“কিহহহ!? ওই হ্যান্ডসাম লোকটা তোর ভাইয়ের ফ্রেন্ড!?”
মেয়েটার আকস্মিক চিৎকারে কানের পর্দা ফেটে পড়ার জোগাড় প্রিয়ন্তীর। বিরক্ত হয়ে ফোনটা কানের কাছ থেকে একটু সরিয়ে নিয়ে ধমকে উঠল তখন,
“শ্রেয়ার বাচ্চা! আমি তোকে কী বলছি আর তুই কী রিয়্যাক্ট করছিস! একটু তো সিরিয়াস হ ভাই!”
“আরে বেডি চুপ থাক! আগে আমাকে একটা জিনিস বুঝা, এই আজব জিনিসগুলো ঘুরে ফিরে তোর দিকেই কেন টার্নিং পয়েন্ট হয়? আমাকে কি কেউ দেখে না নাকি? মানে বাংলাদেশের সব হ্যান্ডসাম ছেলে গুলা কেন ঘুরে ফিরে তোর আত্মীয়স্বজনের মধ্যেই পড়ে?”
“এ্যা?”
“হ্যা! তুই একটু ভেবে দেখ,প্রথমে এই ব্যাটা নিরামিষ কমান্ডা...
প্রিয়ন্তী চোখ কুঁচকে মাঝপথেই থামালো বান্ধবীকে,
“শ্রেয়ার বাচ্চা! এখানে আবার ওনাকে টানছিস কেন?”
“আরেহ আগে পয়েন্টে তো আসতে দে মেরি বেহেন!
প্রথমে ওই ব্যাটা কমান্ডার, তারপর আবার এই গ্রীন চোখ ওয়ালা! কেন ভাই? আমাকে কি কেউ চোখে দেখে না?”
প্রিয়ন্তী এবার বিরক্ত হয়েই বলল,
“আমার জায়গায় থাকলে বুঝতি! আমার কি অবস্থাটাই না হয়েছিল! হার্টবিট থেমে গিয়েছিলো ভয়েতে! ভাগ্যিস ব্যাটা আমায় চিনেনি। চিনলে এতক্ষনে ভাইয়ার কাছ থেকে জুতো পিটা খেতাম হান্ড্রেড পার্সেন্ট সিউর!”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল শ্রেয়া। তারপর হঠাৎ করেই ফুস করে শব্দ তুলে গাঁ হেলিয়ে হেসে উঠল,
“আমি সিরিয়াসলি বলতেছি, তোর এই আজব গুজব মিস্টেক সিস্টেক লাইফ নিয়ে সুন্দর করে একটা উপন্যাসের বই ছাপা যাবে!”
প্রিয়ন্তী চোখ উল্টে ফোঁসফোঁস করে বলল,
“তুই হাসছিস? আমার হার্ট অ্যাটাক হওয়ার জোগাড় আর তুই মজা পাচ্ছিস?”
“আরে মজা পাবো না? তুই ভাব, এত মানুষ থাকতে ওই অলিভ গ্রিন চোখ ওয়ালা হ্যান্ডসাম বান্দাকেই কেন তোর ভাইয়ের ক্লোজ ফ্রেন্ড হতে হবে! মানে ইউনিভার্স লিটারেললি তোকে ঘিরেই ঘুরতেছে!”
“শ্রেয়া, প্লিজ!এইটা কোনো ফানি ব্যাপার না। আমি এখনো শিওর না,লোকটা আমাকে চিনছে কিনা।যদি ব্যাটা সত্যিই আমায় চিনে ফেলে তো?"
“ওকে,ওকে, ফাইন। একটা কথা বল উনি তোর দিকে স্বাভাবিক ভাবেই চেয়ে ছিল, নাকি খানিকটা অন্যভাবে?”
প্রিয়ন্তী একটু থামল। সময় নিয়ে সুধালো,
“অদ্ভুতভাবে। মানে নরমাল না। মনে হচ্ছিল আমায় খুব আগে থেকেই চিনে হয়তো।আর জানিস উনি আমায় এমন একটা নামে সম্মোধন করেছেন,আমার কেন জানি ডাউট হচ্ছে!"
“ব্যাস!এইটাই তো সন্দেহজনক!"
“মানে তুই কি বলতে চাস,সে হয়তো চিনে ফেলছে?”
“আমি বলতেছি না নিশ্চিত! কিন্তু পসিবিলিটি আছে।”
প্রিয়ন্তী ঠোঁট কামড়ে চুপ করে গেল। গলা শুকিয়ে আসছে।শ্রেয়া আবার বলল,
“একটা কাজ কর, লোকটার সাথে আরেকটু কথা বলিস। ক্যাজুয়াললি। দেখ, কোনো হিন্ট দেয় কিনা।”
“পাগল নাকি?আমি নিজে গিয়ে আগ বাড়িয়ে কথা বলবো? যাতে সে আরো সন্দেহ করে?”
"এই প্রিয়, আচ্ছা যদি বাই এনি চান্স তোকে প্রতিদিন রাতে মেসেজ করা সে ব্যক্তিটি'ই তোর ভাইয়ের সেই ফ্রেন্ড বের হয় তখন?"
তড়িৎ বেগে ছুড়ে দেয়া শ্রেয়ার এহেন অদ্ভুত প্রশ্নে আরও বেশি তেতে গিয়ে উত্তর করে প্রিয়ন্তী,
"বেঙের মাথা! তুই চিনিস ওনাকে? উনি কতটা ব্যস্ত মানুষ আইডিয়া আছে? সে কিনা আসবে এরকম লেইম মার্কা কাজ করতে? তাও আবার আমায়?"
“এমনি বললাম। বাদ দে। কোথায় তুই এখন?"
“একপাশে এসে দাঁড়িয়েছি। ভিতরে মানুষের সরগম অনেক। হলুদের প্রোগ্রাম না!"
“আর তোর ওই নিরামিষ কমান্ডার কই?”
প্রিয়ন্তী বিরক্ত হয়ে বলল,
“এখানেই আছে কোথাও!ভাইয়া বলল আর উনি নাচতে নাচতে চলেও আসলো। এতটা আত্মসম্মানহীন মানুষ্ হয় কখনো উনাকে না দেখলে বুঝতাম না!"
“ওমা! ব্যাটা নিশ্চই তোর পিছনে লাইন মারতে আসছে!"
"লাইন না ছাই। আর এই প্রিয়ন্তী বারবার একই ভুল করেনা বুঝেছিস। উনার আত্মসম্মানবোধ না থাকতে পারে, আমার আছে। ব্যাটা ভেবেছে কি নিজেকে? আমায় রিজেক্ট করা? দিয়েছি মেসেন্জার থেকে ব্লক!"
“তো আমাকে ব্লক করার রিজনটা কি জানতে পারি, মিস প্রিয়ন্তী?”
আচানক ভারি পুরুষালি স্বরে আতঙ্কিত চোখে উল্টো ঘুরে তাকালো প্রিয়ন্তী। চোখে পড়ল সাদা রঙের প্যান্ট এর পকেটে দু হাত গুঁজে নির্লিপ্ত দাঁড়িয়ে থাকা মানবেতে। চোখদুটো স্থির। ওর দিকেই নিবদ্ধ। ওপাশে শ্রেয়া তখনও বলেই যাচ্ছে,
“হ্যালো? প্রিয়? কে রে ওটা? ওই মাইয়া?"
প্রিয়ন্তীর গলা শুকিয়ে কাঠ। বহু কষ্টে ঠোঁট নেড়ে জানাল,
“আ আমি… পরে কথা বলছি তোর সঙ্গে!”
বলেই তড়িঘড়ি করে কল কাটল।ফোনটা নামিয়ে আনতেই বুঝল,তাজধীর তখনো একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। মাটির দিকে চোখ নামিয়ে ফেলল প্রিয়ন্তী। বুকের ভেতর ধুপধুপ শব্দটা বাইরে থেকেও শোনা যাচ্ছে কি? শক্ত হ প্রিয়ন্তী,শক্ত হ। প্রিয়ন্তী ঢোক গিলল। মাথা কাজ করছে না একদমই। উপরে যতই শক্ত কথা বলুক না কেন। এই লোকটার সামনে এলেই কেন জড়তা কাজ করে ওর বুঝে পায়না।তাজধীর এগিয়ে এলো কয়েক পা।
“আই রিপিট,হোয়াট ইজ দ্যা এক্সাক্ট রিজন,মিস প্রিয়ন্তী?”
"আগে আমায় বলুন আপনার আসলে সমস্যাটা কি?যখন তখন, যেখানে সেখানে এসে হুটহাট এমন ভুতের মত হাজির হয়ে যান কেন? ওয়েট আপনি আবার আমায় স্টক করছেন নাতো?"
চড়াও গলায় একনিঃশাসে হড়বড়িয়ে কথাগুলো বলে থামে মেয়েটা। তাজধীর কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রয় শুধু। চোখদুটো অদ্ভুত শান্ত।আচমকাই লোকটা শব্দ করে বাঁকা হেসে উঠে। ডান ভ্রু কুঞ্চিত করে জানায়,
“স্টক? আর আপনায়?তা ঠিক কোন দুঃখে আমার আপনাকে স্টক করতে হবে শুনি? "
"সেটা তো আপনি'ই ভালো জানেন। যেখানে সেখানে এসে হুটহাট হাজির হয়ে যাচ্ছেন সামনে। বলি কি, এসব ফাজলামো ছেড়েছুড়ে ভালো হয়ে যান। ভালো হতে পয়সা লাগেনা। যেই কাজে আসছেন সেটায় মন দিন!"
রাগে গজগজ করতে করতেই কথাটা ছুড়ে দিল প্রিয়ন্তী। তাজধীর অবশ্য বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না এতে। বরং প্যান্টের পকেটে দুহাত গুঁজেই দাঁড়িয়ে রইল আগের মতো। ঠোঁটের কোণে অস্পষ্ট একটুকরো হাসি ফুটিয়ে অতঃপর স্থির, মোহনীয় দৃষ্টিতে প্রিয়ন্তীর চোখে চোখ রেখে শান্ত গলায় বলল,
“সেটাই তো করছি।”
প্রিয়ন্তী ভ্রু কুঁচকাল,
“মানে?”
এবার ধীর পায়ে আরও খানিকটা এগিয়ে এলো লোকটা। এতটাই কাছে যে লোকটার পারফিউমের গাঢ় সুবাস এসে লাগল প্রিয়ন্তীর নাকে। বুকের ভেতরটা কেমন অকারণেই শিহরিত হলো। কিন্তু মুখে সেটা প্রকাশ হতে দিল না একটুও।
“প্রথমে বউ সেজে মেসেজ। তারপর মাছ চুরি। এরপরে আবার ব্লক। আর এখন তো সোজা আমাকে স্টকার বানিয়ে দিলেন।আপনার ক্রাইম লিস্ট কিন্তু দিনবেদিন লম্বা হচ্ছে, ম্যাডাম।”
প্রিয়ন্তী কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। লোকটার গলার স্বরটা কেমন যেন বদলে গেছে আচমকা।
ও দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নিল।
“আপনার সাথে কথা বলাই ভুল!"
“তাহলে ক্লিয়ার করুন? "
"কিহ?"
"ব্লক করেছেন কেন?"
"এভাবে বলছেন যেন আপনার সঙ্গে আমার জন্ম জমান্তরের সংসার চলছিল সেখানে?যে হুট্ করে ব্লক করায় তার কৈফিয়তও দিতে হবে?"
"না করলে সংসার টা শুরু হবে কিভাবে মিস?"
"মানে?"
"মানে খুব সিম্পল! আনব্লক করুন।ব্লক করে রেখে আবার রাগ দেখানোটা কেমন বাচ্চামি দেখায় না?তাই বলছি আনব্লক করুন, এরপর নাহয় ধীরে সুস্থে আবার জগড়াটা কন্টিনিউ করা যাবে।"
প্রিয়ন্তী হতভম্ব হয়ে ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে রইলো। কি শেয়ানা লোক! জোড় করে আনব্লক করাবে কিনা শেষমেশ জগড়া কন্টিনিউ করার জন্য?
“ঝগড়া কন্টিনিউ করার জন্য আপনায় আমি আনব্লক করবো?"
"সেটা তো আপনার ইচ্ছা এন্ড মুডের উপর ডিপেন্ড করছে। আপনি চাইলে অন্য কিছুও কন্টিনিউ করা যাবে!"
"আপনি সত্যি সত্যিই অদ্ভুত মানুষ একটা!"
“এই কথাটা আপনি আগেও বলেছেন।”
“আরও হাজারবার বলবো!কোনো সমস্যা?"
"বাই দ্যা ওয়ে আপনি আমার কাছ থেকে এভাবে লুকিয়ে চুরিয়ে বেড়াচ্ছেন কেন আজকাল?"
“আমি? আপনার থেকে পালাবো? প্লিজ! নিজেকে এতটাও ইম্পরট্যান্ট ভাবার কিছু নেই মিস্টার কমান্ডার।”
“ওহ? তাহলে ব্লক করলেন কেন?”
এক সেকেন্ড থেমে গেল প্রিয়ন্তী। পরক্ষণেই ঠোঁট শক্ত করে বলল,
“আমার ইচ্ছা হয়েছে তাই করেছি। সো?”
তাজধীর মাথা নেড়ে ধীরস্বরে বলল,
“মজার ব্যাপার কি জানেন? মানুষ সাধারণত তাকেই এভয়েড করতে চায়, যে মানুষটা তার মাথার ভেতর একটু বেশিই জায়গা করে নেয়।উম!দিনরাত চব্বিশ ঘন্টা ঘুরঘুর করে! ইউ নো না হোয়াট আই মিন?"
“আপনি নিজেকে নিয়ে একটু বেশিই ভাবেন না?”
“হয়তো। তবে আমার ধারণা সাধারণত ভুল হয় না।”
“তাহলে এবার ভুল হয়েছে।”
প্রিয়ন্তী আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না সেখানে। বিরক্তিতে ফুঁসতে ফুঁসতে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলে পেছন থেকে আবার ভেসে এলো তাজধীরের ভারী কণ্ঠ,
“আর হ্যা মিস প্রিয়ন্তী।”
পা থামিয়ে বিরক্ত চোখে ঘাড় ঘুরালো ও।তাজধীর তখনো একইভাবে তাকিয়ে আছে। তারপর একদম নির্লিপ্ত স্বরে বলে উঠল লোকটা,
“আপনি রাগলে আপনার নাকটা একদম লজ্জা রাঙা বধূর মতো টুকটুকে লাল হয়ে যায়।উম,ততটাও খারাপ কিন্ত লাগেনা দেখতে!"
—————
রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সেখান থেকে বেরিয়ে এলো প্রিয়ন্তী। লোকটার প্রতিটা কথা কেন যেন মাথার ভেতর হাতুড়ির মতো বাজছে বারবার। বিরক্তিতে দাঁত চেপে হাঁটতে হাঁটতেই আচমকা টের পেল শাড়িটার আঁচল কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেছে। সম্ভবত তাড়াহুড়োয় কোথাও পিন ছুটে গেছে।
“উফফ!”
বিরক্তিতে কপালে হাত ঠেকালো ও। চারপাশে এত মানুষের ভিড় যে ঠিকঠাক করাও মুশকিল। নিচতলা আর দোতলা পুরো মানুষে গমগম করছে। একবার দোতলার ওয়াশরুমে গিয়ে উঁকি দিয়েই হাঁ হয়ে গেল প্রিয়ন্তী। মেয়েদের লম্বা লাইন!এই লাইনে দাঁড়ালে আজ আর বাড়ি যাওয়া লাগবেনা। নিজের মনেই বিড়বিড় করে তিনতলার দিকে উঠে গেল ও।
আশ্চর্যজনকভাবে থার্ড ফ্লোর পুরোটাই প্রায় ফাঁকা। লম্বা লম্বা পা ফেলে ওয়াশরুমের সামনে পৌঁছাতেই দেখল একটা মেয়ে মাত্র বের হচ্ছে ভিতর থেকে। মেয়েটা চলে যেতেই দ্রুত ভিতরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে নিল। বড় আয়নার সামনে এসে দাঁড়াতেই নিজের এলোমেলো অবস্থা দেখে ঠোঁট কুঁচকালো। শাড়ির আঁচলটা ঠিক করল প্রথমে। খুলে যাওয়া পিন আবার লাগালো। খোঁপা থেকে বেরিয়ে আসা চুলগুলোও আঙুল দিয়ে গুছিয়ে নিল খানিকটা। এরপর চোখ গেল সামনের বড় কাঁচের দেয়ালটার দিকে। পার্স থেকে ফোনটা বের করল কয়েকটা মিরোর সেলফি নেয়ার জন্য।
ফোন বের করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দু-তিনটা মিরর সেলফি তুলে ফেলল প্রিয়ন্তী।তারপর মিনিট পাঁচেক আরও সময় লাগিয়ে বের হয়ে এলো বাইরে। পার্সে ফোন রাখতে রাখতে আচমকাই অসাবধানতায় কারো পায়ের উপর নিজের ৪ ইঞ্চির হাই হিল বসিয়ে দিতেই সঙ্গে সঙ্গেই কারো ভারী গলা থেকে চাপা একটা শব্দ বের হলো,
“উহ্!"
প্রিয়ন্তী আঁতকে উঠে তড়িঘড়ি পা সরালো। অসাবধানতায় সোজা কারো জুতোর ওপর পা দিয়ে ফেলেছে ও!
“স-সরি! আমি আসলে দেখিনি!"
কথাটা বলতে বলতেই মাথা তুলে তাকালো সামনে।
আর পরক্ষণেই ওর চোখ দুটো বিস্ফারিত হয়ে উঠল।
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে কয়েক সেকেন্ডের জন্য নিশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল ওর। গাঢ় রঙের কাবলি সেট পরে দেয়ালের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে লোকটা। একহাতে ফোন, অন্যহাত পকেটে। অলিভ গ্রিন চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে প্রিয়ন্তীর মুখে। চোখেমুখে বিরক্তির লেশমাত্র নেই। বরং কেমন যেন শান্ত, অদ্ভুত একটা দৃষ্টি। প্রিয়ন্তীর গলা শুকিয়ে কাঠ।
“আ-আপনি?”
ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে হাঁসফাঁস করল মেয়েটা। বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করছে। এই লোকটার সঙ্গে কেন বারবার এমন অদ্ভুত অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয় ওর, সেটাই বুঝে উঠতে পারে না।তড়িঘড়ি করে পা সরিয়ে নিয়ে জড়ানো গলায় বলে উঠল,
“স-সরি! আমি আসলে খেয়াল করিনি। আমার দেখে চলার উচিত ছিল, আমি সত্যিই সরি ভাইয়া!"
কথাগুলো বলতে বলতেই প্রায় গুলিয়ে ফেলল ও। অভিরাজ অবশ্য একদম শান্ত। যেন ব্যাপারটা তেমন কিছুই না। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে ধীর স্বরে বলল উল্টো,
“ইটসস ওকে। ঘাবড়ানোর কিছু নেই। আম আলরাইট!"
লোকটার স্বাভাবিক গলায় বলা কথাতেও প্রিয়ন্তীর অস্বস্তি কমল না খুব একটা। বরং চোখ এড়িয়ে যেতে নিয়েও হঠাৎ থেমে গেল ওর দৃষ্টি। অভিরাজের কাবলি সেটের একপাশে খানিকটা ভেজা দাগ পড়েছে।কাপড়টা চিপচিপেও লাগছে কিছুটা। প্রিয়ন্তী অবচেতনভাবেই বলে ফেলল,
“এখানে কী হয়েছে?”
অভিরাজ নিজের পোশাকের দিকে তাকিয়ে বিরক্তির হাসি দিল।বলল,
“নিচে এক ওয়েটার জুস উল্টে ফেলেছে। এত গেদারিংয়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকাও মুশকিল। তাই একটু উপরে চলে এলাম।”
“ওহ!"
অভিরাজ মাথা নেড়ে বুঝালো। তারপর আরও কিছু বলতে নিল হয়তো। কিন্তু প্রিয়ন্তীর ভেতরে ভেতরে অস্বস্তিটা আবার বাড়তে শুরু করেছে। লোকটার চোখদুটো খুব অদ্ভুত। মনে হয় যেন সব বুঝে ফেলছে।
তাই আর দাঁড়ালো না ও। ছোট্ট করে মাথা নেড়ে পাশ কাটিয়ে বের হয়ে যেতে নিল।ঠিক তখনই পেছন থেকে অভিরাজের ভারী গলা ভেসে এলো,
“ম্যাম, আপনার কাছে টিস্যু হবে?”
প্রিয়ন্তী থেমে গেল। পরক্ষণেই ব্যাগ খুলে তাড়াতাড়ি একটা টিস্যু বের করল। তারপর এগিয়ে দিয়ে ভদ্রতাসূচক ছোট্ট একটা হাসি ফুটিয়ে বলল,
“জি। নিন।”
"ধন্যবাদ!"
বলেই টিস্যুটা নিল। আঙুল ছুঁয়ে যাওয়ার আগেই হাত সরিয়ে নিল প্রিয়ন্তী। তারপর আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না সেখানে। দ্রুত পায়ে সিঁড়ির দিকে নেমে গেল।অভিরাজ দেয়ালের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল আগের মতোই। অলিভ গ্রিন চোখ দুটো স্থির হয়ে থাকল প্রিয়ন্তীর চলে যাওয়ার দিকে। ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল অস্পষ্ট এক মুচকি হাসি।তারপর হাতে ধরা টিস্যুটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে সেটাকে খুব যত্ন করে ভাঁজ করল। অতঃপর নিঃশব্দে নিজের পকেটে ঢুকিয়ে রাখল সে।
—————
গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান শেষ হতে হতে রাত বেশ গড়িয়ে গেছে। চারপাশের কোলাহল পুরোপুরি না থামলেও ইতিমধ্যে দূর দূরান্তের আত্মীয়স্বজনরা দুয়েকজন বেরিয়ে গেছে বাড়ির উদ্দেশ্যয়। এত রাত হওয়ায় পাভেলও ঠিক করল আর দেরি না করে বাসায় ফিরে যাবে সবাইকে নিয়ে।
তাজধীর আগেই গাড়ি পার্কিং থেকে বের করে এনে কমিউনিটি সেন্টারের সামনে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। নিজে বসে আছে ড্রাইভিং সিটে। গাড়ির কাঁচের ভেতর থেকে নির্লিপ্ত চোখে বাইরে তাকিয়ে আছে লোকটা।
কিছুক্ষণ পর মিতালী আর প্রিয়ন্তী বের হয়ে এলো ভিতর থেকে। শাড়ি সামলাতে সামলাতে হাঁটছে দুজন। ওদের পেছনেই আসছিল পাভেল, কিন্তু মাঝপথে এক পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা হয়ে যেতেই দাঁড়িয়ে গেল কথায়।
“আরে ভাই! আপনি এখানে?”
ব্যস, তারপর আর তাকে সরানো দায়।মিতালী একবার পিছনে তাকিয়ে হেসে মাথা নাড়ল। তারপর প্রিয়ন্তীকে নিয়ে গাড়ির কাছে এসে দরজা খুলে বলল,
“তুমি বসো, আমি তোমার ভাইয়াকে ডেকে আনছি।”
প্রিয়ন্তী কিছু বলার আগেই মিতালী মুচকি হেসে আবার ভেতরের দিকে চলে গেল। পিছনের সিটে বসে অস্বস্তিতে গুটিয়ে রইল প্রিয়ন্তী। সামনে তাজধীর স্টিয়ারিংয়ে একহাত রেখে বসে আছে। কিন্তু রিয়ার ভিউ মিররের ভেতর দিয়ে লোকটার দৃষ্টি বারবার এসে আটকে যাচ্ছে ওর মুখে। তখনের পর থেকে আর সামনাসামনি হয়নি দুজন। পাভেল নিজের বন্ধুবান্ধব সবার সঙ্গে গর্ব নিয়ে তাজধীরকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে একে একে। তাজধীর ও সৌজন্যেতায় সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলেছে। তবে প্রিয়ন্তী ঠিকই লক্ষ্য করেছে, প্রোগ্রামে থাকা সমস্ত মেয়েগুলো চোখ দিয়ে গিলে খেয়েছে নিরামিষটাকে। মেয়েগুলো তো আর জানেনা যাকে এতটা প্রয়োরিটি দিচ্ছে তার যে মেয়ে মানুষেই ইন্টারেস্ট নেই। ভাবতেই আফসোস লাগে প্রিয়ন্তীর মেয়েগুলোর জন্য।
“আমার মাছটা কবে দিচ্ছেন?”
একবারে আচানক, অপ্রত্যাশিত ভাবেই মুখের উপর ধুম করে ভারী গলায় প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল তাজধীর। প্রিয়ন্তী তাকিয়ে ছিল বাইরে। অমনি কপাল কুঁচকে তাকাল সামনে,
“কি?”
তাজধীর এবার ঘাড় ঘুরিয়ে সরাসরি তাকালো ওর দিকে। গলায় সেই চিরচেনা রুক্ষ ভাবটা স্পষ্টতই বজায় রেখে শুধাল,
“আমার ব্লু হাফমুনটার কথা বলছি। কবে ব্যাক দিচ্ছেন?”
প্রিয়ন্তী বিরক্তিতে চোখ বড় বড় করে বলল,
“এইখানে কি আপনার মাছ সঙ্গে করে আমি নিয়ে এসেছি নাকি?এইযে দেখুন নেই আমার ব্যাগে!"
রাগে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে সত্যি সত্যিই ব্যাগটা খুলে দেখাল প্রিয়ন্তী। তাজধীর সেদিকে চেয়ে গমগমে সরে জানাল,
“সেটা তো জানি না। আপনি যেভাবে জিনিস গায়েব করেন, ট্রাস্ট করা মুশকিল।”
“আর দিব না বলেছি না?”
“দেবেন না বললেই হলো?”
“হ্যা, হলো। একবার যেটা আমার কাছে এসেছে, সেটা ফেরত যাওয়ার চান্স নাই।”
“চুরি করে আবার এত কনফিডেন্স?চোরের মায়ের বড় গলা! তবে আপনি কেন আমার সবকিছু চুরি করতে হাত ধুয়ে লেগেছেন বলুন তোহ? "
"আজব! আবার কি চুরি করেছি আমি?"
"এইযে প্রথমে মাছ, এরপর আমার শান্তি!"
শেষের কথাটা বিড়বিড় করে বলে ঘাড় উল্টে ফোকাস করল সামনের রাস্তায়। প্রিয়ন্তী তখনো সেই কথার পিঠে একের পর এক ঝাঁঝালো বাক্য বলেই যাচ্ছে।তবে তাজধীরের সেদিকে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই আপাতত। রিয়ার ভিউ মিররে তাকানো চোখ দুটো মুহূর্তেই সরে গিয়ে আটকালো সামনের মেইন রাস্তায়। কপাল কুঁচকে গেল ওর। কয়েক সেকেন্ড একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বাইরে। রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে আছে একটা মেয়ে। বয়স খুব বেশি না। কানে ফোন চেপে কী যেন বলছে আর হাসছে। এতটাই ফোনে ডুবে আছে যে আশপাশের দিকে কোনো খেয়ালই নেই মেয়েটার। পোশাক দেখে বুঝতে বাকি রইল না— এই প্রোগ্রামেরই কোনো গেস্ট হবে হয়তো।
চারপাশ অস্বাভাবিক রকম ফাঁকা। রাত অনেক হওয়ায় রস্তায় কোনো গাড়িঘোড়াও নেই বললেই চলে। এমনিতেই কমিউনিটি সেন্টারটা একটু ভিতরের দিকে। ঠিক তখনই একটা বাইক খুব দ্রুতগতিতে মেয়েটাকে ক্রস করে চলে গেল সামনের দিকে।
তাজধীরের চোখ সরু হয়ে এলো আরও।বাইকে বসা দুজন ছেলে। সামনের জনের মাথায় হেলমেট থাকলেও পিছনের জনের মুখে কালো মাস্ক।বাইকটা কয়েক সেকেন্ড সামনে গিয়ে আচমকাই ইউ-টার্ন নিল।
তাজধীরের মুখের রঙ বদলে নিমিষেই।যা বুঝার তার বিচক্ষণ মস্তিস্ক বুঝে নিলো মুহূর্তেই।
“ওহ শিট!”
চোখদুটো হঠাৎ ভয়ানক তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে।পরিস্তিতির আগামবার্তা বুঝতে পেরেই খানিকটা চিন্তিত হয়ে উঠল মুখভঙ্গি। হর্ন দিলেও লাভ হবে না, এটাও বুঝল সঙ্গে সঙ্গে। মেয়েটা সম্পূর্ণ ফোনে মগ্ন।আমলে নিবেনা কিছুই।
এক মুহূর্ত দেরি করল না তাজধীর আর। ধড়াম করে গাড়ির দরজা খুলে প্রায় লাফিয়ে বেরিয়ে গেল বাইরে। তারপর ঝড়ের বেগে দৌড় দিল রাস্তার দিকে।ওদিকে
প্রিয়ন্তী পুরোপুরি হতভম্ব।খানিকটা ঝুকে জানালার কাছে মুখে নিয়ে বিড়বিড় করল,
“এই ব্যাটার আবার কি হলো?"
বাক্য শেষ করার আগেই একটা বাইক এদিক দিয়ে তেড়ে আসতে দেখল ও।তাজধীর দূর থেকেই গর্জে উঠল,
“হেই! সরে যান! সরে যান ওখান থেকে!”
মেয়েটা শুনলই না। এখনো ফোন কানে চেপে দাঁড়িয়ে আছে। পরের মুহূর্তেই বাইকের পিছনে বসা ছেলেটা হাতে ধরা সাদা রঙের একটা বোতল উঁচু করল। ভেতরে স্বচ্ছ তরল জাতীয় কিছু। সবকিছু খুব দ্রুতই ঘটল। পুরো চোখের পলকে।ছেলেটা বোতলের মুখ খুলে মেয়েটার দিকে ছুঁড়ে মারতে নিলে তাজধীর দৌড়ে গিয়ে প্রায় ছিনিয়ে আনার মতো করে মেয়েটাকে জোরে টেনে নিজের দিকে সরিয়ে নিল।ব্যাস!তরলটা গিয়ে পড়ল রাস্তার একপাশে।সঙ্গে সঙ্গে সেখান থেকে ধোঁয়ার মতো কুয়াশা উঠতে লাগল।
প্রিয়ন্তীর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল ভয়ানকভাবে।
এ সিড! আর এক সেকেন্ড দেরি হলেই মেয়েটার পুরো মুখটাই ঝলসে যেত।তাজধীরের ঝটকা টানে মেয়েটা সোজা গিয়ে ধাক্কা খেল ওর বুকের সঙ্গে। ভারসাম্য হারিয়ে হাত থেকে ফোনটাও ছিটকে পড়ল রাস্তায়।
এর মাঝেই বাইকটা পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যেতে নিলে
কমিউনিটি সেন্টারের গেটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কেয়ারটেকারের হাত থেকে ঝটকা মেরে লাঠিটা টেনে নিয়ে সোজা ছুড়ে মারল বাইকের দিকে। লাঠিটা গিয়ে সজোরে আঘাত করল পিছনে বসা ছেলেটার পিঠে।
“আআহ!”
ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠে ভারসাম্য রাখতে না পেরে বাইক থেকে গড়িয়ে পড়ল ছেলেটা। উঁবু হয়ে পড়ল সোজা রাস্তায়। তবে সামনের জন আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। বাইকটা নিয়েই তীব্র গতিতে ছুটে পালাল সামনে। চারপাশে তখন চিৎকার চেঁচামেচি শুরু হয়ে গেছে। কমিউনিটি সেন্টারের ভেতর থেকে একে একে সবাই দৌড়ে বেরিয়ে আসছে বাইরে। তাজধীর ইতিমধ্যে দৌড়ে গিয়ে মাটিতে পড়ে থাকা ছেলেটার কলার চেপে ধরেছে একহাতে। ছেলেটা রাগে ছটফট করতে লাগল নিজেকে ছাড়ানোর জন্য।
“ছাড়! ছাড় বলছি!”
পালিয়ে যাওয়া বাইকের নাম্বারপ্লেটের দিকে একবার তাকিয়েই পুরো নাম্বারটা মুখস্থ করে ফেলেছে তাজধীর।একহাতে ছেলেটাকে চেপে ধরে রেখেই অন্য হাতে ফোন বের করল দ্রুত। কল লাগতেই ঠান্ডা গলায় বলে উঠল,
“একটা ব্ল্যাক R15এইমাত্র বের হয়েছে। নাম্বার— ঢাকা মেট্রো....!ইমিডিয়েটলি ব্লক দ্য রুট। আমি লোকেশন পাঠাচ্ছি। ছেলেটা এ সিড কেসের সঙ্গে ইনভলভড।”
ওপাশে কী বলা হলো শোনা গেল না। তাজধীর শুধু সংক্ষিপ্ত স্বরে বলল,
“নাও।”
কল কেটে আবার পুরো মনোযোগ দিল ছেলেটার দিকে। ওদিকে ছেলেটা বুঝে গেছে এবার বাঁচা কঠিন। মরিয়া হয়ে পকেট থেকে আচমকা ছোট একটা ধারালো ব্লে ড জাতীয় অস্ত্র বের করে সোজা তাজধীরের হাতের দিকে চালিয়ে দিতে যেতেই পিছন থেকে আতঙ্কিত কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল প্রিয়ন্তী,
“সাবধান!”
কিন্তু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নেভি অফিসারের রিফ্লেক্স এত সহজে হারাতে পারবে?একহাতে ছেলেটার কবজি চেপে ধরল সে মোচড়িয়ে।সঙ্গে সঙ্গে ব্যথায় ককিয়ে উঠল ছেলেটি। হাতে থাকা ধারালো জিনিসটা ছিটকে পড়ে গেল দূরে।এরপর কোনো রকম সুযোগ না দিয়েই তাজধীর ছেলেটাকে মাটিতে চেপে ধরল শক্তভাবে।ওদিকে মেয়েটা তখনো আতঙ্কে কাঁপছে। মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে পুরো। ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করছে।প্রিয়ন্তী দৌড়ে গিয়ে মেয়েটাকে ধরল।কাঁপতে থাকা মেয়েটাকে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগল ও। এর মধ্যেই মেয়েটার মা-বাবাও দৌড়ে এসে পৌঁছাল। মেয়ের অবস্থা দেখে মহিলা প্রায় ভেঙে পড়লেন কান্নায়। চারপাশে তখন একটাই আলোচনা,আর একটু হলেই আজ ভয়ংকর একটা দুর্ঘটনা ঘটে যেত।
ছেলেটাকে শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে তাজধীর। চারপাশে তখন মানুষজনের ভিড় জমে গেছে।
কিন্তু ধরা পড়েও ছেলেটার মুখের দাপট কমল না একটুও।উল্টো ছটফট করতে করতেই দাঁত কিঁচিয়ে বলে উঠল,
“ছাড় শালা! তুই জানস আমি কে? হাত ছাড় বলতেছি!"
তাজধীরের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল আচানক।
ছেলেটা থামল না। নিজেকে ছাড়াতে মরিয়া হয়ে বলে গেল,
“বেশি হিরোগিরি দেখাস না! তোরে আমি.. ”
"ঠাস!
আচমকা এমন জোরে একটা চড় বসল ছেলেটার গালে যে চারপাশের কয়েকজন পর্যন্ত কেঁপে উঠল।
ছেলেটার মাথা ঝাঁকুনি খেয়ে একপাশে কাত হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য চোখেমুখ ঝাপসা হয়ে এলো বেচারার। যেন ডানপাশের পৃথিবীটা হঠাৎ বামপাশে চলে গেছে। বাম পাশটা শুন্য, ফাঁকা। তাজধীর ক্ষান্ত হলো না তাতেও। পরপর বাম পাশে আবারও আগের ন্যায় শক্ত পোক্ত দাবাং হাতের চড় পরায় এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে সক্ষম হলোনা। পুরো ভারসাম্য হারিয়ে সোজা ধপ করে পড়ে গেল ধুলোমাখা রাস্তায়। হাঁপাতে হাঁপাতে হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরল। পরক্ষণেই কাশতে কাশতে সামনে থুথু ফেলতেই জমে গেল ওর দৃষ্টি।র ক্ত।টকটকে লাল রক্তের সঙ্গে ছোট্ট সাদা কিছু একটা গড়িয়ে পড়েছে মাটিতে।সর্বনাশ! দাঁত,দাঁত পড়ে গেছে দ্বিতীয় থাপ্পরে?
বেচারা ব্যথার চাইতে বেশি আশ্চর্যে হতোবিহুল। চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম। কাঁপা হাতে নিজের মুখে হাত দিল সে। সত্যিই,দাঁত পড়ে গেছে। তাজধীর ধীর পায়ে এগিয়ে এলো ওর সামনে। কালো জুতোর নিচে রাস্তায় পড়ে থাকা লাঠিটা চাপা পড়ে কট করে শব্দ করল কেমন। তারপর নিচু হয়ে ছেলেটার কলার আবার চেপে ধরে ভয়ংকর ঠান্ডা গলায় বলল,
“এ সিড নিয়ে মেয়েদের মুখ ঝলসানোর আগে একবারও হাত কাঁপেনি, না?মনতো চাচ্ছে ওগুলো দিয়ে তোমার নিজের চেহারার নকশা'ই বদলে দেই!"
রাস্তাজুড়ে তখন বিশৃঙ্খল এক পরিস্থিতি। চারপাশে মানুষজনের জটলা বেঁধেছে বেশ। কেউ আতঙ্কিত, কেউ উত্তেজিত গলায় পুরো ঘটনা আলোচনা করছে। মাঝখানে মাটিতে আধশোয়া হয়ে পড়ে আছে ছেলেটা। মুখের কোণে রক্ত, চোখেমুখে স্পষ্ট ভয়।
আর ঠিক তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে তাজধীর।
পাঞ্জাবির হাতার কাছটা সামান্য কুঁচকে গেছে ধস্তাধস্তিতে। হাতের শিরাগুলোও ফুলে উঠেছে রাগে। কিন্তু এতকিছুর পরও লোকটার মুখে ভয়ংকর রকমের নিয়ন্ত্রিত একটা স্থিরতা বিদ্যমান। দূর থেকেই পুলিশের গাড়ির সাইরেনের শব্দ ভেসে এলো কিছুক্ষণ পর। প্রিয়ন্তী নিজেকে সামলে দাঁড়িয়ে থাকতেই পাভেল, মিতালী আর শিহাবও দৌড়ে চলে এলো সেখানে। মেয়েটা শিহাবের'ই কাজিন।
ওদিকে পুলিশের গাড়ি এসে থামল সামনে।দুজন কনস্টেবল আর একজন অফিসার দ্রুত নেমে এলো গাড়ি থেকে। পরিস্থিতি দেখে প্রথমে তারা ছেলেটার দিকে এগোতেই আশপাশের কয়েকজন একসঙ্গে বলে উঠল,
“এই স্যার! এই ছেলেটাই এ সিড মারতে আসছিল!”
পুলিশ অফিসারের মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল।তখনই তাজধীর সামনে এগিয়ে এলো। ঠান্ডা গলায় বলল,
“ওর পার্টনার ব্ল্যাক R15 ফাইভ নিয়ে পালিয়েছে। নাম্বারটা আমি ট্রেসে পাঠিয়ে দিয়েছি।”
অফিসারটা প্রথমে স্বাভাবিকভাবেই নিলেও পরক্ষণেই ভালো করে তাজধীরের দিকে তাকাতেই মুখের ভাব বদলে গেল খানিকটা। তৎক্ষণাৎ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সম্মানসূচক ভঙ্গিতে মাথা ঝুঁকিয়ে বলল,
“জ্বি স্যার।”
বাংলাদেশে পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক সম্মান প্রদর্শনের একটা প্রটোকল থাকেই, বিশেষ করে উচ্চপদস্থ অফিসারদের ক্ষেত্রে। তাই অফিসারের আচরণেও সেই সম্মানটাই স্পষ্ট ফুটে উঠল। তাজধীর শান্ত, দৃঢ় গলায় বলল,
“ছেলেটার বিরুদ্ধে অ্যাটেম্পটেড অ্যাসিড অ্যাটাক, ক্রিমিনাল অ্যাসল্ট— সবকিছুর চার্জ যাবে। আর একটা কথা…”
একটু থেমে ছেলেটার দিকে তাকাল সে।চোখদুটো মুহূর্তেই বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে উঠল।
“এত সহজে যেন ছাড়া না পায়।”
পুলিশ অফিসার দৃঢ় গলায় বলল,
“ডোন্ট ওরি স্যার। আমরা বিষয়টা সিরিয়াসলি হ্যান্ডেল করব।”
ওদিকে শিহাবের বাবা এগিয়ে এসে তাজধীরের হাত দুটো চেপে ধরলেন আবেগ নিয়ে।
“বাবা, আপনি না থাকলে আজকে আমার মেয়েটার কি হইতো আমি কল্পনাও করতে পারতেছি না।আল্লাহ আপনাকে ভালো রাখুক বাবা।"
তাজধীর অস্বস্তিতে মাথা নেড়ে বলল,
“ইটস ওকে, আঙ্কেল। আমি শুধু মানুষ হিসেবে আমার দায়িত্বটুকু পালন করেছি।"
—————
রাত অনেকটাই গড়িয়ে গেছে তখন। চারপাশের রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা। তাজধীর যথারীতি স্থির হাতে গাড়ি চালিয়ে এনে থামালো সিদ্দিক কুঞ্জের সামনে। গাড়ির হেডলাইটের আলো সামনের গেট ছুঁয়ে নিভে যেতেই একে একে দরজা খুলে নামল সবাই।
প্রথমে মিতালী নামল। তারপর পাভেল। দুজনেই নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে বাড়ির ভেতরের দিকে এগিয়ে গেল। পিছনের সিটে বসে থাকা প্রিয়ন্তীও ধীরে ধীরে দরজা খুলে নামলো। স্বাভাবিকভাবে নেমেই দু কদম হাটতে গিয়ে বাঁধলো বিপত্তি। শাড়ির আঁচলে টান লাগায় ঝটকায় পেছনে তাকায় ও। দেখতে পায় সেদিনের মতো আজও একই ভাবে শাড়ির আঁচল আটকেছে গাড়ির দরজায়।
“উফফ!”
কপাল কুঁচকে নিচে তাকাতেই বুঝল, শাড়ির আঁচলটা গাড়ির দরজার ভেতরে আটকে গেছে। কিছুটা অংশ এখনো ভিতরে রয়ে গেছে। বিরক্ত হয়ে একহাতে শাড়ি সামলে অন্যহাতে আঁচলটা ধরে টান দিতে লাগল প্রিয়ন্তী।ঠিক তখনই ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে আসা তাজধীর দৃশ্যটা দেখে প্রায় আহাজারির সুরেই বলে উঠল,
“আরে আরে! কী করছেন? নষ্ট হয়ে যাবে তো!”
প্রিয়ন্তী এমনিতেই বিরক্ত ছিল। তার উপর এই লোকের কথা শুনে আরও খেপে গেল। আঁচলটা টানতে টানতেই রাগী গলায় বলে উঠল,
“আমার শাড়ি নষ্ট হলে হবে আপনার কী?”
তাজধীর একহাতে গাড়ির চাবিটা ঘুরাতে ঘুরাতে নির্লিপ্ত মুখে উত্তর দিল,
“ম্যাডাম, আমি আপনার শাড়ির কথা বলিনি। আমি আমার গাড়ির কথা বলেছি। যেইভাবে টানাটানি করছেন, কোনোদিন দেখি আমার গাড়ির আত্মার মাগফিরাত কামনা করতে হয়।অনেক কষ্টের টাকায় কেনা গাড়ি এটা আমার।”
প্রিয়ন্তী চোখ কুঁচকে তাকাল লোকটার দিকে। এই লোকটা এমন অদ্ভুত কেন? কিছুক্ষন আগেও তো কতটা সিরিয়াস ছিল। পুরো রাস্তায়ও কেমন গম্ভীর মুখ করে এসেছে। টু শব্দটি অব্দিও করেনি। অথচ ওর সঙ্গেই কেন সবসময় এমন ঠেস মেরে কথা বলে? কোন জন্মের শুত্রুতা ওর সঙ্গে?বিরক্তিতে ঠোঁট বাঁকিয়ে তীক্ষ্ণ স্বরে বলল,
“রাস্তায় বসে প্লেট নিয়ে দিনরাত ভিক্ষা করে কিনেছিলেন বুঝি?”
"টাকার মূল্য আপনি কি করে বুঝবেন?খান তো ভাইয়ের পয়সায়। এটা লাগলে ভাইয়া, ওটা লাগলে ভাইয়া, তাই বুঝবেন কি করে টাকা কামাতে যে কতটা ইফোর্ট দিতে হয়!"
বলেই এগিয়ে এলো। প্রিয়ন্তী কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাজধীর নিচু হয়ে খুব সাবধানে দরজার ফাঁকে আটকে থাকা শাড়ির আঁচলটা আলগা করে বের করে আনল।আঁচলটা বের করে সোজা হয়ে দাঁড়াল তাজধীর। তারপর খানিকটা ঝুঁকে প্রিয়ন্তীর কানের কাছাকাছি এসে নিচু ভারী গলায় ফিসফিস করে বলে উঠল,
“আচ্ছা আপনি এসব ইচ্ছা করে করেন না তো?বাচ্চার বাবাকে দিয়ে শুধু শুধু কাজ করানোর ধান্দা,তাই না?ভারি দুষ্ট তো আপনি ম্যাডাম!"
