পরীক্ষা শেষ হতেই যেন বুকভরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো রাহা, অবন্তিকা ও সাফা। কলেজ প্রাঙ্গণের মাঠের একেবারে শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল কৃষ্ণচূড়া গাছটার ছায়ায় এসে বসেছে তারা। আজও অসহনীয় রৌদ্র আর ভ্যাপসা গরমে পুরো পরিবেশ যেন হাঁসফাঁস করছে।
তিনজনের হাতেই ঠান্ডা কোমল পানীয়।
হাসিমুখে সবাই একসাথে চিয়ার্স করেই প্রথম চুমুকটা মুখে দিলো। শীতল পানীয়টা গলা বেয়ে নিচে নামতেই যেন ক্লান্ত শরীরে মুহূর্তেই প্রাণ ফিরে এলো। রাহা বোতলটা দুই হাতে ধরে চোখ বন্ধ করে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।মাথার উপর ছড়িয়ে থাকা কৃষ্ণচূড়ার রক্তিম ফুলগুলো হালকা বাতাসে দুলছে। মাঝে মাঝে দু-একটা ফুল ঝরে পড়ে তাদের পাশেই এসে পড়ছে।
সাফা ঠান্ডা নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল—
“আহ্…! এখন মনে হচ্ছে আবার প্রাণ ফিরে পেলাম!”
সঙ্গে সঙ্গে বাকিরাও হেসে উঠলো।
অবন্তিকা বোতলটা গালে ঠেকিয়ে বিরক্ত মুখে বলল—
“আজকের দাবদাহটা না, একেবারে অসহ্য!”
রাহা মৃদু হেসে আকাশের দিকে তাকালো। কপালের পাশে এলোমেলো চুলগুলো ঘামে ভিজে গাল ছুঁয়ে আছে। তবুও এই ক্ষণটাকে অদ্ভুত শান্ত লাগছে তার কাছে।
পরীক্ষার চাপ শেষ, মাথার উপর কৃষ্ণচূড়ার শীতল ছায়া, আর পাশে তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ দুটো।
রাহা হঠাৎ বোতলটা হাতে ঘুরাতে ঘুরাতে বলে উঠল—
“কাল থেকে কলেজ বন্ধ…! এখন বল তো, কী করা যায়?”
অবন্তিকা এক চুমুক পানীয় খেয়ে আরাম করে গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বলল—
“আবার কী করবো! খাবো, ঘুমাবো, তারপর আবার খাবো।”
সাথে সাথেই সাফাও মাথা নেড়ে গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল—
“সহমত। এই ছুটিতে আমার সাথে কেউ কোনো কাজের কথা বলবি না।”
দুই বান্ধবীর এমন অলস কথাবার্তা শুনে রাহার চোখ কপালে উঠে গেল।
সে হাতের বোতলটা দুই পায়ের ফাঁকে আটকে রেখে আচমকাই দুই হাতে দুজনের রানেই জোরে চিমটি কাটল।
“আআআআআ…!!”
ব্যথায় অবন্তিকা আর সাফা একসাথে কুঁকড়ে উঠে চিৎকার করে উঠলো।
অবন্তিকা নিজের পা চেপে ধরে রাগী চোখে তাকিয়ে বলল—
“এই পাগলি! মানুষ এভাবে চিমটি কাটে নাকি!”
সাফা ব্যথায় মুখ কুঁচকে বলল—
“আমার তো মনে হচ্ছে চামড়াই তুলে ফেলছিস!”
এতো জোরে চিমটি কাটায় অবন্তিকা আর সাফার মনে হচ্ছিল যেন রানের মাংসই খুলে এসেছে।
তার উপর রাহা এখনও দু’জনকে শক্ত করে ধরে রেখেছে।
দু’জনই তড়িঘড়ি করে নিজেদের হাত দিয়ে রাহার হাত সরানোর চেষ্টা করতে করতে একসাথে বলে উঠল—
“এই ছাড় বলছি, সালি!… আহহ!”
সাফা ব্যথায় মুখ কুঁচকে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল—
“রাক্ষস একটা! তোর আর কোথাও পছন্দ হলো না? ডিরেক্ট এখানেই?”
রাহা ঠোঁট ফুলিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল—
“বেশ করেছি! আরও দিবো। তোরা তোদের প্ল্যান কত সুন্দর করে বল ফেললি— খালি আর ঘুমানি! আর আমার কথা একবারও ভাবলি না!”
অবন্তিকা এবার কোনোমতে রাহার হাত সরিয়ে নিজের রান ঘষতে ঘষতে বলল—
“এই এই, তোর কথা আবার কী ভাববো?”
সাফা সঙ্গে সঙ্গে যোগ করল—
“তুই তো এমনিতেও তাই করবি। খাওয়া আর ঘুম— এটাই তো তোর ফুল-টাইম কাজ!”
কথাটা বলতেই দু’জন হেসে উঠলো।
আর রাহা রাগ দেখানোর ভান করে আবারও হাত তুলতেই—
“না না না! আর না!”
বলে দু’জন একসাথে দূরে সরে ।
তোরা কি স্বার্থপর রে? তোদের না দেখে তো আমি থাকতে পারব না। রাহার গলাটা হঠাৎ করেই নরম হয়ে এলো। মুখটাও এমনভাবে ছোট হয়ে গেল যেন এখনই কেঁদে ফেলবে।
সাফা সঙ্গে সঙ্গে ওর গাল টেনে বলল— “এই রাক্ষসনি, আমরা কখন বললাম আমরা দেখা করব না?”
অবন্তিকাও হেসে যোগ করল— “অবশ্যই প্রতিদিন দেখা করব। ঘুরতে যাব, আড্ডা দিব, খাওয়া-দাওয়া করব। এত নাটকীয়তা করার কী আছে?”
