অন্তর্নিহিত কালকূট - পর্ব ১১৬ - অনিমা কোতয়াল - ধারাবাহিক গল্প

অন্তর্নিহিত কালকূট

          সালটা তখন ১৯৮৮। দেশের রাজনৈতিক অবস্থা ভীষণ অস্থিতিশীল। তখনকার স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিরোধী দলের ঘনঘন আন্দোলনে উত্তাল চারপাশ। সেই অরাজক পরিস্থিতিতে পুলিশের দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় শক্তিশালী হয়ে উঠছিল কিছু অবৈধ চক্র। সবমিলিয়ে দেশ ভীষণ উত্তপ্ত।
শওকত মীর্জা তখন পঁচিশ বছরের তাগড়া যুবক। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ম্যানেজমেন্ট বিষয়ের ছাত্র। ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে ভীষণ সরবভাবে যুক্ত ছিল সে। নামকরা ছাত্রনেতা। চারপাশে ঘনঘন আন্দোলন। বিশেষ করে তিন-চারটা রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন মিলে প্রায়ই আন্দোলন করছিল স্বৈরাচার সরকারের বিরুদ্ধে। ঠিক অনেকটা, বাঘে মোষে একঘাটে জল খাওয়ার মতো। এসবের মধ্যেই দেশের নামকরা কিছু দলের অধিপতিদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে তার। তারমধ্যে অন্যতম ছিল কাদের হক। স্থানীয় অঞ্চলে বেশ জনপ্রিয়তা ছিল তার সেসময়। সকলের ধারণা ছিল সরকার পতন হওয়ার পরে নির্বাচন হলে এমপি হবে কাদের-ই। মন্ত্রী হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও কম নয়। এবং তার ডানহাত হিসেবে কাজ করতো শওকত মীর্জা। তারওপর চলমান আন্দোলনগুলোয় প্রথমদিকে নেতৃত্ব দিতো সে। কাজেই সেখানে বেশ দাপট ছিল তরুণ শওকতের।

তাই গ্রাজুয়েশন শেষ হওয়ার পরেও ক্যাম্পাস ছাড়া হলোনা শওকতের। দলকে নেতৃত্ব দেওয়া, আন্দোলনের পরিকল্পনা ইত্যাদিতে খুব সক্রিয়ভাবে কাজ করতো। যদিও শওকতের রাজনীতিতে প্রবেশটা ক্ষমতার লোভে নয়, অনেকটা আবেগ থেকেই ছিল। দেশজুড়ে অনাচার আর স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল তার তরুণ মন। সেখান থেকেই এই পথ অবলম্বন। নয়তো বিত্তশালী পিতার বড় সন্তান হওয়ায় অর্থ আর প্রতিপত্তির কোন অভাবে ছিলোনা তার। তবুও সব ছেড়ে বেছে নিয়েছিল এই সংঘর্ষের জীবন। অনেকটা দেশপ্রেম থেকেই।
তবে ধীরে ধীরে ছাত্ররাজনীতি তখন অস্ত্রবাজ, দখলদার এবং আধিপত্য বিস্তারে বিশ্বাসী হয়ে উঠল। এছাড়া  টিকে থাকার উপায় নেই। সরকারি সংগঠনটি চড়াও হচ্ছিলো দিনে দিনে। বিশেষ করে দেশের নামকরা তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায়ই সংঘর্ষ হতো তখন। তার মধ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ও অন্যতম। সমান টক্কর আর আত্মরক্ষার খাতিরে দরকার ছিল সমান পাওয়ার, অস্ত্র আর পরিকল্পনা।
ঠিক তখনই মাফিয়া গোষ্ঠীর সঙ্গে জোট বাঁধতে শুরু করল ছাত্র সংগঠনগুলো। গড়ে ওঠে গ্যাং কালচার। তারমধ্যেই বড় একটা গ্যাং এর নেতৃত্ব দিতে শুরু করে শওকত। তাদের অস্ত্র সরবরাহ করতো বিভিন্ন মাফিয়া গোষ্ঠী। তার মধ্যে অন্যতম ছিল রফিক আমের। সোলার সিস্টেমের তৎকালীন লীডার। ঐসময়েও কালোবাজার আর আন্ডারওয়ার্ল্ডের কারবারে অন্যতম ভূমিকায় সোলার সিস্টেম । সুতরাং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কাদের হকের ঐ ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে একটা দৃঢ় লেনদেনের সম্পর্ক গড়ে ওঠে সোলার সিস্টেমের। ঐ রাজনৈতিক সংগঠনের যুক্ত থাকা ছাত্ররা কাজ করতো সোলার সিস্টেমের হয়ে। যেমন বন্দর সামলানো, ঠিকাদারি এবং অস্ত্র পাচারে সাহায্য ইত্যাদি। বিনিময়ে তাদের অস্ত্র সরবরাহ থেকে শুরু করে বিভিন্ন শেল্টার দিতো সোলার সিস্টেমসহ আরও কিছু দল।

কিন্তু ঐবছরই ২৪ জানুয়ারি ঘটে যায় এক ভয়ংকর কাহিনী।  কাদের হক যে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিল সেই দল একটি শান্তিপূর্ণ, সরকারবিরোধী মিছিল এবং জনসভা আয়োজন করে চট্টগ্রামে। স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন দলের সভাপতি। সেই মিছিলে একটি বিভাগকে নেতৃত্ব দিচ্ছিল শওকত মীর্জাও। সকাল থেকে কিছুসময় সবকিছু স্বাভাবিকই ছিল। মিছিলটি শুরু হওয়ার কথা ছিল লালদীঘি ময়দান থেকে। কিন্তু আন্দরকিল্লা মোড় অতিক্রম করার পরপরই কোন উস্কানি ছাড়াই পুলিশ গু*লি চালায়। সেই গো**লাগু*লিতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন দশজন। পরে যদিও বেড়েছিল নিহতের সংখ্যা। আর আহতের সংখ্যা ছিল অনেক। তারমধ্যে শওকত মীর্জাও ছিল। হাতের বাহুর মাংস ছিড়ে একটা বু*লেট বেরিয়ে যায় তার। ঘটনাটা এতোই আকস্মিক ছিলোযে হতভম্ব হয়ে যায় সকলে। যে যাত্রায় একটুর জন্যে বেঁচে যায় সভাপতি।

আহত এবং নিহতদের নিয়ে যাওয়া হয় স্থানীয় হাসপাতালে। শওকত মীর্জার ড্রেসিং শেষ হতেই নিজ গ্যাংয়ের কিছু লোক নিয়ে সবাইকে দেখতে শুরু করে শওকত। যেহেতু সে লীডারদের একজন। সবার খোঁজ নেওয়া, আহতদের ট্রিটমেন্ট, মৃতদের শনাক্ত করা, পরিবারে খবর দেওয়া, লাশ পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব তার ওপরই। সেসব করতে করতে সন্ধ্যা পেরিয়ে গেল। হঠাৎই একজন এসে খবর দিল, জমশেদ মারা গেছে। বুকে গু*লি লেগেছিল। এতক্ষণ জরুরি বিভাগে বাঁচার তীব্র লড়াই করে অবশেষে মৃত্যু হয়। শওকতের দলেরই একজন বিশ্বস্ত লোক ছিল জমশেদ। শওকতকে ভীষণ মেনে চলতো। সে আর দেরী না করে নিজের লোকসহ পৌঁছলো জমশেদের লাশের কাছে। গিয়ে দেখল, জমশেদের স্ত্রী আর দুই বোন এসেছে। ফ্লোরে ম্যাট পেতে শুইয়ে রাখা হয়েছে জমশেদকে। ডানপাশে বসে অঝোরে কাঁদছে স্ত্রী আর বোনেরা। বাবা-মা বেঁচে নেই। বাবা দশ বছর আগেই মারা গেছে। মা মরল গতবছর। কিশোর বয়স থেকেই পরিবারের দায়িত্ব নিজের ঘাড়ে নিয়েছিল ও। জমশেদের এক বোন জড়িয়ে ধরে আছে ওর স্ত্রীকে। স্ত্রী বিলাপ করে চলেছে, 'ইয়া আল্লাহ্! আমার কী হবে এখন? আমি কই যাব? এতো বলছি এইসব মিছিল-টিছিলে যাইও না। শোনে নাই! আমার কথা শোনেনাই লোকটা। শেষ করে দিয়ে গেল আমারে! আল্লাহগো!'

দীর্ঘশ্বাস চাপল শওকত। এইতো গতমাসেই বিয়ে হল জমশেদের। তাদের সবাইকে দাওয়াত করেছিল। গিয়েছিল শওকত। পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করে কতইনা খুশি ছিল ছেলেটা। অথচ একমাস না যেতেই _। মেয়েটার জন্যে মায়া হল তার। কতইবা বয়স? এবয়সের স্বামীহারা হল! পাশের দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেকে জিজ্ঞেস করল, 'মেয়ের বাড়ির লোক আসেনি এখনো?'

সেই ছেলে জানাল, 'আসছে। পথেই আছে।'

শওকতের চোখ পড়ে এবার জমশেদের ছোট দুই বোনের মধ্যে বড়জনের দিকে। নাম সুমনা। মেয়েটাকে প্রথমবার দেখেছিল জমশেদের বিয়ের দিন। ভয়ঙ্কর সুন্দরী। বিশেষ করে চোখদুটো। তারওপর জমকালো গোলাপি শাড়ি জড়িয়ে সবার নজর কাড়ছিল সেদিন। কাজলটানা চোখে কী অসম্ভব মায়া। প্রথম দেখাতেই ভীষণভাবে আকর্ষণ করেছিল মেয়েটা শওকতকে। প্রেমে পড়েছিল তরুণ মীর্জা। কিন্তু সামনাসামনি বলেনি কিছু। আজকালকার মতো অতো অত্যাধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থাও ছিলোনা তখন। নিজের লোক দিয়ে একটু খোঁজ নিয়ে জেনেছে, মেয়েটা পড়াশোনা করছে। উচ্চ মাধ্যমিক দেবে এপ্রিলে। বয়স সতেরো! ঐ যুগে মেয়েদের উচ্চমাধ্যমিক অবধি পড়াশোনাটা বেশ বড় ব্যপারই ছিল। জমশেদ যে বোনদের ভবিষ্যত নিয়ে সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে চিন্তাভাবনা করেছে তা বুঝেছিল শওকত। একবার সুমনা কলেজ যাওয়ার পথে শওকত একখানা চিরকুট পাঠিয়েছিল তার লোক দিয়ে। তাতে লেখা ছিল, ' চিনতে পেরেছো? আমি তোমার শওকত ভাই! তোমার চোখদুটো ভীষণ সুন্দর। তুমিও। প্রেমে পড়ে গেছি আমি।'

সে চিরকুটের কোন জবাব আসেনি। কিন্তু শওকত প্রায়ই নজরে রাখতো ওকে। সাদা কলেজের শাড়ি, সঙ্গে সাদা ফিতে দিয়ে দুই বিনুনী করা সুমনাকে ভীষণ মোহনীয় লাগতো তার।  যেন মেয়েটাকে দেখেই পার করতে পারবে যুগের পর যুগ। মাঝেমাঝে পথ আটকে এটা-ওটা উপহার দিতো। চিরকুট লিখতো। খাবার কিনে দিতো।
মেয়েটা সুন্দরী হওয়ায় প্রায়ই পথেঘাটে উত্যক্ত হতো পাড়ার বখাটেদের কাছে। জমশেদকে কখনও বলেনি তা সুমনা। কিন্তু শওকতের চোখে পড়ল। তার শাসানিতে থেমে গেল সেসব। বিষয়টা সুমনাও জানল। বিষয়টা ভালো লাগল ওর। এরা থেকে সুমনাও পথেঘাটে দেখা হলে আড়চোখে তাকিয়ে দেখতো শওকতকে।  

সুমনার ছোট বোনের নাম ছিল মিতা। তখন সে এইটে পড়তো। বোনের মতো সেও ছিল রূপবতী। কিন্তু স্বভাবে ছিল সুমনার বিপরীত। সুমনা যতটা শান্ত ছিল, মিতা ছিল ততটাই চঞ্চল। সুমনা শওকতের দেওয়া চিরকুটগুলো সব মিতার সঙ্গে বসে বসেই পড়তো। মিতা হেসে কুটিকুটি হতো তা পড়ে। সুমনাকে খোঁচাতো। সুমনকে দুলাভাই সম্বোধন করে করে লজ্জা দিতো। এসবের মধ্যে ধীরে ধীরে সুমনাল মনও ঝুঁকল শওকতের দিকে।
এরপরেরবার যখন শওকত চিরকুট দিল সুমনার হাতে। তার উত্তর এলো পরেরদিন। চিরকুটটা শওকতের হাতে দিয়ে দৌড়ে পালিয়েছিল সুমনা।  তাতে লেখা ছিল খুবই ছোট্ট দুটো লাইন, ' আমি কিছু জানিনা। ভাইয়ার সাথে কথা বলবেন।'

সেটা পড়ে হেসেছিল শওকত। খুশি হয়েছিল ভীষণ। সুমনার মনের খবর সে পেয়েছে। আর জমশেদ তাকে না করবেনা। এরপর পথেঘাঠে দেখা হলে কেবল আড়চোখে তাকাতোই না, মুচকি মুচকি হাসতোও সুমনা। পাল্টা হেসে তাকিয়ে থাকতো শওকতও। উপহার, খাবার, চিরকুট দেওয়া-নেওয়ার প্রক্রিয়াও চলতো সমানতালে। তখনও বিয়ের প্রস্তাব দেয়নি শওকত জমশেদের কাছে। ভেবেছিল মেয়েটা এইচএসসি দিক। তারপরেই কথা বলবে। কিন্তু তার আগেইতো_।

পরেরদিন জমশেদকে দাফন করা হল। জানাজায় শওকত ছিল। সব ঝামেলা শেষ হতেই সুমনাকে খুঁজলো শওকত। গতকাল থেকে লোকজনের এতো ভীড় থাকায় কথা বলতে পারেনি মেয়েটার সঙ্গে। কিন্তু খুঁজে পেলেও ওকে একা পেলোনা সেদিন আর। সুতরাং চেষ্টা করেও সরাসরি কথা হলোনা। তবে কয়েকবার চোখাচোখি হয়েছে দুজনের। যতবার হয়েছে উদাস চোখে তাকিয়ে ছিল সুমনা। 
তারপরের দিন, অর্থাৎ জানুয়ারির ছাব্বিশ তারিখে সেই দলের ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে সোলার সিস্টেমের একটা মিটিংয়ের জন্যে ঢাকা গেল শওকত। কারণ চব্বিশ তারিখে ঘটে যাওয়া গনহ*ত্যার পর আরও বেশি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল পরিস্থিতি। অবস্থা ক্রমশ জটিল হচ্ছিলো।

•••••

সময়মতো ঢাকা গিয়ে পৌঁছয় শওকতসহ দলের আরও কিছু লোক। তখনও আমের ফাউন্ডেশন নামের কোন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। তবে গুলশান-২ এ অন্যএক ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠানের আড়ালে চলতো রফিক আমেরের সোলার সিস্টেম। দলের নামকরণটাও আসলে তারই করা। প্রায় পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই রফিক ছিল অদ্ভুত এক আভিজাত্যে মোড়ানো ব্যক্তিত্ব।
মিটিংয়ের শুরুতেই রফিক এক চাঞ্চল্যকর তথ্য জানায় ওদের। চুরুটে ফুঁক দিতে দিতে জানায়, 'চব্বিশ তারিখে তোমাদের ওপর যে গোলাগু*লিটা হয়েছে সেটা আসলে পুলিশ করেনি।'

চমকে ওঠে শওকত। অবাক হয়ে বলে, ' কী বলছেন কী? কিন্তু... আমি নিজে দেখেছি পুলিশদের গু*লি চালাতে। ইভেন আমি নিজেও গু*লি খেয়েছি।' বলে নিজের হাতের ব্যান্ডেজটার দিকে ইশারা করে শওকত। 

' রাজনীতি শুরু করছেন, অথচ এর প্রবল মারপ্যাঁচ বোঝার ক্ষমতা হয়নি? ব্যপারটা দুঃখজনক।'

স্পষ্ট, দৃঢ় স্বরে কথাগুলো বলতে বলতে মিটিংরুমে প্রবেশ করে বাইশ-তেইশ বছরের এক যুবক। পরনে ঢিলেঢালা শার্ট, প্যান্ট, ব্যাকব্রাশ করা ঘনকালো চুল, গালে হালকা দাড়ি। লম্বা, চওড়া সুঠাম এক শরীর। চোখমুখ দিয়ে ঠিকরে বের হচ্ছে অদ্ভুত তেজ। একবার তাকালে চোখ ফেরানো মুশকিল। এগিয়ে এসে একটা চেয়ার টেনে বসল সেই যুবক। মৃদু হেসে বলল, 'এতোবড় একটা ছাত্রসংগঠনের নেতা হিসেবে ব্যপারটা আপনার ধরতে পারা উচিত।'

কপালে ভাজ পড়ল শওকতের। মৃদু হাসল রফিক। ঠোঁটে মাঝ থেকে চুরুট সরিয়ে বলল, ' আমার বড় ছেলে। রাশেদ! রাশেদ আমের।'

শওকত তাকাল রাশেদের দিকে। এতো অল্প বয়সী ছেলের চলনে কী ধার! প্রবেশ করামাত্র ঘরের আবহাওয়া বদলে গেল। মৃদু গলা ঝেড়ে সে বলল, 'আপনার কথার মানে বুঝিনি।'

আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে চেয়ারে হেলান দিল রাশেদ, ' পুলিশের পোশাকে ওখানকার একটা পোর্ট সিন্ডিকেট গু*লি চালিয়েছে আপনাদের ওপর। যদিও ওদের হায়ার সরকারি দলই করেছে। পুরোটাই প্রি-প্লানড ছিল। সমাবেশটা বাঞ্চাল করে আন্দোলন দমনের জন্যে। আসলে গু*লি করা লোকগুলোর মধ্যে কেউই পুলিশ ছিলোনা।'

চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল শওকতের। ওর সঙ্গে থাকা দলের লোকগুলোও হম্বিতম্বি করে উঠল। শওকত দাঁতে দাঁত চেপে বলল, 'আপনারা এসব কীকরে জানলেন?'

