“তাড়াতাড়ি রেডি হ চুন্নির দল! সন্ধ্যা হয়ে যাবে, আর আমরা ঘুরতে যেতে পারব না।”
দুপুরে খাওয়া শেষ করে একটু চোখ লেগে এসেছিল সাফা আর অবন্তিকার। গভীর ঘুমে ডুবে ছিল দু’জনই। হঠাৎ করেই রাহার তীক্ষ্ণ চিৎকার রুমটা কেঁপে উঠল।
“ওই উঠ! দেরি হয়ে যাচ্ছে!”
ধাম করে শব্দে সাফা আর অবন্তিকা একসাথে চমকে উঠে বসে পড়ে।ঘুম ভাঙার পরপরই তাদের চোখে জমে থাকা বিরক্তি আর রাগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কাঁচা ঘুম ভাঙলে যেমন মানুষটা অর্ধেক রেগে, অর্ধেক এলোমেলো থাকে—ঠিক তেমনই অবস্থা তাদের দু’জনের।
সাফা ধীর গলায় বলল,
“এত চিৎকার করার কী দরকার ছিল?”
অবন্তিকা শুধু ভ্রু কুঁচকে রাহার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,
“বাঁদর মেয়ে এইভাবে কেউ ডাক দেয়?”
তোরা জানিস না আমি এমনই..!
তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে রেডি হ—জলদি!
রাহা তাদের একদম ধমকে ঠেলে ফ্রেশ হতে পাঠিয়ে দিল। নিজেও রেডি হবে বলে ভেতরে চলে গেল।
গ্রামীণ পরিবেশের সাথে মানানসই সাজ হবে আজ। তাই ঠিক হলো সবাই বাঙালি টাইপ শাড়ি পরবে। আর এই সিদ্ধান্তের পেছনে রাহার একটা আলাদা কারণও ছিল—অভ্র।লাল টকটকে চারটা জিন্স ম্যাচিং শাড়ি এনেছিল তারা, আজ সেগুলোই পরার কথা। আয়াতের জন্য রাহা আলাদা করে এক্সট্রা একটা শাড়ি এনেছিল।
তারা সবাই একে একে রেডি হয়ে নিচে নামছে। একদম সাধারণ কিন্তু নজরকাড়া রূপসজ্জা।
কেশগুলো খোলা—পেছনে ছোট ছোট গাজরা গুঁজে দেয়া, সাদা ফুলের সুবাসে পুরো পরিবেশটা ভরে উঠছে। দুই হাতে গাঢ় লাল কঙ্কণের মুঠো, প্রতিটি নড়াচড়ায় টুংটাং ধ্বনি উঠছে।অধরে টকটকে লাল রঙের শৃঙ্গার, আর শাড়ির পল্লুটা সুন্দর করে পেছনে ফেলা—গ্রামীণ সৌন্দর্যের সঙ্গে একদম মানানসই এক মাধুর্য।
গলায় শুধু চিকন চেইন, আর রাহার গলায় আলাদা করে একটা লকেট। সেটা সে খুলতেই চায় না—অদ্ভুত এক টান আছে ওটার সাথে। যদিও মনে মনে সে নিজেও জানে, লকেটটা খারাপ লাগছে না, বরং যেন আরও আপন হয়ে গেছে।
এই পাঁচজনকে একসাথে দেখলে এক মুহূর্তে মনে হয়—এরা যেন নববধূর দল। রূপে নয়, বরং এক আলাদা আবহে ভরপুর। চোখে পড়ার মতো, কিন্তু অনাড়ম্বর।
ঘড়ির কাঁটা তখন ৪টা ৩০ ছুঁই ছুঁই করছে। বাতাসে একটা অদ্ভুত ব্যস্ততা, আর অপেক্ষার চাপ স্পষ্ট হয়ে উঠছে প্রতিটা মুহূর্তে।
ছেলেরা সবাই একেকজনের মতো করে নিজেদের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু চোখগুলো স্থির—উপরে সিঁড়ির দিকেই।
হঠাৎ করে চারপাশটা যেন স্তব্ধ হয়ে গেল কারো আগমনে।পরপর নামতে লাগল মেয়েরা। শাড়ির আঁচল সামলে, লজ্জা মেশানো হাসি আর চোখ নামানো দৃষ্টি—সব মিলিয়ে পুরো পরিবেশটাই অন্যরকম হয়ে উঠল।
ছেলেরা যেন আর ধৈর্য রাখতে পারছে না—কারও ঠোঁটে হালকা হাসি, কারও চোখে অধীর অপেক্ষা।
প্রথমেই নামল আয়াত।তার উপস্থিতি যেন একটা নরম আলো ছড়িয়ে দিল চারপাশে।
কিন্তু কারও চোখ সেখানে আটকাল না বেশিক্ষণ…
তারপরই নামল শিফা।এক ঝলকেই ইভানের দুনিয়া থেমে গেল।মেয়েটাকে দেখে তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা টান অনুভব হলো দেখেই মনে হলো, তার বেঁচে থাকার দায় যেন এই মেয়েটাই। এই মেয়েটির কাছে সে একদম নিঃস্ব।
ডাক্তারি করা ছেড়ে সে নিজেই যেন রোগী হয়ে যাচ্ছে। তাও আবার সাধারণ কোনো রোগ নয়—প্রেম রোগ।
শিফা মাথা নিচু করে নামছিল, লজ্জায় পুরো মুখটাই লাল হয়ে গেছে। চোখ তুলে তাকানোর সাহস যেন পাচ্ছিল না।কিন্তু একবার ভুল করে চোখ উঠাতেই—
সোজা সামনে ইভান।
ওই দৃষ্টি… স্থির, গভীর, আর অদ্ভুতভাবে চুপচাপ জড়িয়ে ধরা।শিফার বুক ধক করে উঠল।
আর পরের মুহূর্তেই, যেন নিজেকে সামলাতে না পেরে, দ্রুত পা বাড়িয়ে আয়াতের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল।
যেন আড়াল খুঁজে নিলো—কিন্তু দৃষ্টি থেকে কি আর আড়াল পাওয়া যায়?ইভানের চোখ তখনও একটাই জায়গায় স্থির…
যেখানে শিফা দাঁড়িয়ে আছে, লুকিয়ে থেকেও সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ে গেছে।
তারপর সাফা নামতে লাগল, তার ঠিক পিছনে অবন্তিকা।
জারিফ সোফায় বসে মোবাইল স্ক্রল করছিল। হঠাৎই একবার অন্যমনস্কভাবে চোখ তুলে আবার নামাতেই থমকে গেল সে—মনে হলো, যেন সামনে কিছু অদ্ভুত সুন্দর একটা দৃশ্য ধরা দিয়েছে।
এক মুহূর্তেই মাথা আবার ঝট করে উঠলো।
সামনের দিকে তাকাতেই তার দৃষ্টি আটকে গেল। মুগ্ধতা এসে ভর করলো পুরো মন জুড়ে। মুখটা অনিচ্ছায় একটু হা হয়ে গেল।
পাশে বসা জায়ান ও জারিফের আচমকা পরিবর্তন দেখে চমকে উঠলো। জারিফের নজর ধরে সেও তাকালো একই দিকে। তাদের সামনেই দাঁড়িয়ে আছে সাফা আর অবন্তিকা।
একজন সামনে, আরেকজন ঠিক তার পিছনে—দুইজনেই যেন আজ অন্যরকমভাবে সেজে উঠেছে।
সাদামাটা পরিবেশেও ওদের উপস্থিতি যেন পুরো ঘরটাকেই আলাদা করে তুলেছে। দুইজনকেই এতোটা সুন্দর লাগছিল যে চোখ সরানোই কঠিন হয়ে যাচ্ছিল।
জারিফ শুধু অবন্তিকার দিকেই তাকিয়েই রইলো… শব্দহীন আর স্থিরভাবে। যেনো চোখের আড়াল হলে বড় কিছু মিস করে ফেলবে।
