আড়ালে আবডালে শুধুই তুই - পর্ব ১৬ - রাহা ইসলাম - ধারাবাহিক গল্প

আড়ালে আবডালে শুধুই তুই
আসবো স্যার?
 
নো…

সরি স্যার—

“ইউ আর টেন মিনিটস লেট।”

রাহা জানত যে আজকে তাদের ক্লাসে নতুন আইসিটি স্যার আসবে। তাড়াতাড়ি ক্লাসে উপস্থিত থাকবে ভেবেছিল। কিন্তু সেই খাটাস বেডার জন্য লেট হয়ে গেলো। তাই ভয়ে আর চোখ তুলে তাকিয়েও দেখেনি।
আর আজকে কলেজে আসতে দেরি হয়েছে বলে
মাথা নিচু করেই,

“আর হবে না স্যার, প্লিজ!”

বলেই একটু সাহস করে চোখ তুলে তাকাতেই—ধপাস!

মাথার ভেতর যেন বাজ পড়ল—মাহাদী!

চমকে উঠে প্রায় লাফিয়ে বলে উঠল,
“আরে এটা তো মেহেদী পা—”
কথা মাঝপথে গিলে ফেলেই চারপাশে দ্রুত গতিতে তাকিয়ে দেখে, একটুর জন্য সে জায়গা ভুলেই বসেছিল কোথায় আছে। সবাই এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন কোনো নাটক দেখছে।  

ধ্যান আসতেই সাথে সাথে “তওবা তওবা” বলে মুখে তালা মেরে দিল।
মনে মনে— উনি এখানে কেন!

হঠাৎ—ঠাস!
বেঞ্চে লাঠির শব্দে রাহা এমনভাবে লাফিয়ে উঠল, যেন বৈদ্যুতিক শক খেয়েছে। মুহূর্তেই ধড়ফড় করে উঠে সবাই।

স্যার চোখ রাঙিয়ে বললেন, দশ বার বলবে—
“কাল থেকে আমি যদি হই লেট ,
আমার অবস্থা হবে আউট অফ গেট!”

সে মুখ কুঁচকে বলল,
“অ্যা… স্যার, এটা আবার কী ডায়লগ!”

স্যার ঠান্ডা গলায়,
“ডায়লগ না, শাস্তি। শুরু করো, কুইক”

সে কাঁদো কাঁদো গলায় বলতে শুরু করল—
“কাল থেকে আমি যদি হই লেট, 
 আমার অবস্থা হবে আউট অফ গেট।”

পাশ থেকে কেউ ফিসফিস করে বলল,
“আরেকটু জোরে বল, পিছনের বেঞ্চে শোনা যাচ্ছে না!”

সে এবার চোখ পাকিয়ে বলল,
বলছি তো ।
সবাই হাসাহাসি শুরু করে দিল—কেউ মুখ চেপে, কেউ আবার খোলাখুলি হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে। পুরো ক্লাস যেন সার্কাস হয়ে গেছে!
কিন্তু এই হাসির ভিড়ের মাঝেও দুইটা মুখ একদম আলাদা—সাফা আর অবন্তিকা।

তারা দু’জন চুপচাপ বসে আছে, চোখে অদ্ভুত এক অসহায়তা। না হাসতে পারছে, না কিছু বলতে পারছে। শুধু তাকিয়ে আছে তার দিকে।

“এই, সবাই চুপ!”

এক ধমকেই পুরো ক্লাস নিস্তব্ধ। একটু আগের হাসির শব্দ যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। ক্লাসে যখন মাহাদী পা রাখে, প্রায় অধিকাংশ মেয়েরাই ক্রাশ খায়। এত হ্যান্ডসাম একটা ছেলে—তাদের স্যার।
অনেকে তো জল্পনা-কল্পনাও শুরু করে দিয়েছিল।
কিন্তু এই রাগ দেখে অনেকের আকাঙ্ক্ষা ফুস করে উড়ে গেল। তাও কিছু কিছু বেহায়া মেয়ে এখনো আশা নিয়ে আছে—এই স্যারকে পটাবেই।

অথচ তারা কি জানে..!যে মাহাদীর এখানে আসার কারণ!
মাহাদী একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। সে ইতালিতে উচ্চশিক্ষা শেষ করে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি অর্জন করেছে। দীর্ঘদিন বিদেশে থেকে কঠোর পরিশ্রম ও বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে নিজেকে গড়ে তুলে সে দেশে ফিরে আসে।
বর্তমানে সে শুধু একজন ইঞ্জিনিয়ারই নয়, বরং নিজের প্রতিষ্ঠিত একটি আইটি কোম্পানির সফল সিইও। আইটি, বিজনেস এবং স্টার্টআপ ম্যানেজমেন্ট—এই তিনটি ক্ষেত্রেই সে অত্যন্ত পারদর্শী। শূন্য থেকে শুরু করে নিজের দূরদর্শিতা, নেতৃত্ব ও কৌশলের মাধ্যমে সে তার কোম্পানিকে একটি শক্ত অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
কোডিং থেকে শুরু করে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত—সবকিছুতেই তার দক্ষতা স্পষ্ট। কঠিন প্রতিযোগিতার মাঝেও সে আত্মবিশ্বাসের সাথে এগিয়ে যাচ্ছে, আর প্রতিনিয়ত নিজের অবস্থানকে আরও শক্ত করছে। 

কলেজে আসার একমাত্র কারণ রাহা। তার জন্যই সে এই কাজটা বেছে নিয়েছে। রাহার সাথে দেখা করা, কথা বলা এবং সময় কাটানোর সুযোগ পাওয়াই তার লক্ষ্য।

রাহা কষ্ট করে দশ বার বলা শেষ করল। হাঁফ ছেড়ে বাঁচার মতো করে বেঞ্চের দিকে এগোতেই—
পিছন থেকে কড়া গলা,
“আমি যেতে বলেছি?”

সে থেমে গেল। মাথা নিচু, ফর্সা গাল দুটো রাগে আর লজ্জায় টকটকে লাল।

মাহাদী সবটাই অনুধাবন করছিল। ঠোঁটের কোণে হালকা এক ঝলক হাসি ফুটলেও, মুহূর্তেই নিজেকে আবার গম্ভীর করে নিল।

“ভালো শিক্ষার্থী হয়েও সময়ের গুরুত্ব বোঝোনি,” । তোমার পরীক্ষা আর তুমি লেট ।আগামীকাল থেকে, বিশেষ করে আমার ক্লাসে, সময়মতো না এলে পুরো কলেজে কান ধরে ঘুরতে হবে—এটা মনে রেখো।”
“যাও, নিজের জায়গায় বসো।”

রাহার চোখ ভিজে উঠল। ধীরে ধীরে গিয়ে বেঞ্চে বসতেই সাফা আর অবন্তিকা দু’দিক থেকে কাঁধে হাত রাখল।
সাফা ফিসফিস করে,
“এত লেট হলো কেন? আমি তোকে কতবার ফোন দিয়েছি!”

অবন্তিকা যোগ করল,
“তুই তো বললি আমারা যেনো কলেজে চলে আসি তোর একটু দেরি হবে কিন্তু এত?”

রাহা চুপ। ঠোঁট কাঁপছে, কথা বের হচ্ছে না।

 মাত্রই বসেছে—চুপচাপ, মাথা নিচু করে। ঠিক তখনই সামনে থেকে কড়া গলায় ভেসে এলো—
“Attention, everyone!”“Focus on the exam.”

এক মুহূর্তে পুরো ক্লাস থমকে গেল। যে যার মতো কথা বলছিল, সবাই একসাথে চুপ হয়ে তাকাল মাহাদীর দিকে।
মাহাদী ধীরে ধীরে ক্লাসরুমে চোখ বুলিয়ে থামল রাহার দিকেই। চোখে হালকা কড়াকড়ি, কিন্তু ভেতরে যেন অন্য কিছু লুকানো।
“ক্লাসে ঢোকার একটা নিয়ম আছে। সেটা সবাই ফলো করবে—কেউ ব্যতিক্রম না।”
কথাটা বললেও ইঙ্গিতটা কার দিকে, সেটা বুঝতে কারো বাকি রইল না।

রাহা মাথা নিচু করেই বসে রইল।
আঙুলগুলো শক্ত করে চেপে ধরেছে—লজ্জা, রাগ, অপমান সব একসাথে গুলিয়ে গেছে।

মাহাদী আবার বলল,
“টাইম ম্যানেজমেন্ট শিখতে হবে। আজকের মতো আর যেন না হয়। কথা শেষ করে বোর্ডের দিকে ঘুরে গেল সে, যেন কিছুই হয়নি।

কিন্তু রাহার কাছে মুহূর্তটা থেমে রইল—
তার কাছে এটা শুধু একটা কথা না,
পুরো ক্লাসের সামনে নিজের সম্মান হারানোর মতো লাগছে।

এদিকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মাহাদী বাইরের মতো শক্ত থাকলেও ভেতরে ভেতরে অন্য কিছু ভাবছে।
আজই সে নতুন জয়েন করেছে। মনে একটা অদ্ভুত আশা ছিল—ক্লাসে ঢুকেই হয়তো শুভ্রপরিকে দেখবে।
কিন্তু তাকে না পেয়ে মাথাটা গরম হয়ে যায়। আর সেই রাগ গিয়েই পড়ে রাহার ওপর।
নিজেও বুঝতে পারছে—কিছুটা বেশি হয়ে গেছে।
তবুও শিক্ষক সুলভ গাম্ভীর্যের আড়ালে সেটাকে লুকিয়ে রাখল।

টানা দুইঘন্টা পরীক্ষা চলে। অবশেষে পরীক্ষা শেষ হলো। পুরো সময়জুড়েই মাহাদী কয়েকবার চোখ তুলে তাকিয়েছিল রাহার দিকে—কখনো কৌতূহল, কখনো অদ্ভুত এক টান নিয়ে। কিন্তু রাহা একবারও তাকায়নি। মাথা নিচু করে বসে ছিল, চুপচাপ, মনমরা।

সে কি ইচ্ছে করে দেরি করেছে নাকি!
মনে মনে তখন আগুন জ্বলছে তার—
“শিক্ষক হয়েছে তো কী হয়েছে! মাত্র দশ মিনিট দেরি করেছি। এর জন্য এত অপমান? সবার সামনে মাথা নিচু করে দিল!”

রাগে তার ভেতরটা ফুটছে। ইতিমধ্যেই প্ল্যান বানাতে শুরু করেছে—
কিভাবে এই মেহেদী পাতাকে একটু শায়েস্তা করা যায়!

মাহাদী একবার শেষবারের মতো তাকাল তার দিকে।
চোখে অদ্ভুত এক দৃষ্টি—কঠিন, কিন্তু ভেতরে অন্য কিছু লুকানো।
মনে মনে বলল,
“আজ থেকে শুরু হলো তোমার জীবনের নতুন অধ্যায় শুভ্রপরি। তোমার প্রতিটা দিন শুরু হবে আমার সাথে।” 

মাহাদী চলে যাওয়ার সময় শুধু বলে গেল, “মিস রাহা, কলেজ থেকে বের হবার আগে অফিস রুমে দেখা করবেন আমার সাথে।”
রাহা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। উনি আবার কী বলবেন…?

স্যার বের হতেই ক্লাসে আবার গুঞ্জন শুরু।
অবন্তিকা আর সাফা তাড়াতাড়ি এসে রাহার পাশে ঘেঁষে বসল।
সাফা নরম গলায়,
“কিরে, কী হয়েছে? এত দেরি করলি কেন? এখন বল।

অবন্তিকা একটু চিন্তিত,
“আমরা তো চিন্তায় পড়ে গেছিলাম!”

রাহা একটা ছোট নিঃশ্বাস ছাড়ল।
“হয়ে গেল আজকে একটু দেরি। পরে বলব।

তার চোখে তখনও ভেজা ছাপ।
কিন্তু কথার ভেতরে লুকিয়ে আছে অন্য গল্প।

রাহা কিছুক্ষণ থমকে রইল। তার মাথায় ঘুরতে লাগল—এই মেহেদী পাতা তাকে কেন ডাকলেন? কোনো সমস্যা হয়েছে নাকি ক্লাস নিয়ে কিছু কথা বলবেন? ভেতরে ভেতরে এক ধরনের ক্ষোভও কাজ করছিল। এতক্ষণ বলেও কি উনার খায়েশ মিটেনি নাকি..! যে অফিসেও ডাকছেন।

সাফা আর অবন্তিকা বলল, “ভয় পাস না।একসাথে যাবো।”
রাহা মাথা নাড়ল, “না, আমি একাই যাব।”

ক্লাস শেষ হতেই সে ধীরে ধীরে অফিস রুমের দিকে এগোল। দরজার সামনে এসে এক মুহূর্ত থেমে শ্বাস নিয়ে নক করল। ভেতর থেকে শান্ত গলায় আওয়াজ এল—“কাম ইন।”

—————

ফ্ল্যাশব্যাক…

সকালে রাহা রেডি হয়ে নাস্তার টেবিলে বসতেই দেখল—টেবিলে শুধু তার জন্য নাস্তা ঢেকে রাখা।
চারপাশে অদ্ভুত নীরবতা। বাড়ির কোথাও কারো উপস্থিতি নেই।
ভ্রু কুঁচকে চারদিকে তাকিয়ে বলল,
“আরে… সবাই কোথায় গেল?”

চোখ ঘুরাতে ঘুরাতে হঠাৎই থমকে গেল সে।
ডিভানের উপর বসে আছে অভ্র—দুই পা ফাঁক করে, শরীরটা একটু সামনে ঝুঁকানো, চোখদুটো সরাসরি তার উপর স্থির। মনেহলো এতক্ষণ ধরে রাহার উপস্থিতি দেখছিল।
সেই দৃষ্টি এত তীক্ষ্ণ, এত গভীর—রাহা বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারল না। শুকনো একটা ঢোক গিলে দ্রুত চোখ নামিয়ে নিল।

আবার সাহস করে তাকাতেই দেখল—অভ্র দুই আঙুল তুলে ইশারা করছে, কাছে যেতে বলছে।
রাহার বুকের ভেতর ধুকপুক শুরু হলো। যাবে, নাকি যাবে না…?

বাড়ি একেবারে খালি—এই চিন্তাটাই তাকে আরও অস্বস্তিতে ফেলল।
সে এগোলো না। বরং দ্রুত ফোন বের করে আম্মুকে কল দিতে যাবে—
ঠিক তখনই রুক্ষ কণ্ঠে ভেসে এলো—
“তোর সাহস কত বড়? আমি ডাকছি, আর তুই দেখছিস না?”

রাহা থমকে গেল।

“বান্দি, কলেজে গিয়ে অনেক বড় হয়ে গেছিস নাকি? আমার ডাক অমান্য করিস?”

ভয়ে হাত কেঁপে উঠল তার। তবুও সে ফোনে কল দিতে যাবে—
হঠাৎই অভ্র উঠে এসে ফোনটা ছিনিয়ে নিল।

ধপ্!

মেঝেতে ছুঁড়ে মারতেই ফোনটা ভেঙে চুরমার। টাইলসের উপর ছড়িয়ে পড়ল টুকরোগুলো।
রাহার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। ওই ফোনটা তার কত প্রিয় ছিল। চোখে সাথে সাথে পানি চলে এলো।
কিন্তু কাঁদার মাঝেও সে অভ্রকে দেখে ভয় পাচ্ছে।

অভ্র কয়েক পা এগিয়ে এসে তার বাহু শক্ত করে চেপে ধরল।
চাপটা এতটাই জোরে যে রাহার মুখ দিয়ে চাপা কষ্টের শব্দ বেরিয়ে এলো।

“চুপ কর! তখন ডেকেছিলাম, দেখিসনি ?”

রাহা কথা বলতে পারল না। শুধু কাঁদছে।
অভ্র ঠান্ডা গলায় বলল,
“ফোন করে কাউকে ডাকার দরকার নেই। বাসায় কেউ নেই। সবাই এতিমখানায় গেছে।”

একটু ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে,
“এখন শুধু তুই আর আমি।”

কথাটা শুনেই রাহার চোখ বড় হয়ে গেল।
এতিমখানায় গেছে—মানে সবাই একসাথে… অথচ কেউ তাকে জানায়নি?

আজকের এই দিনে খান বাড়ির বড় কর্তা আমান খান সকল মৃত ব্যক্তিদের জন্য দোয়া রাখেন। পরিবারের সবাই উপস্থিত হন। সেই সুবাদে তারা এতিমখানায় এতিমদের জন্য খাবারের আয়োজন করেন এবং বাচ্চাদের জন্য পোশাকের ব্যবস্থাও করেন। এরপর তারা নিজেরাই সেখানে গিয়ে সবকিছু তদারকি করেন—বাচ্চাদের হাতে খাবার তুলে দেন, নতুন কাপড় পরিয়ে দেন। ছোট ছোট মুখে হাসি ফুটে উঠতেই পুরো পরিবেশটা এক অদ্ভুত শান্তিতে ভরে যায়, আর আমান খান কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখেন তৃপ্ত চোখে।

রাহার পরীক্ষা এজন্য তারা সাথে নেয়নি।
অভ্রকে বাসায় রেখে গেছে যেনো রাহা পরীক্ষা দিয়ে আসলে সাথে নিয়ে যায় ।

রাহার মনে হালকা কষ্ট আর রাগ একসাথে জমে উঠল।
একবার বললেই কি হতো না?

রাহার এই নির্লিপ্ত ভঙ্গি অভ্রকে আরও রাগিয়ে তুলল। তার ভেতরের মেজাজ একদম বিগড়ে গেল।
“এই… তুই কাঁদছিস কেন? তোকে আমি মেরেছি…?”

রাহার বুকটা কেঁপে উঠল। মাথা নাড়িয়ে সে “না” বোঝাতে চেষ্টা করল।

অভ্র চোখ সরু করে কড়া গলায় বলল,
“কথা বল! না হলে একদম চিরজীবনের মতো বোবা বানিয়ে দিব।”

কোনোমতে কষ্ট করে রাহা ফিসফিস করে বলল,
“না… না…”

অভ্র এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে স্বাভাবিক গলায় বলল,
“আমি ডিভানে বসছি। আমাকে খাইয়ে দিবি, যা খাবার নিয়ে আয়।”
বলেই সে তার বাহু ছেড়ে দিল।

রাহা যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। কাঁপা হাতে টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল।
খাবারের প্লেট তুলে ধীরে ধীরে আবার অভ্রর দিকে ফিরল।

অভ্র ডিভানে হেলান দিয়ে বসে ইশারা করল,
“বস।”

রাহা ঠিক পাশে বসতে যাবে, তখনই আবার থামিয়ে দিল।
“এই… দাঁড়া।”

রাহা ভ্রু কুঁচকে তাকাল—আবার কী হলো? কোথাও ভুল হলো নাকি!

অভ্র এবার ঠান্ডা গলায় বলল,
“ওখানে না।”

তারপর পায়ের দিকে ইশারা করে বলল,
“এখানে বস।”

রাহার চোখ বড় বড় হয়ে গেল—মানে কোলে বসবে?
সে দ্বিধায় দাঁড়িয়ে রইল, না বসে একটু পিছিয়ে গেল।

একদম চুপচাপ। কোনো কথা না বলে অভ্র হঠাৎ এক টানে তাকে নিজের কোলে বসিয়ে দিল।
রাহা পুরোটা সময় জমে গেল। হাতের প্লেট শক্ত করে ধরে আছে, চোখ বড় বড়।
কি করবে, কোথায় তাকাবে—সবকিছুই গুলিয়ে গেছে। এতটা কাছাকাছি তারা। রাহার হৃদস্পন্দন এতো জোরে বিট করছিল যে অভ্র হয়তো সেটা টের পাচ্ছে।

অভ্র স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হেলান দিয়ে বলল,
“এখন তো বসে আছিস। এবার খাওয়ানো শুরু কর।”

 রাহার পুরো শরীর তখন থরথর করে কাঁপছে।
মনে হচ্ছে এখনই কেউ দরজা খুলে দেখে ফেলবে।
তারা দু’জন এত কাছাকাছি যে একে অপরের উপস্থিতি একদম স্পষ্টভাবে টের পাচ্ছিল—শ্বাসের উষ্ণতা, আর অজান্তে ভেসে আসা পরিচিত ঘ্রাণ। রাহার অস্বস্তি আরও বেড়ে গেল।

সে কাঁপা গলায় বলল,
“অভ্র ভাই… করছেন কী? ছাড়ুন, কেউ দেখে ফেলবে।”

অভ্র একদম স্বাভাবিক গলায় বলল,
“তো কি হবে দেখলে?”

রাহা হতভম্ব হয়ে গেল।
“মানে কী বলছেন! আপনি বুঝতে পারছেন না কী হতে পারে? বাড়ির মানুষ দেখলে… খারাপ ভাববে!”

অভ্র কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
“তো ভাবুক। আই ডোন্ট ফাকিং কেয়ার”।

রাহা সঙ্গে সঙ্গে মুখ হাঁ হয়ে এক হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলল।
এই লোকটা এসব কী বলছে!

অভ্র শান্ত গলায় বলল,
“তোকে কি আমি কোলে বসিয়ে রাখার জন্য এনেছি?
শুরুতেই তো বসতে চাসনি,
এখন বেশ আরাম পাচ্ছিস, বুঝি?”

রাহা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলো

 “এই সুন্দরভাবে খাইয়ে দে এখন।”

রাহা তাড়াহুড়ো করে ভয়ে ভয়ে খাওয়াতে শুরু করল—যেন যত তাড়াতাড়ি শেষ করতে পারবে, ততই বাঁচে।

কিন্তু হঠাৎ অভ্র ধমকে উঠল,
“কি করছিস? এভাবে কেউ খাইয়ে দেয়?”

রাহা ঘাবড়ে গিয়ে বলল,
“তাহলে কীভাবে খাইয়ে দেয়? কালকে তো আপনি যেভাবে খেয়েছিলেন।”

অভ্র রাগী চোখে তাকাল,
“কি? আমার মুখের ওপর তর্ক?”

রাহা তাড়াতাড়ি মাথা নাড়ল,
“আচ্ছা , আস্তে আস্তে দিচ্ছি… একটু তাড়াতাড়ি খান।”

অভ্র বাইরে শান্ত থাকলেও ভেতরে ভেতরে অদ্ভুত এক প্রশান্তি কাজ করছিল।
রাহা তার এত কাছাকাছি বসে আছে—এই মুহূর্তটা সে অজান্তেই ধরে রাখতে চাইছিল। এক হাত রাহার কোমরে বাঁধা। এতটা কাছে আসতে তার শিরায় শিরায় নিষিদ্ধ বাহানা গুলো জাগ্রত হচ্ছিলো।
নিজেকে কন্ট্রোল করা দুর্বিষহ হয়ে উঠছিল।

রাহার অস্বস্তি আরও বাড়ছিল, কিন্তু সে কিছুই বলতে পারছিল না।

অভ্র তার এক হাত মুষ্টিবদ্ধ করে চোখ বন্ধ করল, তারপর আবার খুলল—মনে হচ্ছিল নিজেকে অনেক কষ্টে সংযত রাখছে। হঠাৎ তার মনে পড়ল, রাহা তো এখনো খায়নি।
সে খাবার তুলে নিয়ে ধীরে ধীরে রাহার দিকে এগিয়ে দিল।
রাহা আলতো করে চোখ তুলে তার দিকে তাকাল।
অভ্র শান্ত গলায় বলল,
“তাকিয়ে আছিস কেন? হা কর।”

রাহা মুখে খাবার দিতেই অভ্র ধীরে ধীরে খেতে শুরু করল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে হালকা বিরক্ত গলায় বলল—
“সবটা শেষ করে উঠবি। ওজন তো ৩০ কেজিও হবে না। এভাবে না খেয়ে থাকলে পুষ্টিহীনতায় ভুগবি… সাথে আমাদের বাচ্চাকাচ্চাদেরও নিয়ে নিবি।”

রাহা একদম চমকে উঠে বলল,
“কি বললেন?”
চোখ বড় হয়ে গেল, ভ্রু কুঁচকে ধীরে ধীরে পেছন ফিরে তাকাল।
“বাচ্চা?”—

অভ্র সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক হয়ে গেল,
“কিছু না। উঠ, কলেজে যা।”তোর তো পরীক্ষা দেরি হয়ে যাবে। শেষ হলে আমাকে কল দিবি ।আমারও একটা মিটিং আছে। তোকে নামিয়ে দিয়ে সেটা শেষ হলে, আসার সময় নিয়ে আসব। আমি না আসা পর্যন্ত বের হবিনা বলে দিলাম।
 আবার এতিমখানায়ও যেতে হবে ।

রাহাও বেশি মাথায় ঘামায়নি। তার দেরি হয়ে যাচ্ছে।
 দ্রুত বেরিয়ে গেল, আর নিজের অজান্তেই মনটা আরও এলোমেলো হয়ে রইল।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সে দেখল—দশ মিনিট লেট।
তাড়াহুড়ো করে অভ্র কয়েকমিনিটের মধ্যে কলেজে পৌঁছে দিলো।

 রাহা কলেজের ভিতরে হওয়ার আগ পর্যন্ত গাড়ি থেকে তাকিয়েই ছিল। তারপর ধীরে ধীরে তার মুখে একরাশ শান্ত হাসি ফুটে উঠল।
নয় বছর পর আবার তার খুব কাছের একজনকে এভাবে সামনে পাওয়া—অল্প সময়ের জন্য হলেও, সেটাই তার কাছে অনেক।
চুপচাপ নিজে নিজে বলল,
“অল্প হলেও… শুরুটা তো হলো।”

আবারও চুলে ব্যাক ব্রাশ করতে করতে বলল,

“কথা ছিল হৃদয়ের একপাশে থাকার অথচ পুরো মস্তিষ্ক দখল করে আছো মেয়ে”।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp