কখন থেকে তোরা এখানে এসেছিস? আর কী কী দেখলি? রাহা কৌতূহলী অথচ অস্থির কণ্ঠে প্রশ্ন ছুড়ে দিল আয়রা আর জায়রার দিকে।
— এই তো, মাত্রই এলাম। তোমার "আহহহহ!" চিৎকারটা শুনেই দৌড়ে চলে এসেছি…
অভ্র ঠোঁট বাঁকিয়ে বিরক্তি মাখা গলায় বলল,
— “তোদের বোনের "আহহহ" শুনলেই ছুটে চলে আসতে হবে নাকি? একেকটা আস্ত বেয়াদব!”
রাহা কথাটা শুনেই ব্রু কুঁচকে ফেলল সাথে লজ্জা ও পেলো বটে। তবুও যেন স্বস্তির দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। বুকের ওপর চেপে থাকা অদৃশ্য পাথরটা মুহূর্তেই নেমে গেল।যাক, কিছুই দেখেনি!যদি দেখে ফেলত? আবার কাউকে গিয়ে সব বলে দিত? তখন কী হতো?
ভাবনাগুলো মাথায় আসতেই সংকোচে তার শরীরটা কুঁকড়ে এলো। মনে হচ্ছিল, লজ্জায় বুঝি এই মুহূর্তেই মাটির সঙ্গে মিশে যাবে সে।
অভ্রের কথাটা শুনতেই দু'টো ছোট মুখ মুহূর্তেই মলিন হয়ে গেল। কৌতূহলে চকচক করা চোখদুটোও যেন নিমেষে নিভে এলো।
রাহা সঙ্গে সঙ্গে কড়া স্বরে ধমক দিয়ে বলল,
— “তো আমার বোনেরা আমার কাছে আসবে না তো কার কাছে আসবে? আপনার কাছে নাকি?”
অভ্র কয়েক সেকেন্ড চিন্তিত ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর সুরে বলল,
— “তাই নাকি? তাহলে বাসর রাতেও এদের সামনে এনে বসিয়ে রাখিস। যা কিছু হবে, সব লাইভ দেখে যাবে!”
অভ্রর কথা শেষ হতেই দু'জনের মুখ হাঁ হয়ে গেল,
হয়তো ভাবতে লাগলো বাসর আবার কি জিনিস!
ভয়ে জিজ্ঞেস ও করতে পারছে না।
আর রাহা লজ্জা আর রাগে একসঙ্গে তার দিকে তেড়ে তাকাল।এ কথা শুনেই রাহা মুখে হাত দিয়ে বলে উঠল,
— “আস্তাগফিরুল্লাহ! ছিঃ, অসভ্য লোক! কী সব বলছেন আপনি?”
অভ্র ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে বলল,
— “তো কী করব? যেভাবে বলেছিস, সেভাবেই তো উত্তর দিলাম।”
কথাটা বলেই অভ্র চলে যেতে উদ্যত হতেই রাহা তড়িঘড়ি করে তার হাত চেপে ধরল।
নিজের শেরনীর এমন স্পর্শ পেয়ে অভ্রের পা থেকে গেলো। ঠোঁটের হাসিটা আরও গাঢ় হয়ে উঠল। ধীরে ধীরে ঘাড় বাঁকিয়ে রাহার দিকে তাকাতেই—
রাহা দ্রুত প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বাচ্চাদের উদ্দেশে বলে উঠল,
— “বাচ্চারা, যাও তো, আপুদের ডেকে নিয়ে আসো।”
রাহার কথা কানে যেতেই তারা আর এক মুহূর্তও দেরি করল না; ছোট ছোট পায়ে দৌড়ে সেখান থেকে ছুটে চলে গেল।
বাচ্চারা চোখের আড়াল হতেই অভ্র বাকা চোখেই রাহার দিকে তাকিয়ে আছে।অভ্র কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না।একই এটা তো,মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি! এ আবার কী কাণ্ড?
একটু আগেও তো তাকে ছুঁতেও দিচ্ছিল না, আর এখন নিজেই এগিয়ে আসছে!
রাহা ফট করে অভ্রর সামনে গিয়ে আচানাক দুই পা উঁচু করে দু’হাত দিয়ে অভ্রের গলা জড়িয়ে ধরল। অভ্র তার চেয়ে বেশ খানিকটা লম্বা হওয়ায় ঠিকমতো পৌঁছাতে পারছিল না সে। তাই অভ্রও মৃদু হেসে একটু ঝুঁকে এলো তার দিকে। দেখতে চায় এই মেয়ে কি করতে চলেছে।
সুযোগ বুঝে রাহা মুখটা অভ্রের কানের কাছে নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
— বাসর রাতে ওদের না, আপনার সেই না-হওয়া বালের বন্ধনকেই বসিয়ে লাইভ দেখাবো!
কথা শেষ করেই মুখটা অভ্রের মুখের একদম সামনে এনে স্থির হয়ে রইল। দু'জনের নিঃশ্বাস যেন একে অপরকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। মুহূর্তটা আরও ঘন হয়ে উঠতেই অভ্র হাত বাড়িয়ে ঠিক যখন রাহার কোমর জড়িয়ে ধরতে যাবে, তখনই সাফা আর অবন্তিকার কণ্ঠস্বর ভেসে আসে। মুহূর্তেই রাহা যেন চমকে উঠে সরে যায় কয়েক কদম দূরে।
অভ্র অবশ্য সেখানেই স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। চোখেমুখে বিস্ময় আর ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি। মনে মনে ভাবতে থাকে,
— এই মেয়েটার তো দেখি দিন দিন সাহসই বেড়ে যাচ্ছে! লাজ-লজ্জা সব উধাও হয়ে গেছে নাকি? দাঁড়া, একবার হাতে পাই... তখন বুঝাবো ঠেলা কাকে বলে!
সাফা, অবন্তিকা আর শিফারা এসেই রাহার দিকে তাকাতেই একসঙ্গে মুগ্ধ কণ্ঠে বলে উঠল,
— মাশাআল্লাহ!
হলুদ লেহেঙ্গায় যেন রাহাকে অপরূপ লাগছে। তার সৌন্দর্যের দীপ্তিতে চারপাশটাই যেন আলোকিত হয়ে উঠেছে।
তাদের কথা শুনে বাড়ির বড়রাও এগিয়ে এলেন। একে একে সবাই রাহার রূপ, আভিজাত্য আর স্নিগ্ধতার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠলেন। আজ যেন সত্যিই তাকে স্বর্গের কোনো পরীর চেয়ে কম লাগছে না।
আর এসব দেখে রাহার মায়ের চোখ দুটো আনন্দে চিকচিক করে উঠল। বুকভরা তৃপ্তি আর আবেগে তার চোখের কোণে জমে উঠল সুখের অশ্রু। আঁচলের কোণে আলতো করে চোখ মুছে তিনি ধীর পায়ে রাহার সামনে এসে দাঁড়ালেন। তারপর স্নেহমাখা হাতটা মেয়ের মাথায় রেখে কাঁপা কণ্ঠে বলতে লাগলেন,—
— “আল্লাহ আমার মেয়েটার ওপর সবসময় রহমত বর্ষণ করুক। কোনো কুদৃষ্টি যেন তোকে স্পর্শ করতে না পারে। আজ তোকে দেখে আমার মনটা ভরে গেল, মা।”
তখন শিফা দুষ্টুমি ভরা কণ্ঠে বলে উঠল,
— ভাইয়ার পছন্দ কিন্তু একদম সেরা!
ড্রেসটাও, আর যে ড্রেসটা পরে আছে সেও!
শিফার কথার ইঙ্গিত বুঝতে কারও বাকি রইল না। মুহূর্তেই চারপাশে হাসির রোল পড়ে গেল। রাহা লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল, আর অভ্র ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি টেনে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
এদিকে বড়দের কেনাকাটা প্রায় শেষ। বাড়িতে এখনো অনেক প্রস্তুতির কাজ বাকি থাকায় তারা আর দেরি করতে চাইলেন না। সবাই একে একে ফেরার জন্য প্রস্তুতি নিতে লাগলেন। তবে যাওয়ার আগে আরও একবার রাহার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশংসা করতে ভুললেন না কেউই। তাদের চোখেমুখে স্পষ্ট ছিল আনন্দ, তৃপ্তি আর আসন্ন শুভ মুহূর্তের উচ্ছ্বাস।
সাফা, অবন্তিকা আর শিফাদের রেখে সবাই চলে এলো। যেহেতু অভ্র আর জারিফ ওদের সঙ্গে আছে, তাই চিন্তার কোনো কারণ নেই। জায়ানও সামান্য একটা কাজে বাইরে গেছে, কিছুক্ষণ পরই ফিরে আসবে।
বাড়ির বড়রাও বিদায় নিয়ে নিজ নিজ গন্তব্যে চলে গেলেন।
রাহার কেনাকাটা প্রায় সম্পন্ন।
এবার শিফা, অবন্তিকা, সাফা আর আয়াত সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাহার সঙ্গে মিলিয়ে একই ধরনের ড্রেস নেবে। মজার বিষয় হলো, ইভান আর আয়াতও ইতোমধ্যে শপিং আসতে চলেছে।
রাহার মা অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে অবশেষে তার বোনকে রাজি করাতে পেরেছেন। শুরুতে তিনি কোনোভাবেই আসতে চাইছিলেন না। পরে ইভান আর আয়াতের একের পর এক অনুরোধ, জোরাজুরি আর ভালোবাসার চাপে শেষ পর্যন্ত রাজি হন। রাহার খালুও তাকে অনেক বুঝিয়েছেন।
অবশেষে তাদেরকে খান বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে ইভান আর আয়াত সরাসরি ওদের সঙ্গে যোগ দিতে রওনা হলো।
শিফা তো আর অপেক্ষা করতে পারছে না। কখন ইভানকে দেখবে! তার যে কী আনন্দ লাগছে, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। তাই সবাই এবার নিজেদের জন্য ড্রেস দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
শিফা একটা ড্রেস তুলে নিজের গায়ে ধরে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই হঠাৎ পিছন থেকে এক পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো—
— যাই পরেন, সবই আপনাকে অসাধারণ মানায়। উফ! এই চোখ দুটো নিয়ে আমি যে কী করি!
কথাটা শুনেই শিফা চমকে উঠল। দ্রুত সামনে তাকিয়ে আয়নার প্রতিচ্ছবিতে দেখতে পেল, ঠিক তার পিছনেই দাঁড়িয়ে আছে ইভান।
মুহূর্তেই সে হতভম্ব হয়ে গেল। কী প্রতিক্রিয়া দেবে, বুঝে উঠতে পারছে না। শুধু বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে ইভান মুচকি হেসে বলল—
— হ্যাঁ হ্যাঁ, সত্যিই আমি।
— আপনি?
— কেন, অন্য কারও থাকার কথা ছিল নাকি?
প্রশ্নটা শুনে শিফার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
— জ্বি…
বলেই থেমে গেল সে। পরক্ষণেই তড়িঘড়ি করে মাথা নেড়ে বলল—
— না না!
তার অস্থিরতা দেখে ইভানের ঠোঁটের কোণে হাসি আরও গাঢ় হলো।
সে শিফার হাতে থাকা ড্রেসটার দিকে তাকিয়ে বলল—
— অনেক সুন্দর লাগছে। নিয়ে নিন।
শিফার চোখ দুটো আনন্দে চকচক করে উঠল।
— সত্যি?
ইভান মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
— হুম, সত্যিই। দারুণ মানিয়েছে।
শিফার ঠোঁটে তখন অজান্তেই প্রশস্ত হাসি ফুটে উঠল।
— ঠিক আছে, তাহলে এটাই নেব।
এদিকে অবন্তিকার অবস্থা সত্যিই নাজেহাল।
শাড়ি পরার অভ্যাসই নেই—কিন্তু বেস্ট ফ্রেন্ডের বিয়ে, সেখানে না গেলে চলে নাকি!
হাতে একে একে বিশটার মতো শাড়ি এনে ফেলেছে। একটার পর একটা ট্রাই করছে, কিন্তু কোনোটা-ই যেন মনের সাথে তাল মেলাচ্ছে না। যেগুলো ভালো লাগছে, সেগুলোর দাম দেখলেই আবার মুখটা কুঁচকে যাচ্ছে।
তবুও রাহা স্পষ্ট বলে দিয়েছে—যার যেটা পছন্দ হয়, সেটাই নেবে। এটা তার পক্ষ থেকে গিফট।
কিন্তু অবন্তিকা আর সাফা একেবারেই নাছোড়বান্দা। নিজেদের টাকায় কিনবে—এটাই তাদের জেদ।
অবশেষে বারো নম্বর শাড়িটা কিছুটা পছন্দ হলো তার।কিন্তু দামটা দেখেই আবার সেই চেনা গোমড়া মুখ।এতক্ষণ ধরে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা জারিফ পুরো দৃশ্যটাই দেখছিল, আর মৃদু হাসছিল।
কিন্তু অবন্তিকার মুখটা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে যেতেই, তার হাসিটাও ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
সে একটু এগিয়ে এসে ঠাট্টার সুরে বলে উঠল—
“যে মেয়ের শাড়ি পছন্দ করতেই এতো সময় লাগে, তার জন্য জামাই পছন্দ করতে কত ঝামেলা পোহাতে হবে—আল্লাহই জানে!”
কথাটা শেষ হতেই অবন্তিকা পাশ ফিরে তাকায়। জারিফ দাঁড়িয়ে আছে ঠিক তার সামনে।
অবন্তিকা সাথে সাথেই তীক্ষ্ণ গলায় বলে উঠল-
“সেটা নিয়ে আমি কাউকে ভাবতে বলিনি।”
জারিফ ভ্রু কুঁচকে পাল্টা দিল—
“না তা বলবেন কেনো! সেটা কি কেউ নিজের মুখে বলে, বিচ্ছু?”
“এই আপনি কি এখানে ঝগড়া করতে এসেছেন
হাতি??
দুইজনই একে অপরের অদ্ভুত নামে ক্ষেপে উঠে,
অবন্তিকা এবার রাগে আরও একটু এগিয়ে এসে এক হাত উঁচু করে আঙুল তুলে হুঙ্কার দিল—
“বেশি বাড়াবাড়ি করছেন কিন্তু!”
দুইজনের কথার তীব্রতা বাড়তে বাড়তে পুরো এমন হয়ে উঠল—দুজনই দুজনকে ছাড় দেওয়ার মুডে নেই।
জারিফ ও অবন্তিকার হাতের আঙুল ধরে এক মোচড়ে উল্টো ঘুরিয়ে বলে উঠে,
“ বাড়াবাড়ি করবই আমি, কম হবোও না। আর না হতে চাইও না। আই লাইক মাই এনার্জি লেভেল।”
অবন্তিকা সামনের দিকে তাকিয়ে হাত মুচড়াতে মুচড়াতে বলতে থাকে,
“বালের লেভেল। ছাড়ুন আমাকে..”
জারিফ ও ছেড়ে দিতেই অবন্তিকা সামনের দিকে হুমড়ি খেয়ে পরে যেতে নিলেই। ঠিক সেই মুহূর্তেই তার হাতদিয়ে শক্ত করে পেট জড়িয়ে ধরে নিজের বেষ্টনীর মধ্যে ঘিরে ফেলে।দুইজনের সামনের দিক হেলে আছে। জারিফ ছেড়ে দিলেই অবন্তিকা কুপোকাত।
অবন্তিকা ভয়ে পুরোটা সঙ্কুচিত হয়ে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলে। আতঙ্কে জারিফের হাত আঁকড়ে ধরে।চোখ খুলে নিজের অক্ষত অবস্থাটা দেখে বুকের ভেতর জমে থাকা ভয়টা একটু গলে যায়। হালকা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলে ওঠে— “থ্যাংক গড…”
অবন্তিকার মুখ থেকে এটা শুনতেই জারিফ এক মুহূর্তও দেরি না করে হুট কিরে হাতটা ছেড়ে দিতেই সে ছিটকে গিয়ে সোফার ওপর ধপ করে মুখ থুবড়ে পড়ে যায়।
“আআআআআ!” বলে তীক্ষ্ণ আর্তচিৎকার করে উঠল সে।
তারপর ক্ষুব্ধ গলায় বলল–
“বেয়াদব! ছাড়লেন কেন আমাকে?”
জারিফ শান্ত ভঙ্গিতে ভ্রু উঁচু করে জবাব দিল—
“আপনিই তো ছাড়তে বললেন। নিন এখন আবার গডকে থ্যাঙ্ক জানান!”টাটা।
জারিফ ইচ্ছে করেই সামনে রাখা সোফাটা দেখেই ছেড়ে দিল।সাহায্য করে কে আর থ্যাঙ্ক দেয় কাকে..
আর যাওয়ার সময় সেই শাড়িটা অবন্তিকার মুখের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলে উঠল,
“এই নিন। খুব একটা ভালো না মানলেও, টেনে-হিঁচড়ে চালিয়ে নেওয়া যাবে।”
অবন্তিকা মুখের সামনে থেকে কাপড়টা সরিয়ে ক্ষিপ্ত গলায় বলল,
“আমি এটা নেব না। একদমই না। কোনো শাড়িই পরব না আমি। ফাউল লোক একটা!”
তার তীক্ষ্ণ, রাগে ভরা কথাগুলো শুনে জারিফ হালকা হেসে উঠল।সামনের দিকে হাঁটতে হাঁটতে ফোনে কি যেন কিরে নিলো।
অবন্তিকা রাগের মাথায় ফুঁসতে থাকে,কিছুক্ষণ পর যখনই মোবাইলটা হাতে নিল, হঠাৎই একটা নোটিফিকেশনটা চোখে পড়ে গেল। এনজিও থেকে দশ হাজার টাকা পাঠানো হয়েছে—মুহূর্তেই তার চোখ দুটো চকচক করে উঠল, যেন আনন্দে ছোট ছোট তারা জ্বলে উঠেছে। মুখে অনিচ্ছাকৃতভাবেই এক চওড়া হাসি ফুটে উঠল।
অবন্তিকা অনেকদিন ধরেই একটা এনজিওতে যুক্ত আছে। বিকেলে নিয়ম করে দুই ঘণ্টা করে সময় দেয়। কোনো নির্দিষ্ট মাসিক বেতন নেই—পুরোটাই স্বেচ্ছাসেবা। মানুষের জন্য কিছু করার নেশা থেকেই সে এই কাজে জড়িয়েছে। প্রায় এক বছর ধরে সে এখানেই আছে। সাধারণত বছরে একবার সবাইকে খুশি করার জন্য সামান্য গিফট হিসেবে কিছু টাকা দেওয়া হয়—এবার সেটাই এসেছে।
বার্তাটা দেখে তার খুশির বাঁধ ভেঙে গেল। কারণ যেটা সে চুপচাপ পছন্দ করেছিল, সেই শাড়িটাই এবার সহজেই তার হাতের নাগালে। জারিফ যে শাড়িটা হালকা অবজ্ঞায় তার দিকে ছুঁড়ে দিয়েছিল, সেটাই তার চোখে লেগে ছিল—কিন্তু দাম বেশি বলে সে তখন নিতে চায়নি।
এখন আর কোনো দ্বিধা নেই।
সে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে সেই শাড়িটাই সিলেক্ট করল।
অন্যদিকে অবিন্তিকাকে হাসতে দেখে জারিফের মুখে হাসির রেখা দেখা গেলো।
অবন্তিকা হাতে করে শাড়িটা নিতে বের হতেই পাশ থেকে সাফা, শিফারা মজা করে ডাক দিল—
“কিরে ঢিলা কোম্পানি! হলো তোর?”
অবন্তিকা চোখ সরু করে, হাসি মুখে বলল—
“হুম, হয়েছে। ঢিলা না রে, চালুই আছি।। এখন দেখ—কোম্পানি চলবে একদম নিজের গতিতে।।”
অবন্তিকা শাড়িটা উঁচিয়ে দেখাতেই চোখে পড়ল—সাফার হাতেও ঠিক একই শাড়ি!
দুইজনেই এক মুহূর্তে আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল, মুখে খুশির ঝিলিক।
“কিরে! মিলল কীভাবে এটা? একদম একই তো!”
“ওয়াও! আমরা দুজন একই ডিজাইনে ঝলমল করবো—দারুণ হবে!”
অবন্তিকা হেসে উঠে বলল,
“এটা ঐ বজ্জাত তার পছন্দ করা…”
শুনতেই সাফার একটু খারাপ লাগল। সে নরম গলায় বলল,
“তাহলে আমি অন্য কিছু দেখি।”
কিন্তু অবন্তিকা সাথে সাথেই বাধা দিয়ে বলল,
“হোপ কেন? এটাই ঠিক আছে।”
অবন্তিকার মুখে ছোট্ট হাসিটা দেখেই সাফার মনটাও হালকা হয়ে গেল।
সবাই মিলে প্রায় কেনাকাটা শেষ করে ফেলেছে। দুপুর গড়িয়ে গেছে, এখন কিছু খাওয়া দরকার। তাই শপিংমলের তিনতলায় থাকা ফুড কোর্টের দিকে তারা এগিয়ে গেল।
সবাই যার যার আসনে বসে পড়ার পরই হঠাৎ করেই ভেতরে প্রবেশ করলো জায়ান। অভ্র খাওয়ার জন্য ডাক দিল। সাফার পাশের সিটটা তখন ফাঁকাই ছিল। জায়ান সোজা গিয়ে সেখানে বসলো—কারণ সে তো এটাই চাচ্ছিল।
বসে পড়েই নির্দ্বিধায় খেতে শুরু করলো সে। হঠাৎই সাফার নাকে-মুখে খাবার উঠে গিয়ে সে অস্বস্তিতে পড়ে গেল। ঠিক তখনই অবন্তিকা তড়িঘড়ি করে পানি এগিয়ে দিতে যায়, আর একই সময়ে জায়ান নিজেই এক গ্লাস পানি তুলে ধরে।
সাফা চারপাশের কিছুই লক্ষ্য না করে, কোনো দ্বিধা ছাড়াই জায়ানের হাত থেকেই পানি নিয়ে স্বাভাবিকভাবে খেতে শুরু করলো—যেন কিছুই হয়নি, সবই স্বাভাবিক।
অবন্তিকা হয়তো কিছু একটা আঁচ করতে পারল। কিন্তু সেটা নিজের মনের ভেতরেই চেপে রাখল। নিশ্চিত না হয়ে কিছু বলা ঠিক হবে না—এই বোধটাই তাকে আরও সংযত করে তুলল।
আয়াত একবার চোখ তুলে তাকাল অভ্র আর রাহার দিকে। ওদের হাসিমুখ দেখে তার ভেতরের অস্থির মনটাও যেন হঠাৎ শান্ত হয়ে গেল, প্রাণটা জুড়িয়ে উঠল এক অদ্ভুত স্বস্তিতে।তবুও একটা কষ্টের দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
খাওয়া-দাওয়ার পর্বটা শেষ হতে হতে শপিংমলটা যেন আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠল। জুয়েলারি, জুতা আর আরও নানা রকম জিনিসপত্র কেনাকাটা করতে করতে কখন যে সময় গড়িয়ে বিকেল পাঁচটা বেজে গেছে, কেউই খেয়াল করেনি। চারপাশে ব্যাগভর্তি কেনাকাটার ভার আর ক্লান্তির মাঝেও সবার মুখে ছিল একধরনের তৃপ্তির হাসি।
এবার বাসায় ফেরার পালা। ব্যস্ত দিনের শেষে সবাই ধীরে ধীরে বেরিয়ে পড়ল, সাথে নিয়ে চলল দিনের ছোট ছোট আনন্দ আর অজস্র স্মৃতির ঝলক।
সবাই শপিং মলের সামনে গাড়ির জন্য অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে এসে থামাতেই সবাই দ্রুত উঠে পড়ল।
কিন্তু অভ্রকে গাড়িতে উঠতে না দেখে রাহা ভ্রু কুঁচকে একটু তীক্ষ্ণ গলায় বলল—
“কি হলো? আপনি উঠবেন না ?”
·
·
·
চলবে……………………………………………………