সন্ধ্যার আলোয় রাস্তার দুইসাইডের বাতি গুলো জানান দিচ্ছে— রাত নামতে বেশি দেরি নেই। প্রায় তিন ঘণ্টা ড্রাইভ করে ইভান গাড়ির ব্রেক কষল তাদের কাঙ্ক্ষিত স্থানে।গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ করে একবার পাশের সিটে তাকাল। বাইরে সন্ধ্যা ধীরে ধীরে রাতের দিকে ঝুঁকছে, আর গাড়ির ভেতরে নিঃশব্দে ঘুমিয়ে আছে শিফা। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। দীর্ঘ পথের ক্লান্তিতে মাথাটা সিটের সঙ্গে হেলান দিয়ে আছে। এলোমেলো চুলগুলো বারবার মুখের ওপর এসে পড়ছে, অথচ সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ তাকিয়ে থেকে ইভানের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হালকা হাসি ফুটে উঠল।
মেয়েটা পুরো রাস্তা জুড়েই একটার পর একটা কথা বলে শেষমেশ কখন ঘুমিয়ে পড়েছে, সে নিজেও বুঝতে পারেনি। আর সারারাস্তা রাহা আর তার দুই বান্ধবীর অবিরাম বকবক শুনতে শুনতে ইভানের যেন কানের বারোটাই বেজে গেছে। একজন থামলে আরেকজন শুরু করছে—হাসাহাসি, খুনসুটি আর দুষ্টুমিতে পুরো পথটাই সরগরম হয়েছিল।
দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ইভান গাড়ি থামালো একদম পুরোনো সেই “নীল অরণ্য রিসোর্ট”-এর সামনে।
জায়গাটা এখনো আগের মতোই নিস্তব্ধ, নির্জন আর মোহনীয়। রিসোর্ট থেকে একটু সামনেই সেই পরিচিত ক্যাফেটা। তবে সেখানে পৌঁছাতে হলে পার হতে হয় সরু এক নদী। আর নদী পারাপারের জন্য তৈরি করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন একটা ঝুলন্ত সেতু। সেতুটার দুইপাশে ছোট ছোট আলোকবাতি জ্বলছে, যা সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারে আরও বেশি মায়াময় লাগছে। পুরোনো সেই রিসোর্টটার ঠিক সামনেই ছোট্ট কাঠের তৈরি ক্যাফেটা এখনো আগের মতোই দাঁড়িয়ে আছে। হলুদাভ আলোয় ভেসে থাকা জায়গাটা দূর থেকেই এক অদ্ভুত শান্তির অনুভূতি দিচ্ছে।ক্যাফের সামনে টাঙানো ছোট ছোট লাইটগুলো বাতাসে দুলছে, আর ভেতর থেকে ভেসে আসছে ধীর সুরের গান।
নদীর জলে সেই আলো চিকচিক করছে, আর শীতল বাতাস বারবার ছুঁয়ে দিচ্ছে চারপাশ।
চারদিকে বিশাল গাছপালা, মৃদু আলো, নদীর কলকল ধ্বনি আর দূর থেকে ভেসে আসা ক্যাফের সুরেলা গান—সব মিলিয়ে পরিবেশটা এতটাই মনোমুগ্ধকর লাগছিল, যেন বাস্তব নয়, কোনো স্বপ্নিল দৃশ্য।
পুরোটা ক্যাফে যেন কাঠ আর কাঁচের নিখুঁত মিশেলে গড়া এক শান্তির ঠিকানা। সেখানে বসলেই মনটা অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে যায়, যেন সারাদিনের সমস্ত ক্লান্তি মুহূর্তেই মিলিয়ে যায়। দিনের শেষে এখানে এসে এক পসরা সুখ আর স্বস্তি অনুভব হয়।
আর কফির কথা তো না বললেই নয়— তার সুবাস আর স্বাদ যেন আলাদা এক মুগ্ধতা ছড়িয়ে দেয়।
একে একে সবাই গাড়ি থেকে নেমে ভেতরের দিকে এগিয়ে যায়।
রাহা, অবন্তিকা আর সাফা তো নেমেই চারপাশ ঘুরে ঘুরে দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। দূর থেকে ঝুলন্ত ব্রিজটা চোখে পড়তেই তারা খুশিতে আত্মহারা হয়ে যায়। কার আগে কে সেখানে যাবে, সেই উত্তেজনাতেই যেন তাদের চোখ-মুখ ঝলমল করে উঠেছে।
অন্যদিকে শিফা?
শুরুতে সবার সঙ্গে গল্পে মেতে থাকলেও, দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তিতে একসময় চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়েছিল। মাথাটা জানালার সঙ্গে হেলান দিয়ে নিশ্চিন্তে তন্দ্রায় ডুবে আছে সে।
গাড়িতে রয়ে গেছে শুধু ইভান আর শিফা…
শিফার ঘুমন্ত মুখটা যেন সন্ধ্যার নরম আলোয় আরও দীপ্তি ছড়াচ্ছে। চোখ ফেরানো দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইভান নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে তার সামনে বসে থাকা সেই মায়াবিনীর দিকে।
শিফাকে ডাকতে গিয়ে একটু ঝুঁকতেই থেমে যায় সে— মায়াভরা মুখশ্রীটা যেন তাকে মুহূর্তেই স্তব্ধ করে দিয়েছে।
অজান্তেই তার ঠোঁট ফসকে বেরিয়ে আসে—
— “মায়াবিনী।।”
তারপর খুব আস্তে, নিজের মনেই বলে ওঠে—
— “কি এমন মায়ায় ফেলছেন আমায়…? আমি তো কাউকে সেই অধিকার দিইনি। তবে আপনি কেন এভাবে আমায় আপনার মায়ায় জড়িয়ে ফেলছেন? পরে সামলাতে পারবেন তো…?”
হঠাৎই রাহার ডাকে ঘোর কাটে ইভানের।
তাকিয়ে দেখে, রাহা ভ্রু কুঁচকে দু’হাত বুকের ওপর ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে গম্ভীর ভাব, আর চোখদুটো সন্দেহভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকেই।
ফট করে সরে যায় ইভান। যেন হাতেনাতে ধরা পড়ে গেছে।
দ্রুত গলাটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বলে ওঠে—
— “এই শিফা, উঠুন…”
তারপর শিফার পাশের জানালার কাঁচ নামিয়ে একটু অপ্রস্তুত, ধরা পড়ে যাওয়া ভঙ্গিতে বলল—
— “ও ঘুমাচ্ছিল, তাই ডাকছিলাম…”
রাহা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল—
— “ওই আচ্ছা। কিভাবে ডাকছেন যে এখন পর্যন্ত একটুও নড়লো না। দিব্যি ঘুমিয়েই আছে।”
তারপর ধীরে ধীরে দু’হাত মুখের দু’পাশে এনে হঠাৎ জোরে চিৎকার করে উঠল—
— “আপুপুপু!!!”
তার চিৎকারে ইভান সাথে সাথেই দুই কান চেপে ধরে মুখ কুঁচকে ফেলল।
আর শিফা ধড়ফড় করে ঘুম থেকে উঠে বসল।
ভয়ভরা চোখে চারপাশে তাকিয়ে শব্দের উৎস বোঝার চেষ্টা করতে লাগল সে। তারপর পাশ ফিরে ইভানকে ওই অবস্থায় দেখে আরও একটু হতভম্ব হয়ে যায়। আবার অন্য পাশে তাকাতেই দেখে, রাহা কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে— ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ঝুলিয়ে।
শিফার বুঝতে আর একটুও দেরি হলো না,
এই কাণ্ডটা কার কাজ।
ইভান অসহায় চোখে একবার শিফার দিকে, আরেকবার রাহার দিকে তাকাতে লাগল। যেন মাথার ওপর পড়ে যাওয়া পুরো পরিস্থিতিটাই সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।
শিফা রেগে গিয়ে বলে উঠল—
— “এই মেয়ে! এভাবে কেউ ডাকে নাকি?”
রাহা একদম নির্লজ্জ ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল—
— “তো কী করবো? এমন ঘুম ঘুমাচ্ছো যে ইভান ভাইয়া পর্যন্ত সেটা ভাঙাতে পারছে না। উনার ডাক নাকি তোমার কান পর্যন্তই যাচ্ছিল না!”
“আমাকে কখন ডাক দিল…??” বাঁকা দৃষ্টিতে ইভানের দিকে তাকিয়ে বলল সে।
ইভান অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে এক ঢোক গিলে প্রসঙ্গ বদলে বলল, “আচ্ছা আচ্ছা, এখন তাড়াতাড়ি চলো। অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
রাহা সঙ্গে সঙ্গেই মুখ বাঁকিয়ে বলে উঠল, “বাহ! নিজেরাই এতক্ষণ দেরি করলো, এখন আবার আমাদেরই তাড়া দিচ্ছে! চলুন চলুন, রাত তো প্রায় নেমেই গেছে।”
“হুম… চলো তাহলে।”
রাহা আর তার বান্ধবীরা ঝুলন্ত সেতুর উপর দাঁড়িয়ে টুপটাপ কয়েকটি ছবি তুলে নিল।
তাদের কাছে মনে হচ্ছিল, এমন মনোমুগ্ধকর মুহূর্তগুলো ফ্রেমবন্দি না করলে যেন বড়সড় ক্ষতি হয়ে যাবে।
তাদের খানিকটা পেছনে হেঁটে আসছিল শিফা, আর তারও আরও কিছুটা দূরে ছিল ইভান।
একসাথে পাশাপাশি চললে যদি রাহাদের মনে কোনো সন্দেহ জাগে, তাই ইচ্ছে করেই দু’জন নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে হাঁটছিল।
রাহা একটানে শিফাকে নিজের পাশে টেনে এনে ঝটপট কয়েকটা সেলফি তুলে ফেলল।
ইভানকে ডাক দিতেই সে প্রথমে না-না করছিল।
কিন্তু শিফার দিকে তাকিয়ে হয়তো বুঝতে পারল, সেও চাইছে ইভান তাদের সাথে একটা ছবি তুলুক। তাই ইভান কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখেই শিফার পাশে এসে দাঁড়াল, আর রাহা তাদের ছবি তুলে দিল।
এরপর রাহা অবন্তিকাকে বলল তাদের তিনজনের একটা ছবি তুলে দিতে।
মাঝখানে রাহা, আর দু’পাশে ইভান ও শিফা দাঁড়াল। কয়েকটা ছবি তোলার পর হঠাৎই রাহা দুষ্টুমি ভরা হাসি দিয়ে সেখান থেকে সরে গেল।
তারপর সুযোগ বুঝে ইভান আর শিফার দু’জনের আলাদা কয়েকটা ছবিও তুলে ফেলল।
