নিজের রুমের ডিভানে হেলান দিয়ে ল্যাপটপে গভীর মনোযোগে কাজ করছে অভ্র। তার আঙুলগুলো দ্রুতগতিতে কিবোর্ডের ওপর ছুটে চলেছে, যেন চারপাশের কোনো কিছুর প্রতিই তার খেয়াল নেই।
ঠিক তখনই নিঃশব্দ পায়ে অভ্রের পেছনে এসে দাঁড়াল রাহা। অভ্র আগেই তার উপস্থিতি টের পেয়েছে, কিন্তু এমন ভাব করে ল্যাপটপে মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে লাগল যেন কিছুই জানে না।ধীর পায়ে আরও একটু এগিয়ে এসে ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমিভরা হাসি ফুটিয়ে দুইহাত মুঠো ভর্তি রং নিয়ে কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই অভ্রের গাল সহ পুরো মুখে মেখে দিল।
আকস্মিক ঘটনায় অভ্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে গেল। কী ঘটল, তা বুঝে ওঠার আগেই রাহা দ্রুত কয়েক কদম দূরে সরে দাঁড়াল। অভ্রের বিস্ময়ভরা মুখের দিকে তাকিয়ে সে খিলখিল করে হেসে উঠল।
নিজের ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে রাহার দিকে তাকাতেই রাহা একদম চুপ হয়ে গেলো। এতক্ষণ ধরে সে একটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ফাইল নিয়ে ব্যস্ত ছিল, কাজটা প্রায় সমাপ্তির পথে—আর মাত্র পাঁচ মিনিট! কিন্তু তার এই পাগলী গাধীটা ঝড়ের বেগে এসে মুহূর্তেই সব ওলটপালট করে দিল।
রাহা মুখ বন্ধ করে বলে উঠল,
“কখন থেকে অপেক্ষা করছি, অথচ আপনার নামার কোনো নাম গন্ধ নেই। এবার বুঝুন ঠেলা কাকে বলে!যেহেতু কাজ নিয়েই আপনার এত ব্যস্ততা, এই নিন—আরও কিছু কাজ আপনার জন্যে। আমার দিক থেকে সব হিসাব চুকতা!”
বলেই রাহা সেখান থেকে চলে যেতে উদ্যত হতেই অভ্র বিদ্যুৎগতিতে সামনে ঝুঁকে এক ঝটকায় তার কোমরটা টেনে নিজের দিকে চেপে ধরল। মুহূর্তের মধ্যে নিখুঁত টানে তাকে ঘুরিয়ে নিজের কোলের ওপর বসিয়ে নিল। আচমকা ভারসাম্য হারিয়ে দুজনেই ধপ করে ডিভানে বসে পড়ল।অভ্রের কোলের উপর রাহা।
সবকিছু এত দ্রুত ঘটল যে রাহা বুঝে ওঠারও সুযোগ পেল না। বিস্ময়ে তার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল, আর অভ্রের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক রহস্যময়, দুষ্টুমিভরা হাসি।
রাহা যেন মুহূর্তেই জমে গেল। পুরো শরীর শক্ত হয়ে এলো, নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য সে ছটফট করছে, শরীর মোচড়াতে শুরু করলো,কিন্তু যতই সে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে, ততই অভ্রের শক্ত আঙুলের বাঁধন আরও দৃঢ় হয়ে উঠছে—
রাহার এমন আচরণে অভ্র ধৈর্য হারিয়ে একটু বিরক্ত স্বরে উঠে দাঁড়াল।
“তোর ধৈর্যটা বরাবরের মতোই একদম কম, রাহা…
আর আমার মতো হলে কী করতি? যে মানুষটা কারও জন্য টানা সতেরো বছর ধরে অপেক্ষা করছে—তার সহ্যশক্তির কাছে এইটুকু তো কিছুই না।"
রাহা নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করল—
“মানে ?কে অপেক্ষা করছে আর কার জন্য??”
