ভাঙা আয়নার আলো - পর্ব ১৮ - শারমিন আক্তার সাথী - ধারাবাহিক গল্প

ভাঙা আয়নার আলো - শারমিন আক্তার সাথী
          সকালের সোনালি আভা অনেক আগেই শহরের কংক্রিটের গায়ে মিশে গেছে। ভোরের কোমল রোদ এখন তীব্র হয়ে উঠেছে। চোখে লাগে, গায়ে লাগে। নিচের রাস্তায় গাড়ির শব্দ বাড়ছে। মানুষ ছুটছে। কেউ অফিসে, কেউ ব্যবসায়, কেউ জীবনের পেছনে।
হাসপাতালের লম্বা কোরিডোরে দাঁড়িয়ে জবা কাঁচের জানালা দিয়ে সেই ব্যস্ত পৃথিবীটা দেখছিল।

অদ্ভুত এক অনুভূতি হচ্ছিল ওর। পৃথিবীর সবাই যেন কোথাও পৌঁছানোর জন্য ছুটছে। অথচ কেউই জানে না শেষ পর্যন্ত কোথায় পৌঁছাবে। মানুষের জীবনটা বোধহয় এমন। অবিরাম দৌড়, অবিরাম যুদ্ধ।

জবাও তো ব্যস্ত। বরং অন্যদের চেয়ে বেশি ব্যস্ত। ক্ষমতা, প্রতিশোধ, সম্পর্ক, ব্যবসা, হিসাব, সবকিছুর মাঝে নিজেকে এমনভাবে জড়িয়ে ফেলেছে যে এখন আর নিজের জন্য আলাদা কোনো সময়ই নেই। অথচ একসময় এই ব্যস্ততাই ওকে তৃপ্তি দিত। মনে হতো, থেমে যাওয়া মানেই হেরে যাওয়া, কিন্তু ইদানীং আর ভালো লাগে না।

মনে হয় সব ছেড়ে কোথাও চলে যাক। খুব দূরে। যেখানে কেউ তাকে চিনবে না। কেউ ভয় পাবে না। কেউ তার শক্তি, ক্ষমতা কিংবা রাগের হিসাব করবে না। শুধু খুব সাধারণ একটা জীবন হবে। সকালে ঘুম ভাঙবে শান্তিতে, রাতে ঘুম আসবে ক্লান্তিহীন মনে।

মানুষ আসলে কতটুকুই বা চায়? দিনশেষে একটু শান্তি। একটু নিশ্চিন্ত নিঃশ্বাস। জবা ধীরে চোখ বন্ধ করল। তার মনে হলো, সে অনেকদিন ধরে যুদ্ধ করছে। এত দীর্ঘ সময় ধরে লড়াই করতে করতে মানুষ একসময় জিততে চায় না, শুধু বিশ্রাম চায়। কারণ যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক পরাজয় না অবিরাম ক্লান্তি। আর সেই ক্লান্তিটাই আজ জবাকে ভেতর থেকে ধীরে ধীরে শূন্য করে।

হাসপাতালের করিডোরজুড়ে তখন তীব্র ঔষধের গন্ধ। সাদা দেয়াল, সাদা আলো, সাদা পোশাক, সবকিছু মিলিয়ে জায়গাটা এমনিতেই অস্বস্তিকর। এর মাঝেই খবরটা কীভাবে যেন পুলিশের কানে পৌঁছে গেছে।
ইরফান চৌধুরী আর সিনথিয়ার গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর।

ধারণা করা হচ্ছে হাসপাতালের কোনো ডাক্তার কিংবা নার্সই বিষয়টা জানিয়েছে। অবশ্য এমন ঘটনা বেশিক্ষণ চাপা থাকে না। রক্তের গন্ধের মতোই এসব খবরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

পুলিশ দেখে জবা মোটেও বিচলিত হলো না। বরং ওর মুখে সেই চিরচেনা স্থিরতা। এ ধরনের পরিস্থিতি সামলানোর অভ্যাস বহু আগেই হয়ে গেছে ওর। ভয় নামক অনুভূতিটা যেন অনেক আগেই মরে গেছে জবার ভিতরে।

কিছুক্ষণ পর ইরফানের কেবিনের সামনে এসে থামলেন পুলিশ অফিসার সুবেদার আলী।

সুবেদার আলীর চেহারা দেখলে যে কেউ ভয় পাবে। বিশাল দেহ, কড়া দৃষ্টি, রক্ত চক্ষু। পুরো মানুষটাকে দেখলে মনে হয় তিনি বুঝি মুহূর্তেই কাউকে গুলি করে ফেলবেন।
অথচ বাস্তবে তিনি সম্পূর্ণ উল্টো। সুবেদার আলীর চেহারা যতটা ভয়ংকর তিনি মানুষ হিসেবে ততটাই নরম।
রক্তারক্তি, মারামারি,এসব তিনি প্রচণ্ড ভয় পান। ছোটবেলা থেকে নিরিবিলি, শান্ত একটা জীবন চেয়েছিলেন। কিন্তু জীবন সবসময় মানুষের চাওয়া মেনে চলে না।

পুলিশের চাকরিটা সে বাবার সূত্রে পেয়েছে। তার বাবা পুলিশের বড়ো কর্মকর্তা ছিলেন। এক অপারেশনে মারা যায়। ফলে তার চাকরি সুবেদার আলী পেয়েছিল। তারপর থেকেই এই ইউনিফর্ম, এই দায়িত্ব।

নির্ভেজাল জীবন চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু পেটের দায়ে এ চাকরি করছেন। কিন্তু তার চেহারা অদ্ভুত ভয়ংকর। অপরাধীরা তার চেহারা দেখলেই ভয়ে আধমরা হয়। তিনি অবশ্য এসবে মাথা ঘামান না। রোজ বিয়ম করে ডিটউি করেন। অফিস শেষে বাড়ি গিয়ে পরিবারকে সময় দেয়। কেস সমাধান নিয়ে তার মাথা ঘামানোর মাত্রা খুবই কম। এ কারণেই গত বারো বছর চাকরি করেও তার ইন্সপেক্টর পদ থেকে পদন্নোতি হয়নি।

তিনি ধীরে দরজা ঠেলে কেবিনে ঢুকলেন।
ঢুকেই দৃশ্যটা দেখে খানিক থমকে গেলেন।
জবা খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বসে ইরফানের জন্য মাল্টা কাটছে। যেন কিছুই হয়নি।
যেন এই কেবিনে গুলিবিদ্ধ কোনো মানুষ নেই। জবা চোখ তুলে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে হালকা হাসল,
'আসুন স্যার। কী মনে করে হসপিটালে?'
সুবেদার আলী গলা পরিষ্কার করলেন।
'শুনলাম ইরফান চৌধুরীর পায়ে গুলি লেগেছে। সে কারণে তদন্ত করতে আসা।'
'আপনাকে কে বলেছে?'
'পুলিশের সোর্সের অভাব থাকে না।'
'ওহ।'
এক মুহূর্ত নীরব থেকে সুবেদার আলী সরাসরি প্রশ্ন করলেন,
'কে গুলি করেছে?'

জবা এবার ধীরে চাকুটা নামিয়ে রাখল।
তারপর ভয়হীন, স্থির চোখে তাকিয়ে বলল,
'আমি গুলি করেছি। আমার লাইসেন্স প্রাপ্ত পিস্তল দিয়েই গুলি করেছি।'

সুবেদার আলী খানিক থতমত খেয়ে গেল। এভাবে পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে তার চোখে চোখ রেখে অকপট ভাবে সত্যি কথা কজন বলতে পারে? তাও একটা মেয়ে। সুবেদার আলী তার কপালে জমা বিন্দু বিন্দু ঘাম মুছে বলল,
'কেন?'
জবার আবেগহীন উত্তর,
'ও আমায় রেখে পরকীয়া করেছে। আমার বাড়িতে বসেই সে মেয়ের সাথে নোংরামি করতে গিয়েছিল। তাই আমি ওদের দুজনকেই শুট করেছি।'

সুবেদার আলী জবার চোখে তাকালেন। ও চোখে নেই কোনো ভয়, ভানহীন, অকপট সত্যি বলে এ চোখ। এমন ভয়হীন নারীচোখ তিনি খুব কমই দেখেছেন। সুবেদার আলী ধীরে জিজ্ঞেস করলেন,
'মেয়েটা কোথায়?'
'জেনারেল ওয়ার্ডে আছে।'
'অপরাধ তো দুজন সমান করেছে আমার হ্যাজবেন্ড ভিআইপি কেবিনে আর মেয়েটা জেনারেল ওয়ার্ডে কেন?'

জবা এবার মাল্টার এক টুকরো ইরফানের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে শান্ত গলায় বলল,
'আমার মেয়ে তার বাবাকে দেখতে আসবে। মেয়ের চোখে তার বাবা ভালো মানুষ। আমি চাই না সে তার বাবাকে জেনারেল ওয়ার্ডে পড়ে থাকতে দেখুক।'

কথাটা শুনে সুবেদার আলী কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন। এই মেয়েটাকে বোঝা কঠিন।
সে নিষ্ঠুরও, আবার অদ্ভুত রকম দায়িত্বশীলও। তিনি ধীরে বললেন,
'আপনাকে এখন আমি গ্রেফতার করতে পারি, তা জানেন?'
'না পারেন না।'
ভ্রু কুচকে তাকাল সুবেদার আলী। বলল,
'কেন?'
'আপনার কাছে কোনো সাক্ষী প্রমাণ নেই। যাদের গুলি লেগেছে তাদের জিজ্ঞেস করুন। দেখুন তারা স্বীকারোক্তি দেয় কি না যে আমি গুলি করেছে।'

সুবেদার আলী হালকা হাসলেন। একটা পরাজিত হাসি। বললেন,
'আপনি যে সে ফাঁক ফোকর রাখেননি তা আমি জানি।'
তারপর ইরফানের দিকে তাকিয়ে বলল,
'আপনাকে গুলি কে করেছে?'

ইরফান অনেকক্ষণ চুপ থেকে রোবটের মতো গলায় বলল,
'কেউ না। আমি লোড করা পিস্তল পরিষ্কার করছিলাম। তখন ট্রিগারে চাপ পড়ে আমার পায়ে লাগে।'

জবা তাচ্ছিল্য হাসল। সুবেদার আলী মাথা নেড়ে বলল,
'বাহ। আপনার স্বামী দারুণ কাহিনি বানাতে পারে।'

কেবিনে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা নেমে এলো।
তারপর সুবেদার আলী বের হয়ে যেতে নিতে হঠাৎ আবার থেমে গেলেন। পেছনে ফিরে জবার দিকে তাকালেন। তার চোখে এবার কৌতূহলের সাথে অদ্ভুত এক ক্লান্তি,

'মিসেস জবা চৌধুরী, পুলিশ মহলে আপনাকে চেনে না, এমন লোক খুব কম আছে। শিয়ালের থেকেও ধূর্ত আপনি।'

জবা চুপচাপ শুনছিল। সুবেদার আলী ধীরে বললেন,
'আমি চাইলে আপনার বিরুদ্ধে প্রমাণ জোগাড় করতে পারি। কিন্তু লাভ হবে না। এর আগেও কয়েকজন অফিসার চেষ্টা করেছে। কেউ পারেনি। আমিও নিজের জীবনে অযথা ঝামেলা বাড়াতে চাই না।'

তিনি কিছুক্ষণ থেমে আবার বললেন,
'তবে একটা কথা বলি আপনি কখনো অন্যায় করেন না, এটা সত্যি। কিন্তু ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াও ঠিক না।'

জবা এবার প্রথমবারের মতো একটু হেসে বলল,
'আইন সবসময় ন্যায় দেয় না স্যার। অনেক সময় মানুষকে নিজের বিচার নিজেকেই করতে হয়।'

সুবেদার আলী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
তারপর ধীরে দরজা খুলে বেরিয়ে গেলেন।
কেবিনের ভিতরে আবার নীরবতা নেমে এলো। শুধু সেই নীরবতার মাঝখানে জবার হাতে ধরা চাকুর চকচকে ধারটা বারবার আলো কেটে উঠছিল।

জবা ধীর চোখে তাকিয়ে ছিল ইরফানের দিকে। জানালার ফাঁক গলে আলো ঘরে ঢুকেছে, কিন্তু সেই আলোতেও যেন এক ধরনের শীতলতা জমে আছে। কিছু কথা থাকে যেগুলো চিৎকার করে বলা লাগে না। শান্ত গলাতেই সেগুলো সবচেয়ে বেশি আঘাত করে। জবা ধীরে বলল,
'একটা কথা কদিন যাবত তোমায় বলবো বলেও ভুলে যাচ্ছি।'
'বলো।'

কিছুক্ষণ চুপ থেকে জবা বলল,
'তোমার নাম তো শুধু মোহাম্মদ ইরফান। বিয়ের পর আমার নামের পদবী ব্যবহার করা শুরু করেছিলে।'

ইরফান ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলল,
‘হ্যাঁ।'

জবা বলল,
'প্রথম যদিন বললে সব মেয়েরা স্বামীর পরিচয়ে পরিচিত হয়, কিন্ত আমি আমার বউয়ের পরিচয়ে পরিচিত হতে বেশি পছন্দ করব। বউ পাগল হয়ে সারাজীবন থাকব। বিশ্বাস করো, সেদিন তোমার কথা এতটাই ভালো লেগেছিল যে আমি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমার সবকিছু তোমার নামে করে দিব।'

ইরফান এবার পুরোপুরি ওর দিকে তাকাল। জবা ধীর কণ্ঠেই বলতে লাগল,
'কিন্তু বাবার কারণে সেদিন পারিনি। তিনি বললেন সব কিছুর ক্ষমতা দে ঠিকআছে, কিন্তু মালিকানা দিস না। সব তোদেরই থাকবে। তবুও তোকে নিষেধ করব সব ওর নামে লিখে দিতে। মানুষ পরিবর্তনশীল। আজ যার প্রতি ভালোবাসা আছে কাল নাও থাকতে পারে। সে কারণে ক্ষমতা দিলেও মালিকানা দিস না।'

একটু থামল জবা। চোখের দৃষ্টি কেমন দূরে হারিয়ে গেল,
'জানো, তখন বাবার সাথে আমার ঝগড়াও হয়েছিল। মনে হয়েছিল উনি তোমাকে বিশ্বাস করেন না। খুব রাগ হয়েছিল আমার। মনে হয়েছিল, পৃথিবীতে যদি কাউকে নিঃশর্ত বিশ্বাস করা যায়, তবে সে তুমি।'

ঘরের বাতাস ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠল। শান্ত গলায় জবা বলল,
'এখন বুঝতে পারছি বাবা কেন মা করছিলেন! আমরা তোমায় চিনতে পারিনি ঠিকই, কিন্তু আমাদের অবচেতন মন আমাদের অজান্তেই তোমার প্রতি নেগেটিভ ধারণা পোষন করত। হয়তো মহান রব আমার প্রতি বিশেষ দয়াশীল সে কারণেই তোমাকে লিখে দিব ভেবেও আর দেওয়া হচ্ছিল না।'