' ব্যপারটা আন্ডারওয়ার্ল্ডের শওকত সাহেব। আন্ডারওয়ার্ল্ডে একটা পাতা নড়লেও সেই খবর সোলার সিস্টেমের কাছে পৌঁছে যায়। সরকারি দলের সঙ্গে ওদের একটা গিভ এন্ড টেইক ডিল হয়েছে। ওরা উইপন আর অ‍্যাটাক দেবে, সরকার দেবে শেল্টার। বুঝেছেন নিশ্চয়ই?'

শওকত সন্দিহান চোখে তাকিয়ে বলল, ' এই গিভ এন্ড টেইক পলিসিতে যে আপনারাও কখনও ঢুকবেন না, সেটা কীকরে বিশ্বাস করি?'

হেসে ফেলে রাশেদ। দুহাত টেবিলে রেখে সামান্য ঝুঁকে বলে, 'আমরা কোন রাজনৈতিক দলের সমর্থক নই। সরকার কেন, কোন রিরোধী দল নিয়েও মাথাব্যথা নেই আমাদের। দরকার হয়না আসলে। পরোক্ষভাবে দেখলে আন্ডারওয়ার্ল্ডের পাওয়ার পলিটিক্সের চেয়ে সবক্ষেত্রেই বেশি। অনেকটা বাঁধনছেঁড়া প্রাণ! আমরা ডিল করি লাভ দেখে। দল দেখে নয়।'

হালকা করে মাথা দোলালো শওকত। ভেতরে রাগ পুষেই বলল, 'পোর্ট সিন্ডিকেটের নাম?'

রফিক বলল, ' সেসব পরে হবে। আগে কাজের কথায় আসা যাক?'

শওকত লম্বা শ্বাস ফেলল, 'কাদের সাহেব নতুন কিছু মালের ডিমান্ড করেছেন। চব্বিশ তারিখের পর ঐদিকের আবহাওয়া ঠিক কতটা গরম তাতো বুঝতেই পারছেন। আত্মরক্ষা, সঙ্গে প্রতিঘাত। দুটোর জন্যই দরকার।'

রফিক লম্বা শ্বাস টেনে বললেন, 'তাহলে চলো! রেট, লোকেশন আর রুট কী হবে সেসব দেখি!'

•••••

চট্টগ্রাম গিয়ে সবার আগে সুমনাদের বাড়ি গিয়েই পৌঁছয় শওকত। তখনও সুমনার ভাবি আর ভাবির মা-ভাই রয়েছে ঐ বাড়িতে। সকলের খোঁজ নেওয়ার নাম করে গেলেও গিয়েছিল সুমনাকে দেখতে। সেদিন ক্ষণিকের জন্যেই সুমনাকে একা পেয়েছিল শওকত। বেশি কিছু বলতে পারেনি সেসময়। শুধু আলতো করে কাঁধে হাত রেখে জানিয়েছে, 'চিন্তা করোনা, আমি আছি।'

এরপরই একটা ভয়ংকর অপারেশনে নামতে হয় শওকতকে। সেই পোর্ট সিন্ডিকেটটাকে নিশ্চিহ্ন করার পরিকল্পনা করে কাদের। একটা স্বসস্ত্র দল তৈরী করা হয় সেকাজে। তার নেতৃত্বে ছিল শওকত স্বয়ং। সেই কাজে যাওয়ার আগের গোধূলিতে সুমনার সঙ্গে দেখা করতে আসে শওকত। মিতাকে দিয়ে খবর পাঠায়। মুখে ওড়না চেপে বাড়ির গেইট থেকেই উঁকি দেয় সুমনা। দূর থেকেই প্রিয় নারীকে কিছুক্ষণ দেখে শওকত হাত নেড়ে বিদায় নেয়। সুমনার চোখে জল আসে। সে শুধু তাকিয়েই থাকে লোকটার দিকে।
সেই মিশনটা চলল পুরো এক সপ্তাহ। জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর এবং শিহরণ জাগানো একটা সপ্তাহ পাড় করেছিল শওকত। শেষেরদিকেতো মারাত্মক আহত হয়ে মরতে মরতে বাঁচল। তবে সফল হয়েছিল তারা। ধ্বংস করে দিয়েছিল সেই পোর্ট সিন্ডিকেটকে। 

শওকত ফিরে আসার পরেরদিনই সুমনার সঙ্গে দেখা করার কথা ভাবল। ছুটির সময় সুমনা যে রাস্তা দিয়ে বাড়ি যায় সে রাস্তারই এক নিরিবিলি জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকল সে। সরু মাটির রাস্তা। দুপাশে গাছপালা। ফেব্রুয়ারির বিকেলের শীতল হাওয়া। শওকত ভেবেছিল সুমনা ওকে দেখে খুশি হবে। কিন্তু তাকে না দেখার ভান করে চলে যেতে দেখে অবাক হয় ভীষণ। আশেপাশে একবার চোখ বুলিয়ে পথ আগলে দাঁড়ায়। সমুনা থমকে যায়। শওকত বিস্ময় নিয়ে বলল, ' কী হলো?'

আশেপাশে একবার চোখ বুলিয়ে মাথা নুইয়ে ফেলল সুমনা। চিকন কম্পিত স্বরে বলল, ' যেতে দিন শওকত ভাই। কেউ দেখলে বিপদ হবে।'

আরও একবার আশেপাশে তাকায় শওকত। অতঃপর ক্ষপ করে ধরে ফেলে সুমনার হাত। টেনে রাস্তা থেকে নামিয়ে আনে বাগানের মধ্যে। সুমনা বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও পেরে ওঠেনা শওকতের সঙ্গে। বাগানের পাশের একটা পুকুরপাড়ে গিয়ে থামে শওকত। জায়গাটা নিরাপদ। কেউ চলে আসার সম্ভাবনা নেই। সুমনা অস্থিরভাবে বলল, 'কী করেন শওকত ভাই!'

শওকত ভ্রুদয় কুঁচকে বলল, ' এমন করো কেন? কিছু কী হয়েছে?'

' বাড়ি যাইতে দেন আমারে।'

' দিয়ে আসছি। চলো!'

' আমি আমাদের বাসায় থাকিনা এহন।'

শওকত ধারণা করেছিল এমন কিছু একটা। জমশেদের স্ত্রী নিশ্চয়ই স্বামীর মৃত্যুর পর বাপের বাড়ি ফিরে গেছে। আর দুজন অল্প বয়সী মেয়েকেও খালি বাড়িতে একা রাখা সম্ভব না। সে বলল, ' জমশেদের শ্বশুরবাড়ি থাকছো এখন?'

প্রশ্নটা করামাত্রই সুন্দর চোখজোড়ায় জল টলমল করে উঠল সুমনার। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে শুরু করল। চিন্তিত হয়ে সুমনার দুই বাহুতে হাত রাখে শওকত, ' কী হয়েছে বলবে?'

প্রথমবারের মতো লাজলজ্জা, সংকোচ সব ভুলে শওকত জাপ্টে ধরলে সুমনা। হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। স্তম্ভিত হয়ে গেল শওকত। এরপর সে জানতে পারল মাঝে কী ঘটে গেছে। উপায় না পেয়ে জমশেদের শ্বশুরবাড়ির লোকেরা ওদের দুবোনকে নিয়ে গেলেও ওদের ওখানে থাকা নিয়ে সন্তুষ্ট নয় ওরা কেউ। দায়ে পরে ভার নিতে হচ্ছে। কিন্তু ওদের দুই বোনেরই পড়াশোনা বন্ধের চিন্তাভাবনা তারা করেছে। সুমনার বিয়েও ঠিক করেছে মধ্যবয়স্ক বিপত্নীক এক অসুস্থ লোকের সঙ্গে। যার প্রথমপক্ষের দুজন সন্তানও আছে। গতকালই দেখে আংটি পড়িয়ে দিয়ে গেছে। ওরা চেয়েছিল এখনই সুমনার কলেজ যাওয়া বন্ধ করে দিতে। বিয়েতো হচ্ছেই। আর কলেজ গিয়ে কী হবে? কিন্তু সুমনার ভাবির এখনো কিছুটা দুর্বলতা আছে স্বামীর বোনদের প্রতি। তাই ভাইদের পায়ে পড়ে বলেছে, বিয়েটা হওয়ার আগ পর্যন্ত যাক কলেজে। তাইতো আজও কলেজে আসতে পারল মেয়েটা। সব শুনে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল শওকত। একটা গাছ উপড়ে পড়েছিল। বসার জন্যে বেশ চমৎকার জায়গা হয়েছে তাতে। শওকত সুমনাকে ধরে বসাল। নিজেও বসল। কিছুক্ষণ স্তব্ধ রইল চারপাশ। সুমনার ফোঁপানোর আওয়াজটাই শোনা যাচ্ছিল কেবল। লম্বা শ্বাস নিয়ে শওকত বলল, 'তুমি আংটি পরাতে দিলে?'

চোখভর্তি জল নিয়ে তাকাল সুমনা। ভাঙা গলায় বলল, ' কী করব বলেন? ভাইয়ের শ্বশুরবাড়ি থাইকা কী করা যায়? নিজের বাড়ি ফেরত যাইতাম? খাইতাম কী? তারওপর জোয়ান দুইটা মাইয়া! কতজনের কতরকম কুনজর আছে। ভাইয়ের সাথে কত মানুষের কত শত্রুতা। ছিঁড়া খাইবনা আমাগো? আমার বিয়ে করে নেওয়াই ভালো শওকত ভাই। মান নিয়া দু মুঠো খাইতেতো পারমু।'

মনোযোগ দিয়ে সবটাই শুনল শওকত। সুমনা থামতেই কিছুক্ষণ চুপচাপ কিছুক্ষণ চিন্তা করল। সুমনা বলল, 'আমি ওহন যাই শওকত ভাই। কেউ দেখলে মান যাইব।'

সুমনা উঠতে নিলে হঠাৎই ওর হাত ধরে পুনরায় বসিয়ে দিল শওকত। বাঁ হাতটা টেনে আনল নিজের সামনে। আঙুল থেকে নিঃসংকোচে খুলে ফেলল আংটি। সুমনা চমকে উঠে বলল, 'একী করলেন!'

শওকত নির্বিকারভাবে বলল, ' বিয়ে তোমার হবে। কিন্তু সেটা আমার সাথে। তাও এই মাসের মধ্যেই।'

সুমনা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বলল, 'কী!'

' ওনারা তোমার দ্বায় ঘাড় থেকে ঝাড়তে চায়তো? নিতে হবেনা কোন দ্বায়। আমি নেব।'

' আর আমার বইন? আমি হাতছাড়া হইলে আমার বইনটারে বিয়া দিয়া দিব ওরা। মাত্র তেরো বছর বয়স অর। অর কী হইব?'

' অবশ্যই আমাদের সঙ্গে থাকবে ও। তোমার আমাকে এতো বেশি অমানবিক মনে হয়?'

মাথা নুইয়ে ফেলল সুমনা। চোখ তখনও জলে টাইটুম্বুর হয়ে আছে ওর। ভেঙ্গে আসা গলাতেই শুদ্ধ বাংলায় বলল, ' তবুও আমি বিয়ে করতে পারব না আপনাকে?'

' কেন?' শওকতের কন্ঠে স্পষ্ট বিস্ময়!

সুমনা অসহায় চোখে একবার পরখ করে নিল শওকতকে। শরীরের কয়েক জায়গায় তার ব্যান্ডেজ। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে ভয়ঙ্কর কোন বিপদ কাটিয়ে এসেছে সে। সুমনা বলল, 'ভাইয়ার সঙ্গে যা হয়েছে ক'দিন পরযে তা আপনার সঙ্গেও হবেনা তার কী নিশ্চয়তা আছে? তারপর? তারপর কী হবে আমার? আমার বোনের? আপনারতো আরও বেশি শত্রু আছে। ভাবিরতো তাও মাথা গোজার জন্যে বাপের বাড়ি ছিল। আমারতো তাও নেই! কোথায় যাব আমি? আমার ভবিষ্যত কী? এরচেয়ে দুই সন্তানের বাপকে বিয়ে করে নেওয়াইতো ভালো। একটা নিরাপদ আশ্রয়তো থাকবে!'

শওকত নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে সুমনার দিকে। ঠিক ঐ মুহূর্তে গিয়ে শওকত বুঝতে পারে সুমনার প্রতি তার ভালোবাসা কতটা গভীর। একমুহূর্তের জন্যেও সে চিন্তা করতে পারল না যে সুমনা তার হবেনা। বরং অনায়াসের রাজনীতি আর কালোবাজারকে ছেড়ে দেওয়ার চিন্তা চলে এলো মাথায়। সে এসব ছাড়লে কারো কোন আপত্তি থাকার কথা নয়, বরং গোপনে অনেকে ভীষণ খুশিই হবে। সিন্ডিকেটের সঙ্গেও সে সরাসরি যুক্ত নয়। সুতরাং সেখানে কোন বিপদের আশংকা নেই। সুমনার প্রতি তীব্র প্রেমে মুহূর্তেই এসব ভেবে ফেলল সে। কোনরকমে বলল, 'যদি এসবে আমি আর না থাকি? ছেড়ে দেই? তবে?'

সুমনা বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইল। কন্ঠে অবিশ্বাস নিয়ে বলল, 'কী!'

' তোমার জন্য এসব ছাড়তে আমি দুবার ভাবব না সুমনা। তোমাকে কতখানি ভালোবেসেছি তা তুমি কল্পণাও করতে পারবেনা। তুমি শুধু বলো যে তুমি আমাকে বিয়ে করবে। আমি এইমুহূর্তে সব ছাড়ব।'

' তা-তারপর? চলবেন কেমনে?'

ঘোরের মধ্যে থেকেই বলল সুমনা। মৃদু হাসল শওকত। সুমনার হাতদুটো নিয়ে নিল নিজের হাতের মুঠোয়। নরম গলায় বলল, ' আমি যদি কিছু নাও করি, আমার বাপের যা আছে তা দিয়ে রাণীর হালে থাকতে পারবে তুমি। আমার বাবার ব্যবসা-বাণিজ্য এখন থেকে আমিই দেখব।'

সুমনা চোখের বিস্ময় তখনও কাটেনি। শওকত সুমনার গালে একটা হাত রেখে বলল, ' এইবার বিয়ে করবেতো আমায়?'

সুমনার দুচোখভর্তি জল। এমন করুণ বিপর্যয়ের পর একটা আশার আলো পেয়ে মন স্বস্তি পায় যেন। ঠোঁটে ফোঁটে প্রাপ্তির এক লাজুক হাসিতে মাথা নুইয়ে এলো ওর। শওকত হেসে আগলে নেয় তার জীবনের প্রিয় নারীটিকে।

•••••

ঐ মাসে না, কিন্তু তার পরের মাসেই বিয়ে হয় শওকত আর সুমনার। যদিও বিয়েটা হতে অনেক হ্যাপা পোহাতে হয়েছে শওকতকে। শওকতের বড়লোক ব্যবসায়ী বাবা কিছুতেই একটা অনাথ, ছোট ঘরের মেয়েকে বউ করে আনার কথা চিন্তা করতে পারেনি। কিন্তু শওকত জেদ ধরে বসল। নিজের পিতাকে কথা দিল, তার ব্যবসা সে দেখভাল করবে। ছন্নছাড়া জীবন ত্যাগ করে পরিপূর্ণরূপে সংসারী হবে। কিন্তু তার বদলে সুমনাকে বিয়ে করতে দিতে হবে। মত না থাকলেও বড় ছেলের তীব্র জেদের কাছে হার মানে মীর্জা পরিবার। মেনে নেয় সুমনাকে। পলাশ মীর্জা তখনও কিশোর। সুতরাং শওকত মীর্জাল ওপ ভর্সা করা ছাড়া উপায় কী?
এরপর জমশেদের শ্বশুরবাড়ি গিয়ে তাদের মানাতেও যথেষ্ট ঝামেলায় পড়তে হয়েছে। কিন্তু শওকতের বাবার প্রতিপত্তি এবং এলাকায় শওকতের প্রভাবের কারণে মানতে হয় তাদের।
এসবের চেয়েও বেশি চ্যালেঞ্জিং ছিল দল ছাড়া। সে যখন কাদেরকে গিয়ে বলল, সে আর দলে থাকবেনা। ভরা মিটিংয়ে নিজের পি*স্ত*লখানি জমা দিয়ে বলেছিল, 'আমি আর এসবের মধ্যে নেই।'  চমকে উঠেছিল সবাই। কারণ ভার্সিটির সংগঠনের সভাপতি নিজে সব ছেড়েছুড়ে চলে যাচ্ছে ব্যপারটা মানার মতো না। কেউ ক্ষুব্ধ হয়েছে,,কেউ হতাশ, কেউবা আহত। কিন্তু সবাইকে থামিয়ে দিয়ে কাদের হক বলল, ' বেশ। তোকে কেউ জোর করবেনা। সেচ্ছায় যখন যেতে চাইছিস, যা! কিন্তু দলটা তোর জন্যে সবসময়ই খোলা। যদি কখনও মনে করিস ফিরবি। সে যত বছর পরেই হোক। সাদরে গ্রহন করা হবে তোকে।'

