"অভ্র, তুই যদি চলিস ডালে ডালে, তবে আমিও চলি পাতায় পাতায়… তোর প্রতিটা চালের আগেই আমার চাল প্রস্তুত।"
ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে দুই হাতের আঙুল মটকালো মাহাদী।
— "সবকিছু নিখুঁতভাবে সম্পন্ন। এখন শুধু সঠিক সময়ে শেষ চালটা দেওয়ার অপেক্ষা।"
তার চোখে তখন এক অদ্ভুত জেদ আর অধিকারবোধ।
— "শুভ্রপরী, তুমি আমার না হয়ে কোথায় যাবে? শেষ পর্যন্ত তোমাকে আমার কাছেই ফিরে আসতে হবে।"
দাঁতে দাঁত চেপে সে ফিসফিস করে বলল—
— "বাই হুক অর বাই ক্রুক… আই ওয়ান্ট ইউ, অ্যান্ড আই'ল মেক শিউর ইউ'র মাইন।”
তখনই কেবিনের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল বাঁধন। মাহাদীর মুখে এমন উচ্ছ্বাস আর আত্মতৃপ্তির হাসি দেখে সে ভ্রু নাচিয়ে বলে উঠল—
— “ইজ ইট অল ডান, ব্রো? আইম সো এক্সাইটেড, ইউ নো!
মাহাদী ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি টেনে হাতে থাকা গ্লাসটা একটু উঁচিয়ে বলল—
— “ইয়েস, সিস।জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ।”
কথাটা বলেই সে গ্লাস উঁচিয়ে চিয়ার্স করল, তারপর ধীরে ধীরে ওয়াইনে চুমুক দিল। তার চোখেমুখে তখন স্পষ্ট ফুটে উঠেছে কোনো বড় পরিকল্পনা সফল হওয়ার তৃপ্তি।
—————
— "এই সিঁড়ির কাছ থেকে সোজা পুলের ঠিক মাঝখানে গিয়ে দাঁড়া।"
রাহাকে একচুলও নড়তে না দেখে অভ্র ভ্রু কুঁচকে বলল,
— "দাঁড়া, আমি নিজেই আসছি।"
রাহা "আআআআ!" বলে চিৎকার করে উঠল। আরে যাচ্ছি তো, বাল! একবার বলেন যেন না নড়ি, আবার বলেন নড়তে। বাল শুরু করছেন কতগুলা!”
অভ্র কড়া গলায় ধমক দিল,
— "এই পাঁকনা মেয়ে, একদম চুপ! যা বলছি, ঠিক তাই কর।"
রাহা মুখ বাঁকিয়ে আর অভ্রকে ভেংচি কাটতে কাটতে পুলের ঠিক মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল।
এদিকে অভ্র একে একে পঞ্চাশটা বস্তা পুরো পুলের চারপাশে সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রাখল। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছিল, যেন পুল সাজানোর জন্য কোনো বিশেষ আয়োজন করা হচ্ছে।
কাজ শেষ করে সে ধীর পায়ে রাহার সামনে এসে দাঁড়াল।
— "এখন একটা একটা করে সব বস্তার মুখ খুলবি।"
রাহা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।
— "পারব না।"
অভ্র চোখ সরু করে এগিয়ে এলো।
— "কি বললি?"
রাহা নির্ভীক ভঙ্গিতে বলল,
— "আপনি কি কানে কম শোনেন নাকি? বললাম, পারব না!”
"বেয়াদব মেয়ে!"
অভ্র ঠোঁটের কোণে রহস্যময় এক বাঁকা হাসি টেনে ফিসফিসিয়ে বলল,
— "আরেকটা শাস্তি নিজের খাতায় যোগ করে ফেললি জান!"
বলেই সে নিজ হাতে একে একে সবগুলো বস্তার মুখ খুলে দিল। মুহূর্তের মধ্যেই রঙে গুলো পানিতে ছড়িয়ে পড়ল, আর পুরো সুইমিংপুলটা যেন রঙধনুর উন্মাদনায় রঙিন হয়ে উঠল।
রাহা শুধু চারপাশে তাকিয়ে শুকনো ঢোক গিলতে লাগল।
এখন তার অবস্থা—এগোলেও বিপদ, পিছু হটলেও বিপদ!
কী করবে, কিছুই যেন মাথায় আসছে না।সব রং মিশে পানিটা হয়ে উঠেছে এক অপার্থিব, বর্ণিল আবেশে ভরা।
ঠিক তখনই পাশে দাঁড়িয়ে রাহা কাঁপা গলায় বলে উঠল—
— "পানি খাব…" ।
অভ্র ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে উদাস ভঙ্গিতে বলে উঠল,
— “খা! তোর সামনে তো পানির কোনো অভাব নেই। উল্টো আজ তো স্পেশাল রঙিন পানির ব্যবস্থাই করেছি!”
রাহা জেদি দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে সত্যিই সেই পানি খেতে উদ্যত হতেই অভ্র হঠাৎ গম্ভীর স্বরে বলে উঠল,
— “স্টপ!”
বলেই পাশে থাকা এক বোতল পানি তার দিকে এগিয়ে দিল।
রাহা তো ঠিক এটারই অপেক্ষায় ছিল।
সে ধীর পায়ে একটু এগিয়ে এল। কিন্তু পানির বোতল ধরার বদলে আচমকাই অভ্রের কব্জিটা শক্ত করে চেপে ধরে এক প্রচণ্ড টান দিল।
পরমুহূর্তেই—
ধপাস!
অভ্র সোজা পানিতে গিয়ে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গেই চারপাশে তীব্র ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল, রঙিন পানি ছিটকে চারদিকে ছড়িয়ে গেল, যেন পুরো সুইমিংপুল এক নিমিষে জলকেলির যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
রাহা আবারও খিলখিলিয়ে হেসে উঠল।
অভ্র মুহূর্তেই সোজা হয়ে দাঁড়াতেই সে দুষ্টুমি ভরা হাসি নিয়ে এক আঁজলা পানি তুলে তার মুখের ওপর ছুড়ে দিল।
অভ্র গভীর একটা শ্বাস টেনে নিল। তারপর বিদ্যুৎগতিতে দুই হাত দিয়ে রাহার সরু কোমর শক্ত করে নিজের সঙ্গে চেপে ধরল, আর অন্য হাতটা তার ঘাড়ের পেছনে রেখে এক ঝটকায় তাকে নিয়ে পানির অতলে ডুব দিল।
পরমুহূর্তেই সে রাহার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট স্থির করল—তীব্র, দাবিদার আর আগ্রাসী এক চুম্বনে। যেন তার জমে থাকা সমস্ত রাগ, অভিমান আর উন্মত্ত অনুভূতিগুলো সেই চুম্বনের মাধ্যমেই উজাড় করে দিচ্ছে। যেন প্রতিটি শাস্তি, প্রতিটি হিসাব এসে থেমেছে ওই দুটো কাঁপতে থাকা ঠোঁটের ওপরেই।
রাহা পানির নিচে মরিয়া হয়ে ছটফট করতে লাগল। হাত-পা ছুঁড়ে নিজেকে মুক্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল, কিন্তু অভ্রের শক্ত, অটল বাঁধন থেকে নিজেকে একচুলও সরাতে পারল না।
ধীরে ধীরে তার শরীর নিস্তেজ হয়ে আসতে লাগল। ঠিক তখনই অভ্রের হুঁশ ফিরল। দের মিনিটের মাথায় সে দ্রুত রাহাকে নিয়ে পানির ওপর ভেসে উঠল। নিশ্বাস নিয়ে আবার ডুব দিলো মোট তিন মিনিট পর সে তাকে ছাড়ল।
মাথাটা পানির ওপর উঠতেই রাহা হাপরের মতো হাঁপাতে শুরু করল। যেন মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসে আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে। সে অভ্রকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে বড় বড় শ্বাস নিতে লাগল।
তার চোখ দুটো রক্তিম হয়ে উঠেছে, মুখে ভয়ের স্পষ্ট ছাপ। এমন অনুভূতি হচ্ছিল, আর কয়েকটা মুহূর্ত দেরি হলেই বুঝি সরাসরি আজরাইলের সাথেই সাক্ষাৎ হয়ে যেত।
অভ্র নিজেও খানিকটা হাঁপিয়ে উঠেছিল। ঠিক তখনই সে আবার পানির নিচে ডুব দিতে উদ্যত হতেই রাহা আতঙ্কে চিৎকার করে কেঁদে উঠল। আর তা দেখে অভ্রের ঠোঁটে দুষ্টু এক হাসি ফুটে উঠল। সে তো কেবল ওকে ভয় দেখাতেই এমনটা করছিল।
রাহা কেঁদে দিয়ে বলে উঠল—
— "আ-আ-আ... অসভ্য লোক! আমি আর পারছি না।আমি মরেই যাবো।
ততক্ষণে তার শরীর সম্পূর্ণ অবসন্ন, শক্তিহীন হয়ে পড়েছে। অভ্রের কাছ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে গিয়েই তার মনে হলো, এই বুঝি পানির অতলে তলিয়ে যাবে। ভয় আর অসহায়তায় সে আবারও অভ্রকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, যেন সেই মুহূর্তে অভ্রই তার একমাত্র ভরসা।
— "যা, সরে যা। আবার জড়িয়ে ধরছিস কেন? এইটুকুতেই যদি এমন অবস্থা হয়, তাহলে আমার তো সন্দেহ হচ্ছে—আমাকে আদৌ সামলাতে পারবি তো? নাকি শেষমেশ বাঁধনকেই ডেকে আনতে হবে!"
বাঁধনের নাম উচ্চারিত হতেই রাহার চোখ দুটো ক্রোধে জ্বলে উঠল। কিছুক্ষণ দম মেরে থাকে পরমুহূর্তে এক ঝটকায় অভ্রের মুখ চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিসিয়ে বলল—
— 'আর একবার ওই মেয়ের নাম মুখে আনলে, যে সিস্টেম নিয়ে এত বাহাদুরি দেখান না, সেটা এক লাত্থিতেই চিরদিনের জন্য হ্যাং করে দেব! বলে দিলাম!'”
অভ্র কয়েকবার পলক ফেলল। যেন এখনও বিশ্বাসই করতে পারছে না, কথাগুলো সত্যিই রাহার মুখ থেকে বের হয়েছে।এই দুরন্ত মেয়েটা এমন কথা বলবে—অভ্র তা কল্পনাতেও আনেনি।
অভ্রকে এভাবে অপলক তাকিয়ে থাকতে দেখে রাহা বলে উঠল—
— "এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন? আমি কিন্তু সত্যিই বলেছি।"
এখন রাহা অনেকটাই ধাতস্থ। অথচ অভ্রের মাথায় এখনও একই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—
শাস্তি দিতে এসে এই পিচ্চি বিচ্ছুটা শেষমেশ কী বলল !
সে ধীরে ধীরে রাহার দিকে এগিয়ে এসে নিচু স্বরে বলল,
— "তুই জানিস তো, তুই কী বললি?"
রাহা একটুও পিছু না হটে সোজা তার চোখে চোখ রেখে বলল,
— "জানি।
রাহার এমন দৃঢ় জবাবে অভ্রের বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠল। ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল।
শাস্তি দিতে এসে শেষমেশ নিজেই যেন রাহার কথার কাছে হার মেনে বসে রইল সে।
অনেকক্ষণ সুইমিং পুলে কাটানোর পর অবশেষে অভ্র রাহাকে নিয়ে ওপরে উঠল। একটু সামনে এগোতেই দেখতে পেল—ছেলে-মেয়েরা সবাই সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। অভ্রকে উঠতে দেখে সবাই না-দেখার ভান করলেও ঠোঁট চেপে চাপা হাসি লুকাতে পারল না।
দু'জনের পুরো শরীরই রঙে মাখামাখি, যেন জীবন্ত রঙের পাত্র। জামাকাপড়ের অবস্থাও একেবারে করুণ—এলোমেলো, কুঁচকে যাওয়া আর রঙে চুপচুপে।
অভ্র সবার দৃষ্টি আর চাপা হাসিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে তাদের পাশ কাটিয়ে সোজা বাড়ির ভেতরে চলে গেল। তার হাতে সময় খুব কম। সাতটার আগেই সবকিছু নিখুঁতভাবে গুছিয়ে, সামলে প্রস্তুত করতে হবে।
আর এদিকে রাহা তো পড়েছে একেবারে মহা ফাঁপরে। সবার সামনে লজ্জায় যেন মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে সে।
অবন্তিকা, সাফা, শিফা, আয়াত, জায়রা আর আয়রা সবাই একসঙ্গে এগিয়ে এলো। অভ্র চলে যেতেই তারা আর নিজেদের সামলাতে পারল না। একেকজন উচ্চস্বরে হেসে অন্যজনের গায়ে ঢলে পড়ছে।
রাহা লজ্জায় রাঙা মুখে তাদের দিকে তাকাতেই তারা আরও ফিকফিক করে হেসে উঠল। আর রাহা অভিমানী ভঙ্গিতে সেখান থেকে চলে যেতে উদ্যত হতেই সাফা তড়িঘড়ি করে তার হাত চেপে ধরে বলল—
— "এই, কোথায় যাচ্ছিস? আয়, চল! এখনও তো আমাদের সাথে রং খেলা বাকি!”
অবন্তিকা ঠোঁট বাঁকিয়ে, দুষ্টুমিভরা সুরে বলে উঠল,
— "জামাই-বউ তো একসাথেই রং খেলায় মত্ত ছিল, আমাদের সঙ্গে আর কী খেলবে বল?"
কথাটা শেষ হতেই আয়াত আর শিফা মুখ চেপে হেসে ফেলল। তারপর শিফা ভ্রু নাচিয়ে, খোঁচা মেরে বলল—
— "ওদের নিয়ে টিপ্পনী কাটার আগে একবার নিজের হালটা আয়নায় দেখে নে!"
বলেই সে অবন্তিকার মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার চোখ বুলিয়ে নিল। আর বাকিরা আর হাসি সামলাতে না পেরে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছে।
সাথে সাথেই অবন্তিকার মুখের হাসি উবে গেল, ঠোঁটদুটো চুপসে গেল।তার অবস্থা দেখে সবাই আবারও একদফা হেসে উঠল। রাহাও আর নিজেকে সামলাতে না পেরে নিজেও খিলখিল করে হেসে ফেলল।
রাহা হাসতে হাসতেই বলল—
— "কিরে, তোর এই করুণ দশা হলো কী করে?"
অবন্তিকা ভ্রু কুঁচকে, রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলে উঠল—
— "সব তোর আর ওই হাতিটার জন্য! আমার এই অবস্থা তোরা করেছিস!"
রাহা চোখ বড় বড় করে বলল—
— "যাব বাবা! আমি আবার কী করলাম?"
সাফা দু'জনের মাঝে এসে হেসে বলল,
— "আচ্ছা, এবার ঝগড়া বাদ দে। আয়, আবার রং খেলায় মেতে উঠি। যা হয়েছে, সব ভুলে যা!"
ঠিক তখনই সাউন্ড বক্সের তীব্র আওয়াজে বেজে উঠল—
"বালাম পিচকারি, যা তুনে মুঝে মারি..."
গানের তালে চারপাশ যেন আবারও রঙ,
উল্লাস আর হাসির উন্মাদনায় মেতে উঠল।ছোট-বড় সবাই মেতে উঠল রঙের উৎসবে। একে একে সবাই সুইমিং পুলে ঝাঁপিয়ে পড়ল, চারদিকে হাসি, দুষ্টুমি আর আনন্দের কোলাহল ছড়িয়ে পড়ল।
আর ইভান? সে শুধু মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে রইল তার প্রিয় নারীটির উচ্ছ্বসিত, প্রাণচঞ্চল মুখশ্রীর দিকে। সেই হাসিতে যেন লুকিয়ে ছিল তার সমস্ত পৃথিবী।
ইভান বাগানের এক কোণে নীরবে বসে ছিল। ঠিক তখনই সামনে থেকে শিফা দুষ্টু হাসি নিয়ে এগিয়ে এসে এক মুঠো রঙ তুলে তার মুখে মাখিয়ে দিল।
তারপর ভ্রু নাচিয়ে বলল—
— "আপনি কেন বাদ যাবেন?"
ইভান চমকে উঠে,
— "আরে…!" বলে কিছু একটা বলার আগেই শিফা হেসে দৌড়ে পালাল।
দৃশ্যটা দেখে ইভানের ঠোঁটের কোণে আপনাআপনি এক কোমল, তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল।
আর সেই হাসিটাই তীক্ষ্ণ নজরে ধরা পড়ল আয়াতের চোখে।
জায়ান অভ্রের কাছে যাওয়ার জন্য বাড়ির রাস্তা ধরে দ্রুত পায়ে হাঁটছিল। হঠাৎই সামনে থাকা সাফার সঙ্গে সজোরে ধাক্কা লেগে দু'জনই টাল খেয়ে গেল। জায়ান কোনোমতে নিজেকে সামলে নিলেও সাফা আর ভারসাম্য রাখতে পারল না।
ধপাস!
একেবারে মাটিতে চিৎপটাং হয়ে পড়ে গেল সে।
জারিফ তাড়াহুড়ো করে তাকে ধরতে এগিয়ে এলেও ততক্ষণে সব শেষ।
জায়ান সঙ্গে সঙ্গে জিভ কামড়ে অপরাধী গলায় বলে উঠল,
— সরি!
সাফা কোমরে হাত দিয়ে ককিয়ে উঠে বলল,
— ওমাগো! চোখ কোনদিকে রেখে হাঁটেন, হে? সামনে মানুষ আছে, সেটা দেখেন না নাকি?
সাফার রঙে মাখামাখি, এলোমেলো চেহারা আর মুখভরা বিরক্তি দেখে জায়ানের হাসি চেপে রাখা দায় হয়ে পড়ল। শেষমেশ সে হো হো করে হেসে উঠল।
সাফা সঙ্গে সঙ্গে নাক ফুলিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল। এভাবে হাসার মতো কী হলো, সেটা কিছুতেই মাথায় ঢুকল না তার।
সে কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই অবন্তিকা কোথা থেকে যেন বিশাল একটা পিচকারি হাতে নিয়ে হাজির হলো।
— সরি, জায়ান ভাই!.
বলেই পুরো পিচকারির রঙিন পানি সোজা জায়ানের গায়ে ছুড়ে মারল।মুহূর্তের মধ্যেই জায়ানের পুরো শরীর ভিজে একাকার।সেই দৃশ্য দেখে সাফা আর নিজের রাগ ধরে রাখতে পারল না। মাটিতে পড়ে থাকা অবস্থাতেই মাটি চাপড়াতে চাপড়াতে উচ্চস্বরে হেসে উঠল।
সাফার প্রাণখোলা হাসির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে জায়ান।
অবন্তিকা একটু এগিয়ে এসে হালকা কাশির ভান করে বলে উঠল,
— সেটিংটা করিয়ে দিলে কেমন হয়, জায়ান ভাই?
জায়ানও নির্বিকার ভঙ্গিতে উত্তর দিল,
— মন্দ হয় না কিন্তু, শালিকা!
ব্যাস, অবন্তিকাকে আর পায় কে! সে তো উচ্ছ্বাসে চিৎকার করে উঠল,
— আআআ! সত্যি বলছেন?
সাফা ভ্রু কুঁচকে তিনজনের দিকে তাকিয়ে বলল,
— তোর আবার হঠাৎ কী হলো? আর তোরা দু'জন কী নিয়ে ফিসফাস করছিস?
অবন্তিকা দুষ্টু হেসে বলল,
— রাহার পর এবার তোর পালা।
বলেই সাফার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।
-চল, তাড়াতাড়ি ওঠ!
সাফা সন্দেহভরা চোখে তাকিয়ে বলল,
— বলবি তো, কিসের পালা?
— তোকে বলি দিবো।
— কী?
— হুঁ...
— মেজাজ গরম করিস না, বলে দে।
-- আরে বাল, এত অস্থির হোস না। সময় হলে নিজেই দেখে নিবি, এখন চল।
—————
রাহা সম্পূর্ণ সেজেগুজে বাড়ির প্রাঙ্গণে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। অভ্র তাকে শুধু এতটুকুই বলেছিল—প্রস্তুত হয়ে থাকতে, কারণ সে তাকে কোথাও নিয়ে যাবে। তবে গন্তব্যের ব্যাপারে একটিও শব্দ উচ্চারণ করেনি।
অভ্রের নির্দেশমতো রাহা গায়ে জড়িয়েছে ঝলমলে সোনালি আভাময় একটি শাড়ি, আর তার সঙ্গে পরেছে হীরাখচিত সাদামাটা অথচ অভিজাত অলংকার। যাওয়ার আগে অভ্র বলে গিয়েছিল, যেন সে পুরোপুরি তৈরি থাকে; নির্দিষ্ট সময়ে তার জন্য গাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
সঙ্গে যাবে তার দুই দুর্ধর্ষ অপরাধ-সঙ্গিনীও।
অভ্র খুব ভালো করেই জানে, রাহা যেখানে যাবে সেখানে তার দুই প্রিয় সখীকে ছাড়া যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
তাই দুটি গাড়ি পাঠানো হলো। একটি গিয়ে থামল রাহার সামনে। ড্রাইভার বিনীত স্বরে বলল,
— "রাহা ম্যাম, আপনি শুধু এই গাড়িতেই উঠুন। বাকিরা অন্য গাড়িতে আসবেন।"
রাহা ভ্রু কুঁচকে বলল,
— "কেন?"
— "অভ্র স্যারের নির্দেশ।"
অবন্তিকা আর সাফা সঙ্গে সঙ্গেই বুঝে গেল, নিশ্চয়ই কোনো না কোনো বিশেষ পরিকল্পনা আছে। কিন্তু মাথামোটা রাহা এখনও বিস্মিত হয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছে—
এভাবে আলাদা করে পাঠানোর কারণটা আবার কী?
গাড়িতে উঠে বসতেই সেটি দ্রুত গতিতে ছুটে চলল গন্তব্যের দিকে। শহরের কোলাহল পেরিয়ে তারা পৌঁছে গেল ঢাকার অদূরের সেই স্বপ্নময় গন্তব্যে—The Palace Luxury Resort।
রিসোর্টে ঢুকতেই চারপাশ যেন বদলে গেল।নিঃশব্দ হাওয়ার মৃদু ছোঁয়া, আর লেকের শান্ত জল—সবকিছু মিলিয়ে জায়গাটা যেন বাস্তব না, কোনো রাজকীয় স্বপ্ন।
গাড়িটি ভেতরে ঢুকে ধীরে ধীরে থেমে যেতেই একে একে তারা নেমে পড়ল। চারপাশের সৌন্দর্যে রাহা কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেল—এই মুহূর্তটা যেন তার কল্পনার থেকেও বেশি কিছু।
রাহা চোখ তুলে দেখল—পুরো রিসোর্টটা একেবারে রাজকীয়ভাবে সাজানো। চারপাশে আলোর ঝলকানি, গাছপালা থেকে শুরু করে প্রবেশপথ পর্যন্ত সবকিছুতেই আভিজাত্যের ছাপ।
তার গাড়ির সামনে বিছানো লাল গালিচা—যেন কোনো রাজকীয় অভ্যর্থনা।
ড্রাইভার গাড়ির দরজা খুলে বলে উঠল,
“নামুন ম্যাম…”
রাহা ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নামতেই, মুহূর্তের মধ্যেই গাড়িটা পেছনে সরে চলে গেল—নীরব অথচ শৃঙ্খলিত গতিতে।
কিছুটা দূরেই দাঁড়িয়ে ছিল সাফা আর অবন্তিকা। তারা চারপাশটা একবার চোখ বুলিয়ে নিতেই বুঝে গেল পরিবেশটা কতটা জমকালো।
ঠিক তখনই দুই পাশ থেকে এগিয়ে এলো জারিফ আর জায়ান। নিঃশব্দ পায়ে, তারা এসে দাঁড়াল তাদের সামনে।
দুজনই ওপর দুইজনের দিকে তাকিয়ে সামান্য হাসি দিল, তারপর সাফা ও অবন্তিকার দিকে চোখ ফেলল—কিন্তু তাদের খেয়াল আসতেই অবন্তিকা হাসি একদম বন্ধ করে দিলো। মুখটা কুঁচকে, চোখ কুঁচকে জারিফের দিকে তাকিয়েই মুখ ভেংচি দিলো।
জারিফ তখনও হাসছে। একটু নিচু হয়ে, ঠান্ডা আর হালকা দুষ্টু গলায় বলল—
“কাবাবের মধ্যে হাড্ডি না হলে হয় না নাকি?
অন্যদিকে জারিফের ঠোঁটের কোণে তখনও দুষ্টু হাসি লেগে আছে। একটু ঝুঁকে সে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই অবন্তিকা তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল।অবন্তিকার চোখ একদম আগুন হয়ে উঠল। সে তীব্র কণ্ঠে বলে উঠল—
“এই কার বারা ভাতে ছাই দিয়েছি হ্যাঁ?”
রাহাই তো নিয়ে এসেছে,
সে কটাক্ষ ভরা হাসি দিয়ে আবার বলল—
“আনলেই ছুটে আসতে হবে?
চোখ সরু করে সামনে দাঁড়ানো দিকে তাকিয়ে অবন্তিকা ঝাঁঝিয়ে উঠল—
" তাহলে তো আপনিও সেই কাবাবের হাড্ডি! "
"বলেই কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে উঠল, 'সরেন এখান থেকে! নিজেদের বেলায় তো ষোলো আনা, আর আমার বেলায় এক আনাও না।এটা আমি মানি না।”
তাদের কথার মধ্যেই চারজনের দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো সামনের মানুষটার ওপর।
গভীর কালো স্যুটে নিজেকে নিখুঁতভাবে সাজিয়ে, রাজকীয় ব্যক্তিত্ব নিয়ে অভ্র ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে। তার এক হাতে ধরা লাল রঙের কাপড়ের টুকরো, আর ঠোঁটের কোণে লেগে আছে মৃদু রহস্যময় হাসি।
·
·
·
চলবে……………………………………………………