আড়ালে আবডালে শুধুই তুই - পর্ব ৩০ - রাহা ইসলাম - ধারাবাহিক গল্প

আড়ালে আবডালে শুধুই তুই
রাহা ঠোঁট বাঁকিয়ে কাঁধ ঝাঁকাল।

 — এত অবাক হওয়ার কী আছে? আয়াত আপু যেন আপনাকে নিয়ে ভুল কিছু না ভাবে, তাই একটু নাটক করলাম। আপনি তো এমনিতেও অভিনয়ে ভালো করলেন।

এক সেকেন্ড… দুই সেকেন্ড… পুরো ছাদজুড়ে নেমে এলো অস্বস্তিকর নীরবতা। অভ্র স্থির চোখে শুধু তাকিয়ে রইল রাহার দিকে। সেই দৃষ্টিটা এতটাই তীক্ষ্ণ ছিল যে, রাহার বুকের ভেতর পর্যন্ত কেঁপে উঠল। তবুও মুখে জেদের মুখোশ টিকিয়ে রাখল সে।

— কী হলো? চুপ করে আছেন কেন?

অভ্র ধীরে ধীরে জিভ দিয়ে নিজের গালের ভেতরটা চেপে ধরে হাসল। কিন্তু সেই হাসিতে উষ্ণতার বদলে ছিল হিংস্র শীতলতা।

— তাই নাকি? মানে এতক্ষণ যা যা বললি… যা যা করলি… সবটাই অভিনয় ছিল?

রাহা চোখ সরিয়ে নিল
 — অবশ্যই। না হলে কেন করব?

অভ্র এবার ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলো। এক পা… দুই পা…
রাহা অজান্তেই পিছু হটতে লাগল। কিন্তু অভ্র থামল না। শেষমেশ পেছনে দেয়ালে গিয়ে ঠেকে গেল সে। অভ্র দু’হাত দেয়ালে ঠেকিয়ে তাকে সম্পূর্ণ আটকে ফেলল নিজের মাঝে।
নিচু, ভারী গলায় দাঁতে দাঁত চেপে বলল—

 — তাহলে একটা জিনিস বুঝিয়ে দে, রাহা বেবি… অভিনয় করার কারণটা কি? অভিনয় করতে গিয়ে তোর চোখ কাঁপছিল কেন? আমার নাম শুনলেই তোর নিঃশ্বাস এলোমেলো হয়ে যায় কেন? আর আমি আয়াতের কাছে যাওয়ার কথা বলতেই তুই আমাকে খুন করার হুমকি দিলি কেন?
-জাস্ট টেল মি, ড্যাম ইট!

রাহা ঠোঁট কামড়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল। চোখ গুলো ছোট ছোট হয়ে গেলো,ভয়ে তোতলাতে তোতলাতে বলতে লাগলো,

 — ও...ওসব কিছু না। 

— ওহ্, কিছু না?

অভ্র হঠাৎ তার থুতনিটা শক্ত করে ধরে নিজের দিকে ফিরিয়ে আনল। তার চোখদুটো তখন কঠোর ভাবে জ্বলছে। 

— তাহলে কপালে চুমুটা? ওটাও অভিনয়?

রাহার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে— অভ্র রেগে গেছে। আর এই মানুষটার রাগ ভয়ংকর।
তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে কষ্টে হাসল সে। 

— আপনি তো ভিলেন টাইপ মানুষ। ভিলেনদের একটু ধোঁয়াশায় রাখা দরকার। বাস্তব নাকি অভিনয় সেটা শুনে আপনি কি করবেন। আমার যেটা কাজ ছিল শেষ এবার আমি যাই।

কথাটা শুনেই অভ্র কয়েক সেকেন্ড চুপ করে হঠাৎ করেই উঁচু স্বরে হেসে উঠল।
সেই হাসিটা শুনে রাহার শরীরের লোম দাঁড়িয়ে গেল। কারণ ওই হাসির ভেতর বিপদের গন্ধ ছিল।
অভ্র ধীরে ধীরে মুখটা রাহার কানের কাছে নামিয়ে ফিসফিস করে বলল—

— ভুল করছিস, জান… আমি ধোঁয়াশা পছন্দ করি না। আমি জিনিস নিজের করে নিতে পছন্দ করি।

তারপর একদম থেমে, ভারী নিঃশ্বাস ফেলে আরও নিচু গলায় বলল—

— আর একটা কথা খুব ভালো করে মনে রাখিস… তুই যদি অভিনয়ও করে থাকিস, তাহলে সেই অভিনয়ের মাঝেই সত্যিটা ফাঁস করে ফেলেছিস। কারণ চোখ কখনো অভিনয় করতে পারে না, রাহা।

