“কী হলো? উঠবেন না?”
“না।”
অভ্রের ঠোঁটে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। গাড়ির দিকে তাকিয়ে সে বলল,
“তোমরা সবাই বাসায় যাও। আমি আর রাহা একটু পরে আসছি। একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মানুষকে নিজে গিয়ে দাওয়াত দিতে হবে। সেই কাজটা সেরে তবেই ফিরব।”
তারা অভ্রের কথা মতো যে যার বাসার উদ্দেশে চলে গেল।
সময়টা তখন ঠিক সন্ধ্যা ছয়টা। দিনের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে গোধূলির নরম আবরণে মিশে যাচ্ছে। পশ্চিম আকাশে সূর্যের শেষ রক্তিম আভাটুকুও প্রায় মিলিয়ে গেছে। শহরের রাস্তাজুড়ে একে একে জ্বলে উঠেছে বৈদ্যুতিক আলোর সারি, আর চারপাশে নেমে এসেছে এক অদ্ভুত আবছা আবহ। তবে আজকের আকাশটা যেন অন্যরকম। কালো মেঘের বিশাল স্তরে পুরো আকাশ যেনো ঢেকে যাচ্ছে। বিদ্যুতের তীক্ষ্ণ ঝলকানি আঁধার চিরে বারবার ছুটে যাচ্ছে। ঝোড়ো বাতাসে রাস্তার পাশের গাছগুলো দুলে উঠছে বারবার।মানুষের আনাগোনাও তুলনামূলক কম যাচ্ছে, যেন প্রকৃতির আসন্ন রুদ্ররূপ আঁচ করে সবাই দ্রুত নিজেদের গন্তব্যে ফিরছে।
এমন সময় পার্কিং লট থেকে নিজের বাইকটা বের করে আনল অভ্র। কালো রঙের শক্তিশালী বাইকটার ইঞ্জিন স্টার্ট হতেই গম্ভীর গর্জন ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে।
রাহা একবার আকাশের দিকে তাকাল, তারপর বাতাসে উড়ে আসা চুলগুলো কানের পেছনে সরিয়ে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে উঠল,
“আকাশের অবস্থা তো একদম ভালো না। দেখছেন না, কী ভয়ানক বাতাস বইছে? যেকোনো সময় বৃষ্টি নামতে পারে। এই অবস্থায় আবার কোথায় যাব? যদি ভিজে যাই?”
অভ্র হেলমেটটা হাতে নিয়ে আকাশের দিকে একবার তাকাল। বিদ্যুতের ঝলকানি তার তীক্ষ্ণ চোখে ক্ষণিকের জন্য প্রতিফলিত হলো। তারপর ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটিয়ে শান্ত গলায় বলল,
–“ভিজলে ভিজব।সব সময় বৃষ্টি থেকে বাঁচতে হয় না, জান। কিছু কিছু মুহূর্ত আছে, যেগুলোকে উপভোগ করতে হয়।”
কথাটা বলেই সে বাইকের উপর ঠেসে বসল। বাতাস তখন আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। দূরে কোথাও বজ্রধ্বনি গর্জে উঠল। আর রাহা দাঁড়িয়ে রইল অভ্রের দিকে তাকিয়ে,
— “আমি থাকতে তোর কোনো প্রবলেম হবে?সেটা হলে সরাসরি বল। এক্ষুনি গাড়ি কল করছি। তুই বাসায় চলে যা।”
কথাটা বলেই ফোনটা হাতে তুলে নিল সে।
রাহা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল।
— “আরে আরে! কী করছেন?”
অভ্র ফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখেই বলল,
— “যা বললাম তাই। যখন এত সমস্যা, তখন জোর করে নিয়ে যাওয়ার কোনো মানে হয় না।”
রাহা বিরক্ত হয়ে এক ঝটকায় অভ্রের হাত থেকে ফোনটা নামিয়ে দিল।
— “উফ! আমি আবার কী বললাম?আমি কি একবারও বলেছি আমি যাব না?সত্যি, আপনার একটা সমস্যা আছে। কেউ একটা কথা বললে সেটাকে দশটা কথা বানিয়ে ফেলেন।”
— “ও তাই?”
— “হ্যাঁ তাই। আমি শুধু বলেছি বৃষ্টি হতে পারে। তাই বলে কি বলেছি আমি আপনার সাথে যাব না!
শুধু শুধু রেগে যান। যেন রাগ দেখানোর লাইসেন্স নিয়ে ঘুরেন।”
কথাটা শুনে অভ্রের মুখের গাম্ভীর্য ভাঙল না, তবে চোখের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল,
— শেষ?
—- হুম্
– চল এবার।
অভ্রের বাইকটা দুরন্ত গতিতে এগিয়ে চলছে। ঝড়ো হাওয়া তাদের গায়ে আছড়ে পড়ছে, তবুও দু'জন নিজেদের মতো করে পথ পেরিয়ে যাচ্ছে।
অভ্রের মুখে অদ্ভুত এক গাম্ভীর্য। বিষয়টা চোখ এড়াল না রাহার।
সে কৌতূহলী স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“কী ব্যাপার? আপনাকে এমন লাগছে কেন?”
অভ্র সামনের আয়নায় একবার রাহার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
“কেমন লাগছে?”
“ অন্যমনস্ক।”
অভ্র ভ্রু নাচিয়ে জবাব দিল,
“পিছনে যদি আমার একান্ত ব্যক্তিগত সুন্দরী রমণী বসে থাকে, তাহলে এই অভ্র কি কখনো অন্যমনস্ক থাকতে পারে?”
কথাটা শুনে রাহার গাল লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল।
অভ্র যেন ইচ্ছা করেই হঠাৎ বাইকের গতি বাড়িয়ে দিল। আকস্মিক ঝাঁকুনিতে রাহা ভারসাম্য হারিয়ে সামনের দিকে সরে এল। তার শরীর এসে ঠেকল অভ্রের পিঠে। পড়ে যাওয়ার ভয়ে সে দ্রুত দু'হাত বাড়িয়ে অভ্রকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
রাহা চমকে উঠে বলে উঠল,
— “আরে! এসব কী করছেন? পরে যাব তো!
আস্তে চালান।”
"পড়লে পড়বি। তাতে আমার কী?"
"মানে কী বললেন?" — রাহা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
অভ্র ঠোঁট বাঁকিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,
"তোর যদি সত্যিই মনে হয় আমি তোকে সামলাতে পারব না, তাহলে আর বলার কী আছে? পড়ে-টড়ে হাত-পা ভেঙে ল্যাংড়া হয়ে গেলে তোকে নিয়ে বসে থাকব নাকি? দিব্যি তোকে রেখে একটা নতুন, ঝকঝকে বউ বিয়ে করে ফেলব। কী বলিস, আইডিয়াটা মন্দ না কিন্তু!”
এমন কথা শুনে রাহা কোমরে জড়িয়ে রাখা দু’হাত আলগা করতেই, অভ্র নিজের হেলমেট খুলে ফেলে, আর রাহা কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক হাতে তার কোমর জড়িয়ে ফট করে ঘুরিয়ে একদম সামনে এনে বসাল। পরের মুহূর্তেই নিজের বাহুর শক্ত বাঁধনে আগলে নিলো।আকস্মিক ঘটনায় রাহার চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল। ভারসাম্য হারিয়ে সে অভ্রের বুকের উপর এসে ঠেকল।
এক হাত দিয়ে হ্যান্ডেল নিয়ন্ত্রণে রেখে অন্য হাতটা তার চারপাশে সুরক্ষার বলয়ের মতো জড়িয়ে রাখল অভ্র। ভয় আর বিস্ময়ে রাহা অভ্রের জ্যাকেট খামচে ধরল। তার মনে হচ্ছিল, সামান্য নড়লেই যেন পড়ে যাবে। ঝোড়ো বাতাস তাদের পাশ কাটিয়ে বয়ে যাচ্ছিল, আর রাহা নিঃশ্বাস আটকে অভ্রের বুকের সাথে লেগে রইলো।
অভ্র রাহাকে নিজের বাহুর দৃঢ় আবরণে টেনে ধরে রাখল। মুহূর্তের জন্য সে সামান্য ঝুঁকে এলো, আর রাহার শরীর অনিচ্ছাসত্ত্বেও পেছনের দিকে হেলে পড়ল।তারপর কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই তার মুখটা রাহার গলার বাঁকে গুঁজে দিল।
উষ্ণ নিঃশ্বাসের স্পর্শে রাহার সমগ্র শরীর শিহরিত হয়ে উঠল। বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই তীব্রভাবে কেঁপে উঠল তার। বাইকের গর্জন, ঝোড়ো বাতাস, দূরের বজ্রধ্বনি— সবকিছু যেন এক মুহূর্তে ঝাপসা হয়ে গেল।
অভ্রের দৃঢ় উপস্থিতি তাকে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে। আর রাহা? সে তো ইতোমধ্যেই ভয় আর অস্থিরতায় অভ্রকে এমন শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছে যেন পৃথিবীর সমস্ত নিরাপত্তা ওই একজন মানুষের মাঝেই বন্দি।
অভ্র গলার কাছে মুখ রেখেই নাক ঘষতে ঘষতে চোখ বন্ধ করল কয়েক সেকেন্ডের জন্য নিঃশ্বাস নিলো। তারপর কোমল গভীর স্বরে ফিসফিস করে বলল—
— “এতক্ষণ তো খুব সাহস দেখাচ্ছিলি, জান। এখন কোথায় গেল সেই সাহস?”
কথাগুলো কানের কাছে পৌঁছাতেই রাহার শ্বাস আরও ভারী হয়ে এলো। তার আঙুলগুলো অজান্তেই অভ্রের পোশাক আরও শক্ত করে মুঠোবন্দি করল, আর ঝড়ো সন্ধ্যার বুক চিরে বাইকটা দুর্বার গতিতে সামনের দিকে ছুটে চলল।
কাঁপা কাঁপা, তীক্ষ্ণ গলায় রাহা বলল—
“সামনে তাকিয়ে চালান।এক্সিডেন্ট হয়ে যাবে, অসভ্য লোক!”
অভ্র ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত, নির্লিপ্ত বাঁকা হাসি টেনে বলল
— “হোক !"
রাহা একটু থেমে, রাগ মিশে থাকা কণ্ঠে আবার বলল
— “দেখুন!”
অভ্র এইবার আরও গাঢ়, স্থির আর দৃঢ় গলায় জবাব দিল,
—”দেখা”।
রাহা হঠাৎ করেই তীক্ষ্ণ কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল—
“আআআআআ… বাইক থামান! আমি আপনার সাথে যাবো না!”
কিন্তু তার সেই আর্তনাদ যেন বাতাসেই মিলিয়ে গেল।
অভ্র কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়েই,জিজ্ঞেস করলো
—“তাহলে কার সাথে যাবি, জান?”
তারপরই সে বাইকের গতি একটু কমাল, রাহাকে এক ঝটকায় আগের মতোই ঠিক করে বসিয়ে দিল।
রাহা তখনো হাঁপাচ্ছে, বুক ওঠানামা করছে দ্রুত গতিতে। চোখে বিস্ময় আর ভয়ের মিশ্র ছায়া।
“এটা… এটা কী ছিল?”—তার কণ্ঠ কাঁপছে, অবিশ্বাসে ভরা।
এটা তার জন্য একদম নতুন, অচেনা এক অভিজ্ঞতা—যেটা সে আগে কখনো অনুভব করেনি।
“প্লিজ, একটু বাইকটা থামান।”
অভ্র ব্রেক চাপতেই বাইকটা থেমে গেল। রাহা ধপ করে তার কাঁধে মাথাটা নামিয়ে দিল। পুরো শরীরটা যেন এক ঝটকায় শিথিল—ভেতরের আতঙ্ক আর ক্লান্তি মিলিয়ে নিজেকে একটু সামলে নিচ্ছে।
অভ্র ধীর গলায় ডাকল—
“জান।”
রাহা ছোট্ট করে জবাব দিল—
“হুম্।”
“অনেক ভয় পেয়ে গেছিস?”
“হুম্।”
“আমি পাশে থাকা সত্ত্বেও?”
“হুম্।”
অভ্র ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি টেনে বলল—
“তাহলে চল, আরেক রাউন্ড ঘুরে আসি।”
“হুম্।”
কথাটা বলেই রাহা হঠাৎ চমকে উঠল। চোখ দুটো বড় বড় করে কাঁধ থেকে মাথা সরিয়ে নিচে নেমে দাঁড়াল। ক্ষিপ্ত গলায় বলে উঠল—
“অসভ্য লোক! আমাকে এভাবে ভয় দেখিয়ে মেরে ফেলতে চান নাকি?”
রাহা এক ঝটকায় নেমে আসে। মাটিতে পা পড়তেই সে একবার টাল খেয়ে সামলে নেয়, তারপর দ্রুত দু’পা পিছিয়ে দাঁড়ায়। চুলগুলো বাতাসে এলোমেলো হয়ে মুখে এসে পড়েছে, শ্বাসটা এখনো একটু ভারী। চোখে এখনো সেই তীক্ষ্ণ রাগ আর ভয় মিশে আছে।
অভ্র নিচে নামার আগেই রাহা কটমট করে বলে ওঠে—
“এবার আর এক সেকেন্ডও না… আমি আর আপনার সাথে বসবো না এই বাইকে!”
অভ্র বাইকের ওপর হেলান দিয়ে বসে ছিল। এক ঝটকায় রাহার হাতটা শক্ত করে ধরে তাকে টেনে নিজের একেবারে কাছে নিয়ে এল। কোমরে দু' হাত পেঁচিয়ে এমনভাবে আটকে রাখল, যেন তাকে হারানোর কোনো সুযোগই নেই।
তার গলায় গম্ভীর, ঠান্ডা দৃঢ়তা—
“আমি থাকতে তোর ভয় পাওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না, জানিস?”
এক মুহুর্ত থেমে সে আরও নিচু স্বরে বলল—
“মনে গেঁথে রাখ—“এই জিহাদ খান অভ্র থাকতে তোর গায়ে কোনো আঁচড়ও পড়তে দেবে না—আল্লাহ ছাড়া কেউ না, কোনো শক্তি না, কোনো মানুষ না, এমনকি নিয়তিও না। তোর দিকে ওঠা প্রতিটা হাত থেমে যাবে আমারই সামনে।”
রাহা কোনো কথা বলল না। তার চোখে ভয় নেই, বরং এক অদ্ভুত নীরব বিশ্বাস। ধীরে ধীরে সে নিজের থেকেই এগিয়ে এসে অভ্রের বুকে মাথা রাখল।
ঠিক সেই মুহুর্তে অভ্রের ভেতরে যেন এক অদৃশ্য বিস্ফোরণ ঘটে গেল—এক অদ্ভুত বিজয়ের অনুভূতি, যার নাম অধিকার নয়। আসক্তি। সে নিজেও আরও শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরল।
অভ্রের বুকের ভেতর তখন এক অদ্ভুত জয়ধ্বনি বেজে উঠল। এটাই তো সে চেয়েছিল—তার “ফেইরি টেইল” নিজেই ফিরে আসুক, তাকে আঁকড়ে ধরুক, নিঃশর্তভাবে ভালোবাসুক। এতদিনের চাপা স্বপ্ন, নীরব অপেক্ষা—সব যেন এক মুহূর্তেই বাস্তব হয়ে উঠছে।
সে আলতো, কিন্তু দৃঢ় এক আবেশে রাহাকে নিজের কাছে টেনে নিল। এক অদ্ভুত কোমলতায় তাকে আগলে রাখল, যেন পৃথিবীর কোনো ঝড়ই তাকে ছুঁতে না পারে।রাতের গভীর নিস্তব্ধতায়, গাছের ছায়ার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুইটি হৃদয় তখন নীরব ভাষায় কথা বলছে—ভালোবাসার, আশ্রয়ের, নির্ভরতার।প্রকৃতি যেন থমকে গেছে তাদের এই মুহূর্তটা দেখার জন্য।
অভ্র আবার বাইকের হ্যান্ডেল শক্ত করে ধরে সামনে তাকাল।
“চল, এবার যেটার জন্য বেরিয়েছিলাম সেখানে যাই।”
রাহা চারপাশে তাকিয়ে কৌতূহলী গলায় বলল—
“ওহ্, কোথায় যাচ্ছি আমরা?”
