অনুভব হয়?
যতই চোখের পানি মুছে ফেলছে, ততই যেন নতুন করে গড়িয়ে পড়ছে। নোনা অশ্রুগুলো কোনোভাবেই বাধা মানতে চাইছে না।
ঠিক তখনই রাহার পিছন থেকে দুটি শক্ত হাত এসে তার দুই পাশের রেলিং আঁকড়ে ধরে। মুহূর্তেই সে একপ্রকার বন্দি হয়ে পড়ে পরিচিত সেই বেষ্টনীর মাঝে। বাতাসে ভেসে আসে ম্যানুয়ালি পারফিউমের চেনা ঘ্রাণ। সেই সুবাসটুকুই যথেষ্ট ছিল বুঝে নেওয়ার জন্য—কে এসেছে।
রাহার বুকটা ধক করে ওঠে। কিন্তু পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলে নেয় সে। তাড়াতাড়ি চোখের কোণের পানি মুছে ফেলে মুখ গম্ভীর করে নেয়। যেন কিছুই হয়নি। যেন কয়েক মুহূর্ত আগেও তার চোখ ভিজে ছিল না।
পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকে। শুধু গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে রাহার কাঁপতে থাকা অবয়বের দিকে।
— "কাঁদছিলি কেন?"
অভ্রের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে আসতেই রাহা ঠোঁট শক্ত করে ফেলে।
— "আপনার জানার দরকার নেই।"
— "আমি জিজ্ঞেস করেছি, কাঁদছিলি কেন?"
— "আর আমি উত্তর দিয়েছি, আপনার জানার দরকার নেই।"
রাহার শীতল উত্তর শুনে অভ্রের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। অথচ তার চোখ দুটো আটকে থাকে রাহার লাল হয়ে থাকা চোখের পাতায়, যেখানে কান্নার স্পষ্ট ছাপ এখনো রয়ে গেছে।
অভ্রের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ এক রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। পরমুহূর্তেই সে রাহার কাঁধ স্পর্শ করে এক ঝটকায় নিজের দিকে ফিরিয়ে নিল। আকস্মিক ঘটনায় রাহা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে উঠল। ঘুরতেই অজান্তেই তার চোখ দুটো শক্ত করে বুজে এলো, আর দুহাতে অভ্রের ব্লেজারের দু'পাশ মুঠোবন্দী করে ফেলল।
আতঙ্কে তার শ্বাস-প্রশ্বাস হয়ে উঠল দ্রুত ও অগোছালো। সবকিছু এত আকস্মিকভাবে ঘটল যে মুহূর্তটির অর্থ অনুধাবন করারও সুযোগ পেল না সে।
চোখ বুজতেই অতীতের সেই তিক্ত স্মৃতিগুলো আবারও ঝড়ের মতো আছড়ে পড়ল তার মনে। বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্ট যেন বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে এলো। চোখের কোণে জমাট বাঁধা অশ্রুকণাগুলো নীরবে গড়িয়ে পড়তে লাগল গাল বেয়ে। সে স্থির করেছে অভ্রের দিকে তাকাবে না।
অভ্র ধীর অথচ দৃঢ় ভঙ্গিতে তার সরু কোমর জড়িয়ে নিজের সান্নিধ্যে টেনে আনল। গলার কাছে মুখ নিয়ে নাক দিয়ে টেনে নিতে থাকে তার শরীরের ঘ্রাণ। যেনো কতদিন পর কাছে পেলো তার রমণীকে।
এভাবে কিছুক্ষণ পার হয়ে গেলে মুখ তুলে তাকায় অসহায় কান্নায় ভেঙে পড়া মুখখানার দিকে, যেন তার প্রতিটি অশ্রুবিন্দুর আড়ালে লুকিয়ে থাকা ব্যথার ভাষা পড়ে নিতে চাইছে।
রাহার গাল বেয়ে নেমে আসা অশ্রুবিন্দুগুলো চিবুক স্পর্শ করার আগেই নিজের জিহ্বার স্পর্শে শুষে নিল সেই পানিটুকু। মুহূর্তে জিমে গেলো রাহা।
ঠিক তখনই নিচতলার পিলারের পিছন থেকে ইভান এসে বলে উঠল—
— "নিজের রোমান্স করার বয়সে ভাই-বোনদের রোমান্স দেখছেন, ছ্যাহ, মায়াবিনী?"