রাহা এবার একটু শান্ত হলেও মুখটা এখনও অভিমান করে রেখেছে। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে হঠাৎ বলল—
“আচ্ছা তোরা শোন… আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
সাফা আর অবন্তিকা একসাথে ভ্রু কুঁচকে তাদের মধ্যমণি রাহার দিকে তাকালো।
রাহা ঠোঁট ফুলিয়ে গম্ভীর গলায় বলল— “আমি কিন্তু তোদের ‘না’ কখনোই শুনব না। বাসায় আপত্তি করলেও যেভাবেই হোক রাজি করাবি। ব্যাস, এটাই শেষ কথা!”
অবন্তিকা সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে রাহার একদম সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর সন্দেহভরা চোখে তাকিয়ে বলল—
“এই ছেমরি, আগে বল তো তোর আবার কী উদ্ভট সিদ্ধান্ত?”
রাহা মুহূর্তেই ক্ষেপে উঠে চোখ বড় বড় করে বলল— “কি বললি…? উদ্ভট?”
“না না, যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত… সরি সরি! ওটা মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে।”
অবন্তিকা কথাটা বলেই থেমে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই আবার দুষ্টুমি করে বলে ফেলল—
“আমাদের রাহু রানীর সব সিদ্ধান্তই তো ভেজালসহ আসে—”
কথাটা মুখ থেকে বের হতেই নিজের ভুল বুঝতে পারল সে। সঙ্গে সঙ্গে জিভে কামড় দিয়ে তড়িঘড়ি করে বলল—
“দুর না না! ভেজালসহ না… নির্ভেজাল হয়, নির্ভেজাল!”
রাহা তো রাগী মুখ করে তাকিয়েই ছিল। অবন্তিকার মুখে এমন কথা শুনতেই ধপ করে বসা থেকে উঠে দাঁড়াল।
আর অবন্তিকা সেটা দেখেই বুঝে গেল— এবার তার রক্ষা নেই!
পরক্ষণেই দিল ভোঁ দৌড়— “এই থাম! আমি কিন্তু মজা করছিলাম!”
কিন্তু রাহা কি আর ছাড়ার পাত্রী! সেও সঙ্গে সঙ্গে ওর পিছু পিছু দৌড়ে গেল।
মাঠজুড়ে তখন তাদের ছুটাছুটি আর হাসির শব্দে একেবারে হুলুস্থুল অবস্থা।
সাফা হতভম্ব হয়ে ওদের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। মনে হচ্ছে যেন কোনো টিকিট ছাড়াই সে সরাসরি সার্কাস দেখছে। ছোটবেলার মতো দুষ্টুমি আর ছোটাছুটিতে ওদের এমন উন্মাদনা দেখে সে অবাক হয়ে কপাল চাপড়াল।
অন্যদিকে অবন্তিকার পিছু পিছু ছুটতে ছুটতে রাহা হঠাৎই কারও পিঠে সজোরে ধাক্কা খেয়ে থমকে গেল।
ধাম করে ধাক্কা লাগতেই রাহা একটু পিছিয়ে গেল। কপাল চেপে ধরে চোখ বন্ধ করে সে এক নিঃশ্বাসে বলে উঠল,
“কোন খাম্বা রে তুই! আমার সামনে এসেই দাঁড়ালি কেন? এত বড় মাঠে আর কোথাও জায়গা পেলি না?”
বলেই সে কপালটা আলতো করে ঘষতে লাগল, মুখটা কুঁচকে ব্যথার ভাব স্পষ্ট। কিছুক্ষণ থেমে আবার বিরক্তি মেশানো গলায় বলল,
“উফফ… একদম সোজা এসে লাগল! চোখে কি দেখিস না নাকি?”
রাহার এহেন কথাটা কানে যেতেই মাহাদীর চোখটা তৎক্ষণাৎ তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। ভ্রু কুঁচকে সে চাপা রাগে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল—কে এমনভাবে কথা বলছে, সেটা দেখার আগেই তার মুখে একধরনের কঠোরতা এসে জমে গেল।
কিন্তু সামনে রাহাকে দেখামাত্রই সেই কঠিন ভাবটা এক মুহূর্তেই ভেঙে পড়ল। চোখের তীক্ষ্ণতা নরম হয়ে গেল, ঠোঁটের টান হালকা ঢিলে হয়ে এল। সে অল্প থমকে দাঁড়াল, তারপর যেন নিজের অজান্তেই এক চিলতে হাসি বেরিয়ে এল—যেটা সে দ্রুতই চাপা দেওয়ার চেষ্টা করল।
পরীক্ষা শেষ হওয়ায় চারপাশে শেষমুহূর্তে কথা বার্তা চলছে। অনেক শিক্ষার্থী একে অপরকে বিদায় জানাচ্ছে, কয়েকজন শিক্ষক ও সেখানে উপস্থিত ছিল। মাহাদীও চেষ্টা করছিল নিজেকে স্বাভাবিক ও ক্যাজুয়াল ভাবে ধরে রাখতে।
রাহার দিক এগুতে এগুতে কোটটা একটু টেনে ঠিক করে নিল, গম্ভীর মুখে বলতে শুরু করল,
“হোয়াট দ্য হেল আর ইউ?হোয়াট আর ইউ ইভেন সেইয়িং.?আর ইউ আউট অফ ইয়োর মাইন্ড?”
