অবন্তিকা পাইপটা ঠিকঠাক লাগিয়ে ধীরে ধীরে কলটা একটু খুলে দিল। পাইপের ভেতর দিয়ে পানি ছুটে যেতে শুরু করল। কিন্তু সে তাড়াহুড়ো করল না। দুষ্টুমি করতে হলে সেটাও শিল্পের মতো করতে হয়! পাইপটা হাতে নিয়ে গাছের আড়ালে লুকিয়ে উঁকি দিল।
জারিফ তখনও ফোন নিয়ে ব্যস্ত। মাঝে মাঝে নিজের মনে হেসেও উঠছে। মনে হচ্ছে কোনো মজার ভিডিও দেখছে।
অবন্তিকা ফিসফিস করে বলল,
— হাসো হাসো চন্দু... আর দুই মিনিট পর কাঁদবা।
এরপর নিশানা ঠিক করে পাইপের মুখটা সোজা জারিফের দিকে তাক করল।
এক...দুই...তিন!
ঝপাশশশ!
বরফশীতল পানির সোজা আঘাত গিয়ে পড়ল জারিফের ঘাড়ে।
— ইয়াআআআ আল্লাহ!!
চিৎকার দিয়ে এমন লাফ দিল সে।যেন ফোনটা হাত থেকে প্রায় ছিটকে পড়ে যাচ্ছিল।
মুহূর্তের মধ্যে তার টি-শার্ট, চুল, মুখ— সব ভিজে একাকার! কয়েক সেকেন্ড সে বোঝারই চেষ্টা করল কী হয়েছে!
তারপর চোখ কুঁচকে চারপাশে তাকাতেই গাছের আড়াল থেকে ভেসে এলো পরিচিত খিলখিল হাসি।
অবন্তিকা তখন হাসতে হাসতে প্রায় দাঁড়িয়েই থাকতে পারছে না।
— হাহাহাহা! মৌমাছি কাকে বলছিলেন? বলেন? বলেন?
জারিফ অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে বলল,
— আপনি?!
— জ্বি, আমি!
— আপনি আমাকে ভিজিয়ে দিলেন?
— না, বৃষ্টি ভিজিয়েছে। আমি শুধু বৃষ্টির ব্যবস্থা কর
করেছি।
জারিফ দাঁত চেপে বলল,
— অবন্তিকা, আজকে আপনি শেষ!
— আগে ধরতে পারেন, তারপর শেষ কইরেন মশাই!
কথা শেষ করেই অবন্তিকা আবারও পানির পাইপটা সোজা জারিফের মুখের দিকে তাক করল।
জারিফ দু'হাত তুলে পানি সামলাতে সামলাতে ধীরে ধীরে সামনে এগোতে লাগল। ঠোঁটের কোণে বিপজ্জনক এক হাসি।
— ধরতে পারলে কিন্তু অবস্থা খুব একটা ভালো হবে না, আগে থেকেই বলে দিলাম।
অবন্তিকা ভ্রু কুঁচকে তাচ্ছিল্যের হাসি দিল।
— কচু হবে!
বলেই পাইপটা হাতে নিয়েই দৌড় দিতে গেল। কিন্তু এক পা-ও এগোতে পারল না। মুহূর্তের মধ্যেই বড় পা ফেলে জারিফ এসে তার কবজি চেপে ধরল। অবন্তিকার বুক ধক করে উঠল।
জারিফ ধীরে ধীরে এক ভ্রু উঁচিয়ে কুটিল হাসল।
— কী ব্যাপার, মিস বিচ্ছু? এবার কী করবেন?
অবন্তিকা ছটফট করে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগল।
— ছাড়ুন! বলছি ছাড়ুন! আমাকে কি সব পোকামাকড় বানিয়ে ফেলছেন। একবার মৌমাছি , আরেকবার বিচ্ছু..!
কিন্তু জারিফের মুঠো যেন লোহার বাঁধন। অবন্তিকা যতই হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করুক, তার সমস্ত চেষ্টাই মুহূর্তে ব্যর্থ হয়ে গেল। এক টানে তাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিতেই অবন্তিকা এসে থমকে দাঁড়াল জারিফের একেবারে সামনে। তার পিঠ প্রায় জারিফের বুক ছুঁয়ে আছে, মাঝখানে শুধু শ্বাস নেওয়ার মতো সামান্য দূরত্ব।
অপ্রত্যাশিত এই ঘনিষ্ঠতায় অবন্তিকার পুরো শরীর যেন জমে গেল। বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন এমন বেগে ছুটতে লাগল, যেন পাঁজর ভেঙে বাইরে বেরিয়ে আসবে। হাতের আঙুলগুলো অনিচ্ছাকৃতভাবে মুঠো হয়ে এলো, আর নিঃশ্বাসগুলো হয়ে উঠল ছোট ছোট ও এলোমেলো।
জারিফ সবকিছুই অনুভব করছিল। তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা চিরচেনা ঝড়ের মতো মেয়েটা এই মুহূর্তে অদ্ভুতভাবে নিশ্চুপ। সেই পরিবর্তনটা দেখে তার চোখে খেলে গেল দুষ্টু এক তৃপ্তির ঝিলিক।
ধীরে ধীরে সে মুখটা অবন্তিকার কানের কাছে নামিয়ে আনল। তাদের মাঝের দূরত্ব আরও কমে আসতেই অবন্তিকার চোখ দুটো আপনাআপনি বন্ধ হয়ে গেল। কানের পাশে এসে লাগা উষ্ণ নিশ্বাসে তার পুরো শরীর কেঁপে উঠল। মনে হলো চারপাশের সব শব্দ একে একে মিলিয়ে গেছে— না আছে বাতাসের শব্দ, না আছে আশপাশের মানুষের উপস্থিতি। শুধু নিজের বুকে ধুকপুক করতে থাকা হৃদয়ের আওয়াজই যেন স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে সে।
আর জারিফ?
সে নিঃশব্দে সেই অস্থিরতা উপভোগ করছিল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে থাকা মৃদু হাসিটা ধীরে ধীরে আরও গভীর হয়ে উঠল, যেন অবন্তিকার প্রতিটি কাঁপুনি, প্রতিটি অগোছালো নিঃশ্বাস তার চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে না। মুহূর্তটা দীর্ঘ হতে লাগল, আর সেই দীর্ঘতার মাঝেই অবন্তিকার ভেতরের সমস্ত সাহস যেন কোথাও গিয়ে লুকিয়ে দু'হাতে পাইপটা এমনভাবে চেপে ধরেছে যেন সেটাই শেষ ভরসা।
জারিফ এক মুহূর্ত চুপ থেকে তার সব প্রতিক্রিয়া উপভোগ করল।
তারপর নিচু, ভারী কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল—
— এখন ভয় পাচ্ছেন কেন, মিস বিচ্ছু?
একটু থেমে আরও ঝুঁকে এল।
— এই সাহস দেখানোর আগে একবারও ভাবেননি, এর পরিণাম কী হতে পারে?
অবন্তিকা কোনো উত্তর দিতে পারল না।
জারিফের কণ্ঠ আরও গভীর হয়ে উঠল।
— কার সঙ্গে খেলতে নেমেছেন, সেটা আগে বুঝে নেওয়া উচিত ছিল।
তারপর অবন্তিকার কানের কাছে মুখ এনে ধীরে ধীরে বলল,
— কারণ আমি হারতে পছন্দ করি না, আর যে আমাকে চ্যালেঞ্জ করে... তাকে শাস্তি না দিয়ে ছাড়িও না।
জারিফ ধীরে ধীরে কথার ফাঁকে অবন্তিকার হাত থেকে পাইপটা নিজের হাতে নিল। তারপর এক ঝটকায় পাইপের মুখ ঘুরিয়ে তার দিকেই তাক করল। অবন্তিকা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সজোরে পানির ফোয়ারা এসে আছড়ে পড়ল তার মুখে।
— আহ্!
নাক-মুখ দিয়ে একসাথে পানি ঢুকে যেতেই সে কাশতে কাশতে দুই হাত তুলে পানি আটকানোর চেষ্টা করল।আর এদিকে জারিফ দাঁড়িয়ে আছে নির্বিকার ভঙ্গিতে।অবন্তিকা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ভেজা মুখ থেকে পানি সরিয়ে তাকাল তার দিকে।
— এই মিয়া! আপনার সাহস তো কম না! আমাকে ভিজিয়ে দিলেন?
জারিফ ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল,
— আর আপনি বুঝি খুবকম সাহসী? আমাকে কি রোদে শুকিয়ে রেখেছিলেন?
— একদম ফালতু কথা বলবেন না।
— ফালতু না, একদম বাস্তব কথা বলছি।
অবন্তিকার চোখ দুটো চিকচিক করে উঠল। আশেপাশে একবার তাকিয়ে আবার পাইপটা শক্ত করে হাতে তুলে নিল।
— ঠিক আছে... এখন দেখবেন বাস্তব কাকে বলে!
কথাটা শুনেই জারিফের মুখের হাসি খানিকটা মিলিয়ে গেল।
— এই এই! দাঁড়ান! আবার কী করতে যাচ্ছেন?
— প্রতিশোধ নিতে।
কথা শেষ হতেই অবন্তিকা খপ করে পাইপটি নিজের হাতে নিয়ে পাইপের মুখ তার দিকে ঘুরিয়ে দিল।
ঝপাৎ!
বরফশীতল পানির তীব্র ঝাপটা সরাসরি এসে আবারও লাগল জারিফের গায়ে।
— আরে!
সুযোগ বুঝে অবন্তিকা বিজয়ীর হাসি হেসে দৌড় দিল, আর জারিফ কয়েক সেকেন্ড হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে চিৎকার করে উঠল—
— অবন্তিকা! বিচ্ছু। দাঁড়ান বলছি।
আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলা জায়ান, সব দেখে কপালে হাত ঠেকিয়ে শুধু একটা কথাই বলল,
— এরা মানুষ না... এরা চলন্ত দুর্যোগ!
এই দুইটা একসাথে হলে কিছু না কিছু গণ্ডগোল হবেই।
জায়ান ফোন কানে ধরে সবকিছু দেখছিল। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— আমি আপনাকে পরে কল দিচ্ছি।
ওপাশ থেকে কিছু একটা জিজ্ঞেস করতেই সে বাগানের দিকে তাকিয়ে বলল,
— কারণ আমি বর্তমানে একটা মানসিক হাসপাতালের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি।
— কী বলছেন?
— জি। আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, রোগী দুজনকেই আমি খুব ভালো করে চিনি!
ওপাশের মানুষ কিছু বুঝতে না পেরে অবাক হয়ে গেল।
—————
জারিফও আর এক সেকেন্ড নষ্ট করল না। পাইপটা হাতে নিয়ে অবন্তিকার পেছনে ছুটল। আর মুহূর্তের মধ্যেই পুরো বাগানজুড়ে শুরু হয়ে গেল এক তুমুল তাড়া-পাল্টা তাড়া।
অবন্তিকা দৌড়াতে দৌড়াতে বারবার পিছনে তাকিয়ে জিভ ভেংচাচ্ছে, আর জারিফ তাকে ধরার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছে। দুজনেই ভেজা অবস্থায় ঘাসের উপর দৌড়াচ্ছিল। হাসাহাসি আর খুনসুটিতে কেউই খেয়াল করল না যে ভেজা ঘাস কতটা পিচ্ছিল হয়ে গেছে।
হঠাৎ করেই অবন্তিকার পা পিছলে গেল।
— আআআ...!
সামনে পড়ে যাওয়ার আগেই জারিফ দ্রুত তার হাত ধরতে গেল। কিন্তু বিপদ হলো, সেও তখন ভেজা ঘাসের উপর দাঁড়িয়ে ছিল।
ফলাফল—
তার নিজের পায়ও স্লিপ খেয়ে গেল।দুজনের ভারসাম্য একসাথে নষ্ট হয়ে গেল। এক মুহূর্তের মধ্যেই জারিফ অবন্তিকাকে জড়িয়ে ধরে ধপাস করে ঘাসের উপর পড়ে গেল।অবন্তিকা নিচে, জারিফ উপরে।চারপাশ যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল। অবন্তিকার এলোমেলো চুলের গোছা মুখের উপর এসে পড়েছে। আর জারিফের এক হাত এখনো স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার কাঁধ জড়িয়ে আছে, যেন পড়ে যাওয়ার শেষ মুহূর্তেও তাকে আঘাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছে।
দুজনেই কয়েক সেকেন্ড নিঃশ্বাস বন্ধ করে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর অবন্তিকা চোখ বড় বড় করে বলল,
— আপনার জন্যই পড়লাম!
জারিফ ভ্রু তুলে তাকাল।
— বাহ! আমি আপনাকে বাঁচাতে গিয়ে পড়লাম, দোষও আমার?
— অবশ্যই আপনার!
— যুক্তিটা শুনি?
— কারণ আপনি তাড়া করেছিলেন!
জারিফ এবার আর হাসি চেপে রাখতে পারল না।
—————
তাদের দৌড়াদৌড়ি দেখে সাফা আর আয়াত দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না চিৎকারের শব্দে কাছে আসতেই , জারিফ আর অবন্তিকা কে এভাবে মাটিতে একজনের উপর আরেকজন পরে থাকতে দেখে সাফার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। তার কেনো যেনো বুকটা ছ্যাত করে উঠল।
এখন এত কিছু ভাবার সময় নেই। অবন্তিকা পরে গিয়েছে আগে দেখতে হবে।
— ইয়া আল্লাহ! অবু রেরেরে….
বলেই সে দৌড়ে তাদের দিকে ছুটে গেল।
আয়াতও পিছনে পিছনে ছুটল।
— কি হয়েছে? লেগেছে নাকি? (আয়াত)
এদিকে অবন্তিকা তখনও জারিফের সাথে তর্কে ব্যস্ত।
— আমি বলেছি, সব আপনার দোষ!
— আর আমি বলেছি, আমি না থাকলে আপনি মুখ থুবড়ে পড়তেন!
সাফা কাছে এসে কপালে হাত ঠেকাল।
— তোমাদের কি একটুও বুদ্ধি নেই? এত ভেজা ঘাসের উপর এভাবে দৌড়াদৌড়ি করে কেউ?
তার গলায় স্পষ্ট উদ্বেগ।
সে তাড়াতাড়ি অবন্তিকার পাশে বসে তার হাত-পা দেখে বলল,
— কোথাও ব্যথা পেয়েছিস? হাতটা দেখ তো!
অবন্তিকা একটু অবাক হলো।
— আরে না, তেমন কিছু হয়নি।
— তেমন কিছু হয়নি মানে? যদি মাথায় আঘাত পেতি?
সাফার চোখেমুখে বিরক্তির চেয়ে চিন্তাই বেশি ফুটে উঠল।
ঠিক তখনই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জায়ান ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে বলল,
— আমি কিন্তু অনেকক্ষণ ধরে দেখেই বুঝেছি, এই দৌড়ের শেষ এমন কিছুই হবে!
আয়াতও হেসে ফেলল।
— সত্যি বলতে, তোমাদের দেখে মনে হচ্ছিল কার্টুন চলছে!
অবন্তিকা সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসে বলল,
— হাসার কিছু নেই!
— আছে, অনেক আছে! — জায়ান বলতেই সবাই হেসে উঠল।
সাফা মাথা নেড়ে বলল,
— আমি তো আগে ভাবতাম অবন্তিকা একাই পাগল। এখন দেখছি জারিফ ভাইয়াও কম না!
আয়াত সাথে সাথে বলে উঠল,
— এই, তোমরা থামো! পড়ে গেছো, আর এখনও ঝগড়া করছো?
জারিফ উঠে দাঁড়াতেই অবন্তিকাও তড়াক করে উঠে গেল।
আআআআআ আমার কোমর….
সাফা তাকে ধরে সামলাতে সামলাতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেই অবন্তিকা হাত ছাড়িয়ে বলে উঠল,
— ছাড় বলছি! আমাকে উনাদের সামনে পাগল বললি, সালি! আবার ধরতেও এসেছিস?
সাফাও ছাড়ার পাত্রী নয়। ভ্রু কুঁচকে বলল,
— এই, তুই এসব করে আবার রাগ ও দেখাচ্ছিস? তোকে এসব করতে কে বলেছিল শুনি? আমাদের সামনে পাঠিয়ে এমন কাণ্ড করতে গেলি কেন?
আয়াতও মাথা নেড়ে যোগ করল,
— দুই লাইন বেশি বুঝিস তুই। এখন আবার উল্টো রাগ দেখাচ্ছিস!
অবন্তিকা একবার তিনজনের দিকে আগুনঝরা চোখে তাকাল। তারপর ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
— তোমাদের কারও সাথে আমি কথা বলব না!