এরপর আর কারো কিছু বলার থাকেনা। অবশেষে ক্যাম্পাস ছাড়ে শওকত। ফেব্রুয়ারিতে বেশ ধুমধাম করেই শওকত সুমনার বিয়ে হয়। মিতা ভীষণ খুশি ছিল এই বিয়েতে। ঐ ওপারে অর্ধেক পা বাড়িয়ে রাখার বুড়োর চেয়ে শওকত ভাই ঢের ভালো। তারওপর ওদেরও একটা ঠিকঠাক গতি হল। বিয়ের পর ক'দিন বেশ মধুর কাটল। শওকত-সুমনার নব্য প্রেম, একে অপরকে পরিপূর্ণ রূপে পাওয়ার মুহূর্ত, ছোটছোট খুনশুটি। শওকতের স্বাভাবিকভাবে অফিস যাওয়া। সব কেটেছিল স্বপ্নের মতো। কিন্তু ক'দিন যেতেই ঝামেলা শুরু হল। এই বিয়েতে বিন্দুমাত্র মন ছিলোনা শওকতের মায়ের। অমন ছোটঘরের মেয়ে সুমনাকে তার মোটেই পছন্দ হয়নি। সঙ্গে এসে জুটেছে ছোট বোন। দুই বোনই পড়াশোনা চালিয়ে যাবে, ব্যপারটা যেন আরও বেশি আপত্তির ঐ মহিলার কাছে। তাইতো ক'দিন না যেতেই সুমনা আর মিতাকে ঘরের কাজে ডুবিয়ে রাখতে শুরু করল সে। সামনে বোর্ড পরীক্ষা, অথচ পড়ার বিন্দুমাত্র অবসর পেতে যেন দম ফুরোতো সুমনার। বোনের সেই করুণ অবস্থায় অসম্ভব ধৈর্য্য আর বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিল কিশোরী মিতা। স্বস্তি দিতে মিতা এক হাতেই সব করার চেষ্টা করতো। মাঝেমাঝে স্কুল কামাই করে করতো সব কাজ। সারাদিন অফিসে থাকতো শওকত, সুমনাও কিছু জানাতোনা শুরুতে। বাড়ির বাকি পুরুষগণও কেউ এসব বিষয়ে কিছু জানতোনা। মাথাও ঘামাতো না। শওকতের বোনদের বিয়ে হয়ে গেছে। কিন্তু মাঝেমাঝে বাড়ি এলে তারাও কথা শোনাতে ছাড়তোনা।

সে অবধি তাও সয়ে নেওয়া যাচ্ছিল। একপর্যায়ে এদিক থেকে ওদিক হলেই বংশ, জাত তুলে গালাগাল করতো শওকতের মা। সে পর্যায়ে সুমনারও বাঁধ ভাঙল। সেও কথার পৃষ্ঠে কথা শোনাতে শুরু করল। ঘনঘন তর্ক হতে শুরু করল বাড়িতে। মিতা ছিল খুবই নরম মেয়ে। চঞ্চল হলেও এসব ঝগড়াঝাটি তার পছন্দ হতোনা। সে সুমনাকে বোঝানোর চেষ্টা করতো। থামিয়ে রাখার চেষ্টা করতো। কিন্তু তাতে উল্টে মিতার ওপরই ক্ষেপে যেতো সুমনা। সে পর্যায়ে গিয়ে সবটাই নজরে এসেছে শওকতের। প্রথমদিকে সে সুমনাকে একটু চুপ থাকতে বললেও একপর্যায়ে গিয়ে নিজের মাকেও থামতে বলতো। এ নিয়ে রোজকার ঝামেলা লেগেই ছিল। একদিন তরকারির স্বাদ নিয়ে নাটক শুরু করল শওকতের মা। সুমনাও ত্যাড়াভাবে উত্তর দিল। রেগে গিয়ে প্রথমে মাকেই ধমক দিয়ে বসল শওকত। বিষয়টাতে ভীষণ ক্ষেপেছিলেন শওকতের মা। সুমনাকে যা নয় তা বলে গালাগালি করলেন, তার ছেলেকে খেয়ে নেওয়া রাক্ষুসী উপাধি দিলেন। সেদিন সুমনাও সমানে তর্ক করল। সেই তর্কের একপর্যায়ে শওকতের মা চড় মেরে বসল সুমনাকে। সব সয়ে নিলেও, ঐটা কিছুতেই সহ্য হলোনা শওকতের। সুমনার প্রতি ভীষণমাত্রায় পজেসিভ ছিল সে। সবকিছুর উর্ধ্বে ছিল তার কাছে সুমনা। তাইতো বাড়িভর্তি মানুষের সামনে নিজের মাকে কটু কয়েকটা কথা শুনিয়ে, সেদিনই সুমনা আর মিতাকে নিয়ে সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। আলাদা সংসার পাতে। মিতার এইচএসসিও শুরু হয় তার দুদিন পর থেকেই। সুমনা পরীক্ষায় পড়ায় ব্যস্ত থাকতো, শওকত অফিসের কাজে, আর মিতা স্কুলের পাশাপাশি ছোট বাসাটাকে গুছিয়ে রাখতো। এসবের মধ্যেই দু'মাস পার হল। সুমনার পরীক্ষাও শেষ হল। ততদিনে পরিবারের সঙ্গে রেশারেশি কমে এলেও এক সংসারে ফেরার কথা আর ভাবেনি শওকত। সুমনার জন্যেই ভাবেনি। শওকত জানে তার মায়ের স্বভাব ঠিক হবেনা। তাই বাবার কাছ থেকে আলাদা ব্যবসার ভাগ বুঝে নিয়ে নিজের সংসার সাজাতে শুরু করে শওকত।

সুমনার পরীক্ষা শেষ হতেই ছোট্ট একটা ফ্ল্যাট কেনে শওকত। শুরুটা হয় মোটামুটি সাইজের তিন রুমের একটা ফ্ল্যাট থেকেই। শওকত-সুমনার সম্পর্ক চলছিল অনেকটা স্বপ্নের মতো। সুমনাকে কাছে পেলেই কেমন ঘোরে চলে যেতো শওকত। বাকি দুনিয়া মূল্যহীন, তুচ্ছ মনে হতো ঐ নারীর কাছে। যত দিন যাচ্ছিল, সুমনার প্রতি তীব্র আকর্ষণ, প্রেম, অবসেশন পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল শওকতের। সুমনার আল্হাদি স্বভাব, বাচ্চাদের মতো বায়না, ছোটছোট খুনশুটি, ভীষণ আকর্ষণীয় রূপ, সবকিছুই গভীরভাবে আসক্ত করে ফেলছিল তাকে। সেই আসক্তি ধীরে ধীরে কোন মাদকদ্রব্যের চেয়েও ভয়ংকর হয়ে উঠল। অফিস থেকে ঘন্টায় ঘন্টায় বাড়ির টেলিফোনে ফোন করা। অবসর কিংবা ছুটির দিনে সবসময় সুমনার আশেপাশে ঘুরঘুর করা। একমুহূর্তের জন্যে চোখের আড়াল হলেই যেন শ্বাস আটকে মরে যাবে সে। অন্যদিকে বাড়িটাকে মাতিয়ে রাখতো মিতা। সারাদিন এটাওটা রান্না করতো, কবিতার বই পড়তো, শওকতের কিনে আনা বড় রেডিওতে গান শুনতো। শওকতের এমন বউপাগল স্বভাব দেখে প্রায়ই দুজনকে লজ্জা দিতো। শওকত, সুমনা আর মিতা মিলে বেশ ভালোই জীবন-যাপন করছিল সেখানে।
এসবের মধ্যেই সুমনার এইচএসসির রেজাল্ট এলো। ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছে সে। সেদিন সুমনার চেয়ে বেশি খুশি হল যেন মিতা। আনন্দে সারাবাড়ি মাথায় তুলে ফেলল। সেকী পাগলামি! শওকতও পিছিয়ে থাকেনা। একগাদা মিষ্টি কিনে পাড়ায় বিলিয়ে দিল। যারা জানল কেউ কেউ ধন্য ধন্য করল শওকতকে। ঐযুগে এমন স্বামী বিরল। অনেক লোক আড়ালে কটু কথাও বলল, বউকে বেশি আশকারা দিচ্ছে; খুব শীঘ্রই মাথায় চড়বে ইত্যাদি। সেসব কানেই তুলল না বউয়ের প্রেমে মত্ত শওকত। সেই মুহূর্তে সত্যিই আনন্দিত ছিল সে।

কিন্তু শওকতের সেই আনন্দে খানিকটা ভাটা তখন পড়ল, যখন সুমনা বলে বসল, সে ঢাকাতেও ভর্তির আবেদন করবে। কথাটা সুমনা পাড়ল রাতের বেলায়। নিজেদের একান্ত মুহূর্তে। প্রথমেই ঘোর আপত্তি জানাল শওকত। গম্ভীর স্বরে বলল, 'ঢাকা কেন? চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চেষ্টা করবে। যদি সেখানে না হয়তো বেশ ভালো কয়েকটা কলেজ আছে এখানে। সেখানে ভর্তি করব আমি তোমাকে।'

সুমনা বলল, ' তুমিতো জানো আমি শুধু পড়ার জন্যে পড়িনা। আমার অনেক স্বপ্ন আছে। আমি দেশ ঘুরতে চাই, বিদেশ ঘুরতে চাই। জীবনটা উপভোগ করতে চাই।'

শওকত জানে সুমনার স্বপ্ন সবসময়ই বড় ছিল। নিন্ম-মধ্যবিত্ত ঘরে জন্মালেও জমশেদ সময়ের চেয়ে এগিয়ে বড় করেছে বোনদের। দেখিয়েছে বড়বড় স্বপ্ন। তাই সুমনাকে দোষ দিতে পারল না শওকত। মাথায় আলতো চুমু খেয়ে বলল, ' সেসব হবে। আমি নিজে পূরণ করাব তোমার স্বপ্ন। কিন্তু আমার থেকে দূরে গিয়ে নয়। একসঙ্গে। তুমিতো জানো আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারিনা।'

' তুমি আবেদন করতে দেবেনা আমায়?' সুমনার কন্ঠে স্পষ্ট  জেদ।

' জেদ করছো কেন সুমনা? আমিতো বলছি তোমার সব স্বপ্ন পূরণ হবে। কিন্তু তারজন্যে ঢাকা কেন যেতে হবে?'

কিন্তু সুমনা নিজ জেদে অনড় থেকে বলল, ' আমি করবোই আবেদন।'

শওকত রেগে গেল। নিজের বুক থেকে সুমনাকে সরিয়ে দিয়ে শক্ত গলায় বলল, ' আমি আমার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছি তোমাকে। তার কোন নড়চড় হবেনা।'

মুহূর্তেই চোখে জল ছলছল করে উঠল সুমনার। কিছুক্ষণ চরম অভিমান নিয়ে তাকিয়ে রইল শওকতের দিকে। কিন্তু শওকত কঠোর। উল্টো ঘুরে শুয়ে পড়লো সুমনা। শওকতও কিছু বলল না। ভাবল এখন রাগ করেছে, সকালে সব ঠিক হয়ে যাবে। যেমনটা সবসময় হয় আরকি।

কিন্তু সেবার আর তা হলো। সুমনার রাগ-জেদ কোনটাই পড়ল না। সকালে খাবার টেবিলে সুমনাকে দেখতে পেলোনা শওকত। মিতাকে প্রশ্ন করলে সে জানাল, সুমনার ঘরে গিয়ে দরজায় খিল দিয়েছে সুমনা। খুলবেনা। শওকত দীর্ঘশ্বাস চাপল। হালকা খেয়ে বেরিয়ে গেল সে। কাজে যেতে দেরী হচ্ছে। যাওয়ার আগে মিতাকে বলে গেল সুমনাকে খাওয়াতে।   কিন্তু সময় যত গেল অবস্থা বেগতিক হতে শুরু করল। সুমনা ঠিকমতো খাচ্ছিল না, কথা বলছিল না। রাতের বেলাতেও ঘুমিয়ে থাকতো মিতার কাছে। প্রাণপ্রিয় স্ত্রীর এমন আচরণে অস্থির হয়ে উঠছিল শওকত। যার সঙ্গে ঘন্টায় ঘন্টায় কথা না হলে স্বস্তি পাওয়া যায়না, তারসঙ্গে এমন দূরত্ব সহ্য হয়? কিশোরী মিতাও বুঝল দুলাভাইর পীড়া। একদিন রাতে সুমনাকে বোঝাতে বলল, 'এবার কিন্তু সত্যিই বাড়াবাড়ি হচ্ছে আপু। তোকে ঢাকাই কেন পড়তে হবে আমি বুঝলাম না। দেখিসতো মানুষটা তোকে ছাড়া থাকতে পারেনা। অযথাই ঝামেলা বাড়াচ্ছিস।'

উত্তরে ধমকে উঠল সুমনা, ' ছোট ছোটর মতো থাক। যা বুঝিস না তা নিয়ে এতো কথা কেন বলিস?'

বেশ কয়েকটা দিন এভাবেই কেটে গেল। অনিয়মের ফলে সুমনার শারীরিক অবস্থারও অবনতি হতে শুরু করল। একদিন দুপুরেতে মাথা ঘুরে পড়ে গেল সে। শওকতের পক্ষে আর সম্ভব হলোনা এমন মানসিক অশান্তি সহ্য করা। শুক্রবারের এক বন্ধের দিকে সুমনাকে ঘরে ডেকে বলল, 'তুমি যা চাইছো তাই হবে। যদি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে না হয় চান্সতো যাবে তুমি ঢাকা। তাও এসব বন্ধ করো। অসুস্থ হয়ে পড়ছো দিনদিন।'

সুমনা সন্দিহান হয়ে প্রশ্ন ছোড়ে, 'কথা দিচ্ছেন?'

'দিচ্ছি।' শওকতের কন্ঠে হতাশা।

আনন্দে চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল সুমনার। খুশিতে জড়িয়ে ধরেছিল শওকতকে। মলিন হেসে স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরলেও মনে মনে খুশি ছিলোনা শওকত। ভীষণ ভালোবেসেছে সে সুমনাকে। মেয়েটাকে ছাড়া থাকতে হবে ভাবলেই তার বুক কাঁপে। সেখানে এতো দূরত্ব! মনে মনে শওকত ভীষণভাবে প্রার্থনা করল, সুমনার যাতে চট্টগ্রামেই চান্স হয়ে যায়।  

কিন্তু শওকতের প্রার্থনা বিফলে যায়। চট্টগ্রাম কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনটাতেই চান্স হয়না সুমনার। তবে পরবর্তীতে ইডেন কলেজের প্রকাশিত তালিকায় নাম আসে ওর। ইংরেজি বিভাগে পড়ার ইচ্ছা ছিল সুমনার। সুতরাং একটা ছোট্ট ভাইবার জন্যে ডাকা হয়। শওকতও কথা দিয়ে বসে ছিল। তাই বাধ্য হয়েই নিয়ে যায় ওকে। ঢাকা শহরেহ নতুন শহরের আভিজাত্য দেখে চোখ চকচক করে উঠেছিল সুমনার। সেকি আনন্দ, উচ্ছ্বাস তার। স্ত্রীকে এতো খুশি দেখে ভালো লাগলেও ভেতরে চাপা বিষাদ ছিল মীর্জার। তার প্রিয় জিনিসটা যেন হারিয়ে যাচ্ছে চিরকালের মতো।

অবশেষে ইডেন কলেজেই ভর্তি হল সুমনা। সেপ্টেম্বরের দিকে ঢাকায় পুরোপুরি কলেজের হলে স্থানান্তরিত হল সে। মিতার তখন সে-কি কান্না। সুমনাকে জড়িয়ে বাচ্চাদের মতো করে কেঁদেছিল। সুমনা সান্ত্বনা দিয়ে বুঝিয়েছে, কয়েকটা বছরইতো। ছুটিছাটা পেলেইতো চলে আসবে সে। বুকে একপ্রকার পাথর চেপে রেখেই সুমনাকে ঢাকা রেখে এসেছিল শওকত। সে পর্যায়ে মিতাকে নিয়েও আলাদা সেই ফ্ল্যাটে থাকা সম্ভব হয়নি। যতই হোক লোকচক্ষু বলে কিছু আছে। তাই মিতাসহ আবার নিজ বাড়িতে ফেরে শওকত। নিজের মাকে বোঝায়, মিতা মেয়েটা ছোট। বাপ-মা-ভাই মরা অসহায় এক মেয়ে। বোনটাও কাছে নেই। শওকতের মা বোঝে কি-না তা জানার মতো মানসিক অবস্থা ছিলোনা শওকতের। ন'মাসেই সুমনার প্রতি ভয়ংকরভাবে আসক্ত হয়ে উঠেছিল সে। তাই মেয়েটা দূরে যেতেই পাগল পাগল লাগতে শুরু করল তার। শুরুর দিকে শক্ত থাকলেও ধীরে ধীরে মানসিক অস্থিরতা যেন আকাশ ছুঁলো। সুমনা হলে থাকতো, পড়াশোনা ক্লাস নিয়ে ব্যস্ত থাকতো। সুতরাং ঘনঘন কথা হতোনা দুজনের। এখনকার মতো মুঠোফোন না থাকায় সে যোগাযোগ আরও বেশি কঠিন হয়ে উঠেছিল। দিনে  একটাবার কথা হতো ঠিকঠাকভাবে। শওকতের হাঁসফাঁস লাগতো। দম আটকে আসতো। আশেপাশের সবকিছুর প্রতি বিতৃষ্ণা চলে আসল। তখন নিজেকে সামলে রাখার জন্যে কাজকে বেছে নিল সে। দিনরাত ব্যবসার জটিল কাজে ডুবে থেকে ভুলিয়ে রাখতো নিজের মনকে। সকাল থেকে রাত অবধি ভীষণ কাজে ডুবে থেকে, দিনশেষে যখন সুমনার সঙ্গে কথা বলতো ভীষণ শান্তি লাগতো তার। নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারতো রাতে। মনে হতো এইতো, পাশেই শুয়ে আছে সুমনা। নিজের এবং নিজের মানসিক অবস্থায় বিভোর থাকা শওকত তখন আর মিতার দিকে নজর রাখতে পারল না।

