মৌমিতা খন্দকার কলেজে আসে না দুই দিন হলো। টিউশনেও যায় না। একেবারে কোথাও নেই সে। মেয়েটার বাড়ির ঠিকানা সংগ্রহ করে রাখা উচিত ছিলো। সেটা করাও সম্ভব হয়নি।
আজ তৃতীয় দিন। অথচ হন্যে হয়ে খুঁজেও কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না তাকে।
শেষ বেঞ্চের আগেরটাতে এক কোণে বসে বাদল অন্যমনস্ক হয়ে কলম কামড়াচ্ছে। তার এতোগুলো টাকা বোধহয় বৃথাই যায়! বইটা কি আসলেই দেয়া সম্ভব হবে না? এমন তো হওয়ার কথা ছিলো না। আর হতেও পারে না। বাদল এই প্রথমবার কারও পেছনে এতোটা শ্রম দিয়েছে। বলা বাহুল্য, অর্থও দিয়েছে! এর সবটুকু প্রয়াস তো ব্যর্থ হতে পারে না!
এবার অন্তত মৌমিতার উচিত বাদলকে একটু হলেও পাত্তা দেওয়া। কিন্তু পাত্তা তো দূরের কথা, মেয়েটা আর দেখাই দিচ্ছে না। ডায়েরির কথা শুনেও সে কোনো আগ্রহ দেখায়নি। সত্যিকারের মানুষটা ডায়েরির ভেতরের মৌমিতার চেয়েও বেশি জটিল। তার গতিবিধি বোঝা দায়।
বাদল স্থির হয়ে বসে থাকতে পারছে না, কেবলই ছটফট করে যাচ্ছে।
ইংরেজির ক্লাস চলছে। বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে শিক্ষক কী বলছেন, পেছন দিকের বেঞ্চ থেকে তার কিছুই শোনা যাচ্ছে না। তিনি সম্ভবত এ ব্যাপারে অবগত। তাই কিছুক্ষণ পরপর পেছনের সারিকে উদ্দেশ্য করে বলছেন, কথা শোনা যায় কিনা। ছাত্ররা উৎসাহের সঙ্গে ইতিবাচক জবাব দিয়েছে প্রতিবারই। স্যার আর সত্য-মিথ্যা যাচাই করতে গেলেন না, নিজের মতো বক্তৃতা দিয়ে গেলেন।
রাশেদ কনুই দিয়ে ঠেলে সরায় বাদলকে, বিরক্তিসূচক শব্দ করে বলে, “এতো ঝাঁপাঝাঁপি করছিস কেন? এক জায়গায় বসে থাকতে পারিস না?”
বাদল পেছনের ফাঁকা বেঞ্চটাতে হেলান দেয়, “ভালো লাগছে না।”
“হলে গিয়ে ঘুমাস। আর মাত্র একটা ক্লাস বাকি।”
“আমি কখন ঘুমাতে চাইলাম?”
“না চাইলেও ঘুমাস। আমিও ঘুমাবো।”
“বাল! তোর ঘুমের রুটিন জানতে চেয়েছি? কাজের কথা বলতে না পারলে চুপ করে থাক। তোর কথা শোনার জন্য লাফাচ্ছি না আমি।”
“তাহলে কেন লাফাচ্ছিস?”
বাদল একটু শান্ত হলো। কিছু বলা যাবে কি? রাশেদকে বলা ঠিক হবে কিনা—সে বুঝলো না। তবে বিষয়টা নিজের মাঝে আর চেপেও রাখতে পারলো না। অস্থিরতা ঢাকতে সে অহেতুক নখ খুঁটতে শুরু করলো, অস্ফুটে বললো, “ঐ... মেয়েটা আসে না তিনদিন হলো।”
তার বলার ধরনটা দেখে হাসি আটকাতে খুব কষ্ট হলো রাশেদের। সে মুখ চেপে ধরে অন্যদিকে তাকালো প্রথমে, তারপর তুলনামূলক গম্ভীর হয়ে বললো, “না-ই আসতে পারে। হয়তো অসুস্থ।”
বাদল মাথা নাড়লো, রাশেদ আড়চোখে তার গতিবিধি দেখে বলে, “ডায়েরিটা ফেরত দিতে না পেরে এতো কষ্টে ভুগছিস তুই, এটা আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।”
“তুই বিশ্বাস না করলে আমার কোনো ক্ষতি হবে না।”
“আচ্ছা, একটা কথা বল তো?”