বলেই গটগট করে পা ফেলে বাড়ির ভেতরে চলে গেল।
পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা সাফা, আয়াত আর জারিফ একে অপরের মুখের দিকে তাকাতেই জায়ান হেসে বলে উঠল,
— যুদ্ধ শুরু করেছিল দুজন, আর এখন শাস্তি পাচ্ছি আমরা সবাই!
তখনই জায়ানের ফোনে কল এলো। তার মুখের বিস্মিত অভিব্যক্তি দেখে জারিফ এগিয়ে গেল।
— কী হয়েছে?
জায়ান ফোনটা কানে ধরে কয়েক মুহূর্ত কথা বলে কল কেটে দিল। তারপর বলল,
— হাসপাতাল থেকে কল এসেছে।
"হাসপাতাল" শব্দটা কানে যেতেই সাফার এগিয়ে যাওয়া পা থেমে গেল। বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল। কার আবার কি হলো..!
আয়াত একটু সামনে চলে গিয়েছিল, কিন্তু সাফা পিছিয়ে পড়েছে দেখে ফিরে তাকিয়ে ডাক দিল,
— কী হলো? দাঁড়িয়ে আছিস কেন?
সাফা চমকে উঠে বলল,
— আসছি।
তারপর দ্রুত পা বাড়াল বটে, কিন্তু মনে মনে অজানা আশঙ্কা ঘুরপাক খেতে লাগল।
তারা যেতেই জায়ান বলল,
— মেয়েটার নাম সানা। ডাক্তাররা বলেছে এখন আগের চেয়ে অনেকটাই স্টেবল। জ্ঞানও ফিরেছে কিছুক্ষণ আগে। আমাকে হাসপাতালে যেতে হবে।
জারিফ মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
— ঠিক আছে। কোনো আপডেট পেলে আমাকে জানাস।
জায়ানও সায় দিল।
মনের ভেতর একটা স্বস্তির অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল। কারণ সানা যত দ্রুত সুস্থ হবে, তত দ্রুত সেই নরপিশাচগুলোর মুখোশ খুলবে। আর তাদের অপরাধের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা যাবে। এখন শুধু অপেক্ষা— সানার সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠার।
—————
দুপুর ১টা।
রাহার ঘুম ভাঙতেই সে বুঝতে পারল রুমে একাই শুয়ে আছে। কিছুক্ষণ বিছানায় স্থির হয়ে থেকে আশপাশে চোখ বুলাল। চারদিক অস্বাভাবিক শান্ত।
ঠিক তখনই তার নাকে ভেসে এলো পরিচিত এক সুগন্ধ। নাসারন্ধ্র বেয়ে ধীরে ধীরে সেই ঘ্রাণ যেন মনটাকেও ছুঁয়ে গেল। কৌতূহলী হয়ে উৎস খুঁজতে গিয়ে সে নিজের বুকের ওপর রাখা ওড়নাটার দিকে তাকাল। হাত বাড়িয়ে ওড়নাটা কাছে টেনে নিল। তারপর চোখ বন্ধ করে গভীর একটা শ্বাস নিল।
একটা...দুইটা...তারপর আরও কয়েকটা।
ঘ্রাণটা এতটাই পরিচিত যে চিনতে এক মুহূর্তও লাগল না।
অভ্র সঙ্গে সঙ্গেই সকালবেলার ঘটনাগুলো একে একে মনে পড়ে গেল। তার কথাগুলো, দুষ্টু হাসিটা, আর সেই অদ্ভুত অনুভূতি— যেটা এখনও বুকের ভেতর অকারণে আলোড়ন তুলছে।
মনে পড়তেই রাহার গাল দুটো হালকা লাল হয়ে উঠল। সে দ্রুত চোখ খুলে ফেলল, যেন নিজের চিন্তাগুলো থেকেই পালাতে চাইছে।
ঠিক তখনই পাশের দিকে তাকিয়ে তার নজর পড়ল বেডসাইড টেবিলের ওপর রাখা একটা ছোট্ট চিরকুটে। ভ্রু কুঁচকে সেটার দিকে হাত বাড়াল সে।
চিরকুটটা তুলে খুলতেই সেখানে পরিচিত হাতের লেখায় লেখা-
"মাই লেডি,"
প্রথম দুটো শব্দ পড়তেই রাহার কুঁচকে থাকা ভ্রু একটু নরম হয়ে এলো। বিরক্ত হওয়ার চেষ্টা করলেও ঠোঁটের কোণে অজান্তেই ফুটে উঠল এক টুকরো হাসি। যেন এই দুটো শব্দের মাঝেই লুকিয়ে আছে পরিচিত এক মানুষের উপস্থিতি।
নিচে আরও লেখা-
"আমার ড্রিম গার্ল। স্বপ্নের রানি, ফেইরী টেইল।
একটা জরুরি কাজে বাইরে যাচ্ছি। তাই ঘুম থেকে উঠে আমাকে না দেখে মন খারাপ করার কোনো কারণ নেই। আমি তাড়াতাড়ি ফিরবো।
ফ্রেশ হয়ে নিচে গিয়ে আগে খেয়ে নিবি নইলে কিন্তু ফিরে এসে হিসাব নেব। অভিমান করতে পারিস, কিন্তু না খেয়ে থাকা একদম চলবে না।"
লেখার শেষ লাইনের পাশে একটা ছোট্ট হাসিমুখ আঁকা।
লেখাটা পড়ে রাহার চোখ বড় বড় হয়ে গেল।
— অসভ্য একটা!
বিরক্তি দেখানোর চেষ্টা করলেও ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল। চিরকুটটা ভাঁজ করে বুকে চেপে ধরে সে বিছানায় বসে রইল কিছুক্ষণ। নিজের অজান্তেই তার হৃদস্পন্দন যেন একটু বেশি দ্রুত হয়ে উঠেছে।
—————
রাহা ফ্রেশ হয়ে নিচে নামতেই দেখল ডাইনিং টেবিলে সবাই যেন তার অপেক্ষাতেই বসে আছে। দীর্ঘ ঘুম আর ঠান্ডা শাওয়ারের পর শরীরটা অদ্ভুত হালকা লাগছে। মাথার ভেতরের ভারটাও অনেকটা কমে গেছে। বেশ ফুরফুরে মন নিয়েই সে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামল। কিন্তু নিচে আসতেই তার হাসিটা খানিকটা থমকে গেল।ঘরে উপস্থিত সবার দৃষ্টি একসাথে এসে থামল তার ওপর।
রাহা ভ্রু কুঁচকে চারপাশে তাকিয়ে বলল,
— এভাবে সবাই তাকিয়ে আছো কেন?
আয়াত উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
— এখন ঠিক আছিস তো?
প্রশ্নটার আড়ালে লুকিয়ে থাকা চিন্তাটা রাহা বুঝতে পারল। কিন্তু মুখে তার কিছুই প্রকাশ পেল না। বরং ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে বলল,
— একদম ঝাক্কাস আছি আপু। আমাকে দেখে কি অসুস্থ মনে হচ্ছে?
তার স্বাভাবিক আচরণে সবার মুখে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এলো।
আফরোজা বেগম মমতাভরা গলায় বললেন,
— আয় মা, আগে কিছু খেয়ে নে।
সবাই খাবার টেবিলে বসে পড়ল।
রাহাও চুপচাপ নিজের চেয়ারে বসল ঠিকই, কিন্তু তার চোখ বারবার চলে যাচ্ছিল দরজার দিকে। অভ্র এখনও আসেনি। অকারণেই বুকের ভেতরটা কেমন খচখচ করে উঠল।
কোথায় গেল? এখনও ফিরল না কেন? নাকি আজ আর আসবে না...?
ভাবনাগুলো মাথায় ঘুরপাক খেতেই সে অন্যমনস্কভাবে খাবারে হাত বাড়াল।
ঠিক তখনই—
টিং টং!
হঠাৎ কলিং বেলের শব্দে পুরো ঘরের দৃষ্টি ঘুরে গেল দরজার দিকে।আর রাহার চোখে মুহূর্তেই জ্বলে উঠল আগ্রহের ঝিলিক।পরের সেকেন্ডেই দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল অভ্র, জারিফ আর জয়ান।
কিন্তু তাদের দেখে রাহার মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।তিনজনের মুখই অস্বাভাবিক গম্ভীর।
চোখেমুখে স্পষ্ট টানটান উত্তেজনা আর চাপা উদ্বেগ। ভেতরে ঢুকতেও তারা নিজেদের মধ্যে নিচু গলায় কোনো একটা বিষয় নিয়ে তীব্র আলোচনা করছিল। ঘরের পরিবেশ মুহূর্তেই বদলে গেল।
রাহাসহ উপস্থিত সবাই ভ্রু কুঁচকে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল।
হঠাৎ অভ্রর নজর পড়ল সবার ওপর।
সে সঙ্গে সঙ্গে কথাটা মাঝপথে থামিয়ে দিল।
তারপর কোনো ভূমিকা না করেই গম্ভীর স্বরে বলল,
— আজ রাতেই আমরা ঢাকা ব্যাক করছি।
কথাটা বলেই সে একবার চারপাশে তাকাল।
— সবাই রেডি থাকবে।
অভ্রর কণ্ঠে এমন এক দৃঢ়তা ছিল, যা শুনে কারও বুঝতে বাকি রইল না—কিছু একটা ঘটেছে। আর সেটা মোটেও সাধারণ কিছু নয়।
রাহার বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই ধক করে উঠল।
কয়েক মুহূর্ত আগেও যে হালকা, নিশ্চিন্ত অনুভূতি তাকে ঘিরে ছিল, তা যেন এক নিমিষে মিলিয়ে গেল। এখন শুধু একটাই প্রশ্ন মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে—
হঠাৎ এমন কী হয়েছে, যার জন্য এত তাড়াহুড়ো করে ঢাকা ফিরতে হবে?
শুনে মুহূর্তেই সবার মুখের হাসি ম্লান হয়ে গেল। এতদিন পর সবাই একসাথে হয়েছে, অথচ ঠিকমতো ঘোরাঘুরিও করা হলো না। কালই এসেছে, আর এর মধ্যেই চলে যাওয়ার কথা— বিষয়টা কেউই সহজভাবে নিতে পারল না।
বিশেষ করে শিফার মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল।
সবার মুখের দিকে তাকিয়ে আয়াত হঠাৎ বলল,
— ভাইয়া, প্লিজ! আর দু'দিন থাকুক ওরা। আপনার যদি কোনো জরুরি কাজ থাকে, সেটা শেষ করে আসবেন। কিন্তু ওদের নিয়ে যাবেন না। এমনিতেই তো ওরা খুব একটা আসতে পারে না। সবে তো কাল এসেছে!
আয়াতের কথায় সায় দিলেন আফরোজা বেগম আর মাইনুদ্দিন মির্জাও। তারাও অনুরোধ করলেন যেন রাহারা আরও কয়েকদিন থাকে।
অভ্র নীরবে একবার রাহার দিকে তাকাল।
রাহা কিছু না বললেও তার চোখ-মুখই বলে দিচ্ছিল, সে থাকতে চায়। পরিবারের সঙ্গে আরও কিছুটা সময় কাটাতে চায়।
সেটা বুঝেই অভ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— আচ্ছা, ঠিক আছে। দুইদিন পর আমি নিজেই এসে নিয়ে যাব।
কথাটা শুনতেই যেন সবার মুখে আবার প্রাণ ফিরে এলো।
আয়াত তো খুশিতে প্রায় লাফিয়ে উঠল।
তারপর বলল,
— তাহলে আর দেরি কেন? আপনারা যাওয়ার আগে আজকে পুরো এলাকা ঘুরে দেখাবো!
কথাটা শুনে মেয়েদের উচ্ছ্বাস যেন আর ধরে না। মুহূর্তেই চারপাশের পরিবেশ আবার হাসি-আনন্দে ভরে উঠল।
অভ্রের ব্যক্তিগতভাবে কোথাও যাওয়ার বিশেষ ইচ্ছে ছিল না। বরং রাহাকে এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল করতে মন চাইছিল না তার। তবুও রাহার মুখের সেই উজ্জ্বল হাসিটা দেখেই রাজি হয়ে গেল।
নিজের প্রাণের মানুষের খুশির জন্য এটুকু তো করাই যায়।
তার ওপর রাতেই তাকে ঢাকায় ফিরতে হবে। তাই আর আপত্তি করল না।এমন সময় ইভান সবাইকে খাবার টেবিলে ডাক দিল।সবাই একসাথে টেবিলে বসে খেতে শুরু করল।
আর রাহা?
তার মুখে তখন এক অন্যরকম উজ্জ্বলতা। বিকেলে অভ্রের সঙ্গে বের হবে— এই চিন্তাতেই সে ভেতর
থেকে আনন্দে ভরে উঠেছে।
—————
— ওয়েলকাম, মিস্টার মাহাদী।
আগামীকালের অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে আপনাকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। আশা করি এখানে আসতে কোনো অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়নি।
মাহাদী করমর্দন করে মৃদু হেসে বলল,
— ধন্যবাদ, মিস্টার আসিফ রহমান।
তবে মনে মনে সে বলল,
“আপনি না চাইলেও আমাকে আসতেই হতো। আমার রাজ্যের রানি যে এই প্রাঙ্গণেই উপস্থিত, তাকে ফেলে আমি কীভাবে দূরে থাকি?”
মাহাদীর অস্ফুট স্বর শুনে আসিফ রহমান ভ্রু কুঁচকে বললেন,
— সরি! কিছু বললেন?
মাহাদী তৎক্ষণাৎ স্বাভাবিক হয়ে উত্তর দিল,
— না, তেমন কিছু নয়। আসলে খুব ভালো লাগছে। আপনাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে আমাকে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো সত্যিই সম্মানের।
আসিফ রহমান সৌজন্যমিশ্রিত হাসি দিয়ে বললেন,
— সম্মান তো আমাদেরই, মিস্টার মাহাদী। আপনি এ সম্মানের সম্পূর্ণ যোগ্য। আপনার বাবা দেশের একজন স্বনামধন্য ও শ্রদ্ধেয় চিকিৎসক, আর আপনি নিজেও একজন খ্যাতিমান ও প্রতিভাবান অধ্যাপক। আপনার মতো একজন গুণী ব্যক্তিত্বকে আমাদের মাঝে পেয়ে আমরা সত্যিই গর্বিত ও
— অনেকটা পথ জার্নি করে এসেছেন। আগে একটু বিশ্রাম নিন।
কথাটা বলে আসিফ রহমান ভদ্রতাসূচক হাসি দিয়ে সেখান থেকে চলে গেলেন।
—————
মাহাদী স্থির দৃষ্টিতে তার চলে যাওয়া দেখল।
যখন থেকে সে শুনেছে তার শুভ্র পরী কুমিল্লায় এসেছে, তখন থেকেই ঢাকায় তার মন টিকছিল না। যেন অদৃশ্য এক টান তাকে বারবার কুমিল্লার দিকেই টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।
সেদিনই সেখানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল সে। ঠিক তখনই তার বাবা এসে বলেছিলেন,
— তোমার নামে একটা আমন্ত্রণ এসেছে। অনুষ্ঠানে তোমাকে যেতেই হবে।
মাহাদী বিরক্ত হয়ে বলেছিল,
— বাবা, আমি ব্যস্ত। অন্য একটা জরুরি কাজে যেতে হবে।
— কোথায় যাবে তুমি? আগে ওই অনুষ্ঠানটা অ্যাটেন্ড করে এসো। একদিনেরই তো ব্যাপার। কুমিল্লা যেতে তিন ঘণ্টার বেশি লাগে না। সকালে গিয়ে অনুষ্ঠান শেষ করে আবার ফিরে এসো।
'কুমিল্লা' নামটা শুনেই মাহাদীর চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গিয়েছিল।পরক্ষণেই তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠেছিল প্রশস্ত এক হাসি।কারণ সে তো ঠিক সেখানেই যেতে চাচ্ছিল!
মাহাদী আর দেরি না করে বলেছিল,
— আমি সকালে যেতে চাই না। আজ রাতেই রওনা দেব। সকালে জার্নি করে যাওয়ার ধৈর্য নেই।
তার বাবা মুচকি হেসে বলেছিলেন,
— আচ্ছা, তুই প্রস্তুত হ। আমি ওদের জানিয়ে দিচ্ছি।
— ঠিক আছে, বাবা।
কথাটা বলেই মাহাদী দুই হাত একসাথে ঘষতে ঘষতে মুখের সামনে এনে দুষ্টুমিভরা এক বাকা হাসি দিল।তারপর দ্রুত পায়ে নিজের রুমের দিকে চলে গেল।তার যে আর তর সইছে না!
কখন সে তার শুভ্র পরীকে একনজর দেখবে, কখন সেই চিরচেনা মুখখানা আবার নিজের চোখের সামনে খুঁজে পাবে— সেই অপেক্ষাতেই যেন তার প্রতিটি মুহূর্ত দীর্ঘ হয়ে উঠছিল।
·
·
·
চলবে……………………………………………………