কিন্তু শওকতের বোঝানো বুলি তার মা আসলে বোঝেনি। এমনিতেই ছেলের বউ নিয়ে সে অখুশি ছিল। সঙ্গে আবার নিয়ে এসেছে ছোটবোনকে। তারওপর মেয়ে ঢ্যাংঢ্যাং করতে করতে চলে গেছে ঢাকা। বিবাহিত মেয়ে না-কি স্বামী সংসার ছেড়ে অন্যশহরে গিয়ে ধিঙ্গিপণা করে বেড়াচ্ছে। পাড়াপ্রতিবেশি কত কানাঘুষা করে। লজ্জায় কান কাটা যায় তার। সেই ঝাল মেটানোর জন্যে সুমনাকে না পেলেও মিতাতো আছে। মিতার ওপরেই যেন নিজের জমানো সব আক্রোশ মেটানো শুরু করে সে। শওকতের উদাসীনতার সুযোগে মিতা হয়ে উঠল ঐ বাড়ির অঘোষিত কাজের লোক। স্কুলে যাওয়ার সময়টুকু ছাড়া বাকি সময়টা বাড়ির কাজে ডুবে থাকতে হতো ওকে। সব সামলে সময় বের করে পড়তে বসতে তবে সেসব নিয়ে কোন আক্ষেপ ছিলোনা চৌদ্দ বছরে পা রাখতে চলা মিতার। দিনশেষে ওর আপু আর দুলাভাই ভালো থাকলেই হলো। কিন্তু শওকতকে দেখে মাঝেমাঝে মায়া হতো ওর। ভাবতো, কেনযে আপুটা তাকে ছেড়ে দূরে থাকছে। এমন স্বামীভাগ্য কজনের হয়।

দেখতে দেখতে এক বছরেরও বেশি সময় কেটে যায়। সুমনা তখন চট্টগ্রাম আষে। প্রথমবর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে। এরআগেও দুবার এসেছিল। শওকত নিয়ে এসেছিল ছোট ছোট ছুটিতে। তবে সেবার এসেছিল বেশ দীর্ঘ সময়ের জন্যেই। সুমনাকে তেমন ঘাটায়ন তার শ্বশুরবাড়ির লোক। আগেরবারের অভিজ্ঞতা মনে আছে তাদের। তারওপর নতুন শহরের বাতাস লেগে মেয়ে আরও চটপটে হয়েছে। কথার ধার বেরেছে। সুমনার এই সামান্য বদল শওকতও লক্ষ্য করেছে। তবে সেটা সে নিয়েছে স্বাভাবিকভাবেই। আপাতত সুমনাকে দীর্ঘদিনের জন্যে পেয়েই সে খুশি। সুমনাকেও ভীষণ খুশি দেখাল। চালচলনে সামান্য পরিবর্তন ঘটলেও বাকিসব ঠিক আছে। যেকটাদিন ছিল শওকতের সঙ্গে বেশ চমৎকার মুহূর্ত কাটিয়েছে সে। মিতার ও ভীষণ খেয়াল রেখেছে। বোনকে এতো খুশি দেখে মিতার বেশ ভালো লাগছিল। তাদের আগোচরে নিজের হওয়া কষ্টগুলোকে তখন আর কোন কষ্টই মনে হচ্ছিলো না।

ঢাকা ফিরে যাওয়ার আড়াইমাসের মাথায় এলো এক চমকপ্রদ খবর। সুমনা প্রেগনেন্ট। খবরটা শোনার সঙ্গেসঙ্গেই শওকতের ঠোঁটে ফুটেছিল স্বস্তির এক হাসি। আসলে ব্যপারটা সে অনেকটা  ইচ্ছাকৃতই ঘটিয়েছে এবার। শওকত বুঝতে পারছিল, এতো দূরত্বে থাকায় না চাইতেও তাদের মধ্যে দেয়াল তৈরী হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। সেই সম্ভাবনা দেখা দেওয়ার আগেই সুমনাকে বাঁধতে হবে। তারজন্যে এরচেয়ে সেরা উপায় হতে পারেনা। সুমনাকে সে কোনকিছুর মূল্যেই হারাতে পারবেনা। এই বাচ্চাই সুমনাকে আটকে রাখবে তার সঙ্গে। সে খুশিমনেই বাড়ির সবাইকে জানায় এই সুসংবাদ। শওকতের কাছে খবরটা শুনে মিতার সে-কী উচ্ছ্বাস। যদিও তার বাবা-মার ঘোর আপত্তির বিষয় ছিল এই অবস্থাতেও সুমনার ঢাকায় থাকা নিয়ে। তবে ছেলেকে এসব বলেতো লাভ নেই। তারা এখন নিজের মর্জির মালিক।

এদিকে সুমনার কাছে প্রেগনেন্সিটা আচমকা হলেও। অখুশি হয়নি সে। তবে খুব বেশিযে খুশি হয়েছিল তা আসলে বলা যায়না। সদ্য ঢাকা এসে ডানা মেলে উড়ছিল সে। নতুন অনেক বান্ধবী হয়েছে তার। খুব ঘনিষ্ঠ বান্ধবী। সিনিয়র কিছু আপুদের সঙ্গেও ভালো সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছে তার। তাদের সঙ্গে প্রায়ই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ঘোরাঘুরি করা হয়। টিএসএসি, কার্জন হলে তারা আড্ডা দেয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছেলে বন্ধুদের সঙ্গে। সুমনাও থাকে সেখানে। টুকটাক কথাবার্তা বলে। ভাইয়ারা ট্রিট দেয়। নতুন  নতুন যারা দেখে হুটহাট প্রপোজ করে বসে। যদিও সুমনা পরে জানায় সে বিবাহিত। তবে এসব তার ভালোই লাগে। অস্বীকার করবেনা। এইসময় বাচ্চাটা বোধহয় না এলেই ভালো হতো। তবে এসেও ভালোই করেছে। ওর আর শওকতের প্রথম সন্তান। ওকে মা বলে ডাকবে, শওকতকে বাবা। ব্যপারটা শিহরণ জাগানোর মতো। ক্যাম্পাসের এই আনন্দময় জীবনতো আর পালিয়ে যাচ্ছেনা।

এরপরে প্রায় তিন-চারমাস ক্লাস করেছিল সুমনা। এরপর শওকত নিয়ে আসে তাকে চট্টগ্রামে। প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়তো তখন মেয়েটা। ডেলিভারির সময়ও কাছে আসছে। তারওপর দেশের অবস্থাও তখন আরও বেশি অস্থিতিশীল। সারাদেশ উত্তপ্ত। এই অবস্থায় ওখানে কোনভাবেই সুমনাকে কোনভাবেই সেখানে রাখবেনা শওকত। সুমনাও মেনে নিয়েছে তা। কারণ আর কোন উপায় ছিলোনা। গর্ভবতী বোনকে কাছে পেয়ে যেন আকাশের চাঁদ পেল মিতা। সত্যি সুমনাও স্বস্তি পেয়েছিল বাড়ি ফিরে। এসময় মিতার সান্নিধ্য তার সত্যিই দরকার ছিল। 
ঠিক তার আড়াইমাস পর, ১৯৯০ সালে সেপ্টেম্বর মাসের দশ তারিখে জন্ম নেয় শওকত এবং সুমনার প্রথম সন্তান। ফুটফটে একটা ছেলে সন্তান দেখে খুশিতে আত্মহারা হয়ে যান শওকতের মা। ছেলের বউয়ের প্রতি জমানো সব রাগ গলে জল হয়ে যায়। প্রথম সন্তানকে কোলে নিতেই শওকতের হাতের সে-কি কম্পন। এমনটা কোনদিন অনুভব করেনি সে। এতো সুখ, এতো পরিপূর্ণতা। সুমনা ছেলের মুখটা দেখার সঙ্গে সঙ্গেই ভুলে গেল তার সেই কলেজের আনন্দময় জীবন। সদ্যজাত ছেলের মুখে চুমু খেয়ে মনে হল এরচেয়ে বড়কোন সুখ আসলে হয়না। ছেলের নাম রাখল সুমনাই। শান, শান মীর্জা।
ছেলেকে পেয়ে সেমুহূর্তে সব ভুলে গেল সুমনা। ছেলের মায়ায় জড়িয়ে পড়ল ভীষণভাবে। তা দেখে তৃপ্তি পায় শওকত। বুঝতে পারে তার সিদ্ধান্ত ভুল ছিলোনা। এসব দেখে স্বস্তি পায় মিতা। এদের দুজনের এমন একটা সুখি পরিবার দেখার জন্যেইতো মন আনচান করতো ওর। সুমনার শাশুড়িও এখন খারাপ ব্যবহার করেনা ওর সঙ্গে। পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারছে ঠিকঠাক। আর কী চাই? সবকিছু কত ভালো চলছে। কয়েকমাস পর মেট্রিক পরীক্ষাও দেবে সে। 

ডিসেম্বর মাসের দিকে বিশাল এক রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটল। সরকার পতন হল অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। সারাদেশ তখন ভীষণ উত্তাল। আগের মতো রাজনীতিতে যুক্ত থাকলে হয়তো ভীষণ ব্যস্ত থাকতে হতো শওকত মীর্জাকে। কিন্তু এখন সে তার পরিবার, স্ত্রী, আর তিনমাসের ছেলেকে নিয়ে ভালো আছে। সুখে আছে। মাঝেমাঝে ডাক এলেও যায়নি শওকত। এই সুখ সে নষ্ট করবেনা। কোনভাবেই না।

দেখতে দেখতে কেটে গেল আরও কয়েকটা। সেবছর অর্থাৎ ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হয়েছিল ঠিকই। তবে তাতে কাদের হক যে দলে ছিল সেদল বিজয়ী হতে পারেনি। তবে কাদের হক এমপি পদ পেয়েছিল বটে। তবে এসবে মাথা ঘামায়নি শওকতের। তারওপর মাসখানেক আগে মারা গেছে শওকতের বাবা। এসবের মধ্যে সুমনার ফিরে যাওয়ার সময় হয়। শওকত ভেবেছিল সব ঠিকঠাকই আছে। আর কিছু বেগড়াবে না। তবে ব্যপারটা অনেকটা বিগড়ে গেছে এরমধ্যেই। সুমনা এরমধ্যেই ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে এসেছিল শওকতের সঙ্গে। এবং ফলাফল এসছে কদিন আগে। খুব খারাপভাবে ফেইল করেছে সুমনা। দ্বিতীয়বর্ষটা আবার পড়তে হবে তাকে। শওকত বলেছে এসব কিছু না। ঠিক হয়ে যাবে সব। কিন্তু সুমনার মনে প্রভাব পড়েছে বড়সর। সে সোজা বলে দিয়েছে সে ওখানে থেকে, নিয়মিত ক্লাস করেই পরীক্ষা দেবে এখন থেকে। শানের এখন একবছর হয়ে গেছে। ওর দেখাশোনা নিশ্চয়ই দাদী এবং খালা মিলে করতে পারবে। শওকততো আছেই। শওকত আর মিতা প্রায় হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে ছিল সুমনার দিকে। একবছরের সন্তানকে ছেড়ে কোন মা এভাবে যেতে পারে! কয়েকদিনেই সুমনার চোখেমুখে কী অদ্ভুত কঠোরতা! কোনকিছুতেই কোন লাভ হয়নি। তাই অনেকটা বাধ্য হয়েই সুমনাকে আবার হলে রেখে আসে শওকত। শওকতের মাও এবার বলেনি কিছু। স্বামী মারা যাওয়ার পর কেমন নেতিয়ে গেছেন মহিলা।

আসলে রেজাল্ট খারাপ হওয়ার চেয়েও ফেইল করে ক্লাসমেটদের সামনে ছোট হওয়াটা বেশি গায়ে লেগেছিল সুমনার। ইয়ারলসতো আছেই। তারওপর বেবি হওয়াতে শরীরেরও অনেকটা পরিবর্তন ঘটেছে। সবমিলিয়ে হঠাৎ করেই বেশ বিরক্ত হয়ে উঠেছিল সাংসারিক জীবন নিয়ে। বাচ্চাটার প্রতি ধীরে ধীরে বেড়েছিল বিতৃষ্ণা। বেশ ভালো বুঝতে পেরেছিল হঠাৎ এই মা হওয়াটাই কাল হয়েছে ওর। সেই ধারণা  আরও পাকাপোক্ত হয় ক্যাম্পাসে ফিরে আসার কয়েকমাস পর। বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে চলা সেই জীবনযাপন। ঢাবিতে গিয়ে আড্ডা। নতুন নতুন মানুষদের সঙ্গে পরিচয়। সুমনা বুঝতে পারে সাংসারিক জীবনটাই তার আনন্দের পথে সবচেয়ে বড় এক বাঁধা। 
আগের মতো আর চুপ থাকেনা তখন সুমনা। আড্ডায় সমানভাবে যোগ দেয়। ভিন্নধরণের ব্যক্তিত্বের পুরুষদের বোঝার পর তার মনে হয়, এতো কম বয়সে বিয়ে করে সবচেয়ে বড় ভুল করেছে সে। তার আরও জগত দেখার ছিল। নতুন নতুন মানুষ চেনার ছিল। নিশ্চয়ই সে আরও ভালো, আরও আকর্ষণীয়, আরও ব্যক্তিত্ববান কাউকে জীবনে পেতো। তারচেয়েও বড় কথা, যে সুমনা অনায়াসে নিজেকে বিবাহিত বলে পরিচয় দিতো, সে যেন এখন নিজের এই পরিচয়টাকে লুকাতে পারলেই বাঁচে। সে বিবাহিত, এ যেন সবচেয়ে বড় লজ্জা।

এদিকে সুমনার এই বিস্তর ফারাক দূর থেকেও স্পষ্ট টের পাচ্ছিল শওকত। আগের সেই নিয়মিত আলাপ গিয়ে ঠেকেছে এখন দু-তিন পরপর গিয়ে। অথচ এখন আরও বেশি হওয়ার কথা ছিল। ছোট্ট একটা বাচ্চা আছে তাদের। অথচ সুমনার যেন কোন টানই নেই বাচ্চাটার প্রতি। ভাগ্যিস মিতা আর মা ছিল। নয়তো এইটুকু শানকে কে সামলে রাখতো? কিন্তু শওকতের ভেতরটা খাঁ খাঁ করে ওঠে। সুমনার এই পরিবর্তন তাকে যন্ত্রণার সাগরে ডুবিয়ে দেয়। প্রথমে খুব ধৈর্য্য ধরে, ভালোভাবে সুমনাকে বোঝানোর চেষ্টা করতো শওকত। কিন্তু সুমনা বুঝতোতো নাই। উল্টে ঝগড়া শুরু করে দিতে চাইতো। শওকত যখন ভয়ংকর রেগে গিয়ে সুমনার পড়াশোনা সব বন্ধ করে দিয়ে ফিরিয়ে আনার কথা জানাতো। তখনই শুরু হতো সুমনার আরেক নাটক। কেঁদেকেটে একসার করতো সে। আত্মহত্যার ভয় দেখাতো। সেপর্যায়ে দমে যেতো শওকত। স্ত্রীকে প্রচণ্ড পরিমাণে ভালোবাসে কি-না। যদি সত্যিই এমন কিছু করে বসে! শওকত বাঁচবে কী নিয়ে। মাঝেমাঝে ছুটিতে সুমনা আসতো ঠিকই, তবে সংসারের প্রতি তার বিশেষ কোন টান দেখা যেতোনা। পোশাক, চালচলন সবকিছুতেই ঘটেছিল বিস্তর ফারাক। শওকত হতভম্ব হয়ে যেতো। শ্বাস আটকে আসতো তার। এদিকে মিতা অবাক হয়ে দেখতো আপার পরিবর্তন। কিন্তু কিছু বলতে পারতোনা বেচারি। বলতে গেলেই কড়া ধমকে বসিয়ে রাখা হতো তাকে। তারচেয়েও বিষাদ নিয়ে দেখতো শওকত বদলে যাচ্ছে। আজকাল কেমন করে লোকটা। সারাদিন কী অদ্ভুত ঘোরে যেন ছটফট করে। 

দেখতে দেখতে আরও বছর কয়েক কেটে যায়। সুমনার উন্নতির বদলে ভয়ংকর অবনতিই ঘটেছে তারমধ্যে। বছরখানেক আগে শওকত খুব গোপনে খোঁজ নিয়েছিল সুমনার চালচলন, জীবনযাপন সম্পর্কে। আর যা জেনেছে তাতে হাড় হিম হয়ে এসেছে শওকতের। এরমধ্যেই বেশ কয়েকজন পুরুষের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়েছে সুমনা। কয়েকজন! যাকে এতো ভীষণভাবে ভালোবেসেছিল তারকাছ থেকে পাওয়া এমন প্রতারণার ধকল হজম হয়নি শওকতের। সুমনার কাছে জবাব চাওয়ার সাহস বা মানসিক অবস্থা তৈরীই হয়নি তার আর। দীর্ঘ একবছর যাবত মানসিক অবসাদে ভুগছে সে। দিনদিন অবস্থার অবনতি হচ্ছে আর। তারওপর ছ'মাস হল মারা গেছে শওকতের মাও। সব মিলিয়ে অবস্থা নাজেহাল। শওকতের মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটছে তা স্পষ্ট টের পাচ্ছিল শওকত নিজেও। মিতা অসহায় হয়ে কেবল শক্তসবল মানুষটার শেষ হয়ে যাওয়া দেখছিল। কিন্তু কিছু করার ছিলোনা ওর চারবছরের ছোট্ট শানকে নীরবে সামলে গেছে কেবল। 
তারমধ্যে ওর জীবনে নতুন এক রঙ এসেছে। বশির ভাই! লোকটা ওকে দেখেছিল সেই ইন্টারের প্রথম বর্ষে। কয়েকমাস দূর থেকে নজরে রেখে রেখে হঠাৎই প্রেম নিবেদন করেছে ছ'মাস আগে। এখন পর্যন্ত করেই যাচ্ছে। কী অদ্ভুত অদ্ভুত উপায়েইনা প্রেম নিবেদন করে লোকটা। কত পরিপাটি, স্নিগ্ধ মনে হয় তার শব্দগুলো। অন্যসবার চেয়ে আলাদা। এতোগুলো মাস এড়িয়ে গেলেও ইদানিং তাকে বেশ ভালোই লাগে অষ্টাদশী মিতার। লোকটার কথা ভাবলেই চোখমুখ কেমন রাঙা হয়ে ওঠে।

এরমধ্যেই একদিন টিএসসির আড্ডায় সুমনাদের আড্ডার মাঝে এসে যোগ দেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র সংগঠনের সভাপতি কাশেম হক। বয়স তখন তার চব্বিশ। কালো পাঞ্জাবী পড়ুয়া ভীষণ সুদর্শন এক তাগড়া যুবক। কাশেমকে দেখামাত্র চোখ আটকে যায় সুমনার। পলকহীনভাবে তাকিয়ে থাকে কেবল। এদিকে পরিচয়পর্বের সময় কাশেমের চোখও পড়ে সুমনার ওপর। তারচোখও একইভাবে চোখ আটকায় তার। তবে সুমনা প্রথম মেয়ে নয়, যার ওপর কাশেমের চোখ আটকেছে!


          সুমনা মির্জা ছিল ছোট্ট এক খাচায় বেড়ে ওঠা পাখি। বাইরের না দেখা পৃথিবী নিয়ে হাজারটা ফ্যান্টাসিতে ভরপুর মন নিয়ে পার করেছিল নিজের কিশোরী জীবন। শওকত নামক পুরুষের আগমনে যখন সেই খাঁচা থেকে ও মুক্তি পেল, সত্যিকারের পৃথিবীটা দেখার সুযোগ হল, উড়তে পারল নিজের ইচ্ছামতো। বদ্ধতায় বেড়ে ওঠা সেই সুমনার কাছে বাইরের জগতটা বড্ড বেশি রঙিন লাগল। নতুন মানুষগুলোকেও মনে হলো রঙবেরঙের। ঝকঝকে, চকচকে। এতোই বেশি রং আর চাকচিক্যের অনুভূতি ওকে মনে করালো ওর ফেলে আসা জীবনটা বড্ড বেশি ফিকে, বে-রঙের। সেইসঙ্গে মানুষগুলোও। সেকারণেই বোধহয় একটু আকর্ষণীয় পুরুষদের প্রতি ওর দুর্বলতা খুব সহজে চলে আসতো। আকৃষ্ট হয়ে পড়তো। সুমনাও ছিল নজরকাড়া সুন্দরী। বেশিরভাগ পুরুষেরই ভালো লাগতো ওকে। এতে করেই শেষমেশ সেই সম্পর্ক পৌঁছতো প্রেমে গিয়ে। কিন্তু যখনই সুমনা অপেক্ষাকৃত আকর্ষণীয় এবং ব্যক্তিত্বপূর্ণ পুরুষের সান্নিধ্য পেতো, তখন আর আগের জনের প্রতি কোন আকর্ষণ থাকতোনা ওর। সেই আকর্ষণ ধীরে ধীরে স্থানান্তরিত হতো সেই নতুনজনের দিকে। এভাবেই কাটছিল দিনকাল। যাদের সঙ্গে পড়েছিল তারাও সবাই প্রায়ই একইরকম হওয়াতে সুমনার কখনও মনেও হয়নি ও অস্বাভাবিক কিংবা অশালীন কিছু করছে। ওর দৃষ্টিকোণ থেকে ও নিজের জীবনকে উপভোগ করছিল কেবল। কাঁচা বয়সে হুট করে হয়ে যাওয়া একটা বিয়ে, একটা অনাকাঙ্খিত সন্তান ওর পায়ের শেকল হতে পারেনা। ও এই জাকজমকপূর্ণ জীবনটাই ডিজার্ভ করে, চার দেয়ালে বদ্ধ গৃহিনী জীবন নয়। 
কাশেম হকের সঙ্গে টিএসসির ঐ আড্ডাটা বেশ গভীর প্রভাব ফেলেছিল সুমনার মনে। এতোবছর অনেকরকম মানুষদের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। তন্মধ্যে কাশেম নামক এই তরুণ ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। আসা মাত্রই আবহওয়া কেমন ভিন্নরূপ নিয়েছিল। অদ্ভুত নিয়ন্ত্রণশক্তি, নেতাসুলভ আচরণ, হাস্যরসপূর্ণ কথাবার্তা। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাহ্যিক সৌন্দর্য। সুমনা কেবল মুগ্ধ হয়ে দেখছিল লোকটাকে। পরিচয়ের সময় যখন কাশেম জিজ্ঞেস করল, 'কী নাম ম্যাডাম?'
সুমনার বুকের ভেতরের সেকি কম্পন। বারবার তুঁতলে যাচ্ছিল উত্তর দিতে গিয়ে। তারওপর কাশেমের সেই মেরে ফেলার মতো দৃষ্টি। বারবার বারবার কী অদ্ভুতভাবেই না দেখছিল ওকে। শরীর লোম প্রতিবারই দাঁড়িয়ে যাচ্ছিল একদম। সেদিন হলে ফিরে কাশেমের ভাবনাতেই বিভোর ছিল সুমনা। কীসব উথালপাতাল চিন্তা!!

•••••

এমপি কাদের হকের বড় ছেলে হল কাশেম হক। কাদেরের পাঁচ সন্তানের মধ্যে চতুর্থ সে। বড় তিনবোন আছে কাশেমের। ভাইটা ছোট। স্কুল লাইফ চট্টগ্রামে কাটলেও কলেজের সময় থেকে ঢাকাতেই আছে। ছাত্র হিসেবেও যথেষ্ট মেধাবী। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেতে খুব একটা অসুবিধা হয়নি। তবে পরিবারের ধারা অনুযায়ী ছোটবেলা থেকেই রাজনীতির প্রতি তীব্র এক ঝোঁক ছিল কাশেমের। ফলসরূপ ভার্সিটিতে যুক্ত হয়েই যোগ দেয় প্রভাবশালী এক ছাত্রসংগঠনে। সেই দলের একজন নামকরা নেতা এবং এমপি ছিল কাদের হক। সুতরাং দলে কাশেমের জায়গাটাই ছিল ভিন্ন রকমের। রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড এবং অসাধারণ লীডারশীপ থাকার ফলে সহজেই শক্তপোক্ত অবস্থান করে নেয় নিজের। কয়েকবছরের মধ্যেই ছাপিয়ে যায় সবাইকে। চব্বিশ বছর বয়সেই এতোবড় এক সংগঠনের সভাপতি সে তখন। তবে এতোকিছুর মাঝে কাশেমের অন্যতম দুর্বলতার জায়গা ছিল নারী। সুন্দরী নারী। এই এক জায়গাতে টিনএজ বয়স থেকেই নড়বড়ে কাশেম। একেতো ক্ষমতাবান বাপের বড়লোক ছেলে, সেইসঙ্গে ভীষণ মাত্রায় সুদর্শন হওয়াতে রূপবতী মেয়ে সহজেই ধরা দিতো তার হাতে। সুতরাং মেয়ের অভাব হতোনা কাশেমের। কিন্তু একপর্যায়ে এই পেয়ে যাওয়াটাই কাশেমের বদ অভ্যাসে পরিণত হল। সব পেতে পেতে খুবই ভয়ংকর এক ধারণা তৈরী হল, যেকোন মেয়েকে চাইলেই সে পেতে পারে। এটা তার অধিকার। সেইসঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল তার ক্ষমতাও। ক্যাম্পাসে দাদাগিরি, চাঁদাবাজি, এমনকি দুটো খু*নেরও রেকর্ড তৈরী হয়েছিল ঐ বয়সেই। ফলসরূপ তার নজর কাড়া মেয়ে সেচ্ছায় তার হাতে ধরা দিলে ভালো, অন্যথা নিজের লোক দিয়ে তুলে এনে ধ*র্ষ*ণ করতো সে মেয়েকে। এটা ছিল তখন ক্যাম্পাসের ওপেন সিক্রেট। সব জেনেশুনেও এসব বিষয়ে কেউ মুখ খোলার সাহসও পেতোনা। আশ্চর্যের ব্যপার হল তাদের দল তখনও রাজনৈতিক ক্ষমতায় ছিলোনা। তারপরেও সংগঠনের এতো দাপট আসন্ন নির্বাচনে মোর ঘুরে যাওয়ারই পূর্ব সংকেত ছিল।

সুমনার মতো কাশেমও সুমনার চিন্তায় বিভোর ছিল গোটা দিন। এমনিতেই সুন্দরী মেয়েদের প্রতি তার দুর্বলতা প্রখর। তারওপর ঐ সৌন্দর্য, ঐ চোখ, মুখ, ঠোঁট! সবকিছু মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছিল লোকটার। ইতিমধ্যে লোক লাগিয়ে দিয়েছে সুমনা সম্পর্কে সব তথ্য সংগ্রহের জন্যে। নজর যখন পরেছে তখন, মেয়েটাকে তার লাগবেই।

রাত তখন এগারোটা। চায়ের স্টলের বসে চা আর সিগারেট খেতে খেতে সঙ্গীদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিল কাশেম। এরমধ্যেই তার নিয়োগকৃত সেই লোক এসে যুক্ত হলো আড্ডায়। কাশেম দাঁতের মাঝে সিগারেট চেপে ধরে প্রশ্ন করল, 'খবর কী?'

লোকটা বলল, ' মেয়েটা আপনেগো চট্টগ্রামেরই ভাই। ইডেনের ইংরেজি বিভাগের ছাত্রী। ফাইনালটা দিলেই অনার্স শেষ হইব। তয়_'

'তয়?' ভ্রুকুটি করল কাশেম। সিগারেটেটা তখনও দাঁতের মাঝে আটকে।

'মাইয়াডা বিয়াইত্তা। একটা পোলাও আছে চাইর বছরের।'

চিন্তিত ভঙ্গিতে সিগারেটটা নামাল কাশেম। ধোঁয়া ছাড়র নাক দিয়ে। কপালে ইতিমধ্যে ভাজ পড়েছে একটা। পাশ থেকে একজন বলল, 'চিন্তা করতাছেন কিল্লিগা ভাই? বিয়াত্তা হইলেই বা কী? আপনাতো আর বিয়া করার লেইগগা পছন্দ করেন নাই।' 

বলার সঙ্গেসঙ্গেই বিশ্রী ভঙ্গিতে দাঁত বেড় করে হাসল। খবর নিয়ে আসা লোকটা জানাল, 'তয় কথা হচ্ছে গিয়া ভাই। মাইয়ার কিন্তু চরিত্র ভালা না। লাস্ট তিন বছরে কয়ডারে যে নাকে দড়ি দিয়া ঘুরাইছে তার ঠিক নাই। এহনতো কাহিনী আরও অনেকদূর গেছগা।'

কাশেম সপ্রশ্ন চোখে তাকিয়ে বলল, 'মানে?'

চেহারায় অশালীন এক অভিব্যক্তি ফুটে ওর তার। মিথ্যা ইতস্তত ভাব দেখিয়ে বলল, 'দুই একটার লগে শুইছে এরমধ্যেই। আগে শুইতোনা। ইদানিং শুরু করছে। গায়ে জ্বালা বাড়ছে মনে হয়। মানি বিয়াতো করছেই, তারওপর মাইয়াডা কিন্তু দুইএকটার খাওয়া মাল ভাই।'

ঠোঁটে কুটিল হাসি ফুটল কাশেমের। পাঁচ বছরের এক বাচ্চার মায়ের এই রূপ! ইন্টারেস্টিং! তবে মেয়ে খাসা! অমন মেয়ে খাওয়া হলেও আপত্তি নেই। সেসব ভাবনায় বিভোর থেকেই শওকত প্রশ্ন করল, ' ওর হাজবেন্ড কে?'

মনে করার চেষ্টা করল লোকটা। একটু ভেবে বলল, 'সেইভাবে ডিটেইলস জানিনা ভাই। তয় নাম হইল শওকত মির্জা।'

চেয়ারে হেলান দিয়ে পুনরায় খুব ধীরেসুস্থে সিগারেটটা মুখে পুড়ল কাশেম। নামটা তার বেশ চেনা!

•••••

সুমনার সঙ্গে কাশেমের সম্পর্ক তৈরী হতে বেশি সময় লাগেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের প্রায় নিয়মিত আড্ডায় ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে তাদের। প্রথমে গ্রুপে হলেও পরে নিজেরা একাকি দেখা করতে শুরু করে। দুজনেই দুজনের প্রতি ভীষণভাবে আকৃষ্ট থাকায় একমাসের মধ্যেই সম্পর্কটা অন্যরূপ নেয়। এবং দেড়মাসের মাথাতেই হোটেল রুমে স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে উঠে রাত্রিযাপনও করে তারা। এদিকে শওকত নিয়মিত টেলিফোন, অগনিত চিঠি। কোনটাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার প্রয়োজন মনে করেনা ও। অপরদিকে কাশেমের সঙ্গে সম্পর্কটাও ছিল কেবলই শরীরবৃত্তিয়। মানসিক কোন টান একেঅপরের প্রতি ছিলোনা বললেই চলে। তবে সুমনার এমন তথাকথিত বোল্ডনেস বেশ ভালো লাগতো কাশেমের। সবার চেয়ে ভিন্ন লাগতো!

১৯৯৪ সালের শেষদিকে সুমনার অনার্সের ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হলে চট্টগ্রামে ফিরতে অনেকটা বাধ্যই হয় ও। এছাড়া তখন আর কোন উপায় ছিলোনা। অকারণে ঢাকা পড়ে থাকতে পারবেনা সে। কাশেমের কাছ থেকে মোটামুটি একটা বিদায় নিয়েই নিয়েছিল সে। কাশেম যদিও চাইছিল আরও কিছুদিন খাঁচায় পুষতে। কিন্তু কী আর করার। চিরকালতো ধরে রাখার শখ তার নেই। তাই ছেড়ে দেয়।

সুমনার টেলিফোন পেয়ে শওকতই যায় ওকে নিয়ে আসতে। মনেমনে সেবার অনেককিছু ভেবে রেখেছিল শওকত। সুমনার দেওয়া আঘাতে তার মানসিক অবস্থার যে কী পরিমাণ অবনতি হচ্ছিলো তা কেবল সে-ই টের পাচ্ছিল। গোটা জগতের প্রতি কেমন নিরাসক্তি চলে আসছে তার। নিজের ছোট্ট ছেলেটা ছাড়া অন্যকোনকিছুর দিকে খেয়াল থাকেনা। তার এই বেখেয়ালে চরম অবনতি হচ্ছিল ব্যবসায়। ভাগ্যিস ঐসময় তার ছোট ভাই পলাশ ব্যবসায় হাত লাগিয়েছে। নয়তো সবদিক ডুবতো লোকটার। কিন্তু এভাবেতো বাঁচা যায়না আসলে। সুমনাকে ছাড়ার কথাও সে ভাবতে পারেনা। ভালোবাসে সে মেয়েটাকে প্রচন্ড। এতোকিছুর পরেও ভালোবাসে। 

শওকত খেয়াল করেছে, শানের জন্মের সময় সুমনা বদলেছিল। অনেকটা বদলেছিল। সেই আগের সুমনাকে দেখতে পেয়েছিল সে। মাতৃত্ব সবকিছু বদলে দেয়। শওকতের ধারণা এবারও তাই হবে। নিশ্চয়ই সুমনা আগের মতোই সন্তানের সংস্পর্শে এলে বদলে যাবে। আগেরবারের মতো এবারতো আর যাবেনা সুমনা কোথাও। তাই মনবদলেরও কারণ তৈরী হবেনা কোন। সুতরাং তাদের দ্বিতীয় সন্তান আবশ্যক। সে চেষ্টা অবশ্য এরমাঝেও কয়েকবার করেছে শওকত। কিন্তু প্রথমবারের মতো কাজ হয়নি। সুমনা দূরে থাকাতেই বোধহয় হয়েছে এমনটা। এখন সুমনা ওর কাছে থাকবে। এটাই সুযোগ। শেষ সুযোগ! সবঠিক হয়ে গেলে সুমনার অন্যায়কে ক্ষমা করে দিতে পারবে শওকত। মানসিক শান্তি এবং সুখের আগেতো কিচ্ছু না। 

সুমনা বাড়ি ফেরার সঙ্গে সঙ্গে ছোট্ট শান দৌড়ে এসে জাপটে ধরেছিল নিজের মাকে। কতইনা উৎসাহ আর আনন্দ চেঁচিয়ে উঠেছিল, 'মা' বলে। অথচ সুমনা খানিকটা ধরে ছাড়িয়ে নিল নিজেকে। শানের গালে হাত রেখে বলল, ' মা টায়ার্ডতো আব্বু। ফ্রেশট্রেশ হয়ে মা আসবে তোমার কাছে। এখন ডিস্টার্ব করেনা বাবা।'

বোনের আগমনে ভীষণ উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিল মিতা। কিন্তু এমন কথা শুনে চেহারার সব উচ্ছ্বাস হারিয়ে যায় ওর। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে নিজের বোনের দিকে। এতোমাস পরে নিজের ছেলেকে কাছে পেয়ে কোন মা এভাবে দূরে সরাতে পারে! এও সম্ভব? অথচ কিছুই হয়নি এমন এক ভাব করে ভেতরে দিয়ে ঠাস্ করে দরজা বন্ধ করে দেয় সুমনা। শওকতের অপেক্ষা অবধি করেনা। শান ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদে ফেলে। দৌড়ে এসে মিতার পেটে মুখ লুকিয়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদে। শওকত এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেরিয়ে যায়। বড্ড বেশি অসহায় সে তখন।

দিন কাটতে থাকে। প্রথমদিকে শানের প্রতি মোটামুটি নির্বিকার দায়িত্ব পালন করলেও, ধীরে ধীরে উদাসীন হতে থাকে সুমনা। সান্নিধ্যে না থাকায় শানের অত্যধিক কোন টান ছিলোনা সুমনার প্রতি। তবে একটা অদম্য কৌতূহল, আকর্ষণ, কাছে যাওয়ার চেষ্টা ছিল। কিন্তু সুমনা ছিল বরাবরই উদাসীন। মিতা না থাকলে ছেলেটার কপালেযে ভীষণ দুর্ভোগ ছিল তা নিয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। বোনের ওপর হতাশা, রাগ, বিরক্তির অন্ত ছিলোনা মিতার। এখন পুরোপুরি অবসর থেকেও সংসারের কুটো নেড়ে দুটো করেনা সে। যদিও তাতে সমস্যা হয়না, কাজের মহিলা আছে। কিন্তু তাই বলে এতো উদাসীনতা! সারাদিন সাজগোজ, আর গাড়ি নিয়ে হুটহাট বেরিয়ে যাওয়া। আধুনিক পোশাক, সাজ, চালচলনের সঙ্গে ঢাকা থেকে সুমনাযে গাড়ি চালানোও শিখেছে তা দেখে আরও বেশি অবাক হয় মিতা। এই কী তার সেই সহজ-সরল, শান্তশিষ্ট আপা!