তারা কেউই ছবিগুলোর জন্য প্রস্তুত ছিল না, তবুও প্রতিটা ছবি অসম্ভব সুন্দর এসেছে। অপ্রস্তুত মুহূর্তগুলোর মাঝেই যেন আলাদা এক সৌন্দর্য লুকিয়ে ছিল, আর সেটাই সবাইকে মুগ্ধ করে দিল।
ব্যাপারটা যে তাদেরও ভীষণ ভালো লেগেছে, সেটা মুখের হাসিই বলে দিচ্ছিল। ব্রিজ পার হয়ে তারা গিয়ে বসল ক্যাফের বাইরের অংশে। ছোট ছোট আলাদা ছাউনিতে সাজানো বসার জায়গাগুলো যেন পুরো পরিবেশটাকে আরও শান্ত আর মনোমুগ্ধকর করে তুলেছিল। ভিতরেও বসার ব্যবস্থা ছিল, তবে তারা সেখানে যায়নি।
কফির উষ্ণতার সাথে বাইরের ঠান্ডা বাতাস, নদীর পাশের নরম আলো আর চারপাশের প্রশান্ত পরিবেশটাও তারা একসাথে উপভোগ করতে চেয়েছিল।
ইভান গিয়ে কফির সঙ্গে কিছু হালকা খাবারেরও অর্ডার দিয়ে এলো।
রাত বাড়তে থাকায় ধীরে ধীরে ক্যাফেতে ভিড়ও বাড়ছিল। চারপাশের প্রতিটা কোণ যেন মানুষের উপস্থিতিতে জমে উঠছিল।
ইভান সবার সাথেই বসে ছিল। হঠাৎ তার ফোনে কল আসতেই সে একটু সামনে গিয়ে রিসিভ করল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে— তার মা, আফরোজা বেগম।
— “কিরে বাবা, আর কতক্ষণ? রাত তো হয়ে যাচ্ছে।”
— “এই তো মা, আর এক ঘণ্টার মতো। আমরা কাছাকাছিই আছি।”
— “সাবধানে আসিস বাবা।”
— “ঠিক আছে মা।”
কথা শেষ করে ইভান ফোনটা পকেটে রাখল। তার কণ্ঠে ছিল স্বাভাবিক শান্ত ভাব, আর মায়ের কণ্ঠে স্পষ্ট চিন্তার ছাপ।
ফোনটা কেটে সামনে তাকাতেই ইভানের চোখ পড়ল এক মেয়ের দিকে।বয়স ষোলো বা সতেরো হবে। হাতে বেলিফুলের মালা নিয়ে সে ধীরে ধীরে সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল।
ইভান সঙ্গে সঙ্গে ডাক দিল,
— “এই শোনো!”
মেয়েটি থেমে ঘুরে দাঁড়াল। মুখে মিষ্টি হাসি টেনে বলল,
— “জ্বি ভাইজান, বলুন?”
ইভান একটু বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে বলল,
— “ভাই ঠিক আছে… কিন্তু পরেরটা বলো না, প্লিজ!”
তার কথায় মেয়েটিও হেসে ফেলল।
হালকা মাথা নেড়ে আবার সামনে এগিয়ে এলো।
— চলো আমার সাথে।
— কোথায়??
ইভান কোনো উত্তর না দিয়ে হাতের আঙুলের ইশারায় শিফাদের দিকটাই দেখিয়ে দিলো।
তাদের কাছে পৌঁছাতেই মেয়েটির হাতে থাকা বেলি ফুলের মালাগুলো দেখে রাহাসহ সবাই বেশ উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে।
ইভান কিছু বলার আগেই রাহা দ্রুত এগিয়ে গিয়ে চারজনের জন্য চারটি মালা নিয়ে নিলো। এরপর আরও দুটো অতিরিক্ত নেয়, কারণ বাসায় তার খালাতো বোন আয়াত আছে— ওর জন্যও নিতে হবে।
— ছয়টা মালার দাম কত??
— বিশ টাকা করে, ভাইজা….
ওই না না, ভাই । একশ বিশ টাকা হয়েছে।
শিফা আর রাহা চোখ সরু করে সন্দেহভরা দৃষ্টিতে তাকাতেই মেয়েটা তড়িঘড়ি করে সব গড়গড় করে বলে দিল।
তার কথা শুনে সবাই হেসে কুটিকুটি অবস্থা। শিফাও মৃদু হেসে ফেলল।
আর ইভান? তার মধ্যে লজ্জার লেশমাত্র নেই। তার যুক্তি একদম পরিষ্কার— অন্য কোনো মেয়ে তাকে “জান” বলে ডাকবে কেন? সেটা ভাইজান হোক কিংবা খালুজান!
অবন্তিকা মেয়েটিকে বসতে বলতেই সে নরম গলায় জানিয়ে দিল, তার এখনও অনেক কাজ বাকি। এগুলো বিক্রি করতে হবে, বসে থাকলে চলবে না। এসব বিক্রি করেই বাসায় টাকা দিতে হয় তাকে।
কথাগুলো শুনে সবার মনটাই কেমন ভারী হয়ে উঠল।
ইভান মৃদু হেসে মেয়েটির নাম জানতে চাইলে সে বলল, তার নাম সানা।
— তোমার পরিবারে কে কে আছে?
— আমি আর আমার ছোট ভাই।
— আর তোমার বাবা?
মেয়েটার মুখটা মুহূর্তেই ম্লান হয়ে গেল।
— নেই । আমার ভাই যখন দুই বছরের, তখনই বাবা মারা যায়।
— কী হয়েছিল?
— আম্মু বলেছে, কারা নাকি মেরে ফেলেছে।
তার কথায় মুহূর্তেই পরিবেশটা নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
কিছুক্ষণ পর ইভান আবার জিজ্ঞেস করল,
— পড়াশোনা করো?
— জি। দশম শ্রেণিতে পড়ি।
— তাহলে এসব কাজ?
সানা ছোট করে হেসে বলল,
— পড়াশোনার পাশাপাশি ফুলও বিক্রি করি। আম্মু গার্মেন্টসে চাকরি করে। আর আমাদের বাসায় অনেকগুলো বেলি ফুলের গাছ আছে। স্কুল থেকে ফিরে আমি সেগুলো দিয়ে মালা গেঁথে সন্ধ্যায় এখানে বিক্রি করতে আসি।
এসব শুনে সবার চোখই যেন অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল। সানা কতটা সংগ্রাম করে নিজের পরিবারকে আগলে রাখছে, তা ভাবতেই সবার বুকটা ভারী হয়ে গেল।
রাহা আলতো জোর করে তাকে নিজের পাশে বসাল। তারপর মৃদু হেসে বলল,
— তোমাকে আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। ঠিকানাটা রেখে দিও, ঢাকায় গেলে অবশ্যই আমাদের বাসায় আসবে। আর খালার বাসার ঠিকানাও দিয়ে দেব। আমরা যতদিন এখানে আছি, সময় পেলে অবশ্যই আমাদের সাথে দেখা করবে।
মেয়েটি ভদ্র ও নম্র ভঙ্গিতে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাল।
ইভান একহাজার টাকার একটি নোট এগিয়ে দিতেই
মেয়েটি ইতস্তত ভঙ্গিতে বলল,
— আমার কাছে তো ভাঙতি নেই ভাই।
ইভান হালকা হেসে উত্তর দিল,
— ভাঙতি লাগবে না, পুরো টাকাটাই তুমি রাখো।
মেয়েটি সাথে সাথেই মাথা নেড়ে না করে দিল।
— না ভাই, এমনি এমনি আমি টাকা নেব না। এটা আমার স্বভাবের বিরুদ্ধে। আমি পরিশ্রমে বিশ্বাস করি। আমার প্রাপ্যটুকুর বাইরে এক টাকাও বেশি নিতে চাই না।
মেয়েটির আত্মসম্মানবোধ আর ব্যক্তিত্ব সবাইকে মুগ্ধ করল।
তার কথাগুলো শুনে উপস্থিত সবাই প্রশংসার দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
হঠাৎ ইভানের মাথায় একটা ভাবনা এলো।
সে মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করল,
— আচ্ছা, সবগুলো মালার দাম কত?
মেয়েটি দ্রুত হিসাব করে বলল,
— এখানে পঞ্চাশটা মালা আছে। সব মিলিয়ে একহাজার টাকা।
ইভান সাথে সাথেই রাহার দিকে তাকাল।
চোখের ইশারাতেই রাহা সবটা বুঝে গেল।
এক মুহূর্তও দেরি না করে সে মালাগুলো হাতে তুলে নিল, তারপর নিজের বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে ছুটে গেল সেখানে উপস্থিত মেয়েদের কাছে ফুলের মালা উপহার দিতে। হাসিমুখে একে একে সবার হাতে বেলিফুলের মালা তুলে দিচ্ছিল তারা।
কিছু মেয়ে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করতেই রাহা মিষ্টি হেসে বলল,
— এটা আমাদের তরফ থেকে ছোট্ট একটা গিফট।
কথাটা শুনে তারাও সানন্দে মালাগুলো গ্রহণ করল। মুহূর্তেই চারপাশটা হাসি, আনন্দ আর বেলিফুলের মিষ্টি সুবাসে ভরে উঠল।
এভাবেই একসময় সব মালা শেষ হয়ে গেলে
ইভান বাড়তি টাকা এগিয়ে দিয়ে মুচকি হেসে বলল,
— এবার কিন্তু এটা নিতেই হবে। হিসাব সমান সমান।
কথাটা শুনেই মেয়েটির চোখ দু’টো জলে ভরে ওঠে। ইভান তার জন্য খাবারের অর্ডারও করে দেয়। সানা বারবার নিষেধ করলেও কেউ তার কথা শোনেনি। রাহাদের হাতে থাকা মালাগুলো সবাই নিজেদের হাতে পেঁচিয়ে পরে নেয়।এরপর হাসি-ঠাট্টা আর গল্পে জমে ওঠে পুরো আড্ডা।
হঠাৎ রাহার মনে হলো তার চুলের ঝুঁটিটা কিছুটা ঢিলে হয়ে গেছে। তাই সে পুরো চুল খুলে আবার বাঁধতে যায়। ঠিক তখনই হাতের মালাটা গলায় থাকা পেনডেন্টের সঙ্গে জড়িয়ে যায়।
রাহা অসাবধানতাবশত একটু জোরে টান দিতেই পেনডেন্টের হুক খুলে সেটা গলা থেকে পিছলে নিচে পড়ে যায়। তবে রাহা বিন্দুমাত্রও টের পায়নি সেই ঘটনাটা।
কিছুক্ষণ পর তাদের অর্ডার করা কফি ও খাবার এসে পৌঁছায়।
Espresso → এসপ্রেসো
Americano → আমেরিকানো
Cappuccino → ক্যাপুচিনো
Latte → লাতে / ল্যাটে
Mocha → মোকা /
পাঁচজনের পাঁচ রকমের কফি অর্ডার করেছে। আর। সানার জন্য কোল্ড কফি ছিল সেটা একটু পর আসবে।এই ক্যাফেতে প্রায় বিশ রকমের কফি পাওয়া যায়।
রাহা তো পুরো ছবি-বিলাসী! চারপাশের সবকিছুরই ছবি তুলছে, এমনকি খাবারেরও। বাসায় গিয়ে সবাইকে দেখাতে হবে না?
কফির মাদকতাময় সুবাসে যেন সবাই বিভোর হয়ে পড়ে। রাহা নিচু হয়ে গভীরভাবে ঘ্রাণ নিতে নিতে বলে উঠল—
“উফফ… কী দারুণ সুগন্ধ! আহা…”
তার এমন কাণ্ড দেখে সবাই হেসে ওঠে।
শিফা তখন বলে উঠল—
“রাহু, তাড়াতাড়ি খেয়ে নে। রাত হয়ে যাচ্ছে, বাসায় ফিরতে হবে।”
“আহা আপু, এত বকা দিও না তো।
একটু শান্তিতে উপভোগ করতে দাও।”
“তুই তোর উপভোগ নিয়েই থাক,
আমি কিন্তু একাই চলে যাব।”
“আচ্ছা আচ্ছা, রাগ কোরো না আপু। খাচ্ছি তো তাড়াতাড়িই।”
অবশেষে সবার খাওয়া শেষ হলে। তারা বেরিয়ে যেতে নিলে, সানা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
শিফা মৃদু হেসে বলল,
— চলো, তোমাকে পৌঁছে দিই।
সানা মাথা নেড়ে শান্ত স্বরে বলল,
— না আপু, আমি একাই যেতে পারব। এই তো সামনেই আমাদের বাসা। যেতে বিশ মিনিটের বেশি লাগবে না।
— আচ্ছা। ইনশাআল্লাহ্ আবার দেখা হবে। আর সময় পেলে অবশ্যই এই ঠিকানায় যেও। এখান থেকে মাত্র ত্রিশ মিনিটের পথ ইভানদের বাড়ি।
বিদায় জানিয়ে তারা চলে গেল।
সানা কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে বসে রইল। ভাবতে লাগল রাহাদের কথা। কতদিন পর আজ সে প্রাণ খুলে হেসেছে! বুকভরা কষ্ট আড়াল করে অপরিচিত কিছু মানুষের সঙ্গে এতটা স্বাভাবিকভাবে কথা বলেছে। অথচ আপন মানুষগুলোর কাছ থেকেও সে কখনো এতটা আন্তরিকতা পায়নি। তারা তো বরং দূরত্বই তৈরি করে রেখেছে।
বাবা বেঁচে থাকা পর্যন্ত সম্পর্কগুলোও যেন জীবন্ত ছিল। বাবা চলে যাওয়ার পর একে একে সব বন্ধন ফিকে হয়ে গেছে। খোঁজখবর নেওয়ার মধ্যে শুধু নানাবাড়ি থেকে মাঝেমধ্যে মামা খবর নেন।
সত্যিই তো, কথায় আছে—
“বাবা না থাকলে বাবার বাড়ির সম্পর্ক টেকে না, আর মা না থাকলে মায়ের বাড়ির।”
চরম বাস্তবতার মধ্য দিয়েই সানা ধীরে ধীরে বড় হয়েছে।
হঠাৎই কোনো কিছুর ঝলক তার দৃষ্টি কেড়ে নিল। চোখ ফেরাতেই দেখতে পেল টেবিলের এক কোণে সাদা ঝকঝকে একটি ছোট্ট পেনডেন্ট পড়ে আছে— ঠিক যেখানে একটু আগেও রাহা বসে ছিল। মুহূর্তের মধ্যেই সেটা হাতে তুলে নিতেই সানার মনে পড়ে গেল, এই পেনডেন্টটা সে রাহার গলায়ই দেখেছিল। দেখলেই বোঝা যায়, জিনিসটা ভীষণ দামি ও অভিজাত। সাদা পাথরের উপর আলো পড়তেই ঝিকমিক করে উঠছে সেটি। এত সুন্দর আর মূল্যবান জিনিস সে হয়তো আগে কখনও এত কাছ থেকে দেখেনি।
এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, এটা বিক্রি করলে হয়তো কয়েক মাসের সংসার চালানো যাবে। ছোট ভাইটার জন্য নতুন জামা কেনা যাবে, ঘরের বকেয়া টাকাও শোধ করা সম্ভব হবে। কিন্তু পরক্ষণেই নিজের ভাবনাতেই চমকে উঠল সে।
মুঠো শক্ত করে পেনডেন্টটা বুকের কাছে চেপে ধরে ধীরে ধীরে বলল, — “না… এটা আমার না।”
তার চোখে ভেসে উঠল রাহাদের হাসিমুখ, তাদের আন্তরিক ব্যবহার। অচেনা হয়েও তারা তাকে কত আপন করে নিয়েছে! সেই মানুষগুলোর বিশ্বাসের দাম টাকার চেয়েও অনেক বেশি।
সানা তাড়াহুড়ো করে দোকানের বাইরে বেরিয়ে আসে। চারদিকে তাকিয়ে তাদের খুঁজতে থাকে। দূরে রাস্তার মোড়ের কাছে রাহাদের গাড়িটা চোখে পড়তেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সে। তারপর ছোট ছোট পা ফেলে দৌড়ে এগিয়ে যায় তাদের দিকে।
গাড়ির কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাহাদের গাড়ি ততক্ষণে রওনা হয়ে গেছে। রাত তখন প্রায় পৌনে দশটা। আজ তাদের সঙ্গে গল্পগুজবে মেতে থাকায় সানার বাসায় ফিরতে বেশ দেরি হয়ে যাচ্ছে।
সানা মনে মনে ভাবল, এটা সে কালই গিয়ে তাদের হাতে তুলে দেবে। যেহেতু তারা ঠিকানাও দিয়ে গেছে।
পেনডেন্টটি হাতে নিয়ে ধীর পায়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে হাঁটতে লাগল সানা। রিসোর্টের সামনে পৌঁছাতেই তার মনে হলো কেউ যেন পিছু নিয়েছে। হঠাৎ পিছনে ফিরে তাকাতেই দেখল চারপাশ নিস্তব্ধ, কোথাও কেউ নেই।
আবার সামনের দিকে কয়েক কদম বাড়াতেই একই অনুভূতি তাকে আঁকড়ে ধরল। এবার আতঙ্ক ধীরে ধীরে তার মনে গেঁথে বসল।
সানাদের বাড়ির পথটা বেশ নির্জন, মাঝখানে এক ফাঁকা ও সুনসান এলাকা পেরোতে হয়। চারদিকের নীরবতা যেন তার ভয় আরও বাড়িয়ে তুলছিল। মেয়েটি ভীত হয়ে পড়ল ভীষণভাবে।
আরও কিছুটা এগোতেই আচমকা এক লোক সামনে এসে পথরোধ করে দাঁড়াল। বয়স আনুমানিক পঁয়ত্রিশ। নেশাগ্রস্ত দেহ টালমাটাল হয়ে দুলছে।
সানা আতঙ্কে নিজেকে গুটিয়ে নিলো। দ্রুত পিছিয়ে যেতে নিতেই হঠাৎ কারও সাথে ধাক্কা খেল সে। মুহূর্তেই তার সমগ্র শরীর শীতল হয়ে এলো, অজানা আশঙ্কায় বুক কেঁপে উঠল।
রাস্তার মাঝখানে হঠাৎ করেই কয়েকটা ছায়ামূর্তি এসে সানার পথ রোধ করে দাঁড়াল।
চারপাশটা তখন অস্বাভাবিক নিরব। দূরের বাতির ম্লান আলোয় তাদের চোখেমুখে অদ্ভুত কুৎসিত হাসি ফুটে উঠেছে।
একজন ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল—
—“এই রাতে একা একা কোথায় যাও সুন্দরী?”
আরেকজন ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এসে বলল—
—“এত তাড়া কিসের? আমাদের সাথে একটু গল্প করো না।”
সানা ভীত চোখে পিছিয়ে যেতে নিলে একজন পথ আটকে দাঁড়ায়।
—“আরে ভয় পাচ্ছ কেন? আমরা তো শুধু কথা বলতে চাই।”
তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল—
—“রাস্তা ছেড়ে দিন। আমাকে যেতে দিন।”
লোকগুলোর মধ্যে একজন বিকৃত হাসি দিয়ে বলল
—“এত সহজে কি ছাড়া যায়? আজ তো ভাগ্য নিজেই আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।”
সানা দ্রুত পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইলে হঠাৎ পেছন থেকে কেউ তার হাত চেপে ধরে বলে উঠল—
—“দেখেছিস? আগুনের মতো তেজ!”
ছটফট করতে করতে বলে ওঠে সে।
—“ছাড়ুন! প্লিজ ছাড়ুন!”
তার বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ বাড়তেই থাকে। হাতের পেনডেন্টটা শক্ত করে চেপে ধরে সে দ্রুত নিজেকে ছড়ানোর চেষ্টা করল, কিন্তু তারা ধীরে ধীরে তাকে ঘিরে ফেলতেই হঠাৎই পেছন দিক থেকে একজন শক্ত হাতে সানার মুখ চেপে ধরল।
আতঙ্কে তার চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পাঁচজন মিলে তাকে নির্মমভাবে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যেতে লাগল পরিত্যক্ত রিসোর্টের জরাজীর্ণ গোডাউনের দিকে।
সানা প্রাণপণে ছটফট করছে, বারবার নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করছে।
তার গলা থেকে অস্পষ্ট গোঙানির শব্দ বের হচ্ছে, ভয়ে চোখ বেয়ে টপটপ করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।
সে কাঁপতে কাঁপতে মাথা নেড়ে মিনতি জানাচ্ছে যেন তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
গোডাউনের ভাঙাচোরা দরজাটা ঠেলে খুলতেই ভেতরের স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার পরিবেশ যেন আরও বিভীষিকাময় হয়ে উঠল।
মুখ থেকে হাত সরাতেই সানা হাঁপাতে হাঁপাতে কান্নায় ভেঙে পড়ল—
“দয়া করে আমাকে ছেড়ে দিন। আমার কোনো সর্বনাশ করবেন না। প্লিজ,, আল্লাহর দোহাই লাগে।”
তার কণ্ঠে ছিল আতঙ্ক, অসহায়ত্ব আর বাঁচার আকুতি। চারপাশের নিস্তব্ধতা আর অমানবিক হাসিগুলো যেন মুহূর্তটাকে ভয়াবহ করে তুলেছে।
ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে সানার হাত থেকে ছোট্ট ঝকঝকে পেনডেন্টটা ছিটকে পড়ে গেল গোডাউনের দরজার ঠিক বাইরে।
অন্ধকারের মাঝেও সাদা ডায়মন্ডের বস্তুটা ক্ষীণ আলোয় একবার চকচক করে উঠল। মুহূর্তের জন্য তার চোখ সেখানে আটকে গিয়েছিল। ক্ষীণ আলোয় ঝলমল করা পেনডেন্টটা সে স্পষ্টই দেখেছিল, কিন্তু আতঙ্কে জমে যাওয়া শরীর আর মুখ চেপে ধরা হাতের কারণে কিছু বলার বা সেটার দিকে এগোনোর সামর্থ্য তার ছিল না।
গোডাউনের ভেতরটা স্যাঁতসেঁতে অন্ধকারে ঢেকে আছে। দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ে চারদিকে ধুলোর স্তূপ জমে আছে। সানা’কে ধাক্কা মেরে আধভাঙা চৌকির উপর নিক্ষেপ করতেই কাঠের কড়মড় শব্দ উঠল।
সানা কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়ায়।
ভীত চোখে চারপাশে তাকিয়ে এক পা এক পা করে পিছাতে থাকে।
তার বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ যেন পুরো ঘরজুড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
— ভাই, আমাকে যেতে দেন। আমাকে ছেড়ে দেন। আপনাদের পায়ে পড়ছি। হাত জোর করে নিজের ইজ্জত ভিক্ষা চাইছে। বার বার পর্দার দিকে তাকাচ্ছে কেউ হয়তো আসবে তাকে এই জানোয়ার গুলোর হাত থেকে বাঁচাতে।
কাঁপা কণ্ঠে মিনতি করতে থাকে সবার দিকে তাকিয়ে।
কিন্তু পাঁচজন মানুষের সামনে তার অসহায় শরীরটা যেন মুহূর্তেই শক্তিহীন হয়ে পড়ে। সে একদিকে সরে বাঁচার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে আতঙ্কে তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠছে। বারবার তার ছোট ভাইটার মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠছে।
সন্ধ্যায় দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই অপেক্ষারত চেহারা। আর মায়ের ক্লান্ত মুখটা— যে হয়তো এখনো ভাবছে মেয়েটা একটু পরেই বাসায় ফিরবে।
এই চিন্তাগুলো মাথায় আসতেই সানার চোখ বেয়ে টপটপ করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। আরও বিকট শব্দ করে কাঁদতে থাকে।
সে দুহাত জোড় করে আবারও অনুনয় করে ওঠে—
— আমার সর্বনাশ কইরেন না ভাই।
আমার মা মরে যাবে। আমার ভাইটার কেউ নাই।
আমার অনেক স্বপ্ন। আমার বাপ টাও নাই।
বলেই জোরে জোরে কান্না করতে লাগলো
সানার এই আকুতি মিনুতি তাদের কর্ণভেদ করলো না। কারও মন গলাতে পারলো না।
একজন রেগে উঠে বলে,
— এই শালির মুখ বন্ধ কর তো! এসব প্যানপ্যানানি শুনে রাগ উঠতাছে।
আরেকজন দাঁত বের করে কদর্য ভঙ্গিতে হেসে ওঠে।
— “আমরা কি তোকে মেরে ফেলছি নাকি? বেশি না, একটু মজা করমু তো। তুইও মজা পাবি শালী।”
কথাগুলো শুনে সানার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে যায়। সে আরও পিছু হটে দেয়ালের সাথে গা ঠেকিয়ে দাঁড়ায়। চোখ বেয়ে অনবরত পানি গড়িয়ে পড়ছে। লোকটা আবারও বিকৃত ভঙ্গিতে হাসি দিল।
বারবার তার ভাই আর মায়ের মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠছে। মনে হচ্ছিল আজ বুঝি আর তাদের কাছে ফেরা হবে না।
হঠাৎ বাইরে কোথাও কিছু পড়ার শব্দ হতেই একজন চমকে উঠে বলে,
— কে ওখানে?
কয়েক সেকেন্ডের জন্য সবাই থেমে যায়।
সেই সুযোগে সানা ধীরে ধীরে দেয়ালের পাশে সরে দাঁড়ায়। তার হাত কাঁপছিল, নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে। কিন্তু ঠিক তখনই আরেকজন তার হাত শক্ত করে চেপে ধরে।
— পালানোর চিন্তা করস? বেশি চালাকি ভালো না।
সানা ব্যথায় মুখ কুঁচকে ফেলে।
চোখের পানি মুছতে মুছতে মনে মনে শুধু একটা কথাই বলছিল—
“আল্লাহ, আমাকে বাঁচাও।”
একজন হেঁচকা টান মেরেই পুনরায় ভাঙ্গা চৌকির উপর ফেলে দেয়। বুকের উপর থেকে এক টানে উড়নাটা ফেলে দেয় নিচে।
সানা আতঙ্কে কেঁপে উঠে সঙ্গে সঙ্গে দু’হাত আড়াআড়িভাবে বুকের উপর টেনে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করলো। কিন্তু অসহায় মেয়েটি শেষ পর্যন্ত নিজেকে রক্ষা করতে পারলো না। একজন হিংস্রভাবে তার হাত দুটো সরিয়ে কাছে টেনে নিলো। তারপর শুরু হলো তার বিকৃত মানসিকতা আর নিকৃষ্ট কাপুরুষতার জঘন্য প্রকাশ।
অন্ধকার গুদামঘরটা ধীরে ধীরে তার কাছে দমবন্ধ এক দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠল। একের পর এক নিষ্ঠুর নির্যাতনে তার ক্ষতবিক্ষত শরীর আর অবসন্ন মন নিস্তেজ হয়ে পড়তে লাগল।
মেয়েটার চোখের সামনে যেন তার সব স্বপ্ন চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। যে জীবনটাকে এত কষ্ট করে আগলে রেখেছিল, মুহূর্তেই তা বিভীষিকাময় অন্ধকারে তলিয়ে গেল।
প্রতিটি ক্ষণ তার কাছে মৃত্যুযন্ত্রণার মতো লাগছিল।
ব্যথায় জর্জরিত হয়ে সে চিৎকার করছিল, কাঁদছিল, বাঁচার আকুতি জানাচ্ছিল— কিন্তু সেই আর্তনাদ যেন গুদামঘরের দেয়াল ছাড়িয়ে আর কোথাও পৌঁছাতে পারল না।
বাইরের ঘন জঙ্গলে রাতের বাতাস থমথমে হয়ে আছে। দূরে কোথাও নিশাচর পাখির ডাক, শুকনো পাতার মর্মর শব্দ— যেন প্রকৃতিও তার অসহায় কান্নায় স্তব্ধ হয়ে গেছে। অথচ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মতো সেখানে কেউ ছিল না।
ধীরে ধীরে সানার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে।
তার কাঁপতে থাকা ঠোঁট শুধু একবার ফিসফিস করে ওঠে—
“মা।”
—————
…….বর্তমান.....
মেয়েটির বিকৃত অবয়ব দেখে জারিফ কয়েক কদম পিছিয়ে গেল। বুকের ভেতরটা হঠাৎই কেঁপে উঠল তার। কী ভয়ংকর নির্মমতায় না অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে মেয়েটিকে!
ছিন্নভিন্ন ঠোঁট রক্তিম আভা হারিয়ে নীলচে-কালচে রঙ ধারণ করেছে। শরীরের নানা স্থানে লেগে থাকা রক্তের দাগ যেন তার ওপর নেমে আসা পাশবিক নির্যাতনের নীরব সাক্ষ্য বহন করছে। অসহনীয় যন্ত্রণায় জর্জরিত মেয়েটি নিথর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে জারিফের দিকে।
হয়তো তার সেই নীরব চাহনি করুণ আর্তি হয়ে বলতে চাইছে—
এই দুঃসহ নরকযন্ত্রণা থেকে তাকে মুক্তি দিতে।
জারিফ তড়িঘড়ি করে অভ্রের কাছে এসে বলে,
— “বস… উনি রাহা ম্যাম নন।”
কথাটা শুনেই অভ্র সঙ্গে সঙ্গে জারিফের দিকে তাকায়। পরক্ষণেই বুকের ভেতর জমে থাকা আতঙ্ক যেন ভেঙে পড়ে। সে জারিফকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়ে।
অভ্রের অশ্রুতে জারিফের কাঁধের শার্ট ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছে। জারিফও তাকে শক্ত করে আগলে নিলো।
শান্ত কণ্ঠে বারবার বলতে লাগলো—
“রাহা ম্যাম নিরাপদে আছে বস… ডোন্ট ওয়ারি।”
জায়ান এই নিয়ে দ্বিতীয়বার অভ্রকে ভেঙে পড়ে কাঁদতে দেখলো। আর দু’বারের কারণই এক— রাহা।
সাধারণত ছেলেরা নিজের অনুভূতি এত সহজে প্রকাশ করে না। বুকভরা যন্ত্রণা লুকিয়ে রাখতেই অভ্যস্ত তারা। অথচ রাহার ক্ষেত্রে অভ্র যেন সম্পূর্ণ উল্টো। তার অস্তিত্বের প্রতিটি রক্তকণা, প্রতিটি শিরা-উপশিরায় যেন রাহারই বসতি।
একটা মানুষ কতটা আতঙ্কিত, কতটা অসহায় হয়ে পড়লে একটি মেয়ের জন্য এভাবে চোখের জল ফেলতে পারে— তা অভ্রকে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করতো না।
জারিফ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে জায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“মেয়েটাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা কর। আর এই পাঁচটা জানোয়ারকে ঢাকার টর্চার সেলে পাঠানোর সব প্রস্তুতি নাও।”
জায়ানও এক মুহূর্ত দেরি না করে জারিফের নির্দেশ অনুযায়ী সবকিছু সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।
এদিকে অভ্র এখনও জারিফকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে। কাঁপা কণ্ঠে বলতে লাগলো—
“থ্যাংক গড… আ-আ-আ।
“ওই পাগলিটার কিছু হয়ে গেলে আজ আমিও শেষ হয়ে যেতাম। আমার বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বনটাই তো ও।ওকে ছাড়া আমি পুরোপুরি শূন্য… নিঃস্ব। এই জীবনে নিজের বলতে, হৃদয়ের গভীরে আগলে রাখার মতো— শুধু ওই একটাই মানুষ আছে আমার। তার কিছু হলে আমার অস্তিত্বটাই অর্থহীন হয়ে যেত।”
কথাগুলো বলতে বলতেই তার গলা ভারী হয়ে আসে। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু যেন আবারও বাঁধ ভাঙতে চাইছে।
হঠাৎই নিজেকে সামলে নিলো সে।
হাতে থাকা পেন্ডেন্টটা মুঠোবন্দি করে এত জোরে চেপে ধরলো যে আঙুলের শিরাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠলো। মুহূর্তেই তার মুখের কোমলতা মিলিয়ে গিয়ে জায়গা নিলো ভয়ংকর গাম্ভীর্য।
দাঁত কটমট করে কঠিন স্বরে জায়ানের উদ্দেশ্যে বলল,
“রাহার খবর বের কর… এখনই।”
অভ্রের কণ্ঠের ভয়ংকর কঠোরতা শুনেই জায়ান বুঝে গেলো—
আজকে রাহা ম্যাম একবার হাতের নাগালে পেলেই তার জন্য অপেক্ষা করছে ভয়াবহ পরিণতি।
কারণ এই মুহূর্তে অভ্রের চোখেমুখে স্পষ্ট প্রতিফলিত হচ্ছে জমে থাকা ক্রোধ, গভীর আতঙ্ক আর ভালোবাসা হারিয়ে ফেলার উন্মত্ত যন্ত্রণা।
“জ্বি বস…”
বলেই জারিফ ধীর পায়ে একটু সরে দাঁড়ালো।
·
·
·
চলবে……………………………………………………