কথাটা কানে যেতেই শিফার বুক ধক করে উঠল। যেন হাতেনাতে চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে। চোখ দুটো বিস্ফারিত হয়ে গেল, গাল বেয়ে লাল আভা ছড়িয়ে পড়ল মুহূর্তেই।
সে তড়িঘড়ি করে এক ঢোক গিলে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
— "আমি... আমি কিছু দেখছিলাম না!"
তোতলানো কণ্ঠে বলেই সেখান থেকে দ্রুত সরে যেতে উদ্যত হলো। কিন্তু পাশ কাটিয়ে যাওয়ার আগেই ইভান এক পা এগিয়ে তার পথ আটকে দাঁড়াল।
ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ঝুলিয়ে বলল—
— "ওহ্, কিছু দেখছিলেন না? তাহলে পাঁচ মিনিট ধরে পিলার আঁকড়ে ধরে উপরে তাকিয়ে ছিলেন কেন?"
শিফার মুখ আরও রাঙা হয়ে উঠল। লজ্জা, অস্বস্তি আর ধরা পড়ার বিব্রতবোধ মিলেমিশে একাকার।
— "আপনার এত খেয়াল করার কী দরকার?" দাঁত চেপে ফিসফিস করে বলল সে।
ইভান ভ্রু নাচিয়ে একটু ঝুঁকে এলো।
— "খেয়াল তো করতেই হয়। কেউ যদি এত মনোযোগ দিয়ে অন্যের প্রেমকাহিনি পর্যবেক্ষণ করে, তখন ভাবতে হয় তার নিজের গল্পটা কবে শুরু হবে।"
শিফা এবার সত্যিই বিপাকে পড়ে গেল। চোখ তুলে একবার ইভানের দিকে তাকিয়েই আবার দৃষ্টি সরিয়ে নিল। হৃদস্পন্দন অকারণে দ্রুত হয়ে উঠছে।
সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। প্রায় দৌড়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
পেছন থেকে ইভানের হাসি মিশ্রিত কণ্ঠ ভেসে এলো
— "এভাবে পালিয়ে গেলে কিন্তু সন্দেহ আরও বেড়ে যায়, মায়াবিনী!"
কথাটা শুনে শিফার পদক্ষেপ আরও দ্রুত হয়ে গেল, অথচ অজান্তেই ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠেছিল।
এসব নিচ থেকে দেখছিল শিফা। বিস্ময়ে তার চোখ দুটো প্রায় গোল হয়ে গেছে। বারবার পলক ফেলেও যেন বিশ্বাস করতে পারছে না সামনে যা দেখছে তা সত্যি।
নিজের শান্ত-গম্ভীর ভাই আর চঞ্চল স্বভাবের চাচাতো বোনকে এভাবে একসাথে দেখে তার মাথাই যেন কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে।
কিছুক্ষণ আগেও যে দু'জন একে অপরের সামনে স্বাভাবিকভাবে কথাও বলতে পারত না, তারা এখন নিজেদের জগতে এতটাই মগ্ন যে আশপাশে কেউ আছে কি না, সেদিকেও কোনো খেয়াল নেই।
জিভের উষ্ণ স্পর্শ পেতেই রাহা ফট করে চোখ খুলে তাকায়। হঠাৎ এমন স্পর্শে তার পুরো শরীর যেন কেঁপে ওঠে। ভেজা চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে যায়। তার শরীর নিজের ভর ধরে রাখতে অক্ষম হচ্ছে। এক মুহূর্তের জন্য সে বুঝতেই পারে না ঠিক কী ঘটল।
চোখ খুলতেই দেখতে পায় অভ্র তার খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছে। এতটাই কাছে যে দু'জনের নিশ্বাস একে অপরের মুখে এসে লাগছে। অভ্রের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে তার চোখের ওপর।
অভ্র নিজের মুখ রাহার সামনে আনতেই দুইজনের নজর একসাথে আটকে যায়। সময় যেন হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়।রাহার বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। মনে হচ্ছে হৃদস্পন্দনের আওয়াজ চারপাশের নীরবতাকেও ছাপিয়ে যাচ্ছে। সে চাইলেও চোখ সরিয়ে নিতে পারছে না। অভ্রের গভীর দৃষ্টির সামনে তার সব রাগ, অভিমান আর অস্থিরতা যেন এক মুহূর্তে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুবিন্দুগুলো এখনও চিকচিক করছে। ভেজা পাপড়িগুলো বারবার কেঁপে উঠছে, অথচ দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে অভ্রের চোখে।
রাহার মনে হচ্ছিল, অভ্র যেন শুধু তার চোখের দিকেই তাকিয়ে নেই; বরং তার বুকের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সব না-বলা অনুভূতিগুলোও পড়ে ফেলছে।
রাহার ভেজা চোখ, কাঁপতে থাকা পাপড়ি আর অশ্রুসিক্ত গাল দেখে অভ্রের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
সে ধীরে ধীরে ঝুঁকে ভারী কণ্ঠটা রাহার কানের কাছে নামিয়ে বলল,
— দূরে যেতেই তো চেয়েছিলি...
এখন কাঁদছিস কেন?
— দূরে যেতেই তো চেয়েছিলি... এখন কাঁদছিস কেন?
কথাটা কানে পৌঁছাতেই রাহার বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত কষ্ট যেন হুড়মুড়িয়ে বিস্ফোরিত হয়ে উঠল। এক ঝটকায় অভ্রকে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দিল সে।
— দূরে থাকুন!
রাগে, অপমানে আর অভিমানে পুরো শরীরটা কাঁপছে তার।
— আমার সাথে লু*চ্চামি করে এখন আমার বোনের সাথেও লাইন মারতে চান?
অভ্র ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— কী?
— নাটক করবেন না। আমি সব দেখেছি।
রাহার গলা কেঁপে উঠল, তবুও থামল না সে।
— ভাবছেন আমি বুঝি না? আমার সামনে একরকম… আর সুযোগ পেলেই আমার বোনের সাথে হাসাহাসি! বেশ তো… নতুন কাউকে পেয়ে গেছেন যখন, তাহলে আমার পেছনে ঘোরার দরকার কী?
শেষ কথাটা বলতেই গলাটা ভেঙে গেল তার। কারণ রাগের চেয়েও ভয়ংকর ছিল বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্টটা। অভ্র অন্য কারও দিকে তাকিয়েছে— শুধু এই ভাবনাটাই যেন রাহার অন্তরটাকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছিল। সে নিজেও বুঝতে পারছিল না কেন এতটা জ্বালা হচ্ছে। অভ্র তো তার কেউ নয়… তবুও নিচে তাকে অন্য কারও সাথে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে দেখার মুহূর্তে বুকের ভেতর এমন মোচড় দিয়েছিল, যেন কেউ তার সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটা ছিনিয়ে নিচ্ছে।
আর সেই অনুভূতিটাই তাকে সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত করে তুলছিল। চোখের কোণে জমে থাকা জল আবারও গড়িয়ে পড়ল। রাহা তড়িঘড়ি করে মুখ ফিরিয়ে নিল। সে চায় না অভ্র দেখুক— তার রাগের আড়ালে লুকিয়ে থাকা হিংসে, অভিমান আর অদ্ভুত সেই অধিকারবোধটাকে। কিন্তু যতই লুকাতে চাক, তার টলমলে চোখ দুটো যেন প্রতিটা সত্যি ফাঁস করে দিচ্ছিল।
“লুচ্চামি” শব্দটা কানে পৌঁছাতেই অভ্রর ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে গাঢ়, দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।
— এখনও তো লুচ্চামির শুরুই করিনি, জান। আর তোর বোনের কাছে গেলে তোর এত সমস্যা কেন…? সে তো তোরই বোন। নিজের বোনকে নিয়ে কেউ এভাবে হিংসে করে নাকি? তুই-ই তো নিজেই আমাকে তোর ধারে-কাছেও ঘেঁষতে দিস না।
অভ্রের কথাগুলো শুনে রাহার রাগ যেন আরও দাউদাউ করে জ্বলে উঠল।
ভ্রু কুঁচকে ক্ষুব্ধ গলায় বলে উঠল সে—
— ছিঃ! বাজে মানুষ… নির্লজ্জ… একদম অসভ্য!