এদিকে শওকত চেষ্টা করেও পারেনি সুমনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে। আগে মরে যাওয়ার ভয় দেখাতো। এখন সেসবেরও ধার ধারেনা। শওকত চেয়েও পারেনা সুমনার সঙ্গে খুব বেশি শক্ত ব্যবহার করতে। তা সত্যেও প্রায়ই ঝগড়া লেগে যায়। ভীষণ কথা কাটাকাটি হয়। সুমনা চলাচল, কোথায় কী করে বেড়াচ্ছে তা জানার চেষ্টা করেছিল শওকত। কিন্তু এসব টের পেলেই সুমনা ভীষণ তেঁতে উঠতো। বিশ্রী ব্যবহার করতো। একপর্যায়ে থেমে যেতে হয় শওকতকেই। ভয় তার একটাই। যদি ছেড়ে চলে যায়! বাঁচবে কীকরে সে? মানুষ সারাদিন কাজ করে ঘরে ফেরে শান্তির খোঁজে। অথচ তার ঘরটাই যেন তার সমস্ত অশান্তির মূল।তবে মনেপ্রাণে চেয়ে যাচ্ছে, কোনভাবে, জাস্ট কোনভাবে সুমনা সন্তানসম্ভবা হোক আবার। আগেরবারের মতো এবারও সেভাবে সবকিছু বদলে যাক। অমন মানসিক যন্ত্রণা সহ্য হচ্ছিলো না তার আর। জীবনধারণ অসম্ভব হয়ে যাচ্ছিল। একটু শান্তি প্রয়োজন। তা যেভাবেই হোক।

•••••

সুমনার বেপরোয়া চলাফেরা, শওকতের মানসিক যন্ত্রণা, মিতার শানকে নিয়ে মানিয়ে চলার মধ্যেই কয়েকমাস কেটে যায়। শওকত তখন অধীর আগ্রহে কেবল একটা জিনিস শোনার জন্যেই অপেক্ষা করতোযে সুমনা প্রেগনেন্ট। কিন্তু চেষ্টা করেও এমনকোন সুসংবাদ এখনোপর্যন্ত।

দেখতে দেখতে ১৯৯৫ সালেরও কটা মাস কেটে যায়। এরমধ্যে সুমনার অনার্সের রেজাল্ট দেওয়ার সময়ও চলে আসে। রেজাল্ট কলেজের নোটিস বোর্ডে টাঙিয়ে দেওয়া হবে। প্রথমে সুমনাই যেতে চেয়েছিল রেজাল্ট দেখতে। কিন্তু বাঁধ সাধে শওকত। প্রথমত ও চায়না সুমনা এখন আবার ঢাকা যাক। আরও একটা প্রধান কারণ হচ্ছে তখনকার দেশের অবস্থা। বেশ ঘনঘন হরতালের ডাক দিতো বিরোধী দল। অর্থাৎ কাশেম হক যে দলর এমপি। দাবী ছিল ছিয়ানব্বইর নির্বাচন হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। বিশেষ করে ঢাকায় রাজনৈতিক সহিংসতা, অবরোধ, সংঘর্ষ লেগেই থাকতো। সুতরাং এহেন অবস্থায় সুমনাকে ঢাকা ছাড়ার প্রশ্নই ওঠেনা। তাছাড়াও ব্যাবসার কাজে ঢাকা যাওয়ার দরকার ছিল তার। এক কাজে দু-কাজ হয়ে যাবে ভেবে নিজেই ঢাকা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। অদ্ভুতভাবে সুমনা কোনরকম হল্লা করেনি সেবার। মেনে নিয়েছিল শওকতের নিষেধাজ্ঞা। ব্যপারটা আশ্চর্যজনক হলেও মনে মনে খুশি হয়েছিল শওকত। ভেবেছিল, একটু হলেও বোধ হয় নরম হচ্ছে সুমনার মন। সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চারদিনের জন্যে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেয় শওকত।

শওকতের ঢাকা যাওয়ার দ্বিতীয়দিন বিকেলবেলা অনেকটা সুমনার ঘরে ঢুকল মিতা। সুমনা তখন বিছানায় মা মেলে মনের সুখে নেইলপলিশ লাগাচ্ছে নখে। মিতা গিয়ে বিছানার এক কোণে বসল। সুমনা নিজের কাজে ব্যস্ত থেকেই ভ্রুকুটি করে বলল, 'কী ব্যপার? তুই এখানে? শান কোথায়?'

' ঘুমায়।'

' কিছু বলবি?'

' হ আপা। একটা কতা কইতাম।'

সুমনা ধমকে বলল, ' ভাষা ঠিক কর! অশিক্ষিত নাকি তুই? আমার বরের টাকায়তো বেশ পড়ছিস। অথচ কথা বলিস গাইয়াদের মতো। বেশভুশাও তাই।'

মিতা মাথা নিচু করে বলল, 'ছোটকাল থিকাতো এমনেই কথা কইছি আপা।'

সুমনা কন্ঠে ঝাঁঝ ঢেলে বলল, 'ছোটবেলায়তো টিনের চালার নিচেও থেকেছিস। এখন যা থাক সেখানে। এই আলিশান ফ্ল্যাটে আছিস কেন?'

মিতা মাথা নিচু করে রইল। সুমনা ভীষণ বিরক্তি নিয়ে বলল, '‍কী বলবি বল!'

মিতা গলা ঝেড়ে বলল, ' আসলে সম্পার (মিতার একমাত্র ঘনিষ্ঠ বান্ধবী) বিয়ে কাল।আমাকে অনেক করে বলেছে আজ রাত থাকতে। কাল ওর বিদায়ের পরেই চলে আসবো। তুমি যদি অনুমতি দাওতো।'

নেইলপলিশ করা থামিয়ে সুমনা ভ্রু তুলে বলল, ' বান্ধবীর বিয়েতেই যাবি নাকি কোন নাগরের কাছে?'

মিতা চমকে উঠল। অপমানে লাল হয়ে মাথা নুইয়ে বলল, 'ছিঃ আপা! কীসব বলো! তুমি না বললে যাবোনা আমি।' 

সুমনা আবার নিজের কাজে মন দিয়ে বলল, ' যা যা। এমনিতেতো জীবনে এজয়মেন্ট বলতে কিছু নেই তোর। পুরাটাই নিরামিষ। কিন্তু শানকে নিয়ে যাস সঙ্গে করে। ছেলেটা বড্ড জেদি হয়েছে। কথায় কথায় বিরক্তিকর বায়না করে। রাতে শান্তিতে ঘুমোতে দেবেনা আমাকে।'

মনে মনে রাগ হলেও মুখে কিছু বলল না মিতা। চুপচাপ বেরিয়ে গেল। সুমনার কপালে বিরক্তির ভাজ পরেই রইল। মিতাকে আজকাল বেশ হিংসে হয় সুমনার। আগে খেয়াল না করলেও ইদানিং দেখছে, মেয়েটার বেশ রূপ খুলেছে। সৌন্দর্যে নিঃসন্দেহে সুমনাকে ছাড়িয়ে গেছে মিতা। সেটাই সহ্য হচ্ছেনা তার। ওর দৃঢ় বিশ্বাস শওকতের সঙ্গে নিশ্চয়ই কোন না কোন লটরপটর আছে মিতার। ও মাসের পর মাস কাছে থাকতোনা। শওকতের মতো জোয়ান পুরুষ ততমাস নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতো একথা সুমনা কস্মিনকালেও বিশ্বাস করেনা। 

আরেকটা বিষয় মাথা ঘুরছে তার। পলাশ মির্জা সাধারণত রাতে বাড়িতে কম থাকে আজও থাকবেনা। মিতা আর শানও থাকবেনা। তারমানে আজরাতে ফ্ল্যাটটা ফাঁকা থাকবে!!

•••••

মিতার বান্ধবী সম্পা মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। হলুদের অনুষ্ঠানটা ছোট করেই করছে। মিতা খুব ঘনিষ্ঠ বান্ধবী বলেই ওকে প্রায় জোর করে এনেছে। তবে বিয়ে বাড়িতে এসে বেশ বড় চমক পেল মিতা। যখন দেখল বশিরও আছে। পরে জানতে পারল, বশির আর কেউ নয় সম্পার বড় ভাই। কখনও সম্পার বাড়িতে আসেনি ও। শুধু জানতো সম্পার একটা ভাই আছে বড়। কিন্তু সে-যে বশির তা জানতোনা। আর মিতাও বশিরকে দেখতো কেবল বাড়ি আসার পথে। রাস্তা উল্টো হওয়ায় সম্পা থাকতোনা সঙ্গে। তাই সম্পাও জানতে পারেনি এ সম্পর্কে কিছু। বলেনি মিতাও। 

সাদা পাঞ্জাবিতে বেশ আকর্ষণীয় লাগছিল শ্যামরঙা বশিরকে। লম্বা গড়ন। চোখে চিকন ফ্রেমের একটা চশমা। এলোমেলো চুল। চোখভরা দুষ্টুমি। মিতার অমন অবাক দৃষ্টি দেখে মুচকি হেসে ভ্রু নাচাল বশির। দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল মিতা। শানকে নিয়ে সরে এলো দূরে।

গুরুজনরা যখন সম্পাকে হলুদ ছোঁয়াচ্ছিল, শানকে সামনে নিয়ে ওর গলার ওপর দিয়ে হাত পেঁচিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল মিতা। এরমধ্যেই ওর ঠিক পাশে এসে দাঁড়াল মিতা। চমকে উঠল মিতা। সরে যেতে নিলেই বশির বলে উঠল, 'পালাতে চাইলে কিন্তু গায়ে হলুদ লাগিয়ে দেব। সবার সামনে। আমার কিন্তু লাজলজ্জা একদমই নেই।'

ছোট্ট একটা ঢোক গিয়ে জায়গায় স্থির হয়ে বলল, ' কী চান?'

বশির অমায়িক হেসে বলল, ' আমার জোছনাকে।'

থমকে গেল মিতা। জোছনা! সে কে? বশির আবার অন্যকাউকে পছন্দ করে নাতো এখন! ভেতরে ভেতরে কান্না পেল মিতার। তবুও নিজেকে শক্ত রেখে বলল, ' আপনার জোছনা আমার কাছে কীকরে আসবে, বশির ভাই?'

' তুমিইতো আমার জোছনা।' ধীরকন্ঠে বলল বশির।

মিতা সারা শরীরে কেমন এক শিহরণ বইল। হঠাৎ বিষাদে থাকা মনটা অদ্ভুত অনুভূতিতে ভরে উঠল।এদিকওদিক তাকিয়ে লজ্জায় রাঙা হয়ে ওঠা মুখটাকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করল কেবল। ছোট্ট শান মাথা তুলে বোকার মতো কেবল দেখছে দুজনের কান্ড। বশির শানের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ' এই সুন্দর মিষ্টি বাচ্চাটা কার?'

মিতা মাথায় দুষ্টুমি খেলে গেল। শক্ত গলায় বলল, ' কার আবার? আমার কাছে আছে যখন নিশ্চয়ই আমার বাচ্চা।'

প্রতিক্রিয়ায় বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হলোনা বশিরের। উল্টে বলল, ' বাহ্। বউয়ের সঙ্গে সঙ্গে একটা ফুটফটে বাচ্চাও পেয়ে যাব দেখছি। কী সৌভাগ্য।'

মিতা অবাক চোখে তাকিয়ে বলল, ' আপনি পাগল? বিবাহিত একটা মেয়ের সঙ্গে এভাবে কথা বলেন!'

বশির হেসে বলল, ' তোমার সম্পর্কে খবর না নিয়েতো তোমাকে ভালোবাসিনি জোছনারাণী। তুমি বিবাহিত নও। এছাড়াও তোমাকে যেকোন অবস্থায় গ্রহন করতে পারব আমি।'

মিতা ভ্রু তুলে বলল, 'যেকোন?'

' যেকোন!' 

•••••

সুমনা ফার্স্টক্লাস পেল সেবার। রেজাল্ট দেখামাত্র খুশিতে উচ্ছ্বাসিত হয়ে উঠল শওকত। এই রেজাল্ট শুনলে নিশ্চয়ই সুমনার মন ভালো হয়ে যাবে। একবার ভাবল টেলিফোন করে জানাবে এই সুসংবাদ। সেইসঙ্গে ওর কাজযে দুইদিন আগেই শেষ হয়ে গেছে তাও জানাবে। পরে ভাবল, এতো ভালো খবর। সামনাসামনি একটা দারুণ সারপ্রাইজ দেওয়া উচিত। তার কাজতো শেষ, যাচ্ছেইতো আজই। যেই ভাবা সেই কাজ, কাউকে কিছু না জানিয়েই চট্টগ্রাম ফিরে এলো শওকত। নিজ এলাকায় আসতে আসতে রাত হল বেশ। জানতো বেল রাত হবে। তাইতো পথেই বড় একটা ফুলের তোড়া, চকলেট, আর একটা গলার হার কিনেছে সে সুমনার জন্যে। চমকে দেবে মেয়েটাকে।

নিজের ফ্ল্যাটে মর্টেস লক লাগিয়েছিল শওকত মির্জা। চাবিও ছিল তারকাছে। সারপ্রাইজ দেওয়ার পরিকল্পনা করায় যথাসম্ভব কমশব্দে দরজা খুলল সে। বেডরুমগুলোর দরজা বন্ধ। মিতা নিশ্চয়ই ঘুমোচ্ছে শানকে নিয়ে। পলাশ বোধহয় নেই। সুমনা এতো তাড়াতাড়ি ঘুমোয় না। কখনও কখনও ঘুমিয়ে যায়। দেখা দরকার। শওকত প্রায় পা টিপে টিপেই পৌঁছলো দরজার কাছে। মোচড় দিয়েই বুঝল ভেতর থেকে লাগানো নেই। জেগে থাকলেও যাতে টের না পায় তাই খুব ধীরে একটু একটু করে দরজাটা ফাঁক করে ভেতরে উঁকি দিল শওকত। এবং যা দেখল তাতে পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল তার। জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা খেল সে সেদিন। 

শওকত হতবাক হয়ে দেখল, তারই বেডরুমে, তারই বিছানায় অন্য এক পুরুষের সঙ্গে সঙ্গমে লিপ্ত হয়ে আছে তার প্রাণপিয় স্ত্রী। একে অপরকে খুব গভীরভাবে আদর করছে। যেন একে অপরের সম্পূর্ণ কামবাসনা যেন উজার করে দিচ্ছে তারা। শওকতের শরীর জমে গেল। মনে হল যেন থেমে গেছে হৃদস্পন্দন।

হঠাৎই সুমনার গলার আওয়াজ পেল শওকত। লোকটাকে বলছে, ' ওটা এনেছো?'

জবাবে লোকটা বলল, ' ওটার কী দরকার। ঔষধ খেলেইতো পারো।'

' পাগল তুমি! এই বাড়িতে ঔষধ খেলে শওকত আস্ত রাখবেনা। যদিও নেই এখন। কিন্তু এখন ঐ বা* কিনতে আমি সকালে বের হব? পরে নাও ঐটা! আর হ্যাঁ, রাতেই চলে যেও। সকালে গেলে কারো না কারো চোখে পরে যাবে।'

কথাটা বলে হতাশ শ্বাস ফেলল সুমনা। লোকটা নিজের কাজ করতে করতে সুমনা বলল, ' তবে মনে হয়না এখন আর ঔষধ না খেয়ে পারব। এইনিয়ে তিনটা বাচ্চা নষ্ট করেছি। শেষে জান নিয়ে টানাটানি হবে আমার।'

শওকতের নিঃশ্বাস সত্যিই আটকে এলো এবার। তাল সামলাতে ভয়ংকর কষ্ট হলো। সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে ওর। বুকে কী অসম্ভব চাপ! এ কেমন ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন! এদিকে তার স্ত্রী এখন সেই পুরুষের সঙ্গে মিলনে ব্যস্ত। 

গা গুলিয়ে বমি পেল শওকতের। কোনরকমে দরজাটা ভিড়িয়ে বেসামাল পায়ে বেরিয়ে এলো শওকত। হাতে তখনও সেই ফুল, গিফ্ট। টালমাটাল পায়ে বিল্ডিংটা থেকে বেরিয়ে বেশ অনেকটা পথ উদ্ভ্রান্তের মতো হাঁটল। কতক্ষণ হাঁটল জানেনা সে। একপর্যায়ে রাস্তার একপাশে এসে প্যাকেটা সাইডে ফেলল শওকত। একটা গাছ ধরে হরহর করে বমি করে দিল। বমি করে একটু এগিয়ে রাস্তার পাশেই বসে পড়ল সে। নিঃশ্বাস নিতে পারছেনা। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। চারপাশটা কেমন অদ্ভুত ঘোলাটে লাগছে। কেমন দমবন্ধকর এক বিভ্রম। চারপাশটা যেন বনবন করে ঘুরছে। জোরে শ্বাস নিতে নিতে উন্মাদের মতো নিজের ব্যাগটা হাতরে পানির বোতল বের করে পানি খেল। অর্ধেকের বেশি পানি নিচে পড়ল। বোতলটা একপাশে ফেলে রেখে এলোমেলো দৃষ্টিতে এদিক ওদিক তাকাতেই চোখে পড়ল ফুলের সেই তোড়া, গিফটের সেই ব্যাগ। দুকদম হামাগুড়ি দিয়ে সেখানে পৌঁছলো শওকত। ফুলের তোড়টা দুহাত দিয়ে টেনেটেনে ছিন্নভিন্ন করে ফেলল ফুলগুলো। হারটা দুখন্ড করে ছুড়ে ফেলল অলক্ষ্যে। বড় চকলেটের প্যাকেটটা দুহাতে চেপে চূর্ণবিচূর্ণ করে ফেল ঠিক তার এইমুহূর্তের হৃদয়ের মতো। বিনষ্ট করার কাজ সম্পন্ন করে হু হু করে কেঁদে ফেলল শওকত। নিস্তব্ধ রাস্তায় তার কান্নার শব্দ ভীষণ করুণ আর ভয়ানক শোনাল। টের মাথাটা বড্ড বেশি ব্যথা করছে। ভয়ংকর ব্যথা।

জীবনের ঐ ভয়ঙ্কর দুটো ঘন্টা রাস্তার পাশে, মাটিতে বসেই কাটিয়ে দিল শওকত। এখন কাঁদছে না। মাথা ব্যথাটাও নেই তেমন, হালকা চিনচিন করছে কেবল। চেহারা কেমন অদ্ভুত এক শক্ত ভাব তার। যে লোকটার সঙ্গে সুমনা আজ ছিল তাকে চিনেছে শওকত। এই এলাকার মেয়রের ছেলে। সরকারি দল করে। যখন সে রাজনীতি করতো বেল দ্বন্দ্ব ছিল দুজনের। বর্তমানের এখানকার রাজনীতিতে বেশ প্রভাব আছে এর। কাদের হকের গলার কাঁটা হয়ে আছে সে। এই কবছরে দুবার শওকতের ডাক এসেছিল একে সরানোর বিষয়ে আলোচনায়। কিন্তু রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ায় এদিকে যাওয়ার কথা ভাবেইনি শওকত। এই দুইঘন্টায় মাথা বিগড়ে গেছে শওকতের। ভয়ংকরভাবে বিগড়ে গেছে। হঠাৎ ওর মাথায় বেজে উঠল "রাতেই চলে যেও।" 
দ্রুত উঠে দাঁড়াল শওকত। ফিরে গেল নিজের বিল্ডিং গ্যারেজে। নিজের গাড়ির ডিকি খুলে ধারাল একটা ছুরি বের করল। এরপর হনহনে পায়ে পুনারায় রাস্তায় বেরিয়ে গেল। শওকতের বাড়ি থেকে মেয়রের বাড়ি অবধি পৌঁছনোর রাস্তার মাঝামাঝি খুবই নির্জন, অন্ধকারপূর্ণ রাস্তায় গিয়ে ঘাপটি মারল সে। ঠিক যেন মৃত্যুস্থলে অপেক্ষমান আজরাইল! 

শওকতকে অপেক্ষা করতে হল অনেক লম্বা একটা সময়। তবে লম্বা সময়টা তার কাছে মোটেও লম্বা মনে হলোনা। কেমন অদ্ভুত ঘোর আর অনিয়ন্ত্রিত চিন্তাভাবনায় সময় কেটে গেল বুঝতে পারল না সে। শওকতের ঘোর কাটল মোটরবাইকেল আওয়াজে। শওকত জানে এটা কে। নিজেকে প্রস্তুত করল সে। চেহারায় কেমন অদ্ভুত হিংস্রতা খেলছে তার। ছোরাটা ইতিমধ্যে প্যান্টের পেছনে প্যান্টের সাথে শার্টের আড়ালে গুজে নিয়েছে। শীতল চলনে রাস্তার ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে গেল শওকত। দৃঢ় কোন পাহাড়ের মতো।

শেষরাতে, চলতি পথে রাস্তার মাঝে এমন একজনকে দন্ডায়মান দেখে চমকে উঠল লোকটা। বাধ্য হয়েই থামাতে হল তাকে। এলাকায় প্রভাব তার ব্যাপক। মেয়রের ছেলে বলে কথা। সবাই বেশ সমঝে চলে। চালচলনও সেকারণে ভীষণ লাগামছাড়া। খুন, গুম, লুট, চাঁদাবাজি, এমনি বাড়িতে একা পেয়ে গৃহবধুকে ধ*র্ষ*ণসহ সবটাই করেছে। একবার মনে হয়েছিল তার কোন শত্রু কি-না। কিন্তু আজরাতেযে সে সুমনার কাছে যাবে সেটাতো কারো ঘুনাক্ষরেও জানার কথা না। কোন পাগল, চোর বা নেশাখোর বোধহয়। অশ্রাব্য এক গালি ছেড়ে নামল। 
' কীরে শু**র পয়দা। মরবি নাকি তুই?'

কথাটা বলে তেড়ে আসতে আসতেই হেডলাইটের আলোয় দেখতে পেশ শওকতকে। থমকে দাঁড়িয়ে গেল লোকটা। বিষ্ময়ে কিছু বুঝে ওঠার আগেই তেড়ে এলো শওকত। প্রতিরক্ষার জন্যে নিজের সঙ্গে রাখা পিস্তল বের করতেই যাচ্ছিল কিন্তু আগেই প্রথম ছো*রার আঘাতটা পড়ল। হাতের শিরাসহ কেটে গেল। সেই আঘাতে অনুভূতি মস্তিষ্কে পৌঁছনোর আগেই দ্বিতীয়বার ছু*রিটা ঢুকল পেটের মধ্যে। গোঁত করে শব্দ করে উঠল লোকটা। ছো*রাটা গাঁথা অবস্থাতেই লোকটার পিস্তল দূরে ছুড়ে ফেলল শওকত। ঘাড় ধরে দ্বিতীয়বার বসাল ছোরাটা। একইভাবে শব্দ করল লোকটা। বিষয়টা এতোটাই দ্রুত ঘটল যে কিছু বোঝার সময় পাইনি সে লোক। যখন বুঝল তখন কিছু করার সুযোগই পেলোনা সে। শওকত ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, 'অন্যের বউয়ের সঙ্গে শোওয়ার অনেক মজা তাইনা বাইন**। চিরকালের মতো শুয়াবো দেব আজ তোকে।'

বাক্যটা শেষ করতে করতে পরপর কয়েকবার লোকটার পেটের মধ্যে ছু*রি ঢুকিয়ে দিল শওকত। প্রতিবারই গোঁত গোঁত শব্দ করল লোকটা। রক্ত ছিটে আসলো শওকতের শার্টেও। শওকত ছাড়তেই লোকটা লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। বিকৃত আওয়াজ করে মোচড়াতে শুরু করল। কিন্তু শওকত তাতেও থামল না। সেও ঝুঁকে বসল লোকটার সামনে। রক্তমাখা ছু*রিটা গলায় চেপে ধরে টান দিল শওকত। পরপর দুইবার। বিকৃত ভঙ্গিতে হাসল শওকত। ঐ অবস্থায় শওকতকে দেখলে যেকারো রুহু কেঁপে উঠতো। মুখ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এলো লোকটার। শওকত শেষ প্রহার করল ঠিক বুকের মাঝ বরাবর। অর্ধেকের বেশি ছু*রিটা গেঁথে গেল ভেতরে। ততক্ষণে নিথর হয়ে গেছে এমপির ছেলে। শেষে প্রহারে খানিকটা কেঁপে উঠে প্রাণত্যাগ করল সে।

•••••

দরজায় করাঘাতের আওয়াজে ভ্রু কোঁচকালো কাদের হক। এখনো ফজরের আজানও দেয়নি। কে এলো এই মুহূর্তে! আওয়াজের তার স্ত্রীও উঠে বসে আঁচল টানল মাথায়। হাঁক দিয়ে উঠে লুঙ্গিতে ঠিকভাবে গিঁট দিল কাদের। দরজাটা খুলতেই দেখল দারোয়ান দাঁড়িয়ে আছে। সে কিছু বলার আগেই দারোয়ান বলল, ' শওকত মির্জা সাব আইছে মালিক। বৈঠক ঘরে বসাইয়া রাখছি তারে।'

একটু নয়, অনেকটাই অবাক হয়েছে কাদের। শওকত এসেছে! তাও এই সময়! দ্রুতপায়ে বসার ঘরের দিকে পা বাড়াল সে। গিয়ে দেখল শওকত কেমন থম মেরে বসে আছে চেয়ারটাতে। মুখভঙ্গি কেমন অদ্ভুত লাগছে। লালচে চোখ, শরীরটা কেঁপে উঠছে থেকে থেকে। কাশেম গিয়ে বসল আরেকটা চেয়ারে। অথচ শওকত তখনও প্রতিক্রিয়াহীন। কাদের নিজেই জিজ্ঞেস করলেন, ' কী হইছে? এইসময়! কোন সমস্যা?'

কিছুক্ষণ চুপ থাকল শওকত। অতঃপর খুব ধীর গলায় বলল, 'মেয়রের বড় ছেলেটাকে নিয়ে ঝামেলায় ভুগছিলেন না?'

কাদের হতাশ হয়ে বলল, ' হ ভুগতাছিতো। শু**রটা বেশি জ্বালাইতাছে। কাশেম আসুক বাড়ি! সামনের নির্বাচনের আগেই ওইটার ব্যবস্থা করা লাগব। নাইলে বিপদে পরমু। শালার যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্ডারে নির্বাচন না হয় তাইলে নির্বাচনে বহুত ঝামেলা করব এডি। আমরা কিছুই করতে পারুম না শ্যাষে আগেরবারের মতোই অবস্থা হইব। কিন্তু তুই এইসব জিগাস কেন? তুইতো না-ই কইরা দিছিলি।'

শওকত শীতল চোখে কাদেরর দিকে তাকিয়ে বলল, ' খু*ন করে ফেলেছি ওকে আমি। একটু আগেই।'

কাদের কেঁপে উঠল। বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে থাকল শওকতের দিকে। শওকতের দিকে তাকিয়ে বলল, 'লা*শটা কোথায় আছে বলে দিচ্ছি। আপনি আপনার লোক দিয়ে ব্যবস্থা করুন ওটার। আমার নাম যেন কোনভাবেই সামনে না আসে। ওকে মেরে আপনাদের উপকার করেছি আমি। তারবদলে এইটুকু সাহায্যতো পাব?'

শওকত বিস্ময় নিয়ে বলল, ' পোশাকআসাক দেইখাতো...'

' বদলে ফেলেছি। রাস্তায় কারো চোখে পড়ে গেলে বিপদে পরতাম তাই। রক্তমাখা জামাটা এই ব্যাগেই আছে। দেখাবো?'

' থাক! থাক! তা মারলি কেন?'

শক্ত হয়ে উঠল শওকেতের চোয়াল, 'তা আপনার না জানলেও চলবে। যা বলেছি তা করতে পারবেন?'

বিস্ময় কাটিয়ে হেসে ফেলল কাদের, 'তুই খালি জায়গাটা ক। বাকি দায়িত্ব সব আমার।'

শওকত বলল, 'বাকি রাতটা আপনার বাসায় থাকতে চাই। কাল দুপুরের পর চলে যাব। সম্ভব হবে?'

কাদের উৎসাহিত হয়ে বলল, ' সম্ভব হইবনা মানি! তুই ফ্রেশ হ আমি রুম সেট করতাছি তোর লেইগ্গা। শান্তিতে ঘুম দে একটা।'

শওকত ক্লান্ত পায়ে উঠে চলে গেল বাথরুমের দিকে। খু*নটা করার পর শরীরটা হালকা লাগছে তার। মাথাটা ঠান্ডা লাগছে। মনে হচ্ছে এতোগুলোদিন যাবত মন-মস্তিষ্কে চেপে থাকা বোঝাটা যেন একরাতেই নেমে গেছে।

•••••

সুমনার প্রতি প্রেম কিংবা ভালোবাসার অনুভূতি সেদিনই মরে গেল শওকতের। পরদিন বাড়ি ফেরার পর বেশ স্বাভাবিক ব্যবহারই করল সুমনার সঙ্গে। সুমনা একদিন আগে ফিরে আসার কারণ জিজ্ঞেস করলে জানাল কাজ শেষ হয়ে গিয়েছিল। সুমনার ফলাফলও জানাল। আল্হাদে শওকতকে যখন সে জড়িয়ে ধরল শওকতের ইচ্ছা করছিল গলাটা টিপে মেয়েটাকে সেখানেই মেরে ফেলতে। কিন্তু শওকত করতে পারেনি তা। ঐদিন রাতে যখন সুমনা ঘুমিয়ে পড়ল। শওকত একটা ছু*রি হাতে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ বসে রইল সুমনার ঘুমন্ত শরীরের পাশে। কয়েকবার চেষ্টা করেও পারল না সুমনাকে খুব করতে। মনে তীব্র ঘৃণা, আক্রোশ। কিন্তু কীসে ঠিক আটকাচ্ছে বুঝল না শওকত।

এরমধ্যেই মেয়রের ছেলের নিখোঁজ হওয়া খবরে এলাকায় তোলপাড় শুরু হয়ে গেল। পাঁচদিন পর পাওয়া গেল সেই ছেলের পঁচা লাশ। পেট ফেঁ*ড়ে নদীতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল লাশটা। পাওয়া গেছে অবশেষে। শওকত অবাক হয়ে দেখল, পুরো বিষয়টাতে সুমনা কতটা নির্বিকার। কিচ্ছু যায় আসেনা তার! যেই মেয়েটাকে পাশে নিয়ে সে সংসার করছে সে মেয়েটা এতো জঘন্য, নিকৃষ্ট চিন্তা করলেই ঘৃণার সারা শরীর তিক্ত হয়ে ওঠে তার।

আরও কয়েকদিন কেটে যায়। এরমধ্যে কয়েকবার সুমনাকে মে*রে ফেলার চেষ্টা করেছিল শওকত। কিন্তু পারেনি। এপর্যায়ে সে বুঝতে পারে দুর্বলতা আসলে তার পুরুষত্বে। সে তার স্ত্রীকে খুন করতে পারবেনা। ছাড়তেও পারবেনা। কিন্তু ঐরকম মহিলার সঙ্গে সরকার করার অসহ্য যন্ত্রণাও সইতে পারবেনা। ভয়ংকর মানসিক রোগ। সেইসঙ্গে শওকত এটাও খেয়াল করল যে সেদিন সেই খু*নটা করার সঙ্গে সঙ্গে খু*নটা করে মানসিক তৃপ্তি পেয়েছিল সে। পরবর্তীতেও নিশ্চয়ই পাবে! সে সঙ্গেসঙ্গেই যোগাযোগ করে কাদের হকের সঙ্গে। তাকে জানায়। নির্বাচনের বেশ কয়েকমাস বাকি। এরমধ্যে দলের হয়ে যতগুলো খু*ন করতে হবে সবগুলোর কনট্রাক্ট যেন তাকে দেওয়া হয় সে করবে। ফ্রিতে করবে বললে ধপে টিকবেনা। তাই বিনিময়ে যথেষ্ট টাকা দিলেই হবে বলে শওকত। কাদেরও রাজি হয়ে যায়। তারজন্যেতো মেঘ না চাইতেই জল। সত্যিই শওকত দেখল খু*ন করে অদ্ভুত তৃপ্তি পাচ্ছে সে। নৃশংস খু*ন। অদ্ভুত মানসিক শান্তি। প্রতিটা মারণ আঘাত যেন সে সুমনাকেই করছে। প্রতিবার যেন সে সুমনাকেই খু*ন করছে। এরচেয়ে শান্তি আর কোথায়? এছাড়াও প্রতিরাতে মধ্যপান, বিভিন্ন নেশা করে করে ধীরে ধীরে নিজের স্বস্তির জায়গা তৈরী করে নিয়েছিল শওকত। শওকতের এই পরিবর্তন নিয়ে সুমনা তেমন মাথা না ঘামালেও মিতা বেশ অবাক হচ্ছিলো। কিন্তু ওর করার কিছুই ছিলোনা। শানকে এসব থেকে সরিয়ে রাখা ছাড়া।

এভাবেই আরও আড়াইমাসের মতো কেটে গেল। এরমধ্যেই জানা গেল সুমনা প্রেগনেন্ট! ব্যপারটা চরম অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল। বাড়িতে জানানোর আগে এবারও এবরশন করাতে হাসপাতালে ছুটেছিল সুমনা। কিন্তু ডক্টর পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিল সম্ভব না এবার আর। সুমনার লাইফ রিস্ক আছে। সুতরাং বাধ্য হয়েই বাচ্চাটা রাখার সিদ্ধান্ত নেয় সুমনা। এবং এবার বাড়িতে জানায়। কিন্তু এইবার সন্তানটা শুধু সুমনার জন্যে নয়, শওকতের জন্যেও অনাকাঙ্খিত ছিল। নেশা করে বাড়ি ফেরার পর নিয়ন্ত্রণ থাকতোনা নিজের ওপর। শরীরের টানে মাঝেমাঝেই ঘনিষ্ঠ হত সুমনার সঙ্গে। কিন্তু বাচ্চা! এই নারীর গর্ভে নিজের আর কোন সন্তান চায়নি সে। অর্থাৎ বাবা-মা কেউই চায়নি এই সন্তান। অনেকটা জোর করে, বাধ্য করেই যেন পৃথিবীতে আসছিল সে।