বেচারির মুখটা মুখটা হাঁ হয়ে গেল। কান পর্যন্ত লাল হয়ে উঠল লজ্জা আর রাগে। কিন্তু ততক্ষণে তাজধীর দুই হাত প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে বড় বড় পা ফেলে বাড়ির ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। যেতে যেতে আবারও গলায় হাঁক ছেড়ে মেয়েটার মেয়েটার উদ্দেশ্য বলে গেল,
"টাকাপয়সা এখন থেকে একটু হিসেব করে ভাঙবেন মিস প্রিয়ন্তী, আপনার হাসব্যান্ডের কিন্ত ওতো বেশি টাকা নেই। শেষে দেখা গেল বাচ্চার মা'কে নিয়েই না আবার রাস্তায় বসতে হয়!"
Page 2
সারারাতের বৃষ্টির পর পুরো গ্রামটা ধুয়ে-মুছে নতুন হয়ে উঠেছে। আকাশে রোদ উঠেছে ঠিকই, তবে ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ এখনো ভাসছে বাতাসে বাতাসে। দূরে দূরে ধানক্ষেতের মাথায় বৃষ্টির পানি চিকচিক করছে তখনো। সরু মেঠোপথগুলো কাদায় থকথকে। মাঝেমধ্যে ছোট ছোট গর্তে জমে থাকা পানিতে জিপের চাকা ঢুকলেই ছপাৎ ছপাৎ শব্দ তুলে কাদা ছিটকে পড়ছে দুপাশে।একটা সবুজ রঙের জিপ ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে সেই গ্রামের ভেতরের আঁকাবাঁকা পথ ধরে।
ড্রাইভিং সিটে বসে আছে সেহরোজ। মুখভর্তি বিরক্তি। ভ্রু কুঁচকে আছে শুরু থেকেই। এই কাদা, ভাঙাচোরা রাস্তা, চারপাশের এতো অগোছালো পরিবেশ একটাও সহ্য হচ্ছে না তার। অথচ পিছনের সিটে বসা অর্ণব আর ফাহিমের হাবভাব এমন যেন দীর্ঘদিনের প্লানিং করে পিকনিকে এসেছে এরা।ফাহিম জানালা দিয়ে মাথা বের করে ভেজা বাতাস টেনে নিয়ে বলল,
“উফফ! ভাই, গ্রামের এই ওয়েদারটার জাস্ট প্রেমে পড়ে গেছি আমি!”
অর্ণব সঙ্গে সঙ্গে যোগ করল,
“ঢাকায় এই জিনিস খুঁজে পাবি? এই কাদা, এই ভিজা মাটির গন্ধ! একদম মিলেমিশে ক্ষীর!"
“তোরা চাইলে এখানেই নেমে কাদায় গড়াগড়ি খেতে পারিস।”
শেহরোজের কথায় অর্ণব হেসে বলল,
“তোর সমস্যা কী বলতো? মানুষ এত সুন্দর পরিবেশ পেলে কবিতা লিখে, আর তুই এমন মুখ করে বসে আছিস যেন যুদ্ধ করতে এসেছিস।”
সেহরোজ শুষ্ক গলায় উত্তর দিল,
“কারণ আমি ঘুরতে আসিনি।”
পাশেই বসা তার মা তখন জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন। হঠাৎ বললেন,
“এই রাস্তা তো আগে এমন ছিল না!"
সেহরোজ স্টিয়ারিং ঘুরাতে ঘুরাতেই বলল,
“আম্মু, তুমি নিশ্চিত তো ঠিক জায়গায় আসছি আমরা?”
“হ্যাঁ রে বাবু! এইদিকেই তো হওয়ার কথা। অনেক বছর আগে এসেছিলাম তো, ঠিক মনে পড়ছে না।”
“গ্রেট!"
চোয়াল শক্ত করে খিটমিট করে উচ্চারণ করল সেহরোজ।পথিমধ্যে জিপটা হঠাৎ ঝাঁকুনি খেয়ে থেমে গেল। সামনের রাস্তা এতটাই সরু আর কাদামাখা যে আর ভেতরে নেওয়া অসম্ভব প্রায়।সেহরোজ গভীর একটা আহত শ্বাস ছাড়ল। তারপর ইঞ্জিন বন্ধ করে দরজা খুলে একলাফে নেমে গেল গাড়ি থেকে।
সাদা টি-শার্টের উপর জলপাই রঙের জ্যাকেট, নিচে সাদা ট্রাউজার আর সাদা স্নিকার্স। কিন্তু নামার সঙ্গে সঙ্গেই কাদায় “চপাস” শব্দ তুলে জুতোর অর্ধেকটা ডুবে গেল কাদায়।সেহরোজের মুখের ভাব দেখে অর্ণব আর ফাহিম পেছন থেকে হাসি চাপতে চাপতে আওড়াল,
“ভাই, তোর জুতার আত্মার মাগফিরাট কামনা করছি!"
সেহরোজ পাত্তা দিল না সেসবের। বিরক্ত মুখে সামনে এগিয়ে গেল সরু একটা গলির দিকে।চারপাশে টিনের ঘর। কোথাও কোথাও আবার মাটির দেয়াল। বৃষ্টির পানি গড়িয়ে এখনো টুপটাপ পড়ছে চালের কার্নিশ থেকে। পুরো পথজুড়ে কাদা আর জমে থাকা পানি থকথক করছে।সেহরোজ যত ভেতরে যাচ্ছে, সাদা জুতো আর ট্রাউজার তত কাদায় মাখামাখি হয়ে যাচ্ছে তার। ঠিক তখনই সামনের মোড় ঘুরে আচমকা একটা কিশোরী মেয়ে দৌড়ে এসে প্রায় বুকের সঙ্গে ধাক্কা খেলো তার। মেয়েটার দুহাত ভর্তি কাঁচা পেয়ারা। ওড়নার কোঁচড়েও গাদা গাদা পেয়ারা বাঁধা।মেয়েটার অবচেতনে দৌড়ানোর দরুন কাদার পানি ছিটকে এসে সেহরোজের পুরো ট্রাউজার আর জুতোর উপর লেপটে গেল। বেচারা সেহরোজ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে।তারপরই, টের পেল কেউ একজন হুট করে পেছন থেকে ওর শার্ট খামচে ধরেছে। চমকে ঘুরে তাকাতেই দেখল সেই মেয়েটাই ওর পেছনে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তখন। মেয়েটার ডাগর ডাগর চোখে আতঙ্ক স্পষ্ট। অমনি সামনের দিক থেকে একটা মোটা গলার চিৎকার শুনতে পেলো দুজনে,
“ঐইই! আজকে ধরতে পারলে তোর খবর আছে মাইয়া!”
একজন মধ্যবয়স্ক লোক লাঠি হাতে তেড়ে আসছে এদিকটায় । পরনের লুঙ্গিটা হাঁটু পর্যন্ত গুটিয়ে কাঁচা মারা। মুখ রাগে থমথম করছে।মেয়েটা আরও শক্ত করে সেহরোজের শার্ট আঁকড়ে ধরে কাঁপা গলায় বলে উঠল,
“আংকেল আমারে বাঁচান প্লিজ! ওই লোকটা আজকে আমারে পাইলে আর আস্ত রাখবো না!”
“আংকেল?”
চোখ কুঁচকে তাকাল সেহরোজ। তবে ঘুরলো না। লোকটা ততক্ষনে সামনে এসে লাঠি উঁচিয়ে বলল,
“সরে যান ভাই! এই মাইয়াডারে আজকে আমি..
সেহরোজ শান্ত, ঠান্ডা চোখে তাকাল লোকটার দিকে।
একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নেভি অফিসারের সেই স্থির চাহুনি এমনিতেই সাধারণ মানুষকে থামিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।গভীর গলায় বলল সে,
“কি করেছে?”
লোকটা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“আমার বাগানের সব পেয়ারা চুরি করছে! রোজ রোজ করে!”
পেছন থেকে মেয়েটা ছোট করে বলল,
“দুইডা নিছিলাম শুধু”
“চুপ!”
লোকটা আবার তেড়ে উঠতেই সেহরোজ হাত তুলে থামাল।
“ঠিক আছে। কত টাকার পেয়ারা?”
“জি?”
সেহরোজ ওয়ালেট বের করে কিছু টাকা এগিয়ে দিল।
“এতে হবে?”
লোকটা টাকার দিকে তাকিয়ে মুহূর্তেই শান্ত হয়ে গেল। লাঠিটা নামিয়ে নিয়ে গলা খাঁকারি দিল।
“আরে না মানে,আপনের লোক নাকি বুঝি?”
সেহরোজ নির্লিপ্ত স্বরে বলল,
“না। কিন্তু এখন চলে যান।”
লোকটা আর কিছু বলল না। টাকা নিয়ে বিড়বিড় করতে করতে চলে গেল সেখান থেকে।লোকটা চোখের আড়াল হতেই মেয়েটা ধীরে ধীরে সেহরোজের পেছন থেকে উঁকি দিল। তারপর নিশ্চিত হয়ে বেরিয়ে এলো।ওড়নার কোঁচড় খুলতেই সব পেয়ারা গড়িয়ে পড়ল কাদায়।মেয়েটা একটুও বিচলিত না হয়ে নিচে বসে একটা পেয়ারা তুলে নিল। তারপর নিজের ওড়নায় ঘষে মুছে দিব্যি “কচাৎ” করে কামড় বসাল তাতে। হতভম্ব সেহরোজ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখল সেসব। পরোক্ষণেই মুখ বিকৃত করে উঠল সে। যেন জীবনে এরচেয়ে ভয়ংকর কিছু দেখেনি।
“ইউক!”
মেয়েটা চোখ পিটপিট করে তাকাল।
“কি হইছে?”
সেহরোজ অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে বলল,
“ওটা কাদায় পড়েছিল মেয়ে! ক্লিন করে করেই খাওয়া শুরু করে দিয়েছো? ডু ইউ হেভ এনি আইডিয়া ওখানে কত জার্মস আছে?"
মেয়েটা নির্বিকারভাবে আরেক কামড় দিয়ে বলল,
“জার্মস আবার কি?"
সেহরোজ বিরক্তিতে বিড়বিড় করে আওড়াল,
"নাথিং!"
মেয়েটা দিব্যি পেয়ারায় কচাৎ কচাৎ করে কামড় বসাতে বসাতে এবার সেহরোজকে আগাগোড়া ভালো করে পর্যবেক্ষণ করল।সাদা কাপড়চোপড় কাদায় মাখামাখি।হাতে দামি ঘড়ি। পরিষ্কার শেভ করা মুখ। চুলগুলোও সেট করা। দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গিটাও আলাদা। দুই সেকেন্ড তাকিয়ে থেকেই মুখ কুঁচকে নিল মেয়েটা।এই লোকটাকে কোনো দিক দিয়েই গ্রামের মানুষ মনে হচ্ছে না। একেবারে শহুরে বাবু টাইপ লাগছে দেখতে।ওদিকে সেহরোজও অস্বস্তি নিয়ে তাকিয়ে আছে মেয়েটার দিকে।
বয়স বড়জোর তেরো-চৌদ্দ হবে হয়তো। পরনে সবুজ রঙের থ্রি-পিস। শরীরটা একদম শুকনো পাটকাঠির মতো। মুখে ঘাম লেপ্টে আছে, চুলগুলো এলোমেলো করে বাধা। গ্রামের সাধারণ মেয়েদের মতোই একদম সাদাসিধে চেহারা। মেয়েটা পেয়ারা চিবাতেই চিবাতেই হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,
“আংকেল কি এখানে নতুন নাকি? কোন বাড়িতে আসছেন?”
আবারও “আংকেল”!সেহরোজের বিরক্তির মাত্রা এবার আকাশ ছুঁয়ে গেল।তাকে কোন দিক দিয়ে আংকেল মনে হচ্ছে এই মেয়ের?তবুও নিজেকে কন্ট্রোল করল সে। বুঝতে পারছে, বাচ্চা একটা মেয়ে। সেই হিসেবেই বলছে।চোয়াল শক্ত করে শান্ত গলায় বলল,
“দেলোয়ার বাড়ি কোনটা জানো?”
নামটা শুনতেই মেয়েটার মুখের ভাব বদলালো এবার।
চোখ সরু করে আবারও উপরে নিচে দেখল সেহরোজকে। এবার যেন একটু বেশি মনোযোগ দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করল।
“বাবু ! কার সাথে কথা বলছিস?"
সেহরোজ ঘুরে তাকাতেই দেখল তার মা এগিয়ে আসছে অর্ণব আর ফাহিমকে নিয়ে। তবে তাকে আরও আশ্চর্য করে দিয়ে মেয়েটা তার মাকে দেখতেই লাফিয়ে উঠল প্রায়,
“আরে সুমি আন্টি!আপনি এখানে?"
সেহরোজের মা চশমাটা ঠিক করে তাকালেন মেয়েটার দিকে। তারপর অবাক হয়ে বললেন,
“মেহরিণ না ? এমা তুই এখানে?ও মা, কত বড় হয়ে গেছিস! মাশাআল্লাহ কত সুন্দর হইছিস দেখতে!”
বলে আদর করে মেয়েটার গাল ছুঁয়ে দিলেন তিনি।
সেহরোজ কপাল কুঁচকে তাকাল দুজনের দিকে।বলল অতিব আশ্চর্যে,
“তুমি একে চেনো?”
“চিনবো না কেন? এটাই তো মেহরিণ!”
এক সেকেন্ড থামলেন তিনি।তারপর সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন,
“যার সঙ্গে তোর বিয়ে ঠিক করেছি।এর সঙ্গে বিয়ে দিতেই তো এনেছি তোকে!"
বিনা মেঘে বড়োসড়ো একটা বজ্রপাত আছড়ে পড়ল সেহরোজের মাথায়। শূন্য মস্তিষ্কটা বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় তার।বিস্ময়ে হা হয়ে গেল চোয়াল। অস্ফুট গলায় কোনোরকম টেনেটুনে উচ্চারণ করল,
“হোয়াট?”
মিসেস সুমি দিব্যি হেসেই চলেছেন তখনো।
“তোকে তো এই মেয়ের সঙ্গেই বিয়ে দিতে এনেছি আমরা। দেখ না, কত সুন্দর মানাবে তোদের!”
সেহরোজ এবার ঘুরে তাকাল মেয়েটার দিকে।মেয়েটাও পেয়ারা হাতে দাঁড়িয়ে আছে নির্বিকারভাবে।
একবার ওর দিকে তাকাচ্ছে, আবার পেয়ারা খাচ্ছে।
সেহরোজের চোখ উপরে থেকে নিচে নামল।এই বাচ্চা মেয়ের সঙ্গে ওর বিয়ে ঠিক করেছে ওর মা?একদম কাঁচা গ্রামের মেয়ে। শরীরে হাড় ছাড়া কিছুই আছে বলে মনে হয় না। দেখে মনে হচ্ছে জোরে ধাক্কা লাগলে উড়ে যাবে। সেহরোজের মাথা ভনভন করে উঠল।
অসম্ভব। এটা কোনোভাবেই সম্ভব না। ঠিক তখনই পাশে এসে দাঁড়ালো অর্ণব আর ফাহিম।দুজনেই কিছুক্ষণ পরিস্থিতি বুঝে চুপ করে থাকলেও একটা সময় অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল অর্ণব।
“ভাই তোর বাচ্চা বউটা কিন্ত সেই! আমাদের কিন্ত একদম মনে ধরেছে আমাদের ভাবিকে।বিয়ে তো এইবার আমরা তোকে করিয়েই ছাড়বো। এবারের মিশন সেহরোজ সরোয়ার এর বিয়ে খাওয়ার মিশন। এবারের মিশন, এই মেয়েটাকে আমাদের ভাবি বানানোর মিশন!"
“নো ওয়েইইই!”
চিৎকার দিয়ে ধড়ফড় করে উঠে বসল সে।বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। কপাল, গলা, বুক— সব ঘামে ভিজে গেছে।মোবাইলের একঘেয়ে অ্যালার্ম তখনও একটানা বাজছে পাশে।ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল,
সকাল সাতটা। কয়েক সেকেন্ড হাঁপাতে হাঁপাতে বসে রইল সেহরোজ একইভাবে।স্বপ্ন।তার মানে এটা একটা স্বপ্ন ছিল? স্বপ্ন নয় ঠিক, এটা দুঃস্বপ্ন! এরকম ভয়াবহ স্বপ্ন জীবনে আর দুটো দেখেছে কিনা সন্দেহ।
সঙ্গে সঙ্গে এমন এক স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো বুক থেকে, যেন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বেঁচে ফিরেছে মাত্রই।
একহাতে মুখ ঢেকে কিছুক্ষণ বসে থেকে বিড়বিড় করে উঠল,
“ড্যাম!"
গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।তাড়াতাড়ি পাশের বোতলটা তুলে ঢকঢক করে দু ঢুক পানি খেলো।
তবুও বুকের ধরফড়ানি কমছে না পুরোপুরি। জীবনে অনেক ভয়ংকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে সে। সমুদ্রের ঝড়, অস্ত্র, বিপদ— সবকিছুর সামনে ঠান্ডা মাথায় দাঁড়িয়েছে কিন্তু আজ একটা স্বপ্ন এভাবে নড়িয়ে দিয়েছে তার অস্তিত্ব! বিষয়টা সত্যিই প্রচন্ড হরিবল!
—————
নাস্তা শেষ করে সবেই রুমে এসেছে পাভেল। পকেটে থাকা ফোনটা ভাইব্রেট করে বেজে উঠল তখনি। পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্ক্রিনে তাকাতেই ভ্রু কুঁচকে গেল একটা অচেনা নাম্বার থেকে ফোন আসাতে। গ্রীন কালার ফোনের অপশনে প্রেস করে কানে চেপে ধরলো ফোনটা। শুনতে পেল অপরিচিত কোনো পুরুষালি কণ্ঠস্বর। ওপাশ থেকে কি শুনতে পেল কে জানে তবে কথাটা শুনতেই খানিকটা থতমত খেয়ে বসল পাভেল। কৌতূহল চেপে জানালার দিকে এগিয়ে গেল। বারান্দা দিয়ে নিচে তাকাতেই চোখ আটকালো বাড়ির ঠিক গেটের সামনে একটা বড় কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে।
ফোন রেখে তৎক্ষণাৎ ঘরে ফিরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করল যথাসম্ভব।গায়ের শার্টটা একবার টেনে গুছিয়ে নিয়ে তড়িঘড়ি করে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো নিচে।গেটের কাছাকাছি পৌঁছাতেই গাড়ির দরজা খুলল। একজন পুরুষ নেমে এল সঙ্গে সঙ্গেই।
গায়ে সম্পূর্ণ কালো ইউনিফর্ম, কালো শার্প বুট, গলায় হেডসেট। কানে ছোট কালো ব্লুটুথ ডিভাইস।লোকটা নেমেই এক পা সামনে এগিয়ে মাথা সামান্য ঝুঁকিয়ে সম্মান জানাল তাকে।
“গুড মর্নিং, স্যার।”
পরপর ইউনিফর্ম পরা লোকটা একটা ব্র্যান্ডেড শপিং ব্যাগ হাতে এগিয়ে এলো তার সামনে। ব্যাগটা ছিল বেশ ভারী তারউপরে সুন্দর করে রিবন বাঁধা।গলায় স্বভাবসুলভ গুরুগম্ভীর ভাব বজায় রেখেই জানাল,
“স্যার পাঠিয়েছেন এটা ম্যামের জন্য।”
বিনা বাক্যয় ব্যাগটা হাতে নিল পাভেল।লোকটা আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না সেখানে। দায়িত্ব শেষ করে আবার চুপচাপ ঘুরে গাড়িতে উঠে পড়ল। মুহূর্তেই গাড়িটা সরে গেল গেটের সামনে থেকে।পাভেল ব্যাগটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কীয়তক্ষণ। একটা অস্বস্তিকর কৌতূহল নিয়ে ব্যাগের দিকে তাকাল সে। বাইরে থেকে বোঝা যাচ্ছে এটা সাধারণ কিছু না। অত্যন্ত এক্সক্লুসিভ, বিদেশি ব্র্যান্ডের প্যাকেজিং।প্রচন্ড কৌতূহলে ব্যাগটা উল্টে পাল্টে দেখল আবার।
ব্যাগটা বেশ বড়োসড়োই। পাভেল ব্যাগটা নিয়ে সোজা চলে এলো নিজ রুমে।রুমে মিতালী নেই। মায়ের সঙ্গে একটু বাড়ির আশেপাশে হাঁটতে বেরিয়েছে নাস্তা শেষে। মিনিট খানেক সময় নিয়ে কিছু একটা ভেবে অবশেষে নিজেই আগেভাগে ব্যাগটা খুলল সে। প্রথমেই চোখে পড়ল,একটা হালকা অ্যাসিমেট্রিক সি-কালারের গাউন। নিখুঁত কাট ও প্রিমিয়াম ফেব্রিকে আবৃত গাউনটা এক দেখাতেই নজর আটকাতে সক্ষম। পাভেল স্বয়ং ছেলে হয়েও হা করে তাকিয়ে থাকলো কয়েক সেকেন্ড। তার সাথে মিলিয়ে এক জোড়া হাই হিল জুতোও আরেক পাশে ছোট ও অত্যন্ত এলিগ্যান্ট একটা ব্যাগ ও রাখা। সবকিছুর নিচে রাখা একটা ছোট কার্ড।পাভেল সেটার দিকে তাকাতেই চোখ আটকালো আরেকদফা।প্রাইস দেখতেই কেশে উঠল খুক খুক করে। দামের জায়গায় লেখা—ডলার ফিগার। বাংলাদেশি টাকায় হিসাব করলে কয়েক লাখের কাছাকাছি! কয়েক লাখ!
গ্রাউন, জুতো অবশেষে ব্যাগ প্রত্যেকটার নিচে থাকা কার্ডগুলো ছিঁড়ে নিজের পকেটে ঢুকিয়ে রাখল সে।
তারপর ব্যাগটা আবার গুছিয়ে বন্ধ করল।অবশেসে দু চোখ বন্ধ করে বড়োসড়ো একটা হাফ ছাড়ল
—————
দুপুর গড়িয়ে তখন প্রায় একটার কাছাকাছি।
ড্রয়িং রুমটা একদম রেডি হয়ে বসে আছে পাভেল। অপেক্ষা করছে স্ত্রী আর বোনের জন্য। শাড়ির আঁচল গায়ে পেচাতে পেচাতে নিচে নেমে এলো তখন মিতালী।জাম রঙা একটি জর্জেট এর শাড়ি পড়েছে আজ সে। তারউপর আবার ছোট ছোট স্টোনের কাজ করা। ফর্সা গায়ের সঙ্গে মানিয়েছে বেশ। পাভেল হা করে তাকিয়ে থাকল নিজে স্ত্রীর পানে। মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থেকে পুনরায় তাড়া দিয়ে জানাল,
"প্রিয়র হয়নি? ডেকেছো ওকে?"
বলতে না বলতেই এবার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসতে দেখা গেল প্রিয়ন্তীকে। সে সময় বাড়ির সদর দরজা পেরিয়ে ভিতরে ঢুকছিলো তাজধীর। সেই সকালে কোনো একটা ইম্পরট্যান্ট কাজে বাড়ির বাইরে বের হয়েছিল সে।ফিরলো এখুনি।এক হাতে কানের পাশে চেপে ধরে রাখা ফোন। কোনো একটা বিষয়ে অর্ণবের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ঢুকছিল সে। কথা বলার ব্যস্ততায় ডুবে থাকলেও একদম হুট্ করেই চোখ আটকালো সিঁড়ির দিকে।
অমনি মিস করল বোধহয় কয়েকটা হার্টবিট। হৃদযন্ত্রটা কেমন থমকে গেল। অ্যাসেন্ট-সি কালারের গাউনে থাকা রমণীটা ঠিক মাঝ সমুদ্রে ডুবে থাকা কোনো রূপকথার ভবনমোহিনী মৎসকন্যার মতোই লাগছে। কানে শোভা পাচ্ছে ম্যাচিং করা একজোড়া দুল। গলায় ওড়না আলতো করে রাখা। অনেক্ষন যাবৎ বন্ধুর থেকে কাক্ষিত রেসপন্স না পেয়ে ফোনের ওপাশ থেকে অর্ণব অধৈর্য হয়ে বলে উঠল,
"হ্যা হ্যালো, কিরে ভাই রেসপন্স করছিস না কেন? কোথায় তুই? হ্যালো তাজধীর শুনছিস?"
অর্ণবের গলার টানটান বাক্যদয়েও ধ্যান ভাঙেনা লোকটার। সিঁড়ির দিকে চেয়েই গমগমে সরে উত্তর করে কেবল,
"এক টুকরো সমুদ্রের সামনে!"
ওপাশ থেকে মুহূর্তেই চেঁচিয়ে উঠল অর্ণব,
“এ্যা? কি বললি? কই তুই?!
অর্ণবের উঁচু বাক্যর চোটে ধ্যান ভাঙল তাজধীরের। নড়েচরে দাঁড়ালো খানিকটা।মহাকষ্টে চোখ সরিয়ে নিলেও বেহায়া চোখ দুটো ঘুরেফিরে পুনরায় গিয়ে আটকালো সেই রমণীতে। মুখ একদম স্বাভাবিক করে ফোনটা নামিয়ে আনল।একটু থেমে বলল,
“বাদ দে, পরে কথা হবে।”
বলেই কল কে টে পকেটে ঢুকিয়ে রাখল। সোজা চলে গেল সিঁড়ি বেয়ে উপরে। তবে যাওয়ার আগমুহূর্তেও একবার তাকাতে ভুলল না সে।
ওদিকে প্রিয়ন্তীকে এই ভেসে দেখে তাজধীরের সাথে সাথে থমকালো আরেকজন ও। সেটা হলো মিতালী। প্রথম মুহূর্তে মেয়েটা সত্যিই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল। নিজের ননদকে এত সুন্দর লাগছে দেখে চোখ জুড়িয়ে গিয়েছিল যেন। কিন্তু সেই মুগ্ধতা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। ধীরে ধীরে ভ্রু কুঁচকে গেল মিতালীর। চোখে ভেসে উঠল সন্দেহ আর বিস্ময়। নিজের চোখের দেখাকে অবিশ্বাস প্রমান করতে আরেকবার ভালো করে পর্যবেক্ষণ করল প্রিয়ন্তীর ড্রেসটা। ততক্ষণে উঠে বাইরে চলে গেছে পাভেল। যেতে যেতে বলে গেল,
“আমি বাইরে আছি, তোমরা আসো।”
ড্রয়িং রুমে রয়ে গেল শুধু মিতালী আর প্রিয়ন্তী। এর মাঝেই এগিয়ে এসে দাঁড়ালো প্রিয়ন্তী। বলল প্রচন্ড উচ্ছাস নিয়ে,
“ড্রেসটা সুন্দর না ভাবি?”
“হ্যাঁ, অনেক সুন্দর।”
তারপর একটু থেমে, চোখ সরু করে জিজ্ঞেস করল,
“কই পেলে এটা? কবে নিলে?”
প্রিয়ন্তী স্বাভাবিকভাবে উত্তর দিল,
“ ভাইয়া এনেছে সকালে। বলেছে এটা পড়েই রেডি হতে!"
“তোমার ভাই?”
অবাক হয়ে বলল মিতালী।প্রিয়ন্তী জবাব দিলো,
“হ্যাঁ, আর কে দিবে? আমার খুব পছন্দ হয়েছে জানো? এত সুন্দর গাউনটা! ইশ!”
বলতে বলতেই নিজের গাউনের কাপড়টা আলতো করে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখতে লাগল।তবে মিতালী কেন যেন চেয়েও স্বাভাবিক থাকতে পারছেনা। কারণ ততক্ষণে
তার মাথার ভিতর একটার পর একটা হিসেব মিলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………