আর কখনো আমার আশেপাশে আসবেন না, বলে দিলাম। তর্জনী তুলে কড়া গলায় কথাগুলো বলেই সরে যেতে নিল সে। কিন্তু তার আগেই অভ্র আলতো অথচ শক্তভাবে রাহার কব্জিটা ধরে পেছনের দিকে টেনে নিল। আঙুলগুলো নিজের মুঠোয় বন্দি করে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল—
— আমার জন্য তোর কিছুই ফিল হয় না?
হঠাৎ টানে রাহা ব্যথায় কুঁকড়ে উঠল।
— না… হয় না… ছাড়ুন, লাগছে আমার।
অভ্রর চোখদুটো হঠাৎ অদ্ভুত গাঢ় হয়ে উঠল।
— লাগুক। আমারও তো এই আগুনে পুড়ে পুরো নয়টা বছর কাটাতে হয়েছে… সেই হিসেবটা কে দেবে?
অভ্রর কথার গভীরতা পুরোপুরি ধরতে পারল না রাহা। ভ্রু কুঁচকে তাকাল সে।
— মানে…?
অভ্র ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি টেনে ধীরস্বরে বলল—
— কিছু না। আগে এটা বল… তোর এত জ্বালা হচ্ছে কেন, বেবি?
রাহা সঙ্গে সঙ্গে তেতে উঠল।
— আমার বয়েই গেছে আপনার জন্য জ্বলতে! আপনি কী এমন— দেশের নায়ক নাকি কোনো প্রেসিডেন্ট ?
অভ্র মুচকি হেসে আরও একপা এগিয়ে এল।
— ওহ্… তাই নাকি? তার মানে তোর অন্তরে আগুন ধরাতে আমাকে নায়ক কিংবা প্রেসিডেন্ট হতে হবে?
একটু থেমে চোখে দুষ্টু ঝিলিক নামিয়ে বলল—
— চ্যালেঞ্জ একসেপ্টেড।
কথাটা বলেই অভ্র ঘুরে দাঁড়াল।
— ঠিক আছে, তাহলে আমি আয়াতের কাছেই যাচ্ছি।
অভ্র সামনের দিক এক পা বাড়াতেই আচমকা রাহা ঝটকা মেরে অভ্রর শার্টের কলার চেপে ধরল। শক্ত করে আটকে দিল তাকে। চোখদুটো রাগ, অধিকার আর অদ্ভুত এক অস্থিরতায় কাঁপছে।
— একদম যাবেন না। খুন করে ফেলব বলে দিলাম।
অভ্র চোখে নুইয়ে নিজের কলার আঁকড়ে ধরা ছোট্ট হাতটার দিকে তাকাল। তারপর ধীরে ধীরে চোখ তুলে রাহার দিকে তাকাতেই ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল গাঢ়, বিজয়ী হাসি। তার ভেতরটা স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছে— সে জিতে গেছে।
অভ্র নিচু স্বরে বলল—
— এই তো একটু আগে বললি, আমার জন্য তোর কিছুই ফিল হয় না। তাহলে এখন আটকাচ্ছিস কেন, জান?
রাহা সঙ্গে সঙ্গে চোখ সরিয়ে নিল। কিন্তু হাতটা ছাড়ল না। বরং আরও শক্ত করে কলারটা মুঠোয় নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল—
— আয়াতের কাছে যাবেন না।
— কেন?