ইরফানের মুখ শক্ত হয়ে উঠল। বুকের ভেতর কেমন অস্বস্তি জমতে লাগল। জবা এবার সোজা হয়ে বসে বলল,
'তো যা বলছিলাম কিছুদিন পর আমরা আর এ সম্পর্কে থাকব না। আলাদা হয়ে যাব। সে কারণে এখন থেকে তুমি নিজের নাম শুধু "মোহম্মদ ইরফান" ই বলো। শেষের চৌধুরী পদবী কেটে দিও।'

ইরফান এবার কষ্টমাখা চোখে তাকাল। জবার গলা তখনও অদ্ভুত শান্ত। বলল,
'নিজের বাবার নাম ব্যতিত অন্য কারও পদবী লাগানো আমাদের ধর্মও সমার্থন করে না। আর যেখানে আমরা স্বামী স্ত্রীই থাকব না সেখানে নামের পদবী নিয়ে কী কাজ?'

কথাগুলো খুব সাধারণ ভঙ্গিতে বলা হলেও প্রতিটা শব্দ যেন ধারালো কাঁচের টুকরোর মতো এসে বিঁধল ইরফানের ভেতরে। ইরফান অসহায় চোখে তাকিয়ে বলল,
'সরাসরি বললেই পারো তোমার পদবীও তুমি আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে চাও। এত ভনিতার তো প্রয়োজন নেই।'

জবা কিছু বলল না। শুধু ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত বাঁকা হাসিটা ফুটে উঠল। যে হাসিতে ভালোবাসা নেই, অভিমান নেই, আছে শুধু নির্মম উপলব্ধি।

—————

সিনথিয়ার জ্ঞান ফিরল ধীরে ধীরে। যেন গভীর অন্ধকার কোনো কুয়ো থেকে টেনে তোলা হচ্ছে তাকে। প্রথমে চোখ খুলতেই সাদা সিলিংটা ঝাপসা লাগল। তারপর ধীরে ধীরে অনুভূতি ফিরতে শুরু করল শরীরে। আর সেই অনুভূতির সাথে সাথে তীব্র যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়ল ওর সারা অস্তিত্বে।

পায়ে আগুনের মতো জ্বালা করছে। এটা স্বাভাবিক। গুলি তো পায়েই লেগেছিল। কিন্তু তলপেটেও কেন এমন অসহ্য ব্যথা হচ্ছে? কেন মনে হচ্ছে পেটের ভেতর কেউ ভারী পাথর বসিয়ে রেখেছে?

কোনোমতে উঠে বসতে গিয়েই ককিয়ে উঠল সিনথিয়া। ঘামে ভিজে গেছে শরীর। নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে।

ধীরে ধীরে খেয়াল করল, ওর পরনে আগের কাপড় নেই। সালোয়ারের বদলে হাসপাতালের পাতলা পেটিকোট। আরও ভয়ংকর বিষয়। ওর শরীরে ইউরিনারি ক্যাথেটার লাগানো। মুহূর্তেই বুকের ভেতর অজানা আতঙ্ক জমে উঠল। পায়ে গুলি লাগলে ক্যাথেটার কেন? তলপেটে এত ব্যথা কেন? আর অপারেশনের সময় ওকে পুরো অজ্ঞানই বা করা হলো কেন?

হাসপাতালে আনার পর পর্যন্ত তো ওর জ্ঞান ছিল। ডাক্তার কিসব কাগজ পত্রে সাইন করালো। ঝাপস চোখে কাঁপা হাতে সেসব সাইন করে দিয়েছিল।

সিনথিয়া তেমন বেশি কিছু ভাবতেও পারল না। তলপেটে যেন ব্যথায় ফুলে আছে। পায়েও ব্যথায় কলিজা পর্যন্ত ধরে আসছে। সিনথিয়ার মনে হচ্ছে গায়ে প্রচণ্ড জ্বর৷ এখন জ্বর আসাটা কি স্বাভাবিক জানে না সিনথিয়া।

ও ঠোঁট কামড়ে ব্যথা সহ্য করার চেষ্টা করল। কিন্তু শরীরের যন্ত্রণার চেয়ে ভয়টা ধীরে ধীরে বড়ো হতে লাগল।

চারপাশে তাকিয়ে দেখল। জেনারেল ওয়ার্ড। এক রুমে অনেকগুলো বেড। প্রতিটা বেডেই কোনো না কোনো মহিলা রোগী শুয়ে আছে। কারও পাশে মা বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। কারও স্বামী পানি খাওয়াচ্ছে। কোথাও মেয়েরা মিলে রোগীর গা চাপড়ে দিচ্ছে।

শুধু সিনথিয়ার বেডটাই ফাঁকা। কেউ নেই।এক গ্লাস পানি এগিয়ে দেওয়ার মতোও কেউ নেই। মানুষ অসুস্থ হলে বুঝতে পারে সে আসলে কতটা একা। সিনথিয়াও আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে, পরিবার হারানোর মানে কী।

