সন্ধ্যার নরম আলো তখন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। আকাশজুড়ে নীলচে অন্ধকার নেমে এসেছে। নদীর পাড় থেকে ফিরে জবা আর ইরফান যখন বাড়িতে ঢুকল, তখন পুরো বাড়ি যেন কেঁপে উঠছে ছোট্ট একটা কণ্ঠের চিৎকারে। জারা কান্না জুড়ে দিয়েছে।
ওর চোখ মুখ লাল, গলা ভাঙা। যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটে গেছে। জবা জিজ্ঞেস করল,
'কী হয়েছে মা?'
হেঁচকি তুলতে তুলতে জারা বলল,
'আমার চেরিকে খুঁজে পাচ্ছি না! আমি আমার চেরিকে চাই!'
চেরি ওর প্রিয় সাদা বিড়ালটা। যাকে খুঁজে পাচ্ছে না। তা নিয়ে এত হট্টগোল।
জবা কিঞ্চিৎ রেগে বলল,
'আরে এত চিল্লাচ্ছো কেন মা? হয়তো আসে পাশেই কোথাও আছে। পেয়ে যাবে।'
কিন্তু জারা থামল না। বরং আরও জোরে কাঁদতে লাগল।
'না! আমার চেরি হারিয়ে গেছে! এনে দাও!'
শেষমেশ বিরক্ত হয়ে জবা একটু জোরেই ধমক দিল।
‘চুপ করো!’
মুহূর্তেই কান্নার শব্দ থেমে গেল। কিন্তু সেই ছোট্ট মুখটা কেমন ভেঙে পড়ল অভিমানে। ঠোঁট কেঁপে উঠল। বড় বড় চোখ দুটো জলে ভরে গেল। তারপর হেঁচকি তুলে আবার কাঁদতে শুরু করল ও।
দৃশ্যটা দেখে ইরফানের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। মেয়ের কান্না সইতে না পেরে সে তৎক্ষণাৎ বলল,
'একটু বুঝিয়ে বলতে পারো না, জবা? ও তো বাচ্চা।'
"জবা" শব্দটা শুনেই জবা বুঝল ইরফান রাগ করেছে। কারণ রাগ না করলে সে কখনো ওকে জবা বলে ডাকে না। সবসময় জান ডাকে।
জবা মৃদু হেসে বলল,
'মেয়েকে আল্হাদ দিয়ে দিয়ে তো মাথায় তুলে ফেলছো। এরপর বেশি জেদি হলে কী করবে?'
'ওর জেদ পূরন করব। আমার মেয়ে যাই জেদ করবে তাই পূরণ করব।'
জবা ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
'তা তো করছোই। গত মাসে তোমার মেয়ে বলল সে শকুন পালতে চায়। তুমি তাকে একটা শকুন এনে দিলে৷ বাগানে যে বড়ো খাঁচাটায় শকুনটা থাকে। আমার সেখানে গেলেই ভয় হয়৷ মনে হয় কবে যেন ও ব্যাটা আমাকে ছিঁড়ে খায়।
ইরফান হেসে ফেলল। জবা থামল না। বলল,
'কিছুমাস আগে বলল, হরিণ পালতে চায়। তুমি হরিণের ঘর বানিয়ে দুটো হরিণ কিনে আনলে। দুনিয়ায় যত প্রাণী আছে সব তোমার মেয়ে পালতে চায়৷ কী নেই এ বাড়িতে? আটটা খরগোশ, চারটা কুকুর, ছয়টা বিড়াল, দুটো হরিণ, এক গাদা কবুতর, বিভিন্ন জাতের পাখি, দুটো ময়ূর৷ এটাকে বাড়ি না বলে তোমরা বাপ মেয়ে চিড়িয়াখানা ঘোষণা দিয়ে দাও। এমনিও এখানে মানুষের চেয়ে পশুপাখি বেশি।'
পাশ থেকে কাজের মেয়ে টিকলি বলল,
'এইডা কতা ঠিক কইছেন আফা। আমারও ডর লাগে আপনাগো বাড়ি থাকতে। এমনিতেই ভূতের বাড়ির মতো বড়ো বাড়ি আপনাদের৷ এক মাথায় থাকলে আরেক মাথার লোক মরে পড়ে থাকলেও বোঝা যায় না। তার উপর ভাইজান কতডি কুত্তা বিলাই, জীব জন্তু ঘরে পোষে৷ এগুলোর গন্ধে আমি আপনাদের দক্ষিণ পাশে যাই না। গেলেই বমি আইয়া পড়ে?'
পাশ থেকে রুমা বলল,
'চুপ থাক ছেড়ি। গন্ধ কোথায় পাস তুই? ঐ গুলা দেখা শোনার জন্য, ওদের পরিষ্কার করার জন্য স্যার তিনজন দক্ষ লোক রাখছে৷ ওদের ঘর তোর রুমের চেয়ে বেশি পরিষ্কার।'
'আপনে আমার রুম দেখছেন কেমন সুবাঁসনা আহে রুম থেকে৷'
রুমা বলল,
'দেখেছি। সেদিন তোর রুমে গিয়ে আমার পেটে পাক দিয়েছে।'
'তো পাক দিলে পায়খানায় যান। আমার রুমে গেছিলেন কেন?'
'তোর রুমের চেয়ে বাথরুম বেশি পরিষ্কার।'
জবা দুজনকে ধমক দিয়ও বলল,
'আহ। তোমরা চুপ করো। তোমাদের দুজনার মধ্যে কেন যে দা কুমরার সম্পর্ক আল্লাহ জানেন। যাও যে যার কাজ করো।'
রুমা আর টিকলি দুজন দুজনকে মুখ ভেংচি দিয়ে দুদিকে চলে গেল। ইরফান জারাকে বলল,
'মাম্মা চেরিকে লাস্ট কখন দেখেছিলে তুমি?'
'বিকালে আমি ওকে দুধ দিয়েছিলাম। তারপর পাশের বাড়ির মিকি আসল। চেরি ওর সাথে দৌড়ে গেল৷ এখন মিকি ওদের বাড়ি আছে, কিন্তু চেরিকে দেখছি না।'
'আচ্ছা মা, আমি খুঁজে আনছি তোমার চেরিকে।'
ইরফান হাতে টর্চ নিয়ে বের হলো। জবা আর কিছু বলল না। এই বাবা মেয়ের পাগলামিতে বেশ বিরক্ত ও। যা খুশি করুক গিয়ে দুজন।
অনেক খোঁজাখুঁজি করেও চেরিকে সেদিন রাতে পাওয়া গেল না। তারপরও অনেক দিন চেরিকে পাওয়া গেল না। জারা চেরির কারণে অনেক কান্না করত। খেতে চাইতো না। ফলে জবাও বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ল। ইরফান লোক লাগিয়ে চেরির খোঁজ করাচ্ছে।
—————
চেরি নিজে নিজেই বাড়ি ফিরল এক মাস তিন দিন পর। একা না, পেটে বাচ্চা নিয়ে। পেট মোটা চেরিকে দেখে জারার প্রথম প্রশ্ন ছিল,
'এই চেরি কোথায় ছিলি? নিশ্চয়ই পথে ঘাটে বাজে খাবার খেয়েছিস। সে কারনেই পেট মোটা হয়েছে।'
জবা কি বলবে ভেবে পেল না। চেরি ফেরায় জারা খুশি হয়েছে বলে ইরফানও খুশি। তবে এখন চেরিকে নিয়ে জবা আলাদা চিন্তায় পড়েছে। এমনি ওদের বাড়ি এত বিড়াল। তার উপর চেরির পেট দেখে মনে হচ্ছে চার পাঁচটা বাঁচ্চা হবে। এত বিড়াল ঘরে পালবে কি করে? তাছাড়া বিড়ালের বাচ্চা ছোটো থাকতে খুব জ্বালায়।
টিকলি জবাকে বলল,
'কি ম্যাডাম বলে ছিলাম না এ বেডি লা* ঙ্গের লগে গেছে। এখন দেখছেন লা* ঙ্গে দিছে হেতেরে পেট বাজাইয়া।'
টিকলির এমন ভয়ংকর কথা শুনে জবা ধমক দিয়ে বলল,
'কতবার বলেছি এমন ভাষায় কথা বলবি না। আর জারার সামনে একদমই না। জারা...!'
জবা কথা সম্পূর্ণ করতে পারল না এর মধ্যে জারা বলল,
'মা লা* ঙ্গ কী?'
জবা ইরফানের দিকে তাকাল। ইরফান রাগী চোখে টিকলির দিকে তাকিয়ে বলল,
'টিকলি ফের যদি কখনো শুনি তুমি এমন ভাষা করো। আমি তোমাকে কাজ থেকে বের করে দিব। এটাই শেষবার বললাম।'
ইরফান জারাকে কোলে নিয়ে বলল,
'মা শোনো এগুলো পচা কথা। তুমি তো ভালো মেয়ে। ভালো মেয়েরা পচা কথা বলে না।'
'টিকলি আপুও কি পচা?'
'ও মহাপচা। পচার উপড়ে পচা। পচায় ফাস্ট ক্লাস ডিগ্রি প্রাপ্ত।'
টিকলি আবারও মুখ ভেংচি কেটে চলে গেল। যাবার সময় বলতে বলতে গেল,
'এ ঘরে কতা কইয়াও শান্তি নেই। আমিও কাম করমু না এহানে। আমি ভাত এক বেলা কম খাইতে পারি, কিন্তু কতা কম কইতে পারমু না। স্বাধীনতা যুদ্ধে লাখ লাখ মানু মরছিইলো তো কথা কওয়ার লইগাই। এত মানুষ মরার পরও যদি কতা না কই তাহলে মুখ দিয়া কী কাম? আমার ঠোঁট কাইট্টা ফালান। নয়তো সুই সুতা দিয়া আমার মুখ সেলাই করে দেন।'
টিকলির কথা শুনি জবা খানিক মুচকি হেসে ইরফানের দিকে তাকিয়ে বলল,
'কথা কিন্তু খারাপ বলেনি ও।'
'ঐ ব্যক্তির কথা বলার স্বাধীনতা কোন কাজের, যে জানেই না কোথায় কোন কথা বলতে হয়!'
ইরফান জারাকে নিয়ে উপরে চলে গেল। জবা বিরস মুখে বলল,
'এই বাড়ি এ বাড়ির মানুষ আর জীব জন্তুদের সামলানো মুখে কথা না।'
—————
জবা ফ্রিজ থেকে মাংস বের করে ওর কুকুর দুটোর কাছে গেল। ও এ কুকুর দুটো জার্মান শেফার্ড জাতের কুকুর। জবাকে এরা প্রচণ্ড ভালোবাসে। জবা ছাড়া কারও কথা শোনে না৷ জবা বললে ওরা যে কাউকে কামড়ে মেরে ফেলতে পারে। ওদের একজনার নাম হিটলার, আরেকজনার নাম চেংগিস খান। জবার বিশেষ পছন্দের এ কুকুর দুটো। ও এদের ছোটোবেলা থেকে এ কারণই বড়ো করেছে যাতে বড়ো হয়ে এরা জবার রক্ষক হতে পারে।
হিটলার আর চেংগিস খানকে খাইয়ে জবা গেল ইরফানের কাছে। গিয়ে দেখল সে জারাকে খাওয়াচ্ছে। জবা কাছে যেতেই ইরফান রুটি ছিড়ে মাংস পুরে জবার মুখের সামনে ধরল। জবা রুটি মুখে নিয়ে ইরফান আর জারা দুজনের কপালেই চুমু খেল। মনে মনে বলল,
'হে করুণাময় এ সুখ না ফুরাক। কারও নজর না লাগুক।'
ইরফান জবার হাত ধরে টেনে পাশে বসিয়ে বলল,
'তুমি জানো তুমি আর জারাই আমার সব।'
জবা হাসল। তৃপ্তির হাসি। এ হাসিতে হাসিতে মহান রবের প্রতি লক্ষ কোটি শুকরিয়া ভরা।
—————
টেবিলের উপর দামি ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসল সিনথিয়া। আজ ইরফান ওকে এটা উপহার দিয়েছে। অবশ্য ও-ও ইরফানকে কম কিছু দেয়নি। আজ সারাদিন খুব কাছে ছিল ইরফানের। লাক্সারি হোটেলের দামি রুমে দুটো শরীরের মিলন হয়েছে আজ। সিনথিয়ার এখনও ঘোর লাগছে। ইরফান এত যত্ন করে ভালোবাসতে পারে ওর জানা ছিল না। ভাবলেই সারা শরীর কেমন অবশ হয়ে আসে ওর।
বাড়ি ফেরার সময় ইরফান ওকে এই ল্যাপটপ দিয়েছিল৷ ল্যাপটপ দেখে সিনথিয়া বলেছিল,
'এত দামি ল্যাপটপ!'
'তুমি খুব দামি। তোমার রূপের কাছে এর দাম কিছু না। আজকের দিনটার মতো সুন্দর একটা দিন দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ সিনথিয়া।'
সিনথিয়া লাজুক হেসে বলেছিল,
'আজকের দিনটা আমার জন্যও খুব বিশেষ ছিল।'
ল্যাপটপটা অনেক দামি। ঘরে কী বলবে ভেবে পাচ্ছিল না সিনথিয়া। কিন্তু ঐ যে বলে না ভালো বুদ্ধির চেয়ে শয়তানি বুদ্ধি খুব দ্রুত মাথায় আসে। তেমনই সিনথিয়া বাড়ি গিয়ে বলল,
'একটা কুইজ প্রতিযোগিতায় নাম দিয়ে ল্যাপটপটা পেয়েছি।'
সিনথিয়ার বোন সীমা বলল,
'এটা তো অনেক দামি ল্যাপটপ বোন।'
সিনথিয়া বেশ স্বাভাবিক ভাবে বলল,
'আপু এটা তো ঐ ব্যান্ডের কপি ল্যাপটপ৷ দেখতে দামি হলেও অত দামি নয়।'
সীমা সহ বাড়ির সবাই ওর কথা সহজেই বিশ্বাস করে নিল। শুধু বিশ্বাস করল না সিনথিয়ার ভাবি ঝুমা৷ ঝুমা ইলেকট্রনিকস এর জিনিস চেনায় পটু। কিন্তু সিনথিয়াকে কিছু বলার ওর সাহস নেই। খুব ভয় পায় এ মেয়েকে ও।
ঝুমার সংসারে বেশ ভালোই প্যাচ লাগায় সিনথিয়া। কখনো শাশুড়ির সাথে কখনো স্বামীর সাথে টুকটাক ঝামেলা লাগানোর চেষ্টা করে থাকে।
এটা যে অরিজিনাল দামি ল্যাপটপ সেটা যদি ও বলে দেয়, দেখা যাবে উল্টো সিনথিয়া ওকেই সবার সামনে খারাপ বানিয়ে দিবে। তাই ভয়ে কিছু বলল না।
কোনো কারণ ছাড়াই ঝুমা ভীষণ ভয় পায় সিনথিয়াকে। ঝুমার ধারণা মানুষকে ফাসানোর অদ্ভুত ক্ষমতা নিয়ে জন্ম ওর। কীভাবে যেন ও মানুষকে নিজের প্রতি প্রভাবিত করে ফেলে।
—————
বছর দুই আগে ঝুমার সাথে সিনথিয়ার বড়ো ভাই সোহানের বিয়ে হয়। সোহান ঝুমাকে প্রথম দেখায়ই পছন্দ করেছিল। ঝুমা দেখতে শ্যামলা, সাধারণ চেহারা, তারপরও ওর মায়া মায়া মুখটা মানুষের মনে আলাদা ভালোবাসার জন্ম দেয়। তেমন ভালোবাসার জন্ম দিয়েছিল সোহানের মনে। তবে সোহান বেশি অভিভূত হয়েছিল ঝুমার ঘন কালো হাটুঁ সমান লম্বা চুল দেখে। ওর চুল এতটাই ঘন যে চুলে খোঁপা করলে মাথার চেয়ে খোঁপা বড়ো চিনায়। এই চুলের প্রেমে পড়েছিল সোহান।
তারপর বাড়ির সবাইকে বলে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায় ঝুমার বাড়ি৷ মোটামুটি সবাই বেশ পছন্দ ঝুমাকে। শুধু ওর গায়ের রঙ চাপা বলে সিনথিয়া ওকে পছন্দ করেনি। তবে সিনথিয়ার কথায় কেউ পাত্তা দেয়নি। কদিন পরই বিয়ে হয় ওদের।
দুজন বেশ ভালোই আছে। ঝুমার শাশুড়ি নীলুফা বেগম খুব ভালো। তবুও মাঝে মাঝে সিনথিয়ার কথায় প্রভাবিত হয়ে ঝুমার সাথে বাজে আচরণ করে ফেলেন। ঝুমা সব বুঝে তাই তার মুখের উপর কখনো কিছু বলে না।
সোহানের বাবা হক সাহেব প্রচণ্ড ভালো মানুষ। সারা জীবন সরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন তিনি। তার বড়ো ছেলে সোহান আর মেয়ে সীমা তার মতোই ভালো মানুষ হয়েছে। ছোটো মেয়ে সিনথিয়াকেও তিনি একই শিক্ষায় বড়ো করেছেন। তবুও মেয়েটা অসৎ সঙ্গে খারাপ হয়ে গেল।
মূলত অসৎ সঙ্গ নয়, ওর লোভ এ জন্য বেশি দায়ী। সিনথিয়া প্রচণ্ড লোভী মেয়ে। ছোটোবেলা থেকেই ওর চাহিদার শেষ ছিল না। তবে ওর বেশির ভাগ চাওয়াই হক সাহেব পূরণ করতে পারতেন না। শিক্ষক মানুষ তিনি। তিন সন্তান আর তারা দুজন। সাথে ছিল তার বাবা মা। তখন সাতজনার সংসার টানতে বেশ হিমসিম খেতে হতো তাকে৷ সংসারের সকল প্রয়োজন মিটিয়ে ছেলেমেয়ের অধিকাংশ আবদারই তিনি পূরণ করতে পারতেন না।
সোহান, সীমা বাবার অবস্থা বুঝলেও সিনথিয়া বুঝতে চাইতো না। কিছু মানুষ হয় না জন্মগত স্বার্থপর। সিনথিয়া হয়তো তেমন। সিনথিয়া একটা বিখ্যাত কথা খুব মানে, গরীব হয়ে জন্মানোটা তোমার হাতে ছিল না, কিন্তু গরীব হয়ে মরাটা তোমার হাতে। আর ও গরীব হয়ে মরতে চায় না। জীবনে ধনীদের মতো সকল সুখ আরাম আয়েশ ওর চাই। চাই মানে চাই। সে জন্য ও যা খুশি করতে পারে।
ইরফানের সাথে সাথে সিনথিয়া নিহাদকেও নিজের জালে ফেলার চেষ্টা করছে। কিন্তু নিহাদ ওর স্ত্রী কথাকে প্রচণ্ড ভালোবাসে। খুব বিশ্বস্ত নিহাদ৷ ওকে বাগে আনা এত সহজ হবে না।
নিহাদও ইরফান চৌধুরীর মতোই অতি ধনী। সিনথিয়া উপরে ওঠার সিড়ি হিসাবে অনেক অপশন হাতে রাখতে চায়। কোনো না কোনো অপশন তো কাজে আসবেই৷ ইরফানের সাথে চুটিয়ে প্রেম করছে।
নিহাদকে হাতে অলটারনেটিভ হিসাবে রাখতে চায়। যদি ইরফান কোনোভাবে হাত থেকে ছুটে যায় তবে নিহাদই ওর আয়েশী জীবন কাটানোর মাধ্যম হবে।
নিহাদের স্ত্রী কথা ওরই ক্লাসমেইট। সিনথিয়া ভেবে পায় না নিহাদের মতো এমন ছেলে কথাকে কীভাবে এত ভালোবাসে!
কথা নিহাদকে নিয়ে এত বেশি গর্ব করে যে মাঝে মাঝে ওর মন চায়,কথাকে গলা টিপে মেরে ফেলে। আর নিহাদ, দুনিয়ায় এত বউপাগল বলদ থাকতে পারে ওকে না দেখলে জানত না সিনথিয়া৷ ও ইরফানের সাথে সম্পর্ক পরিচালনা করার সাথে সাথে নিহাদকেও নিজের জালে আটকানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।
যেমন বারবার নিহাদের কাছে যাওয়া। গা ঘেসে দাঁড়ানো৷ মিষ্ট ভঙ্গিতে কথা বলা৷ আবেদনময়ী লুকস দেওয়া। একদিন ভার্সিটিতে বসে নিহাদ যখন সিড়ি দিয়ে উঠছিল ঠিক তখনই সিনথিয়া ইচ্ছা নিহাদের গায়ের উপর পড়ে গেছে। সিনথিয়া ভাবল, নিহাদ হয়তো এতে পুলকিত হয়ে ওর প্রতি আকর্ষিত হবে। কিন্তু হলো তার ঠিক উল্টো। নিহাদ বেশ জোরে ধমক দিয়ে সিনথিয়াকে অনেক কথা শোনাল।
এ ভার্সিটিতে আসার পর নিহাদকে দেখে সিনথিয়ার প্রথম প্রেমের কথা মনে পড়ল। নিহাদ ওর জীবনের প্রথম প্রেম। ওর বোন সীমার প্রাইভেট টিচার ছিল নিহাদ। সীমাকে বেশ শাসন করে পড়াত। সিনথিয়া তখন কিশোরী। ওর কিশোরী মনের প্রথম ভালোলাগা ছিল নিহাদ স্যার। কিন্তু নিহাদের কঠিন রাগী স্বভাব আর প্রখর ব্যক্তিত্বের কারণে ও কখনোই তা প্রকাশ করতে পারেনি।
ভার্সিটিতে যখন নিহাদের সাথে প্রথম দেখা হলো। সিনথিয়া ভাবল নিহাদ ওকে চিনতে পেরেছে, কিন্তু নিহাদ তো ওর দিকে তাকায়নি পর্যন্ত। পড়ে নিহাদের বিষয়ে যাবতীয় সকল খোঁজ নিতে গিয়ে জানল। নিহাদ বিবাহিত। আর নিহাদের বউ নিহাদেরই ক্লাসের ছাত্রী।
সিনথিয়া প্রথমে ভেবেছিল হয়তো স্যার ছাত্রীর প্রেম ঘটিত কোনো বিয়ে, কিন্তু না ওদের বিয়ে অনেক বছর আগেই হয়েছে। রোজ দুজন একসাথে ভার্সিটিতে আসে আবার একসাথে যায়। এসব দেখলে রাগে সিনথিয়ার গা জ্বলে।
মাঝে মাঝে কথাকে খোঁচা দিয়ে দু চারটা কথাও শোনায়, কিন্তু তূবা সাপের মতো ফস করে ওঠে। কথাকে কিছু বললে কথার বেস্ট ফ্রেন্ড তূবা ওর ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে যায়।
তূবা মেয়েটাকেও আজব লাগে সিনথিয়ার। এত অপরূপ সুন্দরী অথচ একটা বয়ফ্রেন্ড পর্যন্ত নেই। যদি বয়ফ্রেন্ডই না থাকে, তাহলে সে রূপ দিয়ে কী কাজ? তবে সিনথিয়ার সন্দেহ তূবা কথার ভাই শ্রাবণের সাথে সম্পর্কে আছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে শ্রাবণ তূবার চেয়ে তিন বছরের ছোটো। সিনথিয়া ভেবে পায় না, তূবার মতো এত সুন্দরী আর বুদ্ধিমতি মেয়েটা বয়সে ছোটো ছেলের সাথে রিলেশন কেন করছে।
পরোক্ষনে সিনথিয়া ভাবল, হতে পারে টাইম পাস। শ্রাবণ দেখতে অনেক সুদর্শন। টাইম পাসের জন্য এসব ছেলেরা পারফেক্ট।
(অথচ সিনথিয়া কখনো জানতে পারল না শ্রাবণ তূবা একে অপরের জন্য কত কি করেছিল। পুরো সমাজকে টেক্কা দিয়েছিল কেবল নিজের সম্পর্ক বাঁচাতে।)
সিনথিয়া ভাবল,
'এখন আমার দুটো কাজ ইরফানকে হাতে রাখা আর নিহাদ স্যারকে হাত করার চেষ্টা করা।'
একটু শোনেন তারপর আবার গল্প পড়ুন।
(কথা-নিহাদ, শ্রাবণ-তূবার সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে সংগ্রহ করতে হবে "অমানিশায় আলো" বইটি।)
—————
আসরের আযানের কিছুক্ষণ পর,
ইরফান খাদিজার রুমের দরজার কাছে গিয়ে ডাকল,
'আপা, ভিতরে আসব?'
কিছুক্ষণ কেনো উত্তর আসল না। ইরফানও স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে রইল। ও জানে এ সময় খাদিজা কোরআন তেলায়ত করেন। ভিতর থেকে গুণগুণ তেলায়তের আওয়াজ আসছিল। আয়াত শেষ না করে কথা বলা ঠিক না। তাই ইরফান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। চোখ বন্ধ করে কোরআন তেলায়ত শুনতে লাগল।
ইরফান যখন কোরআন তেলায়ত শোনে ভিতরে তখন ভিতরে এক অদ্ভুত অস্থিরতা অনুভব করে৷ যেন কেউ ওকে কিছু বলতে চায়। চোখের সামনে আলোক রশ্মির মতো কিছু ভাসে৷ সে কারণে ইরফান কোরআন তেলায়ত শুনে না।
জবা রোজই নামাজের জন্য ডাকে৷ কখনো পড়ে। কখনো পড়ে না৷ ইরফানের ধারণা নামাজ রোজা করলে ও জবার সম্পত্তি পাবার পরিকল্পনা করতে পারবে না। সে কারণে নামাজ রোজা কম করে ও৷
কিছুক্ষণ পর ভিতর থেকে ডাক আসল,
'আসো, ইরফান।'
ইরফান ভিতরে গিয়ে বসার পর খাদিজা ওর মাথায় দোয়া পড়ে ফুঁ দিলো। ইরফান বলল,
'কেমন আছেন আপা?'
'আলহামদুলিল্লাহ। তুমি?'
'ভালো।'
'শুধু ভালো নয় বলো আলহামদুলিল্লাহ।'
অনিচ্ছা সত্ত্বেও ইরফান বলল,
'আলহামদুলিল্লাহ ভালো।'
'বলো কী খবর?'
'জবা বলল, আপনি আমায়, ডেকেছিলেন?'
'হ্যাঁ কিছু কথা বলার ছিল।'
'বলুন।'
'ইরফান তোমাদের বাড়ি আমি কতদিন আগে এসেছি?'
'চার বছর আপা।'
'আমাকে কে নিয়ে এসেছে?'
'আমি আপা।'
'কেন?'
'আপনার সাহায্যর প্রয়োজন ছিল তাই।'
'ইরফান তুমি কি জানো ভালো মানুষ ছাড়া এ পৃথিবীতে কেউ অসহায় কোনো নারীর সাহায্য করে না। ভালো মানুষ না হলে মাঝরাতে এক নারীকে রাস্তায় বিপদে দেখে তাকে নিজ বাড়িতে আশ্রয় দিয়ে বোনের মতো স্নেহ করে, মায়ের মতো সম্মান দিয়ে বছরের পর বছর তাকে নিজ গৃহে রাখে না।'
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ইরফান বলল,
'আমি মোটেও ভালো মানুষ না আপা।'
'তুমি ভালো মানুষ-ই ইরফান, কিন্তু শয়তান তোমার মাথা চড়ে বসেছে। মানুষের দুই কাঁধে দুটো ফেরেশতা থাকে জানো?'
'জি জানি৷ ডান কাঁধে থাকে রকীব যিনি ভালো কাজ লিখেন। আর বাম কাঁধে থাকে আতীদ যিনি খারাপ কাজ লেখেন।'
'সব জেনেও তুমি কীভাবে খারাপ কাজ করছো?'
'কারণ আমি তাদের বিশ্বাস করি না।'
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে খাদিজা বলল,
'তুমি কেন নিজেকে এত খারাপ করার চেষ্টা করছো যতটা তুমি নও? জবার কথা ভাবো, যে তোমায় সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। জারার কথা ভাবো৷ যার পৃথিবী তুমি।'
'আমি অনেক খারাপ। ধারণার বাইরে খারাপ।'
আবারও দীর্ঘশ্বাস ফেলে খাদিজা বলল,
'ইরফান তোমাকে আগেও বলেছি, আজ আবার বলছি সিনথিয়া মেয়েটা খুবই ধূর্ত। ওকে তুমি যেমন ভাবছো ও তেমন নয়। তোমাকে টপকে ও তোমার সর্বনাশ করবে।'
'আপনি একটা কথা বলেন আপা, আমার সম্পর্কে সব জেনেও আপনি কেন জবাকে বলছেন না? কেন আমাকে শুধরাতে চাইছেন।'
'তুমি আমায় এত সম্মান করে তোমার বাড়িতে কেন রেখেছো?'
'একবার বলেছিলাম, আপনার চেহারা আমার মৃত মায়ের সাথে হুবহু মিলে। আপনাকে দেখলে মনে হয় আমার মাকে দেখছি।'
'আমিও তোমাকে নিজ সন্তানের মতো দেখি। আমি অভাগী তো চাইলেও নিজ সন্তানের কাছে যেতে পারব না। তুমি আমার সন্তান সমতুল্য ছোটো ভাই। সে কারণে আমি চাই না আমার ভাইয়ের সংসার ভাঙুক। আমি চাই আমার ভাইয়ের মাথায় যে শয়তান ভর করেছে সে বিদায় হোক। ভাইটা আমার সুস্থ একটা জীবন যাপন করুক।'
ইরফান হেসে বলল,
'আমি তো চাই না শয়তানটা আমার মাথা থেকে দূর হোক। বরং শয়তানির তালে থাকলে আমি ভালো থাকি। নয়তো বোরিং জীবন আমার পছন্দ না।'
খাদিজা চুপ হয়ে গেল। ইরফান বলল,
'আর কিছু বলবেন আপা?'
'না।'
'আমি যাই।'
·
·
·
চলবে……………………………………………………