“কী?”
“না, থাক।”
রাশেদ অপরজনের মুখ থেকে চোখ সরিয়ে বোর্ডের দিকে মনোযোগ দিলো। বাদল অল্প হলেও অনুমান করলো, সে কোন ব্যাপারে প্রশ্ন করতে চেয়েছিলো। রাশেদ প্রশ্ন করলো না ঠিকই। তবে নিজের সন্দেহটা আকারে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিলো। এবং বাদলের সমস্ত উত্তেজনায় জল ঢেলে দিলো।
দু'জনের মধ্যে কথোপকথন এ পর্যন্তই রয়ে যায়। ছুটির ঘণ্টা বাজার আগ পর্যন্ত কেউ কোনোকিছুই উচ্চারণ করলো না।
বাড়িতে পোলাও রান্না হয়েছে আজ। জহির মিঞা আর তার ছোট ছেলের দাওয়াত।
মার্জিয়া সকাল থেকে বেশ সাহায্য করেছে কাজে। কিন্তু এখন ঘরে ঢুকে চুপচাপ বসে আছে। মস্ত বড় একটা ভুল করে ফেলেছে সে। মাথায় তেল দিয়েছে। লোডশেডিংয়ের কারণে আজ পানি তোলা হয়নি সময়মতো। মোটর চালু করার পরেই একে একে সবাই গোসল সেরে নিয়েছে। রিপন আবার ইচ্ছে করেই দেরিতে গোসলে ঢুকেছে, মার্জিয়ার আগেই। জুনায়েদরা হয়তো এসে পড়বে কিছুক্ষণের মধ্যে। এই জবজবে চুল আর তৈলাক্ত মুখ নিয়ে তার সামনে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না!
রাবেয়া ডেকেছেন টেবিলে খাবার গুলো সাজিয়ে দেওয়ার জন্য। সেখানে না গিয়ে মার্জিয়া খুব দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে নখ কামড়াচ্ছে। সে ভালোভাবেই জানে, নির্দেশের হেরফের হলে আম্মা খুব বকবেন।
“আপা? প্লেটগুলো একটু সাজিয়ে দিয়ে আসো না।”
“তুই যা। আমার ভালো লাগছে না।” কথাটা বলেই মৌমিতা পড়ার টেবিলে আরেকটু ঝুঁকে বসলো। তার শরীরটা আসলেই একটু অস্বস্তির মাঝে রয়েছে। মার্জিয়া তা মানতে চাইলো না, প্রায় লাফিয়ে উঠে বললো, “গেলে কী সমস্যা তোমার? এতোটুকু কাজ করতে ভালো লাগা–না লাগার আবার কী আছে?”
“তাহলে তুই যা। তোর তো কোনো সমস্যা নেই।”
“আমি যেতে পারবো না।”
“তাহলে থাক।”
“কিন্তু আম্মা রাগ করবেন।” বোনকে নিরুত্তর দেখে মেয়েটা আরও মরিয়া হয়ে অনুরোধ করলো, “আপা যাও না—”
মৌমিতা কর্কশ স্বরে বলে ওঠে, “তুই আমাকে আদেশ করবি কেন? এতো দরকার হলে নিজে যা। আশ্চর্য!”
মার্জিয়া চুপসে গেলো, মিনমিনে স্বরে বললো, “যেতে পারলে তো যেতামই।”
“তাহলে যাচ্ছিস না কেন? মাথায় তেল দিয়েছিস, এজন্যে? শোন, জুনায়েদ ভাই তোকে দেখতে আসছে না এখানে। তুই ওনার পাত্রী না। ওসব আজাইরা জিনিস কল্পনা করা বাদ দিয়ে কাজে মন দে।”
আপার কড়া কথা শুনে মেয়েটার মুখ সহসা কালো হয়ে যায়। মাথা নিচু করে বসে থাকে সে। ঐ শব্দগুলো তাকে এতো গুরুতরভাবে আঘাত করলো যে সে নখ কামড়াতেও ভুলে গেলো। শেষ পর্যন্ত এই প্রসঙ্গ টেনে আপা তাকে এভাবে অপদস্থ করলো!
রাবেয়া এসে দাঁড়ালেন দোরগোড়ায়, অসহায় দৃষ্টিতে চেয়ে দেখলেন দুই মেয়েকে। তারপর নীরবতা ভেঙে বলে উঠলেন, “এতোক্ষণ ধরে ডাকছি, তোমাদের কানে যায় না? ওরা চলে এসেছে। এখন দয়া করে বের হও ঘর থেকে, একটু সাহায্য করে উদ্ধার করো আমাকে।”
তিনি বড় মেয়ের দিকেই অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। মৌমিতা আর ঝামেলায় জড়ানোর অবস্থায় নেই, সে মুখ শক্ত করে উঠে দাঁড়ালো। খুব রুক্ষভাবে চেয়ারটাকে ধাক্কা দিয়ে সরালো। ছোটখাটো একটা হুলুস্থুল কাণ্ড ঘটিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় সে।
মার্জিয়া বসে থাকে আগের মতোই। আপার কথাগুলো সে এখনও হজম করতে পারেনি। তবু বড়সড় একটা ঢোক গিলে সেগুলোকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করলো। আসলেই তো! জুনায়েদ ভাইকে নিয়ে সে একটু অতিরিক্তই ভাবছে। মার্জিয়া যদি সং সেজে তার সামনে যায়, তবুও ছেলেটা কোনো ভ্রুক্ষেপ করবে না। জুনায়েদ ভাই নিশ্চয়ই অতো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখবে না তাকে। আর দেখলেও বড় কোনো ক্ষতি হয়ে যাবে না। নিজের মনটাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে মেয়েটা উঠে দাঁড়ায়।
বিকেলের নাস্তার সময় পর্যন্ত থেকে গেলেন জহির মিঞা আর জুনায়েদ। ততোক্ষণে মার্জিয়া চুল ধুয়ে ফেলেছে। চা বানিয়ে মেহমানদের সামনে তা পরিবেশন করেছে। সে সাধারণত বড়দের কথার মাঝখানে থাকে না। আজ তাকে এখনও কেউ যেতে বলেনি। বললেই সে চলে যাবে। এই মুহূর্তে বড়রা গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করছেন।
জহির চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বিজ্ঞের মতো বললেন, “তোমাদের আসলেই একটা কাজের লোক রাখা লাগবে এখন। এতোগুলো কাজ রাবেয়া একাই করে।”
রাবেয়া মাথা নাড়লেন, “না, আমার অসুবিধা হয় না। মেয়েদুটো তো আছেই। মার্জু সব কাজে সাহায্য করে আমাকে। মৌ একটু... ব্যস্ত থাকে, পড়া নিয়ে।”
“ওদের পড়া দরকার তো। নিজের একটা ভবিষ্যৎ হবে। তারপর যেমন ছেলের সাথেই বিয়ে হোক, চিন্তা নাই।”
রিপন বলে ওঠে, “যেমন তেমন ছেলের সাথে বিয়ে হবে কেন?”
“কথার কথা বললাম। মেয়েদের পড়াশোনা আজকাল খুব দরকারি। সেজন্যই বললাম, বাড়ির কাজ পরে শিখুক। নিজের একটা পরিচয় তৈরি করুক আগে। আর একটা কাজের লোক রাখো, মারুফ। জোবেদাকে বলবো নাকি এখানে এসে কাজ করে দিয়ে যেতে?”
