আয়নার জীবনে তার স্কুল শিক্ষক নারায়ণ স্যারের অবদান অপরিসীম। নারায়ণ স্যার অংক শেখাতেন। কঠিন কঠিন গানিতিক সমস্যার সমাধান করা তার জন্য ডালভাত ছিল। আয়না যখন জেদ করে পড়াশোনা বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তিনি তখন ছুটে তাকে বোঝাতে আসেন। আয়না তখন চরম হতাশাগ্রস্ত, বাড়ি থেকে দু-একবার চলে গিয়েও সুবিধা করতে পারেনি, সরকার বাড়ির মেয়ের ঠিকানা অন্য কোথাও হতে পারে না।
সে বলল, স্যার আমার পক্ষে আর সম্ভব না। পড়াশোনা থেকে ভক্তি চলে গেছে। এরচেয়ে কারিগরি কাজ শিখা ভালো।
নারায়ণ স্যার বললেন,
মা এইটা চরম ভুল সিদ্ধান্ত। তোমার মেধা আছে, রেজাল্ট ভালো। তুমি কেন এই সময় এসে পড়া ছাড়বা? চুপচাপ ছুটির পর আমার কাছে এক ঘন্টা অংক করে যাবা। রুকাইয়া ম্যাডামের সাথে আলাপ হয়েছে উনি অন্য বিষয়গুলা দেখবে।
আয়না কৃতজ্ঞতার ভারে কোনো কথা বলতে পারল না। সমস্যাটা যে এখানে তা তিনি কিভাবে বুঝলেন? কিছু কিছু শিক্ষক ক্লাসে দাঁড় করিয়ে অপমান করতে ছাড়ে না, আর কিছু কিছু শিক্ষক শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের চিন্তায় বিভোর।
নারায়ণ স্যার আর নেই। তিনি থাকলে আয়না ভর্তি পরীক্ষা না দিতে পারায় তিনি সবচেয়ে বেশি দুঃখ পেতেন তবে ছাত্রীর এখনকার সুরক্ষিত আর্থিক অবস্থা দেখে সন্তুষ্ট ও বোধহয় হতেন।
তিনি সবসময় বলতেন ছেলেদের সমান বা তার চেয়েও বেশি একটা মেয়ের স্বাবলম্বী হওয়া প্রয়োজন। নয়তো বিপদের দিনে ভাতও যাবে, জাতও যাবে।
ইরা কে কপাল ঠুকরে ঠুকরে কাঁদতে দেখে তার তাই মনে হলো। আর কয়েকদিন পরেই ডেলিভারির ভেট। সর্বোচ্চ যত্ন পাওয়ার অধিকারী মানুষ সর্বহারিনীর মতো আহাজারি করছে।
আয়নার চুড়ান্ত অস্বস্তি হচ্ছে। থেমে থেমে শ্বাস ভারী হয়ে আসছে। কেন এই মেয়েটার সাথে মায়া লাগতে গেল? এই যে এখন অনাকাঙ্ক্ষিত কষ্ট আঘাত করছে এর উত্তর কি?
ইরা রক্তিম চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলে, আমাকে বিষ এনে দিবা আয়না?
পাশের ভারাটিয়ারাও এসে ভিড় জমাচ্ছে। শারমিন আরাও হইচইয়ে বেশ বিরক্ত। আয়না একে একে সবাই ঘর থেকে বের করল।
দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে আয়না কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। বাইরে মানুষের ফিসফাস ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু ঘরের ভেতরের ভারী বাতাসটা আরও ঘন হয়ে উঠছে।
ইরা কাঁপছে। এখন আর শব্দ করে কাঁদছে না কিন্তু সেই চেপে রাখা কান্নাটাই বেশি অসহ্য।
আয়না ধীরে এগিয়ে এসে তার সামনে বসে পড়ল। কিছুক্ষণ কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল।
তারপর শক্ত গলায় বলল,
এইসব কথা আর বলবা না। বিষ-টিষের কথা একদম না।
ইরা মাথা তুলল। চোখদুটো লাল ও অসম্ভব ফোলা।
-আমি পারছি না, গো একদম পারছি না। আমার মাথা কাজ করছে না। একদম পাগল পাগল লাগছে। মনে হচ্ছে দুঃস্বপ্ন দেখছি। এটা কিভাবে সম্ভব? আচ্ছা বোন আমি তার কাছে গেলে ঠিক হয়ে যাবে না? আমি যদি সামনে দাঁড়াই, ওর সাথে কথা বলি, আমাদের বাচ্চার কথা বলি তাহলে সে ফিরে আসবে না?ও তো এমন না, মানুষটা সত্যিএমন করতে পারে না… নিশ্চয়ই সবার কিছু একটা ভুল হচ্ছে।
কথাগুলো বলতে বলতে সে নিজেকেই বোঝাতে চাইছে। প্রতিটা বাক্যের শেষে তার গলা আরও ভেঙে যাচ্ছে।
আয়না কিছুক্ষণ চুপ করে শুনল। তারপর ধীরে বলল,
—তুমি আসলে ওই লোককে বোঝাতে যেতে চাও, কি বলবে? কোনটা সে না বুঝে করেছে? সে জানতো না সে বিবাহিত? সন্তান পৃথিবীতে আসবে তার? সজ্ঞানে যে মূল্যায়ন করেনি, তার কাছে এখন গিয়ে কি চাইবে?
ইরা থেমে গেল। প্রশ্নটা ঠিক জায়গায় গিয়ে আঘাত করল,
আমি, আমি শুধু আমার সংসারটা বাঁচাতে চাই। আমার শাশুড়ী ও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে মেয়ে হবে শোনার পর থেকে। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। আমার বাবুটার কি হবে? আমি তো কোনো অন্যায় করিনি কখনো কারো সাথে তাহলে আমার সংসারে এমন হলো কেন? আমার বাচ্চাটা কোথায় থাকবে?
-তোমার কাছে। শতকরা নব্বই ভাগ সম্ভবনা আছে বাচ্চা তার চাই না।
-আমার সাথে এমন কেন হলো? আমি কি পাপ করেছিলাম? নাহ সংসার ভাঙা যাবে না। কোথায় যাবো তাহলে আমি? বাবার ছায়া ছাড়া আমার বাচ্চা কিভাবে বাঁচবে? সে নিশ্চয়ই বুঝবে আমাকে দেখলে!
-তুমি এখন যা ভাবছো, সেটা খুব স্বাভাবিক। তুমি ভাবছো তুমি থাকলে, চেষ্টা করলে, বাচ্চার কথা বললে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু একটা কথা ভাবো, যে মানুষটা এই অবস্থায় তোমাকে রেখে অন্য একটা সংসার করেছে, সে কি তোমার কথা শুনে হঠাৎ বদলে যাবে? সে তোমাকে অনেক আগেই মানসিক ভাবে ছেড়ে দিয়েছে।
ইরা মাথা নিচু করে ফেলল। হাতটা ধীরে নিজের পেটের ওপর চলে গেল,
আমি চাই না আমার বাচ্চা বাবাকে ছাড়া বড় হোক।
আয়নার স্বর এবার একটু নরম হলো, কিন্তু কথাগুলো আগের মতোই স্পষ্ট,
বাবা থাকা আর বাবার মতো মানুষ থাকা এই দুইটা জিনিস এক না।
জীবনের কিছু স্মৃতি মানুষ শত চাইলেও ভুলতে পারে না। একটুও মলিন হয় না, উল্টো এতোটাই জীবন্ত চোখের সামনে ভাসে যেন অনেক বছর পার হয়নি।
আয়না মাটির পুতুল নিয়ে উঠানে খেলছিল। তার তেমন খেলার সাথী নেই। তার পুতুলদের বিয়ে হচ্ছে। সেই মেয়েপক্ষ আবার বরযাত্রীতেও সেই প্রধান। শতকাজ তার একা হাতে করতে হচ্ছে। মা তাকে সাহায্য করছিল, আয়নার মন খারাপ হলে তারও মন খারাপ হয় কিনা! তাই ব্যস্ততার মাঝেও এসে তার রান্না করে দিচ্ছে, বউকে সাজিয়ে দিচ্ছে। টোপর বানিয়ে দিচ্ছে।
আয়না তার বাবাকে খুব ভয় পায়। মা বলে বাবাকে ভয় না পেয়ে সম্মান করতে কিন্তু আয়নার শুধু ভয় লাগে। কোনোদিন বাবা তাকে নাম ধরে ডাকে না। না আয়না, না আইরিন। বাবা যখন তার দিকে তাকায় আয়নার গা শিউরে উঠে, একদম স্নেহের পরশ পায় না সেখানে।
তার পায়ের শব্দও সে চিনতে পারে। সদর দরজায় পা রেখেছে বুঝতে পেরেই আয়না পুতুল খেলা রেখে দৌড়ে লুকিয়ে রইল।
রফিক সরকার গতি থামিয়ে পায়ের কাছে এসব জঞ্জাল দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। এক লাথি মেরে সব লন্ডভন্ড করে দেয়। আয়না মুখে হাত চেপে ধরে কান্না থামায়।
রফিক সরকার গজগজ করতে করতে ভেতরের ঘরে যায়। সময়মতো তিনবেলার খাবার সাজানো না থাকলে তার মেজাজ চুড়ান্ত খারাপ হয়।
ঘরে মহিলাদের কাজটা কি? তিনবেলা ভালোমন্দ রান্না করতে পারবে না সময়মতো? আছে শুধু বসে বসে পরের অন্ন ধ্বংস করার তালে!
রফিক সরকারের কথার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। দুনিয়ার যেকোনো সমস্যার প্রকোপ তার নিজের বাড়িতেই প্রকাশ করতে হয়।
এইবারের সমস্যা হলো ভাত-তরকারির সাথে সালাদ কাটা ছিল না।
-কয়বার বলেছি সালাদ যেন মিস না যায়?
আইনুন নাহারের বুক ধক করে উঠল। অশনিসংকেত বাজতে থাকল।
তিনি দ্রুত সালাদ কাটতে গিয়ে আঙুল কাটলেন। তাড়াহুড়ায় কখনো কাজ ভালো হয় না। দ্বিতীয় সমস্যা ধরা পড়ল ভাত নরম হয়ে গিয়েছে।
রফিক সরকারের গরম ঝরঝরা ভাত পছন্দ। তিনি থমথমে স্বরে বললেন, এইটা কি?
আইনুন নাহার মৃদু হেসে বললেন, নরম হয়ে গেছে? আবার বসায় দেই? বেশিক্ষণ লাগবে না একদম। আসলে ওই অন্য কাজে-
-সারাদিন কাজ করে এখন আমি বসে থাকবো আর তুমি রান্না চড়াবা?
-মানে আসলে?
-তোর মনোযোগ কই থাকে?
-মেয়ে বাইরে আছে, শুনতে পারবে!
-শুনুক বা'ন্দির বাচ্চা।
-রাগ করবেন না। দেখেন না ওতোটাও-
রফিক সরকারের মাথায় অসুর ভর করে। তার তর্ক পছন্দ না একদম। চুলের মুঠি ধরে বলে, নরম হয় নাই? আমি মিথ্যা বলতেছি?
আয়না কেন তখন দরজার দাঁড়িয়ে দেখতে গেল? মা তো তাকে হাজারবার বলেছিল বাবা যখন রেগে থাকবে একদম যেন কাছে না যায়। আয়না কেন ছিল তবে?
না থাকলে তো দেখতে হতো না সেই কুৎসিত দৃশ্য! রফিক সরকার নিজের পুরুষত্বের সর্বোচ্চ প্রমান দিয়ে সেই ভাতের পাতিল দিয়েই আইনুন নাহারকে মারতে লাগলেন।
আয়না পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে দেখতে থাকল। না সে মা'কে বাঁচাতে গেল, আর না সে চোখের পাতা বন্ধ করতে পারল।
অনেকটা সময় পর তার দাদী আসলেন। বিরক্ত হয়ে বলল, কি শুরু করলি রে রফিক এই ভরদুপুরে? কি কপাল আমার! দুইটা ভাত একবেলা শান্তিতে খাইতে পারি না। মাইনষে কি কইবে? ছাড় ওরে! বউ ওরে ক্ষেপায় দিয়া কি মজা পাও তুমি? এমনে সংসার হয়?
রফিক সরকার আর বেশিক্ষণ থাকেনি। আইনুন নাহার ও ধরে ধরে উঠে দাড়ায়। মেঝে পরিষ্কার করে। হঠাৎ আয়নাকে দেখে এক পলক থমকায়। তারপর হেসে ফেলে। হাসতে হাসতে কেঁদে উঠে।
আয়নার মনে হয় মা শরীরে বেশি ব্যথ্যা পায়নি। কিন্তু মনটা ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। লজ্জা অপমান তাকে পুরোপুরি গ্রাস করেছে।
তাও রাতের বেলা মা পরিপাটি হয়ে বাবার জন্য দুধের গ্লাস নিয়ে ঘরে যায়। দরজার খিল তুলে দিয়ে স্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে।
অপছন্দের হলেও স্ত্রী তো! তিন বেলা খাবার দিচ্ছে, অধিকার আদায় বাদ যাবে কেন!
আয়নার কথা গুলিয়ে যায়, গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসে। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। ইরা তার গা ঘেঁসে বসেছে।
আয়না বলল,
আমি ভাবতাম মা কেন নানাবাড়ি চলে যায় না? একটা বয়সে এসে মনে হতে থাকে আমার জন্য, আমার ভবিষ্যতের জন্য থেকে গেছেন। কিন্তু আরেকটু বড়ো হওয়ার পর বুঝতে পারি মূল কারণ ছিল ভালোবাসা। হ্যাঁ খুব হাস্যকর তাই না?
মার-অপমানের মাঝে যেটুক ভালো ব্যবহার পেতো, সেগুলো তাকে লোভী বানিয়ে দিয়েছিল। সে ভাবতো ঠিক হয়ে যাবে সব। কবুল বলে এই ভিটাতে পা রেখেছে, খাটিয়া ছাড়া বের হবে কিভাবে?
নেশার মতো হয়ে গিয়েছিল, বিষাক্ত নেশা ও জেদ। ভালোবাসা পাওয়ার জেদ। এই জেদ তার মধ্যে যেসব উজ্জ্বল, ইতিবাচক সম্ভাবনা ছিল সবকিছু ধূলিসাৎ করে দেয়। সে নারীর চেয়ে বেশি একটা খোলসে আবৃত জড়পদার্থ হয়ে রয়ে যায়।
এটাই দুঃখজনক যে আমার মা'কে কেউ জোর করে রাখেনি। নিজেই থেকেছে। কারণ সে বিশ্বাস করতো, ভালোবাসার টানে একসময় সব ঠিক হয়ে যাবে। যে মানুষটা তাকে কখনো ভালোবাসেনি, সম্মান দেয়নি, উল্টো প্রতিদিন অপমান, অপদস্ত করেছে, তার পাশেই থেকেছে আমৃত্যু।
আয়না ইরার হাত নিজের মুঠোয় নিয়ে বলে,
একটা বাচ্চা যদি প্রতিদিন দেখে তার মাকে অপমান করা হচ্ছে, অবহেলা করা হচ্ছে সে শেখে যে এইটাই স্বাভাবিক। তার ভেতরের আত্মসম্মানটা খুব ছোটবেলাতেই ভেঙে যায়। মায়ের সহ্য সীমানা সব মেয়েরা ভেদ করতে পারে না, দুর্বিষহ জীবনের গোলচক্রে আটকে যায়। অথচ এই মায়েরা সন্তানের ভালোর জন্যই রয়ে গিয়েছিল।
ইরা চোখ বন্ধ করে ফেলল। নিরন্তর অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে, আমি কি সত্যি পারব ?
আয়না কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল তার দিকে। তারপর সাহস দিয়ে বলল,
তোমাকে পারতেই হবে। কারণ এবার তুমি শুধু নিজের জন্য না, তোমার সন্তানের জন্যও একটা সম্মানজনক জীবনের সিদ্ধান্ত নিবে।
ইরা ধীরে ধীরে মাথা নিচু করল। তার কান্নার শব্দ এবার আর হাহাকার নেই, শুধু দীর্ঘশ্বাস আর ক্লান্তি।
আয়না তার হাতে ধরে পাশে বসে রইল। স্বান্তনামূলক কিছুই সে বলতে পারল না, আর না হা-হুতাশ করে পুরো কাহিনি জানতে চাইল। শুধু অনেকটা সময় ইরার সাথে রইল।
—————
মাহির খুব সকালে যখন বাসা থেকে বের হলো, তার মাথায় একটা খুব পরিষ্কার পরিকল্পনা ছিল।
আজ সে নেগোশিয়েট করে নিজের অবস্থান দাঁড় করাতে এসেছে।
একদিনের নোটিসে আসলেই তেমন কিছু সমাধান করা সম্ভব হয়নি। খামে করে ভেতরে যা টাকা প্রয়োজন সেটার প্রায় এক-চতুর্থাংশ জোগাড় হয়েছে। কিছু ধার, আর নিজের জমানো সামান্য অংশ মিলিয়ে এইটুকুই সম্ভব হয়েছে। সে জানে, এটা যথেষ্ট না। কিন্তু সে এখন একা না, তার নিজস্ব পরিবার আছে। সেভিংস পুরোটায় হাত দেওয়া যাবে না, স্ত্রীর জন্য জমিয়ে রাখতে হবে।
কিন্তু এটুকু দেখাতে পারলে অন্তত সে বলতে পারবে সে চেষ্টা করেছে, সে এড়িয়ে যায়নি।
তার পরিকল্পনা ম্যানেজমেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করা। যে অভিযোগ এসেছে, সেটা নিয়ে নিজের ব্যাখ্যা দেওয়া। সরাসরি সময় চাওয়া পুরো বিষয়টা পুনরায় যাচাই করার জন্য।
সে ভেবেছিল এতোদিন পর অফিসে আসায় অন্তত তার কথা শোনা হবে।
অফিসে ঢুকতেই সে বুঝল, পরিবেশটা স্বাভাবিক না।
মানুষজনের আচরণে একটা অদ্ভুত পরিবর্তন আছে কেউ সরাসরি কিছু বলছে না, কিন্তু চোখে চোখে একটা চাপা ইঙ্গিত কাজ করছে।
সে রিসেপশনে গিয়ে বলল সে এইচআর হেডের সাথে দেখা করতে চায়। কাউন্টারের মেয়েটা একবার তার দিকে তাকিয়ে জানাল, মাহির ভাইয়া স্যার এখন ব্যস্ত আছেন। একটু অপেক্ষা করতে হবে।
মাহির কিছু না বলে পাশের চেয়ারে গিয়ে বসে পড়ল। তার ডেস্কে যাওয়ার সুযোগ নেই।
সে ভাবল এটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। ধাপে ধাপে এগোলেই ভালো হবে। কিন্তু সময় যত এগোতে লাগল, ততই বুঝতে পারল এটা সাধারণ অপেক্ষা না।
কারণ তাকে না ডাকা হচ্ছে আর না কেউ কোনো আপডেট দিচ্ছে। কেউ তার দিকে তাকাচ্ছে না, যেন তাকে এই মুহূর্তে কোনো গুরুত্বই দেওয়া হচ্ছে না।
কর্পোরেট লাইফের অলিখিত নিয়ম হলো নেটওয়ার্কিং ও কানেকশন তৈরি রাখা। পদমর্যাদা বুঝে তৈলমর্দন করা ও দুর্বলদের এড়িয়ে চলা।
অন্তর্মুখী মাহির এসব দিকে পিছিয়ে ছিল, সে ঠিক বুঝতে পারছে তার প্রতি এক শ্রেণির মানুষ ক্ষিপ্ত ও তাকে শায়েস্তা করতে চায়।
প্রায় আধঘণ্টা পরে শফিক এসে হাজির হলো।
তাকে দেখে মুখে স্বাভাবিক হাসি টেনে বলল,
আরে মাহির সাহেব, শরীর তো ভালো না। আপনি এখন এখানে?
মাহির মাথা তুলল, আমি এইচআরের কাছে এপোয়েন্টমেন্ট নিয়েছি, সরাসরি কথা বলতে চাই। কিন্তু উনি এখন আনরিচেবল।
শফিক সাহেব কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থাকল, তারপর বলল,
মিটিং? না না, এখন তো আর দরকার নেই।
মাহির একটু থেমে গেল, মানে?
শফিক সাহেব এবার একটু স্বস্তির ভঙ্গিতে বলল, সবকিছু তো ক্লিয়ার হয়ে গেছে। আর কি চাই?
এই বাক্যটা শুনে মাহির ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল,
ক্লিয়ার মানে কী?
শফিক একটু ইতস্তত করে বলল, আরে ম্যানেজমেন্ট বলছে, ইস্যুটা সেটেলড। আপনি কোঅপারেট করেছো, তাই আর কোনো প্রসিডিং নেই, ফলো আপ নেই। সিক লিভ শেষে অফিস জয়েন করবেন।
মাহিরের চোখ সরু হয়ে এলো,
আমি কোনো সেটেলমেন্টে সাইন করিনি।
শফিক এবার একটু থামল। তারপর বলল, সেটায় সাইন করেননি ঠিক আছে। কিন্তু পেমেন্ট হয়ে গেছে।
কম্পানি আর এটাকে ঘাঁটাবে না।
মাহির সময় নিয়ে পুরো ব্যাপারটা বুঝল। তারপর জিজ্ঞেস করল, কে? কে করেছে?
শফিক সাহেব চমকে বললেন, মানে? আপনি জানেন না আসলেই?
মাহিরকে দেখে তিনি ভরকে গেছেন। কেমন অদ্ভুত, উদভ্রান্ত চাহনি! অমায়িক মাহিরকে অপরিচিত লাগছে।
সে আবার জিজ্ঞেস করল, কে ক্লিয়ার করেছে?
—————
মিনি ও দিনা বাইরে দাড়িয়ে ছিল মাহির যখন বাসার গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকল। মিনি তাকে ডেকেও কোনো উত্তর পেল না। উদভ্রান্ত অবস্থা, তার হাঁটার ভঙ্গিটাও স্বাভাবিক না। বরং খুব দ্রুত, কঠোর, অস্থির। ভেতরে জমে থাকা ক্রোধ কোনোভাবে আটকে রেখেছে, আর সেটা যেকোনো মুহূর্তে বের হয়ে আসবে।
মিনি বলল, ভাইয়ার এতো মুড অফ কেন? কখনো এরকম দেখিনি তো।
দিনা চুপ থেকে বলে, বউয়ের জন্য হবে আর কি!
মাহির কথা বলার শব্দ শুনেও থামল না। সোজা দৃঢ় পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠল। চিলেকোঠার দরজা খোলা, কেউ নেই। ছাদে উঠে দরজাটা ঠেলে খুলতেই হালকা বাতাস মুখে লাগল।
আয়না ছাদে পায়চারী করছে।সে চমকে পিছনে তাকাল, সে বুঝতে পারেনি মাহির এসে গেছে। বা হয়তো বুঝেও ঘুরে তাকায়নি।
মাহির কিছু সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল দরজার কাছে। তারপর ধীরে দরজাটা ভেতর থেকে লাগিয়ে দিল।
শব্দটা খুব জোরে হলো না। আয়না দেখল তাকে, হাতের প্লাস্টারের প্রতি কোন ধ্যান নেই। বুক ওঠানামা করছে, আসমানি শার্ট ঘামে ভিজে শরীরে লেপ্টে আছে। সে ঘনঘন চুলে হাত দিয়ে ব্যাকব্রাশ করছে। আয়না তাকে হাতমুখ ধোয়ার কথাও বলতে পারে না। গলায় কথা আটকে যায়। এক গ্লানিবোধ তাকে আঁকড়ে ধরেছে।
চোখে চোখ পড়তেই এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল সময়টা। মাহির আর অপেক্ষা করল না,
তুমি এটা কী করেছো, আয়না?
তার গলার স্বর গমগম করছে, চাপা রাগ স্পষ্ট।
আয়না তাকিয়ে রইল তার দিকে।
-আমি স্পষ্ট করে বলেছিলাম আমার অফিশিয়াল ব্যাপার আমি এটা সামলে নেব। বলিনি? অ্যানসার মি!
আয়না হকচকিয়ে বলল, বলেছো!
-মনে আছে তাহলে? তবুও তুমি করলে? কারণ কি? একবারও মনে হলো না আমার সাথে কথা বলার?
তুমি সবসময় নিজের জন্য এত ক্লিয়ার বাউন্ডারি সেট করো। কে কোথায় কতটুকু আসবে, সেটা নিয়ে এত হিসাব তোমার। ইভেন আমি, তোমার হাসবেন্ডের জন্যও তোমার ইমোশনাল ব্যারিয়ার আছে। আমি নিজে পর্যন্ত কতবার থেমে গেছি এর হিসেব নেই, শুধু এই জন্য যে তুমি চাও না আমি ইন্টারফেয়ার করি। তখন তো তোমার সেই বাউন্ডারিগুলো খুব ইম্পর্ট্যান্ট ছিল, তাই না?
তার দৃষ্টি সোজা আয়নার দিকে। আয়না মাহিরকে এরকম কখনো দেখেনি। সে কি অনাধিকার চর্চা করে ফেলল! নিজের গোছানো কথাগুলো সব এলোমেলো হয়ে যায় তার।
-তাহলে আজকে, আমার বেলায় সেগুলো গেল কোথায়? উত্তর দাও?
আয়নার আঙুলগুলো ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে উঠল,
একটু শান্ত হয়ে আমার কথা শোনো।
মাহির থামল না,
মোটেও শান্ত হতে বলবে না, সেরকম পরিস্থিতি রাখোনি তুমি। আমি বলেছিলাম এটা আমি হ্যান্ডেল করব। আমি চেষ্টা করছিলাম। তুমি কি একবারও ভেবেছো আই ক্যান ফিক্স দিজ? নাকি তুমি ধরে নিয়েছো লাইক আ ফুল আমি নিজের সমস্যাটা নিজে সামলাতে পারি না?
-মাহির প্লিজ!
-আজ অফিসে গিয়ে আমি কী পরিস্থিতিতে পড়েছি জানো? সবাই জানে আমার হয়ে অন্য কেউ এসে সব মিটিয়ে দিয়েছে। আর সবচেয়ে ভালো অংশটা জানো? আমি নিজেই জানতাম না টাকাটা কে দিয়েছে। চমৎকার না?
-তুমি জানলে পারমিশন দিতে না…
-অবভিয়াসলি! এটাই তো স্বাভাবিক।
—তুমি আমাকে এই জায়গায় এনে দাঁড় করালে। এটা শুধু টাকা না, আয়না। এটা আমার দায়িত্ব ছিল, আমার লড়াই ছিল। আমি সেটা নিজে নিতে চেয়েছিলাম। তুমি সেটা-
-আমি তোমাকে স্ট্রেস নিতে দেখতে চাইনি। শুনো কথা আমার। সময় তোমার ফেবারে ছিল না।
ব্যথিত মাহির সঙ্গে সঙ্গে কেটে দিল,
তুমি ভেবেছিলে আমি পারব না। এইটাই ভেবেছিলে।
আয়না মাথা নাড়ল, না, আমি-
-তুমি কি মনে করো আমি এমন মানুষ, যে নিজের পরিবারের জন্য বিপদ তৈরি করবে?
আয়না এবার চুপ করে গেল। তার উত্তরটা গলায় এসে আটকে গেল।
-তুমি তোমার সেভিংস দিয়ে দিলে! ছোটবেলা থেকে জমানো টাকা, কষ্ট করে ফ্রিল্যান্সিং শিখে আর্ন করা টাকা তুমি এখানে দিয়ে দিলে! এতো বড়ো একটা এমাউন্ট! তোমার নিজের টাকা আয়না। তুমি জানো তো তুমি কী করেছো?
তুমি চাকরি করো না। তোমার ওই সেভিংস ওইটাই তোমার মেন্টাল সিকিউরিটি। আর তুমি সেটা এনে দিলে, কাকে?
একজন মানুষকে, যাকে তুমি ঠিকমতো এমনকি ভালোবাসোও না। বলো?
কথাটা বাতাসে স্থির হয়ে রইল। আয়নার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
মাহির এবার একটু নিচু স্বরে বলল, উত্তর দাও আয়না? কেন দিলে? যে মানুষটার জন্য তোমার কিছুই ফিলিংস নেই, তার জন্য তুমি তোমার পুরো সেভিংস ঢেলে দিলে কেন? এটা কি কোনো লজিক্যাল ডিসিশন? নাকি তুমি ভেবেছো আমি ডুবে যাবো, আর তোমাকেও নিয়ে ডুবাবো?
আয়না হকচকিয়ে বলল, এটা তো, এটা তো আমার দায়িত্ব।
কথাটা যেন ঠিক জায়গায় গিয়ে আঘাত করল। মাহিরের মুখের ভাব বদলে গেল।
-দায়িত্ব?
সে বিস্ফোরিত স্বরে শব্দটা পুনরাবৃত্তি করল,
-তাহলে তুমি এটা দায়িত্ব, শুধু দায়িত্ব ভেবে করেছো?
আয়না কিছু বলল না।
মাহির তাচ্ছিল্য নিয়ে হাসল,
গ্রেট। একদম পারফেক্ট!
মাহির রক্তিম নয়নো আয়নার দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে রইল। আয়না কথা বলার জন্য মুখ খুলেও কিছু বলতে পারল না।
মাহিরকে সেখান থেকে চলে যেতে দেখে তার মনে হলো আজ সে নিজে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়েছে, না মাহির আহমেদকে করেছে, তা বলা মুশকিল।
·
·
·
চলবে……………………………………………………