আড়ালে আবডালে শুধুই তুই - পর্ব ২৮ - রাহা ইসলাম - ধারাবাহিক গল্প

আড়ালে আবডালে শুধুই তুই
          গা ছমছমে, স্যাঁতসেঁতে সেই পরিত্যক্ত গোডাউনের মাঝখানে ছুঁড়ে ফেলে রাখা হয়েছে পাঁচজনকে। চারদিকে আধো-অন্ধকারের রাজত্ব। মাথার উপর ঝুলে থাকা মরিচাধরা টিনের ছাদ থেকে টুপটাপ করে পানি পড়ছে, আর সেই শব্দ নিস্তব্ধতাকে আরও ভয়াল করে তুলছে।
পেছন দিকে শক্ত করে বাঁধা তাদের দুই হাত। মোটা দড়ির চাপে কব্জির চামড়া লালচে হয়ে উঠেছে। আতঙ্কে কারও বুক দ্রুত উঠানামা করছে, কারও কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে ঠান্ডা ঘাম। চোখে-মুখে স্পষ্ট অসহায়তার ছাপ, অথচ সেই নীরবতা ভাঙার সাহস কারও নেই।

ঠিক তখনই ভারী বুটের নিয়মিত শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে থাকে গোডাউনের ফাঁকা দেয়ালজুড়ে।
ঠক... ঠক... ঠক...
শব্দটা যত কাছে আসে, ততই জমাট বাঁধতে থাকে ভয়।
অবশেষে অন্ধকার চিরে ভেতরে প্রবেশ করে অভ্র। তার মুখে কোনো ক্রোধ নেই, নেই কোনো উন্মত্ততা। বরং সেই অস্বাভাবিক শান্ত চেহারাটাই পরিস্থিতিকে আরও ভীতিকর করে তুলেছে।

অভ্রকে দেখামাত্রই জারিফ একটুও দেরি না করে সামনে একটি ধাতব চেয়ার টেনে দেয়। ধীর, স্থির পদক্ষেপে সেখানে গিয়ে বসে অভ্র। এক পা অন্য পায়ের উপর তুলে হেলান দেয় চেয়ারের পিঠে। যেন বিচারক নিজের আসনে বসেছে, আর সামনে দাঁড়িয়ে আছে অপরাধীরা।

অন্যদিকে জায়ানের হাতে ধরা সেই বহুল পরিচিত টুলবক্স। ধাতব বাক্সটার গায়ে পড়া ম্লান আলো অদ্ভুত এক শীতল ঝিলিক ছড়াচ্ছে। বাক্সটা মেঝেতে রাখতেই ধাতুর ঠোকাঠুকির ক্ষীণ শব্দ ভেসে আসে, যা উপস্থিত সবার মেরুদণ্ড বেয়ে শীতল স্রোতের মতো নেমে যায়।
গোডাউনের বাতাস হঠাৎই আরও ভারী হয়ে ওঠে।
কেউ কিছু বলছে না।
তবুও নীরবতার মাঝেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে—এখানে কি হতে যাচ্ছে।

অভ্র বসেই আদেশ দিলো
এদের জ্ঞান ফিরা,তাড়াতাড়ি…”

জারিফ এগিয়ে এসে বালতি ভর্তি ঠান্ডা পানি তাদের গায়ে ঢালতে যাবে, ঠিক তখনই অভ্রের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে আসে—
— “নোপ। স্টপ।”

জারিফ থেমে যায়।
অভ্র ধীর পায়ে সামনে এসে চেয়ারের হাতলে আঙুল ঠুকতে ঠুকতে বলে—

— “এত সহজে ঠান্ডা পানি ঢেলে জ্ঞান ফেরাবি? নো ওয়ে।”

চোখের কোণে জমে থাকা অদ্ভুত ইঙ্গিতটাই যথেষ্ট ছিল। বহুদিনের সঙ্গী জারিফ সেই ভাষা পড়তে ভুল করে না। তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে শয়তানি হাসি ফুটে ওঠে।এক মুহূর্তও নষ্ট না করে সে গোডাউনের ভেতরে তৈরি ছোট স্টোররুমের দিকে হাঁটা দেয়। সেখানে প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জাম আগেই মজুত রাখা আছে।
কিছুক্ষণ পর হাতে কয়েকটি প্যাকেট নিয়ে ফিরে আসে সে।