অভ্র ইচ্ছে করেই আরও কাছে ঝুঁকে এল।
— তুই তো বললি, আমার সাথে কে কথা বলল তাতে তোর কিছু যায় আসে না।
রাহার বুকটা ধক করে উঠল। সে নিজেও বুঝতে পারছে না কেন এত রাগ হচ্ছে। কেন অভ্রর অন্য কারও দিকে তাকানোর কথাতেই তার ভেতরটা পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে।
— আমি শুধু বলেছি…
কথা শেষ করতে পারল না সে।
অভ্র মুচকি হেসে ফিসফিস করে বলল—
— শুধু বলেছিস… কী? হিংসে হচ্ছে?
— না!
রাহা তড়িঘড়ি করে উত্তর দিলেও কণ্ঠের সূক্ষ্ম কম্পন তার ভেতরের অস্থিরতাকে স্পষ্ট করে দিল।
তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে চাপা অভিমানে বলল
— আমাকে ‘জান’ বলে ডাকেন, আবার অন্য কারও দিকেও ঝুঁকতে চান? দিস ইজ নট ফেয়ার, অভ্র ভাই…
অভ্র এবার আলতো করে রাহার হাতটা নিজের কলার থেকে নামিয়ে নিজের মুঠোয় নিয়ে ফেলল। তারপর গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল—
— তাহলে ফেয়ার কোনটা, রাহা বেবি? এই যে বারবার মিথ্যে বলে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিস? তুই হয়তো মুখে সব লুকাতে পারিস… কিন্তু তোর চোখ? ওগুলো প্রতিবারই তোকে আমার কাছে ধরিয়ে দেয়, জান।
রাহা কিছু বলার আগেই অভ্র আরও এক ধাপ কাছে এসে নিচু গলায় বলল—
— আর শুন… আমি নায়ক না, প্রেসিডেন্টও না।
কিন্তু তোর জীবনের খলনায়কটা কে জানিস..?
সেটা আমি। আর সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার কি জানিস, রাহা বেবি? তুই এখন নিজেও সেটা বুঝতে শুরু করেছিস। আমার থেকে তোর এই ইহকালে কোনো নিস্তার নেই। মরার আগে পর্যন্ত তোকে আমার ছায়া হয়েই থাকতে হবে। কারণ আমি মানুষটা খারাপ হতে পারি,
কিন্তু তোকে ছাড়ার মতো ভালো কখনোই না।
রাহা নিজেও আবারও ওয়ার্নিং দেওয়ার ভঙ্গিতে আঙুল তুলে কড়া স্বরে বলে উঠল—
— চুপ করুন! আর কান খুলে একটা কথা শুনে রাখুন… খবরদার! আজকেই ফার্স্ট আর লাস্টবার বললাম। কেনো মেয়ের দিক চোখ তুলে তাকাবেন না। এরপর আবার এমন কিছু দেখলে আমার চেয়ে ভয়ংকর আর কেউ হবে না। এটা মাথায় রাখবেন।
তার চোখেমুখে তখন তীব্র অধিকার, জেদ আর দহন স্পষ্ট। অভ্র যেন উল্টো মজাই পেল। ঠোঁট বাঁকিয়ে হালকা হাসল সে। এটাই তো সে এসেছে এতদিন। তার বাসনা পূর্ণ হচ্ছে।
হুট করেই আচমকা রাহার সরু কোমর জাপটে নিজের একদম কাছে টেনে আনল।
নিচু স্বরে ধীরে ধীরে বলল—
— এইটুকুনি একটা মেয়ে… সে কিনা আমাকে থ্রেট দিচ্ছে? এই জিহাদ খান অভ্রকে? ওয়াও… গ্রেট।
রাহা চোখ রাঙিয়ে তাকালেও অভ্রর চোখে তখন স্পষ্ট দুষ্টু মুগ্ধতা। অভ্র আরও একটু ঝুঁকে এলো। দু’জনের নিঃশ্বাস প্রায় একসাথে মিশে যাচ্ছে।
— ভয় করছে না তোর?