এমন কর্কশ ও তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর কানে পৌঁছাতেই রাহার পুরো শরীর যেন কেঁপে উঠল। কপালে কাঁপতে থাকা এক হাত রেখে সে ধীরে ধীরে নিভু নিভু চোখ মেলে তাকাল। ঝাপসা দৃষ্টি একটু পরিষ্কার হতেই দেখতে পেল, মাহাদী সহ আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠা মাখা চোখে তার দিকে স্থির হয়ে তাকিয়ে আছে।
মাহাদী ভেতরে ভেতরে দারুণ মজা পাচ্ছিল। রাহার এমন অসহায় ও বিব্রতকর অবস্থা দেখে ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করছিল সে। অন্যদিকে রাহা লজ্জা আর অস্বস্তিতে একেবারে মুখ কালো করে ফেলেছে। যেন মুহূর্তের মধ্যেই তার সমস্ত আত্মবিশ্বাস উধাও হয়ে গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সে তড়িঘড়ি করে নিচু স্বরে বলে উঠল,
— “সরি স্যার…”
মাহাদী ঘুরে শিক্ষার্থীদের বিদায় জানিয়ে ধীর পায়ে রাহার দিকে এক কদম এগিয়ে এলো। তার চোখেমুখে চাপা দুষ্টুমির ঝিলিক, আর ঠোঁটের কোণে লুকানো এক রহস্যময় হাসি স্পষ্ট ফুটে উঠেছিল। সে একদৃষ্টিতে রাহার দিকে তাকিয়ে রইল, যেন ইচ্ছে করেই তাকে আরও অস্বস্তিতে ফেলতে চাইছে।
অন্যদিকে রাহা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। লজ্জা আর অস্বস্তিতে তার গাল হালকা লালচে হয়ে উঠেছে। আঙুলগুলো অস্থিরভাবে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আছে আর ভাবছে,ছি কি বলে ফেলল।
মাহাদী ভ্রু উঁচু করে একটু ঝুঁকে গম্ভীর অথচ খোঁচামিশ্রিত সুরে বলল,
— “আমি খাম্বা?”
কথাটা শুনে রাহা আরও অপ্রস্তুত হয়ে গেল। ঠোঁট কামড়ে কাঁপা কণ্ঠে তাড়াতাড়ি বলে উঠল,
—"হ্যাঁ, পরক্ষণেই বলে ফেলল না, না।
সেটা তো ভুল করে আর কি,
গলার স্বর ক্ষীণ হয়ে আসলো, সরি বললাম তো।”
— “তোমার সরি তে কি আমি ছোট হয়ে গেছি?”
মাহাদীর কথাটা শুনে রাহা এবার রেগে চোখ তুলে তাকাল। তার চোখেমুখে বিরক্তির স্পষ্ট ছাপ, যেন আর একটুও খোঁচা সহ্য করার ইচ্ছে নেই।
চারপাশের নীরবতার মাঝেও তার দ্রুত শ্বাসের শব্দ যেন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল।
রাহার সেই রাগান্বিত দৃষ্টি দেখে মাহাদী হালকা হেসে দু’হাত তুলে শান্ত করার ভঙ্গিতে বলল,
— “কুল, কুল রাহা মেডাম।”
অবন্তিকা তাদের কথোপকথন শুনে ভয়ে একদম চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সেই চিন্তায় তার মুখে স্পষ্ট আতঙ্কের ছাপ ফুটে উঠেছিল। এদিকে সাফাও দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে রাহার পাশে দাঁড়াল।
রাহার দুই পাশে অবন্তিকা আর সাফা দাঁড়িয়ে একসাথে নিচু স্বরে বলে উঠল,
— “দুঃখিত স্যার…”
রাহা তখনও রাগ আর অস্বস্তি নিয়ে মাহাদীর দিকেই তাকিয়ে ছিল। সরি বলার পরও মাহাদীর এমন আচরণে রাহার ভেতরের রাগ যেন আরও বেড়ে গেল। তার মনে হচ্ছিল, লোকটা ইচ্ছে করেই বিষয়টা টেনে তাকে অস্বস্তিতে ফেলছে। অথচ ঘটনাটা পুরোপুরি অনিচ্ছাকৃত ছিল। এক ঝলক দেখেই সে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, কিন্তু মাহাদী যেন সেটা নিয়েই মজা পাচ্ছে।
রাহার বান্ধবীদেরও ভয়ে ভয়ে “দুঃখিত স্যার” বলতে দেখে মাহাদীর মুখের ভাব মুহূর্তেই বদলে গেল। সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
— “এই, তোমরা চুপ থাকো। ওর কি মুখ নেই? ওকেই কথা বলতে দাও।”
তার কণ্ঠের দৃঢ়তা এতটাই তীব্র ছিল যে অবন্তিকা আর সাফা সঙ্গে সঙ্গে চুপ মেরে গেল। চারপাশের বাতাসও যেন আচমকা ভারী হয়ে উঠল।
মাহাদীর এমন আচরণে রাহার ভেতরে জমে থাকা বিরক্তি এবার বিস্ফোরিত হলো। সে রাগে চোখ তুলে সরাসরি মাহাদীর দিকে তাকাল। তার বুক দ্রুত ওঠানামা করছে, চোখেমুখে তীব্র ক্ষোভের ছাপ। দাঁতে দাঁত চেপে কড়া স্বরে বলে উঠল,
— “আর কী বলব? সরি বলেছি তো! এবার কি আপনাকে নিয়ে নাচবো?”
কথাটা বলেই সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। আর মাহাদী কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ থেকে তার সেই রাগী চেহারা দেখছিল। ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে এক চাপা, রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল, যেন রাহার এই আগুনে রূপটাই তাকে অদ্ভুতভাবে টানছে।
রাহার এমন কথায় মাহাদীর ঠোঁটের এক দুষ্টুমিভরা হাসি ফুটে উঠল। সে আরও কয়েক কদম দূরত্ব কমিয়ে সামনে এগিয়ে আসতেই সাফা আর অবন্তিকা অস্বস্তিতে একটু সরে দাঁড়াল।
আর রাহা?