একসময় ও অসুস্থ হলে ওর বাবা পুরো হাসপাতাল মাথায় তুলে ফেলত। ভালো কেবিন, দামি ডাক্তার, সারারাত পাশে বসে থাকা। সব করত। আজ সেই বাবার মুখও এক বছর দেখেনি সে। প্রায় এক বছর কেউ খোঁজ নেয়নি। যেন সে মরে গেলেও কারও কিছু যায় আসে না। যেন ও এ পৃথিবীর কেউ নয়।

এতমাস জবা চৌধুরী প্রতিটি মিনিট ওকে কষ্ট দিয়েছে। শারিরীক মানসিক সব রকম কষ্ট দিয়েছে। আর কাল তো গুলিও করল। 

হঠাৎ তলপেটের ব্যথাটা আবার মোচড় দিয়ে উঠল। সিনথিয়া কাঁপা গলায় পাশের এক মহিলাকে বলল,
'দয়া করে কোনো নার্স ডেকে দিবেন। আমি একটু কথা বলবো তার সাথে।'

মহিলা বোধহয় বিরক্ত হলো। চোখে মুখে তেমনই অভিব্যক্তি ফুটে উঠল। বলল,
'আপনার সাথের লোক কই। তাগো কন।'
'আমার সাথে কেউ নেই।'
মহিলার চোখে এক মুহূর্তের জন্য করুণা ফুটে উঠল।
'আচ্ছা দাঁড়ান।'

মহিলা চলে গেল। কিন্তু অনেকক্ষণ হয়ে যাওয়ার পরও নার্স আসল না। সময় যেন থেমে গেল। ব্যথা আর অস্বস্তিতে ছটফট করতে করতে প্রায় দুই ঘণ্টা পর এক নার্স এল। সিনথিয়া নার্সকে ডেকে বলল,
'ডাক্তারের সাথে কথা বলা যাবে? ডাক্তার কখন আসবে?'
'রাতে আসবে।'
'আমার তলেপেটে পেটে কেন ব্যথা হচ্ছে বলতে পারেন? পায়ের ব্যথা বুঝলাম। কিন্তু পায়ের ব্যথার কারণে কি তলপেটেও ব্যথা হয়?'

নার্স কিছুক্ষণ অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে রইল ওর দিকে। তারপর বলল,
'আজব কথা বলেন আপনি। জরায়ু অপারেশন হয়েছে তাহলে তলপেটে হালকা ব্যথা ভারি ভাব তো হবেই।'
মুহূর্তেই সিনথিয়া কেঁপে উঠল। বলল,
'জরায়ু অপারেশন?'
নার্স খানিক বিরক্ত কন্ঠে বলল,
'অপারেশন আপনার হয়েছে আর আপনি জানেন না? আজব। আপনিই তো মেডিকেলের কাগজে সাইন করলেন। আপনার জরায়ু আর ডিম্বাশয় স্বেচ্ছায় রিমুভ করার জন্য?'

কথাগুলো শুনে একঝাক গরম হাওয়া যেন সিমথিয়ার শরীর থেকে বের হয়ে গেল। মনে হলো কেউ ওর মাথার ভেতর বোমা ফাটিয়ে দিয়েছে। শরীরের সব রক্ত যেন মুহূর্তে জমে গেল। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এলো।
'জরায়ু... ডিম্বাশয়... রিমুভ?'

নার্স তখনও বলে যাচ্ছে,
'মানুষ এ পৃথিবীতে নিজের অংশ রেখে যাওয়ার জন্য, একটা বাচ্চা রেখে যাওয়ার জন্য কতকিছু করে আর আপনি সেচ্ছায় জরায়ু কেটে ফেললেন যাতে বাচ্চা না হয়? দুনিয়ায় কত রকম যে মেয়ে মানুষ আছে আল্লাহই জানেন। আমার বোনের জরায়ুতে সিস্ট হওয়ার পরও সে জরায়ু কাটেনি বাচ্চা নিবে সে কথা ভেবে। আর তুমি এতটুকু বয়সে সুস্থ সবল জরায়ু কেটে ফেললে যাতে বাচ্চা না হয়, তোমার ফিগার নষ্ট না হয়। পেটের ব্যথা কমে যাবে কয়েকদিনের মধ্যে। নিয়মিত ওষুধ খেলেই হবে।'

নার্স চলে গেল। সিনথিয়া হতবুদ্ধি হয়ে বসে রইল। ধীরে ধীরে সব পরিষ্কার হতে লাগল ওর কাছে। সেই সাদা কাগজ। জবার ঠান্ডা হাসি।
পিস্তল ঠেকিয়ে সাইন নেওয়া। এটাই ছিল?
এটাই জবা চৌধুরীর প্রতিশোধ?
ওকে মেরে ফেলেনি জবা। তারচেয়েও ভয়ংকর কিছু করেছে। ওকে বেঁচে থাকতে দিয়েছে, কিন্তু কোনোদিন মা হওয়ার অধিকার ছাড়া।

