–আমি তোর ছায়া হবো –
–কিছু টা বেহায়া হব –
–কেড়ে নেবো চেনা আবদার–….
–ঘুমের ভিতরে তোকে–
–ঘোরাবো নয়ন নদী–
–ঢেকে দেব মেঘেতে আবার–
-হুম কতো হাসি কতো কথা–
–বারে মনে মনে–
–তোর নাম তোর ছবি এঁকেছি গোপনে–
গুনগুন সুরে গান গাইতে গাইতে দেয়ালে টাঙানো বিশাল ফ্রেমবন্দী প্রতিকৃতির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বসে আছে অভ্র। সামনে রাখা রাজকীয় চেয়ারে হেলান দিয়ে বসা তার ভঙ্গিমায় যেন অদ্ভুত এক প্রশান্ত উন্মাদনা। এক হাতে স্ফটিকের ওয়াইনের গ্লাস, অন্য হাতটি নিস্তেজভাবে ঝুলে আছে চেয়ারের হাতল বেয়ে।
কবজি চিরে অবিরাম রক্তধারা ঝরে পড়ছে মেঝেতে, অথচ সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই তার। সমস্ত মনোযোগ আটকে আছে নিজের হৃদয়হরণকারী রমণীর প্রতিকৃতিতে। যেন সেই ছবির মাঝেই বন্দী হয়ে আছে তার সমগ্র অস্তিত্ব।
রক্তে স্নাত শরীরটাকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে এক ভয়াল আবহ। লালচে তরল ছোপে মাখামাখি চারপাশ।
আর তার কয়েক কদম দূরে, নিখুঁত সোজা ভঙ্গিতে, পাথরের মূর্তির ন্যায় নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জারিফ ও জায়ান। দু'জনের মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই।
প্রায় ভোরের আবছা আলো ফুটতে চলেছে। গত এক ঘণ্টা ধরে স্থির দৃষ্টিতে একটানা তাকিয়ে আছে সে। চোখদুটো রক্তিম আভায় জ্বলছে, যেন সামান্য পলক ফেললেই রক্তক্ষরণ শুরু হবে। সেই দৃষ্টিতে আছে দহন, উন্মত্ততা আর অদম্য প্রতীক্ষা।
এই নীরব, নিশ্চুপ মানুষটাকে দেখে কে বলবে, কিছুক্ষণ আগেই সে প্রলয়ঙ্কর তাণ্ডব চালিয়ে এসেছে? ক্ষুধার্ত হিংস্র বাঘও বোধহয় তার সেই রুদ্ররূপের কাছে ম্লান হয়ে যাবে।
বসের এই অস্বাভাবিক নীরবতা দেখে তার দুই বিশ্বস্ত সঙ্গীও তাকে একা ফেলে যাওয়ার সাহস করেনি। তাদের কাজ অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে, তবুও তারা সেখানেই অপেক্ষা করছে। কারণ এই মুহূর্তে অভ্রকে এই অবস্থায় রেখে যাওয়া মানেই ঝড়ের মুখে কাউকে ফেলে আসা।
হঠাৎ করেই অভ্রের গম্ভীর, কর্কশ কণ্ঠে তাদের ধ্যান ভাঙল।
— এই, তোরা রেডি হ। জাস্ট থার্টি মিনিটস। মাইন্ড ইট।
একটু থেমে ঠোঁটের কোণে রহস্যময়, বক্র হাসি টেনে বলল,
— খালা-শাশুড়ির বাড়ি যাব। আমার বউ ছাড়া ঘুম আসে না।
কথাটা বলেই মাথা কাত করে দেয়ালে টাঙানো রাহার ফ্রেমবন্দী ছবিটার দিকে তাকাল। চোখেমুখে তখন এক অদ্ভুত উন্মাদনা আর অধিকারবোধের ছাপ।
ধীরস্বরে, অথচ শীতল হুমকির মতো উচ্চারণ করল—
— মাই ফাকিং সুইটহার্ট, আই'ম কামিং।
বি রেডি।
তার ঠোঁটের হাসিটা আরও গাঢ় হলো।
বাক্যশেষে চেয়ারটা ধীরে সরিয়ে দাঁড়াল সে। তারপর দীর্ঘ পদক্ষেপে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। তার পেছনে যেন অদৃশ্য কোনো ঝড়ও সঙ্গী হয়ে এগিয়ে চলল।
জায়ান আর জারিফও আদেশ পেয়ে আর এক মুহূর্ত দেরি করেনি। নিঃশব্দে সরে গিয়ে নিজেদের প্রস্তুত করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
—– রাতের সেই ঘটনা —–
রাহারা গভীর নিদ্রায় তলিয়ে যাওয়ার পর অন্ধকারকে সঙ্গী করে বারান্দা বেয়ে উপরে উঠে আসে সে। চাইলে অনায়াসেই প্রধান ফটক ব্যবহার করতে পারত, কিন্তু অযথা কোলাহল কিংবা সন্দেহের অবকাশ সৃষ্টি করার ইচ্ছে তার ছিল না।
আজকের এভাবে আসার একমাত্র লক্ষ্য ছিল রাহাকে কঠিন শিক্ষা দেওয়া, নিজের দুঃসাহসের মূল্য বুঝিয়ে দেওয়া। তার অবাধ্যতার জবাব এমনভাবে দেওয়া হবে, যেন ভবিষ্যতে সেই স্মৃতি তাকে বারবার সতর্ক করে দেয়।
যদি সেই অসহায় মেয়েটির জায়গায় রাহা থাকত, তাহলে হয়তো আজই অভ্রর জীবনের শেষ দিন হয়ে যেত। কারণ নয়টি দীর্ঘ বছর ধরে দূরে থেকেও যে মানুষটি রাহাকে নিজের অস্তিত্বের অংশ করে বাঁচিয়েছে, প্রতিটি নিঃশ্বাসে যার নাম নিঃশব্দে জপেছে, তাকে এমন অসহায়, ভাঙাচোরা অবস্থায় দেখার শক্তি তার নেই।
হয়তো পৃথিবীর সবকিছুর ক্ষতি সহ্য করতে পারবে অভ্র, নিজের রক্ত ঝরতে দেখেও নির্বিকার থাকতে পারবে, কিন্তু রাহার চোখের একফোঁটা অশ্রু কিংবা তার শরীরে সামান্য আঁচড়ও তাকে ভেতর থেকে তছনছ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তার হৃদয়হরণীর চোখে জল আনার স্পর্ধা অভ্র কাউকে দেয়নি। সেই চোখে অশ্রু দেখার অধিকার যদি কারও থেকেও থাকে, তবে সে একমাত্র অভ্র; অন্য কারও ছোঁয়ায় ঝরে পড়া প্রতিটি অশ্রুবিন্দু তার কাছে যুদ্ধের ঘোষণা। কারণ ভালোবাসাটা তার কাছে কোনো ক্ষণিকের অনুভূতি নয়; এটা তার নয় বছরের জমে থাকা অপেক্ষা, অগণিত নির্ঘুম রাতের আর্তনাদ, বুকের গভীরে লুকিয়ে রাখা এক অবিনাশী অনুভব।
তাই রাহার সঙ্গে এমন কিছু ঘটলে, নিজের জীবন-মৃত্যুর হিসাবও হয়তো ভুলে যেত অভ্র। তখন তার ভেতরে থাকা শান্ত মানুষটার মৃত্যু ঘটত, জন্ম নিত শুধু এক উন্মত্ত, বিধ্বংসী ঝড়ের— যে ঝড়ের সামনে দাঁড়ানোর সাহস খুব কম মানুষেরই আছে।
—————
ঘরে পা রাখতেই অভ্রর চোখে পড়ল—তিন চুন্নি এমন নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে যেন পৃথিবীর কোনো চিন্তাই তাদের ছুঁতে পারেনি। একজনের গায়ে আরেকজনের পা তুলে, আরামের চরম সীমায় পৌঁছে আছে।
অভ্রর ঠোঁট বাঁকা হয়ে উঠল।
— তোদের এই স্বর্গীয় আরাম আজই জাহান্নামে পাঠাবো।
পকেট থেকে রুমাল বের করে তাতে তীব্র অচেতনকারী রাসায়নিক স্প্রে ছিটিয়ে একে একে তিনজনের মুখের সামনে ধরতেই মুহূর্তের মধ্যে তারা গভীর অচেতনতার অতলে তলিয়ে গেল।
এরপর রাহাকে কাঁধে ফেলে নিঃশব্দে বেলকনি বেয়ে নিচে নেমে গেল সে। কিন্তু কয়েক কদম এগিয়েই থামল। যেন কিছু মনে পড়েছে।
ঠান্ডা হাসি হেসে আবার ফিরে এল।
সে ভালো করেই জানে, সকাল হতেই রাহা কোনো না কোনো তুমুল কাণ্ড বাধাবেই। তাই ইচ্ছে করেই করিডোরের সিসিটিভি ক্যামেরার সামনে এক ঝলক নিজের উপস্থিতির আভাস দিয়ে চলে গেল।
অভ্র জানে, ইভান যথেষ্ট ধূর্ত আর বিচক্ষণ। একটুখানি ইঙ্গিতই তার জন্য যথেষ্ট। পুরো পরিস্থিতি সে সামলে নিতে পারবে।
আর যদি না-ও পারে—
তাতে অভ্রর বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই।
কারণ ঝড় তুলে চলে যাওয়াই তার স্বভাব; সেই ঝড়ের ধ্বংসস্তূপ সামলানোর দায় সে কখনো নিজের কাঁধে নেয়না।
রাহাকে গাড়িতে তুলে যখন নিজের নিখুঁতভাবে প্রস্তুত করা নির্জন গুদামঘরে আনা হলো, তখন তার সঙ্গে ছিল শুধু জারিফ। আর জায়ান সেই নরপিশাচ ধর্ষকদের নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেছে। রাহার অধ্যায় শেষ করেই তাদের হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে দেওয়া হবে।
অভ্রের নির্দেশ অনুযায়ী জারিফ আগেভাগেই সবকিছু সুনিপুণভাবে গুছিয়ে রেখেছিল। গুদামে পা রেখেই অভ্র এক মুহূর্ত দেরি না করে রাহাকে বরফের চাঁইয়ের ওপর শুইয়ে দিল।
কিছুক্ষণ পর হাড়কাঁপানো শীতলতার দংশনে রাহার জ্ঞান ফিরতে শুরু করল। চোখ খুলতেই চারপাশের অচেনা পরিবেশ দেখে তার বুকের ভেতর আতঙ্কের ঝড় বয়ে গেল।
তাকে বিশ্বাস করানো হলো যে অভ্র তার গলায় ছুরি চালিয়েছে। প্রমাণ হিসেবে সামনে ধরা হলো রক্তমাখা একটি ধারালো ছুরি। কিন্তু সত্যিটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেই রক্ত রাহার নয়, অভ্রের নিজের। কিছুক্ষণ আগেই নিজের আঙুল চিরে রক্ত ঝরিয়েছিল সে, শুধু এই অভিনয়টাকে বাস্তবের মতো করে তুলতে।
কারণ একটি সত্য সে যতই অস্বীকার করুক, পাল্টাতে পারবে না—
এই মেয়েটিকে সে হত্যা করবে কীভাবে?
যার নাম উচ্চারণে তার হৃদস্পন্দন বদলে যায়, যার অস্তিত্ব নয়টি বছর ধরে তার প্রতিটি নিঃশ্বাসে মিশে আছে, যার জন্য বুকের ভেতর আগলে রেখেছে এক অদৃশ্য রাজ্য— তাকে কি আদৌ মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া যায়?
রাহা শুধু একটি মেয়ে মানুষ নয়। সে অভ্রের হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা প্রাণভোমরা, তার বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ, তার সমস্ত উন্মত্ততা আর সমস্ত দুর্বলতার কেন্দ্রবিন্দু। তাই হাতে অস্ত্র থাকলেও, ক্রোধে চোখ রক্তবর্ণ হলেও, সেই হাত কখনোই রাহার জীবন কেড়ে নেওয়ার জন্য উঠবে না।
কেননা অভ্রের আড়ালে আবডালে শুধু রাহার বসবাস।
রাহা অচেতন হয়ে পড়তেই অভ্র তাকে নিজের বলিষ্ঠ বাহুবন্ধনে আগলে নিল। বরফশীতল মেঝে থেকে সাবধানে তুলে এনে আবার গাড়ির আসনে বসিয়ে দিল, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান কোনো সম্পদকে স্পর্শ করছে।
দুই হাতের অঞ্জলিতে রাহার মুখখানি তুলে নিয়ে সে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। তারপর কাঁপা কাঁপা নিঃশ্বাসে কপাল, চোখের পাতা, গাল—সমস্ত মুখজুড়ে অসংখ্য স্নিগ্ধ চুম্বনের ছোঁয়া এঁকে দিল। প্রতিটি স্পর্শে মিশে ছিল বছরের পর বছর জমে থাকা আকুলতা, অভিমান আর অদম্য ভালোবাসা।
কিন্তু ঠোঁটের কাছে পৌঁছাতেই থেমে গেল সে।
মুহূর্তেই যেন সমস্ত উদ্ধততা, সমস্ত দাপট গলে নিঃশেষ হয়ে গেল। ভয়ংকর রুদ্ররূপী মানুষটা হঠাৎ করেই হয়ে উঠল এক অসহায় প্রেমিক।
মৃদু হেসে, অথচ কণ্ঠে গভীর আর্তি মিশিয়ে ফিসফিস করে বলল—
— "একটা আবদার রাখবি, বউ? রাগ করিস না... একটা চুমু খাই, প্লিজ?"
কিন্তু তার সেই মিনতি কি শুনতে পাচ্ছিল রাহা?
না।
সে তো সমস্ত জাগতিক হুঁশ হারিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে অভ্রের বুকে মাথা রেখে, তার শক্ত বাহুর নিরাপদ আশ্রয়ে। আর অভ্র—নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে নিজের হৃদয়হরণীর মুখপানে, যেন এই একটি মুহূর্তেই আটকে আছে তার সমগ্র পৃথিবী।
অনুমতির তোয়াক্কা না করেই নিজের প্রাপ্য নিজেই আদায় করে নিল সে।
অচেতনতার সুযোগ নিল অভ্র? না, বিষয়টা সে দৃষ্টিতে দেখার অবকাশ নেই। কারণ তার বিশ্বাসে, এই মেয়েটি তারই—সম্পূর্ণ বৈধ অধিকারে বাঁধা, তার জীবনপত্রে দলিলবদ্ধ একমাত্র অধিকারিণী। তাহলে এত দ্বিধা, এত আত্মসংযম কিসের?
রাহার ধনুকের মতো বাঁকানো শরীরের সরু কোমর জড়িয়ে তাকে আরও কাছে টেনে নিল অভ্র। এক হাত আলতোভাবে গিয়ে ঠেকল ঘাড়ের নিচে, অন্য হাত শক্ত করে আগলে রাখল তাকে। তারপর গভীর মমতা আর দহনমিশ্রিত আকাঙ্ক্ষা নিয়ে নিজের অধিকার ভেবে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল রাহার শীতল, নীলাভ হয়ে আসা অধরে। ওষ্ঠযুগলেরও তো উষ্ণতা দরকার, প্রাণের স্পর্শ দরকার।
দীর্ঘ কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল সে। তারপর নিবিড় এক চুম্বনে তাকে আচ্ছন্ন করে ধীরে ধীরে সরে এলো। সেই স্পর্শে জমে থাকা শীত যেন একটু একটু করে গলতে শুরু করল। বুকের সঙ্গে মিশে থাকতে থাকতে রাহার শরীরের অবশ ঠান্ডা ভাব ক্রমশ উধাও হয়ে উষ্ণতার আভাস ফিরে পেল।
কতক্ষণ এভাবে কেটে গেল, তার হিসাব রাখেনি অভ্র। শুধু মনে হচ্ছিল, এই দলিলকৃত হৃদয়হরণীকে আর কখনও দূরে সরিয়ে না রাখে। বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখুক চিরদিনের জন্য।
কিন্তু বাস্তবতারও দাবি আছে।তাকে ঢাকায় ফিরতেই হবে। যারা মানুষের মুখোশে ঘুরে বেড়ানো নরপিশাচ, তাদের বিচার এখনো বাকি।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাহাকে নিরাপদে ফিরিয়ে দিয়ে গাড়ির স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরল অভ্র। চোখে তখন আর কোমলতার ছাপ নেই, জেগে উঠেছে প্রতিশোধের শীতল অগ্নিশিখা। পাশে বসা জারিফও নীরব।
পরমুহূর্তেই ইঞ্জিনের গর্জনে রাতের নিস্তব্ধতা বিদীর্ণ করে তারা ছুটে চলল ঢাকার উদ্দেশে—এক অনিবার্য হিসাব চুকিয়ে দিতে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………