সে রাগে নিজের হাত দুটো শক্ত করে মুষ্টিবদ্ধ করে ফেলল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে, চোখেমুখে জ্বলছে তীব্র বিরক্তি।
রাহার সেই অবস্থা দেখে মাহাদীর মুখের হাসিটা যেন আরও গভীর হয়ে উঠল।
একেবারে রাহার সামনে এসে সে সামান্য ঝুঁকে পড়ল। দু’জনের দূরত্ব এতটাই কমে এলো যে রাহার অস্থির নিঃশ্বাস পর্যন্ত স্পষ্ট টের পাওয়া যাচ্ছিল। মাহাদী ধীরে ধীরে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে নিচু, ভারী কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
— “আমাকে নিয়ে নাচলে অবশ্য আমি কোনো মাইন্ড করব না। যদি বলো, এখনি ডান্স ফ্লোর রেডি করে ফেলি।
কি বলো? শুভ্র পরি…”বলেই চোখ মেরে দেয়।
তার উষ্ণ নিঃশ্বাস কানে লাগতেই রাহার শরীর রাগে কেঁপে উঠল। আর মাহাদীর চোখে তখন খেলা করছিল গভীর দুষ্টুমি আর অদ্ভুত এক মুগ্ধতা।
এমন কথায় রাহার শরীরে যেন আগুন ধরে গেল। ফট করে দুই হাত তুলে মাহাদীকে ধাক্কা দিতে গেল সে।
কিন্তু ধাক্কা দেওয়ার আগেই মাহাদী দ্রুত সরে দাঁড়াল। ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা দুষ্টু হাসি।
কারণ রাহার ওপর তার একদমই ভরসা নেই— কখন এই খোলা মাঠের মাঝখানে এমন কাণ্ড করে বসে যে সত্যিই তার নাক ফেটে যায়!
মাহাদী দু’হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে হেসে বলল,
— “সি ইউ সুন, ডেয়ার!”
বলেই এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করল। আর রাহা দাঁড়িয়ে রইল রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে।
রাহাকে রাগে সাপের মতো ফুঁসতে দেখে অবন্তিকা আর সাফা— দু’জনেরই আর কিছু বলার সাহস হলো না।
কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তারা খেয়াল করল, ধীরে ধীরে পুরো কলেজ ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। দুপুরের আলোও ম্লান হয়ে এসেছে।
শেষ পর্যন্ত সাফা ভয়ে ভয়ে রাহার কাছে এগিয়ে এলো। আলতো করে তার হাতে স্পর্শ করতেই রাহা ঝাঁক করে উঠল।
— “সর এখান থেকে!”
তার চোখ-মুখ তখনও রাগে কঠিন।
— “আর তোদের দুইটাকে বলি, কান খুঁলে শুনে রাখ— তিনটার দিকে রেডি থাকবি। খালামনির বাসায় কুমিল্লা যাবো। কীভাবে কী করবি,বাসায় কি বলবি ,তোরা দুটো জানিস, সেটা আমার দেখার বিষয় না।”
অবন্তিকা আর সাফা একে অপরের মুখের দিকে তাকালো।
রাহা এবার আরও কড়া গলায় বলল,
— “যদি এক মিনিটও দেরি করিস, তাহলে তোদের একদিন, আর আমার যতদিন লাগে!”
কথাটা বলেই সে হনহন করে কলেজ গেটের দিকে বেরিয়ে গেল।
পেছনে দাঁড়িয়ে সাফা ছোট করে ঢোক গিলল।
অবন্তিকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করল,
— “মাহদি ভাই আজকে নিশ্চিত কেয়ামত নামাইছে।”
অবন্তিকা আর সাফা থম মেরে দাঁড়িয়ে রইল—
একজন আরেকজনের মুখের দিকেই শুধু তাকিয়ে।
“যাব বাবা… আমরা আবার কি করে ফেললাম!”
স্যার ঠিক কী বলেছিলেন, সেটা জিজ্ঞেস করার সুযোগটুকুও পেল না তারা। মনে মনে ভাবল, পরে না হয় শুনে নেবে। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার— নিশ্চয়ই খুব সিরিয়াস কিছু হয়েছে। না হলে রাহুর মতো শান্ত মেয়ে এভাবে রেগে যায় না।
দুজনেই গভীর চিন্তায় পড়ে গেল। বাসায় গিয়ে সবকিছু কীভাবে সামলাবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা। কিন্তু যেভাবেই হোক, পরিস্থিতি তো সামলাতেই হবে।
দুজনেই তাড়াহুড়ো করে বাসার উদ্দেশে রওনা দিল। তখন প্রায় দেড়টা বাজে। তিনটার মধ্যেই রাহুদের বাসায় পৌঁছাতে হবে— নইলে সেই মেয়েটা যে তাদের সঙ্গে কী কাণ্ড ঘটাবে, তা ভেবেই গা শিউরে উঠছে।
অবশেষে দুজন দুজনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিজ নিজ গন্তব্যের পথে হাঁটা দিল।
—————
বাসায় ফিরেই রাহা সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। আজ যেন তার ভেতরে জমে থাকা সব রাগ, বিরক্তি আর ক্লান্তি ধুয়ে ফেলতে চাইছে সে।
অনেকটা সময় ধরে শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে রইল। ঠান্ডা পানির ধারাগুলো ধীরে ধীরে তার উত্তপ্ত মাথাটা শান্ত করে দিচ্ছে। শেষমেশ যখন বের হলো, তখন মুখজুড়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। কিছুক্ষণ আগের রগচটা মেজাজটা অনেকটাই থিতিয়ে এসেছে। তবে দীর্ঘক্ষণ পানিতে থাকার কারণে চোখ দুটো টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। ভেজা চুলের ডগা থেকে টুপটাপ পানি ঝরছে, আর সেই অবস্থাতেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে একবার ভালো করে দেখল সে।
হঠাৎ ঠোঁট বাঁকিয়ে নিজের মনেই বিড়বিড় করে উঠল,
— “মেহেদী পাতা। তোকে এমন নাচ নাচাবো না, নিজের নামটাই ভুলে যাবি! নইলে আমার নামও রাহা না!”
কথাটা বলেই মুখ ভেংচি কাটল সে। যেন চোখের সামনেই সেই মানুষটাকে কল্পনা করছে।
তারপর আর দেরি না করে বিছানার পাশে রাখা লাগেজটা টেনে নিল। একে একে কাপড়চোপড় গুছাতে শুরু করল। কিন্তু হাত চললেও মাথার ভেতর তখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে দিনের সব ঘটনা। মাঝে মাঝেই বিরক্তিতে ঠোঁট কুঁচকে যাচ্ছে তার, আবার পরক্ষণেই ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক রহস্যময়ী হাসি ফুটে উঠছে। মনে হচ্ছে সে তার মিশনের আরো কাছে চলে এসেছে।
—————
ফ্ল্যাশব্যাক............
সকালের নাস্তার টেবিলে মুহূর্তের জন্য যেন সব শব্দ থেমে গেল। চামচের টুংটাং আওয়াজ টাও স্তব্ধ হয়ে গেলো।
জানালার ফাঁক দিয়ে আসা নরম রোদ পুরো ঘরটাকে শান্ত করে রেখেছে, কিন্তু পরিবেশের ভেতর অদ্ভুত এক চাপা বিষণ্নতা জমে উঠল।
ইভান গ্লাসটা নামিয়ে শান্ত গলায় বলল,
— খালা, আজকে বিকেল ৩.৩০-এর বাসে চলে যাব। অফিসে জরুরি কাজ পড়ে গেছে।
সাথী বেগম একটু থেমে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— এত তাড়াহুড়ো করে যেতেই হবে বাবা? আর দু’টা দিন থাকলে কী এমন ক্ষতি হতো?
বাড়ির বড় গিন্নি আফসানা বেগম নিজেও অনুরোধ করছেন যেনো আরো কয়দিন থেকে যায়। ইভান ও যে তাদের ছেলের মতোই।
কিন্তু দুইজনের ব্যক্তিত্ব দুই মেরুর মতো
এতক্ষণ মাথা নিচু করে খেতে থাকা রাহা হাত থামিয়ে দিল।
আর শিফা “চলে যাব” কথাটা কানে আসতেই তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন শূন্য হয়ে গেল। ধীর গতিতে মুখ তুলে তাকালো ইভানের দিকে। সে জানত আজকে ইভান চলে যাবে।
ইভানও ঠিক তখনই তার দিকে তাকিয়েছিল।
সকালের নরম আলোয় দু’জনের চোখ কয়েক মুহূর্তের জন্য আটকে রইল।
কেউ কিছু বলল না, অথচ না বলা হাজারটা অনুভূতি যেন তাদের মাঝখানে নিঃশব্দে ভেসে বেড়াতে লাগল।
শিফার হাতের চামচটা থেমে গেছে দেখে সাথী বেগম মৃদু হেসে বললেন,
— কী হলো রে? খাওয়া বন্ধ করলি কেন?
শিফা দ্রুত চোখ নামিয়ে ফেলল।
— কিছু না মেজো আম্মু।
কিন্তু তার গলায় লুকানো কাঁপনটা ইভানের চোখ এড়াল না।
এদিকে রাহা পাউরুটিতে ছোট ছোট কামড় বসাচ্ছিল, কিন্তু স্বাদ যেন কিছুই লাগছিল না। মাথার ভেতর বারবার ঘুরে ফিরে আসছিল সকালের সেই ঘটনাগুলো। অভ্রের প্রতিটা কথা, প্রতিটা আচরণ বুকের কোথাও গিয়ে বিঁধেছে। তাই আর দেরি না করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে—আজ পরীক্ষা শেষ হলেই ইভানের সাথে খালামনির বাসায় চলে যাবে। কিছুদিন দূরে থাকলেই হয়তো মনটা একটু শান্ত হবে।
ডাইনিং টেবিলে অদ্ভুত নীরবতা।
ইভান আজ চলে যাবে ভেবেই শিফার মনটা সকাল থেকেই খারাপ। মুখটা গোমরা করে প্লেটের দিকে তাকিয়ে আছে সে। খাবারে হাত দিলেও কিছু মুখে তুলছে না। মাঝে মাঝে চুপচাপ ইভানের দিকে তাকাচ্ছে, আবার চোখ নামিয়ে ফেলছে।
রাহা আনমনে খাবারে নাড়াচাড়া করতে করতে হঠাৎ চোখ তুলল শিফার দিকে। মেয়েটার মুখটা কেমন মলিন হয়ে আছে দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেলল সে। কিছু না ভেবেই সবার সামনে ফট করে বলে উঠল,
— “আপু, তোমার কি মন খারাপ? এমন দেখাচ্ছে কেন? কী হয়েছে?”
রাহার কথা শুনে টেবিলে বসা সবার দৃষ্টি একসাথে ঘুরে গেল শিফার দিকে।
হঠাৎ এভাবে সবাই তাকানোয় শিফা ভীষণ হকচকিয়ে গেল। হাতের চামচটা প্রায় পড়েই যাচ্ছিল। চোখ বড় বড় করে একবার ইভানের দিকে তাকিয়ে আবার দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিল।
— “ক.. কই… না তো…”
আমতা আমতা করে বলল সে।
কিন্তু তার গলায় জড়তা স্পষ্ট।
ইভান ঠোঁট চেপে মুচকি হাসল। শিফার অস্বস্তিটা তার চোখ এড়াল না। আর টেবিলের বাকিরাও বুঝে গেল—শিফার হয়তো কিছু একটা অবশ্যই হয়েছে।
তখন তার মা, আফসানা বেগম, উদ্বিগ্ন গলায় বলে উঠলেন,
— “কি হয়েছে শিফু মা? আসলেই তো এমন দেখাচ্ছে কেন? বল মাকে।”
শিফা জোর করে হালকা হাসার চেষ্টা করল।
— “ মা, তেমন কিছু হয়নি। এমনি আরকি…”
কথাটা বললেও তার মুখের মন খারাপ ভাবটা একটুও কমল না।
আর ঠিক তখনই যেন রাহা একটা সুযোগ পেয়ে গেল। নিজের মনকে শক্ত করে ফেলল সে। অভ্রের থেকে দূরে সরে যাওয়ার জন্য এর চেয়ে ভালো অজুহাত আর হয় না। ইভানের সাথে খালামনির বাসায় চলে গেলে অন্তত লোকটার আশেপাশে থাকতে হবে না তাকে। রাহা নিচের ঠোঁট কামড়ে চুপচাপ বসে রইল।
সে ঠিক করে ফেলেছে—আর না।
এবার সত্যিই অভ্রের থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেবে।
তখনই রাহা হঠাৎ বলে উঠল—
“আচ্ছা মা, ইভান ভাইয়া তো বলল আজকেই চলে যাবে?”
মা হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—
“হ্যাঁ, সেটাই তো বলল।”
রাহা একটু ভেবে নিয়ে মুচকি হেসে বলল—
“তাহলে একটা কাজ করি…?”
রাহা একটু গলা খাঁকারি দিয়ে চারপাশে তাকাল।
সবাইয়ের চোখে তখন কৌতূহলের ঝিলিক।
রাহা এবার পাশে বসে থাকা শিফাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে বলল—
“আমারও তো আজকে পরীক্ষা শেষ। মাথাটা একদম ধরে গেছে। আমারও একটু সতেজ হাওয়ার দরকার আছে। আর আপুও অনেকদিন কোথাও ঘুরতে যেতে পারছে না।”
কথার মাঝেই রাহার মা ফোড়ন কেটে বললেন—
“কেন? এখানে কি দূষিত হাওয়া খাচ্ছিস নাকি?”
কথাটা শুনে সবাই হেসে উঠল।
রাহা ঠোঁট ফুলিয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল—
“আহা মা… আমাকে বলতে দাও তো!”
মা এবার মুচকি হেসে চুপ করে গেলেন।
রাহা আবারও মুখে দুষ্টু হাসি এনে বলতে শুরু কর
“যেহেতু আপুরও মন খারাপ।আর আমারও আজকে থেকে পুরো ছুটি। তাই ভাবছিলাম, আমরা সবাই মিলে কুমিল্লায় খালামনির বাসা থেকে একটু ঘুরে আসি।”
একটু থেমে সে নাটকীয় ভঙ্গিতে আবার বলল—
“আমি, শিফা আপু… সাথে আমার একজন জান আর একজন প্রাণও যাবে।”
কথাটা বলেই সে দাঁত কেলিয়ে হাসতে লাগল।
তার এমন রহস্যময় কথায় সবাই কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
কেউই বুঝতে পারছিল না, রাহার সেই “জান” আর “প্রাণ” আবার কারা!
তাদের অবাক মুখগুলো দেখে রাহা হেসে ফেলল।
তারপর গর্বিত ভঙ্গিতে বলল—
“আরে, ওরা আমার বান্ধবী। আমি আদর করে এই নাম দিয়েছি!”
কথাটা শুনতেই ঘরে আবারও হাসির রোল পড়ে।
শুধু একজন হাসছে না— রাহার বড় আব্বু।
কারণ, শিফা যদি এই বাড়ির হার্ট হয়, তাহলে রাহা হলো সেই হার্টের স্পন্দন।
তারা চলে গেলে বাড়িটা শুধু ফাঁকা নয়— একদম প্রাণহীন হয়ে যায়।
যে বাড়িটা সবসময় তাদের হাসি, চিৎকার আর দুষ্টুমিতে মুখর থাকে, তাদের অনুপস্থিতিতে সেই বাড়িটাই কেমন নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে।
দেয়ালগুলো পর্যন্ত যেন তাদের খুঁজতে থাকে।
বড় আব্বুর তখন মনে হয়, এই দুই মেয়ে শুধু বাড়ির সদস্য নয়— তারা-ই এই বাড়ির হাসি, শান্তি আর বেঁচে থাকার কারণ।
বড় আব্বুকে চুপ থাকতে দেখে রাহাসহ বাকিরাও চুপ হয়ে যায়। রাহা বুঝতে পারে, বড় আব্বু কিছু একটা ভাবছেন। তাই সে আর কিছু না বলে শান্ত চোখে তাঁর দিকেই তাকিয়ে থাকে। দাঁত কেলানো বন্ধ করে একটু মন খারাপের ভানও ধরে সে। অসহায় চোখে সবার দিকে তাকিয়ে পলক ফেলতে থাকে, বিশেষ করে বড় আব্বুর দিকে। কারণ তিনি রাজি হলেই সবাই রাজি।
রাহা জানে, কেউ তাকে না করবে না। কয়েকদিন আগেও রাহার খালামণি বারবার বলেছিলেন, রাহার পরীক্ষা শেষ হলে যেন বাড়ির বাচ্চাদের কিছুদিনের জন্য তাদের বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এতে সবারই ভালো লাগবে, মনও প্রফুল্ল থাকবে। একই জায়গায় দীর্ঘদিন থাকতে থাকতে একঘেয়েমি চলে আসে। তাই কিছুদিন অন্য পরিবেশে কাটালে মনটা সতেজ ও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
খেতে খেতেই ইভান যেন কিছু বলার সাহস জোগাড় করছিল। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে সে ধীরে মাথা তুলে আমান খান–এর দিকে তাকাল। তারপর নরম গলায়, খানিক দ্বিধা নিয়েই কথা শুরু করল—— বড়আব্বু, ওরা যদি কিছুদিন থেকে আসে, তাহলে আম্মুর ওর ভালো লাগবে। অনেক খুশি হবে। তাই,যাওয়ার অনুমতিটা দিয়ে দিন না।
কথাগুলো বলার সময় তার কণ্ঠে ছিল নরম এক অনুরোধ। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসিও লেগে ছিল।
ইভানের মুখে এমন আবদার শুনে আমান খান আবারও হালকা হেসে উঠলেন। তাঁর চোখেমুখে তখন স্পষ্ট স্নেহের ছাপ ফুটে উঠেছিল।
দুই মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আমান খান আর না করতে পারলেন না।
হঠাৎ করেই তিনি মৃদু হেসে উঠলেন। তাঁর সেই হাসি দেখে উপস্থিত সবাই ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটিয়ে তুলল।
এতক্ষণ যেন রাহা–র বুক ধুকপুক করছিল—যদি কোনোভাবে অনুমতি না মেলে! আর শিফা তো রাহার কথা শুনে ভীষণ খুশি হয়েছিল। এতে সে ইভান–এর আরও কিছুদিন কাছাকাছি থাকতে পারবে।
বড়আব্বুর মুখে হাসি ফুটতেই রাহা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল, সঙ্গে শিফাও। আর টেবিলের নিচে হাত মুঠো করে সামনের দিক এগিয়ে এনে বলে,
"ইয়েস"
আমার তো এখন নাচতে মন চাচ্ছে।
— আচ্ছা, যাও। তবে বেশি দেরি করো না, তাড়াতাড়ি ফিরে এসো।
তোমাদের ছাড়া এই বাড়িটা আমার ভীষণ ফাঁকা আর দমবন্ধ লাগে।
খাবার শেষ করে উঠে দাঁড়াতেই ইভান হালকা গলায় জিজ্ঞেস করল,
— রাহা, তোমার পরীক্ষা কয়টায় শেষ হবে?
— জি ভাইয়া, তিনটায়।
— তাহলে সাড়ে তিনটার মধ্যে রেডি থাকবে। তখনই আমরা বের হব।
মাথাটা আলতো করে কাত করে রাহা মৃদু স্বরে উত্তর দিল,
— ঠিক আছে, ভাইয়া।
ইভান চলে যেতে গিয়েও একবার আড়চোখে তাকাল শিফা–র দিকে। চোখাচোখি হতেই সে বুঝল, শিফাও তার দিকেই তাকিয়ে আছে।
ইভানের সেই গভীর চাহনি যেন শিফার হৃদয়ের ভেতর নিঃশব্দে তীরের মতো বিঁধল। দু’জনের চোখে তখন অদ্ভুত এক নীরবতা, অথচ সেই নীরবতাই যেন হাজারো না-বলা কথার ভাষা হয়ে উঠেছিল। তাদের দৃষ্টির আড়ালেই হয়তো লুকিয়ে ছিল মনের সব অনুভূতি।
—————
বর্তমান...
ঘড়ির কাঁটায় তখন প্রায় ৩টা ১০।
একে একে সবাই এসে ড্রয়িংরুমে জড়ো হচ্ছে। বাড়ির দু’জন মানুষ কয়েকদিনের জন্য দূরে চলে যাবে—ভাবতেই যেন পুরো বাড়িটা অদ্ভুত এক নীরবতায় ডুবে গেছে। কোলাহলে ভরা পরিবেশটাও আজ পানির মতো স্থির আর শান্ত লাগছে।
ইভান–ও তৈরি হয়ে নিজের লাগেজ নিয়ে নিচে চলে এসেছে। সবকিছুই প্রায় প্রস্তুত।
এখন শুধু বাকি সেই চারজনের আসা।
তাদের কথার মাঝেই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো রাহা আর শিফা।
দু’জনের কাঁধে ছোট ট্রাভেল ব্যাগ। পরণে ঢিলেঢালা ব্যাগি প্যান্ট আর থ্রি-কোয়ার্টার টপস। চুলগুলো টাইট পনিটেইলে বাঁধা থাকায় মুখ দুটোকে আরও তীক্ষ্ণ আর আত্মবিশ্বাসী লাগছিল।
সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে একসময় সবাই বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো।
বিকেলের আলো তখন নরম হয়ে এসেছে। পশ্চিম আকাশ জুড়ে কমলা আর হালকা সোনালি রঙ ছড়িয়ে আছে। দূরের গাছগুলোর ছায়া লম্বা হয়ে রাস্তার ওপর পড়ে আছে।
রাহার দুই বান্ধবী— অবন্তিকা আর সাফা। তারাও পৌঁছে গেছে..
অবন্তিকার পরণে ছিল হালকা নীল ওভারসাইজ শার্ট আর সাদা ট্রাউজার। মুখে সবসময়ের মতো শান্ত একটা ভাব। আর সাফা পুরো উল্টো—চুড়িদার পড়েছে।
রাহার মা এগিয়ে এসে তার চুলে হাত বুলিয়ে দিলেন।
— “রাস্তায় সাবধানে যাস। পৌঁছে ফোন দিবি।”
রাহা হালকা হেসে মাথা নাড়ল।
সাফা আর অবন্তিকাও বড়দের সঙ্গে একে একে বিদায় নিল। গাড়িতে ওঠার আগেই একের পর এক কথা বলে তারা তিনজন চারপাশ সরগরম করে তুলেছে।
ইভান তখন গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে সবার কথা শান্তভাবে শুনছিল। ঠিক সেই সময় আমান সাহেব ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন। মুখে স্বাভাবিক গাম্ভীর্য থাকলেও চোখেমুখে স্পষ্ট দুশ্চিন্তার ছাপ ছিল।
গাড়ির দরজায় হাত রেখে তিনি বললেন,
— “গাড়ি ধীরে চালাবে, ইভান। রাস্তা ফাঁকা পেলেই অতিরিক্ত গতি তোলার প্রয়োজন নেই। আর সন্ধ্যার পর হাইওয়েতে সাবধানে থাকবে। পৌঁছে একটি ফোন দেবে।”
ইভান হালকা মাথা নেড়ে মৃদু হেসে বলল,
— “আচ্ছা বড় আব্বু, চিন্তা করবেন না।”
আমান সাহেব আর কিছু বললেন না। শুধু একবার সবার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে ধীরে সরে দাঁড়ালেন। তবে চোখের ভেতরের দুশ্চিন্তাটা তখনও স্পষ্ট ছিল।
ইভান গাড়ির রিমোটে চাপ দিতেই হালকা শব্দ করে গাড়ির লক খুলে গেল। চকচকে কালো গাড়িটার গায়ে পড়ে থাকা বিকেলের আলো এক মুহূর্তে ঝিলিক দিয়ে উঠল।
শিফা ধীরে ধীরে গাড়ির পাশে এসে দাঁড়াল। হালকা বাতাসে তার পনিটেইল দুলে উঠছিল। একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে গাড়ির পেছনের দরজাটা খুলে ভেতরে উঠতে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই রাহা হঠাৎ তার হাত টেনে থামিয়ে দিল।
— “এই এই, তুমি পিছনে কেন বসছ?”
শিফা একটু অবাক হয়ে তাকাতেই রাহা মুখে দুষ্টু হাসি এনে বলল,
— “সামনে গিয়ে বসো। আমরা পেছনেই ঠিক আছি।”
— “না, আমি এখানে ঠিক আছি…” শিফা হালকা আপত্তি করতেই রাহা আর কোনো কথা শুনল না। ধীরে ধীরে তাকে সামনে এনে বসিয়ে দিল।
এতে শিফা মনে মনে খুশি হলো অনেক।
রাহা যেন আর অপেক্ষাই করতে পারছিল না। ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে দ্রুত গিয়ে পিছনের সিটে বসে পড়ল। চোখেমুখে চাপা উচ্ছ্বাস। যেন পুরো ট্রিপটার সেরা অংশ শুরু হতে যাচ্ছে এখনই।
সাফা আর অবন্তিকা দুজনেই রাহার দিকে তাকিয়ে চাপা হাসল। রাহা চোখ টিপে ব্যাগটা নিয়ে নিজেই পেছনের সিটে গিয়ে বসে পড়ল।
শিফা একটু অস্বস্তি নিয়ে সিটবেল্ট বাঁধছিল। পাশে বসে থাকা ইভান একবার তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে আবার সামনে তাকাল। আর রাহা জানালার পাশে হেলান দিয়ে সবকিছু চুপচাপ দেখছিল।
তার মনে হচ্ছিল, শিফা হয়তো কিছুই বুঝতে দিচ্ছে না, কিন্তু কোথাও না কোথাও সে ঠিকই আঁচ করতে পারছে— এই হঠাৎ সামনে বসানোটা শুধু সিট বদলানো নয়। হয়তো রাহা ইচ্ছে করেই তাদের একটু আলাদা সময় দিতে চাইছে।
অবন্তিকা আর সাফা পেছনের সিটে উঠতে উঠতেও নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করছিল।
গাড়ি চলতেই রাহা বলে উঠল,
"ভাইয়া মনে আছে তো?"
-"একশো পার্সেন্ট মনে আছে।
ডোন্ট ওয়ারি।"
সাফা একবার রাহার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
— “তোর এই কফির জন্য পাগলামো কোনোদিন কমবে না।”
সঙ্গে সঙ্গে রাহা মুখ বাঁকটা মেরে বলল,
— "এমনি লেট করেছিস কিছু বলছি না। একবার সেখানে পোঁছাতে দে? তোদের আমি পরে ঠিকই দেখে নিচ্ছি।”
অবন্তিকা রাহার দিকে তাকিয়ে আবার বলল,
— “তুই জানিস, বাসায় কত কিছু বলে ম্যানেজ করতে হয়েছে? তুই হলে তো কখনোই আসতিস না, সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি।”
অবন্তিকা ঠোঁট চেপে হাসল, আর সাফা হালকা হেসে মাথা নাড়তেই রাহা হাত তুলে থামিয়ে দিল,
— “হয়েছে, হয়েছে। এবার চুপচাপ বস।”
ইভান গাড়ি স্টার্ট দিতেই নরম সুরে গান বেজে উঠল। বিকেলের আলো ধীরে ধীরে শহরের ভিড়ের উপর ঝরে পড়ছিল, আর গাড়িটা দীর্ঘ রাস্তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল এক অদ্ভুত শান্ত অনুভূতি নিয়ে।
—————
বাইরে তখন সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে গাঢ় হয়ে আসছে। শহরের ব্যস্ততা পেছনে ফেলে তারা আজ সরাসরি দুলালপুরের বাসায় ফিরবে না। কুমিল্লা শহর ছাড়িয়ে নিরিবিলি রাস্তার পাশে একটা পুরোনো রিসোর্ট আছে— “নীল অরণ্য রিসোর্ট”।
সময়ের ছাপ পড়ে গেলেও জায়গাটার আলাদা একটা মায়া আছে। রিসোর্টের পাশেই কাঠ আর কাঁচে তৈরি ছোট্ট একটা ক্যাফে— “ক্যাফে মেঘবেলা”।
রাত নামার পর ক্যাফেটার হলুদ আলো দূর থেকেই চোখে পড়ে। চারপাশে ঝিরঝিরে বাতাস, ভেজা মাটির গন্ধ আর কফির ধোঁয়া মিশে জায়গাটাকে অন্যরকম শান্ত করে তোলে। সেখানে নাকি এমন কফি বানায়, এক কাপ শেষ হওয়ার পরও যার স্বাদ অনেকক্ষণ মুখে লেগে থাকে।
রাহা সেই জায়গায় যাওয়ার জন্য সকাল থেকেই বায়না ধরে আছে। শেষ পর্যন্ত ইভানও আর না করেনি। তার ওপর নিজের গাড়ি— তাই রাত হলেও তেমন কোনো চিন্তা নেই। আগে কফি, তারপর বাসা।
·
·
·
চলবে……………………………………………………