রাহা কিছু বলার আগেই অভ্র তার কানের পাশ দিয়ে মুখ সরিয়ে চোখে চোখ রেখে দাঁড়াল। দু’জনের মাঝের দূরত্ব তখন বিপজ্জনকভাবে কম।
অভ্রের গলায় এবার স্পষ্ট দখলদারিত্ব।

— এখন সমস্যাটা কী জানিস? তুই..! 
তুই নিজেই আমাকে আশা দেখিয়েছিস। নিজের দিকে এক পা এগিয়ে আসতে শিখিয়েছিস। আর এখন আবার দূরে ঠেলে দিতে চাইছিস। কিন্তু একটা কথা মনে রাখিস, আমি এমন মানুষ না যে একবার কোনো কিছুকে নিজের বলে মনে করে আবার সহজে ছেড়ে দিতে পারি। আমি একবার যার স্বাদ পাই, তাকে ভুলে যাই না— আর একবার যাকে চাই, তাকে এত সহজে হারাতেও দিই না।

এখন আমাদের হিসাব হবে একদম গিভ অ্যান্ড টেক।

চুমুর বদলে চুমু।

আমি কারও নাটকের চুমু নিজের কাছে জমা রাখি না। যারটা, তাকে সেটাই ফিরিয়ে দিবো। তবে একটা ছোট্ট পার্থক্য থাকবে— তুই আমাকে কপালে দিয়েছিলি, আর আমি তোর…

কথাটা শেষ না করেই অভ্র ঠোঁট গোল করে রাহার ঠোঁটের দিকে ইশারা করল।

অভ্রের ইঙ্গিত বুঝতে পেরেই রাহার চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল। সে তড়িঘড়ি করে দু'হাত দিয়ে নিজের ঠোঁট চেপে ধরে মিনতির সুরে বলল—

— আআআ! আমার ভুল হয়ে গেছে, অভ্র ভাই! আর জীবনে কোনোদিন নাটক করব না। প্লিজ,এবারের মতো আমাকে মাফ করে দিন! 

– তুই না হয় নাটক করেছিস, আমি তো করিনি।
কথাটা বলেই অভ্র খপ করে রাহার দু'হাত চেপে ধরল। শক্ত, দৃঢ়, প্রায় অনড় এক মুঠো। রুমে চল। তোর সব নাটক আজ বের করছি। বলেই কব্জিটা আরও শক্ত করে টেনে নিল সে। 
রাহা ভয় পেয়ে তড়িঘড়ি হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগল।

— ছাড়ুন, অভ্র ভাই! 

কিন্তু অভ্র আজ একদম অনমনীয়। ঠোঁট বাঁকিয়ে নিচু স্বরে বলল,

— আর কোনো ছাড়াছাড়ি নেই। একবার ধরেছি যখন… তখন এত সহজে ছাড়ছি না।

টানতে টানতে তাকে ঘরের ভেতর নিয়ে এসে বিছানার ওপর বসিয়ে দিল। তারপর নিজেও বিছানায় উঠে এল। অভ্র যত সামনে এগোচ্ছে, রাহা তত পিছাচ্ছে। একসময় পিছানোর আর কোনো জায়গা রইল না, কিন্তু অভ্র ধীরে ধীরে রাহার দিকেই এগোতে থাকল। রাহার বুক ধড়ফড় করছে। সে এখন পুরোপুরি অভ্রের মাঝে বন্দী। অভ্র নিজের দুই হাত রাহার দুই পাশে রেখে গলা পর্যন্ত ঝুঁকে এল। ঠোঁটের কাছে অগ্রসর হতেই রাহা মাথা নাড়িয়ে না-না করতে লাগল আর নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগল। এতে অভ্র এক হাত দিয়ে রাহার দুই হাত টেনে ওপরের দিকে চেপে ধরল। আর নিজের দুই পা দিয়ে রাহার দুই পা আটকে দিল। এতে যেন রাহার নড়াচড়া একদম বন্ধ হয়ে গেল। আর অন্য হাত দিয়ে গলাটা খুব হালকাভাবে চেপে ধরল, যেন রাহা নড়তে না পারে। অভ্র তার পুরো শরীরের ভর রাহার উপর ছেড়ে দিয়েছে।

অভ্র এবার ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি টেনে বলল,

— ছোট মরিচের ঝালই বেশি হয়।

তারপর চোখ সরু করে রাহার দিকে তাকিয়ে আবার বলল,

— পিচ্চি একটা মেয়ে হয়ে আমার সাথেই নাটক করতে এসেছিস? সাজা তো পেতেই হবে জান।

কথাটা বলেই সে আরও খানিকটা ঝুঁকে এল।
রাহার ঠোঁট থেকে তার দূরত্ব এখন মাত্র এক নিঃশ্বাসের। রাহা ভয়ে, লজ্জায়, অস্বস্তিতে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল। বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ যেন নিজেই শুনতে পাচ্ছে।
কিন্তু কয়েক মুহূর্ত কেটে গেলেও কিছুই হলো না।
ধীরে ধীরে অভ্রের ঠোঁটে ফুটে উঠল তৃপ্তির এক দুষ্টু হাসি।

রাহাকে এভাবে চোখ বন্ধ করে কুঁকড়ে থাকতে দেখে সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। গলা থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে আলতো ভঙ্গিতে মাথাটা রাহার বুকে এলিয়ে দিল।
তারপর মৃদু হেসে ফিসফিস করে বলল,

— এত ভয় পাস কেন, হুম? 

রাহা মনে মনে মুখ বাঁকিয়ে ভেঙিয়ে বলল,

— নিজেই তো সারাক্ষণ ভয় দেখায়, আবার জিজ্ঞেস করে ভয় পাই কেন! যেন কিছুই জানে না!

তার ইচ্ছে হচ্ছিল অভ্রের মাথায় একটা ঠুস করে গাট্টা বসিয়ে দিতে। মুখে অবশ্য কিছুই বলল না। কারণ এই লোকটার সাথে তর্কে জড়ানো মানেই নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারা।

তবুও মনে মনে বিড়বিড় করে উঠল,

— একটা আস্ত জ্বালাতন! আগে মানুষটাকে ভয় পাইয়ে দিবে, তারপর আবার এমন ভাব করবে যেন কিছুই হয়নি।

কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই সে নিচের দিকে তাকাল। আর ঠিক তখনই বুঝতে পারল, অভ্র এখনও নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে মাথা রেখে আছে তার বুকে।
মুহূর্তেই রাহার কানদুটো লাল হয়ে উঠল,আর জিজ্ঞেস করলো,

— এই যে! আর কতক্ষণ এভাবে থাকবেন?

ক্লান্ত স্বরে অভ্র বিড়বিড় করে বলল,

— সারারাত একফোঁটা ঘুম হয়নি, জান। একটু ঘুমাতে দে…প্লিজ...

কথাগুলো বলেই চোখ বুজে ফেলল সে। তার উষ্ণ নিশ্বাসের স্পর্শ রাহার বুকের কাছে মৃদু ঢেউ তুলতে লাগল। প্রতিটি শ্বাস যেন রাহার অস্থির হৃদস্পন্দনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আছড়ে পড়ছে। হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনায় রাহা পুরোপুরি কিংকর্তব্যবিমূঢ়। রাগ, লজ্জা, বিরক্তি আর অদ্ভুত এক মায়া—সব অনুভূতি মিলেমিশে তার বুকের ভেতর তোলপাড় শুরু করে ।

অভ্রের করুন কণ্ঠের মিনতি সে ফেলতে পারলো না। কিন্তু এভাবে থাকতে তার কেমন যেন লাগছে।এই প্রথম কোনো পুরুষ যে রাহার বুকে এভাবে মাথা রাখলো। এতে রাহা বারবার ছটফট করতে লাগল। ভয় আর লজ্জা মিলে তার ভেতরটা কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। বুকের ভেতর ধুপধুপ শব্দ যেন সে নিজেই শুনতে পাচ্ছে। নিজের উপর থেকে ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে সে।

রাহার এই অস্থিরতায় অভ্র বিরক্ত হয়ে চোখ মেলে তাকাল। তারপর নিচু ধমকের স্বরে বলে উঠল,

— উফ, আর একবার নড়বি, এখানেই কিন্তু খাট কাঁপিয়ে দেব। 
বি আ গুড গার্ল অ্যান্ড স্টে কোয়ায়েট... আদারওয়াইজ, আই'ল স্টার্ট ইটিং ইউ এলাইভ।

কথাটা শুনেই রাহার মুখ থমথমে হয়ে গেল। কথার অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে তার বাকি রইল না।
মুহূর্তেই চুপসে গিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করল,

— ছিঃ! কী অসভ্য মানুষ! মুখে যা আসে তাই বলে!

তবুও অদ্ভুতভাবে তার রাগের সঙ্গে এক অচেনা অনুভূতিও মিশে ছিল। অস্বস্তি হচ্ছিল, অথচ সেই অস্বস্তির আড়ালেই কোথাও যেন একফোঁটা প্রশান্তি লুকিয়ে ছিল।

ধীরে ধীরে তার দু’হাত উঠে এল অভ্রের মাথার কাছে। সংকোচ ভুলে আঙুলগুলো আলতো করে জড়িয়ে গেল তার চুলের ভাঁজে। অন্যমনস্কভাবে চুলগুলো এলোমেলো করতে লাগল সে।
অভ্র চোখ বুজে ফেলল। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল তৃপ্তির এক ক্ষীণ হাসি। সেই স্পর্শ যেন দিনের সমস্ত ক্লান্তি মুছে দিচ্ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই চোখের পাতা ভারী হয়ে উঠল ,সে ঘুমের অতলে তলিয়ে গেল।

রাহার শরীরের অবস্থাও খুব একটা ভালো ছিল না। আগের রাতের নির্ঘুম ক্লান্তি, সারাদিনের মানসিক চাপ আর এই অদ্ভুত শান্ত পরিবেশ—সব মিলিয়ে তার নিজেরও চোখের পাতাগুলো ভারী হয়ে আসছিল। শেষবারের মতো অভ্রের শান্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে রাহাও চোখ বন্ধ করল।
কখন যে নিঃশব্দে ঘুম তাকে নিজের রাজ্যে টেনে নিয়েছে, সে নিজেও টের পায়নি।

—————

অবন্তিকা আর সাফা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে নিতেই আয়াত দ্রুত তাদের পথ আগলে দাঁড়াল। কোনো সুযোগ না দিয়েই দু'জনকে ধরে নিচের দিকে এগিয়ে গেল।

প্রথমে অবন্তিকা আর সাফা খানিকটা অবাক হলেও মুখে কিছুই প্রকাশ করল না। বরং স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই আয়াতের সঙ্গে হাঁটতে লাগল। তবে দুজনের মনেই একই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে— হঠাৎ করে আয়াত আপু তাদের নিচের দিকে নিয়ে যাচ্ছে কেন?

কিন্তু তারা জানত না, আয়াতের এই আচরণের পেছনে যথেষ্ট শক্ত একটা কারণ আছে। সে ভালো করেই বুঝতে পেরেছে, এই মুহূর্তে রাহা আর অভ্রের মাঝে তৃতীয় কারও উপস্থিতি মোটেও কাম্য নয়। তাই কোনো সুযোগ না দিয়েই কৌশলে অবন্তিকা আর সাফাকে অন্যদিকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আজ সে কোনোভাবেই চায় না কেউ গিয়ে তাদের নির্জন মুহূর্তটুকুর মাঝখানে দেয়াল হয়ে দাঁড়াক। 

হঠাৎ অবন্তিকা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,

— কোথায় যাচ্ছি আপু?

আয়াত ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে একদম স্বাভাবিক গলায় বলল,

— বাগানে।

— এই সময় বাগানে? — সাফার কণ্ঠে কৌতূহল।

— হ্যাঁ। ঘরে বসে বসে বিরক্ত লাগছে। ভাবলাম একটু খোলা হাওয়ায় হাঁটাহাঁটি করা যাক।

— একটু রাহাকে দেখে তারপর আসি? ( অবন্তিকা)

সঙ্গে সঙ্গে সাফাও সায় দিল।

— হ্যাঁ, সেই কখন উপরে এসেছে! এখনও তো আর দেখলাম না।

কথাটা শুনতেই আয়াতের বুকের ভেতর কেঁপে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে তার চোখের সামনে ভেসে উঠল কিছুক্ষণ আগের সেই দৃশ্যগুলো। রাহা আর অভ্রের মধ্যকার একান্ত মুহূর্ত। অভ্রের চোখে সেই উন্মত্ত অধিকারবোধ, আর রাহার নীরব আত্মসমর্পণ। অজান্তেই তার চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠল।

আয়াতকে এমন অস্বাভাবিক দেখাতে দেখে সাফা আলতো করে তার বাহুতে ধাক্কা দিল।

— এই আপু, তোমার কী হয়েছে? এমন লাগছে কেন?

প্রশ্নটা শুনে আয়াত যেন হঠাৎ বাস্তবে ফিরে এলো। দ্রুত কয়েকবার চোখের পলক ফেলে নিজেকে সামলে নিয়ে ঠোঁটে জোর করে একটা হাসি টেনে বলল,

— কই? কিছু হয়নি তো!

একটু থেমে আবার বলল,

— আমি তো রাহাকে দেখতে ওর রুমে গিয়েছিলাম। কিন্তু গিয়ে দেখি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তাই আর ডিস্টার্ব করিনি। এমনিতেই ওর শরীরটা ভালো নেই। ভাবলাম, আরেকটু ঘুমাক। বিশ্রামটা অন্তত ঠিকমতো হোক। 

কথাগুলো যতটা সম্ভব স্বাভাবিক শোনানোর চেষ্টা করলেও বুকের ভেতরটা তার ততক্ষণে অদ্ভুত এক ভারে চেপে বসেছে। সে ধীর পায়ে অবন্তিকা আর সাফার সঙ্গে হাঁটতে লাগল।
আর মনে মনে ফিসফিস করে বলল—

"রাহার ওষুধ সে পেয়ে গেছে... ঠিক হয়ে যাবে তাড়াতাড়ি ।

অবন্তিকা আর সাফা আয়াতের পিছু পিছু এগিয়ে গেল। ড্রয়িংরুম পেরিয়ে যেতেই দেখল, সবাই সেখানে বসে আছে। তারা পাশ কাটিয়ে চলে যেতে উদ্যত হতেই আফরোজা বেগম গলা উঁচু করে ডাক দিলেন,

— কিরে, তোরা কোথায় যাচ্ছিস?

আয়াত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জবাব দিল,

— মা, ওদের নিয়ে বাগানে যাচ্ছি। একটু ঘুরে আসি।

— আচ্ছা, যা। কিন্তু রাহা কোথায়?

অবন্তিকা উত্তর দিল,

— ঘুমাচ্ছে।

— ঠিক আছে, তাহলে যা।

এদিকে আগুনের উৎস খুঁজতে গিয়ে আফরোজা বেগম আর মাইনুদ্দিন মির্জার অবস্থা বেশ কাহিল। পুরো বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজেও সন্দেহজনক কিছু না পেয়ে দু’জনেই সোফায় ধপাস করে বসে হাঁপাচ্ছেন।

ঠিক তখনই ইভান এগিয়ে এসে দু’জনের হাতে এক গ্লাস করে পানি ধরিয়ে দিয়ে বলল,

— তোমরাও কম যাওনি! অভ্র ভাইয়ার কথা শুনে এমন তড়িঘড়ি ছুট দিলে, যেন পুরো বাড়িটাই আগুনে পুড়ছে। আমি তো সামনেই গিয়ে বুঝে গিয়েছিলাম, কিছুই হয়নি। কিন্তু এরপর তোমাদের খুঁজে পাওয়াই দায় হয়ে গেল। কে যে কোন আড়াল-আবডালে, কোন কোণা-কাঞ্চিতে ঢুকে পড়েছিলে, খুঁজেও হদিস পাচ্ছিলাম না! পুরো বাড়ি চষে ফেলেছি, তারপর গিয়ে তোমাদের দেখা মিলেছে।

অভ্রের কথা শুনে আফরোজা বেগম চারপাশে তাকিয়ে বললেন,

— আচ্ছা, অভ্র কোথায় গেল?

সঙ্গে সঙ্গে ইভান উত্তর দিল,

— আমার রুমে। ফ্রেশ হয়ে একটু রেস্ট নিচ্ছে।

ইভানের কথা শেষ হতেই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিফার দিকে কৌতুকভরা চোখে তাকাল সে। 

শিফা আশ্চর্য ভঙ্গিতে ইভানের দিকে তাকালো। মাথায় এখনো একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।

—মানুষটা এত নির্লজ্জের মতো এত বড় মিথ্যা কীভাবে বলে ফেলল!

শিফার সেই বিস্মিত দৃষ্টি দেখে ইভান ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে এক চোখ মারল।
তারপর নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল,

— এভাবে তাকিয়ে আছো কেন? ভালো কাজ করতে গেলে মাঝে মাঝে একটু-আধটু মিথ্যা বলতেই হয়।

কথাটা বলেই সে ভ্রু নাচিয়ে যোগ করল,

— দুইজন যে কী রেস্ট নিচ্ছে, সেটা কিন্তু আমি বেশ ভালো করেই বুঝতে পারছি!

কথাটা শুনেই শিফার গাল লাল হয়ে উঠল। যতই হোক তার বড় ভাই আর ছোট বোনতো। লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল সে। চোখ তুলে কারও দিকে তাকানোর সাহসও যেন পাচ্ছিল না। আর ইভান ঠোঁট চেপে হাসি আটকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করতে লাগল।

—————

বাগানে পা রাখতেই তিনজনের চোখ পড়ল দুই দিকে।
একদিকে জারিফ, বেঞ্চে আরাম করে বসে ফোন স্ক্রল করছে। এমন ভাব যেন পৃথিবীর সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ আজ তার আঙুলের ডগাতেই হচ্ছে।

আরেকদিকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে জায়ান কারও সাথে ফোনে কথা বলছে। মুখভঙ্গি এতটাই গম্ভীর যে দেখে মনে হচ্ছে দেশের অর্থনীতি বাঁচানোর জরুরি বৈঠক চলছে!

জারিফ আবার উল্টো দিকে মুখ করে বসে থাকায় তাদের উপস্থিতি টেরই পেল না।

ঠিক তখনই অবন্তিকার মাথায় দুষ্টুমির একশো ওয়াটের বাল্ব জ্বলে উঠল।

"মৌমাছি" বলে খেপিয়েছিল না?

আজ সেই অপমানের সুদে-আসলে হিসাব চুকানো হবে! চারপাশে চোখ বুলাতেই তার নজরে পড়ল বাগানের একপাশে লাগানো পানির লাইনের দিক। পাশে সুন্দর করে গুটিয়ে রাখা লম্বা লতা পাইপ। যেটা দিয়ে গাছে পানি দেওয়া হয়।
অবন্তিকার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে এক রহস্যময় বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সেই হাসি দেখে আশেপাশে কোনো ভিলেন থাকলে চাকরি ছেড়ে দিত!

হাঁটতে হাঁটতেই হঠাৎ থেমে গেল সে।

সাফা ভ্রু কুঁচকে বলল,

— কিরে? থামলি কেন?

অবন্তিকা একদম নিরীহ মুখ করে বলল,

— কিছু না। আমি একটু হাতটা ধুয়ে আসি ময়লা লেগে গেলো। তোরা যা, আমি আসছি।

সাফা সন্দেহের চোখে কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল,

— কোথায় ময়লা? ঠিকই তো আছে।

— এই দেখ!

বলেই অবন্তিকা তড়িঘড়ি করে দুই হাত সামনে তুলে এদিক-ওদিক নাড়াতে লাগল, যেন হাতের ময়লাটা সবাইকে দেখাতে চায় না।

ময়লা লাগলে তো দেখাবে..! মনে মনে ভাবে

সাফা বিরক্ত ভঙ্গিতে হাত তুলে থামিয়ে দিল।

— হয়েছে, হয়েছে! আর দেখাতে হবে না। যা, ধুয়ে আয়।

আয়াতও সঙ্গে সঙ্গে সায় দিয়ে বলল,

— ওইদিকে পানির লাইন আছে। যা, গিয়ে হাত ধুয়ে আয়।

অবন্তিকা আর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। দ্রুত পা চালিয়ে সেদিকেই এগিয়ে যেতে যেতে বলল তোমরা যেতে থাকো আমি তাড়াতাড়ি আসছি।

– তোর ওই "আমি আসছি" কথাটার ওপর আমার বিন্দুমাত্র ভরসা নাই। তারপরও যা, তাড়াতাড়ি আয়। (সাফা)

— আচ্ছা আচ্ছা, যা তো!

ওরা চলে যেতেই অবন্তিকা চোরের মতো চারপাশে তাকাল। মিশন শুরু।
ধীর পায়ে টিপটো করে এগিয়ে গেল টেপকলের দিকে। তারপর অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পাইপটা কলের সাথে লাগিয়ে দিল।
মুখে তখন এমন এক হাসি, যেটা দেখলে যে কেউ বুঝে যেত— কারো না কারো আজ সর্বনাশ নিশ্চিত!

দূরে নিশ্চিন্ত মনে ফোন স্ক্রল করতে থাকা জারিফ তখনও জানে না, তার শান্তিপূর্ণ জীবনের শেষ কয়েকটা শুকনো মুহূর্ত চলছে...! 
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp