হাত, পা আর মুখ বাঁধা অবস্থায় পিঠের নিচে হিমশীতল স্পর্শ অনুভব হতেই আচমকা চোখ মেলে তাকায় রাহা… প্রথম দৃষ্টিতেই মাথাটা ঝিমঝিম করে ওঠে। ক্লোরোফর্মের ঘোর তখনও পুরোপুরি কাটেনি। ধীরে ধীরে চারপাশে দৃষ্টি বুলাতেই বুঝতে পারে— সে রয়েছে একেবারে নিঃস্তব্ধ, ঘুটঘুটে অন্ধকার একটি কক্ষে। শুধু মাথার উপর মিটমিট করে জ্বলছে ক্ষীণ হলুদাভ একটি বাতি।
আর তার ঠিক নিচে, ঘাড় থেকে পা পর্যন্ত ছুঁয়ে আছে বিশাল এক বরফখণ্ডের হিমেল শীতলতা।
কয়েক হাত দূরে অস্পষ্ট এক ছায়ামূর্তির অবয়ব চোখে পড়তেই বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে। চারদিকের অন্ধকারে মানুষটিকে স্পষ্ট বোঝা না গেলেও, পিছনে জ্বলতে থাকা আলোয় তাকে যেন কোনো নিষ্ঠুর সম্রাটের মতো লাগছে—সিংহাসনে হেলান দিয়ে পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে।
আতঙ্কে রাহার বুক শুকিয়ে কাঠ। অন্যদিকে বরফের হিমে তার পুরো শরীর অবশ হয়ে আসছে। থরথর করে কাঁপছে সে।
রাহা যেন কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না—এটা আদৌ বাস্তব, নাকি কোনো বিভীষিকাময় দুঃস্বপ্ন!
–সে তো একদম স্বাভাবিকভাবেই খালামনির বাসায় ঘুমিয়ে পড়েছিল…
তাহলে এখানে এলো কীভাবে? কে তাকে তুলে নিয়ে এলো?এই ভয়ঙ্কর মানবটি বা কে?
হাজারো প্রশ্ন একসাথে ঝড় তুলছে তার মাথার ভেতর। আতঙ্কে নিঃশ্বাস পর্যন্ত ভারী হয়ে আসছে। বাঁধা হাত-পা ছাড়ানোর জন্য মরিয়া হয়ে ছটফট করতে চাইলো রাহা, কিন্তু শক্ত রশির বাঁধনে সামান্য নড়াচড়া করতেও ব্যথায় শরীর কেঁপে উঠল।
হঠাৎ নিস্তব্ধ ঘরের ভেতর ভেসে এলো ধীর, ভারী কারও নিঃশ্বাসের শব্দ। শব্দটা যেন আরও স্পষ্ট হয়ে কানে বাজতে লাগল। রাহার বুকের ধুকপুকানি মুহূর্তেই কয়েকগুণ বেড়ে গেল।
ঠিক তখনই ছায়ামূর্তিটা আস্তে আস্তে নড়ে উঠল…
চারদিকে জমে থাকা অন্ধকার যেন আরও গাঢ় হয়ে এলো।
রাহা ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে রইল মানুষটার দিকে। তার মনে হচ্ছিল, এই কয়েক সেকেন্ডই হয়তো তার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর মুহূর্ত হতে চলেছে।
ঠান্ডায় জমে যাওয়া কাঁপা কণ্ঠে কোনোভাবে শব্দ বের করার চেষ্টা করল সে—
“কে… কে আপনি…? আমাকে এখানে কেন এনেছেন…?”
কিন্তু কথাগুলো শেষ হওয়ার আগেই ভয়ে তার গলা শুকিয়ে এলো।
কারণ অন্ধকারের ভেতর থেকে ভেসে এলো এক চাপা, রহস্যময় হাসির শব্দ।
হাসির বিকট শব্দ যত তীব্র হয়ে উঠছে, রাহার বুকের ভেতর ততই আতঙ্ক জমে বরফ হয়ে যাচ্ছে।
অতিরিক্ত ঠান্ডায় দাঁতের সাথে দাঁত কাঁপতে কাঁপতে বারি খাচ্ছে। তার শরীরের নিচে রাখা বিশাল বরফখণ্ডের হিমশীতল স্পর্শ ধীরে ধীরে পুরো দেহ অবশ করে দিচ্ছে। পিঠ বেয়ে কনকনে ঠান্ডা ছড়িয়ে পড়ছে শিরা-উপশিরায়, যেন হাজারো সূচ একসাথে বিঁধছে শরীরে। কাঁপতে কাঁপতে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার, ঠোঁট নীলচে হয়ে এসেছে, আর আঙুলগুলো অসাড় হয়ে পড়ছে মুহূর্তে মুহূর্তে।
ছায়ামানবটি ধারালো দৃষ্টিতে অনেকক্ষণ ধরেই পর্যবেক্ষণ করছে রাহার প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি।
মেয়েটির আতঙ্কে কাঁপতে থাকা শরীর, দ্রুত ওঠানামা করা বুক, আর ভীতসন্ত্রস্ত চোখের প্রতিটি পরিবর্তন যেন তার দৃষ্টি এড়াচ্ছে না একটুও।
চারপাশের হিমশীতল নীরবতার মাঝে সেই দৃষ্টিটা আরও ভয়ংকর হয়ে উঠছে, যেন অন্ধকারের আড়াল থেকে কোনো অজানা বিভীষিকা ধীরে ধীরে রাহাকে গ্রাস করে নিতে চাইছে।
হঠাৎ করেই আসন ছেড়ে ধীর ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল ছায়ামানবটি। ঠোঁটের কোণে শীতল, রহস্যঘেরা হাসি টেনে কর্কশ-মধুর কণ্ঠে বলে উঠল—
— “হ্যালো, রাহা ডার্লিং। ওয়েলকাম টু মাই হেল।
কেমন উপভোগ করছেন আপনার এই ভয়ংকর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা?”
কথাগুলো উচ্চারণ করতেই ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে আসতে থাকে সে।
চারপাশের ম্লান আলো ভেদ করে লোকটার মুখ স্পষ্ট হয়ে উঠতেই রাহার বুকের ভেতর যেন বজ্রপাত হলো।লোকটা কাছে এসে এক টানে মুখের বাঁধন খানিকটা আলগা করে দিতেই কেঁপে ওঠে রাহা।
শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁট থরথর করে নড়ে ওঠে।আতঙ্কে তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠছে, পুরো শরীর অনবরত কেঁপে চলেছে। মুখ শক্ত করে বাঁধা থাকায় শব্দগুলো স্পষ্ট বেরোচ্ছিল না। তবুও অসহায় আর ভাঙাচোরা ফিসফিসানিতে বারবার একটি নামই উচ্চারিত হচ্ছিল—
— “ অ… ভ্র… ভাইয়া…!”
অভ্র ঝড়ের বেগে এগিয়ে এসে রাহার ঘাড়ের নিচে শক্ত করে একহাত গুঁজে টেনে নিল নিজের মুখোমুখি। তার চোখে তখন দাউদাউ করে জ্বলছে ক্রোধের আগুন। দাঁত চেপে বিষাক্ত স্বরে ফিসফিসিয়ে উঠল—
“বান্দির বাচ্চা… তোর এত বড় দুঃসাহস হলো কীভাবে বাড়ির বাইরে পা রাখার? একবারও বুক কাঁপল না? আজ আমি তোর সেই কলিজার জোর মেপে দেখবো। তোর প্রতিটা নিঃশ্বাসকে জাহান্নামে সফর করিয়ে ছাড়বো!”
কথা শেষ হতেই কোমর থেকে ধীরে ধীরে বের করল একটি ধারালো ট্যাকটিক্যাল নাইফ। চকচকে ফলাটা মুহূর্তেই গিয়ে ঠেকল রাহার গলার ঠিক কাছে। রাহার নিঃশ্বাস মুহূর্তেই আরো ভারী হয়ে উঠল। ধারালো ফলার শীতল স্পর্শ গলার চামড়ায় লাগতেই পুরো শরীর কেঁপে উঠল আতঙ্কে। বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন যেন উন্মত্ত ঢাকের মতো আছড়ে পড়ছে বারবার।
অভ্র ধীরে ধীরে আরও ঝুঁকে এলো তার মুখের কাছে। চোখদুটো রক্তিম ক্রোধে জ্বলছে, যেন সামান্য উসকানিতেই সবকিছু ছিন্নভিন্ন করে ফেলবে। তার আঙুলের চাপ রাহার ঘাড়ে ক্রমেই শক্ত হতে লাগল।
দমচাপা গর্জনে বলে উঠল,
“ভাবছিস পালিয়ে বাঁচবি? আমার চোখ ফাঁকি দিয়ে কেউ কোথাও যেতে পারে না। আর তুই তো আমার হাতের মুঠোয় বন্দি।”
রাহা ঠোঁট কাঁপিয়ে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু ভয়ে শব্দগুলো গলাতেই আটকে গেল। ঠান্ডা ঘামে ভিজে উঠেছে তার কপাল। চোখের কোণে জমতে থাকা অশ্রু চিকচিক করছে ম্লান আলোয়।বরফের খণ্ডগুলোর শীতলতা তার শরীর ভেদ করে মজ্জায় পৌঁছে যাচ্ছে, যেন রক্তও জমে আসছে ধীরে ধীরে।
হঠাৎ অভ্র ফলাটা গলার পাশ ঘেঁষে ধীরে টেনে নিয়ে ফিসফিসিয়ে উঠল—
“আজ তোকে এমন শিক্ষা দেব… এই রাতটার বিভীষিকা মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত ভুলতে পারবি না।”
ঘরের নিস্তব্ধতা তখন আরও ভারী হয়ে উঠেছে। শুধু শোনা যাচ্ছে রাহার কাঁপতে থাকা নিঃশ্বাস আর ধাতব ফলার ঠান্ডা ঘর্ষণের ক্ষীণ শব্দ।
সমস্ত শরীর ধীরে ধীরে অবশ হয়ে আসছিল… যেন দেহের প্রতিটি শিরা থেকে শক্তি নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। হাত-পা আর কোনো নির্দেশ মানছিল না, নিস্তেজ হয়ে পড়ছিল পুরো শরীরটা। তবুও মৃত্যুভয় তো সহজে মানুষকে ছেড়ে যায় না—প্রাণ বাঁচানোর শেষ আকুতিতে সে বারবার মাথা নেড়ে ‘না’ বোঝানোর চেষ্টা করছিল।
দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল অবিরাম। কান্নায় ভেজা মুখটা কাঁপছিল আতঙ্কে, আর বুকের ভেতর ধুকপুক করা হৃদপিণ্ড যেন যেকোনো মুহূর্তে থেমে যাবে।
অভ্র নির্মম ভঙ্গিতে ছুরিটা গলার দিক থেকে একটানে বের করতেই ক্ষতস্থান চিরে ছলকে উঠল উষ্ণ তাজা রক্ত। লাল রক্তের ধারা মুহূর্তেই ঝরে পড়তে লাগলো গলা বেয়ে নিচের দিকে। রক্তমাখা ধারালো ছুরিটা ধীরে এনে রাহার চোখের সামনে ধরতেই তার চোখদুটি আতঙ্কে আরও বড় হয়ে উঠল। যেন সেই দৃশ্যই তার ভিতরের শেষ সাহসটুকু গুড়িয়ে দিলো। তার জীবনের হয়তো এখানেই সমাপ্তি ঘটলো।
পরক্ষণেই সমস্ত শক্তি হারিয়ে নিথর দেহটা ঢোলে পড়ল অভ্রের বাহুতে।
—————
ইভান ও রাহার দলবল সহ বাসায় ফিরতে ফিরতে ঘড়ির কাটায় রাত সাড়ে দশটা ছুঁইছুঁই ।
তবে এতটা রাত করে ফেরায় কারও ভেতর তেমন কোনো বিরক্তি বা অস্বস্তি দেখা যায়নি। বরং পুরো বাড়ি জুড়েই ছিল এক উষ্ণ, প্রশান্তিময় আবহ।
ইভানের মা, আফরোজা বেগম—নিজের বোনের মেয়েকে সামনে পেয়ে যেন আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠেছিলেন। বাসায় পা রাখতেই তিনি পরম স্নেহ আর মাতৃত্বের মায়ায় রাহাকে বুকে টেনে নেন। সেই আলিঙ্গনে ছিল বহুদিনের শূন্যতা পূরণের প্রশান্তি।
শুধু রাহাই নয়, শিফা, অবন্তিকা আর সাফাকেও তিনি একই আন্তরিকতায় আগলে নিয়েছিলেন। মেয়েগুলোর আগমনে যেন পুরো বাড়িটাই প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
মাইনুদ্দিন মির্জা ও আয়াতও তাদের দেখে ভীষণ আনন্দিত হয়েছিলেন। বিশেষ করে আয়াত—এতদিন পর নিজের খালাতো বোনকে কাছে পেয়ে তার উচ্ছ্বাস যেন বাঁধ মানছিল না। তার সঙ্গে নতুন তিনজনকেও পেয়ে মুহূর্তেই আপন করে নিয়েছিল সে।
রাহা হঠাৎই বেলি ফুলের মালাটা বের করে ভালোবাসা ভরা হাসি নিয়ে আয়াতের হাতে পরিয়ে দেয়। ঠিক তখনই অকারণেই সানার কথা মনে পড়ে যায় তার। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক নরম অনুভূতি দোলা দিয়ে ওঠে।
মালাদুটো হাতে পেয়ে আয়াত বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইল। স্নিগ্ধ এক ভালো লাগা ধীরে ধীরে ছেয়ে গেল তার মুখজুড়ে।
— “এগুলো কোথায় পেলে?”
রাহা কিছু বলার আগেই ইভান মৃদু হেসে উত্তর দিল,
— “ওই ক্যাফেটাতেই।”
আয়াত ভ্রু কুঁচকে অবাক স্বরে বলল,
— “ক্যাফে?”
ইভান এবার মাথা নেড়ে শান্ত গলায় বলল,
— “হুম,আমরা আসার সময় ওখানেই গিয়েছিলাম।”
— “আআআআ, ভাইয়াআআ?? আমাকে ছাড়াই গেলে?”
কথাটা বলেই আয়াত ঠোঁট ফুলিয়ে একেবারে ন্যাকামো মেশানো কান্না জুড়ে দিল। মুখভর্তি অভিমান যেন উপচে পড়ছে।
ইভান সাথে সাথে বিরক্তি ভরা ভান করে বলে উঠল,
— “এই এই ধিঙ্গি মেয়ে, কাঁদছিস কেন? তুই তো ওই জায়গায় একশোবারেরও বেশি গিয়েছিস!”
আয়াত মুখ বাঁকিয়ে আরও গম্ভীর সুরে বলল,
— “তো?”
— “তো মানে? একই জায়গায় কয়বার যায় মানুষ?”
আয়াত এবার ভ্রু নাচিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে উঠল,
— “রাহার সাথে তো আর যাইনি!”
কথাটা শুনে সবাই মৃদু হেসে উঠল।
রাহা এগিয়ে এসে স্নিগ্ধ হাসি দিয়ে বলল,
— “আরে, এভাবে মন খারাপ করো না। আবার একদিন সবাই মিলে যাব। আর জানো? সেখানে একটা মেয়ের সাথেও পরিচয় হয়েছে। ভীষণ মিষ্টি আর আন্তরিক একটা মেয়ে।”
মুহূর্তেই আয়াতের মুখের অভিমান অনেকটা মিলিয়ে গেল। চোখ চকচক করে উঠল আগ্রহে।
— “আচ্ছা, তাহলে পরশুই যাব!”
ঠিক তখনই আফরোজা বেগম সবাইকে থামিয়ে স্নেহমাখা কণ্ঠে বলে উঠলেন,
— “আরে, তোরা কি এখানেই দাঁড়িয়ে সব গল্প শেষ করে ফেলবি নাকি? আগে হাত-মুখ ধুয়ে এসে খেয়ে নে। তারপর সারারাত গল্প করিস। তোরা ফ্রেশ হয়ে আয় আমি খাবার বাড়ছি।”
—————
— অসম্ভব…!!
একসাথেই চিৎকার করে উঠে রাহা, শিফা আর অবন্তীকা। তিনজনের চোখই প্রায় কপালে উঠে গেছে টেবিলভর্তি খাবার দেখে।
ডাইনিং টেবিলজুড়ে একের পর এক পদ সাজানো—গরম ধোঁয়া ওঠা কাচ্চি, রোস্ট, শাহী কোরমা, কাবাব, চিংড়ি মালাইকারি, সালাদ, ফিরনি, জর্দা… যেন ছোটখাটো রাজকীয় দাওয়াতের আয়োজন।
রাহা দুইহাত মাথায় দিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে উঠল,
— খালামণি, তুমি কি আমাদের খাওয়াতে চাও নাকি আজকেই শেষ করে দিতে চাও? এত খাবার মানুষে খায়?
শিফা ঠোঁট গোল করে বলে উঠল,
— আমি এইসব দেখে আবার ক্ষুধা হারিয়ে ফেলছি।
অবন্তিকা সাথে সাথে মাথা নাড়িয়ে বলল,
— না না, আমি এতটুকুও পারবো না। এমনি আগে থেকেই পেট ভরা।
“কিসের অসম্ভব?”
আফরোজা বেগম কপট রাগ দেখিয়ে বললেন,
“ঠিকমতো খাস না বলেই তোদের এই অবস্থা! একেকটা যেন শুকনো বাঁশপাতা হয়ে গেছিস।”
‘বাঁশপাতা’ শব্দটা কানে যেতেই অবন্তিকার হঠাৎ জারিফের কথা মনে পড়ে গেল। মুহূর্তেই তার ঠোঁটের কোণে অচেতন এক মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
সেটা চোখ এড়াল না সাফার। ভ্রু কুঁচকে সে বলল,
“কিরে? একা একা এভাবে হাসছিস কেন? কোনো ভূত-টুত ভর করল নাকি?”
অবন্তিকা দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল,
“আরে না না, তেমন কিছু না। খাবারগুলো দেখে হঠাৎ হাসি পেয়ে গেল।”
সাফা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“তোর কথাবার্তাগুলো দিন দিন আরও রহস্যময় হয়ে যাচ্ছে।”
ঠিক তখনই ইভান সবার দিকে তাকিয়ে শান্ত অথচ আন্তরিক কণ্ঠে বলে উঠল,
“আচ্ছা, সবাই বসো। যার যা ভালো লাগে, নিজের ইচ্ছেমতো নিয়ে খাও। তোমরা এই বাড়ির অতিথি নও, পরিবারেরই একটা অংশ। তাই একদম নিজের বাড়ির মতো স্বাচ্ছন্দ্যে থাকবে।”
ইভানের কথায় সম্মতি জানিয়ে মাইনুদ্দিন মির্জাও স্নিগ্ধ হাসলেন। ইভান একদম ঠিক বলেছে। তোমরা সবাই আমাদের আয়াতের মতোই আপন। তাই কোনো সংকোচ নয়—এ বাড়িকে নিজেদের ঘর ভেবেই থাকবে। তাদের কথা শুনে আফরোজা বেগম হেসে ফেললেন। মমতা ভরা চোখে তিনজনের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— আমার মেয়েগুলো অনেকদিন পর একসাথে হয়েছে। একটু আদর করে খাওয়াবো না?
কথাটার মাঝেই এমন এক উষ্ণতা ছিল যে মুহূর্তেই তিনজন চুপ হয়ে গেল।
বলেই তিনি নিজ হাতে একে একে সবার প্লেটে খাবার তুলে দিতে লাগলেন।
রাহা অসহায় মুখ করে বলে উঠল,
— এই এই…এত দিয়ো না প্লিজ! আমি কিন্তু সত্যি কেঁদে দিবো।
তার কথা শুনে আবারও হেসে ওঠে সবাই।
মুহূর্তেই পুরো বাড়িটা হাসি আর আপন উষ্ণতায় ভরে ওঠে।
সবাই হাসিমুখে খাবার টেবিলে বসলেও, সেটাকে ঠিক খাওয়া বলা চলে না—নাম মাত্র। সারাদিনের ক্লান্তি আর দীর্ঘ ভ্রমণের ধকল যেন সবার শরীর-মনকে নিঃশেষ করে দিয়েছে। কোনোরকম দু’মুঠো খেয়েই একে একে সবাই উঠে পড়ল।
আজ আর কারও আড্ডা দেওয়ার শক্তি নেই। মাত্রই তো এসেছে, এখন দরকার শুধু একটু বিশ্রাম। তাই যে যার রুমে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর..
আফরোজা বেগমের শরীরটা আচমকাই বেশি খারাপ লাগতে শুরু করায় আয়াত তড়িঘড়ি করে মায়ের কাছে চলে আসে। সম্ভবত প্রেশার হঠাৎ করেই ফল করেছে। খবর পেয়েই ইভান দ্রুত এসে প্রেশার মেপে দেখতেই বিষয়টা নিশ্চিত হয়। সঙ্গে সঙ্গে ওষুধ খাইয়ে তাকে বিশ্রাম নিতে বলে সে বেরিয়ে আসে। আর আয়াত থেকে যায় মায়ের পাশেই—আরও কিছুক্ষণ থাকার ইচ্ছে নিয়ে।
ইভান মায়ের রুম থেকে আসার সময় দোতলায় উঠতেই করিডোরের মাঝামাঝি একটি রুমে গভীর রাতে আলো জ্বলতে দেখে ইভানের ভ্রু কুঁচকে ওঠে। কৌতূহলবশত ধীর পায়ে দরজার কাছে এগিয়ে উঁকি দিতেই সামনে ধরা পড়ে এক অপ্রস্তুত দৃশ্য।
—————
শিফার দু'চোখে যেন ঘুমের লেশমাত্রও নেই। রাত অনেক গড়ালেও নিদ্রাদেবী তার চোখের পাতায় ধরা দিতে নারাজ। চারপাশে নেমে এসেছে গভীর নীরবতা, যেন পুরো পৃথিবী ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেছে। রাহারাও নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছে তাই আর তাকে ডাকতে গেলো না। ভেবে শিফা ধীর হাতে বালিশের পাশে রাখা ফোনটা তুলে নিল। স্ক্রিন জ্বলে উঠতেই মৃদু নীলাভ আলো তার কোমল মুখাবয়বে পড়ে এক রহস্যময় আবেশের জন্ম দিল। নিস্তব্ধ রাতের মাঝে সেই আলোয় তার লাজুক মুখশ্রী যেন আরও মোহনীয় ও স্নিগ্ধ হয়ে উঠল।
গ্যালারিতে ঢুকেই চোখ কপালে ওঠার উপক্রম— পুরোটা যেন ৪৪০+ ছবিতে ঠাসা!
রাহা এমন কোনো মুহূর্ত বাদ রাখেনি, যার ছবি সে তোলেনি।
অভ্র রাগের মাথায় রাহার ফোনটা ভেঙে ফেলেছিল বলে নতুন ফোন কেনার সুযোগ এখনও হয়ে ওঠেনি। ভেবেছিল বাসায় ফিরেই কিনবে। তাই এই ক’দিনের জন্য নির্দ্বিধায় শিফার ফোনটাই ব্যবহার করছে।
আর শিফাও ছোট বোনের মতো ভালোবেসে নিজের ফোনটা অনায়াসেই তার হাতে তুলে দিয়েছে।
একের পর এক স্থিরচিত্রে চোখ বুলাতে বুলাতে আজকের প্রতিটা মুহূর্ত যেন আবার জীবন্ত হয়ে উঠছে শিফার মনে।
সারাদিনের ছোট ছোট স্মৃতি, হাসি, কথোপকথন—সবকিছু যেন ছবিগুলোর ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থেকে তাকে নতুন করে অনুভব করিয়ে দিচ্ছে পুরো দিনটাকে।
হঠাৎই তার আঙুল এসে থেমে যায় একটি ছবির উপর—যেখানে ইভান আর সে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।
মুহূর্তের মাঝেই শিফার ভেতর অদ্ভুত এক লাজুক আবেশ ছড়িয়ে পড়ে।
গালদুটো রক্তিম আভায় রাঙা হয়ে ওঠে, বুকের ভেতরটাও কেমন অচেনা অনুভূতিতে ধুকপুক করে ওঠে।
সে বারবার ছবিটা জুম করে দেখছে, যেন চোখ সরালেই সৌন্দর্যময় সেই মুহূর্তটা হারিয়ে যাবে।
ছবিটা সরাতেই সামনে ভেসে ওঠে আরেকটি অপ্রস্তুত মুহূর্ত—যেখানে তারা কেউই ক্যামেরার জন্য প্রস্তুত ছিল না, অথচ দু’জনের দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল একে অপরের দিকেই।
অদ্ভুতভাবে স্বতঃস্ফূর্ত সেই ছবিটাই যেন সবচেয়ে বেশি হৃদয়ছোঁয়া হয়ে উঠেছে। চোখে চোখ রেখে হারিয়ে যাওয়া সেই ক্ষণিক মুহূর্তটায় লুকিয়ে ছিল একরাশ নীরব অনুভূতি, যা ভাষার চেয়েও মূল্যবান।
মৃদু আলোয় ডুবে থাকা নিস্তব্ধ ঘরটা যেন হঠাৎ করেই অন্যরকম হয়ে উঠলো।
চারপাশে সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, অথচ শিফার চোখে একফোঁটা ঘুমও নেই। বুকের ভেতর অকারণ এক উচ্ছ্বাস দোলা দিচ্ছে বারবার।
ফোনটা হাতে নিয়েই লাউড স্পিকারে গান চালিয়ে দিলো সে—
“O re piya haaye... O re piya…”
সুর ভেসে উঠতেই ঠোঁটের কোণে আপনাআপনি হাসি ফুটে ওঠে তার।
খালি পায়ে ধীরে ধীরে বিছানা ছেড়ে নেমে আসে। ঠান্ডা মেঝের স্পর্শে শরীর কেঁপে উঠলেও মনটা যেন আরও বেশি উড়ে যেতে চায়।
দু’হাত আলতো করে ছড়িয়ে চোখ বন্ধ করতেই মনে হলো সে যেন আর এই ছোট্ট ঘরে নেই…
কোনো এক অচেনা স্বপ্নরাজ্যে হারিয়ে গেছে।
“Udne laga kyon man baawla re…”
গানের তালে তালে ধীর পায়ে ঘুরে ওঠে শিফা। তার খোলা চুলগুলো বাতাসে দুলে গিয়ে বারবার মুখ ছুঁয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে নিজেই নিজের দিকে তাকিয়ে লাজুক হেসে ফেলছে।
আজকে কেন যেন তার ভীষণ ভালো লাগছে সবকিছু।
মনে হচ্ছে বুকের ভেতর জমে থাকা হাজারটা অনুভূতি নাচের ভঙ্গিতেই বেরিয়ে আসছে।
শিফা এতটাই নিজের নাচের ছন্দে ডুবে ছিল যে টেরই পেল না—দূরে কেউ একজন নিবিড় মুগ্ধতায় তার প্রতিটি ভঙ্গিমা উপভোগ করে চলেছে। সেই দৃষ্টিতে ছিল এক অদ্ভুত মোহ, চোখের গভীরে চিকচিক করছিল অচেনা কোমলতা আর মাধুর্যের দীপ্তি। বহুক্ষণ ধরে নিঃশব্দে তাকে পর্যবেক্ষণ করছে সে, যেন শিফার প্রতিটি নড়াচড়া তার দম আটকে দিচ্ছে। বুকের ভেতর হৃদস্পন্দনগুলো উন্মত্ত অশ্বের মতো লাগামহীন ছুটে চলেছে।
দরজার পাশে হেলান দিয়ে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে, চোখ সরানোর সামান্য শক্তিটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছে।
আয়াত বের হওয়ার সময় দরজাটা শুধু টেনে দিয়েছিল। কিন্তু শিফা সেটি লক করার কথা সম্পূর্ণ ভুলে গিয়েছিল… কিংবা বলা যায়, সেই মুহূর্তে তার হুঁশই ছিল না।
হঠাৎই ড্রেসিংটেবিলের বড় আয়নায় করো চেহারার উপস্থিতি টের পেয়ে শিফার দৃষ্টি সেদিকে আটকে যায়। মুহূর্তেই তার পদযুগল যেন স্থবির হয়ে পড়ে আতঙ্কে। নিস্তব্ধতার ভেতর দু’জনই একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে অপলক দৃষ্টিতে।
ইভানের সেই ঘোরলাগা, গভীর দৃষ্টি রাহার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক কম্পন তুলল। লজ্জায় যেন মাটির সঙ্গে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে তার। কাঁপা কাঁপা হাতে উড়নার দুই প্রান্ত শক্ত করে চেপে ধরেছে সে, আর নত চোখে নিজের অস্থিরতা আড়াল করার ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছে।
শিফা লজ্জায় হঠাৎ করেই বিপরীত দিকে ঘুরে দাঁড়াতেই ইভানের সম্মোহন ভাঙল। গভীর দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকে দেখার পর ধীর, স্থির পদক্ষেপে এগিয়ে এলো সে—একদম শিফার নিশ্বাসের দূরত্বে।
শিফা এখনও পেছন ফিরেই দাঁড়িয়ে, বুকে ঝড় তুলে দ্রুত শ্বাস নিচ্ছে। হয়তো ইভান বুঝে ফেলেছে
তার মায়াবিনীর অকারণ লজ্জার রহস্যটা।
ইভানের প্রশস্ত বুকের ঠিক সামনে শিফার কাঁপতে থাকা পিঠ। মাঝখানে যেন একফোঁটা বাতাসেরও জায়গা নেই। এতটা কাছে ইভানের উষ্ণ উপস্থিতি অনুভব করতেই শিফা আচমকাই ঘুরে দাঁড়ালো। আর তাতেই তার কোমর ছোঁয়া নরম চুলগুলো উড়ে এসে আছড়ে পড়ল ইভানের মুখজুড়ে।
মুহূর্তেই সেই মাতাল করা সুবাসে হারিয়ে গেল সে। চোখ বন্ধ করে আলতো হাতে চুলগুলো আঁকড়ে ধরে বুকভরা এক দীর্ঘ নিশ্বাস নিল, যেন সেই ঘ্রাণেই লুকিয়ে আছে তার সমস্ত প্রশান্তি।
আর শিফা?
সে তো নিঃশ্বাসহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ইভানের প্রতিটি কর্মকাণ্ডের দিকে। বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠছে বারবার।
ইভান ধীরে ধীরে তার মুখ থেকে চুলগুলো সরাতেই দেখল, শিফা লাজুক ভঙ্গিতে পিছু হটছে।
আর সে?
ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি টেনে একধাপ একধাপ এগিয়ে আসতে লাগল। গভীর, মাদকতা মেশানো কণ্ঠে বলে উঠল—
“Kya jaane tu mere iraade,
Le jaunga saansein chura ke…
Dil keh raha hai gunehgaar ban jaa,
Bada chain hai inn gunaahon se aage…”
তার চোখ দুটো তখন শুধু শিফাতেই আটকে।
*“Main gumshuda si raat hoon,
Meri khushnuma subah tum ho…
Main jo jee raha hoon,
Wajah tum ho…
Wajah tum ho
·
·
·
চলবে……………………………………………………