অভ্র ঠোঁট বাঁকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল—
“বাদ দে। তোর এই মোটা মাথায় এসব ঢুকবে না।
এখন যেহেতু অন্যায় করেছিস, শাস্তি তো পেতেই হবে।
রাহা সাথে সাথে মুখ শক্ত করে প্রতিবাদ করে উঠল
“এহ! বললেই হলো আমি অন্যায় করেছি?
যা করেছি, ঠিকই করেছি। আপনি তো আসছিলেন না।
সে মুখ বাঁকিয়ে, অভিমানের সুরে যোগ করল—
“যার বিয়ে তারই হুশ নেই, আর পাড়া পড়শির ঘুম নেই।আপনার বিয়ে, অথচ আপনাকেই খুঁজে পাওয়া যায় না—হুঁ!”
অভ্র ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে বলল,
—ওহ, এই কথা! আমার কাজ প্রায় শেষ দিকে ছিল। তুই সব ভেস্তে দিয়েছিস।তা এতক্ষণ ধরে যে বিয়ে বিয়ে বলে মুখে খই ফুটাচ্ছিস, বিয়ের পরের কোনো দায়িত্বের কথাও কি ভেবেছিস? বিয়ে তো আমাদের দু'দিন আগেই হয়ে গেছে। আজকের এই আয়োজনটা শুধু লোক দেখানো একটা আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। কিন্তু আসল কাজটা এখনো বাকি রয়ে গেছে।
—তাহলে আর দেরি কেন? শুভ কাজ যখন করতেই হবে, তাহলে আজই না হয় সেই অসমাপ্ত অধ্যায়টা সম্পূর্ণ করে ফেলি! যা এতদিন থেমে ছিল, এবার তার পরিণতি সামনে আসুক।
চলে আসিস রাতে প্লিজ জান।” — বলেই অভ্র হালকা ঝুঁকে নিজের গালটা রাহার গালের সাথে ঘষে দিল। মুহূর্তেই রাহার গালে তার ছোঁয়ার ছাপ, রঙের আভা যেন মিশে একাকার হয়ে গেল। অভ্র গাল থেকে কিছু রং নিয়ে রাহার গলায় লাগিয়ে দিলো,হাত টা আরেকটু গভীরে যেতেই রাহা সঙ্গে সঙ্গে তার নিজের হাত দিয়ে চেপে ধরে কটমট করে বলে উঠল,
“অসভ্য লোক! কী করছেনএসব? একদম বেহায়ার মতো আচরণ করছেন—লজ্জা-শরম কিছুই নেই আপনার!”
অভ্র ঠোঁটের কোণে এক বাঁকা, আত্মবিশ্বাসী হাসি টেনে শান্ত গলায় বলল,
“আর তুই মাঝে মাঝে যা করিস… সেটা কি তবে শালীনতা?
এতে রাহার মুখ এক মুহূর্তে বন্ধ হয়ে যায়। সে যেন হঠাৎ থমকে যায়—কি বলবে, কিভাবে বলবে কিছুই মাথায় আসে না। লজ্জায় মূর্ছা যাচ্ছে।
কিছুটা গলা নামিয়ে আবার বলে উঠে,
“আপনার থেকেই তো দেখা আর আপনার থেকেই শিখা। আমার কোনো দোষ নেই—আমি একদমই নির্দোষ!”
অভ্র তখন তার কথা মাঝপথেই কেটে দিয়ে ঠান্ডা গলায় বলে উঠে,
—”এবার এটাও বলবি যে, তখন তোর আবেগ কাজ করছিল, বিবেক না? নাকি দুটোকে তালাবন্দি করে রেখে এসেছিস? আমার তো মনে হচ্ছে, আবেগ আর বিবেক—দুটোতেই বেশ ভালোই জং ধরে গেছে!”
রাহা শান্তভাবে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়—অর্থাৎ “হ্যাঁ”।
অভ্র এক গভীর নিঃশ্বাস ফেলে, ঠোঁটের কোণে তীক্ষ্ণ বিরক্তির ছায়া টেনে বলে উঠল,
“গাধী কোথাকার…”
রাহা কোনো উত্তর না দিয়ে ধীরে ধীরে নিজের শরীরটা অভ্রের কাঁধের দিকে এলিয়ে দিলো। তার এই নীরব, অনায়াস আশ্রয় নেওয়াটা যেন মুহূর্তেই বাতাস বদলে দিলো।
অভ্রও আর দেরি করল না—তৎক্ষণাৎ দৃঢ়, ও শক্তভাবে তাকে নিজের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে নিলো। তার হাতের গ্রিপে একধরনের অধিকার আর নিরাপত্তার স্পষ্ট ছাপ।
রাহার চুলের ভাঁজে মুখ ডুবিয়ে অভ্র গভীরভাবে শ্বাস নিচ্ছে—যেন সেই ঘ্রাণেই সব অস্থিরতা থেমে যাচ্ছে,ভেতরের সব উত্তাপ শান্ত হয়ে আসছে।
এটার চেয়ে বড় কোনো মাদকতা আর নেই।
তখনই তার কানে ভেসে এলো—
“অভ্র ভাই…”
“হুম, জান?”
“আমি তো কখনো প্রেম করিনি।আমার ভীষণ ইচ্ছা—একটা প্রেম করার।”
অভ্র ভ্রু কুঁচকে তৎক্ষণাৎ বলে উঠল,
“তো কর।”
রাহা শান্তভাবে বলল,
“ছেলে এনে দেন।”
কথাটা শেষ হতেই অভ্র ঝট করে মাথা ঘুরিয়ে তীক্ষ্ণ গলায় বলে উঠল,
“এক লাত্থি দিয়ে তোর মাজার সব হাড়গোড় ভেঙে প্রেম ছুটাবো, সালি। আমার বউ হয়ে আরেক ছেলের সাথে প্রেম—একদম জানে মেরে ফেলব!”
রাহা হেসে ফেলল, চোখে দুষ্টুমি ভরা ঝিলিক—
“তাহলে কার সাথে করব?”
অভ্র এক মুহূর্তও দেরি না করে দৃঢ় স্বরে বলল,
“আমার সাথে করবি।”
“কিন্তু আমাদের তো বিয়ে হয়ে গেছে।”
অভ্র ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“বিয়ে হয়ে গেলে কি স্বামীর সাথেই প্রেম করা যায় না? বরং সেটাই তো সবচেয়ে খাঁটি, সবচেয়ে পবিত্র প্রেম—প্রতি মুহূর্তে যার ভেতর সওয়াব আর ভালোবাসা লেখা থাকে।”
রাহা একটু ভেবে ধীরে বলল,
“আপনি তো আমাকে কখনো স্পেশালভাবে প্রপোজই করেননি…”
আচ্ছা, রাহা বলতো ,তোর কাছে ভালোবাসা মানে কী?
রাহা দুষ্টু হেসে অভ্রের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল—
“Love is like bubblegum…
First taste… finally waste।”
বলেই অভ্রের কাঁধেই চিত থাকা অবস্থায় হাসতে থাকে।
উত্তর শুনে এবার অভ্র ইচ্ছে করে বলে উঠে,
“তুই কি ভাবছিস, তোকে স্পেশাল ভাবে প্রপোজ করতে হবে? সর এখান থেকে।”
বলেই অভ্র রাহাকে কোল থেকে নামিয়ে দিল।
রাহা কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল, যেন কথাগুলো ঠিক বিশ্বাসই করতে পারছে না।
—”কি হলো এটা? সারাক্ষণ জান-জান করে ডাকেন, আর এখন বলছেন আমি স্পেশাল কেউ নই!
তার গলায় অভিমানের সুর আরও গাঢ় হয়ে উঠল।
—”ঠিক আছে… আপনার এই কথাটা আমি মনে রাখব। আর কখনো আমার কাছে আসবেন না, বলে দিলাম!”
রেগে হনহন করে চলে গেলো
রাহা চলে যেতেই অভ্র হাসতে হাসতে বলে উঠে,
“এইরে… আমার বাঘিনীকে তো দেখি রাগিয়ে দিলাম।”
পাশ থেকে ফোনটা তুলে নিয়ে গম্ভীর অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলে উঠল,
“ঠিক সাতটার মধ্যে যেন সবকিছু রেডি হয়ে যায়। আমি কোনো ভুল দেখতে চাই না।”
ওপাশ থেকে উত্তর দেওয়ার সুযোগ না দিয়েই অভ্র কলটা কেটে দিল।
—————
হলির সকালে চারপাশটা রঙের হালকা আবেশে ভরে আছে। হাসি, দৌড়াদৌড়ি আর দুষ্টুমির শব্দে পুরো বাড়িটা যেন এক উৎসবের গল্প হয়ে উঠেছে।
অভ্র একদম সাদা কুর্তা—পরিপাটি করে ইস্ত্রি করা, শরীরে নিখুঁতভাবে ফিট করা। সাথে সাদা পায়জামা, পুরো লুকটাকে আরও ক্লাসি করে তুলেছে। গলায় সাদা স্কার্ফট ঝুলানো, চুল গুলো সুন্দর করে সেট করে একদম রেডি হয়ে নিচে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তাকে এখন জরুরি একটি কাজে একটু অফিসে যেতে হবে। তারপর আবার বাসায় ফিরে প্রোগ্রামের ফটোশুটসহ আরও কিছু আয়োজন আছে–শিফা সেগুলোর কথাই একটু আগে মনে করিয়ে দিয়ে গেছে।
সে মাত্র এক ঘণ্টার জন্য বের হবে। প্রয়োজনটা এতটাই জরুরি যে, তা না হলে এই মুহূর্তে এক পা-ও বাড়ির বাইরে রাখত না। কাজটা শেষ করেই আবার সবার সঙ্গে যোগ দেবে–এমনটাই ভেবেছে সে তাই প্রোগ্রাম লুকেই বের হবে।
শিফাও ভাইয়ের কথা শুনে আর কিছু বলল না। এক ঘণ্টার জন্যই তো যাচ্ছে, এর মধ্যে আর কী-ই বা হবে! কাজ শেষ করেই তো ফিরে আসবে.।
নিচেই গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছে জারিফ।
এদিকে এরই মধ্যে রাহার বান্ধবীরাও এসে গেছে। আজ সবাই মিলে জমিয়ে হলি খেলবে। প্রত্যেকের পরনে তুষার-সাদা চুড়িদার, যেন রঙের উৎসবকে বরণ করে নেওয়ার জন্যই তাদের এই সাজ।
রুম থেকে বের হওয়ার মুহূর্তে অভ্র ফোনে কথা বলতে বলতে জানিয়ে দিল, সে এখনই বের হচ্ছে। ঠিক তখনই রাহার মাথায় দুষ্টু, দুরন্ত এক বুদ্ধির ঝিলিক খেলে গেল। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চেনা হাসি—যেটা স্পষ্ট বলে দিচ্ছিল, এবার অভ্রের জন্য বিশেষ কিছু অপেক্ষা করছে।অবন্তিকা আর সাফা কে টেনে নিয়ে ছাদে চলে গেলো।
অভ্র বাড়ির গেটের সামনে এসে দাঁড়াল। কানে তখনও ব্লুটুথ সংযুক্ত, কারও সঙ্গে গম্ভীর স্বরে কথা বলছিল। মুখে স্পষ্ট গাম্ভীর্যের ছাপ।অভ্রকে এতটা সিরিয়াস দেখে জারিফও ধীর পায়ে তার দিকে এগিয়ে এলো।
ঠিক তখনই—
ঝপাৎ!
কোথা থেকে যেন এক বালতি রঙ মেশানো পানি এসে দু'জনের মাথা থেকে পা পর্যন্ত ভিজিয়ে দিল।
কয়েক সেকেন্ডের জন্য দু'জনই স্তব্ধ হয়ে গেল। বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে নিজেদের দিকে তাকিয়ে রইল।
অভ্র মাথা তুলে দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল—
"হোয়াট দ্য... ফা*ক!"
জারিফও মুহূর্তের জন্য দিকবিদিকশূন্য হয়ে গেল।
হঠাৎ এমন কাণ্ডে সে যেন কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। কে তাদের গায়ে পানি ঢেলে দিল? কার এত বড় দুঃসাহস!
হাসির কলতান কানে আসতেই দু'জন উপরের দিকে তাকাল। আর তাকিয়েই দেখল—তিন বাঁদর হো হো করে হাসছে।
বাড়ির কিছু মেহিমান তখন বাগানে উপস্থিত ছিল।পানি পড়ার শব্দ শুনে সবার দৃষ্টি তখন বাড়ির গেটের দিকেই নিবদ্ধ হয়ে গেলো ।হুট করে এমন একটি কান্ড দেখেই সবাই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।
আয়রা আর জায়রা তো হাসতে হাসতে পেট চেপে মাটিতে গড়াগড়ি খাওয়ার উপক্রম।
অভ্র রাগে গজগজ করে বলে উঠল, — দাঁড়া,তোকে দেখাচ্ছি মজা!
বলেই গম্ভীর গলায় নির্দেশ দিল ,
— এই মুহূর্তে, বাগানের সুইমিং এরিয়াটা খালি চাই।
জারিফের দিক তাকিয়ে বলে উঠে,
" মিটিং ক্যান্সেল করে ২০ মিনিটের মধ্যে পঞ্চাশ বস্তা রঙের ব্যবস্থা কর।আজকে সেই হলি খেলা হবে।
কথা শেষ করেই বাড়ির দিকে তেড়ে দিলো এক দৌড়।
রাহা অভ্রের এমন চেহারা আর হুমকি দেখে আঁতকে উঠে বলল,
— এই রে, বেডা তো রেগে গেছে।আজ তো ধরতে পারলে আমার খবর আছে! তাড়াতাড়ি ভাগ রাহা।
বলেই নিজের ঘরের দিকে প্রাণপণে দৌড়াতে লাগল। যখনই দরজা বন্ধ করতে যাবে, ঠিক তখনই অভ্র এসে এক হাতে দরজাটা আটকে দিল। ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে ধীর স্বরে বলল,
— “হোয়াটস আপ, বেবি? এবার কোথায় পালাবি?”
রাহা শত চেষ্টা করেও দরজাটা বন্ধ করতে পারল না। অভ্রের শক্তির সঙ্গে পেরে ওঠা তার পক্ষে অসম্ভব।
অভ্র ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি টেনে বলল,
— “চল, আজ তোকে এমন হলি খেলা শেখাব, যা সারাজীবন মনে রাখবি। যতই হোক, এটা আমাদের বিয়ের উপলক্ষে প্রথম স্পেশাল হলি!”
রাহা ভয়ার্ত কণ্ঠে মাথা নেড়ে বলল,
“— না… না, অভ্র ভাই! এত স্পেশাল কিছু লাগবে না। আমি… আমি কোথাও যাব না!”
কথাটা বলেই সে দ্রুত ওয়াশরুমের দিকে দৌড় দিতে নিল। কিন্তু তার আগেই অভ্র বিদ্যুৎগতিতে হাত বাড়িয়ে রাহার কবজি চেপে ধরল।
তারপর দুষ্টু সুরে গুনগুন করে বলতে লাগল,
“আজ হলি খেলব রে শ্যাম___
ওওওও শ্যাম____
আজ হলি খেলব রে শ্যাম__
হঠাৎ রাহা অবাক হয়ে বলে উঠল, — আপু! তুমি?
অভ্রও রাহার দৃষ্টির অনুসরণ করে পেছনে তাকাতেই আর সেই সুযোগটাই কাজে লাগাল রাহা। মুহূর্তের মধ্যে সে অভ্রের হাত ছাড়িয়ে দিল এক দৌড়!
— “এই মেয়ে, দাঁড়া!”
বলেই অভ্রও তার পিছু নিল।
পুরো ড্রয়িংরুমজুড়ে সবাই বসে ছিল। চারপাশে বিয়ে নিয়ে চলছিল গম্ভীর আলোচনা—সব ঠিকঠাক হচ্ছে তো? কোথাও কোনো কিছু বাদ পড়ল না তো? কারও কণ্ঠে ব্যস্ততা, কারও চোখে সূক্ষ্ম হিসাব-নিকাশ।
ঠিক তখনই হঠাৎ সিঁড়ির দিক থেকে ছুটে আসে রাহা।তার পিছু পিছু একদম তীক্ষ্ণ গতিতে ধেয়ে আসে অভ্র।
সবার দৃষ্টি একসাথে ঘুরে যায় তাদের দিকে। কথা মাঝপথে থেমে যায়। কারও হাতের কাজ থমকে থাকে, কারও চোখ কৌতূহলে বড় হয়ে যায়।
শুরু হয়ে গেল তাদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। রাহা কখনো বড় আব্বুর পেছনে গিয়ে লুকাচ্ছে, কখনো বড় আম্মুর আঁচল আঁকড়ে ধরছে, আবার কখনো ছোট আম্মুর পাশে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে।
কিন্তু অভ্রের আজ থামার কোনো নাম নেই।
অবশেষে সুযোগ বুঝে হাত চেপে ধরে নিচু হয়ে এক টানেই রাহাকে কাঁধে তুলে নিল।
রাহা ভয়ে ঢোক গিলে চিৎকার করে উঠল,
— “মাআআআ…! বাঁচাও!”
সে কখনো পিলার আঁকড়ে ধরছে, কখনো সামনে যা পাচ্ছে তাই ধরে নিজেকে বাঁচানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে।
বড় আব্বু আর বড় আম্মুর দিকে তাকিয়ে অসহায় ভাবে বলে উঠে
— “আমাকে বাঁচাও, প্লিজ! তোমাদের ছেলের হাত থেকে আমাকে বাঁচাও!”
কিন্তু কেউ এগিয়ে এল না। বরং দুজনেই মুচকি হেসে উল্টো দিকে ঘুরে চলে গেলেন।
এ দৃশ্য দেখে শিফা হেসে কুটিকুটি হয়ে বলল,
— “এখন মনে পড়ছে বোনু? একটু আগে যখন ভাইয়াকে রঙের পানিতে ভিজিয়েছিলে, তখন কি এসব মনে ছিল না!”
কথা শেষ করেই সে আরও জোরে হেসে উঠল।
আর রাহা? সে অসহায় মুখে সবার দিকে তাকিয়ে বুঝে গেল— আজ তাকে বাঁচানোর মতো কেউ নেই, কারণ সবাই মিলে যেন অভ্রের পক্ষেই জোট বেঁধেছে!
ইভানও সবকিছু দেখছিল। দৃশ্যটা তার ভীষণ ভালো লাগছে, ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠেছে।
কিন্তু অন্যদিকে ইভানের মায়ের মুখ ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছিল। চোখেমুখে স্পষ্ট বিরক্তি আর অসহিষ্ণুতা। তার হয়তো সহ্য হচ্ছিল না।
সেদিকে একবার তাকিয়েই অভ্র সব বুঝে গেল। ঠোঁট বাঁকিয়ে হালকা হেসে সে এগিয়ে গিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলে উঠল—
"লোকের জ্বলবে___
আমার তাতেই চলবে.___
কথাটা গানের সুরে কয়েকবার গাইতে গাইতে সামনের দিকে এগোতে থাকে।আত্মবিশ্বাসী পদক্ষেপে দরজা পেরিয়ে সোজা সুইমিং পুলের দিকে এগিয়ে গেল, আর তার ঠোঁটের কোণে তখনও খেলে যাচ্ছিল দুষ্টু, বিজয়ী এক হাসি।
রাহার খালা প্রথমে বুঝতে না পারলেন না যে কথাটি উনাকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে। পরক্ষণে বুঝতে পেরেই মুখের ভাব পাল্টে গেলো। রাগী চলে কটমট করতে করতে তাদের যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো।
রাহাকে নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অবন্তিকা আর সাফাও সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো। নিচে পা রাখতেই তাদের চোখ আটকে গেল জারিফের গম্ভীর, রাগে কঠিন হয়ে থাকা মুখশ্রীতে।
অবন্তিকা তাড়াহুড়ো করে "সরি" বলতে যাবে, ঠিক তখনই—
পেছন থেকে এক বালতি রঙিন পানি তার গায়ে এসে পড়ল। তার ওপর মুহূর্তেই শুকনো আবির মেখে দিয়ে দুষ্টুমি ভরা কণ্ঠে জারিফ বলে উঠল,
— এবার হলো একদম পারফেক্ট!বিচ্ছু কোথাকার।
একটা চওড়া হাসি দিয়ে "বাই" বলে সেখান থেকে দৌড়ে সরে পড়ল সে।
অবন্তিকা রাগে ফুঁসতে লাগল। চোখ-মুখ লাল হয়ে গেছে তার।
— “আমি তো শুধু সরি বলতে এসেছিলাম! কথা ছিল, রাহা শুধু অভ্র ভাইয়ের মাথায় রং ঢেলে পালাবে বলেছিল। উনিযে ওখানে চলে আসবেন, সেটা কি আমি জানতাম? আর এখন উল্টো আমার সঙ্গেও একই কাণ্ড!
সে ক্ষোভে দাঁত চেপে বলল,
— না, এটা একদমই বেশি হয়ে গেছে!
পাশ থেকে সাফা হেসে বলল,
— আরে পাগলি, সমান সমান হয়ে গেছে। এবার সব ভুলে এনজয় কর!
অবন্তিকা বিরক্তিতে মুখ বাঁকিয়ে বলল,
— বালের এনজয় করব! যাদের বিয়ে, তারাই তো একদিকে উধাও হয়ে গেল। আর এই জাউরা বেডা আমাদের কী অবস্থা বানিয়ে দিল দেখ!
একবার নিজের রঙে ভেজা অবস্থা দেখে সে চোখ কুঁচকে দৃঢ় স্বরে বলে উঠল,
— এর প্রতিশোধ না নিলে আমার নাম অবন্তিকা নয়। এবার দেখব, কে কাকে রঙে ডুবায়!
—————
সুইমিংপুলের সামনে পৌঁছেই অভ্র এক মুহূর্তও দেরি করল না। কাঁধে তুলে রাখা রাহাকে এক ঝটকায় সরাসরি পানির গভীরে ছুঁড়ে ফেলে দিল।পানির ছিটে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।ঠাস করে পানিতে পড়তেই রাহা দিশেহারা হয়ে গেল। মুহূর্তেই চারপাশের জল তার চারদিকে ঘিরে ধরল, সে হাবুডুবু খেতে লাগল—বারবার উঠে আসার চেষ্টা করেও ঢেউয়ের চাপে তলিয়ে যাচ্ছিল।তীরে ওঠার চেষ্টা করতেই তাকে এক ধমকে থামিয়ে দিলো।
অভ্র ধীরে ধীরে পাশেই সারি করে রাখা পঞ্চাশটা রঙের বস্তার দিকে তাকাল। তার দৃষ্টির অনুসরণ করে সেদিকে চোখ পড়তেই রাহার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। মনে হলো, প্রাণপাখিটাই বুঝি উড়ে যাওয়ার উপক্রম!
অভ্র ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি টেনে গম্ভীর গলায় বলে উঠল,
— “যেখানে আছিস, ঠিক সেখানেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাক। এক ইঞ্চিও নড়বি না।নড়াচড়া করলেই আজকের শাস্তি আরও স্পেশাল হয়ে যাবে,!আর
অসমাপ্ত বাসরটা ও কিন্তু এখানেই সম্পূর্ণ করে ফেলব।”
এমন কথায় রাহা একদম শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে যায়।
ড্যাবড্যাব চোখে তাকিয়ে থাকে অভ্রের দিক।হয়তো তার চোখ গুলো মিনতি করতে চাইছে যেনো তাকে ছেড়ে দেয়।
তারপর ধীর পায়ে সামনে এগিয়ে এসে চোখে চোখ রেখে বলল,
— “কি ভেবেছিস তুই? আজ শুধু তুই রঙের তাণ্ডব চালাবি, আর আমি নির্বিকার দর্শকের মতো দাঁড়িয়ে সব দেখব? ভুল ভাবছিস, । আজকের এই রঙের যুদ্ধের শেষ অধ্যায়টা আমি নিজের হাতেই লিখব!”
·
·
·
চলবে……………………………………………………