রাহা এক সেকেন্ডও দেরি করল না। চোয়াল শক্ত করে, সরাসরি অভ্রর চোখে চোখ রেখে বলল—
— না, ভয় কেনো পেতে যাবো।
অভ্রর ঠোঁটের কোণে হালকা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল।
— ভেবে বলছিস তো? লাই কিন্তু দিচ্ছিস… আমাকে সামলাতে পারবি তো? তুই আমার নয় বছরের তপস্যা… নয় বছরের দহন। আমি এখন উগ্র নেকড়ের মতো ক্ষুধার্ত। একবার আমার হয়ে এলে আর ফিরে যাওয়ার পথ পাবি না। পিছিয়ে যেতে চাইলে ও তোকে পিছাতে দিবো না আমি।
অভ্র আরও নিচু হয়ে ফিসফিস করে বলল—
— শুধু একবার আমাকে ভালোবেসে দেখ… তোর পায়ের নিচে পুরো পৃথিবী এনে রাখব। বিনিময়ে আমার শুধু একটাই চাওয়া— তুই শুধুই আমার হয়ে থাকবি।
অভ্রের এমন কথায় রাহা একদম বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। এটাই কি সেই মানুষ, যাকে সে এতদিন যমের মতো ভয় পেয়ে এসেছে?
যার চোখের দিকে তাকালেই বুক কেঁপে উঠত, নিঃশ্বাস আটকে আসত? অথচ সেই মানুষটাই আজ এমনভাবে তাকে ভালোবাসার কথা বলছে…
যেন পৃথিবীর সবকিছুর চেয়েও বেশি মূল্যবান শুধু রাহা।
মুহূর্তের জন্য রাহার মনে হলো,
অভ্রকে সে হয়তো কখনো বুঝতেই পারেনি।
লোকটা বাইরে থেকে যতটা কঠিন, ভিতর থেকে ঠিক ততটাই ভয়ংকরভাবে গভীর।
রাহার আজ আর বিন্দুমাত্র ভয় লাগছিল না।
বরং বুকের ভেতর অদ্ভুত এক তীব্র অনুভূতির ঢেউ উঠছিল। কথাগুলো কানে পৌঁছাতেই তার ভেতরের সমস্ত অস্থিরতা যেন মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল। সব দুশ্চিন্তিকে সরিয়ে হৃদয়জুড়ে নেমে এলো গভীর প্রশান্তি আর অদ্ভুত এক নিশ্চিন্ততা। রাহার চোখে চিকচিক করে উঠল সুখের অশ্রু।
অভ্রর শার্টের কলার মুঠো করে টেনে ধরতেই নিজের অজান্তেই তার থুতনি খানিক উঁচু হয়ে উঠল। অভ্র সেটা টের পেয়ে ধীরে ধীরে আরও ঝুঁকে এলো। রাহা এবার তাকে আরেকটু কাছে টেনে নিল। তারপর কাঁপতে থাকা কোমল অধর নিঃশব্দে ছুঁইয়ে দিল অভ্রর কপালে।
এই প্রথমবার— রাহা নিজে থেকেই তার রূপকথার মানুষটার এতটা কাছে এলো। যে মানুষটাকে সে সবসময় শুধু কল্পনায় এঁকেছিল— একটু ভিলেইন টাইপ, ভয়ংকর অথচ অসম্ভব আকর্ষণীয় একজন পুরুষ।
রাহা তো বরাবরই কোরিয়ান ড্রামার পাগল ভক্ত।
সেখানে দেখানো ঠান্ডা স্বভাবের, ডমিনেটিং, রহস্যময় পুরুষ চরিত্রগুলোর প্রতি তার আলাদা দুর্বলতা ছিল।
কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপারটা হলো—
নিজেরই বাসায়… নিজেরই কাজিনের মাঝেই সে ঠিক সেই একই ভয়ংকর আকর্ষণ খুঁজে পাবে, সেটা কোনোদিন কল্পনাও করেনি।
কী ভয়ংকর আইরনি তাই না?
রাহার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি কাজ করল। ভয় পাওয়া উচিত ছিল তার… অথচ সে দিনদিন সেই মানুষটার দিকেই আরও বেশি টান অনুভব করছে।
প্রেয়সীর এমন হঠাৎ কাণ্ডে অভ্রের চোখজোড়া আপনাআপনি বন্ধ হয়ে গেল,
যেন এই ক্ষণটাকে নিজের অস্তিত্বের গভীরে গেঁথে নিতে চাইছে সে। রাহার ঠোঁটের উষ্ণ স্পর্শ, কাঁপা নিঃশ্বাস… সবকিছু মিলিয়ে অভ্রর ভিতরটা অদ্ভুত শান্ত হয়ে আসছিল। যে মানুষটা সবসময় রাগ, দখলদারিত্ব আর কঠিন ব্যক্তিত্বের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখে, সে মানুষটাই এই মুহূর্তে পুরোপুরি দুর্বল হয়ে পড়েছে শুধু একটা মেয়ের সামনে।
রাহা সরে আসতেই অভ্র আটকে দিলো ধীরে ধীরে চোখ খুলল ,চোখদুটো লালচে, গভীর… আর সেখানে স্পষ্ট একরাশ অবিশ্বাস মেশানো ভালোবাসা।
— আবার দে…প্লিজ
খুব নিচু স্বরে বলল সে।
রাহা লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলতেই অভ্র হালকা হেসে তাকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে নিল।
তারপর চোখ বন্ধ করেই ফিসফিস করে বলল—
— এই একটা চুমুতে আমার পোষাবে না রাহা বেবি।
ঠিক আছে আজকের জন্য মাফ করলাম। আর লজ্জা পেতে হবে না।
— সবাই আমাকে ভয় পায়।
কিন্তু তোর সামনে আসলে আমার সব রাগ, সব অহংকার কোথায় যেন হারিয়ে যায়।
শুধু মনে হয়… এই মেয়েটাকে একটু কাছে রাখি। আর কিছু না। রাহা নিঃশব্দে অভ্রর বুকের ওপর মাথা রেখে শুনে যাচ্ছে। অভ্রর হাত গুলো আরও শক্ত হয়ে জড়িয়ে ধরে আছে।
কয়েক সেকেন্ড পরেই অভ্র রাহার চুবক ধরে মুখ্টা সামনে তুলে ধরতেই ভেসে উঠল সেই ছোট্ট, জেদি মেয়েটার মুখ— যে অজান্তেই তাকে সম্পূর্ণ উন্মাদ করে দিয়েছে। আজ যেন তার জীবনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত দিন। বুকভরা উচ্ছ্বাস, অবিশ্বাস্য আনন্দ আর বহু বছরের জমে থাকা অপেক্ষা একসাথে বিস্ফোরিত হচ্ছে তার ভেতরে।
এই অনুভূতি কোথায় লুকাবে, কীভাবে সামলাবে— অভ্র যেন নিজেও বুঝে উঠতে পারছে না।
হুট করেই অভ্র রাহাকে শূন্যে তুলে নিজের বাহুর মাঝে আগলে নিলো। তারপর শিশুসুলভ উচ্ছ্বাসে তাকে নিয়ে বনবন করে ঘুরতে লাগল বেলকনির সাথে লাগানো খোলা ছাদজুড়ে।
আচমকা এমন কাণ্ডে রাহা হেসে উঠল। দুই হাত বাতাসে ছড়িয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করেই উপভোগ করতে লাগল মুহূর্তটা। সকালের নরম হাওয়ায় তার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে উড়ছে, আর টুকটুকে রোদের আলো এসে পড়ছে তার হাসিমাখা মুখে।
চারপাশটা যেন হঠাৎ করেই অসম্ভব সুন্দর হয়ে উঠল। আর অভ্রর বাহুর মাঝে নিজেকে এভাবে আবিষ্কার করে রাহার মনে হচ্ছিল— এই সকালটা বোধহয় তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সকাল।
একসময় অভ্র ঘোরা থামিয়ে রাহাকে নিজের একদম সামনে নামিয়ে দাঁড় করাল। তবুও তার হাত দুটো রাহার কোমর ছেড়ে সরে গেল না। দু’জনের নিঃশ্বাস তখনও অগোছালো হয়ে আছে। অভ্র একটু ঝুঁকে নিজের কপালটা আলতো করে ঠেকিয়ে দিল রাহার কপালে আর দুজনের নিঃশ্বাস দুজনের উপর আছড়ে পরছে। চোখে চোখ পড়তেই রাহার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। আর সেটা দেখে অভ্রও হেসে ফেলল।
আর তাদের সেই দৃশ্যগুলো দেখে থমকে দাঁড়িয়ে ছিল আয়াত। যেনো তার পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার কোনো শক্তি নেই। চোখের কোণে নীরব অশ্রুবিন্দু চিকচিক করে উঠল। দরজার পর্দার আড়াল থেকে পুরো দৃশ্যটাই দেখেছে সে। কিশোরী মনের প্রথম ভালোলাগাটা যেন শুরু হওয়ার আগেই নিঃশব্দে ভেঙে গেল।
সে এসেছিল রাহাকে খুঁজতে।নিচে না পেয়ে ধীরে ধীরে উপরে উঠে আসে। আর এসেই দেখে— অভ্রর শক্ত বাহু রাহার কোমর জড়িয়ে আছে, আর রাহার আঙুল শক্ত করে চেপে ধরে আছে অভ্রর শার্টের কলার।
দুজনের মাঝের নীরব ঘনিষ্ঠতা যেন মুহূর্তেই আয়াতের বুকের ভেতরটা শূন্য করে দিয়েছে। না পারছিল চলে আসতে। তার পা গুলো যেন তার সাথে বেইমানি শুরু করে দিয়েছে।
অনেক আগেই রাহার নজর পড়েছিল পর্দার পাশে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকা আয়াতের উপর। আর ঠিক তখন থেকেই মাথার ভেতর ধীরে ধীরে একটা দুষ্টু পরিকল্পনা পাকতে শুরু করেছিল তার।
ইচ্ছে করেই সে অভ্রের আরও কাছে চলে আসে, যেন দৃশ্যটা আয়াতের চোখ এড়িয়ে না যায়। ঠোঁটের কোণে চাপা, রহস্যময় হাসি ফুটে ওঠে রাহার। আর তার সেই চাল নিখুঁতভাবেই কাজে লেগে যায়।
উদ্দেশ্য একটাই— আয়াতকে দেখানো।
আর তার সেই চাল পুরোপুরি সফলও হলো।
আয়াত সবটা দেখেও নিজেকে সামলে নিল। বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলেও মুখে কিছু প্রকাশ করল না। রাহা তো তার নিজের বোন। আর যখন দু’জন দু’জনকে পছন্দ করে, সেখানে সে কখনো বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। চোখের কোণে জমে থাকা কষ্ট লুকিয়ে খুব ধীরে কাপা কাপা পায়ে কদম ফেলে সেখান থেকে সরে আসে।
আয়াত চলে যেতেই রাহা আচমকাই অভ্রের থেকে নিজেকে সরিয়ে নিল। মুহূর্তের মাঝখানে যেন হঠাৎ করেই বরফশীতল একটা দূরত্ব নেমে এলো। একটু আগেও যে মেয়েটা তার শার্টের কলার আঁকড়ে ধরে অধিকার ফলাচ্ছিল, সেই মেয়েটাই এখন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে চুল কানে গুঁজে নির্বিকার গলায় বলে উঠল—
— যান, এবার আমার কাজ শেষ।
কথাটা শুনেই অভ্রর বুকের ভেতর কেমন যেন ধপ করে উঠল। মুহূর্তেই অভ্রের ভেতরের উত্তাপ যেন বরফশীতল পানিতে ডুবে গেল। মুখের হাসিটা মিলিয়ে গিয়ে চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। চোখের দৃষ্টিতে জমাট বাঁধল বিপজ্জনক অন্ধকার।চোখ-মুখ শক্ত হয়ে এলো তার। ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর স্বরে বলল,
— মানে?
·
·
·
চলবে……………………………………………………