সিনথিয়া ফাঁকা চোখে সামনের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে রইল। মনে হলো, গুলির ব্যথা কিছুই না। আসল গুলিটা জবা করেছে ওর অস্তিত্বে।

—————

পার্কের পুরোনো বেঞ্চটায় একা বসে আছে ফারিস। বিকেলের আলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে এসেছে। পশ্চিম আকাশে ডুবে যাওয়া রোদের রঙ ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে। কমলা, সোনালি আর হালকা লালচে আভায় যেন পুরো পার্কটাকে স্বপ্নের মতো লাগছে।
হালকা বাতাসে কৃষ্ণচূড়ার ডাল দুলছে। কোথাও কোথাও শুকনো পাতা ঝরে পড়ছে মাটিতে। দূরে একজোড়া কপোত-কপোতী হাত ধরে হাঁটছে। মেয়েটা কিছু একটা বলছে, ছেলেটা হেসে শুনছে।

দৃশ্যটা দেখে অকারণে বুকের ভেতরটা কেমন হাহাকার করে উঠল ফারিসের। সময় বড়ো নিষ্ঠুর। মানুষকে সামনে এগিয়ে যেতে বাধ্য করে, অথচ কিছু স্মৃতিকে বুকের ভেতর গেঁথে রেখে দেয় চিরদিনের জন্য। ফারিস চোখ বন্ধ করল। আর সঙ্গে সঙ্গে বহু বছর আগের সেই বিকেলটা ফিরে এল মনে।

সেদিন বসন্ত ছিল। বাতাসে ফুলের গন্ধ ছিল। রোদে ছিল নরম উষ্ণতা। আর ওর ভেতরে ছিল এক অদ্ভুত অস্থিরতা। যার নাম তখনও মুখ ফুটে স্বীকার করেনি সে।

তখন ফারিস কেবল বুঝতে শুরু করেছে, জবাকে দেখলে তার ভেতরটা অন্যরকম হয়ে যায়। তবুও প্রাণপণে নিজেকে বুঝিয়েছে এটা ভালোবাসা না। কেবল ভালোলাগা। সাময়িক আকর্ষণ। কিন্তু সেদিনের পর আর নিজেকেও মিথ্যে বলতে পারেনি। নিজের মনের কাছে ভালোবাসার কাছে বাঁধা পড়ে গিয়েছিল এক জীবনের জন্য। ফারিসের ধারণা হয়তো পরকালেও এ মায়া কাটবে না।

এ পার্কেই ঘুরতে এসেছিল কয়েকজন বন্ধু মিলে। জানত না সেদিন জবারাও এখানে আসবে। পার্কে ঢুকে এক পাশে মেয়েদের হাসি শব্দ লক্ষ্য করতেই চোখ আটকে গেল জবাতে। 

বসন্তের শাড়ি পরা। জবার বান্ধবীরাও একই রকমের শাড়ি পরা। সম্ভবত সবাই ম্যাচিং করে পরেছিল। তবে ফারিসের চোখ কেবল জবাতেই আটকে ছিল আর বাকিরা ঝাপসা। ও শুধু জবাকেই দেখতে লাগল।

 এই প্রথম শাড়িতে দেখছে মেয়েটাকে।
চুল খোঁপা করা। খোঁপায় জড়ানো সাদা ফুলের মালা। বাতাসে কয়েকটা চুল উড়ে এসে গালে লেগে আছে। বয়স খুব বেশি না, তবুও শাড়িতে অদ্ভুত পরিণত লাগছে ওকে।
ফারিসের বুকের ভেতর হঠাৎ ঝড় উঠল।
এত জোরে নিজের হৃৎস্পন্দনের শব্দ কখনো শোনেনি ও।

জবার চোখও ওকে খুঁজে পেল। মুখভরা হাসি নিয়ে এগিয়ে এসে বলল,
'ফারিস ভাই আপনি এখানে?'
ফারিস কোনোমতে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
'হু ঘুরতে আসলাম। তুই?'
'বন্ধুদের সাথে ঘুরতে আসলাম। প্রথমবার শাড়ি পরলাম। কেমন লাগছে আমায়?'

সত্যিটা বলতে গেলে বলতে হতো। ওকে দেখে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জিনিসটা চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সে কথা কি বলা যায়?ফারিস তাই মুখ গম্ভীর করে বলল,
'জঘন্য। আর কখনো এভাবে শাড়ি পরে রাস্তায় বের হবি না।'

মুহূর্তেই জবার হাসিটা মিলিয়ে গেল। ফারিস কঠিন গলায় আবার বলল,
'একদম ভালো লাগছে না। দেখ কোমরের কাছটায় সেফটিপিন খুলে তোর কোমর দেখা যাচ্ছে। বারোহাত শাড়িতেও শরীর ঢাকতে না পারলে কেমন দেখায় বল?'

জবা এত লজ্জা পেল যে মুখ গোমরা করে আঁচল টেনে কাঁধ ঢাকল। ফারিস আবার বলল,
'এত পাতলা ব্লাউজ পরেছিস কেন জঘণ্য লাগছে। যা বাড়ি যা। আর কোনোদিন শাড়ি পরে এমন পার্কে টার্কে আসবি না।'

জবার চোখে সঙ্গে সঙ্গে পানি চলে এলো।
মুখ গোমড়া করে সে বান্ধবীদের কাছে ফিরে গেল। কিছুক্ষণ কী যেন বলল, তারপর সত্যিই পার্ক থেকে বের হয়ে গেল। যাওয়ার সময় লুকিয়ে অভিমানী চোখের পানি মুছল।
ও চলে যেতেই ফারিস বুক ভরে নিঃশ্বাস নিল। তারপর মৃদু হেসে বলেছিল,
'আর কিছুক্ষণ তোকে দেখলে আমি নির্ঘাত হার্ট ফেইল করতাম। তোকে এত সুন্দর লাগছিল যে অন্য কেউ এ সৌন্দর্যের প্রেমে পড়ুক তা চাই না। আমার সহ্য হবে না। এ রূপ, সৌন্দর্য শুধু আমার। আর এত পাতলা ব্লাউজ কেউ পরে বল, ভিতরের ইনার দেখা যাচ্ছিল।'

বুকের ওপর হাত রেখে ফিসফিস করে বলল,
'আল্লাহ বাঁচাইছে। আর কয়েক মিনিট সামনে থাকলে হার্ট এত জোরে বিট করত যে সত্যিই ফেটে যেত।'

ঠিক তখনই জবার এক বান্ধবী এসে দাঁড়াল সামনে। হাসিমুখে বলল
'দুলাভাই জবা চলে গেল কেন?'
দুলাভাই ডাক শুনে কেঁপে উঠল ফারিস। বলল,
'কী ডাকলে?'

মেয়েটা খিলখিল করে হেসে বলল,
'ইয়ে মানে। বান্ধবীর বয়ফেন্ডকে তো দুলা ভাই-ই ডাকে তাই না?'
কথাটা শুনে ফারিসের মনে এক ঝাক প্রজাপতি উড়ে গেল। বলল,
'আমি জবার বয়ফেন্ড তোমায় কে বলল?'
'জবা। আপনার কথা তো আমাদের বন্ধু মহলের সবাই জানে। আপনার ছবিও দেখেছি। জবার ব্যগে থাকে সবসময়।'

ফারিস কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল,
'তোমার বান্ধবীকে বলো বয়সের আগে পাকনামী কম করতে। এমন পাকনামি করলে ওর কান আমি ছিড়ে দিব।'

মেয়েটা হেসে চলে গেল। আর ফারিস স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। চারপাশে বসন্তের বাতাস বইছে। গাছে গাছে ফুল দুলছে। অথচ ওর ভেতরে তখন অন্য এক ঋতু নেমেছে।ভালোবাসার ঋতু। ও আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
'পাগলী একটা। সবাইকে জানিয়েছে আমার কথা?'

তারপর বুকের ভেতর জমে থাকা অদ্ভুত কোমল অনুভূতিটাকে ছুঁয়ে ফিসফিস করে বলল,
'এভাবে ভালোবাসলে আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করব কীভাবে বল? এখনও তো কতগুলো বছর অপেক্ষা করতে হবে আমাকে। এমন মিষ্টি মিষ্টি পাগলামী করলে আমি যে পাগল হয়ে যাব। তবে আজ নিজের কাছে নিজে ওয়াদা করলাম তুই ব্যতিত আর কেউ আমার জীবনে আসবে না।'

বাতাসে শুকনো পাতা উড়ে গেল। আর ফারিসের মনে হলো। কিছু ভালোবাসা কখনো শুরু হওয়ার আগেই আজীবনের স্মৃতি হয়ে যায়।

বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে। পার্কের মাথার উপর ঝুঁকে থাকা কৃষ্ণচূড়ার ডালগুলোয় হালকা বাতাস দোলা দিচ্ছে। দূরে ছোট ছোট বাচ্চাদের হাসির শব্দ, কোথাও কফির গন্ধ, কোথা প্রেমিক প্রেমিকার নিচু স্বরে কথা বলা। সব মিলিয়ে চারপাশে এক অদ্ভুত শান্ত সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে। অথচ সেই শান্তির মাঝেও ফারিসের ভেতরে যেন বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা অস্থিরতা নিঃশব্দে জেগে উঠছে।

কাঁধে কারও নরম হাতের স্পর্শ পড়তেই অতীতের ঘোর ভাঙল ফারিসের।
চমকে তাকাতেই দেখল জবা। হালকা বাতাসে জবার চুলের কিছু গোছা উড়ে এসে গাল ছুঁয়ে যাচ্ছে। ওর ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি। সেই পুরোনো, চেনা, বুক কাঁপিয়ে দেওয়া হাসি। জবা ধীরে ওর পাশে বসতে বসতে বলল,
'কোন খেয়ালে ছিলেন? কতক্ষণ যাবত ডাকছি।'

ফারিস কিছুক্ষণ শুধু তাকিয়ে রইল। এমনভাবে তাকিয়ে রইল যেন বহুদিনের তৃষ্ণার পর কেউ জল দেখেছে। আগের মতো ফারিস আর কোনো রাখ ঢাক রেখে মনের কথা গোপন করল না। সরাসরি বলল,
'অনেক বছর আগে এ পার্কে শাড়ি পরা এক কিশোরীকে দেখেছিলাম। সে সেদিন প্রথৃ শাড়ি পরেছিল। তাকে দেখতে পৃথিবীর বাইরের কোনো মানবীর মতো মোহময়ী লাগছিল। আজ পার্কে ঢুকতেই সেই কিশোরীর ছবি চোখের সামনে আবার ফিরে এলো।'

জবা ঠোঁট বাঁকিয়ে তাকাল। কণ্ঠে রসকষহীন অভিমান,
'আপনি তো বলেছিলেন জঘণ্য লেগেছিল?'

ফারিস হালকা হেসে মাথা নিচু করল। সেই হাসিতে কষ্ট ছিল, আফসোস ছিল, আর ছিল বহুদিনের লুকানো প্রেমের ক্লান্তি। বলল,
'সেটা বলেছিলাম যাতে সে দ্রুত লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যায়। তার সৌন্দর্য দর্শনের অধিকার কেবল আমার একার ছিল। তাট সৌন্দর্য দেখার অধিকার কেবল আমার একার হোক এই স্বার্থপর ইচ্ছা থেকেই বলেছিলাম।'

কথাগুলো বাতাসে মিলিয়ে যেতেই দুজনের মাঝখানে নীরবতা নেমে এলো। দূরে কোথাও শুকনো পাতা মাড়িয়ে কেউ হাঁটছে। সূর্যের আলো গাছের ফাঁক দিয়ে এসে জবার মুখে পড়ছে। ফারিস তাকিয়ে আছে। যেন এই মুখটাই তার বহু বছরের অপূর্ণ জীবনের সবচেয়ে প্রিয় দৃশ্য। জবা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নিচু স্বরে বলল,
'এখন নেই।'

ফারিস সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলল। চোখে অদ্ভুত এক জেদ। জেদি কণ্ঠে বলল,
'ভুল বললি। সেই সময়, সেই অনুভূতিতে আজও কেবল আমারই অধিকার। সারাজীবন আমারই থাকবে। না সে সময়ে কেউ যেতে পারবে না আমার অধিকার কেড়ে নিতে পারবে। কিছু ভালোবাসা হারিয়ে গেলেও মরে না, জবা। তারা বুকের ভিতর জমে থাকে৷ ঠিক পুরোনো ক্ষতের মতো।'

জবা একমনে তাকিয়ে আছে ফারিসের চোখের দিকে। এ চোখ ও আগে কখনো এভাবে পড়েনি। কত বছর ধরে একজন মানুষ নিঃশব্দে এত ভালোবাসা বয়ে নিয়ে বেড়াতে পারে, জবা বুঝতে পারছে না।
পরিস্থিতি ওদের আলাদা করেছে। সময় আলাদা করেছে। ভুল মানুষ, ভুল সিদ্ধান্ত, ভুল মুহূর্ত৷ সব মিলিয়ে জীবন অন্যদিকে মোড় নিয়েছে।

তবুও প্রথম ভালোবাসার অনুভূতি কি সত্যিই মুছে যায়? জবা চোখ সরিয়ে নিল। গলা শুকিয়ে আসছে ওর। জবা চোখ সরিয়ে বলল,
'কি যেন বলতে চেয়েছিলেন?'

ফারিস এবার কোনো ভণিতা করল না। কোনো আড়াল রাখল না। শান্ত, স্থির কণ্ঠে বলল, 
'ইরফানের সাথে তোর বিচ্ছেদ কবে হবে?'
'শীঘ্রই।'
'তারপর...'
'আমি আর জারা। শান্তিপূর্ণ একটা জীবন।'
'সোজাসাপটা কথা বলছি উত্তর তেমন দিবি।'

জবা তাকাল। ফারিস বলতে নিলো। ওর কণ্ঠ এবার কেঁপে উঠল সামান্য। এমন কাঁপা স্বর হয়তো জবা আগে কখনো শোনেনি। তারপর বলল,
'তারপর তোর আর জারার সাথে আমাকে আর ফিরনাসকে তোদের জীবনে জায়গা দিবি। তোদের পরিবারের সদস্য করবি আমাদের? আমরা নয়হয় ওদের দু'জনের বাবা মা হলাম।'

মুহূর্তেই সময় যেন থেমে গেল। দূরে হঠাৎ বাতাস একটু জোরে বইল। কৃষ্ণচূড়ার শুকনো পাপড়ি উড়ে এসে পড়ল জবার শাড়ির উপর।
জবা নিচের দিকে তাকিয়ে রইল। ও আগেই আন্দাজ করেছিল ফারিস এমন কিছু বলবে।

তবুও কথাগুলো সরাসরি শুনে বুকের ভিতরটা কেমন অদ্ভুত ভারী হয়ে উঠল।
কারণ জীবনের সবচেয়ে নির্মম সত্যি হলো, কখনো কখনো সঠিক মানুষটা আসে ভুল সময়ে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp