ইউসুফ পাগলের মতো ছুটতে ছুটতে আলাউদ্দিন সওদাগরের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। ততক্ষণে চারপাশ মানুষের ভিড়ে গিজগিজ করছে। ঝিলপাড় বস্তি ও তার আশেপাশের শয়ে শয়ে মানুষ নিজেদের ফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখে সওদাগরের আলিশান বাড়ির প্রধান ফটকের সামনে এসে জড়ো হয়েছে। হাতেগোনা কয়েকজন বাদে বাকিরা যে স্রেফ তামাশা দেখতে এসেছে তা আর আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখে না।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে এলাকার পুলিশ প্রশাসনও বাধ্য হয়ে ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থলে হাজির হয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে কাজলীর লাইভ ভিডিওটি পুরো দেশে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দিয়েছে। এই মুহূর্তে পুলিশ যদি এখানে এসে হস্তক্ষেপ না করে, তবে তাদের ডিপার্টমেন্টেরই বদনাম হবে। একটা অসহায় মেয়ে খোদ অপরাধীর ডেরায় আটকা পড়ে ফেসবুক লাইভে সাহায্য চাইছে, আর পুলিশ সেখানে যায়নি এমন খবর চাউর হলে আর রক্ষা নেই!
লাইভ স্ক্রিনে কাজলীর ভিউয়ার্সের সংখ্যা তখন লাখ লাখ ছাড়িয়ে হু হু করে বাড়ছে। কপালে জমে থাকা ঘামে চোখের কাজল লেপ্টে একাকার হয়ে গেছে। গালটা চড়ের আঘাতে লাল হয়ে বেশ ফুলে উঠেছে, মাথার চুলগুলো এলোমেলো। ওমন বিধ্বস্ত চেহারার ভেতরেও কাজলীর চোখ দুটো দিয়ে আগুন ঝরছিল। ও ভাঙা গলায় যতটা সম্ভব ইস্পাতকঠিন সুরে লাইভ দর্শকদের সামনে এক এক করে বর্ণনা করছিল, সওদাগরের বন্ধ ড্রয়িং রুমে তার সাথে ঠিক কী কী হয়েছে। সবচেয়ে বড় বোমাটা ফাটায় যখন বলে, পুলিশ প্রশাসন যাকে পলাতক বলে গুজব ছড়াচ্ছে সেই মূল অপরাধী আশিক আসলে কোথাও পালায়নি; সে আলাউদ্দিন সওদাগরের নেশাখোর ছেলের আশ্রয়ে এই বাড়ির ভেতরেই বহাল তবিয়তে লুকিয়ে আছে! আশিকের কথাতেই চক্রান্ত করে সালিশির নামে, সমাধানের নামে ডেকে এনে তাকে আটকে রেখে হেনস্তা করা হচ্ছে, মারধর করা হচ্ছে। হয়তো মেরেও ফেলবে।
দুই দিনও হয়নি কাজলীর আগের পোস্টটি ভাইরাল হয়েছে। ফেসবুকের সবচেয়ে হট টপিক ছিল ও। তার ওপর আজ এমন একটা সরাসরি লাইভ বিস্ফোরণ পুরো পরিস্থিতিকে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যায়। দেখতে দেখতে চোখের পলকে সেখানে মিডিয়ার লোক, রিপোর্টাররা এসে ভিড় জমাতে শুরু করে।
জনতার মধ্য থেকে বেশ কয়েকজন সাহসী ছেলে পুলিশদের তোয়াক্কা না করে সরাসরি সওদাগরের বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ল কাজলীকে মুক্ত করতে। তার ঠিক কিছুক্ষণের মধ্যেই সওদাগরের সিংহদুয়ার গলে বেরিয়ে এলো বিধ্বস্ত কাজলী। ওর এক হাতে শক্ত করে ধরা ছিল যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাওয়া জোহরা বেগমের হাত।
কাজলীকে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফেরত আসা ক্লান্ত যোদ্ধার মতো দেখাচ্ছিল। ওর চেহারায় ভয় নেই। বরং ওকে বড্ড আত্মবিশ্বাসী দেখাচ্ছে। ক্ষমতার অন্ধকার কূপে এসেও সে হার মানেনি, অন্যায়ের সামনে মাথা নিচু করেনি। নিজের বুদ্ধি আর সাহসের জোরে ঠিক বুক ফুলিয়ে নরক থেকে বেরিয়ে এসেছে এবং গোটা সমাজ ও জনতার সম্মুখে তথাকথিত বড়লোকদের কুৎসিত,কদর্য মুখোশটা এক ঝটকায় টেনে ছিঁড়ে ফেলেছে।
আলাউদ্দিন সওদাগর আর তার দলবলের যতই ক্ষমতার দাপট থাকুক না কেন, এই মুহূর্তে ওরা কোনোভাবেই নিজেদের গণরোষ থেকে রক্ষা করতে পারবে না। লাখ লাখ মানুষের ক্ষুব্ধ নজর এখন ওদের ওপর। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশকে ঠিকই ওদের প্রিজন ভ্যানে তুলে থানায় নিয়ে যেতে হবে। তবে কোনো আইনি শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়; বরং নিরাপত্তা দিতেই ওদের নিয়ে যাওয়া হবে।
তার কারণ শুধু আলাউদ্দিনের টাকা নয়৷ উনার আপন মামার শালা হচ্ছে এই শহরের মেয়র! এছাড়াও এলাকার কমিশনার উনার ল্যাংটা কালের বন্ধু। এমন প্রভাবশালী ও ক্ষমতার খুঁটি থাকা মানুষদের কি আর এই দেশে সহজে আইনি শাস্তি দেওয়া যায়?
কাজলী অবশ্য এসব নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবছে না। বর্বরগুলোকে গোটা দেশের সামনে নাকানিচুবানি খাওয়াতে পেরেছে এতেই ও খুশি।
কাজলী সদর দরজা পার হয়ে বাইরে আসতেই বেশ কয়েকটা সংবাদ মাধ্যমের টিভি ক্যামেরা, উৎসুক জনতার শত শত মোবাইল ফোন একযোগে ঘুরে গেল ওর দিকে। সাহেব চাচা তড়িঘড়ি করে একটা খালি রিকশা ডেকে আনলেন।
কাজলী রিকশায় ওঠার ঠিক আগে, শেষবারের মতো মানুষের সমুদ্রটার দিকে তাকাল। তখনই চোখটা গিয়ে পড়ল ভিড়ের সামনে পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ইউসুফের ওপর। ওর চোখ দুটো লাল। কাজলীর ভ্রু দুট ধনুকের মতো বাঁকা হয়ে গেল।
যদি এটা কোনো সিনেমার দৃশ্য হতো, কিংবা কোনো কাল্পনিক রূপকথার গল্প হতো, তবে হয়তো এতগুলো বছর ধরে ভালোবেসে আসা মেয়েটার এমন চরম বিপদের কথা শুনে ইউসুফ সব জড়তা ভেঙে দানবের মতো ছুটে যেত সওদাগরের বাড়ির ভেতর। পিটিয়ে তক্তা বানিয়ে দিত আলাউদ্দিন, রুমেল আর আশিকদের। নিজের বুকে আগলে বীরের মতো উদ্ধার করে নিয়ে আসত কাজলীকে। কিন্তু আফসোস এটা বাস্তব জগৎ, কোনো সাজানো গল্প নয়। আর বাস্তব জীবনের ইউসুফটা আসলে এক নম্বরের মেরুদণ্ডহীন টিউবলাইট! যার জ্বলতে বড্ড দেরি হয়। কিংবা আলোই ছড়াতে জানে না।
কাজলী তাচ্ছিল্যের সাথে ইউসুফের দিক থেকে নিজের চোখটা ফিরিয়ে নিল। ইউসুফ তার কাছে আর পাঁচটা সাধারণ, ঠুঁটো জগন্নাথ দর্শকের মতোই। এরা দূর থেকে অন্যায় হতে দেখে, সামনে এসে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর ন্যূনতম পুরুষালী ক্ষমতা রাখে না।
ঘরে ফিরেই কাজলী ধরাধরি করে জোহরা বেগমকে বিছানায় শুইয়ে দিল। যন্ত্রণায় জোহরা বিছানায় ছটফট করছেন। রক্তে ভারী হয়ে ওঠা প্যাড উপচে উনার গায়ের মেক্সি পর্যন্ত ভিজে লাল হয়ে গেছে। কাজলী দ্রুত জামাকাপড় বদলে দিল। নতুন আরেকটা প্যাড পরিয়ে সামান্য কিছু শুকনো খাবার মুখে তুলে দিয়ে ব্যথানাশক ট্যাবলেটটা খাইয়ে দিল।
জোহরার একটু স্বস্তি মিলতেই কাজলী মায়ের রক্তে ভেজা পেটিকোট, মেক্সি ধুতে নিয়ে গেল। কাপড় ধোয়া শেষে নিজেও গোসল সেরে নিল। গায়ের জামাকাপড় সরাতেই নজরে এলো মায়ের মারের কালশিটে দাগগুলো। পানি পড়তেই কাটাছেঁড়া জায়গাগুলো যন্ত্রণায় জ্বলে উঠল। ক্ষতগুলোর দ্রুত চিকিৎসা দরকার, নয়তো ইনফেকশন হয়ে যেতে পারে। অবশ্য ডাক্তারের কাছে যাওয়ার মতো টাকা বা সময় কোনোটাই এখন ওর কাছে নেই। তবে ঘরে এক শিশি কালোজিরের তেল আছে। গ্রামীণ টোটকা হলেও কালোজিরে তেল যেকোনো কাটাছেঁড়া ক্ষত শুকোতে দারুণ উপকারে আসে; সাধারণ অ্যান্টিসেপটিকের মতোই চমৎকার কাজ করে।
কাজলী ঘরের ভাঙা আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে খণ্ড খণ্ড তুলো ভিজিয়ে ক্ষতস্থানগুলোতে কালোজিরের তেল লাগিয়ে নিল। এরপর রান্নাঘরে গিয়ে আলু কাটতে শুরু করল। দুপুরের জন্য আলু ভাজি আর ভাতই হবে তিনজনের আহার। খাওয়া সেরেই ওকে আবার ছুটতে হবে স্টুডেন্ট পড়াতে।
জোহরার ঘর আর রান্নাঘরটা একদম পাশাপাশি, দেয়াল ঘেঁষা। জোহর রান্নাঘরের দিকে মুখ করে বললেন, “তুই মালিকের বাড়িত যে কামডা করছস, ঠিক করোস নাই কাজলী।”
হুইলচেয়ারে বসে থাকা মারিয়ামও মায়ের কথায় সুর মিলিয়ে বলল, “আম্মা ঠিকই কইছে। তুই ফেসবুক লাইভে গিয়া ওদের যেমনে বেইজ্জত করলি, এখন ওরা আরও বেশি ক্ষ্যাপব। মালিকসহ তোর ওপর, আমরার ওপর প্রতিশোধ নিতে নামব।”
রান্নাঘর থেকে কাজলী খেঁকিয়ে উঠে বলল,, “মালিক তো আগে থেকেই ক্ষ্যাপা ছিল আপা! কাশেম মিয়ার ক্ষ্যাপা মানেই তো সওদাগরের ক্ষ্যাপা। ওরা একজোট। এইজন্যেই তো ওরা বিচারের নামে, সমাধানের নামে আমারে শাস্তি দিতে বসছিল। সবাই মিলে আমারেই ছোট করতেছিল, আমার চরিত্রের ওপর দোষ চাপাইতেছিল। মারধর করতেছিল৷ আমি তখন লাইভে না গিয়া আর কী করতে পারতাম? কে বাঁচাতে আসত? তোরা কি চাস, সকালে আমার লাশটাও ঘরের আড়ার সাথে ঝুলে থাকুক? তবেই তোরা খুশি হইতি?”
মারিয়াম চুপসে গেল। এই প্রসঙ্গে আর কথা বলার মতো ভাষা খুঁজে পেল না৷ ভয়ে ওর বুকের ভেতরটা ঢিপঢিপ করছে। ভয়ার্ত কণ্ঠে জোহরাকে বলল, “আম্মা, ভাইয়ারে একটা কল দেই? আমার অনেক ডর লাগতাছে।”
“কল দিবি মানে? তুই কল দেস দেখেই তো কুলাঙ্গারটা নিজের ফোন নাম্বার চেঞ্জ করে ফেলছে! আর তোর কি মনে হয়, তুই কল করলেই ওই নিমকহারাম আইসা তোর ডর কমাইবো?”
কাজলীর রুক্ষ জবাবে মারিয়াম এবারও চুপসে গেল। একবার নিজের বরের কথা ভাবল, কিন্তু তাকেও একটা কল দেওয়ার সাহস মনে মনে সঞ্চয় করতে পারল না।
কাজলী দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সত্যি, ওদের কপালে যত সব কাপুরুষ এসে জুটেছে! এই যে ওদের জন্মদাতা বাপটা, সে-ও তো জুয়ার বোর্ডে টাকা হারতে হারতে একসময় হতাশা আর ঋণের দায়ে বিষ খেয়ে ধুপ করে মরে গেল। মরার আগে একটিবারের জন্যও নিজের স্ত্রী, ছেলে মেয়ের কথা ভাবল না।
কাজলী আলু কাটতে কাটতেই বলল, “বাড়ি থেকে বাইর হবি না আপা। বাইরে থেকে কেউ এসে ডাকলেও দরজা খুলবি না। একটু পরই মিডিয়ার লোক এসে তোরে বিরক্ত করব। মুখের সামনে মাইক ধরে অনেক ফালতু প্রশ্ন করব। উত্তর না দিয়েও পারবি না৷ এর থেকে দরজা লাগায়া বসে থাকবি।”
মারিয়াম হুইলচেয়ারের চাকাটা একটু ঘুরিয়ে মুখ বেঁকিয়ে বলল, “সারাদিন ঘরের ভিতর বন্দী? জীবনেও পারতাম না।”
কাজলী কপাল কুঁচকে ঘাড় ঘুরিয়ে কড়া গলায় বলল, ‘আমি কইছি তুই ঘরে থাকবি মানে থাকবি!”
“তোর কথায় দুনিয়ার সব হইব নাকি?”
“হ, আমার কথাতেই হইব! আমি কষ্ট করে বাইরে খাটতাছি, তোদের মুখে দুবেলা অন্ন জোগাইতেছি, তোদের ভালোমন্দের দেখভাল করতেছি তাই তোদের আমার কথা শুনেই চলতে হইব।”
কথাটা তীরের মতো গিয়ে বিধল মারিয়ামের গায়ে। ও অপমানে, ক্ষোভে চেঁচিয়ে উঠল, “আম্মা! দেখছো তোমার ছেড়ি কি কয়? আমি জানতাম, ও একদিন না একদিন ঠিকই আমাদের এই খাওয়ানোর খোঁটা দিব!’
“খোঁটা না, এটাই রিয়েলিটি। তুই সবসময় আম্মার অন্যায়ের সাথে তাল দেস। নিজে তো কিছু করিস না, উল্টো যখন যা ইচ্ছা তাই বুঝে না বুঝে আমারে শুনাস। আমি কি তোদের কিনা বান্দি নাকি? তোদের জন্য বাইরে দিন-রাত খাটব, আবার ঘরে আইসা তোদের গা জ্বালা, উল্টাপাল্টা কথাও মুখ বুজে সইব?”
মারিয়াম এবার রাগে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “তোর বিবেক-বুদ্ধি কম বইলাই তো তোরে সবসময় সঠিক কথা শুনাইতে হয়! আর হাচা কথা তিতাই লাগে।”
“তুই বিবেক বুদ্ধির ঢেঁকি? পঙ্গু হইতেই যে জামাই আরেকটা বিয়া কইরা তোরে মায়ের কাছে ফালায়া গেছে আরও পাঁচ বছর আগে, সেই জামাই একবার দেখতে আসতেই রাতারাতি পেট বাধায়া ফেলছস, শুইয়া পড়ছস ওর লগে, তখন তোর বিবেক কই আছিলো?”
মারিয়ামের চোখ দুটো মুহূর্তের মধ্যে নোনা জলে ভিজে উঠল। ও জোহরা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি পঙ্গু হইয়া সবার বিপদ হয়ে গেলাম, আম্মা। আমারে বিষ খাওয়ায়া মাইরা ফেলো না কেন? তোমার ছেড়িও এখন আমারে বড় বোঝা মনে করে।”
“পঙ্গু হবার আগে কী এমন কাজে লাগছস তুই? আইলসার খনি ছিলি। খুঁইড়া ছিলি। কিচ্ছু করস নাই!”
মারিয়াম ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে।
কাজলী ফুঁসে উঠেছে, “এই কাজলীরে মাত্র আট বছর বয়সে উপার্জনে নামায়া তোরা মা-মেয়ে একসঙ্গে আয়েশ করছস। আলাউদ্দিনের বুড়ো মায়ের ফরমায়েশ খাটার বান্দি বানায়া আমারে ফেলে রাখছিলি ওই শয়তানদের বাড়ি। ঈদের দিনও আমারে নিজেদের কাছে আনোস নাই। একটু জুড়াতে বাড়ি আসলে পিটিয়ে তোর মা আবার আমারে ওই বাড়ি দিয়ে আসত! তুই পঙ্গু অবস্থায়ই ঠিক আছস। বসে বসে খাওয়ার একটা জুতসই কারণ আছে এখন তোর কাছে। তোর পা নাই, আল্লাহ তোরে অচল কইরা দিছে!’”
কথাটা বলেই কাজলী হাতের ধারালো বঁটিটা সজোরে মেঝের ওপর ছুঁড়ে ফেলে দিল। ও আর রাঁধবে না এদের জন্য। এত বড় একটা ঝড় গেল অথচ জন্মদাত্রী মা, আপন বোন একটাবারও জানতে চাইল না ওর কেমন লাগছে! একটিবার বুকে টেনে নিয়ে শান্ত করল না, দুটো সান্ত্বনার মিষ্টি কথাও বলল না। উল্টো শুরু করেছে নিজেদের স্বার্থের জন্য নির্লজ্জ দোষাদোষি!
কাজলী নিজের ভেতরের অবদমিত রাগটা কিছুতেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। ওর শৈশব অন্য দশটা বাচ্চার মতো পুতুলখেলা বা ধুলোবালির আনন্দে কাটেনি। ওর সোনালী দিনগুলো কেটেছে একটা খিটখিটে, বয়স্ক মানুষের রাগ, চিৎকার আর চেঁচামেচি সহ্য করে৷ জোহরা ভালো কাজ বলতে কেবল একটাই করেছিলেন, শত অভাবের মাঝেও কাজলীর পড়াশোনাটা কোনোদিন বন্ধ করতে দেননি। উনার একটা মাত্র সুবুদ্ধির জোরেই কাজলী সহ অকৃতজ্ঞ দুটো মানুষ দুবেলা পেট ভরে ভাত খেতে পারছে।
কাজলী বুকভরা বিতৃষ্ণা নিয়ে আলনা থেকে কালো বোরকা আর নিকাবটা টেনে নিল। এখন রাস্তাঘাটে মুখ দেখিয়ে চলা আর নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারা একই কথা।
ওপাশে বিছানায় বসে মারিয়াম তখন জোহরা বেগমের গলা জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল আর বলছিল, “উনি আমার বিয়া করা স্বামী, আম্মা। আমারে কাছে চাইছে, এইডা তো তার আইনি আর শরীয়তি হক্ব। আমি নিজের সোয়ামির হক্ব নষ্ট করতাম কেমনে কও? তোমার ছেঁড়ি সবসময় আমার পেটের বাচ্চাটা নিয়ে খোঁটা দেয়!”
কাজলী নিকাবের বাঁধনটা শক্ত করতে করতে দরজা থেকে মুখ বাড়িয়ে বলল, “তোর বাচ্চাটা নিয়া আমি একটা কথাও বলি নাই আপা। আমি বলি তোর মেরুদণ্ডহীন, বেলাজা স্বভাবটা নিয়া! নিজের আত্মসম্মানের পাছায় লাথি মাইরা যে কাপুরুষটা তোরে পঙ্গু অবস্থায় পাঁচ বছর খোঁজ না নিয়া ফেলে রাখল, সে একদিন আইসা মিষ্টি কথা কইল আর তুই অমনে তার সাথে শুয়ে পড়লি৷ আমি খোঁটা দেই তোর ওই নির্লজ্জতা নিয়া! দুনিয়ায় খালি ওরই হক্ব আছে, তোর নিজের কোনো হক্ব নাই? তোরে অন্ন-বস্ত্র দিয়া পালা কি ওর ফরজ কাজ ছিল না? এই বিপদে তোর দেখাশোনা করা কি ওর দায়িত্ব ছিল না? তাইলে তুই কেন ওর হকের কথা ভাইবা গল্লায় যাবি? আমি যদি তোর জায়গায় হইতাম, তবে ওইদিন ওরে আগে জুতা দিয়া পিটাইতাম। ভাগ্যিস আমি ওইদিন বাসায় ছিলাম না, থাকলে ওরে পিটায়া বস্তি ছাড়া করতাম!”
বলতে বলতে কাজলী আর এক সেকেন্ডও ঘরের ভেতর দাঁড়াল না। ধড়াম করে পেছনের দরজাটা টেনে গটগট পায়ে বস্তির গলি পেরিয়ে মেইন রোডে উঠে গেল। সামনের দরজার ওপাশে পুলিশ আর কিছু লোক দাঁড়িয়ে ছিল বলে পেছনের দরজা দিয়ে বেরোতে হলো। ক্ষুধায় পেট জ্বলছে। একটা দোকান থেকে দশ টাকা দিয়ে দুটো আলুভর্তি সিঙ্গারা কিনে গিলে নিল। মানুষ বিকালের নাস্তায় বা শখের বশে সিঙ্গারা, সমুচা, চটপটি আর ঝালমুড়ি খায়; আর সে..দুর্ভাগা এতিম নিজের দুপুরের মূল খাবার হিসেবে, স্রেফ পেটের রাক্ষুসে ক্ষুধা মেটাতে বছরের পর বছর ধরে এসব সস্তা ভাজাপোড়া খেয়েই জীবন পার করে দিচ্ছে।
কোনো রিকশা বা বাসের তোয়াক্কা না করে পায়ে হেঁটে হেঁটেই কলেজ থেকে স্টুডেন্টদের পড়াতে যায়। প্রতিদিন দুপুর দুটো থেকে শুরু করে টানা রাত আটটা অবধি চার-চারটা স্টুডেন্ট পড়াতে হয় ওকে। রাত নয়টায় বাড়ি ফিরে যদি পাতিলে খাবার পায় তবে মুখে দেয়, আর যদি না পায় তবে এক গ্লাস পানি খেয়েই নিজের ভাঙা ফোনটা হাতে নিয়ে ফেসবুকে ঢুকে দেখে তার অনলাইন বিজনেস পেজে কী কী নতুন অর্ডার এসেছে।
ওদের সংসারটা শুধু টিউশনির ওপর চলে না। মারিয়ামের একটা ভালো গুণ আছে, ওর হাতের সুতোর কাজ এককথায় চোখ ধাঁধানো আর চমৎকার। আর কাজলী নিজে দর্জির সেলাই কাজে বড্ড দক্ষ। বিভিন্ন কূর্তি, ব্লাউজ, থ্রি-পিস আর নকশী রুমালে মারিয়াম সারাদিন বসে বসে সুতার কাজ তোলে, আর কাজলী প্রতি রাতে টিউশনি থেকে ক্লান্ত হয়ে ফিরে অন্তত একটা অর্ডারের কাপড় কাটিং ও সেলাই করার আপ্রাণ চেষ্টা করে। ওদের অনলাইন পেজটা ইদানীং বেশ ভালোই সাড়া পাচ্ছিল। কয়েকদিন আগে পেজের লাইক ছিল পনেরো হাজার। রিসেন্ট হ্যারাসমেন্ট ইস্যুতে পেজের ফলোয়ার আর লাইক এক লাফে পঞ্চাশ হাজার ছাড়িয়ে গেছে! কাজলীর উদ্দেশ্য লাইক বা ফলোয়ার বাড়ানো ছিল না। ও নিজের সম্মান বাঁচাতে সব করেছে।
কিন্তু সমাজের হিংসুটে মানুষগুলো আড়ালে আবডালে রসিয়ে রসিয়ে গসিপ করছে যে কাজলী নাকি লাইমলাইটে আসার জন্য, নিজের পেজের প্রমোশন করার জন্যই এত বড় নাটক সাজিয়েছে! বিশেষ করে ওর কলেজেরই কিছু ক্লাসমেট মেয়ে এই নোংরা রটনাটা সবচেয়ে বেশি ছড়াচ্ছে। ছড়াবেই বা না কেন? মাথা উঁচু করে লড়াই করা স্বাধীনচেতা কাজলী তো ওদের চোখে অনেক আগে থেকেই একটা বিষফোঁড়া! কেউ কেউ শাহবাগী বলেও নিজের মনের ক্ষোভ মেটায়।
সওদাগরের বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় দেখল, সেখানে এখনও উৎসুক মানুষের জটলা। বাড়ি একদম ফাঁকা। পুলিশ আসার আগেই রুমেল আর আশিক পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে গেছে। বাকিদের লৌকিকতার খাতিরে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কাজলী দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আগামী দিনগুলো যে তার জন্য কতটা ভয়ঙ্কর আর অন্ধকার হতে চলেছে, তা নিয়ে মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই ওর।
·
·
·
চলবে……………………………………………………