রাবেয়া অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে হাসলেন, “লাগবে না জহির ভাই। বাদ দেন। আমার অসুবিধা হয় না। ওসব বাড়তি খরচের দরকার নাই।”
“বাড়তি খরচ কী? ওকে কিছুই দেওয়া লাগবে না। আমাদের বাসায় রান্না করে দিয়ে যায় দুই বেলা। বাসন মাজে, ঘর মোছে। তবু খুবই অল্প বেতন নেয়। তোমাদের কাছ থেকে আরও কম নিবে। কী বলো মারুফ?”
মারুফ একটু ভেবে বললেন, “দেখি।”
“হ্যাঁ দেখো। রাজি থাকলে আমি কালকেই পাঠাই ওকে এখানে। যাই হোক, অনেক কথা হলো।” জহির ফাঁকা পেয়ালাটা টেবিলের উপর সাবধানে রাখলেন, “এখন আসি।”
অতিথিদের বিদায় দিয়ে মার্জিয়া ঘরে ঢুকলো। ভেজা চুলগুলো খুলে জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। মাগরিবের আজান দেবে এখন। এ সময়ে খুব মশা ঢোকে। দু'টি কপাট বন্ধ করে বিছানায় এসে বসলো মার্জিয়া। দুই বোন কেউ কারো দিকে তাকালো না। ভুল করেও কোনো দৃষ্টিবিনিময় হলো না তাদের।
মৌমিতা চেয়ারের উপর পা তুলে বসে রয়েছে। চোখজোড়া বইয়ের পাতায় নিবদ্ধ, মনটা যদিও বিক্ষিপ্ত।
পড়ায় নির্ঘাত অনেক পিছিয়ে পড়েছে সে। টানা তিনদিন কলেজে যায়নি, টিউশনও ফাঁকি দিয়েছে। সহপাঠীদের সাথে তাল মেলাতে পারবে কিনা সন্দেহ। এইচএসসির সিলেবাস বিশাল। সামনে পরীক্ষা, তবু অনেক পড়া এখনও বাকি। এসব ভাবতে তার ইচ্ছে করে না। ক্লান্তি কাজ করে। এদিকে তার জীবনেও আবার নানান বিপদ এসেছে দল বেঁধে। ক্লান্ত না হয়েও উপায় নেই।
—————
কলেজের প্রাতিষ্ঠানিক ভবনটার একপাশে আছে শিউলি ফুলের গাছ। শরৎকালে তা ফুলে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। নিচের সবুজ ঘাসে পড়ে থাকে সাদা-কমলা খুদে ফুলগুলো। অনেকেই তা কুড়িয়ে নিয়ে যায়। মৌমিতারও মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে গাছের তলায় গিয়ে ফুল কুড়ানোর। কিন্তু সে কিছুই করে না। সামান্য নড়াচড়া করতেও ভীষণ অনীহা তার। ছোটখাটো শখগুলোকে সে গলা টিপে মেরে ফেলে!
সর্বদা অদ্ভুত একটা ভয় হয় তার, কেউ দেখবে, বিচার করবে। তখন সে নিজেকেই প্রশ্ন করে, দুটো ফুল কুড়িয়ে কী হবে? মালা গাঁথা যাবে। সেই মালা দিয়েই বা কী লাভ? ফুল একসময় ঠিকই শুকিয়ে যাবে, নষ্ট হয়ে যাবে। মেয়েটার সমস্ত সাধ এই নিষ্ঠুর প্রশ্নগুলোর নিচে পিষ্ট হয়ে নিহত হয় প্রতিনিয়ত।
সে শুধু সবুজ ঘাসের উপরে পড়ে থাকা জ্বলজ্বলে ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলো অপলক। মাথার ভেতরে এখনও অজস্র পীড়াদায়ক ভাবনা ছোটাছুটি করছে।
“আপনার কি শিউলি ফুল পছন্দ?”
চেনা কণ্ঠটা শ্রবণেন্দ্রিয়ে পৌঁছাতেই মেয়েটা চমকে ওঠে। মাথা ঘুরিয়ে বাদলের দিকে তাকায়। একটু সচেতন হয়ে বিরক্তি দেখিয়ে বলে, “কী চাও তুমি?”
“উত্তর। যে প্রশ্নটা করলাম, সেটার উত্তর। 'হ্যাঁ', অথবা 'না'।”
মেয়েটা হঠাৎ বেশ শান্ত হয়ে গেলো। চোখ সরু করে বললো, “তুমি কি জানো, তুমি একটা বেয়াদব?”
ছেলেটা ভড়কে যায়। তারপর মুখ কালো করে সম্মতি জানায়, “জানি।”
“তুমি একটা চরম বেয়াদব ছেলে!”
“এই তথ্য কি আজকেই আবিষ্কার করলেন?”
মৌমিতা উত্তর দেয় না। তবে উপলব্ধি করে, মনের ভেতরের তিক্ত কথাগুলো সে এই তথাকথিত বেয়াদব ছেলেটার সামনে কতো অনায়াসে উগরে ফেলেছে!
“ম্যাডাম?”
“ম্যাডাম আবার কী? আপু বলে ডাকবা আমাকে।”
“আচ্ছা, আপু।” বাদল একটু এগিয়ে আসে, নিচুস্বরে বলে, “আপনি কি প্রেম করেন? জানি, করেন না, তবু জিজ্ঞেস করলাম। ফরমালিটি।”
“এক থাপ্পড়ে তোমার সব ফরমালিটি বের করে দেবো। বেয়াদব কোথাকার। দাঁত বের করবা না খবরদার! আমাকে আমার ডায়েরি ফেরত দাও। এখনই।”
“ডায়েরি তো আনা হয়নি। তবে আপনি চাইলে বইটা দিতে পারি।”
“ডায়েরিটা হোস্টেলে রেখে এসেছো, তাই না? হোস্টেল তো এখানেই। যাও, দৌড় দিয়ে নিয়ে আসো।”
বাদল হতাশ হয়ে তাকিয়ে থাকে। মৌমিতার এমন অপমানজনক আদেশে দ্বিগুণ হতাশ ভঙ্গিতে বলে, “আমার সাথে এভাবে কথা বলবেন না।”
“কীভাবে বলবো?”
“একটু ভালোভাবে বলবেন। আমি অতোও ছোট না।”
“আচ্ছা?” মৌমিতা বিস্ময় প্রকাশ করে, “কেউ তোমাকে 'আপনি' ডাকলেও সমস্যা, আবার ছোট ভাবলেও সমস্যা। কতো সালে জন্ম নিয়েছো তুমি?”
বাদল মাথা নাড়ে, “বলবো না।”
মেয়েটা এবার একটু অস্থিরতা দেখায়, “ডায়েরিটা ফেরত দাও।”
“দেবো না।”
ইচ্ছাকৃতভাবে হাল ছেড়ে দিলো মৌমিতা। আর কিছুই বললো না। তার গচ্ছিত জ্বালানি শেষ। আর সামাজিকতা দেখাতে পারবে না সে। কথা চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব। এখন সে শুধু কোনো ফাঁকা, নির্জন জায়গায় ছুটে যেতে চায়, ক্লান্তিটা সারিয়ে নিতে, একটু শক্তি সঞ্চয় করতে। কিন্তু কোথাও গেলো না। কেননা, বাদল পিছু নিতে পারে।
“ম্যাডাম... দুঃখিত, আপু! আপনি কিন্তু আমার দুইটা প্রশ্নের উত্তর দেননি।”
মৌমিতা কথা বলে না। মুখ ফিরিয়ে মাঠের দিকে তাকিয়ে থাকে। বাদল হড়বড় করে বলতে শুরু করে, “আচ্ছা, দুটো প্রশ্নই বাদ। একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা জিজ্ঞেস করি। আপনি ডায়েরিটা ডাস্টবিনে ফেললেন কেন? ভুল করে ফেলেছিলেন? নাকি কিছু হয়েছিলো?”
উত্তরের জন্য একটু অপেক্ষা করে সে। তারপর আরও এগিয়ে আসে, অল্প হেসে বলে, “আর কোনো কথা বলছেন না যে? ব্যাটারি শেষ?”
ত্যক্ত মুখে সরে দাঁড়ায় মৌমিতা। সে পণ নিয়েছে, আর কোনো প্রশ্নের উত্তরই দেবে না। যথেষ্ট কথা বলেছে। আর কিছু বলা সম্ভব না, উচিতও না।
“চুপ করে থাকবেন না তো! এটা আমার একদমই পছন্দ নয়।”
মৌমিতা মনে মনে তার কথাটা আওড়ালো বিকৃত করে, “একদমই পছন্দ নয়! তোমার পছন্দ দিয়ে আমি কী করবো? লাত্থি মেরে সব নাটক বের করে দেবো তোমার। খালি ডায়েরিটা ফেরত দাও একবার। তারপর দেখো, আমি কী করি।”
আর এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে থাকলো না সে, ক্লাসের দিকে পা বাড়ালো। পেছন থেকে বাদল বললো, “প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাসের পর একটু এদিকে আসবেন? আমি অপেক্ষা করবো।”
মেয়েটা ঘুরে তাকায় না একবারও, দাঁতে দাঁত চেপে আপনমনে বিড়বিড় করে, “অপেক্ষা করতে করতে মরো তুমি, মরে ভূত হয়ে যাও!”
—————
মার্জিয়া ঘরে ঢোকার আগে ফুলের টবের দিকে এগিয়ে যায়। পানি দেওয়া হচ্ছে না কিছুদিন হলো। বৃষ্টিও হচ্ছে না। গাছ সব শুকিয়ে গেছে। মলিন পাতাগুলোর দিকে তাকিয়ে তার মনটাও খারাপ হয়ে গেলো। ব্যাগ থেকে পানির বোতলটা বের করলো সে।
স্কুলে গেলে পানি খাওয়ার কথা তার মনেই থাকে না। আম্মা বারবার বলেছেন, এই মৌসুমে খুব পানিশূন্যতা হয় শরীরে। তিনি প্রতিদিনই পর্যবেক্ষণ করেন, মেয়েরা পানি খাচ্ছে কিনা। বোতল খালি হয়েছে কিনা।
মার্জিয়া খুশিমনে গাছের গোড়ায় পানি ঢালতে লাগলো।
“ছোট মা?”
সে হন্তদন্ত করে ঘুরে দাঁড়ায়। তার কুকর্ম লুকানোর প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। বোতল থেকে পানি ছিটকে গিয়ে পড়ে দেয়ালে। মারুফ এই দৃশ্য দেখে ভ্রু কুঁচকালেন। মেয়েটা নিজে থেকেই কৈফিয়ত দেওয়ার চেষ্টা করে, “আব্বা, আমি... আমাদের স্কুলে একটা টিউবওয়েল আছে তো। আমি পানি শেষ করার পর আবার ওখান থেকেই বোতলে পানি ভরাই। ওখানকার পানি নাকি অনেক... পুষ্টিকর! অনেক মিনারেল আছে। তাই ভাবলাম, গাছে দেই পানি। বেচারা কেমন আধমরা হয়ে আছে। দেখেন।”
মারুফ খুব শীতল স্বরে বললেন, “গাছের অতো পুষ্টি লাগবে না। পানি তুমিই খাও।”
“আচ্ছা আব্বা।”
“শোনো, মা। তোমার কোন কোন স্যারের বেতন বকেয়া আছে? স্কুলের ফি তো দেওয়া হয়েছে গত মাসে। তাই না?”
“না। গত মাসেও দেওয়া হয়নি। এই মাসেরটাও বাকি আছে।”
“ওহ।” মারুফ একটু সময় নিয়ে ভাবলেন, “আচ্ছা, দেওয়া যাবে, সমস্যা নেই। কয়েকদিন ধরে ভালোই বেচাকেনা হচ্ছে দোকানে।”
“যাক, আলহামদুলিল্লাহ। আপনি একটা নতুন ঘড়ি কিনবেন আব্বা?”
তিনি হেসে ফেললেন, “ঘড়ি আর কিনবো না মা। তোমার মামার দেওয়া ঘড়িটা তো আছেই। নতুন লাগবে না।”
“ওটা তো আপনার পছন্দ না। পছন্দমতো নতুন একটা কিনবেন—”
“ঘড়ি থাক, অন্যকিছু নেবো। আর কয়েকটা টাকা হাতে পেলে ভালো হয়। দেয়ালের সিমেন্ট খসে গেছে। আর রান্নাঘরের এদিকে যতোটুকু জায়গা আছে, সেখানে ঘর তোলার কাজ শুরু করবো। তোমাদের ঐ জানালায় তো শিক লাগানো হয়নি এখনও। ওটার কাজও বাকি আছে।”
জানালায় শিক লাগানোর প্রসঙ্গ আসতেই মার্জিয়ার মুখখানি শুকিয়ে এতোটুকু হয়ে গেলো। সে ঠোঁট উল্টে বললো, “আবার ভাঙচুর! আব্বা বাদ দেন তো। আমরা বড় হয়ে গেলে দোতলা বাড়ি করবো এখানে। তখন সবাই দোতলায় থাকবো।”
“সেটার তো অনেক দেরি।”
কথাটা মারুফ বললেন ঠিকই। তবে অবচেতনে মনে হলো, সত্যিই যদি মেয়েদুটো রাতারাতি বড় হয়ে যেতো! এরপর একটু স্বস্তির শ্বাস ফেলতে পারতেন। আর কোনো চিন্তা থাকতো না। সত্যিই যদি এই পুরোনো কুটিরের স্থলে বড় একটা অট্টালিকা থাকতো, মেয়েদুটো রাজকন্যার মতোই জীবনযাপন করতো।
মারুফ বারান্দার দিকে পা বাড়ালেন। এইসব আকাশ কুসুম কল্পনাগুলো বাস্তবে রূপ দেয়া মোটেও সহজ হবে না। কিন্তু চেষ্টা করতেও অসুবিধা তো নেই।
ল্যাব থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। বেশ বেলা হয়ে গেছে। সূর্যের তেজ কমলেও গরমটা কমেনি। মাঠে নরম একটা রোদ, তবে সেটাও খুব চোখে লাগছে।
কপাল কুঁচকে মাঠ থেকে দৃষ্টি ফেরায় মেয়েটা। শিউলি গাছটার নিচে চোখ পড়তেই মৌমিতা অভিভূত হয়ে পড়ে। বিস্ময় নিয়ে এগিয়ে আসে সেখানে। বাদলের সামনে গিয়ে বলে, “তুমি এতোক্ষণ ধরে এখানেই দাঁড়িয়ে ছিলে?”
“হ্যাঁ। আজকে আমাদের প্র্যাক্টিক্যাল ছিলো না। আর...” ছেলেটা ব্যাগ থেকে বই বের করে, “এটা আপনি নিয়ে যান, প্লিজ।”
মৌমিতাকে খুব অবসন্ন দেখায়। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, ব্যথিত কণ্ঠে বলে, “আমাকে ডায়েরিটা ফিরিয়ে দাও। আর কিচ্ছু করতে হবে না।”
“আপাতত এটা নিয়ে যান। নাহলে আমি মন খারাপ করবো।”
“করো!”
ভাবলেশহীন স্বরে কথাটি বলেই মৌমিতা হাঁটতে শুরু করে। তার চলনে-বলনে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। শুরুর দিকে জড়তা ছিলো। এখন সেটাও নেই।
বাদল মন খারাপ করলো না। সে যতোটুকু জানে, অমন অন্তর্মুখী আর অসামাজিক হওয়া সত্ত্বেও এই মানুষটা আজ তাকে এতোটা সময় দিয়েছে। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থেকেছে এতোক্ষণ ধরে। এরপরেও কি আর মন খারাপ করার উপায় থাকে?
·
·
·
চলবে……………………………………………………