অভ্র নিশ্চুপ। চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে শুধু দেখছে। জারিফ প্যাকেটগুলো থেকে লাল মরিচের গুড়া পানির সঙ্গে মিশিয়ে নেয়। সাথে সাথেই বালতি সহ ঢেলে দেয় পাঁচজনের উপর।
প্রথমে নিস্তব্ধতা। তারপর কয়েক সেকেন্ড।
হঠাৎ করেই নীরব গোডাউনজুড়ে অস্থির নড়াচড়ার ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। একে একে সবাই জেগে ওঠার লক্ষণ দেখাতে শুরু করে। বাঁধা অবস্থায় ছটফট করতে থাকে তারা, যেন অদৃশ্য কোনো আতঙ্ক মুহূর্তেই তাদের ঘুম ভেঙে বাস্তবে ফিরিয়ে এনেছে।

জারিফ মুচকি হেসে পাশে সরে দাঁড়ায়।
আর অভ্র...
চেয়ারে হেলান দিয়ে বসেই রক্তশীতল দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে।
তার চোখের সেই স্থির দৃষ্টি যেন স্পষ্ট ভাষায় বলে দিচ্ছিল—
“এখন খেলা শুরু।”

মুহূর্তেই পাঁচজনের সব মাতলামি, দম্ভ আর বেপরোয়া ভাব উবে গেল। চোখের পলকে নেমে এলো আতঙ্কের ঘন ছায়া।
অভ্র ধীর পায়ে সামনে এগিয়ে এলো। ঠোঁটের কোণে ভেসে উঠল এক শীতল, অস্বস্তিকর হাসি। তারপর কর্কশ অথচ স্থির কণ্ঠে বলল—

"ওয়েলকাম টু মাই হেল জোন..."

কথাটা উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই যেন গোডাউনের ভারী বাতাস আরও জমাট বেঁধে উঠল। 
“আজ তোদের প্রত্যেকের সাহস, দম্ভ আর উত্তেজনার পারদ মাপা হবে। দেখি তো, কতদূর পর্যন্ত নিজেদের বীরপুরুষ ভাবতে পারিস..."
কথা শেষ করেই পাশে রাখা পাত্র থেকে একমুঠো ঝাঁঝালো মরিচগুঁড়া তুলে নিল সে। পরের মুহূর্তেই তা ছুড়ে দিল তাদের মুখের ওপর। চোখ-মুখ জ্বালায় ছটফট করে উঠল সবাই।

হঠাৎ তাদের মধ্যে একজন দাঁত কিড়মিড় করে চিৎকার করে উঠল—

"এই! আমাদের বেঁধে রাখছিস? জানিস আমি কে?"
ক্রোধে তার চোখ রক্তবর্ণ হয়ে উঠেছে।
"আমার নাম মুরাদ! এই এলাকার মেম্বারের ছেলে আমি। আমার বাবার নাম শুনেছিস কখনো? খবর পেলে তোর অস্তিত্ব পর্যন্ত মুছে ফেলবে। কোথায় লুকাবি তখন?"

হুমকি দিয়ে বুক ফুলিয়ে তাকিয়ে রইল সে। কিন্তু অভ্রর মুখের সেই বরফশীতল হাসিটুকুও বদলাল না। যেন এসব কথার কোনো মূল্যই তার কাছে নেই।

মুরাদের নামটা কানে আসতেই জারিফ স্তব্ধ হয়ে গেল। বিস্ময়ে তার চোখদুটো অস্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে উঠল। মুহূর্তের মধ্যেই মস্তিষ্ক অতীতের ছিন্নভিন্ন অধ্যায়গুলো জোড়া লাগিয়ে ফেলল।
এই তাহলে সেই মানুষ... যার লোভ, ষড়যন্ত্র আর নোংরা খেলায় তার ভাই আর মায়া একে অপরের হয়েও কখনো এক হতে পারেনি। যে একটি নয়, দুটো পরিবারকেই ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল। অসংখ্য স্বপ্নকে মাটিচাপা দিয়েছিল নিজের স্বার্থের নিচে। স্মৃতির বিষাক্ত ঝড়ে ডুবে থাকার মাঝেই অভ্রের কর্কশ, শীতল কণ্ঠস্বর গোডাউনের নিস্তব্ধতা চিরে ভেসে এলো—

— “তুই কোন মাদার*বোর্ড, সেটা জানার বিন্দুমাত্র আগ্রহও আমার নেই। আই ডোন্ট ফাকিং কেয়ার। আমি শুধু একটাই জিনিস কেয়ার করি—মি, মাইন ,অ্যান্ড মাইসেল্ফ।”

আর এটা আদৌ তোর এলাকা নয় বিস্ট। এটা আমার রাজ্য। কথাগুলো বলার সময় তার কণ্ঠে এমন এক নির্মম নির্লিপ্ততা ছিল, যেন সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা তার কাছে নিছক একটা শ্বাসপ্রশ্বাস নেওয়া বস্তু ছাড়া আর কিছুই নয়।

জারিফ এক পা পিছিয়ে যেতেই অভ্রের বাজপাখির মতো ধারালো দৃষ্টি তার উপর গিয়ে আটকাল।
সেই দৃষ্টির চাপ সহ্য করতে না পেরে জারিফ কাঁপা গলায় বলে উঠল—
— “ভা...ই... ভাই...”
কিন্তু পরের দৃশ্যটা অভ্রকেও এক মুহূর্তের জন্য থমকে দিল।
জারিফের চোখের কোণে টলমল করছে জমে থাকা অশ্রু। চোয়াল শক্ত করে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করলেও বুকের ভেতর বছরের পর বছর জমে থাকা ক্ষোভ, যন্ত্রণা আর অপূর্ণতার দহন চোখের ভাষায় স্পষ্ট ফুটে উঠেছে।

যে ছেলেটা প্রতিটি পরিস্থিতিতে পাথরের মতো অবিচল থাকে, আজ তার চোখেই ক্ষতের গভীরতা স্পষ্ট। মনে হচ্ছিল বহুদিন ধরে চাপা পড়ে থাকা অতীত হঠাৎ করেই কবর ভেঙে বেরিয়ে এসেছে, আর সেই স্মৃতির ভারে তার সমগ্র অস্তিত্ব কেঁপে উঠেছে।

অভ্র কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই জারিফ এগিয়ে এসে গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল,
— এরাই তারা, বস। যাদের কথা আপনাকে বলেছিলাম।
কথাটা শোনামাত্রই অভ্রের সামনে যেন সমস্ত ধোঁয়াশা সরে গেল। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সব তথ্য এক সুতোয় গাঁথা হয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠল তার কাছে। ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ, অর্থবহ এক রেখা টেনে সে ধীরস্বরে বলল,

— "তাহলে শুরু করা যাক। আমি বসছি। খেলা শুরু কর। গুটিগুলো তো তোর সামনেই সাজানো আছে। যেভাবে ইচ্ছে চাল দিবি। আজকের পুরো বোর্ডটাই তোর হাতে। দেখি, কতটা নিখুঁতভাবে খেলতে পারিস।"

জারিফের বুকের ভেতর তখন বহু বছরের জমে থাকা ক্ষোভ, বেদনা আর অপূর্ণতার ঢেউ আছড়ে পড়ছে। এতদিন পর সে মুখোমুখি হয়েছে সেই মানুষগুলোর, যাদের কারণে তার জীবন থেকে হারিয়ে গেছে অসংখ্য রঙিন অধ্যায়।
তাদের জন্যই শৈশব কেটেছে তীব্র যন্ত্রণা আর শূন্যতার ছায়ায়; মা-বাবার স্নেহ, মমতা ও সুরক্ষার উষ্ণতা থেকে বঞ্চিত হয়েছে সে। হারিয়েছে তার বড় ভাইকে—যে ছিল তার আশ্রয়, সাহস আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসার আরেক নাম। চোখের সামনে ভেসে উঠল মায়ার মুখ, তার পরিবারের ভাঙাচোরা জীবনের করুণ স্মৃতি।
বিশেষ করে সেই দিনের দৃশ্য...
মায়ার মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ, অসহায় কান্না আর নিঃশেষ হয়ে যাওয়া এক মায়ের হাহাকার আজও জারিফের কানে প্রতিধ্বনিত হয়। সময় অনেক দূর গড়িয়ে গেছে, কিন্তু সেই কান্নার রেশ এখনো তার হৃদয়ের গভীরতম ক্ষতকে জাগিয়ে তোলে। মনে হয়, প্রতিটি শব্দ আজও বাতাস চিরে এসে তার আত্মাকে বিদীর্ণ করে দিয়ে 

বিদ্যুৎগতিতে ছুটে এসে সে মুরাদের চুলের মুঠি আঁকড়ে ধরল। এক ঝাঁকুনিতে মাথা উঁচু করে তুলতেই মুরাদের চোখে-মুখে ভয়ের ছাপ গাঢ় হয়ে উঠল। কিছু বলার জন্য ঠোঁট ফাঁক করে কিছু বলতে নিলেই। মরিচের গুঁড়ো ও কাঁচের গুঁড়ো একসঙ্গে মিশিয়ে মুখে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। আর পাশের দেয়ালের সাথে বারি ঠুকে দেয়া হয়।

মুরাদ চিৎকার করে উঠে….

সাথে সাথেই বাকিদের চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠল; আতঙ্কে যেন চোখের মণি কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। একে একে সবাইকে একই পরিণতির মুখোমুখি করা হলো। গলা বেয়ে নিচে নামতে থাকা সেই দহন তাদের ভেতরটাকে তছনছ করে দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছিল। পানির জন্য ছটফট করতে করতে তারা যেন সমস্ত শক্তি হারিয়ে ফেলেছে।

সেই দৃশ্য দেখে জারিফ ঠোঁট বাঁকিয়ে এক অট্টহাসি ছাড়ল। তারপর ধীর, শীতল কণ্ঠে বলল—

"খেলা শেষ ভাবছিস? ভুল করছিস। এটা ছিল শুধু একটা ঝলক... আসল দৃশ্য এখনো শুরুই হয়নি। তোরা যে ট্রেইলার দেখে কাঁপছিস, পুরো সিনেমা দেখার পর নিজের ছায়াকেও চিনতে পারবি না।"
"মনে আছে সেদিনের কথা? মনে আছে তোর করা প্রতিটা নোংরা কাজ?
মায়ার সঙ্গে কী করেছিলি, কীভাবে সব সত্য জানার পরও দুটো পরিবারকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিলি?
তখন তো ক্ষমতার দম্ভে মাটিতে পা পড়ত না তোর। রাজত্বের বড়াই করে বেড়াতি।
আজ কেন মুখে কথা নেই, জানোয়ার?
আজ তুই আমার হাতের মুঠোয় বন্দি।
তোর চিৎকার কেউ শুনবে না, তোর খোঁজ কেউ পাবে না। এতদিন যাদের জীবন ছারখার করে দিয়েছিস, তাদের প্রতিটি অশ্রুর জবাব তোকে দিতে হবে।"

“তোর কোনো বাপও টের পাবে না। তোদের লাশও কেউ খুঁজে পাবে না। অনেক হিসাব-নিকাশ এখনো বাকি আছে—একটারও নিষ্পত্তি হয়নি।”

সে একটি প্লাস এনে একে একে সবার হাতের আঙুলের নখ তুলে ফেলে।
একেক জনের বিকট চিৎকারের আওয়াজে ঘর ভারী হয়ে ওঠে। আকাশ-বাতাস যেন স্তব্ধ হয়ে যায়।
মুরাদসহ তার চেলাগুলো মাফ চাইতে থাকে। তারা ভুল করে ফেলেছে। আর করবে না। শেষ একটা সুযোগ দেওয়ার জন্য মিনতি করতে থাকে।

ভুল..!

“মেয়েগুলোকে দিনের পর দিন ভোগের সামগ্রী বানিয়েছিস, আর এখন বলছিস—ভুল?!”

কথাটা বলেই সে ঘর কাঁপিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। সেই হাসির প্রতিধ্বনি চারদিকে ছড়িয়ে পড়তেই উপস্থিত সবার শরীর শিউরে উঠল।

“ভুল একবার হয়। দ্বিতীয়বার হয় অভ্যাসে।
আর তোরা অন্যায়কে অভ্যাস বানিয়ে ফেলেছিলি।”

তখন আবার ও জারিফ বলে ওঠে—

"বারবার ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও ধান,
এইবার ঘুঘু তোমার যাবে যে পরান..

অনেক সুযোগ পেয়েছিস তোরা। বারবার আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পার পেয়ে গেছিস। কিন্তু আজ ভাগ্য তোদের পক্ষ নেয়নি। আজ তোরা এসে পড়েছিস সেই দরজায়, যেখানে পাপের খাতা বন্ধ হয় আর হিসাব শুরু হয়।
জানি না, কত মায়ের কোল খালি করেছিস। কত বোনের সম্মান ছিনিয়ে নিয়েছিস। কত পরিবারের স্বপ্ন ধুলিস্যাৎ করে দিয়েছিস। কিন্তু দুর্ভাগ্য তোদের—আজ তোদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই মানুষ, যে প্রতিটি আর্তনাদ, প্রতিটি কান্না আর প্রতিটি অভিশাপ নিজের বুকে আগুনের মতো বহন করে এসেছে।
আমি সেই ভাই, যার আপনজনকে তোরা নির্মমভাবে কেড়ে নিয়েছিলি। আমি সেই শোকাহত পরিবারের নীরব চিৎকারের সাক্ষী। আমি সেই অসহায় মায়ের অশ্রুর সাক্ষী, যে প্রতিদিন সন্তানের নাম ধরে কেঁদেছে।
আজ কোনো করুণা নেই। কোনো দয়া নেই। কোনো মুক্তির পথও নেই। আজ তোদের প্রতিটি অপরাধ, প্রতিটি পাপ, প্রতিটি অমানবিকতার মূল্য শোধ করতে হবে। করায়-গণ্ডায় নয়—শেষ বিন্দু পর্যন্ত।

কথাগুলো শেষ করতেই ঘরের বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। নীরবতার মধ্যেও আতঙ্কের গন্ধ স্পষ্ট। একেকটা মুখ থেকে রঙ উধাও হয়ে গেছে। চোখে-মুখে শুধু মৃত্যুভয়ের ছাপ।
জারিফ ধীর পায়ে সামনে এগিয়ে এলো। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক শীতল, হিংস্র হাসি। বহু বছরের জমাটবাঁধা ক্ষোভ, অপমান আর প্রতিশোধস্পৃহা তার দৃষ্টিতে দাউদাউ করে জ্বলছে।
চারপাশে তখন শুধু নিস্তব্ধতা। কিন্তু সেই নিস্তব্ধতার ভেতর লুকিয়ে ছিল এক অশুভ বার্তা—আজ আর কেউ রক্ষা পাবে না, আজ অতীতের প্রতিটি পাপের মুখোমুখি দাঁড়ানোর দিন।”

এবার অভ্র নিজে উঠে এসে একটি হকি স্টিক নিয়ে সবগুলোকে বেদম মারতে শুরু করল। শেষে একটি ব্লেড নিয়ে তাদের শরীরে পোচাতে লাগল। সাথে সবগুলো আরও যন্ত্রণায় নিজেদের মৃত্যু কামনা করতে থাকল।

সে এক মুহূর্ত থেমে আবার বলল—
— “এভাবেই থাক।, এদের মরতে দেওয়া যাবে না।”
কাল এদের ডাস্টবিন থেকে ময়লাযুক্ত খাবার এনে খেতে দিবি। পানি হিসেবে থাকবে নর্দমার কালো পানি। যতদিন না সেই মেয়েটা সুস্থ হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ায়, ততদিন এদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে। কারণ শেষ বিচার আমি করব না... বিচার করবে সে নিজে। যার জীবনটা এরা নরকে পরিণত করেছিল, তার হাতেই এদের পরিণতির সিদ্ধান্ত থাকবে।”

কথাগুলো বলে অভ্র ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখে তখন প্রতিশোধের আগুন নয়, ছিল এক অটল প্রতিজ্ঞা—অপরাধের হিসাব এবার অপরাধীদেরই দিতে হবে।

—————

…….বর্তমান…….

সকাল সাতটায়
সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে তারা তিনজন রওনা দিল কুমিল্লার উদ্দেশে। সকাল নয়টার মধ্যেই গন্তব্যে পৌঁছে যায় সবাই। হঠাৎ বাড়ির সামনে একটি অপরিচিত গাড়ির তীক্ষ্ণ হর্ন বেজে উঠতেই উপস্থিত সবার ভ্রু কুঁচকে গেল। বিস্ময় আর কৌতূহলে একে অপরের মুখের দিকে তাকাতে লাগল তারা। কিন্তু রাহার বুঝতে এক মুহূর্তও লাগল না।

তারা তখন মাত্রই সকালের নাস্তা খেতে বসেছিল।
ইভান, শিফা এবং পরিবারের অন্য সবাই বহুবার তাকে বুঝিয়েছিল—ওটা কেবলই একটি দুঃস্বপ্ন, বাস্তবতার সঙ্গে যার কোনো সম্পর্ক নেই। রাহাও নিজেকে অসংখ্যবার বোঝানোর চেষ্টা করেছে। এতটাই গভীরভাবে ঘটনাগুলো তাকে নাড়া দিয়েছিল যে, একসময় বাস্তব আর স্বপ্নের সীমারেখাই তার কাছে ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল।
তবু নিজের কষ্টকে বুকের গভীরে চাপা দিয়ে রেখেছে সে। তার কারণে প্রিয় মানুষগুলোর মুখে যেন আর বিষণ্নতার ছায়া না নামে, সেই চেষ্টাতেই বাকি দিনগুলো হাসিমুখে কাটিয়ে দিতে চেয়েছে রাহা।

কিন্তু সেই শব্দ...
সেই গাড়ির ইঞ্জিনের গর্জন, সেই পরিচিত হর্ন—রাহার কাছে যেন মুখস্থ এক সুর। অভ্রের কালো মার্সিডিজ। চিনতে একটুও ভুল হলো না তার।
মুহূর্তের মধ্যেই রাহার বুকের ভেতরটা হিংস্র ঢেউয়ের মতো কেঁপে উঠল। হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক গতিতে ছুটতে লাগল, যেন পাঁজর ভেঙে বাইরে বেরিয়ে আসবে। হাতে ধরা পরোটার টুকরো অসাবধানতায় ফসকে পড়ে গেল প্লেটের ওপর।

তার দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল দরজার দিকে।
কারণ সে জানে—
এই শব্দের মালিক মানুষটা তার জীবনে কখনো নিছক আগমন নিয়ে আসে না; সঙ্গে করে নিয়ে আসে ঝড়, আলোড়ন আর অগণিত অমীমাংসিত অনুভূতির ভার।

মুহূর্তেই রাহার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠে চারপাশে যেন এক নিমিষে নীরবতা নেমে আসে—সবার হাত থেমে যায়, খাওয়া বন্ধ হয়ে যায়।
অভ্র দৃঢ় পদক্ষেপে গেট পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই উপস্থিত সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে টেবিল ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। রাহার খালার মনেও ক্ষীণ অভিমান আর চাপা ক্ষোভের রেশ ছিল—সেদিন রাহার সঙ্গে করা আচরণের স্মৃতি এখনো পুরোপুরি মুছে যায়নি। তবু নিজের ছোট বোনের ভাসুরের ছেলে হিসেবে অভ্র এই প্রথম তাদের বাড়িতে এসেছে; তাই সমস্ত অস্বস্তি, অভিমান আর মনোকষ্ট একপাশে সরিয়ে রেখে তিনি তাকে সাদর অভ্যর্থনা জানানোর সিদ্ধান্ত নিলেন।

উঠেই উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠলেন,

— “আরে অভ্র বাবা! হঠাৎ কোনো খবর না দিয়েই এভাবে? কালকেই তো চলে আসতে পারতে!”

অভ্র ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের রেখা টেনে ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। তারপর গম্ভীর অথচ অর্থবহ স্বরে বলল,

— “আমার জিনিস যেখানে, সেখানে তো আমাকে আসতেই হতো... অ্যান্টি-ইন-ল।”

শেষের শব্দ দুটো ইচ্ছে করেই নিচু স্বরে উচ্চারণ করল সে।
অভ্রের এমন রহস্যময় ও ইঙ্গিতপূর্ণ কথায় মুহূর্তেই হতভম্ব হয়ে গেলেন আফরোজা বেগম। কপালে ভাঁজ পড়ল তাঁর। শেষের কথাটা অস্পষ্ট শোনায় পুরো অর্থটা ধরতেই পারলেন না।

অন্যদিকে আয়াত যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো অভ্রের দিকে তাকিয়ে রইল। বিস্ময়, মুগ্ধতা আর কৌতূহলের মিশেলে তার দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে অভ্রের ওপর। এই নিয়ে দ্বিতীয়বার তাকে সামনে থেকে দেখল সে। প্রথমবার দেখেছিল রাহার জন্মদিনের অনুষ্ঠানে, আর আজও সেই ব্যক্তিত্বময় উপস্থিতি তাকে সমানভাবে অভিভূত করে দিল।

শিফার মুখেও আনন্দের ঝলক ফুটে উঠল। চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠতেই সে আর নিজেকে সামলাতে না পেরে দ্রুত এগিয়ে এসে উচ্ছ্বাসভরা কণ্ঠে ডেকে উঠল,
— “ভাইয়া!”

অভ্র সবার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটিয়ে দিল। সেই একচিলতে হাসিই যেন পুরো পরিবেশের ভারী আবহটা কিছুটা নরম করে দিল। সবাই চেয়ার ছেড়ে এগিয়ে এলেও রাহা নিজের জায়গা থেকে নড়ল না। বাইরে থেকে তাকে স্বাভাবিক দেখালেও তার ভেতরে ঠিক কী ঝড় বয়ে যাচ্ছে, তা বোঝা দুষ্কর।

অভ্রের বাজপাখির মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি অবশ্য সেটা এড়াল না। সবকিছু বুঝে ফেলার ভঙ্গিতে ঠোঁট বাঁকিয়ে রহস্যময় হাসল সে। তারপর কোনো দ্বিধা না করে সরাসরি গিয়ে আয়াতের পাশের চেয়ারে বসল, ঠিক রাহার মুখোমুখি।

অভ্রের গা থেকে ভেসে আসা দামি পারফিউমের মাদকতাময় সুবাসে আয়াত যেন অদ্ভুত এক ঘোরের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছিল। বুকের ভেতর ধুকপুকানি ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এমন ব্যক্তিত্বময়, সুদর্শন একজন মানুষের এতটা কাছে বসে থাকা তার জন্য যেন অবিশ্বাস্য অনুভূতি। লাজুক দৃষ্টিতে বারবার অভ্রের দিকে তাকিয়ে আবার চোখ সরিয়ে নিচ্ছিল সে।

আর রাহা?

ভয়ে, অস্বস্তিতে আর অজানা আশঙ্কায় তার অবস্থা প্রায় শোচনীয়। মনে হচ্ছিল শরীরের প্রতিটি স্নায়ু টানটান হয়ে আছে। যে মানুষটার কাছ থেকে দূরে সরে আসার জন্য এত চেষ্টা করেছে, সেই মানুষটাই আজ আবার তার সামনে এসে বসেছে।
একসময় সাহস সঞ্চয় করে নিচু হয়ে থাকা দৃষ্টিটা উপরে তুলল রাহা। কিন্তু তাকাতেই বুকটা কেঁপে উঠল।

অভ্র যেন সেই মুহূর্তটারই অপেক্ষায় ছিল। ঠোঁটের কোণে চিকন, অর্থবহ হাসি ঝুলিয়ে সে আগেই তাকিয়ে ছিল রাহার দিকে। মুহূর্তের জন্য দুজনের চোখে চোখ পড়ে গেল।সময় যেন থমকে দাঁড়াল।

অভ্র ধীর ভঙ্গিতে চোখ ফিরিয়ে তাকাল আয়াতের দিকে। আয়াতও বিস্ময়ে চোখ দুটো আরও প্রসারিত করে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে তুলল। সেই হাসির প্রতিউত্তরে অভ্রের অধরেও ভেসে উঠল এক রহস্যময়, আত্মবিশ্বাসী হাসি।

তাদের এই নীরব বোঝাপড়ার দৃশ্যটা রাহার বুকে যেন অদৃশ্য কোনো শলাকার মতো বিঁধল। মুহূর্তেই তার অন্তর অকারণে হাহাকার করে উঠল। আঙুলগুলো অজান্তেই নিজের পোশাকের কাপড় মুঠো করে আঁকড়ে ধরল, আর দৃষ্টি নত হয়ে গেল মাটির দিকে।
আর এক সেকেন্ডও সেখানে টিকে থাকতে পারল না সে। সামনে রাখা খাবার ছুঁয়েও না দেখে চেয়ার ঠেলে উঠে দ্রুত পায়ে সেখান থেকে চলে গেল।

রাহার প্রস্থানরত অবয়বের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অভ্র। তার চোখের গভীরে তখন স্পষ্ট জ্বলজ্বল করছিল কোনো অজানা পরিকল্পনার অশুভ আভাস। তারপর ঠোঁটের কোণে শিকারির মতো তীক্ষ্ণ এক বাঁকা হাসি ফুটিয়ে অত্যন্ত ধীর, অথচ অর্থবহ কণ্ঠে উচ্চারণ করল—

"আব আয়েগা আসলি মাজা..."
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp