শিফা এখনও চোখ দু’টো বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। ইভান ঠোঁটের কোণে মুগ্ধতার হাসি ঝুলিয়ে বলল— আমার থেকে দূরে সরে যাওয়ার জন্য নিজেকে এতটা কষ্ট দিচ্ছেন?
শিফা কথাটার গভীরতা বুঝতে না পেরে ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল। — মানে?
ইভান আরও খানিকটা ঝুঁকে এলো।
— এই যে, এতটা চেষ্টা করে শুধু পিছিয়ে যাচ্ছেন।
শিফা মৃদু স্বরে বলল,
— সামনে এগিয়ে আসার সময় এখনও আসেনি।
— তাহলে সেই সময়টা কবে আসবে?
— যেদিন আপনার-আমার সম্পর্ক বৈধতা পাবে...!
কথাটা শুনে ইভানের চোখে একরাশ কোমলতা ভেসে উঠল। কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে থেকে সে বলল,
— তাহলে আপনি বলতে চান, আমাদের মধ্যে সম্পর্ক আছে?
এহেন শিফা কি বলবে বুঝে উঠতে পারছে না।
-- আচ্ছা, আমার জন্য কি আপনার একটুও মায়া হয় না, মায়াবিনী?
শিফা বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে ফেলল। — মায়াবিনী!!
— হুম, মায়াবিনী। কারণ আপনার জন্য আমার অস্থিরতা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। প্রতিটি ক্ষণে আপনাকে দেখার তৃষ্ণা বাড়ে, আপনাকে কাছে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আরও গভীর হয়। এই অনুভূতির নাম আপনি কী দেবেন?
— জানি না।
— তাহলে মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে ফেলছেন কেন?
— মায়ায় পড়ছেন কেন?
ইভানের ঠোঁটে দুষ্টুমি মাখা হাসি ফুটে উঠল।
— আর আপনি পড়ছেন না বুঝি?
মুহূর্তেই লজ্জা এসে গ্রাস করল তাকে শিফাকে। মাথা নিচু করতেই কপালের উপর ছড়িয়ে থাকা নরম ছোট ছোট চুলগুলো খেলা করে নেমে এলো চোখ-মুখের উপর। লাজে তার শুভ্র গালদুটো রাঙা গোলাপের পাপড়ির মতো লাল হয়ে উঠল। নিচু হয়ে থাকা পাপড়িগুলো কাঁপতে লাগল অকারণ অস্থিরতায়। মনে হচ্ছিল, তার সমস্ত লজ্জা, সংকোচ আর না-বলা অনুভূতিগুলো সেই এলোমেলো কেশরাশির আড়ালে লুকিয়ে রাখতে চাইছে সে। আর ইভান? সে মুগ্ধ চোখে শুধু তাকিয়েই রইল— যেন তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই লাজুক রমণীই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য।
ইভান ধীরে ধীরে একফোঁটা উষ্ণ নিশ্বাস ছেড়ে দিল। মুহূর্তেই সেই শীতল স্পর্শ শিফার মুখ ছুঁয়ে যেতেই তার সমগ্র শরীর শিহরিত হয়ে উঠল।
ঠিক তখনই করিডোর থেকে ভেসে আসা পদধ্বনি ইভানকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনল। এক ঝলকেই বুঝে গেল—আয়াত এদিকেই আসছে। তাই আর এক মুহূর্তও দেরি না করে নিঃশব্দে শিফার কাছ থেকে সরে গেল ।
কিছুক্ষণ পর যখন আর কোনো উষ্ণ নিশ্বাস নিজের মুখমণ্ডলে অনুভব করল না, তখন শিফা হঠাৎ করেই চোখ মেলে তাকাল। সামনে কাউকে না দেখে ভ্রু কুঁচকে চারপাশে দৃষ্টি বুলিয়ে নিল।
মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,
— আরে! লোকটা গেল কোথায়?
তারপর ধপ করে পিছনের চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল। ঠোঁটের কোণে অকারণ এক মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। এক হাত তুলে কপাল ছুঁয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে নিজেকেই বলল—
— “হবু ডাক্তার সাহেব, আমাকে ঠিক কোন দুরারোগ্য প্রেমব্যাধিতে আক্রান্ত করলেন আপনি?
এর কোনো প্রতিষেধকও কি আপনার কাছে আছে? নাকি ইচ্ছে করেই এমন এক মায়াবী অসুখ উপহার দিয়েছেন, যার প্রতিটি উপসর্গে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাব আমি? বলুন তো, আপনি কি আমাকে অসুস্থ করতে এসেছেন, নাকি এই প্রেম নামক মরণমুগ্ধ ব্যাধিতেই আজীবন বন্দি করে রাখতে এসেছেন...?”
অমনি আয়াত রুমে ঢুকতেই থমকে দাঁড়াল। সামনে থাকা চেয়ারটায় বসে শিফা কপালে হাত ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে, আর ঠোঁটের কোণে খেলছে এক রহস্যময় হাসি। যেন নিজের কোনো গোপন ভাবনার জগতে হারিয়ে গেছে সে।
আয়াত ধীর গতিতে এগিয়ে এলো। চোখ দুটো সরু করে, ভ্রু কুঁচকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল শিফার দিকে।
মনে মনে ভাবল,
— এত রাতে আপুর আবার কী হয়েছে? একা একা বসে হাসছে কেন?
হঠাৎ শিফা চোখ খুলতেই নিজের মুখের একদম সামনে আয়াতকে দেখতে পেল। মুহূর্তেই ভয়ে আঁতকে উঠে চিৎকার করে উঠল—
— আআআআআ!
আয়াতও চমকে গিয়ে তাড়াতাড়ি বলল,
— আরে আপু! আমি, আমি আয়াত! এভাবে ভয় পাচ্ছো কেন?
শিফা দ্রুত বুকের ওপর হাত রেখে কয়েকবার ফুঁ দিল।
— আল্লাহ! আয়াত তুই এসেছিস?
— তো আর কে আসবে? ভূত নাকি?
— না মানে…
— কোনো মানে-টানে নেই। সন্দেহভরা চোখে তাকিয়ে বলল আয়াত, তুমি একা একা হাসছিলে কেন?
— ক... কোথায় হাসছিলাম? কথাটা বলেই শিফা অস্বস্তি লুকাতে চারপাশে দৃষ্টি ঘুরাতে লাগল।
আয়াতের ঠোঁটে ধূর্ত হাসি ফুটে উঠল। শিফার এলোমেলো ভাব, চোখের পলকে ধরা পড়ে যাওয়ার আতঙ্ক আর অকারণ অস্বীকার—সব মিলিয়ে বিষয়টা তার কাছে বেশ সন্দেহজনক লাগল।
মনে মনে সে বিড়বিড় করে বলল—
— "ডাল মে কুছ কালা হ্যায়..."
তারপর দু'হাত বুকে গুটিয়ে শিফার সামনে দাঁড়িয়ে সন্দেহভরা চোখে তাকিয়ে রইল।
শিফা নিজেকে সামলে নিয়ে কৌতূহলী দৃষ্টিতে জিজ্ঞেস করল,
— কিরে, তুই এত রাতে কোথায় গিয়েছিলি?
আয়াত হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— আম্মুর হঠাৎ প্রেশার অনেকটা নেমে গিয়েছিল। তাই উনার কাছেই ছিলাম।
কথাটা শুনেই শিফার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে উঠল,
— কী বলিস! খালামনির এখন কেমন অবস্থা?
— এখন অনেকটাই স্থিতিশীল। ভাইয়া ওষুধ দিয়ে গেছে। আম্মু ঘুমিয়ে পড়েছে।
শিফার মুখে স্বস্তির ছাপ ফুটে উঠলেও অভিমানের সুর রয়ে গেল।
— তুই একা একা গেলি কেন? আমাকে একবার ডাকতে পারতি।
আয়াত মৃদু হেসে উত্তর দিল,
— তুমি তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলে। তাই আর বিরক্ত করিনি। এখন চলো, শুয়ে পড়ি।
শিফা মনে মনে ঠোঁট বাঁকিয়ে বিড়বিড় করল,
"হুঁহ! কচু ঘুমাচ্ছিলাম!"
তবে মুখে কিছু না বলে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
— আচ্ছা, চল।
—————
সকালের স্নিগ্ধ রবিকিরণ চারপাশকে আলতো করে ছুঁয়ে যাচ্ছে। কুমিল্লার দুলালপুর যেন আজ প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে মোড়ানো। চারদিকজুড়ে বইছে শীতল মন্দবায়ু, যা মুহূর্তেই মনকে প্রশান্তিতে ভরিয়ে দেয়। ব্যস্ত নগরজীবনের কোলাহল থেকে দূরে এই পল্লীঘেরা পরিবেশের নির্মল আবহ সত্যিই হৃদয়গ্রাহী। ইভানদের বাড়িটি শহরাঞ্চলে হলেও একটু ভেতরের দিকে এগোলেই মিলিয়ে যায় নগরীর ব্যস্ততা; চোখের সামনে ভেসে ওঠে সবুজে আচ্ছাদিত গ্রাম্য জনপদের মনোরম দৃশ্যপট। চারপাশের নিস্তব্ধতা, সতেজ বাতাস আর প্রকৃতির অপরূপ সান্নিধ্য স্থানটিকে করে তুলেছে আরও মোহনীয় ও মুগ্ধকর।
সকালের স্নিগ্ধ, প্রশান্তিময় সমীরণ আর প্রাণপ্রশমিত করা কফির অপূর্ব সুবাস—দুটোর মেলবন্ধনে যেন এক অনন্য আবেশ ছড়িয়ে আছে চারপাশে। সামনে খোলা অবস্থায় রাখা কারেন্ট অ্যাফেয়ার্সের বই, এক হাতে জ্ঞানের ভাণ্ডার আর অন্য হাতে ধোঁয়া ওঠা কফির মগ। ইভানের মন-প্রাণ যেন পরম তৃপ্তিতে সিক্ত হয়ে উঠছে।
নিজের খোলা বারান্দার রকিং চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে প্রায় পাঁচ দিন পর আবারও উপভোগ করছে নিজের এলাকার নির্মল, সতেজ বাতাস। প্রতিটি কফির চুমুকে শরীর হয়ে উঠছে আরও সজীব, আরও কর্মোদ্যমী; আর প্রতিটি দমকা হাওয়ায় মন ভরে উঠছে প্রশান্তি, স্বস্তি আর এক অদ্ভুত স্বর্গীয় অনুভূতিতে। মনে হচ্ছে, ব্যস্ততা আর ক্লান্তির সব গ্লানি ধুয়ে-মুছে প্রকৃতি তাকে নতুন করে প্রাণশক্তি উপহার
এই বাড়ির প্রতিটি বারান্দাই খোলামেলা নকশায় নির্মিত—ইভানের বিশেষ পছন্দ আর পরিকল্পনায়। যেন ছাদের অপরূপ দৃশ্য আর মুক্ত প্রকৃতির আবেশ বারান্দায় বসেই নিজের মতো করে উপভোগ করা যায়।
তার হাতে খোলা বই থাকলেও সত্যিই সে পড়ছে কি না, তা বোঝা দুষ্কর। কারণ মনটা বারবার ছুটে যাচ্ছে গত রাতের সেই ঘটনাগুলোর দিকে। স্মৃতিগুলো একের পর এক মনের দুয়ার কড়া নাড়তেই তার তীক্ষ্ণ, হালকা গোলাপি অধরে অজান্তেই ফুটে উঠছে মৃদু হাসির আভা।
বইটি হাতেই রেখে রকিং চেয়ারে মাথা এলিয়ে চোখ বুজে নিল সে। তারপর নিজের মনকেই যেন প্রশ্ন করল—
"আপনি আমার লক্ষ্যে বিঘ্ন ঘটাতে চাইছেন, মেয়ে।
কেন এমন আকস্মিকভাবে আমার জীবনে আপনার আবির্ভাব ঘটল? আমি তো এখন কাউকে নিজের জীবনের সঙ্গে জড়াতে চাইনি। অথচ আপনি ধীরে ধীরে আমার অস্তিত্বের প্রতিটি প্রান্তে জড়িয়ে পড়ছেন।কেন আপনাকে দেখলেই আমার সব সংযম ভেঙে যায়, মায়াবিনী? কেন নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি না? কেন আপনার উপস্থিতি আমার সমস্ত স্থিরতাকে অস্থির করে তোলে? কেন এমন হচ্ছে আমার সঙ্গে?”
এসব ভাবনার ঘোরে ডুবে থাকতেই হঠাৎ পাশের বারান্দা থেকে ভেসে এলো এক তীক্ষ্ণ, কর্কশ চিৎকার। শব্দটা কানে পৌঁছাতেই ইভান চমকে চোখ মেলে তাকাল।
ক্ষণমাত্র দেরি না করে সে তড়াক করে উঠে দাঁড়াল। ভ্রু কুঁচকে বিস্মিত কণ্ঠে বিড়বিড় করে বলল,
— এতো ভোরবেলা আবার এমন আর্তচিৎকার করছে কে?
কৌতূহল আর উৎকণ্ঠা একসঙ্গে দানা বাঁধতেই সে দ্রুত পদক্ষেপে ঘরের ভেতর দিয়ে এগিয়ে গেল। লম্বা করিডোর অতিক্রম করে ছুটে চলল সেই দিকেই, যেখান থেকে হৈচৈ আর চিৎকারের উৎস ভেসে আসছিল
গিয়ে দেখে, রাহারা যে ঘরে ছিল ঠিক সেখান থেকেই সেই আতঙ্কমিশ্রিত বিকট চিৎকার ভেসে আসছে। এক মুহূর্ত দেরি না করে ইভান দ্রুত পায়ে সেদিকে ছুটে গেল।
রুমে প্রবেশ করতেই দেখতে পেল, শিফা শক্ত করে রাহাকে জড়িয়ে ধরে আছে। মেয়েটির মুখজুড়ে স্পষ্ট উদ্বেগ আর আতঙ্কের ছাপ। চিৎকার শুনে বাড়ির সবাইও ছুটে এসেছে। রাহার খালামণি, খালু, আয়াত—সবার চোখেমুখে উৎকণ্ঠা স্পষ্ট।
আর একপাশে অবন্তিকা ও সাফা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে ঘুমের ঘোর এখনও পুরোপুরি কাটেনি।
দৃশ্যটা দেখে ইভানের মনে একরাশ সন্দেহের উদয় হলেও সে তা মুখে প্রকাশ করল না। আগে রাহার অবস্থাটা বোঝা দরকার।
সে দ্রুত রাহার কাছে এগিয়ে গেল। রাহা তখনও চোখ শক্ত করে বন্ধ করে আতঙ্কে কাঁপছে। দু'হাত শূন্যে ছুঁড়ে বারবার অসংলগ্নভাবে বলতে লাগল,
— “আমাকে মারবেন না...আমাকে মারবেন না। আমি আর কোথাও যাব না আপনাকে না বলে। দয়া করে আমাকে ছেড়ে দিন। আমার ভুল হয়ে গেছে..।”
কথাগুলো বলতে বলতে তার কণ্ঠ কেঁপে উঠছিল, আর ভয়ে পুরো শরীরটা থরথর করে কাঁপছিল। যেন কোনো ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের বন্দিদশা থেকে এখনও বেরিয়ে আসতে পারেনি সে।
শিফা বারবার উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে বলে উঠছে,
— “বনু, কী হয়েছে তোর? দেখ, আমরা সবাই এখানে আছি। তাকা আমাদের দিকে,চোখ খোল, বনু!”
কিন্তু রাহা যেন ভয়ের এক অদৃশ্য আবরণে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। আতঙ্কে তার পুরো শরীর কাঁপছে, ঠোঁট থরথর করে কাঁপলেও চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে রেখেছে। যেন চোখ খুললেই আবার সেই বিভীষিকাময় দৃশ্যের মুখোমুখি হতে হবে।
রাহার এমন অবস্থা দেখে তার খালামণির বুক ধকধক করে উঠল। মুখজুড়ে স্পষ্ট উদ্বেগের ছাপ। তিনি কাঁপা গলায় বললেন,
— “রাহা মা, চোখ খোল তো! কী হয়েছে তোর? এমন ভয় পাচ্ছিস কেন?”
মেয়েটার কোনো সাড়া না পেয়ে তার উৎকণ্ঠা আরও বেড়ে গেল। অজানা আশঙ্কায় বুকটা মোচড় দিয়ে উঠছে। বারবার রাহার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন, অথচ মনের ভেতর একের পর এক দুশ্চিন্তার ঢেউ আছড়ে পড়ছে।
ঠিক তখনই ইভান এগিয়ে এসে সামান্য ঝুঁকে রাহার দিকে তাকাল। এক নজর দেখেই বুঝে গেল, মেয়েটা প্রচণ্ড আতঙ্কগ্রস্ত। তার শ্বাসপ্রশ্বাস অস্বাভাবিক দ্রুত, মুখশ্রী ফ্যাকাশে হয়ে আছে।
ভ্রু কুঁচকে মনে মনে ভাবল,
“হঠাৎ এমন হলো কেন? কোনো দুঃস্বপ্ন দেখেছে নাকি? কিন্তু রাতে তো একদম স্বাভাবিকই ছিল!”
শিফাকে উদ্দেশ্য করে ইভান দ্রুত বলে উঠল,
— “শিফা, তাড়াতাড়ি মুখে একটু পানি ছিটিয়ে দিন।”
আফরোজা বেগম তৎক্ষণাৎ সাইড টেবিল থেকে পানির গ্লাস এনে দিলেন। শিফা দ্রুত রাহার মুখে ঠান্ডা পানির ঝাপটা দিতেই শীতল স্পর্শে তার চোখের পাতা সামান্য কেঁপে উঠল। ধীরে ধীরে চোখ মেলে চারপাশে তাকাল সে। কিন্তু শরীরটা জ্বরে যেন পুড়ে যাচ্ছে। কপাল অস্বাভাবিক রকমের গরম, আর গলাটাও ভেঙে কর্কশ হয়ে এসেছে।
মেয়ের এমন অবস্থা দেখে আফরোজা বেগমের মুখজুড়ে গভীর উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ল। তিনি কাঁপা গলায় বললেন,
— “বাবা, ভালো করে দেখ তো আমার মেয়েটার কী হয়েছে! হঠাৎ এমন করছে কেন? রাতে তো একদম ঠিক ছিল!”
কথা শেষ হতেই তার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
ইভান মায়াভরা কণ্ঠে বলল,
— “আহা মা, তুমি কাঁদছো কেন? আমি তো দেখছি। আগে শান্ত হও তুমি।”
বলেই সে রাহার কব্জি ধরে পালস পরীক্ষা করল। কয়েক সেকেন্ড পর তার ভ্রু কুঁচকে গেল। পালস রেট স্বাভাবিকের তুলনায় অনেকটাই ধীর।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে সে দ্রুত কিছু প্রয়োজনীয় ওষুধ আনতে বলল। এক মুহূর্ত দেরি না করে বাড়ির ড্রাইভারকে ফার্মেসিতে পাঠিয়ে দেওয়া হলো।
রাহা ধীরে ধীরে চোখ মেলতেই তীব্র আলোর ঝলকানিতে আবারও পাপড়ি বন্ধ করে ফেলল। কয়েক মুহূর্ত পর সাহস সঞ্চয় করে পুনরায় চোখ খুলে চারপাশে দৃষ্টি বুলিয়ে বোঝার চেষ্টা করল—সে ঠিক কোথায় আছে।
হঠাৎই যেন কোনো অদৃশ্য আতঙ্ক তাকে গ্রাস করল। তড়িঘড়ি করে হাত তুলে নিজের গলা স্পর্শ করে দেখতে লাগল।
—আমার গলা...! আমার গলা...!
কাঁপা কাঁপা আঙুল যখন গলার পেনডেন্টটাকে ছুঁয়ে গেল, তখনই বজ্রপাতের মতো স্মৃতির এক টুকরো ঝলকে উঠল তার মস্তিষ্কে। মুহূর্তেই মনে পড়ে গেল সেই ভয়াল কথাগুলো।
তোর গলাতো ঠিকই আছে বনু।
রাহা দু’হাতে নিজের মাথা চেপে ধরে বসে আছে। তার সঙ্গে ঠিক কী ঘটছে, সে যেন কিছুই অনুধাবন করতে পারছে না। মাথাটা অস্বাভাবিকভাবে ভারী লাগছে, যেন অসংখ্য চিন্তা আর অজানা আতঙ্ক একসঙ্গে এসে ভর করেছে তার ওপর।
ইভান গম্ভীর স্বরে শিফাকে বলল, — ওকে ফ্রেশ করিয়ে কিছু খেতে দিন, তারপর ওষুধগুলো খাইয়ে দেবেন।
শিফা নীরবে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
এদিকে আয়াত লক্ষ্য করল, অবন্তিকা আর সাফার চোখে এখনও ঘুম আর ধকলের ছাপ স্পষ্ট। সে দ্রুত তাদের মুখে ঠান্ডা পানির ঝাপটা দিল। শীতল পানির স্পর্শে দু’জনই কিছুটা চেতনা ফিরে পেল এবং ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে লাগল।
আয়াত তাদের দিকে তাকিয়ে বলল, — যাও, তোমরা ফ্রেশ হয়ে এসো। তারপর নিচে গিয়ে কিছু খেয়ে নিও।
কিন্তু ইভানের মনে হঠাৎই এক অদ্ভুত খটকা লাগল।দেখলো বেলকনির দরজা খোলা। ধীর পায়ে সে বেলকনির দিকে এগিয়ে গেল। চারপাশে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল, তবে প্রথমে সন্দেহজনক কিছুই চোখে পড়ল না। ফিরে আসতে গিয়েই নজরে এলো মেঝেতে পড়ে থাকা একটি সাদা রুমাল।
ভ্রু কুঁচকে নিচু হয়ে দুই আঙুলে রুমালটি তুলে সামনের দিকে ধরতেই নাকে এসে লাগল ক্লোরোফর্মের তীব্র, ঝাঁঝালো গন্ধ।
মুহূর্তেই ইভানের প্রখর মস্তিষ্কে সতর্কতার ঘণ্টা বেজে উঠল। ঘটনাটা আর সাধারণ কোনো ব্যাপার বলে মনে হলো না। কেউ পরিকল্পিতভাবে কিছু করেছে—এ ব্যাপারে সে প্রায় নিশ্চিত। কিন্তু এত বড় দুঃসাহস দেখানোর সাহস কার হলো, সেটা তাকে খুঁজে বের করতেই হবে।
তবুও আপাতত পরিস্থিতি শান্ত রাখতে বিষয়টি গোপন রাখার সিদ্ধান্ত নিল সে। সবার উদ্বেগ কমাতে ঘটনাটিকে নিছক দুঃস্বপ্নের ফল বলে উড়িয়ে দিল। আর অন্তিকা ও সাফাকে বুঝিয়ে বলল, গতকালের দীর্ঘ যাত্রার ধকলেই শরীর দুর্বল হয়ে পড়েছে, তাই এমন অস্বাভাবিক অনুভূতি হচ্ছে।
কিন্তু শিফার দৃষ্টি যেন তার মুখ ভেদ করে ভেতরের সত্যটা খুঁজে বের করতে চাইছিল।
"অদ্ভুত তো... আমি তো ঠিকই আছি। আমিও তো একই যাত্রা করে এসেছি!" — কথাটা না বললেও তার চোখে-মুখে স্পষ্ট ফুটে উঠছিল।
শিফার সেই অনুসন্ধিৎসু, ইঙ্গিতপূর্ণ দৃষ্টি টের পেয়েও না দেখার ভান করল ইভান। কারণ সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারছিল, শিফার চোখে ভাসতে থাকা প্রশ্নগুলোর আসল অর্থ কী।
ইভানের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে উঠল। এক মুহূর্তও দেরি না করে দ্রুত পায়ে বাড়ির সিকিউরিটি রুমের দিকে এগিয়ে গেল। ঘটনার রহস্য উদঘাটনের জন্য এখন একটাই উপায়— সিসি ক্যামেরার ফুটেজ চেক করা।
দ্রুত পায়ে সিকিউরিটি রুমে ঢুকে পড়ল ইভান। মুখের কঠোরতা দেখে দায়িত্বে থাকা গার্ডও কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পেল না।
— “গত রাতের সব ফুটেজ চালাও। বিশেষ করে উত্তর পাশের করিডোর আর বেলকনির ক্যামেরাগুলো।”
গভীর কণ্ঠে বলল ইভান।
মনিটরের সামনে বসতেই একের পর এক ফুটেজ স্ক্রিনে ভেসে উঠতে লাগল। রাত বারোটার পর পর্যন্ত সবকিছুই স্বাভাবিক ছিল। বাড়ির সবাই নিজ নিজ কক্ষে, চারপাশও ছিল নিস্তব্ধ ও শান্ত।
হঠাৎ রাত প্রায় এক’টার দিকে একটি ছায়ামূর্তি করিডোরে দেখা দিল।
ইভানের দৃষ্টি আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।
ব্যক্তিটি মাথা থেকে পা পর্যন্ত কালো পোশাকে আবৃত। মুখও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। সে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছে, যেন বাড়ির প্রতিটি কোণ তার চেনা।
ফুটেজটা জুম করতেই দেখা গেল লোকটার ডান কবজিতে কালো রঙের একটি দামী ব্র্যান্ডের ঘড়ি। পরনে ছিল গাঢ় রঙের হুডি জ্যাকেট, যা মুখের বেশিরভাগ অংশ আড়াল করে রেখেছে। আর বাম কবজিতে চকচকে ধাতব কোনো বস্তু ঝলসে উঠছিল, যেন স্টিলের ব্রেসলেট কিংবা বিশেষ ধরনের ব্যান্ড।
ইভান চোখ সরু করে তাকাল।
পরের মুহূর্তেই ছায়ামূর্তিটি রাহাদের বেলকনির দিকের রাইট স্লটে ঢুকে গেল। কয়েক মিনিট কোনো নড়াচড়া দেখা গেল না।
তারপর আবার সে বেরিয়ে এলো।
কিন্তু এবার তার হাতে কিছু নেই।
ইভানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
ক্লোরোফর্মের রুমাল... রাহার আতঙ্কিত অবস্থা... আর এই রহস্যময় অনুপ্রবেশকারী—
সবকিছু যেন এক সুতোয় গাঁথা।
ঠিক তখনই ফুটেজে আরও একটি বিষয় চোখে পড়ল।লোকটা বের হওয়ার সময় হঠাৎ এক সেকেন্ডের জন্য মুখ তুলে ক্যামেরার দিকে তাকিয়েছিল...
আর সেই ক্ষণিক দৃশ্য দেখে ইভানের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
কারণ সেই মুখটা তার সম্পূর্ণ অপরিচিত নয়!
ইভান আনমনে ফিসফিস করে বলে উঠল,
— "অভ্র…”
কিন্তু কেন এমন করলো?
এখন আর কোনো সন্দেহ রইল না—এটা অভ্রেরই কাজ। কিন্তু রাহার সঙ্গে এমনটা করার কারণ কী?
প্রশ্নটা মাথায় আসতেই ইভানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। অভ্রের এই নোংরা কাণ্ডের কথা ভেবে তার ভেতরে ক্ষোভের আগুন দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। দুই হাত অজান্তেই মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেল, শিরাগুলো টানটান হয়ে ফুটে উঠল। চোখে-মুখে স্পষ্ট হয়ে উঠল তীব্র ক্রোধের ছাপ। অভ্রকে এর জবাবদিহি করতেই হবে।
তার আগে রাহাকে সামলাতে হবে..।
·
·
·
চলবে……………………………………………………