শওকত মন থেকে কখনই মানতে পারতোনা এই বাচ্চাকে। হ্যাঁ এটা তারই সন্তান। কারণ এইকয় মাসে অন্যকোন পুরুষ আর আসেনি সুমনার কাছে। কিন্তু মস্তিষ্ক সত্যিটা জানলেও শওকতের মন এই সন্তানকে মেনে নিতে বরাবরই নারাজ ছিল। 
এদিকে ঘটে আরেক কান্ড। সুমনা বিজনেসে বসার দাবি করে ওঠে। শওকতের মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় ছিলোনা। কারণ অনেক আগেই অতি পত্নী প্রেমে নিজস্ব বিজনেসের ভাগটা বউয়ের নামে লিখে দিয়েছিল সে। তবে নতুন একটা প্রাণের আগমনের বার্তায় মিতা এবারও বেশ খুশিই ছিল। ভেবেছিল আবার বোধহয় সব ঠিকহবে।

•••••

দিন কাটছিল এভাবেই। এরমধ্যেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছে মিতা। এতে যদি সবচেয়ে বেশি কেউ খুশি হয়ে থাকে, হয়েছিল বশির। কারণ সে নিজেও একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আগে মাঝেমাঝে দেখা হলেও এরপর দেখা শুরু হল প্রতিদিন। মিতা এমনিতেই বশিরের দিকে ঝুকে গিয়েছিল অনেকটাই। ছেলেটার অমন চাহনী, হৃদয়গ্রাসী নিবেদন বেশিদিন ফেরাতে পারেনি ও আর। যদিও মুখে সরাসরি বলেনি। তবে সয়ংক্রিয়ভাবেই চমৎকার প্রেমের সম্পর্কের শুরু হয় ওদের মধ্যে।

এদিকে সুমনার প্রেগনেন্সি খুব কম্প্লিকেটেড চলছিল। মিতা সবদিক দিয়ে খেয়াল রাখার চেষ্টা করলেও শওকত ছিল বেশ উদাসীন। সুমনা একটু অবাক হতো ঠিকই, কিন্তু একথা ভেবে স্বস্তিও পেতো যে পাগলের মাথা থেকে পাগলামি নেমেছে। নয়তো ওর প্রথম প্রেগনেন্সিতে কী একটা সেকেন্ডও ঐ লোকের জন্যে শান্তি পেতোনা সুমনা। আঠার মতো লেগে থাকতো সাথে। এবার বাঁচা গেছে। অথচ মিতা বুঝে ফেলেছিল শওকতের মনে সুমনার প্রতি কোন ভালোবাসা আর নেই বোধহয়। শওকত অনৈতিক কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে তাও বুঝতো। আফসোস হতো ওর এটা ভেবে যে কী অমূল্য জিনিস হারিয়ে ফেলল তার বোন।

১৯৯৬ সালের ১৫-ই জানুয়ারি জন্ম দেয় শওকত-সুমনার আরেক সন্তান। ভীষণ সুন্দর, ফুটফটে এক কন্যা সন্তান। বাচ্চাটা ছিল প্রি-ম্যাচিওর। ডেলিভারি বাসায় হলেও ডক্টর দেখানোর দরকার হয়। কিন্তু সেসবের তোয়াক্কা না করে সেদিনই নিজের কাজে ঢাকার উদ্দেশ্য বেরিয়ে যায় শওকত। ঠিকভাবে তাকিয়েও দেখেনা নিজের সদ্যজাত মেয়েকে। যেন এ তার সন্তান নয় অন্যকারো আবর্জনা। শেষমেশ মিতাই দারোয়ানের সাহায্যে সুমনা আর সদ্যজাত বাচ্চাকে নিয়ে হাসপাতালে যায়। রাস্তা থেকে বশীরকেও তুলে নেয় সাহায্যের জন্যে। 

•••••

নির্বাচন আসন্ন। মাত্র একমাস বাকি। সারাদেশের অবস্থা তখন খুবই উত্তপ্ত। সরকার নিজেদের অধীনেই নির্বাচন করার সিদ্ধান্তে তখনও অটল। অর্থাৎ গন্ডগোল আরও ভয়ংকর হবে। যদিও শওকত সরাসরি রাজনীতিতে জড়িয়ে নেই এখন। তবে কাদের হকের হয়ে ছোটখাট কাজ সে করে। সেরকমই এক কাজে গুলশান গিয়েছিল সে সেদিন। সোলার সিস্টেমের সঙ্গে অস্ত্রবিষয়ক ডিলের একটা মিটিং। রফিক আমের সেদিন ছিলেন না মিটিংয়ে। এলেন রাশেদ আমের। বহুবছর পর লোকটাকে দেখল শওকত। প্রথমবারের চেয়েও বেশি মুগ্ধতা কাজ করল তার। সেই তেজ, চলনের ধার, কন্ঠের বজ্রতা যেন আরও বেড়েছে।

রাশেদ নিজের চেয়ারে বসে হাত মেলাল শওকতের সঙ্গে, 'অনেকদিন পর দেখা হল। শুনেছিলাম বিয়ে করে সব ছেড়ে দিয়েছিলেন। আবার এপথে যে?'

শওকত খানিক চুপ থেকে বলল, ' লম্বা গল্প। আপনি করেছেন বিয়ে?'

রাশেদ অমায়িক হেসে বলল, ' এপ্রিলে আমার ছেলের বয়স পাঁচ হবে। ওর নাম রুদ্র!'

'বাহ্ ভালো।'

রাশেদ মাথা নেড়ে বলল, ' কাজের কথায় আসি। কতগুলো লাগবে? আর কী কী?'

শওকত ব্যাখ্যা করল। নির্বাচনের আগে এবং নির্বাচনের দিনে ওখানকার সম্ভাব্য ঝামেলার কথা উল্লেখ করে নিজের প্রয়োজন জানাল। সিগারেট টানতে টানতে সবটাই শুনলো রাশেদ। মাথা নেড়ে বলল, ' ডান! কিন্তু কথা হচ্ছে যদি সরকার নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকে, তাহলে নির্বাচন দু'বার হওয়ার চান্স ব্যপক। সরকার ছাড়া কোনদলই অংশগ্রহণ করবেনা। এবং একতরফা নির্বাচন ভ্যালিড হবেনা।'

শওকত ভ্রু কুঁচকে বলল, 'জ্যোতিষি নাকি?'

হেসে ফেললেন রাশেদ। বললেন, ' রাষ্ট্রের পতাকা যাদের হাতে থাকে ক্ষমতা আসলে তাদের হাতে থাকেনা শওকত সাহেব। ক্ষমতা তাদের হাতেই থাকে যারা সিস্টেমের বাইরে থেকেও সিস্টেম চালায়। আন্ডারওয়ার্ল্ডের পাওয়ার আপনি বাইরে থেকে বুঝবেন না। তবে যদি চানতো যুক্ত হতেই পারেন এই জগতে। আপনাকে আমার পছন্দ হয়েছে। সুতরাং সোলার সিস্টেমের সহযোগিতা সবসময়ই পাবেন।'

শওকত সরু চোখে তাকিয়ে রইল রাশেদের দিকে। গভীরভাবে ভাবছে রাশেদের বলা কথাগুলো।

•••••

শওকত ও এবং সুমনার মেয়ের নাম রাণী রাখা হল। রাণী মির্জা। নাম রাখার খুব বেশি চিন্তাভাবনার ঝামেলায় যায়নি ওর বাবা-মা। এবারও সেই একই ঘটনা ঘটল। সুমনা কোনভাবেই চব্বিশ ঘন্টা বাচ্চার ঘ্যানঘ্যান নিতে নয়। শওকতকেযতো সারাদিন বাড়িতে পাওয়াই মুশকিল। রাত করে আসে তাও কখনও মাতাল, কখনও ক্লান্ত। সুতরাং এবারও বাচ্চাটার দায়িত্ব মিতাকেই নিতে হল। সময়মতো ব্রেস্টফিডিং করাতে হতো সেটাই যেন সুমনার কাছে ছিল সবচেয়ে অসহ্য কাজ। বাধ্য হয়ে করা। তাও প্রথম ছয়মাসই করালো। এরপর চলে গেল নিয়মিত অফিস করতে। আর কখনও ভুল করেও ব্রেস্ট ফিডিং করায়নি সুমনা ওকে। হুট করে ছাড়িয়ে দেওয়ায় বাচ্চা মেয়েটা শুরুতে ভীষণ কান্না করতো। অন্যকিছু খেতে চাইতোনা, বমি করতো। অথচ এসব কিছু দেখার সময় সুমনা কিংবা শওকত কারোরই ছিলোনা। তাই সব দায়িত্ব মিতাই তুলে নিল নিজের কাঁধে। যেদিন ইউনিভার্সিটি যেতো সেদিন ঐসময়টুকুর জন্যে কাজের মহিলার কাছে রেখে যেতো। এভাবেই চলছিল দিন।
সবাই রাণী বলে ডাকলেও মিতা রাণীকে প্রিয় বলে ডাকতো। মিতার এক বান্ধবী ছিল আসমা। যার স্বামীর নাম নুরুল ইসলাম। প্রিয়তার জন্মের একমাস আগেই ওদের প্রথম মেয়ে হয়। প্রথম বাচ্চা হওয়ার পর মিতার কাছেই নাম চেয়েছিল সে। মিতা লেখালেখিতে ভালো ছিল তাই। মিতা সেই মেয়ের নাম দিয়েছিল প্রিয়তা। কারণ নামটা ওর প্রিয়। যদিও শুনেছি জন্মের পর থেকেই সেই মেয়েটা অসুস্থ। তবে রাণীকৈ প্রিয়তা নামে ডেকে বেশ শান্তি পায় ও।

•••••

রাশেদ আমেরের প্রেডিকশন ঠিক ছিল। সরকার নিজ অধীনে নির্বাচন করায় সবগুলো দলই বর্জন করেছিল নির্বাচন। ফলসরূপ ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হলেও তা গ্রহণযোগ্য হয়না। ফলসরূপ মার্চে পুনরায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়। এবং সেই নির্বাচনে এবার বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছিল কাদের হকের সেই দলই। এবং সেই পুনরায় এমপি হয় সেখানকার। নির্বাচনে জয়ের পরে কাশেম হকও ফিরে আসে চট্টগ্রাম।
দীর্ঘদিন দূরত্বে থাকা কাশেম আর সুমনার সম্পর্কটা আবার ঘনিষ্ঠ হতে থাকে। এদিকে সেসবে কোন নজর ছিলোনা শওকত। সে তখন শুধু এবং শুধুমাত্র নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত। নিজের বিশ্বস্ত কিছু মানুষ নিয়ে একটা দল তৈরী করেছে ইতিমধ্যে সে। অবৈধ অস্ত্রগুলো সাপ্লাই করবে এই দল। সোলার সিস্টেমের সঙ্গে ছোট্ট একটা চুক্তি এবং সাহায্যের মাধ্যমেই এই যাত্রা শুরু। এবং এই ব্যবসা থেকে কাদের এবং কাশেমকে সহযোগিতা এবং বদলে শেল্টার চেয়ে কাজের জায়গাটা আরও বেশি পোক্ত করে সে। এদিকে ব্যবসার কাজ সুমনা পলাশকে নিয়ে দেখাশোনা করে। সেইসঙ্গে কাশেমের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কটাও চালিয়ে যায় সবার অলক্ষ্যে।

•••••

ডিসেম্বর মাস তখন। কনকনে শীত। ক্লাস শেষে বিকেলে ক্যাম্পাসের নিরিবিলি কোণে বসে ছিল বশির আর মিতা। বুট খেতে খেতে কথা বলছিল দুজন। হঠাৎ সময় দেখে মিতা বলে উঠল, ' আমি আজ উঠি।'

বশির মিতার হাত ধরে বলল, 'আরেকটু থাকোনা।'

মিতা বশিরের হাতের ওপর হাত রেখে বলল, 'প্রিয়টা একা আছেগো বাসায় বুয়াটার কাছে। শানটাও চলে এসেছে বোধ হয় স্কুল থেকে। যাই আজ আমি প্লিজ।'

বশির লম্বা শ্বাস ফেলে বলল, ' তোমার প্রিয়র ওপর কিন্তু আমার খুব হিংসে হয়। যবে থেকে এসেছে তোমাকে আমার থেকে দূরে দূরে সরিয়ে রাখছে। ভেবেছিলাম বিয়ে করে ফেলব এখনি। ওর জন্যে সেটাও হচ্ছেনা। কবে যেন পুরোটাই নিয়ে নেয়।'

হেসে ফেলল মিতা। বশিরের চুল এলোমেলো করে দিয়ে বলল, 'পাগল তুমি একটা।'

বশিরও চমৎকার করে হাসল। মিতার হাতে চুমু খেয়ে বলল, 'চলো এগিয়ে দেই। রাস্তার মোড়টাতে খেলনার দোকান বসে। রাণীর জন্যে কটা কিনে নেই। ওর ঐ বাপতো এজন্মে কিছু কিনবে না।'

••••••••••

দেখতে দেখতে চোখের পলকে কেটে যায় সাড়ে চারটা বছর। এরমধ্যে বদলেছে অনেককিছুই। সুমনা বিজনেসটা ভীষণ ভালো বুঝে গেছে। সেটা এখন যে একাই সামলাতে সক্ষম। কিন্তু মিতার প্রতি তার অকারণ, অদ্ভুত হিংসেটা দিনদিন বাড়ছিল ভয়ংকরভাবে। শওকতের সেই গ্রুপ এখন বড় হয়েছে। নাম দিয়েছে ডার্ক নাইট। সোলার সিস্টেমের সঙ্গে বড় একটা যৌথ প্রজেক্টে কাজও করছে সে তখন। কাদের এবং কাশেম উভয়ই শওকত মির্জার ওপর তখন বিশাল নির্ভরশীল। রাজনৈতিক যেকোন ডার্ক কাজকর্মে শওকতের দলই সাহায্য করে। কাশেমতো রীতিমতো ভাই ভাই করে তাকে। এইনিয়ে কাশেমের কতগুলো অপকর্মের মূল সহায়ক হয়েকে শওকত তার হিসেব নেই। সুমনার প্রতি তার মনোভাব এখনো একইরকম। যা ইচ্ছা করুক কিচ্ছু যায় আসেনা শওকতের। এদিকে সুমনার চোটপাট সহ্য করতে না পেরে পলাশও যোগ দিয়েছে শওকতের গ্রুপেই। 
এরমধ্যেই নিজের পৈত্রিক জমিতে একটা বাংলো তৈরী করেছে শওকত। ওর বাবার কিছু বাড়তি জমি বিক্রি করে এবং নিজের টাকা দিয়ে করেছে কাজটা। বেশ আলিশান আর বড় সেই বাংলোটা।

এদিকে বশির আর মিতা এরমধ্যে বিয়ের কথা ভেবেছিল অনেকবার। কিন্তু শান অনেকটা বড় হয়ে গেলেও প্রিয়তা তখনও ছোট। মাত্র সাড়ে চার বছর মেয়েটার। মিতা চলে গেলে এই বাচ্চা মেয়েটার জগত অন্ধকার হয়ে যাবে সেটা মিতা ভালো করেই জানে। জানে বশিরও। কিন্তু বশিরের মা আর পরিবারও একটা বাচ্চাসহ মেয়েকে এনে তুলবেনা বাড়িতে। কোনভাবেই না। বশির তখনও বেকার। তাই পরিবারের কথার বাইরে কিছু করতে পারছেনা। কিন্তু মনে মনে ভেবে রেখে চাকরিটা একবার পেয়েগেলে মিতাকে বিয়ে করবে ও। প্রিয়তাসহ মিতাকে যদি ওর পরিবার কোনভাবেই না মেনে নেয় তবে আলাদা সংসার পাতবে। কিন্তু এতো চেষ্টা করেও ঠিকঠাক একটা চাকরি জোটাতে পারছেনা ছেলেটা। যারফলে বিয়েটা আটকে আছে ওদের।

একদিন বিকেলবেলা শওকতের সঙ্গেই কাশেম হক প্রথমবারের মতো পা রাখল শওকতের বাংলোতে। সুমনা তখন ড্রয়িংরুমে চা খেতে খেতে টিভি দেখছে। কাশেমের দিকে চোখ পড়তেই দৃষ্টি আটকাল ওর, সঙ্গে কাশেমেরও। চোখ সরিয়ে একটা সোফায় বসল কাশেম। শওকত মেডকে চা আনতে বলে নিজেও বসল। পরিচয় করিয়ে দিল সুমনার সঙ্গে। দুজনেই প্রথমবার দেখছে ভাব করে পরিচিত হল।এরমধ্যেই ওপর থেকে খিলখিল করে হাসতে হাসতে নিচে নামল ছোট্ট প্রিয়তা। খেলছে ও। ওকে অনুসরণ করে পেছন পেছন মিতাও নেমে এলো দৌড়ে। ওও হাসছিল প্রাণখুলে। কিন্তু বসারঘরে অপরিচিত এক যুবককে দেখে থেমে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ইতস্তত করে ঠিক করে নিল ওড়নাটা। 

ঐদিনই কাশেম হকের চোক পড়ল মিতার ওপর। যে প্রকৃতপক্ষে প্রিয়তার একমাত্র অবলম্বন, ওর মা।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp