— বাবা, যেভাবেই হোক, আমার অভ্রকে চাই! প্লিজ বাবা, আমি অভ্রকে না পেলে বাঁচব না। ওকে ছাড়া আমার জীবন অর্থহীন। কিছু একটা করো বাবা... আমি হাতজোড় করে বলছি, প্লিজ!
কথাগুলো বলতে বলতেই বাঁধনের কণ্ঠ ভেঙে এল। উন্মত্ত হতাশায় পাশের টেবিলে রাখা ফুলদানিটা সজোরে আছড়ে ফেলে দিল সে। মুহূর্তেই কাঁচ ভাঙার তীক্ষ্ণ শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল।এরপর আর নিজেকে সামলাতে পারল না বাঁধন। অসহায় কান্নায় ভেঙে পড়ে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ল। চোখ বেয়ে অঝোরে গড়িয়ে পড়তে লাগল অশ্রুধারা, তার পুরো শরীর কাঁপতে লাগল যন্ত্রণা আর ক্ষোভে।
মেয়ের এমন বিধ্বস্ত, উন্মত্তপ্রায় অবস্থা দেখে জনাব আইজাক রহমান করিম যেন দিশেহারা হয়ে পড়লেন। কী বলবেন, কী করবেন—কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না।যে মেয়ের একটুখানি হাসির
ছটা দেখার জন্য কত ছেলেই না পাগল ছিল, যার জন্য একের পর এক সম্ভ্রান্ত, যোগ্য বিয়ের প্রস্তাব এসেছে, সেই মেয়েই শেষ পর্যন্ত মন দিয়েছে এমন এক ছেলেকে, যে তার দিকে ফিরেও তাকায় না, তার অনুভূতির সামান্য মূল্যও দেয় না।এই নির্মম বাস্তবতা একজন বাবার হৃদয়কে যেন অসহ্য যন্ত্রণায় ক্ষতবিক্ষত করে তুলছে ।
মেয়ের এমন ভগ্নপ্রায়, অসহায় অবস্থা দেখে জনাব আইজাক রহমান করিমের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন দৃশ্য বোধহয় একজন বাবার জন্য নিজের সন্তানের চোখের জল দেখা।ধীরে ধীরে তিনি মেয়ের কাছে এগিয়ে গেলেন। মেঝেতে বসে থাকা বাঁধনের এলোমেলো চুলে হাত বুলিয়ে ভারী গলায় বললেন,
— "মা, এভাবে নিজেকে শেষ করে দিচ্ছিস কেন? তুই তো আমার সেই সাহসী মেয়ে, যে হার মানতে জানত না। একজন মানুষের জন্য নিজের জীবনটাকে এতটা কষ্টে ভরে ফেলিস না— মা, ভালোবাসা জোর করে পাওয়া যায় না। কিন্তু তোর এই কান্না, এই কষ্ট—এগুলো দেখে তোর বাবাটা একটু একটু করে ভেতর থেকে মরে যাচ্ছে।”
তার কণ্ঠে ছিল অসহায়ত্ব, আর চোখে ছিল এক বাবার সীমাহীন মমতা।
বাঁধন ফুঁপিয়ে কেঁদে বাবার হাঁটু জড়িয়ে ধরতেই তিনি তাকে বুকে টেনে নিলেন। যেন পৃথিবীর সব ঝড় থেকে নিজের মেয়েটাকে আগলে রাখতে চান।
নিজের প্রাণ প্রিয় বন্ধুর ছেলে না হলেও কিছু একটা করা যেতো।যেভাবেই হোক সে ছেলেকে সামনে এনে হাজির করত।
আজ সকালে জনাব আমান খান স্বয়ং উপস্থিত হয়েছিলেন তাদের বাসায়। যতই হোক, আজীবনের বন্ধুকে তো আর শুধু নিমন্ত্রণপত্র পাঠিয়ে দায় সারা যায় না। তাছাড়া বিষয়টা যখন নিজের বাড়ির ছেলে-মেয়ের বিয়ে, তখন আন্তরিকতা দেখানোই স্বাভাবিক। সঙ্গে ছিলেন তাঁর ছোট ভাই, আসান খানও।
অভ্র আর রাহার বিয়ের কথা শোনার মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় বাঁধনের উন্মত্ততা আর বেপরোয়া পাগলামি।
অবশেষে এক পর্যায়ে অসহায় কণ্ঠে তার বাবা বলেছিলেন,
— "মা, এখন আর আমার কিছুই করার নেই। তুই যদি আগে বলতি,তাহলে হয়তো কোনো না কোনো উপায় খুঁজে দেখার চেষ্টা করতাম। কিন্তু এখন সবকিছু অনেক দূর এগিয়ে গেছে।"
কিন্তু বাবার সেই অসহায় স্বীকারোক্তিও বাঁধনের একগুঁয়েমি আর অন্ধ আবেগের দেয়াল ভেদ করতে পারেনি। তার মনে তখন শুধু একটাই সংকল্প জ্বলছিল—অভ্রকে সে কোনো মূল্যে হারাবে না।
আসান খানের থেকেই সে জেনেছে, আজ দুই পরিবারের সবাই একসঙ্গে শপিং মলে বিয়ের কেনাকাটা করতে যাবে। আর ঠিক সেখানেই অভ্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিং রয়েছে।
এই খবর শোনার পর থেকেই বাঁধনের মনে নতুন করে জেগে উঠেছে একরাশ আশার মরীচিকা। অভ্রকে একনজর দেখার, তার কাছে যাওয়ার কিংবা কোনোভাবে তার মনোযোগ কেড়ে নেওয়ার অদম্য বাসনা তাকে ভেতর থেকে আরও বেশি অস্থির, ব্যাকুল আর আবেগপ্রবণ করে তুলেছে।
তাই সুযোগটা এক মুহূর্তের জন্যও হাতছাড়া করল না বাঁধন। দ্রুত নিজের ঘরে গিয়ে প্রস্তুত হয়ে বেরিয়ে পড়ল। তার মাথায় এখন একটাই চিন্তা—যেভাবেই হোক অভ্রকে নিজের করে পেতেই হবে। কোনো অবস্থাতেই এই বিয়ে সম্পন্ন হতে দেওয়া যাবে না।
তার বাবা শতবার বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, অসংখ্য যুক্তি দিয়েছেন, কিন্তু বাঁধন একটুও কর্ণপাত করেনি। অভ্রকে পাওয়ার উন্মত্ত বাসনা তার বিবেক-বুদ্ধিকে গ্রাস করে ফেলেছে।
তখন শপিং মলে রাহাকে দেখেই পরিকল্পিতভাবেই অভ্রকে জড়িয়ে ধরেছিল বাঁধন। তার উদ্দেশ্য ছিল একটাই—রাহার মনে সন্দেহের বিষ ঢুকিয়ে দেওয়া, যেন তাদের সম্পর্কের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির ঝড় ওঠে।
কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস, যা চেয়েছিল ঠিক তার উল্টোই ঘটল।
রাহা ভুল বোঝার বদলে সবার সামনে তাকে অপমানের চরম মূল্য দিতে বাধ্য করল। এক চড়ে যেন তার সব কল্পনা, সব আশা ধুলোয় মিশে গেল। আর অভ্র? সে তো বাঁধনের দিকে ফিরেও তাকাল না। এক মুহূর্তের জন্যও তাকে গুরুত্ব দেয়নি, বরং এমন উদাসীনতা দেখিয়েছে যেন বাঁধন নামের কেউ তার জীবনে কোনো অস্তিত্বই রাখে না।
সেদিন অপমান, প্রত্যাখ্যান আর ব্যর্থতার তীব্র দহন বুকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়েছিল তাকে। অথচ এত কিছুর পরও অভ্রকে পাওয়ার উন্মত্ত বাসনা তার মন থেকে এক বিন্দুও কমেনি। বরং অভ্রকে অন্য কারও হয়ে যেতে দেখার আতঙ্ক তাকে আরও অস্থির, আরও মরিয়া করে তুলছিল। এখন তার মাথায় একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে—যেভাবেই হোক, এই বিয়ে তাকে আটকাতেই হবে।
বোকা মেয়েটা কি আর সেটা জানে?
অভ্র আর রাহার বিয়ে তো আগেই হয়ে গেছে—কাগজে-কলমে, আর মনেও কোথাও গভীরভাবে। এখন যা চলছে, সেটা শুধু লোক দেখানো অনুষ্ঠান; সমাজের চোখে “সম্পূর্ণ” করে তোলার এক সাজানো আয়োজন।
—————
রেস্টুরেন্টের সামনে অভ্রকে দেখে সাথী বেগম হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে বললেন,
— “অভ্র বাবা, তুমি এখানে!
তুমি এখানে কী করছো?”
তার কণ্ঠে বিস্ময় আর মমতার মিশ্র আবেগ স্পষ্ট।
অভ্র শান্ত, দৃঢ় স্বরে উত্তর দিল—
— “মেজো আম্মু, বিজনেসের একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিং ছিল, তাই এখানেই আয়োজন করেছি। আর তোমরা আসবে বলেই আমি ইচ্ছাকৃতভাবে এই জায়গাটাই বেছে নিয়েছি, যাতে পরে তোমাদের সঙ্গেও যোগ দিতে পারি।
সাথী বেগম সন্তুষ্ট হাসিতে মাথা নেড়ে বললেন,
— “খুব ভালো করেছ বাবা। কাজ ও হলো সাথে তোমার পছন্দমতো কেনাকাটা ও হলো।আমরা তো জানতামই না তুমিও এখানে থাকবে।
অভ্রকে দেখে অভ্রের মা ও অনেক খুশি হলো।
অভ্র বলল.
“চাচ্চু জানত।
সাথী বেগম মুচকি হেসে বললেন,
— ও আচ্ছা। তাহলে যাও রাহাকে নিয়ে নিজেদের বিয়ের শাড়ি, লেহেঙ্গা আর শেরওয়ানি , স্যুট পছন্দ করে নাও।
অভ্র তখন শান্ত গলায় বলে উঠল,
— রাহার জন্য বিয়ের শাড়ি, লেহেঙ্গা আর আমার শেরওয়ানি ও স্যুট ইতালি থেকে আজই এসে পৌঁছাবে। সেগুলো আগেই অর্ডার করা ছিল। বাকিগুলো এখান থেকেই নিলেই হবে।
অভ্রের কথা শুনে সবাই কিছুটা অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। আর রাহা তো একদম হতবাক! বিয়ের জন্য এত আগে থেকেই সবকিছু ভেবে রেখেছে লোকটা! তার অজান্তেই সব ব্যবস্থা করে ফেলেছে। বাহ I am to obak...
রাহার সেই কিংকর্তব্যবিমূঢ়, স্তম্ভিত চাহনির দিকে তাকিয়ে অভ্র ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি টেনে দুই আঙুলে তুড়ি বাজিয়ে বলল,
— কিরে? এভাবে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেন? সিস্টেম হ্যাং হয়ে গেছে নাকি?এখনও তো অনেক কিছু দেখা বাকি আছে।
অভ্রের কথায় রাহা ধ্যানভঙ্গ হওয়া মানুষের মতো চমকে উঠল। তারপর অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে আমতা আমতা করে বলল,
— কই... কিছু না তো।
ততক্ষণে সবাই তাদের দিকে এগিয়ে এলো।
অবন্তিকা আর সাফা একে অপরের দিকে তাকিয়ে চাপা হাসিতে মেতে উঠেছে। তাদের চোখেমুখে স্পষ্ট দুষ্টুমির আভাস।
শিফা আর দেরি না করে তাগিদ দিয়ে বলল,
— আচ্ছা, এবার চল সবাই। আগে হলুদ আর মেহেন্দির জন্য যা যা লাগবে সেগুলো নেওয়া যাক। তারপর বাকি কেনাকাটা করা যাবে।
শিফার কথায় সবাই সম্মতি জানিয়ে সামনে এগিয়ে গেল, আর রাহা এখনও মাঝেমধ্যে আড়চোখে অভ্রের দিকে তাকিয়ে নিজের বিস্ময় কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করতে লাগল।
তারা সবাই একের পর এক ড্রেস দেখতে লাগল।
দেখতে দেখতেই প্রায় এক ঘণ্টা কেটে গেছে, তবুও হলুদের জন্য একটা ড্রেসও চূড়ান্ত করতে পারছে না রাহা।
“ধুর! একদম ভালো লাগছে না। একটা ড্রেসও মন ছুঁতে পারছে না!”
এত বিশাল শোরুম, সারি সারি চোখধাঁধানো কালেকশন—তবুও রাহা ভীষণ দ্বিধা আর সংশয়ে পড়ে গেছে। কোনটা নেবে, কোনটা তাকে সবচেয়ে বেশি মানাবে, কিছুই যেন ঠিক করতে পারছে না।
অবন্তিকা আর সাফার অবস্থাও প্রায় একই। অসংখ্য নকশা, রঙ আর ডিজাইনের ভিড়ে তারা বুঝেই উঠতে পারছে না কোন ড্রেসটা বাদ দিয়ে কোনটা বেছে নিলে রাহাকে সবচেয়ে বেশি অপরূপ লাগবে।
শিফাকে জিজ্ঞেস করলে সে বরাবরের মতো নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলে,
“রাহার যেটা ভালো লাগে, সেটাই নাও।”
কিন্তু সমস্যাটা সেখানেই। রাহা নিজেই যখন সিদ্ধান্তহীনতার জালে আটকে গেছে, তখন তার পছন্দটাই যেন সবচেয়ে বড় ধাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হঠাৎ করেই শিফার মাথায় কিছু একটা এলো। সে মুচকি হেসে সবার দিকে তাকিয়ে বলল,
“এক কাজ করলে কেমন হয়... ভাইয়াকে বলি?”
রাহা উৎসুক আর উজ্জ্বল চোখে তাকিয়ে বলে উঠল,
— “বাহ আপু, দারুণ আইডিয়া তো! তোমরা নিজেদের জন্য ড্রেসগুলো দেখো, আমি উনাকে খুঁজে নিয়ে আসছি।”
ওদিকে রাহার মায়েরা নিজেদের জন্য পোশাক বাছাইয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। কারণ রাহার জন্য তো বাড়ির মেয়েরা আর তার বান্ধবীরাই যথেষ্ট ছিল।
এদিকে রাহা ক্রমশ বিরক্ত আর অস্থির হয়ে উঠছিল। নিজের উপরই রাগ হচ্ছিল তার। বিরক্তিতে চারপাশে চোখ বুলাতে বুলাতে হঠাৎ পিছনে তাকাতেই তার নজর গিয়ে আটকালো অভ্রের উপর।
লোকটা দিব্যি নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে একটা চেয়ারে বসে ফোন স্ক্রল করছে, যেন পৃথিবীর কোনো চিন্তাই তার নেই!ব্যস! রাহার মাথার ভেতর জমে থাকা সব বিরক্তি এক নিমিষেই অভ্রের উপর গিয়ে পড়ল।
ঝড়ের বেগে তার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে কোনো রকম ভূমিকা ছাড়াই ফট করে অভ্রের হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিল।
হঠাৎ এমন কাণ্ডে অভ্র ভ্রু কুঁচকে চোখ তুলে তাকাল। তারপর শান্ত গলায় বলল,
— “সমস্যা কী?”
রাহা চোখ-মুখ শক্ত করে, ঠোঁট ফুলিয়ে একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
— “আপনি।”
–মানে?
— হুম্।বিয়ে কি শুধু আমার একার? আপনার না?
— এখানে, এখন এই প্রসঙ্গ আসছে কেন?
— আসবে না তো কী করবে? সেই কখন থেকে একটা ড্রেসও পছন্দ হচ্ছে না। আমি এতক্ষণ ধরে হিমশিম খাচ্ছি, আর আপনি দিব্যি ফোনে ডুবে আছেন!
— ওহ্, তাহলে আসল অভিযোগ এটা! কিন্তু ডার্লিং, আমি যদি কাজ করি, তাহলে তার পারিশ্রমিক তো লাগবেই। বিনা মূল্যে আমি কোনো সার্ভিস দিই না।
— কী আজব মানুষ আপনি! একটা ড্রেস সিলেক্ট করতে সাহায্য করবেন, তার জন্যও পারিশ্রমিক লাগবে?
— অবশ্যই লাগবে।
— ধুর! আপনার সাহায্য আমার দরকার নেই।
কথাটা বলেই রাহা অভিমানে মুখ ফিরিয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে অন্যদিকে চলে গেল।
অভ্র মৃদু হেসে উঠে দাঁড়াল। শার্টের ভাঁজ ঠিক করে ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে রাহার ঠিক পেছনে দাঁড়াল। রাহা তার উপস্থিতি টের পেলেও ইচ্ছে করেই ফিরে তাকাল না। ঠোঁট ফুলিয়ে নিজের অভিমানটাকে আঁকড়ে ধরে রইল, যেন অভ্রকে একটুও পাত্তা দেবে না। অথচ তার সেই নীরব অভিমানই অভ্রের ঠোঁটের কোণে আরও গভীর হাসির রেখা এঁকে দিল।
রাহার সঙ্গে থাকা সবাই অভ্রকে আসতে দেখেই ধীরে ধীরে আগেই সরে গেল। অভ্র যখন রাহার আশেপাশে থাকে, তখন তারা এমনিতেই দূরত্ব বজায় রাখে।
রাহা তখন সারি সারি ঝুলানো ড্রেসের দিকে তাকিয়ে একটার পর একটা নেড়ে-চেড়ে দেখছিল। ঠিক তখনই অভ্র এগিয়ে এসে তাকে আলতো করে সরিয়ে সামনে ঝোলানো অসংখ্য লেহেঙ্গার মাঝখান থেকে এক নজরেই একটি গাঢ় হলুদ রঙের লেহেঙ্গা বেছে নিয়ে তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
—"গো, ট্রাই ইট। ফাস্ট।”
আদেশের সুরে বলা কথাটার জবাব না দিয়েই রাহা লেহেঙ্গাটা হাতে নিল। ভেতরে ভেতরে সে খুশিতে ভরে উঠলেও মুখে তার কোনো ছাপ পড়তে দিল না। গম্ভীর মুখেই ট্রায়াল রুমের দিকে এগিয়ে গেল।
প্রায় দশ মিনিট পর ট্রায়াল রুমের দরজা ধীরে ধীরে খুলল।
আর তারপর..
রাহাকে দেখেই অভ্র যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্থির হয়ে গেল।
তার দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্যও সরল না।
উজ্জ্বল হলুদ লেহেঙ্গায় রাহাকে মনে হচ্ছিল যেন বসন্তের প্রথম রোদে মোড়া কোনো স্বর্গীয় পরী। নরম আলোয় তার গায়ের আভা আরও দীপ্তিময় হয়ে উঠেছিল। লেহেঙ্গার সূক্ষ্ম কারুকাজ আর তার অপরূপ সৌন্দর্য মিলেমিশে এমন এক মোহনীয় দৃশ্য তৈরি করেছিল, যা থেকে চোখ ফিরিয়ে নেওয়া প্রায় অসম্ভব।
অভ্রর মনে হলো চারপাশের সব শব্দ যেন হঠাৎ করেই স্তব্ধ হয়ে গেছে। শুধু তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা হলুদ পরীটাকেই দেখা যাচ্ছে।
তার চোখে তখন স্পষ্ট বিস্ময়, মুগ্ধতা আর এক অদ্ভুত ঘোরের ছাপ।অভ্রের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক তৃপ্ত, মুগ্ধ হাসি ফুটে
"মাশাআল্লাহ বলে সামনে এগিয়ে যেতেই রাহা হঠাৎ সাইড কেটে যেতে চাইল। কিন্তু ঠিক তখনই অভ্র তার হাতটা শক্ত করে ধরে ফেলল।তার ঠোঁটে এক চিলতে হাসি খেলে গেল। সে হাসতে হাসতে ধীরে ধীরে গেয়ে উঠল—
“আগুন লাগাইয়া আমার মনে...
পিরিতি করো কার সনে..
আগুন লাগাইয়া আমার মনে...”
তার কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভুত দৃঢ়তা,আর অধিকারবোধ মেশানো মায়া।রাহা চোখ তুলে তাকাতেই অভ্র আরও একটু কাছে ঝুঁকে, শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ স্বরে বলল—
“এত সহজে সাইড কাটবি ভাবলি কী করে? তোর এই নীরব এড়িয়ে যাওয়াটাই তো আমার মনে আগুন জ্বালায়, বুঝিস না?”
বলা শেষ করেই সে হঠাৎই রাহাকে একটানে একদম পেছনের আয়নার সাথে মিশিয়ে চেপে ধরল।অভ্রের এমন আচমকা, তীব্র পদক্ষেপে রাহা পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে গেল।
রাহা শ্বাস কেটে যাওয়া গলায় বলে উঠল—
“কি করছেন আপনি? ছাড়ুন আমাকে।বাড়ির সবাই এখানে!”
অভ্র তখনও গভীর, একটানা ঘোর লাগা দৃষ্টিতে রাহার দিকে তাকিয়ে আছে—যেন চারপাশের কিছুই তার আর মাথায় নেই।
রাহার অস্থির ছটফটানি, বারবার নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা—এসব দেখে অভ্রের চোখে সামান্য বিরক্তির ছায়া পড়ল। রেগে বলে উঠল…
“এই থাম। বাইন মাছের মতো এমন করছিস কেন
কেউই নেই এখানে। আমি তোর কাছে থাকলে যে কেউ আসে না। জানিস না..! গাধী কোথাকার।”
“বিয়ের আগেই বকছেন। এভাবে। দূর আর কথাই বলব না।”
অভ্র নিজেও হতবম্ব হয়ে গেলো। এভাবে বলায়। আর বলবে না তো কি করবে।
একটু কাছে গেলেই—
“ছাড়ুন, ছাড়ুন। ধরার আগেই ছাড়ুন। বালের ছাড়ুন।”
রাহা এমনি রেগে ছিল, আবারও রাগিয়ে দিলো।
অভ্র এক গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
“আচ্ছা, সরি জান। এই যে তোকে হেল্প করলাম—এবার আমার পারিশ্রমিকটা দে…”
পারিশ্রমিকের কথা শুনেই রাহা যেন আবারও ক্ষেপে উঠল।
“এই আপনার টাকা-পয়সা নেই বুঝি? শুধু পারিশ্রমিকই চাইছেন… ফকির কোথাকার!”
অভ্র একবার ভ্রু কুঁচকে তাকাল। মনে মনে ভাবল—এই মেয়েটা বুঝায় কী আর বোঝে কী!
“তোরে কি আমি গাধী বলি সাজে নাকি? আমি কি টাকা-পয়সার পারিশ্রমিকের কথা বলেছি?”
রাহা ঠোঁট বাকিয়ে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
“তাহলে টাকা ছাড়া আর কীভাবে পারিশ্রমিক দেবো আমি?”
ঠিক তখনই হঠাৎ অভ্রের চোখে এক দুষ্টু, শান্ত অথচ দৃঢ় ঝিলিক দেখা গেল।
পরক্ষণেই—রাহা চমকে উঠে সাথে সাথে অভ্রের দিকে তাকাল।
কিছু বলতে যাবে—তার আগেই অভ্র এক ইশারায় তাকে থামিয়ে দিল।
একটা শীতল, নরম হাত ধীরে ধীরে রাহার পিঠ ছুঁয়ে উপরের দিকে উঠতে লাগল। সাথে সাথে রাহার দেহে শীতল এক শিহরণ বয়ে গেল। যতই তার হাত ওপরে উঠছিল, ততই শরীরের ভেতরের কম্পন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠছিল।
লেহেঙ্গার জিপ বরাবর উপরের দিকে এগোতেই মুহূর্তেই সে হাত থামিয়ে নেয়।
ফট করে রাহাকে উল্টো ঘুরিয়ে আয়নার মুখোমুখি করে দেয় অভ্র। এতে রাহা তাদের দু’জনকেই একসাথে দেখতে পায়।
অভ্র রাহার কোমরটা দু’হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে তার ড্রেসের জিপারের দিকে ঝুঁকে পড়ল,মাথা নিচু করে, নিজের দৃঢ় দাঁতের চাপে জিপারের চেইনটি আঁকড়ে ধরে। তার এই আচমকা নিকটতা রাহার পিঠে এক অদ্ভুত বিদ্যুৎ-সঞ্চার ঘটায়।
পিঠে হঠাৎ অভ্রের ঠোঁটের স্পর্শে রাহার শরীরে এক অদ্ভুত অনুভূতি ছড়িয়ে যায়। এক ধরনের ভালো লাগা, এক ধরনের অস্থিরতা—যেন ভেতরটা কেঁপে উঠছে। কারণ তাদের তো এখন পবিত্র বন্ধন… তাই হয়তো আটকাতে গিয়েও শরীরটা আর বাধা দিচ্ছে না।
রাহা দুই হাত দিয়ে লেহেঙ্গার দুই পাশ শক্ত করে চেপে ধরে সে। নিশ্বাস ভারী হয়ে আসছে, বুকের ভেতর ধুকপুকানি বাড়ছে।
অভ্র সেটা বুঝতে পেরে দাঁতের মাঝে চেইন ধরে রেখেই বাঁকা হাসি হাসে। ধীরে ধীরে, নিয়ন্ত্রিত ভঙ্গিতে উপরের দিকে চেইনটা উঠাতে থাকে। আর রাহা যেন কলমি লতার মতো ধীরে ধীরে নুইয়ে যাচ্ছে।
একদম শেষ প্রান্তে এসে অভ্রের চোখ আটকে যায় একটি বিউটি স্পটে।যেটা দেখে অভ্র লোভ সামলাতে পারেনি, ফর্সা পিঠে কালো তিলটা এভাবে নিজের স্থান দখল করে রেখেছে যেন এটাই তার নিজস্ব জায়গা।এক মুহূর্তে অভ্রের হিংসা হলো।আর অভ্রের দৃষ্টিতে এক ধরনের তীব্র আকর্ষণ ফুটে ওঠে।
কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।ভাবছে এটা কোথায় ছিল এতদিন।আমার চোখেতো পড়ল না।
আমার জিনিস শুধু আমার থেকে লুকিয়ে রাখার ধান্ধা।দাড়া দেখাচ্ছি মজা।বলেই আরেকটু ঝুঁকে সেই স্থানে একটা সফট চুমু এঁকে আস্তে করে কামড় বসিয়ে দিলো।
কামড় লাগতেই রাহা চোখ খুলে “আহহহ” করে উঠল।
অভ্র সরে গিয়ে হাসতে লাগলো।
রাহা চোখ খুলে আগুন চোখে তাকালো—
“অসভ্য লোক।”
রাহা আরও কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই হঠাৎ অভ্রের দিক ঘুরে থেমে যায়।
তার চোখ চলে যায় অভ্রের কাঁধের পেছনে…
দেখে—দুইটা ছোট্ট মুখ একদম কাপড়ের আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে। চোখ বড় বড় করে তারা একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে তাদের দিকেই, যেন বহুক্ষণ ধরেই এই দৃশ্যটা দেখছে।
রাহা সাথে সাথে চুপ হয়ে যায়। মুখে আসা কথাটা গলায় আটকে যায়।
অভ্র ধীরে ধীরে পেছনে ঘুরে তাকায়।
দুইজন ছোট্ট বাচ্চা তখনও একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে—একজন আরেকজনের হাত শক্ত করে ধরে,
চোখে কৌতূহল আর একটু দুষ্টুমি মেশানো ভয়।
একজন ফিসফিস করে বলে ওঠে,
“ভাইয়া… আপু… তোমরা কি ঝগড়া করছিলা?”
রাহা এক সেকেন্ডে লজ্জায় লাল হয়ে যায়। চোখ নামিয়ে নেয়, আর অভ্রের দিকে তাকাতেই পারে না।
আয়রা জায়রা কে কি বলবে এখন..!
অভ্র একটু থেমে, ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে নেয়। তারপর শান্ত গলায় বলে,
“না, আদর করছিলাম।”
রাহার দিকে তাকিয়ে কথাটা বলতেই, রাহাকে একেবারে শেরনীর মতো ফুঁসে উঠতে দেখে অভ্র মুহূর্তেই গলা পরিষ্কার করে দ্রুত বলে উঠে—
“আআআ… না না, মানে… হ্যাঁ, ঝগড়াই করছিলাম!”
ছোট্ট দুজনের মুখে তখন সম্পূর্ণ বিভ্রান্তি। চোখে প্রশ্নের পাহাড়—একদিকে স্বস্তি, অন্যদিকে তীব্র কৌতূহল।
একটু থেমে একজন আবার জিজ্ঞেস করেই বসে, “তাহলে এখানে আড়ালে কেন?”
বাহিরে আসো আমরাও দেখব।
এই প্রশ্নে রাহা একেবারে স্তব্ধ হয়ে যায়। মুখে কোনো শব্দ নেই, শুধু নীরবতার ভার। সে ধীরে ধীরে অভ্রের দিকে একবার আড়চোখে তাকায়, একটা তীক্ষ্ণ, অর্থবহ দৃষ্টি; যেন পরিষ্কার ভাষায় বলে দিচ্ছে, “এখন পরিস্থিতি আপনি সামলান।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………