অভ্র পাশে এসে দাঁড়াতেই জায়ানের ঘোর ভাঙলো।মুহূর্তেই সে নিজের সংযম ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করল। পাশে দাঁড়ানো জারিফ তখনো যেন টানটান বিস্ময়ে স্থির—মুখ হা করেই আছে। জায়ান ধীরে নিজের এক হাত তুলে জারিফের চিবুকটা হালকা চেপে ধরল, যেন তাকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনতে চায়।
তৎক্ষণাৎ জারিফ নড়ে ওঠে,সে শুকনো ঢোক গিলে একবার অভ্রের দিকে, আরেকবার জায়ানের দিকে তাকাল। দুই পাশে দুইজন—একদিকে অভ্র, অন্যদিকে জায়ান—দুইজনের চোখেই অদ্ভুত এক তীক্ষ্ণতা, আর ভেতরে লুকোনো প্রশ্ন আর ঠোঁটে তীক্ষ্ণ হাসি।
তাদের এই অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া এড়ায়নি অবন্তিকা আর সাফার চোখও। অবন্তিকা যেন মুহূর্তেই বুঝে ফেলল জারিফের সেই মুগ্ধ দৃষ্টি। মুহূর্তেই তার গাল দুটো লাল আভায় রাঙা হয়ে উঠল। বুকের ভেতরটা অকারণেই ধুকপুক করে উঠল। লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিয়ে সে দ্রুত এক পা পিছিয়ে গেল। তারপর নিঃশব্দে সাফার আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল, যেন নিজেকে আড়াল করার ব্যর্থ চেষ্টা করছে।
কিন্তু সাফা পুরো বিষয়টা ভুল বুঝল। তার ধারণা হলো—জারিফের সেই অস্থির দৃষ্টি, সেই থমকে যাওয়া অভিব্যক্তি, সবই যেন তার জন্যই। এই ভুল বোঝাবুঝির মাঝেই তার চোখে অজান্তেই একরাশ মিষ্টি ভালো লাগা ছড়িয়ে পড়ল।
অন্যদিকে সবাই এসে গেছে, কিন্তু রাহাকে না দেখে অভ্রের ধৈর্যের বাঁধ যেন ভেঙে গেল। এতক্ষণ ধরে সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু ভেতরের অস্থিরতা ধীরে ধীরে রাগে রূপ নিতে শুরু করল।
নিজের প্রেয়সীকে এক ঝলক দেখার জন্য তার ভেতরটা কতটা ছটফট করছে, সেটা বাইরে থেকে বোঝা না গেলেও বুকের ভেতরটা যেন অদ্ভুত এক অস্থিরতায় ভরে আছে। চোখ বারবার চারপাশে খুঁজে ফিরছে তাকে—কোথাও নেই রাহা।
অভ্রের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। হাতের মুঠো অজান্তেই একটু কষে ধরল সে।
আফরোজা বেগম মেয়েদের দিকে একবার তাকিয়েই মুগ্ধ হয়ে গেলেন।
— “মাশাআল্লাহ!” — প্রশংসাভরা কণ্ঠে বলে তিনি এগিয়ে এলেন। তারপর একে একে সবার কানের পেছনে নজরটিকা এঁকে দিলেন।
— “আমাদের এলাকায় এমন চার-চারটা কন্যা একসাথে দেখেছি বলে তো মনে পড়ে না। আল্লাহর কী অপার সৌন্দর্য! তোদের রূপ যেন উপচে পড়ছে। কারও যেন নজর না লাগে।”
বয়োজ্যেষ্ঠ নারীর স্নেহমাখা কথায় সবাই হেসে উঠলেও পরমুহূর্তেই আফরোজা বেগমের ভ্রু কুঁচকে গেল।
চারদিকে চোখ বুলিয়ে তিনি বললেন,
— “আরে! একজন তো নেই। রাহা কোথায়?”
সাফা বিরক্ত মুখে হাত গুটিয়ে বলল,
— “ওর তো সাজগোজের কোনো শেষ নেই। আমাদেরই বলল, ‘তোরা নিচে যা, আমি শুধু চুলটা একটু ঠিক করে আসছি।’ সেই ‘একটু’ যে কতক্ষণ, সেটা আল্লাহই জানে!”
কথাটা শুনে সবাই মৃদু হেসে উঠল।
আফরোজা বেগম এবার ইভানের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “বাবা, একবার ডেকে নিয়ে আয় তো।”
ইভান মুখে গম্ভীর ভাব আনলেও ভেতরে ভেতরে হাসল। সে খুব ভালো করেই জানে, অভ্র বাড়িতে থাকতে রাহার কাছে অন্য কোনো ছেলের যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
ইভান ইচ্ছে করেই এক পা সামনে বাড়াতেই অভ্র সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় বলল,
— “আমি একটু উপরে যাচ্ছি। যাওয়ার পথে রাহাকে দেখে নিয়ে আসব।”
তার কণ্ঠে ছিল স্বাভাবিকতা, কিন্তু চোখের ভেতরের অস্থিরতা কারও নজর এড়াল না।
ইভানের ঠোঁটের কোণে তৎক্ষণাৎ দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল। সে ধীরে ধীরে আবার নিজের জায়গায় ফিরে এসে দাঁড়াল।এই দৃশ্য নতুন কিছু নয়। তাই শিফাও সব বুঝে ফেলে মুচকি হেসে বলল,
— “চল, আমরা গাড়িতে গিয়ে বসি। ভাইয়া আর রাহু আসতে থাকুক। ।”
শিফার কথায় সবাই হেসে উঠল।
আর অভ্র?
সে আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। লম্বা পায়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। বাইরে থেকে তাকে যতটা শান্ত দেখাচ্ছিল, ভেতরে ততটাই ব্যাকুল ছিল সে।
আয়াতের মনটাও কেমন যেন ভারী হয়ে উঠল। তবুও মুখে কিছু না বলে ধীর পায়ে সামনে এগিয়ে গেল।
নিজেকেই নিজে বোঝাতে লাগল—
"নসিবের লিখন তো আর বদলানো যায় না। ভাগ্যে থাকলে মানুষটাকে একদিন না একদিন ঠিকই পেতাম। সবাই তো জীবনের সবকিছু পায় না। আমার সমস্ত পূর্ণতার মাঝেও আপনি না হয় এক অপূর্ণতাই হয়ে রইলেন, অভ্র..."
ভাবতে ভাবতেই সে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
অন্যদিকে অভ্র প্রায় তাড়াহুড়ো করেই রাহার রুমের দিকে এগিয়ে এলো। তার অপেক্ষা যেন আর সহ্য হচ্ছিল না।
রুমে ঢুকেই চারদিকে চোখ বুলিয়ে শেষমেশ তার দৃষ্টি গিয়ে থামল ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রাহার ওপর। রাহা নিজের শাড়িটা ঠিক করতে ব্যস্ত। পরার সময় একটু ঢিলা হয়ে গিয়েছিল বলে বারবার আঁচল আর ভাঁজগুলো গুছিয়ে নিচ্ছিল।
এক মুহূর্তে শাড়ির ভাঁজ সামান্য সরে যেতেই উন্মোচিত হলো তার মসৃণ, মেদহীন কোমর। কোমরে জড়ানো চিকন কোমরবন্ধনীর ঝিলিক যেন আলোকে আরও ম্লান করে দিচ্ছিল।দৃশ্যটা চোখে পড়তেই অভ্র যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্থির হয়ে গেল। তার দৃষ্টি আটকে রইল সেই রূপে।
আর এদিকে রাহার খেয়ালই নেই যে কেউ একজন মুগ্ধ হয়ে তাকে দেখছে।
ধীর পায়ে অভ্র এগিয়ে এলো তার পেছনে। তারপর কোনো শব্দ না করেই এক হাত বাড়িয়ে আলতো করে রাহার কোমরে হাত রাখল।
হঠাৎ সেই অপ্রত্যাশিত ঠাণ্ডা হাতের স্পর্শে রাহা কেঁপে উঠল। তার নিঃশ্বাস থমকে গেল এক মুহূর্তের জন্য।
সে দ্রুত নিজের হাত তুলে অভ্রের হাতের ওপর রাখল। আয়নায় চোখ পড়তেই দু'জনের দৃষ্টি এক হয়ে গেল।রুমজুড়ে নেমে এলো এক অদ্ভুত নীরবতা।
অভ্র হঠাৎ করেই পিছন দিক থেকে এক হাত বাড়িয়ে রাহাকে আগলে নিল। মুহূর্তেই তাকে নিজের বুকের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলল। দুই হাত দিয়ে আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে ধরলো। নিজের নাকের ডগা দিয়ে রাহার ঘাড় আর কানের পাশ ছুঁয়ে ছুঁয়ে ফিসফিস করে বলতে লাগল—
— “ঐ চাঁদমুখে যেন লাগে না গ্রহণ,...
জোছনায় ভরে থাক সারাটি জীবন…”...
তারপর আরও খানিকটা ঝুঁকে নরম স্বরে বলল,
— “জান, এই তুই কী করলি? কী রূপ দেখালি? সত্যি বলছি, আমার তো নিজেকেই পাগল পাগল লাগছে। চোখ ফেরাতে পারছি না তোর থেকে। Please, do something, jaan... I can't control myself anymore.”
অভ্রর কণ্ঠের গভীরতা আর উষ্ণ নিঃশ্বাসে রাহার পুরো শরীর ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছে।
এদিকে রাহার অবস্থা একেবারে করুণ।
অভ্র যে হুট করেই এভাবে এসে হাজির হবে, তা সে কল্পনাতেও ভাবেনি। তার উপর এমন আকস্মিক স্পর্শ আর একের পর এক মুগ্ধতা ভরা কথায় যেন বুকের ভেতরটা তোলপাড় করে উঠেছে।
মনে হচ্ছিল হৃদপিণ্ডটা বুঝি এখনই বুক চিরে বাইরে বেরিয়ে আসবে।
লজ্জায় তার গাল দুটো টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। চোখ তুলে অভ্রর দিকে তাকানোর সাহসটুকুও পাচ্ছে না সে। কাঁপা কাঁপা হাতে শাড়ির আঁচলটা মুঠো করে ধরে শুধু নিচের দিকে তাকিয়ে রইল।
রাহার এমন অসহায়, লাজুক চেহারা দেখে অভ্রর ঠোঁটের কোণে আরও গভীর হাসি ফুটে উঠল। আর
রাহা মনে মনে শুধু একটাই কথা ভাবল—
"এই মানুষটা একদিন সত্যিই আমাকে মেরে ফেলবে।"
কাঁপতে কাঁপতে রাহা বলল,
— কী করছেন অভ্র ভাই? ছাড়ুন আমাকে। আমরা তো বের হব। সবাই অপেক্ষা করছে।
অভ্র আরও একটু কাছে ঝুঁকে দুষ্টু হেসে বলল,
— থাক না ওদের অপেক্ষা। চল, একটু সময় শুধু আমার জন্য রাখ।
রাহা এবার সত্যিই অস্বস্তিতে পড়ে সরে যাওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু যতবার সে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইল, অভ্রের আঙুলের বাঁধন ততটাই শক্ত হয়ে উঠল।
— প্লিজ, অভ্র ভাই…
রাহার কণ্ঠের অসহায়তা টের পেয়ে অভ্র হঠাৎই নরম হয়ে গেল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— আচ্ছা ঠিক আছে, যা। আমি আর কিছু বলব না।
একটু থেমে অভিমানী গলায় যোগ করল,
— যেহেতু আমার থেকে দূরে যেতেই এত ইচ্ছে, তাহলে যা।
কথাটা শুনে রাহার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। এই মানুষটা কি সত্যিই বুঝতে পারে না, সে নিজেও কতটা অভ্রকে ঘিরেই বেঁচে আছে?চোখের কোণে চিকচিক করে উঠল জল।সেটা দেখেই অভ্র মুচকি হেসে বলল,
— আরে আরে, এতটুকুতেই চোখে পানি? ঠিক আছে, সব কান্না জমা রাখলাম। তবে মনে রাখবি, যেদিন হিসাব চাইব, সেদিন কিন্তু কোনো ছাড় পাবা না, মাই পার্সোনাল লেডি।
কথাটা শুনে রাহার ঠোঁটের কোণে লাজুক এক হাসি ফুটে উঠল।অভ্র ধীরে ধীরে তাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দিল। তারপর মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার গভীর দৃষ্টিতে দেখে বলল,
— সব তো ঠিক আছে…
একটু থেমে ভ্রু কুঁচকে বলল,
— কিন্তু একটা জিনিস মিসিং।
রাহা সঙ্গে সঙ্গে আয়নার দিকে তাকাল।
— কী মিসিং?
উত্তর না দিয়ে অভ্র টেবিলের উপর রাখা কালো টিপের পাতাটা তুলে নিল। তারপর অত্যন্ত যত্ন করে রাহার কপালের মাঝখানে ছোট্ট একটা কালো টিপ পরিয়ে দিল।
এরপর শাড়ির আঁচলটা আলতো করে মাথার উপর টেনে দিয়ে কয়েক মুহূর্ত মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল।
তারপর মৃদু হেসে বলল,
— এখন... এখন তুমি একদম নিখুঁত।
রাহার গাল দুটো লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল।
অভ্র স্নেহভরে তার কপালে একটি চুমু এঁকে দিল।
মুহূর্তটা যেন সময়ের বুকেই থমকে রইল।
রাহা ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করে সেই স্পর্শটুকু অনুভব করল। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক সুখের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল। মনে হলো, পৃথিবীর সমস্ত আনন্দ যেন এই ছোট্ট মুহূর্তটার মাঝেই এসে ধরা দিয়েছে।
তারপর অভ্র আলতো করে রাহার কপাল থেকে মুখ সরিয়ে কিছুক্ষণ শুধু তার দিকে তাকিয়ে রইল।
সেই দৃষ্টিতে ছিল মুগ্ধতা, ভালোবাসা আর একরাশ নীরব প্রশান্তি।
রাহা লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলতেই অভ্র মুচকি হেসে বলল,
— এভাবে চোখ নামিয়ে রাখলে হবে? একবার নিজের দিকে তাকিয়ে দেখেছ?
— কী আছে দেখার?
— কী আছে সেটা আমি বলব না। আয়নাটা বলবে।
রাহা মুখ ফুলিয়ে আয়নার দিকে তাকাল। কিন্তু নিজের প্রতিবিম্ব দেখার চেয়ে বেশি অনুভব করছিল পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার উপস্থিতি।
অভ্র ধীরে ধীরে তার কানের পাশে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল,
— আজ যদি প্রথমবার তোমাকে দেখতাম, তাহলে আবারও প্রেমে পড়তাম। একেবারে কেয়ামত লাগছিস রে জান
রাহা এবার সত্যিই লজ্জায় অভ্রের বুকে হালকা একটা চাপড় মারল।
অভ্র হেসে তার হাতটা ধরে ফেলল।
— চল, এবার বের হওয়া যাক।
এরপর সে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল। আর অভ্র কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে নিজের মনে বলল,
— আজকে বোধহয় পুরো সন্ধ্যাটাই ওকে দেখেই কেটে যাবে...।
—————
বিকেলের নরম রোদে কুমিল্লার দুলালপুর যেন অন্য এক রূপে সেজে ওঠে। চারদিকে সবুজে ঘেরা গ্রামীণ পরিবেশ, দূরে বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত, আর মৃদু বাতাসে দুলতে থাকা গাছপালা মনটাকে অদ্ভুত শান্তিতে ভরে দেয়। দাউদকান্দি অঞ্চলের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া গোমতী নদী ও আশপাশের গ্রামীণ প্রকৃতি এই এলাকার সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ে, তখন সোনালি আলো ধানক্ষেত আর গ্রামের পথঘাটে ছড়িয়ে পড়ে। কাঁচা রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে দেখা যায় গ্রামের ছেলেরা মাঠে খেলছে, কৃষকেরা দিনের কাজ শেষে বাড়ি ফিরছে, আর পাখির ঝাঁক নিজেদের নীড়ে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দূরে কোথাও গরুর ঘণ্টার মৃদু শব্দ আর সন্ধ্যার পাখির ডাক মিলেমিশে এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশ সৃষ্টি করে।
নদীর পাড়ে দাঁড়ালে শীতল বাতাস মুখে এসে লাগে। পানির ওপর সূর্যের শেষ আলো চিকচিক করে ওঠে, যেন হাজারো সোনালি কণা ভেসে বেড়াচ্ছে। বিকেলের সেই মুহূর্তে দুলালপুরকে মনে হয় প্রকৃতির আঁকা এক জীবন্ত চিত্রকর্ম—যেখানে ব্যস্ততা নেই, আছে শুধু প্রশান্তি আর মুগ্ধতা।
সন্ধ্যা নামার আগমুহূর্তে আকাশ লালচে-কমলা রঙে রাঙিয়ে ওঠে। সেই দৃশ্য দেখে মনে হয়, দিনের শেষ আলো যেন গ্রামবাংলার বুকজুড়ে ভালোবাসার এক কোমল ছোঁয়া রেখে বিদায় নিচ্ছে। দুলালপুরের বিকেল তাই শুধু ঘুরে দেখার নয়, অনুভব করারও একটি সুন্দর অভিজ্ঞতা।
বিকেলের সোনালি আলো তখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে। কুমিল্লার দুলালপুরের গ্রামীণ সৌন্দর্য যেন আজ আরও বেশি মোহনীয় লাগছে। চারপাশে সবুজ মাঠ, কাঁচা রাস্তা, দূরে সারি সারি গাছ আর মৃদু বাতাসে দুলতে থাকা ধানের শীষ।
রাহা, সাফা, অবন্তীকা, শিফা আর আয়াত সবাই লাল শাড়িতে সেজেছে। খোলা চুলে সাদা গাজরা, দুই হাতে লাল চুড়ি, ঠোঁটে হালকা লাল আভা—তাদের দেখে মনে হচ্ছে যেন গ্রামের বিকেলে নেমে আসা পাঁচজন রূপকথার পরী।
কাঁচা রাস্তা ধরে পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছে সবাই। সামনে ইভান, অভ্র, জারিফ আর জায়ান। তবে তাদের চোখ যে বারবার মেয়েদের দিকেই চলে যাচ্ছে, তা কারও অজানা নয়।
অভ্র এক পলক রাহার দিকে তাকিয়ে যেন চোখ সরাতেই পারছে না। লাল শাড়ির আঁচল বাতাসে উড়ছে, আর সূর্যের শেষ আলো পড়ে তার মুখটাকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে। অভ্র মনে মনে ভাবল,
"এই মেয়েটাকে যত দেখি, ততই যেন নতুন করে মুগ্ধ হই।"
অন্যদিকে জারিফও অবন্তীকার দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে আছে। জায়ানের অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। সাফার হাসিমাখা মুখ দেখে তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি কাজ করছে।
আয়াত আর শিফা এদিক-সেদিক ছুটে বেড়াচ্ছে। কখনো ধানক্ষেতের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে, কখনো আবার সবাইকে ডেকে বলছে,
— "এইদিকে আসো! এখানে আলোটা কত সুন্দর!"
সবাই মিলে নদীর পাড়ে গিয়ে দাঁড়াল। পশ্চিম আকাশ তখন লাল, কমলা আর সোনালি রঙে রঙিন। নদীর পানিতে সেই রঙের প্রতিচ্ছবি পড়ে দৃশ্যটাকে আরও অপূর্ব করে তুলেছে।
হালকা বাতাসে মেয়েদের শাড়ির আঁচল উড়ছে। ছেলেরা একপাশে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখছে। তাদের মনে হচ্ছে, এই মুহূর্তটা যেন সময়ের খাতায় চিরদিনের জন্য আটকে রাখা যায়।
হাসি, খুনসুটি, ছবি তোলা আর গল্পে গল্পে কেটে যেতে লাগল বিকেলের সুন্দর সময়। দুলালপুরের সেই স্নিগ্ধ বিকেল তাদের সবার মনে হয়ে রইল এক টুকরো সুন্দর স্মৃতি হয়ে।
,হাসি-ঠাট্টা আর অসংখ্য ছবি তোলার মাঝে কখন যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এসেছে, কেউ টেরই পায়নি। পশ্চিম আকাশের লাল আভাও ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেছে। চারপাশে সন্ধ্যার নরম অন্ধকার নেমে আসছে, দূরে কোথাও মসজিদ থেকে ভেসে আসছে মাগরিবের আজান।
সবাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাড়ির পথে ফিরল। সারাটা বিকেল যেন চোখের পলকেই শেষ হয়ে গেছে।
বাড়িতে ফিরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতেই অভ্র, জায়ান আর জারিফের মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল। তাদের আবার ঢাকায় ফিরতে হবে। কাজের চাপ আর দায়িত্ব কাউকে তো আর ছুটি দেয় না।
নিচে নামতেই পরিবেশটা কেমন যেন ভারী হয়ে গেল। কিছুক্ষণ আগেও যেখানে হাসির রোল পড়েছিল, সেখানে এখন নীরবতা।
শিফা নিচের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আয়াতের মনটাও খারাপ হয়ে গেছে। সাফা আর অবন্তীকার মুখেও হাসির দেখা নেই।
রাহা চুপচাপ দাঁড়িয়ে অভ্রের দিকে তাকিয়ে আছে। কেন জানি বুকের ভেতরটা খালি খালি লাগছে তার।
সবার কাছ থেকে শেষবারের মতো বিদায় নিয়ে তারা সেখান থেকে রওনা দিলো—ঢাকার উদ্দেশে।….
—————
ভাইয়ারা তো চলেই গেলো। কাল সবাই রেডি থাকবি—আমাদের ভার্সিটিতে নবীন বরণ অনুষ্ঠান হবে।
“নবীন বরণ” কথাটা শুনতেই সবার মুখে যেন একরকম খুশির ঝিলিক ছড়িয়ে পড়ল।
রাহা হালকা হেসে বলল,
“ওহ! কাল তো মজা হবে তাহলে!
সাফা উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠে বলল,
“হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি তো এখন থেকেই প্ল্যান করা শুরু করে দিচ্ছি!” কালকে কি পড়ব
অবন্তীকার চোখেও আনন্দের ঝিলিক।
সবমিলিয়ে তাদের দিনটা ভালই কেটেছে আজকে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………