লাল গালিচাজুড়ে ছড়িয়ে আছে টুকটুকে লাল গোলাপের পাপড়ি। দু'পাশের ঝলমলেবাতির আলোয় পুরো পথটা যেন স্বপ্নের কোনো রাজপথের মতো দীপ্তিময় হয়ে উঠেছে।
ঠিক তখনই অভ্র নিঃশব্দে এসে রাহার পেছনে দাঁড়াতেই, পিছনে না ফিরেও রাহা বুঝে গেল—মানুষটা কে। সেই চিরচেনা সুগন্ধ, সেই পরিচিত উপস্থিতি তার হৃদয়কে মুহূর্তেই জানান দিল অভ্রের আগমনের কথা। যেন অজান্তেই সে অভ্রের অস্তিত্বের সঙ্গে গভীরভাবে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। অভ্র তার আশপাশে থাকলেই রাহা অনায়াসে টের পায়—তার ব্যক্তিত্বময় পুরুষটি ঠিক তার কাছেই কোথাও রয়েছে।
অভ্র ধীর পায়ে রাহার পাশে এসে দাঁড়াল। রাজকীয় ভঙ্গিতে নিজের হাতটা তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত করল।কিন্তু রাহা যেন এখনো কোনো মোহময় স্বপ্নের জগতে আটকে আছে। সে একই জায়গায় নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তা দেখে অভ্র মৃদু হেসে বলে উঠল,
—"কী হলো, মাই কুইন? এভাবে থমকে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? এগিয়ে যা… আজ থেকে তোর প্রতিটা স্বপ্ন, প্রতিটা ইচ্ছে পূরণ করার দায়িত্ব এই অভ্রের। তোর জীবনের কোনো চাওয়া, কোনো স্বপ্ন আমি অপূর্ণ থাকতে দেব না। কারণ তোর হাসির জন্য আমি অসম্ভবকেও সম্ভব করতে প্রস্তুত।”
রাহা কয়েক কদম এগিয়ে হঠাৎ খেয়াল করল, অভ্রও তার ঠিক পিছু পিছু হাঁটছে। সে থেমে ঘুরে দাঁড়াতেই অভ্র ভ্রু উঁচিয়ে বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে তাকাল।
— কী হলো, থেমে গেলি কেন?
রাহা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
— "আপনি পেছনে কেন? আমার পাশে পাশে হাঁটুন।"
অভ্র মৃদু হেসে মাথা নাড়ল,
— উহু… তুই আমার রাণী। আমি তোর রাজা হতে চাই না, চাই তোর আজীবনের অনুগত প্রজা হয়ে থাকতে। তুই যেদিকেই পদচারণা করবি, আমি নিঃশব্দে তোর ছায়াসঙ্গী হয়ে সেদিকেই উপস্থিত হব। আমার হৃদয়-রাজ্যের সিংহাসনে একমাত্র অধিষ্ঠাত্রী ‘রাহা’।
আর আমি? আমি শুধু তোরই এক নিবেদিত প্রজা—যে নিজের সমগ্র পৃথিবী, সমস্ত স্বপ্ন আর অস্তিত্ব তোর চরণে উৎসর্গ করে দিতে প্রস্তুত। তোর এক চিলতে হাসিই আমার রাজত্বের পরম প্রাপ্তি, আর তোর ভালোবাসাই আমার বেঁচে থাকার একমাত্র প্রেরণা, একমাত্র অস্তিত্বের মানে।
রাহা মিষ্টি হেসে বলল,
— "তাহলে আপনার রাণীর আদেশ, এখনই তার হাত ধরে সামনে এগিয়ে যাবেন।"
অভ্র ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল,
— "জো হুকুম, মেরি বেগম!"
দু'জনে পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল। অভ্রের একটিমাত্র ইশারায় মুহূর্তের মধ্যে দুই পাশে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে গেল ত্রিশজন তরুণী, সবার হাতভর্তি রঙিন ফুলের পাপড়ি। তারা যত সামনে এগোতে লাগল, ততই তাদের ওপর ঝরে পড়তে লাগল ফুলের বৃষ্টি।
অভ্রের হাতের মুঠোয় বন্দী রাহার হাতটা আজ আর কারও জন্য নয়—এটা এখন সম্পূর্ণ তার ব্যক্তিগত অধিকার। তাদের মাঝখানে আজ কোনো বাধা নেই। আর ভবিষ্যতে যদি কোনো বাধা মাথা তুলে দাঁড়ানোর সাহসও করে, তবে অভ্র সেটাকে শিকড়সহ উপড়ে ফেলবে, একেবারে অস্তিত্ব সহ কারে।
অভ্র রাহার হাতটা আলতো করে ধরে সামনে এগিয়ে চলেছে। আর রাহা ঘাড় ঘুরিয়ে একদৃষ্টিতে অভ্রের দিকে তাকিয়ে হাঁটছে। হঠাৎই অসাবধানতাবশত সামনে হোঁচট খেতে নিলে অভ্র মুহূর্তেই তাকে নিজের দিকে টেনে সামলে নিল।
অভ্রের চোখ পড়তেই দেখল, রাহার জুতোর হুক খুলে গেছে। রাহা নিচু হয়ে সেটি ঠিক করতে যেতেই অভ্র তাকে থামিয়ে দিল। এরপর নিজেই নিচু হয়ে রাহার পা নিজের দিকে টেনে নিতে চাইলে, রাহা তড়িঘড়ি করে বাধা দিয়ে বলল,
—"আপনি আমার থেকে বড়, আপনার এইভাবে নিচু হওয়াটা ঠিক না। আমি নিজেই পারব… প্লিজ, পায়ে হাত দেবেন না।”
অভ্র সঙ্গে সঙ্গে ধমকের সুরে বলে উঠল,
— “একদম চুপ! কয়দিন পর কোথায় কোথায় হাত রাখব, তারই ঠিক নেই; আর এখন বলছ পায়ে হাত দিবেন না?”
অভ্রের এমন দুষ্টু কথায় রাহার গাল লজ্জায় টকটকে লাল হয়ে উঠল।
অভ্র ধীরে তার পা নিজের উরুর ওপর তুলে নিল। অত্যন্ত যত্নে ঝুঁকে জুতোর খুলে যাওয়া হুকটি লাগিয়ে দিল। তারপর পথের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে পকেট থেকে লাল ফিতেটা বের করে আলতো করে রাহার চোখ বেঁধে দিল।
রাহা বিস্মিত কণ্ঠে বলতে গেল,
— “অভ্র… ভা…”
কিন্তু তার আগেই অভ্র নিজের তর্জনী রাহার ঠোঁটের ওপর রেখে ফিসফিস করে বলল,
— “শশ… আর একটা কথাও নয় জান"।
কথাটি শেষ হতেই অভ্র নিজের হাতে থাকা লাল কাপড়ের ফিতেটা আলতো করে রাহার চোখে বেঁধে দিল। তারপর কোনো পূর্বাভাস না দিয়েই হুট করে তাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল।
অপ্রস্তুত হয়ে রাহা দু'হাত বাড়িয়ে শক্ত করে অভ্রের গলা জড়িয়ে ধরল। অভ্রও তাকে বুকে আগলে নিয়ে ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগল। একেবারে তিনতলা পর্যন্ত সে লিফটের সাহায্যও নিল না।
রাহাকে কোলে নেওয়াটা যেন তার ভীষণ প্রিয় একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। যেন এই ছোট্ট, নরম-সরম লিলিপুটটাকে বুকে তুলে নেওয়ার মাঝেই তার এক অদ্ভুত প্রশান্তি লুকিয়ে আছে।
আর রাহার যেই পালকের মতো হালকা ওজন! তাকে কোলে নিয়ে চাইলে অনায়াসেই কয়েক ঘণ্টা দৌড়ে পাড়ি দেওয়া যায়।
সাফা আর অবন্তিকার চোখে তখন আনন্দের দীপ্তি চিকচিক করছে। অভ্র যে তাদের প্রাণের বান্ধবীকে এতটা নিঃস্বার্থ আর গভীরভাবে ভালোবাসতে পারে, তা তারা কখনো কল্পনাও করেনি।
তারা সামনে এগিয়ে যেতেই সাফা আর জায়ানও তাদের পিছু নিল। পেছনে রয়ে গেল অবন্তিকা আর জারিফ।
অবন্তিকা এক পা বাড়িয়ে আবার থেমে গেল। জারিফ কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ঘুরে তাকাল।
অবন্তিকা তখনও সামনের দিকে চেয়ে, বুকের বাঁ পাশে হাত চেপে ধরে আবেগমাখা কণ্ঠে বলে উঠল
—"হায়ে, ম্যায় মার জাওয়া…! তুম দোনো নে তো মেরা দিল হি জিত লিয়া!"
জারিফও গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেলে ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি টেনে বলল—
"মার জাইয়ে, বিচ্ছু! আপকো বাঁচকে রেহনে কা কোই হক নেহি।"
কথাটা বলেই আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না সে। উদাস ভঙ্গিতে সামনে এগিয়ে গেল, আর অবন্তিকা হতভম্ব হয়ে তার চলে যাওয়া দেখতে লাগল।আবার সম্বিত ফিরে পেতেই ভ্রু কুঁচকে রাগী গলায় বলে উঠল,
"এই অসভ্য হাতি! আমার খুশিটাও কি আপনার সহ্য হয় না ?" —
সামনে হাঁটতে হাঁটতেই জারিফ একটুও না ফিরে নির্লিপ্ত স্বরে জবাব দিল—
" একদমই না!"
কথাটা শুনে অবন্তিকা ঠোঁট ফুলিয়ে ক্ষুব্ধ ভঙ্গিতে বলে উঠল—
--"হিংসুটে হাতি একটা! আপনার জন্মই হয়েছে মানুষের খুশিতে পানি ঢালার জন্য!"
বলে সে-ও দ্রুত পা চালিয়ে তার পিছু নিল, আর জারিফের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।
জায়ান ইচ্ছে করেই জারিফ আর অবন্তিকাকে একটু একান্ত সময় দেওয়ার জন্য সাফার সঙ্গে গল্পে মেতে উঠল।
সে মৃদু হেসে প্রশ্ন করল, — "আচ্ছা, আপনার জীবনে কী কখনও ভালোবাসা এসে ধরা দিয়েছে?"
প্রশ্নটা শুনে সাফা হঠাৎই স্তব্ধ হয়ে গেল। এক মুহূর্তে তার মনের পর্দায় ভেসে উঠল জারিফের মুখ। অজান্তেই তার দৃষ্টি গিয়ে থামল দূরে দাঁড়িয়ে তর্কে মশগুল জারিফ আর অবন্তিকার দিকে।
কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে সে গভীর নিশ্বাস ফেলে বলল,
— "ভালোবাসা কোনোদিন আমার দরজায় কড়া নাড়েনি… তবে কাউকে ভালো লেগেছিল। কিন্তু সেই অনুভূতিকেও ভাগ্য আমার করে দেয়নি। কিছু মানুষকে শুধু দূর থেকে ভালোবেসেই যেতে হয়, কাছে পাওয়ার সৌভাগ্য সবার কপালে লেখা থাকে না।"
কথাগুলো বলার সময়ও তার দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল তাদের দিকেই, আর চোখের গভীরে লুকিয়ে ছিল একরাশ না-পাওয়ার বিষণ্নতা।
জায়ান সাফার দৃষ্টির অনুসরণ করে তাকাতেই দেখল, সে একদৃষ্টিতে জারিফ আর অবন্তিকার দিকে চেয়ে আছে। তার চোখজোড়ায় স্পষ্ট ফুটে উঠেছে একরাশ চাপা বেদনা আর না-পাওয়ার হাহাকার। মুহূর্তেই জায়ান যেন তার কষ্টের কারণটা কিছুটা আঁচ করতে পারল, তবে কিছুই প্রকাশ করল না।
ঠোঁটের কোণে এক মৃদু অথচ অর্থবহ হাসি টেনে সে সাফার আরও একটু কাছে এগিয়ে এসে বলল,
— "ওদের একসঙ্গে ভীষণ মানায়, তাই না?"
সাফা ঠোঁটে ফিকে হাসি ফুটিয়ে উত্তর দিল,
— "হুম… খুবই মানায়।"
জায়ান আবার প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
— "কী মনে হয়, ওদের মধ্যে কখনও কিছু হতে পারে?"
সাফা এবার বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে বলল,
— "কেন হবে না?"
— "কিন্তু ওরা তো একসঙ্গে হলেই শুধু ঝগড়া করে!"
সাফা গভীর দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
— "ঝগড়ার আড়ালেই তো সবচেয়ে গভীর ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে। যে মানুষটার ওপর আমাদের কোনো অনুভূতি থাকে না, তার সঙ্গে আমরা কখনও এভাবে রাগ করি না, অভিমান করি না। কিছু সম্পর্কের শুরুটা হয় তর্ক দিয়ে, কিন্তু শেষটা গিয়ে থামে ভালোবাসায়।"
তার কণ্ঠে ছিল অদ্ভুত এক দৃঢ়তা, যেন কথাগুলো শুধু জায়ানকে নয়, নিজের মনকেও বুঝ দিলো।
জায়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর মৃদু হেসে বলল,
— "তাহলে আপনি ভালোবাসায় বিশ্বাস করেন?"
সাফা একবার তার দিকে তাকিয়ে আবার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল জারিফ আর অবন্তিকার দিকে।
— "বিশ্বাস করি বলেই তো দূর থেকে কারও সুখ দেখে হাসতে পারি… ।
জায়ান ভ্রু কুঁচকে বলল,
— "সব ভালোবাসার কী পূর্ণতা পাওয়া জরুরি?"
সাফা ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিষণ্ন হাসি টেনে উত্তর দিল,
— "না। কিছু ভালোবাসা পূর্ণতা পাওয়ার জন্য আসে না, শুধু মানুষকে বদলে দেওয়ার জন্য আসে। কিছু মানুষ আমাদের জীবনে থেকে যায় না, কিন্তু তাদের জন্য অনুভূতিটা সারাজীবন থেকে যায়।”
জায়ান কিছুক্ষণ নীরব থেকে হঠাৎ প্রশ্ন করল,
— "যদি নতুন করে কেউ আপনাকে ভালোবাসতে চায়… তাকে কী একটা সুযোগ দেবেন?”
এমন কথায় সাফা ফট করে জায়ানের দিকে তাকাল। তার চোখে মুহূর্তেই ভেসে উঠল বিস্ময় আর অজস্র প্রশ্ন।
জায়ান অবশ্য দৃষ্টি সরাল না। ঠোঁটের কোণে রহস্যময় এক হাসি ঝুলিয়ে সে ধীর কণ্ঠে বলল,
— "কী হলো? এমনভাবে তাকাচ্ছেন কেন?"
সাফা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— "মনে হচ্ছে… আপনার কথার আড়ালে অন্য কোনো কথা লুকিয়ে আছে।”
তখনই অবন্তিকার তীক্ষ্ণ, খুনসুটিভরা কণ্ঠ ভেসে এলো—
"কিরে লাইলী-মজনু, আর কত দাঁড়িয়ে থাকবি? প্রেমালাপ শেষ হলে আমাদের দিকেও একটু নজর দিস!”চল এবার।
সাফাও সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
— "চুপ কর, অসভ্য মেয়ে! সব সময় শুধু খেপানোর ধান্দা!"
বলতে বলতেই সে এগিয়ে গিয়ে অবন্তিকার পাশে দাঁড়াল,
আর অবন্তিকা দুষ্টু হেসে সামান্য বাঁকা হয়ে সাফার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা জায়ানের দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে ইশারা করল। হয়তো বুঝাতে চাচ্ছে,কি হয়েছে..!
জায়ানও ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ফুটিয়ে হাতের আঙুল তুলে ইশারায় বুঝিয়ে দিল— 'অল রাইট,।
দু'জনের সেই নীরব বোঝাপড়া দেখে মনে হচ্ছিল, তারা যেন কোনো গোপন পরিকল্পনার সঙ্গী।
—————
অভ্র আলতো করে রাহাকে কোল থেকে নামিয়ে ছাদের উপর দাঁড় করিয়ে দিল। চোখের বাঁধনটা খুলে দিতেই সামনের দিক তাকিয়ে রাহার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। মনে হচ্ছিল, হৃদস্পন্দনের শব্দটা চারপাশেও শোনা যাচ্ছে,
সামনে যেন এক টুকরো স্বপ্নের রাজ্য! অত্যন্ত নান্দনিকভাবে সাজানো একটি টেবিল, যার ওপর সারি সারি সুস্বাদু খাবার রাজকীয় আয়োজনে পরিবেশিত। চারপাশে জ্বলছে অসংখ্য সুগন্ধি ক্যান্ডেল, তাদের মৃদু আলো আর মোহনীয় সুবাস পুরো পরিবেশটাকে করে তুলেছে আরও বেশি মায়াবী ও রোমাঞ্চকর।
রাহা যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। কী বলবে, কী করবে—সবকিছুই যেন ভুলে বসেছে। এমন আয়োজন তার কল্পনার সীমানাকেও ছাড়িয়ে গেছে। অভ্র তার জন্য এত কিছু করেছে—এটা ভাবতেই তার বুকের ভেতরটা অদ্ভুত এক অনুভূতিতে কেঁপে উঠল।
সে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল, চোখজোড়া বিস্ময়ে স্থির, ঠোঁট সামান্য ফাঁক হয়ে আছে। পুরো মানুষটা যেন প্রাণহীন কোনো পুতুল, কিংবা সময়ের গণ্ডিতে আটকে পড়া এক মূর্তি—শুধু অপলক দৃষ্টিতে সেই স্বপ্নময় দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে আছে।
টেবিলের পেছনে ছোট্ট একটি স্টেজ, তবে তার সৌন্দর্য ছিল চোখ ধাঁধানো। স্টেজের পেছনজুড়ে অসংখ্য তাজা ফুল দিয়ে তৈরি করা হয়েছে বিশাল এক লাভ-শেপ, । মাঝখানে নিপুণভাবে বসানো রয়েছে কিছু ঝলমলে লাইটিং, যদিও সেগুলো এখনও জ্বালানো হয়নি।
চারপাশে বইছে স্নিগ্ধ সন্ধ্যার মৃদুমন্দ বাতাস, যেন প্রকৃতিও আজ তাদের এই মুহূর্তটাকে আরও রঙিন করে তুলতে ব্যস্ত।
অভ্র ধীর পায়ে সামনে এগিয়ে এসে এক হাত বাড়িয়ে টেবিলের দিকে ইশারা করল, যেন নীরব ভাষায় বলছে— "এগিয়ে চল। এই আয়োজন শুধুই তোর জন্য।"
টেবিলের সামনে পৌঁছাতেই সে ভদ্রভাবে একটি চেয়ার টেনে দিল এবং চোখের ইশারায় বসতে বলল। রাহাও কোনো কথা না বলে ধীরে বসে পড়ল।
কেন যেন সবকিছুই তার কাছে অবাস্তব, স্বপ্নের মতো লাগছে। এ যেন তার বহুদিনের লালিত কোনো কল্পনা, কোনো গোপন ইচ্ছের বাস্তব রূপ।
সে একদৃষ্টিতে অভ্রের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখজোড়ায় বিস্ময়, মুগ্ধতা আর না-বলা হাজারো অনুভূতির ঝিলিক স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। যেন সে এখনও বিশ্বাসই করতে পারছে না— তার স্বপ্নগুলো সত্যিই আজ বাস্তবের রূপ নিয়েছে।
অভ্র হঠাৎ উঠে এসে রাহার পেছনে গিয়ে তার কানের পাশে আলতো করে তিনটি টকটকে লাল গোলাপ গুঁজে দিল। তারপর আবার সামনে এসে একদৃষ্টে তাকিয়ে মুগ্ধ কণ্ঠে বলে উঠল,
— "এবার… একদম পারফেক্ট লাগছে মাই লেডি। এখন তোকে দেখে মনে হচ্ছে সন্ধ্যার আকাশ থেকে কোনো পরী নেমে এসেছে।"
রাহার এভাবে তাকিয়ে থাকা দেখে
অভ্র প্লেটে খাবার তুলে দিতে দিতে দুষ্টু হেসে বলল ,
"কী ব্যাপার, আজ কি আমাকে একটু বেশিই হ্যান্ডসাম দেখাচ্ছে জান?”
রাহা মৃদু হেসে চোখ নামিয়ে নিল। তারপর আবার অভ্রের দিকে তাকিয়ে নরম কণ্ঠে বলে উঠল,
— "মাশাআল্লাহ… আমার জামাই তো বরাবর হ্যান্ডসাম!"
কথাটা শুনে অভ্রের ঠোঁটের কোণেও এক চিলতে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল।
অভ্র নিজ হাতে খাবার তুলে চামচটা রাহার দিকে বাড়িয়ে দিতেই রাহার চোখ দুটো চিকচিক করে উঠল। মুহূর্তেই সেখানে জমে উঠল একরাশ আনন্দাশ্রু।
অভ্র নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল তার প্রিয়তমার দিকে। যেন এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোকে হৃদয়ের গভীরে গেঁথে নিচ্ছে। তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য ছিল—নিজের ভালোবাসার মানুষটার চোখে সুখের ঝিলিক দেখা। সে প্রতিটি অনুভূতি, প্রতিটি নিঃশ্বাস, প্রতিটি স্পন্দন রাহার সঙ্গে একাত্ম হয়ে অনুভব করছিল।
"কিরে জান, হা কর। না হলে কিন্তু আর একটুও খাবার পাবি না।"
অভ্রের কথায় রাহা মিষ্টি করে হেসে মুখ খুলতেই সে আলতো করে এক চামচ খাবার তার মুখে তুলে দিল। দ্বিতীয়বার খাবার দিতে যেতেই রাহা নিজেই চামচটা নিয়ে অভ্রের দিকে বাড়িয়ে দিল।
হঠাৎ কী যেন মনে পড়তেই সে বলে উঠল, — "উপস! সরি…"
বলে তাড়াতাড়ি চামচটা নামিয়ে রেখে আরেকটি চামচ নিতে গেল। কিন্তু অভ্র তার হাতটা আলতো করে ধরে থামিয়ে দিয়ে বলল,
— "উহু… ওটাই লাগবে।"
কথাটা বলেই সে সেই একই চামচে খাবার তুলে নিজের মুখে দিয়ে দিল।
রাহা বিস্মিত চোখে তাকিয়ে বলে উঠল,
— "আরে… এটা তো এঁটো!"
অভ্র ঠোঁটের কোণে গভীর হাসি ফুটিয়ে নরম গলায় বলল,
— "তোর সবকিছুই আমার কাছে অমূল্য, প্রিয়। এখানে এঁটো বলে কিছু নেই। তুই আমার, তোর সবটুকুও আমার। আমাদের ভালোবাসায় পুরোনো বলে কোনো শব্দ নেই; প্রতিটা মুহূর্ত, প্রতিটা অনুভূতি আমার কাছে প্রতিদিন নতুন হয়ে ধরা দেয়।"
খাওয়া শেষ হতেই অভ্র ধীরে ধীরে রাহার হাত ধরে তাকে নিয়ে স্টেজের দিকে এগিয়ে গেল।
স্টেজের মাঝখানে এনে তাকে দাঁড় করিয়ে দিল। চারপাশের আলো, মৃদু বাতাস আর ভালোবাসায় ভরা সেই পরিবেশে হঠাৎই অভ্র তার সামনে এক হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল…
আর রাহা বিস্ময়, আবেগ আর অজানা এক সুখের শিহরণ নিয়ে স্থির চোখে তাকিয়ে রইল তার প্রিয় মানুষটার দিকে ।
ঠিক তখনই হঠাৎ করে আকাশের বুক চিরে ভেসে এলো হেলিকপ্টারের গম্ভীর শব্দ। প্রথমে সবাই অবাক হয়ে উপরের দিকে তাকাল। মুহূর্তের মধ্যেই দেখা গেল—দুটি হেলিকপ্টার ছাদের ঠিক ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে চক্কর দিচ্ছে।
পরের মুহূর্তেই যেন অলৌকিক কিছু ঘটে গেল।
হেলিকপ্টার দুটির দরজা থেকে ঝরনার ধারার মতো ঝরে পড়তে লাগল অসংখ্য টুকটুকে লাল গোলাপের পাপড়ি। লাল পাপড়িগুলো বাতাসে ভেসে ঘুরপাক খেতে খেতে নেমে আসছিল অভ্র আর রাহার ওপর। পুরো আকাশ যেন রক্তিম ভালোবাসায় রঙিন হয়ে উঠল।
চারপাশে উপস্থিত সবাই বিস্ময়ে নিঃশ্বাস বন্ধ করে সেই দৃশ্য দেখছিল। মনে হচ্ছিল, স্বয়ং প্রকৃতিও আজ তাদের ভালোবাসার সাক্ষী হয়ে গোলাপের বৃষ্টি নামিয়েছে।
রাহা আর অভ্র—দু'জনেরই হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক দ্রুততায় ছুটে চলেছে। আর ঠিক তখনই, অভ্রকে নিজের সামনে এক হাঁটু গেড়ে বসে থাকতে দেখে রাহা যেন বজ্রাহত হয়ে গেল। বিস্ময়ে তার চোখদুটি বড় হয়ে উঠল, যেন সে কোনো অলৌকিক দৃশ্য দেখছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে মাহাদী ও বাঁধনের ফোন একসঙ্গে কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটি আকস্মিক নোটিফিকেশন। দু'জনই কৌতূহলভরে তাতে ক্লিক করতেই তাদের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল—সেখানে সরাসরি লাইভ টেলিকাস্ট সম্প্রচারিত হচ্ছে!
অভ্রের শ্বাস-প্রশ্বাস এতটাই তীব্র হয়ে উঠেছে যে তার সমগ্র শরীর হালকা কাঁপছে। আজ সে তার সতেরো বছরের নিঃশর্ত, গভীর ভালোবাসার পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ ঘটাতে চলেছে।এই দিনটির জন্য সে কত প্রতীক্ষা করেছে, কত স্বপ্ন বুনেছে, কত আকাঙ্ক্ষা আর বাসনা হৃদয়ের গভীরে লালন করেছে—তার কোনো হিসাব নেই। অবশেষে বহু প্রতীক্ষিত সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আজ তার দুয়ারে এসে দাঁড়িয়েছে।
আজ তার হৃদয়ের একমাত্র অধিকারিণী, তার একান্ত প্রিয় নারীকে, বছরের পর বছর বুকের গহীনে জমিয়ে রাখা না-বলা অনুভূতি, অব্যক্ত প্রেম আর লুকিয়ে রাখা কথাগুলো উজাড় করে বলার পালা।
অভ্র ধীর ভঙ্গিতে নিজের একটি হাত রাহার দিকে বাড়িয়ে দিল।
রাহাও একরাশ কৌতূহল আর অদ্ভুত অনুভূতি নিয়ে নিজের কোমল হাতটি তার হাতের ওপর রাখল।
মুহূর্তেই অভ্র সেই হাত খানা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল, যেন আর কোনোদিন ছেড়ে দিতে চায় না।
চারপাশের সবকিছু তখন নিস্তব্ধ, শুধু দু'জনের দ্রুত হৃদস্পন্দনের শব্দ যেন বাতাসে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
রাহার চোখে চোখ রেখে, গভীর নিশ্বাস নিয়ে অভ্র তার বহুদিন ধরে হৃদয়ে লুকিয়ে রাখা কথাগুলো বলতে শুরু করল,
– “সতেরো বছর ধরে আমার প্রতিটা প্রার্থনায়, প্রতিটা হাসিতে আর প্রতিটা স্বপ্নে শুধু তুই ছিলি। হাজার মানুষের ভিড়েও আমার চোখ তোকেই খুঁজে ফিরেছে। ভালোবাসার আসল অর্থ আমি বুঝেছি তোকে দেখার পর।
আমি তোকে ভালোবাসার কোনো কারণ খুঁজি না,
কারণ তুই আমার কাছে কারণেরও উর্ধ্বে।
আমি চাই প্রতিটি সকাল তোর হাসি দিয়ে শুরু হোক, আর প্রতিটি রাত তোর নাম ভেবে শেষ হোক। তোর সাথে ঝগড়া, অভিমান, হাসি-কান্না—সবকিছু নিয়েই একটা পুরো জীবন কাটাতে চাই।আর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তোর হাতটা ধরে রাখতে চাই।
আমি নিখুঁত নই, কিন্তু তোকে সারাজীবন আগলে রাখার প্রতিশ্রুতি দিতে পারি। তাই আজ শুধু একটা প্রশ্ন—এই সতেরো বছরের অপেক্ষাটাকে কি তুই সারাজীবনের গল্পে বদলে দিবি? তুই
কি আমার জীবনের শেষ ঠিকানা হবি? তোর নামের পাশে আমার নামটা কি সারাজীবনের জন্য লিখতে দিবি জান??”
অভ্রের কথাগুলো শুনে রাহার চোখ বেয়ে অনায়াসেই অশ্রুধারা নেমে এলো। দু'জনই অপলক দৃষ্টিতে একে অপরের চোখে হারিয়ে রইল।
পাশ থেকে অবন্তিকা আর সাফা উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠল—
'কাম অন, রাহা! জাস্ট সে ইয়েস!'
জারিফ ও জায়ানের ঠোঁটের কোণে তখন প্রশান্তির এক তৃপ্ত হাসি লেগে আছে।
ঠিক তখনই হঠাৎ করে পুরো আকাশজুড়ে রঙিন আতশবাজি ফুটে উঠল। তাদের পেছনের লাইটিংয়ে জ্বলে উঠল—
"উইল ইউ বিমাই সোলমেট?”
পরমুহূর্তেই আকাশে ভেসে উঠল 'রাহা' নামটি।
রাহা যেন একের পর এক সুখের ঝটকা খাচ্ছে। কী বলবে, কী করবে, কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না।
রাহা অভ্রের হাত দু'টো আঁকড়ে ধরে তার সামনে নিজেও হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। চোখ বেয়ে অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ছে। কান্নাভেজা মুখে মাথা নেড়ে কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠল,
"ইয়েস, আই উইল…"
রাহার মুখ থেকে কথাটা শোনা মাত্রই অভ্রের ভেতর যেন প্রবল বজ্রাঘাত নেমে এলো। এক শীতল স্রোত তার সমগ্র শরীরজুড়ে কাঁপন তুলে দিল। দীর্ঘদিনের জমে থাকা কষ্ট, অপেক্ষা আর যন্ত্রণাগুলো মুহূর্তেই তার হৃদয়কে তোলপাড় করে দিল। শুকিয়ে আসা গলায় ঢোক গিলে কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠল,
— “সে দ্যাট অ্যাগেইন, জান”।
রাহা আবারও মৃদু হেসে বলল,
—“ইয়েস, আই উইল”।
অভ্রের চোখে তখন অবিশ্বাস আর আকুলতার ছাপ।
—“ওয়ান মোর… প্লিজ”।
এবার আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না রাহা। সমস্ত অনুভূতি এক করে জোরে চিৎকার করে বলে উঠল,
— “ইয়েস! আই উইল বি ইয়োর সোলমেট”।
কথাটা কানে আসতেই অভ্র যেন পৃথিবীর সমস্ত সুখ নিজের মুঠোয় পেয়ে গেল। আর এক মুহূর্তও নিজেকে আটকে রাখতে না পেরে সে ঝাঁপিয়ে পড়ল রাহার দিকে। শক্ত করে তাকে বুকে জড়িয়ে নিল,
যেন এই মানুষটাকে আর কখনো হারাতে চায় না।
তার চোখের কোণ বেয়ে টলমল করা কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। আবেগে কাঁপতে থাকা কণ্ঠে অভ্র ফিসফিস করে বলে উঠল,
— “আই লাভ ইউ, রাহা… আই লাভ ইউ সো মাচ”।
রাহাও এবার সব দ্বিধা-সংকোচ ভেঙে অভ্রকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আবেগমাখা কণ্ঠে বলে উঠে,
—“আই লাভ ইউ টু, অভ্ররাজ”।
ঠিক তখনই একজন তাদের সামনে মখমলি বাক্সে রাখা এক জোড়া কাপল রিং এগিয়ে দিল।
আংটিগুলো ছিল প্লাটিনামের তৈরি, যার মাঝখানে বসানো ঝলমলে ডায়মন্ড। চারপাশজুড়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হিরের খচিত কারুকাজে সেগুলো যেন হাজারো তারার আলো একত্রে ধারণ করে আছে। নরম আলোর ছোঁয়ায় হিরেগুলো চিকচিক করে উঠছে, যেন তাদের ভালোবাসারই দীপ্তিময় প্রতিচ্ছবি।
অভ্র গভীর মুগ্ধতায় রাহার বাম হাতের অনামিকায় আংটিটি পরিয়ে দিল। আলতো করে তার আঙুলে অধর ছুঁইয়ে দিল। আংটির ভেতরে সূক্ষ্ম অক্ষরে খোদাই করা ছিল— “A”
এরপর কাঁপা হাতে, অথচ পরিপূর্ণ ভালোবাসা নিয়ে রাহাও অভ্রের আঙুলে আংটিটি পরিয়ে দিল। সেই আংটির গায়ে খচিত ছিল— “R”
মুহূর্তেই চারপাশ হাততালির শব্দে মুখরিত হয়ে উঠল।
অভ্র রাহাকে পাশে দাঁড় করিয়ে নিজে স্টেজের একপাশে গিয়ে ক্যামেরার দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির বিজয়ী হাসি ফুটে উঠল।
— “কেমন লাগল তোদের। বিন্দুমাত্র লজ্জা-শরম থাকলে আজকের পর আর আমাদের পেছনে পড়ে থাকবি না। আর তোদের যদি ছেলে-মেয়ের এতই অভাব হয়, বলিস— আমি ব্যবস্থা করে দেব”।
কথাটা শুনে মাহাদী আর বাঁধন দু'জনই রাগে ফেটে পড়ল। হাতে থাকা ফোন দুটো সজোরে ছুড়ে মারল তারা।
মাহাদী দাঁতে দাঁত চেপে, রক্তচক্ষু নিয়ে বলে উঠল,
— “এবার তোকে আমি সত্যিই শোধে-আসলে বুঝিয়ে দেব, অভ্র”!
অন্যদিকে বাঁধনও ক্রোধে ফুঁসতে লাগল। তার চোখেমুখে প্রতিশোধের আগুন স্পষ্ট।
এই বিয়ে সে কিছুতেই হতে দেবে না, কিছুতেই না!
—————
অভ্র, রাহা আর তার বান্ধবীদের গাড়িতে তুলে দিয়ে বলল যেন তারা সোজা বাসায় চলে যায়।
তার এখন হাসপাতালে যেতে হবে।
‘হাসপাতাল’ শব্দটা শুনেই রাহার বুকটা ধক করে উঠল। মুখভর্তি আতঙ্ক নিয়ে সে তাড়াতাড়ি বলে উঠল
—“হাসপাতালে কেন যাবেন? কার কী হয়েছে? আমিও আপনার সঙ্গে যাব”?
অভ্র মৃদু হেসে তাকে আশ্বস্ত করল,
—“কারও কিছু হয়নি, জান। তুই একদম চিন্তা করবি না। খুব শিগগিরই আমি বাসায় ফিরে আসব।
রাহারা চলে যেতেই নিরাপত্তার জন্য জারিফকেও তাদের সঙ্গে পাঠানো হলো, যাতে পথে কোনো ধরনের অসুবিধা না হয়।
আর অভ্র? হাতে শক্ত করে পেনড্রাইভটা ধরে জায়ানের সঙ্গে মুখভরা প্রশান্তি আর আনন্দের দীপ্তি নিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা দিল।
আজকের এই অপার্থিব, সুন্দর মুহূর্তটা সে একজন বিশেষ মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চায়।
—————
বাড়িতে ফিরেই রাহা ফ্রেশ হয়ে বসতে না বসতেই দেখে শিফা আর আয়াত তার অপেক্ষায় আছে।
রাহাকে এত খুশি দেখে শিফা ভ্রু নাচিয়ে বলে উঠল,
— “ক্যান্ডেললাইট ডিনার! উহু, বনু… কেমন কাটল”?
রাহা লজ্জায় টুকটুকে লাল হয়ে গেল। বড় আপুদের সামনে কী বলবে বুঝে উঠতে পারছিল না। তবুও মৃদু হেসে বলল,
— “আজ তোমার ভাই আমাকে প্রপোজ করেছে, আপু”।
কথাটা শুনেই শিফা আনন্দে চিৎকার করে উঠল। মুহূর্তের মধ্যেই সে রাহাকে জড়িয়ে ধরে পুরো ঘর ঘুরতে লাগল। আর আয়াত বিছানায় বসে তাদের কাণ্ড দেখে মিটিমিটি হাসছিল।
রাহা হেসে বলল,
— “আরে আপু, পরে যাব তো! এবার থামো”।
শিফা সঙ্গে সঙ্গে রাহাকে নামিয়ে দিল। দু'জনেই ফট করে বিছানায় বসে পড়ল। তিনজনের মুখেই তখন তৃপ্তির উজ্জ্বল হাসি।
আয়াত মুচকি হেসে বলল,
— “আচ্ছা, আজকের জন্য এতটুকুই থাক। বাকিটা কালকে বিস্তারিত শুনব। এখন একটু বিশ্রাম নে”।
পুরো বাড়ি তখন গভীর নিদ্রায় মগ্ন। প্রায় রাত একটা বাজে, তখন অভ্র বাসায় ফিরল। চারপাশে নেমে এসেছে নিস্তব্ধতার চাদর। পরদিন আবার তাদের মেহেদির অনুষ্ঠান।
রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল অভ্র। কিন্তু আজ যেন তার চোখে ঘুমের কোনো ছোঁয়াই নেই।
কিছুক্ষণ অস্থিরভাবে এপাশ-ওপাশ করার পর আর থাকতে না পেরে সে নিঃশব্দে চলে গেল রাহার রুমে।
ভেতরে ঢুকে দেখে, রাহা আর আয়াত নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। চাঁদের মোলায়েম আলোয় রাহার শান্ত মুখটা আরও মায়াবী লাগছে।
রাহার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে অভ্র মনে মনে বলল,
— আমার ঘুম চুরি করে নিয়ে নিজে কী নিশ্চিন্তে, কী প্রশান্তিতে ঘুমাচ্ছে"।
রাহাও মাত্র এক ঘণ্টার মতো হলো ঘুমিয়েছে। সারাদিনের ঘটনাগুলো ভাবতে ভাবতেই কিছুক্ষণ আগে সে ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমিয়েছে। প্রচণ্ড ক্লান্ত থাকায় ঘুমটাও বেশ গভীর হয়েছে।অভ্র যখন আলতো করে রাহাকে কোলে তুলে দরজা পেরিয়ে বেরিয়ে আসছিল, ঠিক তখনই আয়াত চোখ মেলে তাকাল। দৃশ্যটা দেখে তার ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। কিছু না বলেই আবার চোখ বন্ধ করে নিল সে।
নিজের ঘরে এনে অভ্র খুব যত্ন করে রাহাকে বিছানায় শুইয়ে দিল। তারপর নিজেও তার পাশে শুয়ে পড়ে মাথাটা আলতো করে রাহার বুকে রেখে দিল। মুহূর্তেই যেন এক অদ্ভুত প্রশান্তি তাকে ঘিরে ধরল। নিজের প্রিয় মানুষের বুকে মাথা রেখে ঘুমানোর চেয়ে বড় শান্তি বোধহয় আর কিছুতেই নেই।
চোখ বন্ধ করে অভ্র মনে মনে বলল,
— “তোর আরেকটা স্বপ্ন পূরণ করার সময় এসে গেছে, জান। আমাদের বিয়ের দিন তোর জন্য আমার তরফ থেকে এটাই হবে সেরা উপহার”।
এরপর সে আরও শক্ত করে রাহাকে নিজের সাথে জড়িয়ে নিল।কিন্তু এতটা আঁকড়ে ধরায় রাহার যেন দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগল। বুকের ওপরও ভারী কিছু অনুভব হচ্ছিল। তাই ঘুমের মধ্যেই সে অস্বস্তিতে নড়েচড়ে উঠল।
অভ্রের চোখে তখন সবে ঘুম নেমে এসেছে। ঠিক সেই সময় রাহার অস্থির নড়াচড়ায় তার ঘুমটা ভেঙে গেল।বিরক্ত হয়ে অভ্র বলে উঠল,
— “স্টুপিড! এত নড়াচড়া করছিস কেন? একটু শান্তিতে ঘুমাতে দে”!
ধমকটা শুনেই ফট করে চোখ খুলে ফেলল রাহা। চোখ খুলতেই সে থমকে গেল। তার বুকের ওপর মাথা রেখে শুয়ে আছে অভ্র। সে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে, আর অভ্র মুখ উঁচু করে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
রাহা বিস্ময়ে হতবাক! চারপাশে একবার তাকিয়ে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করল, সে কোনো স্বপ্ন দেখছে না তো? কিন্তু এ তো সত্যি! অভ্র এখানে এলো কীভাবে?
সে বারবার পলক ফেলছে। উঠে বসতে যেতেই টের পেল, একচুলও নড়তে পারছে না।
অভ্র গম্ভীর স্বরে বলল,
— “মেজাজ গরম করবি না কিন্তু। অনেক কষ্টে শান্ত আছি, আমাকে শান্তই থাকতে দে”।
এবার রাহা বুঝল, সবকিছুই বাস্তব।
সে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
— “আপনার মতো এত ভারী মানুষের ওজন আমার মতো একটা মেয়ে কীভাবে বহন করবে? আমার তো এসবের কোনো অভ্যাস নেই। এবার সরুন”।
অভ্রের ঠোঁটে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।
— “অভ্যাস থাকবে কী করে? অভ্যাস করানোর মতো কেউ ছিল নাকি? আমি যদি দেশে থাকতাম, এতদিনে তোকে সব অভ্যাস করিয়ে দিতাম। তবে এখনও দেরি হয়নি… আজ থেকে শুরু করে দে। এখন থেকেই আমার ভার নেওয়ার অভ্যাস করে নে”।
রাহা বলে উঠল,
— “আচ্ছা, ওয়েট, আপনি দেশে ছিলেন না কেন”?
প্রশ্নটা শুনতেই অভ্র হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। অতীতের কিছু তিক্ত স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠতেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। হাতের মুঠি ক্রমশ দৃঢ় হয়ে উঠল, আর কপালের রগগুলো স্পষ্টভাবে ফুলে উঠল।
রাহা অভ্রের বদলে যাওয়া অভিব্যক্তি গভীরভাবে লক্ষ্য করল। এখন সে অন্তত নিশ্চিত—কিছু একটা ঘটেছিল। এমন কিছু, যা অভ্রকে পুরো নয় বছর দেশের বাইরে থাকতে বাধ্য করেছে। শুধু পড়াশোনা, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে আরও কোনো অন্ধকার সত্য? আর তার সামান্য প্রশ্নেই এমন প্রতিক্রিয়ার কারণটা তাকে জানতেই হবে।
অভ্র সরে যেতে উদ্যত হতেই রাহা আলতো করে তার মুঠোবদ্ধ হাতের ওপর নিজের হাত রাখল।
— “রিল্যাক্স”।
মৃদু স্বরে বলেই সে অভ্রের মাথাটা টেনে নিজের বুকে চেপে ধরল।
রাহার এই অপ্রত্যাশিত স্নেহময় আচরণে অভ্রের দেহের সমস্ত কঠোরতা ধীরে ধীরে গলে যেতে লাগল। তার শক্ত হয়ে থাকা মুঠি শিথিল হয়ে এলো, কপালের টানও মিলিয়ে গেল। যেন রাহার বুকে মাথা রাখতেই তার অস্থির হৃদয়টাও একটু শান্তির আশ্রয় খুঁজে পেল।
রাহা খুবই ধীরগতিতে নিজের আঙুলগুলো অভ্রের চুলে চালিয়ে বিলি কেটে দিতে লাগল। আজ সেখানে কোনো জোর, কোনো বাধ্যবাধকতা নেই; সবটুকুই তার নিজের ইচ্ছায়, নিজের মনের টানে।
মুহূর্তটা এতটাই শান্ত আর প্রশান্ত ছিল যে, একসময় অজান্তেই দু'জনের চোখে ঘুম নেমে এলো। একে অপরের উষ্ণতার মাঝে জড়িয়ে তারা দু'জনই গভীর নিদ্রায় তলিয়ে গেল।
—————
"বিয়ের পর রাহাকে নিয়ে আমি এই দেশে থাকব না।"
অভ্রের কণ্ঠে উচ্চারিত কথাটি যেন মুহূর্তেই পুরো ড্রয়িংরুমে এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণের সৃষ্টি করল।
চারপাশের পরিবেশ থমথমে হয়ে উঠল।
সেখানে উপস্থিত ছিলেন অভ্রের বাবা-মা।
অন্যদিকে, নাজিরা বেগম, রাহার আম্মুকে নিয়ে বাইরে গিয়েছেন। ঘরে ছিলেন শুধু রাহার ছোট আব্বু।
আর আয়াত, সাফা, রাহা ও তার দুই বান্ধবীকে নিয়ে ইভান গেছে পার্লারে।
অভ্রের কথা শুনে রাহার ছোট আব্বু বলে উঠলেন,
— "এসব কী বলছিস, অভ্র?"
অভ্র দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিল,
— "আমি একদম ঠিকই বলছি, ছোট চাচ্চু।"
ছেলের মুখে এমন কঠিন সিদ্ধান্তের কথা শুনে আফসানা বেগম যেন ভেতর থেকে ভেঙে চুরমার হয়ে গেলেন। তিনি ধপ করে সোফায় বসে পড়লেন এবং চোখ বেয়ে নীরব অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়তে লাগল।
এবার আমন খান গম্ভীর স্বরে বললেন,
— "কেন এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছ, অভ্র? নয়টা বছর তো আমাদের থেকে দূরেই কাটিয়ে এলে। এবারও কি আমাদের ছেড়ে চলে যাবে?"
অভ্রের চোখে তখন জমে থাকা অভিমান আর ক্ষোভ স্পষ্ট।
— "আমি কি নিজের ইচ্ছায় দূরে ছিলাম? আপনারাই তো আমাকে বাধ্য করেছিলেন!"
আমান খান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— "কেন সেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল, সেটা তুই খুব ভালো করেই জানিস, অভ্র।”
— "আপনারা এখনও আমাকে বিশ্বাস করেন না, আমি জানি। তবে আর মাত্র দুটো দিন… এই অবিশ্বাসের অধ্যায়েরও সমাপ্তি ঘটবে। যাদের জন্য আমি আমার প্রাণের মানুষটার থেকে বছরের পর বছর দূরে ছিলাম, এবার তাদেরও বোঝার সময় এসেছে—প্রিয়জনকে হারিয়ে, তার থেকে দূরে থেকে বেঁচে থাকার যন্ত্রণা ঠিক কেমন!"
অভ্রের কণ্ঠ ক্রমশ ভারী হয়ে উঠল।
— "প্রতিটা মুহূর্ত, প্রতিটা নিঃশ্বাসে আমি সেই কষ্টটা অনুভব করেছি, চেয়ারম্যান সাহেব।"
আমন খান ব্যথিত স্বরে বললেন,
— "অভ্র, তুমি ভুল বুঝছ। আমরা কেউই তোমাকে অবিশ্বাস করিনি। সেদিনের পরিস্থিতি এমনই ছিল যে আমরা বাধ্য হয়েছিলাম ওই সিদ্ধান্ত নিতে। সবকিছুই করেছি তোমার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা ভেবে।"
অভ্র তিক্ত হাসল।
— "উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ? মাই ফুট! আমার কথা শোনার প্রয়োজনই তো আপনারা মনে করেননি। আমার অনুভূতি, আমার সত্য—কোনোটারই মূল্য আপনাদের কাছে ছিল না।"
একটু থেমে সে দৃঢ় কণ্ঠে আবার বলল,
— "তাই আজ আমিও আপনাদের কোনো কথা শুনব না। আমি আমার বিবাহিত স্ত্রীকে নিয়ে অনেক দূরে চলে যাব। তবে যাওয়ার আগে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করেই যাব… যেন আর কখনো কেউ আমার সত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস না পায়।"
আসান খান বলে উঠলেন,
–“কি এমন সত্যি অভ্র?
আর দুটোদিন অপেক্ষা করো চাচ্চু,প্লিজ আর কিছু জিজ্ঞেস করো না।
কথাগুলো বলেই অভ্র আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। প্রচণ্ড অভিমান আর জমে থাকা ক্ষোভ বুকে নিয়ে সে দ্রুত স্থান ত্যাগ করল। তার চলে যাওয়ার শব্দটুকুও যেন ড্রয়িংরুমের নিস্তব্ধতাকে আরও ভারী করে তুলল।
আসান খান ও ভাতিজাকে আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না। তখনই তার একটা জরুরী ফোন আসলে বাহিরে চলে যায়।
এদিকে অভ্রের মা এতক্ষণ নীরবই ছিলেন। তিনি কোনো কথা বলেননি, শুধু সবার কথা গভীর মনোযোগে শুনে গেছেন। তারা তো সবসময়ই ছেলের মঙ্গল চেয়েছিলেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত অভ্রের মনে তাদের নিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারণা জন্ম নিয়েছে। এখন তাকে থামানোর ক্ষমতা একমাত্র রাহারই আছে।
চোখের কোণের অশ্রুবিন্দু মুছে স্বামীর দিকে দৃঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে তিনি বললেন,
— “তুমি কোনো দুশ্চিন্তা কোরো না। অভ্র কোথাও যাবে না।”
আমান খান বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
— মানে?
তিনি মৃদু কিন্তু আত্মবিশ্বাসী হাসি দিয়ে বললেন,
— এবার যা করার, রাহাই করবে।
স্ত্রীর কণ্ঠের অটল বিশ্বাস দেখে তিনিও নিশ্চিন্ত হয়ে তার কথায় সম্মতি জানালেন।
কিছুক্ষণ পর রাহারা বাসায় ফিরতেই চারপাশ যেন মুহূর্তেই প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠল।
সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো রাহার দিকে। অলিভ সবুজ রঙের শাড়িতে আজ তাকে অপার্থিব সুন্দর লাগছে। তার সঙ্গে মানানসই দোপাট্টা আর স্নিগ্ধ ফুলের গহনা যেন তার সৌন্দর্যে অন্যরকম এক মাধুর্য যোগ করেছে। আজ যেহেতু মেহেদী অনুষ্ঠান, তাই ভারী সাজসজ্জার বদলে সে বেছে নিয়েছে একেবারে সরল অথচ মোহনীয় আয়োজন।
আর বাকিরাও রঙের সামঞ্জস্য রেখে ভিন্ন ভিন্ন নকশার শাড়িতে নিজেদের সাজিয়ে নিয়েছে।
সবাই ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে আছে, শুধু অভ্রের অপেক্ষায়।
হঠাৎই আফসানা বেগম মুচকি হেসে এগিয়ে এলেন রাহার কাছে। তারপর দুই হাত ঘুরিয়ে নজর কাটার ভঙ্গিতে থু থু দিয়ে বললেন,
— “আল্লাহ আমার ছেলের বউটাকে সব বদনজর থেকে হেফাজত করুন। কারও কুদৃষ্টি যেন না লাগে আমার পরীর মতো বউমার গায়ে।”
তার কথায় রাহার গাল লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল। মাথা নিচু করে মৃদু হাসল সে।
আফসানা বেগম গর্বভরা কণ্ঠে রাহার দিকে তাকিয়ে ইচ্ছে করেই বলতে শুরু করলে,
— “আমার ছেলে কিন্তু ছোটবেলা থেকেই সবার থেকে আলাদা। আমার ছেলে আমার গর্ব, আমার অহংকার। আমার ছেলের মতো ছেলে লাখে নয়, কোটিতে একটা পাওয়া যায়। আমার ছেলে কখনো ভুল মানুষকে নিজের জীবনে জায়গা দেয় না, আর যাকে একবার আপন করে নেয়, তাকে সারাজীবন বুক দিয়ে আগলে রাখে। তাই বলছি, আমার ছেলের মতো জীবনসঙ্গী পাওয়া সত্যিই সবার কপালে জোটে না। আর আমার ছেলে যেহেতু তোকে নিজের করে নিয়েছে, তাহলে বুঝে নেয় তুই কতটা ভাগ্যবতী।”
কথাগুলো শুনে রাহার ঠোঁটের কোণে লাজুক হাসি ফুটে উঠল।রাহা বারবার তার শাশুড়ি, অর্থাৎ বড় আম্মুর মুখে 'আমার ছেলে, আমার ছেলে' কথাটা শুনছিল। অবশেষে আর চুপ থাকতে না পেরে হঠাৎ করেই বলে উঠল—
Jab tak beta mummy bole
Tab tak beta tera hai
Tab tak beta tera hai
Ab tera beta darling bole
Ab tera beta mera hai
Ab tera beta mera hai
Beta beta mat kar saasu
Ab tera beta mera hai!
রাহার মুখে এমন গান শুনে সবাই প্রথমে হতবাক হয়ে গেল। যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য পুরো পরিবেশটাই চুপ হয়ে গেলো। পরক্ষণেই চারপাশ জুড়ে হাসির ফোয়ারা ছুটে গেল।
রাহার বড় আম্মু তাকে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে আদুরে গলায় বললেন, —
"আহা! এ তো দেখি একেবারে ডাঁটপাকা মেয়ে! বয়সটা যতই কম হোক, কথাবার্তা আর চালচলনে একেবারে পাকা! মেয়েটা যেমন চটপটে, তেমনি ভীষণ দুষ্টুও!"
তার কথা শেষ হতেই উপস্থিত সবাই আবারও হো হো করে হেসে উঠল। কেউ হাসতে হাসতে পেট চেপে ধরেছে, কেউ চোখের কোণে জমে ওঠা পানিটুকু মুছে নিচ্ছে।
আর এদিকে রাহা? লজ্জায় যেন মাটির সঙ্গে মিশে যেতে চাইছে। তার ফর্সা গাল দুটো টকটকে লাল আভায় রাঙা হয়ে উঠেছে। মাথা নিচু করে সে ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর অসহায় দৃষ্টিতে একবার সবার দিকে তাকাচ্ছে ।
তখনই সবাই দেখতে পেল, অভ্র ধীর পায়ে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। তার পরনে সাদা পাঞ্জাবির ওপর অলিভ রঙের নকশাদার কোটি, পায়ে কালো লোফার।
তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রাহার দিকে তাকিয়ে এগিয়ে আসতে আসতে সে মুচকি হেসে বলে উঠল,
— "ইয়েস, জান! আই অ্যাম অলওয়েজ রেডি টু কল ইউ… ডার্লিং।"
অভ্রের কণ্ঠস্বর কানে যেতেই রাহা লজ্জায় মাথা আরও নিচু করে ফেলল। আর অভ্র এসে তার ঠিক পাশে দাঁড়াতেই যেন চারপাশের সমস্ত আলো-ঝলমল, কোলাহল আর মানুষের ভিড়কে হার মানিয়ে দিল তাদের জুটি। দু'জনকে পাশাপাশি দেখে উপস্থিত সবার দৃষ্টি মুহূর্তেই তাদের ওপর গিয়ে স্থির হলো।
চারদিকে হাসি-ঠাট্টা, খুনসুটি আর আনন্দের রেশ আরও গাঢ় হয়ে উঠল। আর সেই প্রাণোচ্ছল পরিবেশের মাঝেই লজ্জায় রাঙা রাহার মুখখানা যেন সবার ঠোঁটে নতুন করে হাসির উপলক্ষ হয়ে দাঁড়াল। তার নত চোখ, লাল হয়ে ওঠা গাল আর মিষ্টি অপ্রস্তুত ভাব মুহূর্তটাকে আরও মোহময়, স্নিগ্ধ ও হৃদয়ছোঁয়া করে তুলল।
—————
মাহাদী আর বাঁধন তৃপ্ত মুখে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এলো। তাদের চোখেমুখে ফুটে উঠেছে এক অদ্ভুত উল্লাস। পরিকল্পনার অর্ধেক ইতোমধ্যেই সফল হয়েছে, আর বাকি অংশটুকুও এই দু'দিনের মধ্যেই সম্পন্ন হয়ে যাবে।
তারপর… তাদের বহু প্রতীক্ষিত মানুষ দু'জনও আর দূরে থাকবে না।
একবার পরস্পরের দিকে তাকাতেই দু'জনের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে এক রহস্যময়, কুটিল হাসি ফুটে উঠল। সেই হাসিতে যেন লুকিয়ে ছিল কোনো অজানা ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত, কোনো গোপন পরিকল্পনার বিজয়ের পূর্বাভাস।
·
·
·
চলবে……………………………………………………