অভ্র রহস্যময় এক হাসি দিয়ে উত্তর দিল—
“গেলেই দেখতে পারবি।”
এই বলেই বাইকটা আবার গর্জে উঠল। অন্ধকার ভেদ করে তারা দু’জন আবার রওনা দিল সেই অজানা গন্তব্যের দিকে…
—————
“মিস্টার খান এখন পুরোপুরি স্থিতিশীল। এতদিন কোমায় থাকলেও তিনি এখন বিপদমুক্ত। তবে সাময়িকভাবে সবাইকে চিনতে একটু বিভ্রান্ত হতে পারেন—এটা স্বাভাবিক। ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
“থ্যাংক ইউ, ডক্টর আহাদ… আই’ম রিয়েলি ফিলিং ভেরি রিলিভড আফটার হিয়ারিং দিস নিউজ। রিয়েলি, আই’ম ভেরি হ্যাপি। থ্যাংক ইউ সো মাচ।”
কথা শেষ করেই ঠোঁটের কোণে এক বাঁকা হাসি টেনে অভ্র ধীরে ফোনটা কেটে দিল। তার চোখে তখন অদ্ভুত এক শীতল শান্তি—যেন দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে অদৃশ্য কোনো খেলা নিজের ছকে গুটি ফেলতে শুরু করেছে।
—————
মাহাদীর বাড়ির সামনে গিয়ে বাইকটা থামতেই অভ্র শান্ত গলায় রাহাকে নেমে যেতে বলল।
রাহা চারপাশটা একবার ভালো করে দেখে নিল—চেনা কিছুই নেই। এখানে সে আগে কখনও আসেনি, তাই পুরো জায়গাটাই তার কাছে অচেনা ও অদ্ভুত লাগছিল।
তবু গেটের সামনে ঝুলে থাকা নেমপ্লেটটা তার দৃষ্টি কেড়ে নিল—“শিকদার বাড়ি”।
চাইলেও রাহা কোনো প্রশ্ন করল না। অভ্রের ওপর আস্থা রেখে নীরবে তার হাতটা শক্ত করে ধরল। এরপর দু’জনে একসাথে ভেতরের দিকে এগোতে শুরু করল।
দারোয়ান তাদের আটকাতে এগিয়ে আসতেই, ওপরের বেলকনি থেকে মাহাদীর কণ্ঠ ভেসে এলো— “আসতে দাও।”
স্যারের সেই দৃঢ় নির্দেশ পেতেই দারোয়ান মুহূর্তেই সরে দাঁড়াল, আর আর কোনো বাধা দিল না।
উপরে দাঁড়িয়ে এতক্ষণ পুরো দৃশ্যটা নীরবে পর্যবেক্ষণ করছিল মাহাদী। হাতে কফির কাপ, চোখে একধরনের স্থির কিন্তু চিন্তামগ্ন দৃষ্টি। ধূসর মেঘে ঢাকা আকাশটাকে যেন সে নিঃশব্দে উপভোগ করছিল। ঠিক তখনই আকাশটা আরও ভারী হয়ে এলো—ঝিরঝিরে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হলো।
রাহার চোখে তখন স্পষ্ট কটাক্ষ, রাগে ঠোঁট দু’টো শক্ত করে চেপে ধরা। মাহাদীকে দেখেই যেন তার ভেতরের জমে থাকা বিরক্তি আবারও উথলে উঠল।
ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও অভ্র তার হাতটা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে একপ্রকার টেনে নিয়ে ভেতরের দিকে এগোতে লাগল। রাহা বাধা দিতে চাইলেও অভ্রের শক্ত, আত্মবিশ্বাসী টানার সামনে তার পা যেন অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাল মিলিয়ে চলতে বাধ্য হলো।
ঘরে ঢুকতেই মাহাদীর দৃষ্টি মুহূর্তেই স্থির হয়ে গেল রাহার দিকে—একদম একাগ্র, নিবদ্ধ, প্রায় অস্থির ধরনের তাকানো।
অভ্র সেটা এক সেকেন্ডেই বুঝে ফেলল।
পরের মুহূর্তেই সে পাশের টেবিল থেকে পানির গ্লাস তুলে নিল—কোনো দ্বিধা নেই, কোনো সতর্কতা নেই—এক টানে সবটুকু পানি নিজের মুখে নিয়ে পুত করে সোজা মাহাদীর মুখের দিকে ছুঁড়ে দিল।
পানি ছিটকে পড়তেই মাহাদী সঙ্গে সঙ্গে চোখ বন্ধ করে ফেলল, চমকে এক মুহূর্ত থমকে গেল।
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই রাহার ঠোঁটে ফুঁটে উঠল চাপা হাসি—ফিক করে হেসে দিল সে। কারণ এই একই দৃশ্য, এই একই পরিণতি একদিন সে মাহাদীর সাথেও করেছিল।
অভ্র বাজপাখির দৃষ্টি ন্যায় তাকালো মাহাদীর দিকে। যা বলে দিচ্ছিল—এখানে সীমা অতিক্রম করার সুযোগ নেই।
মাহাদী হাত দিয়ে মুখ মুছে অভ্রের দিকে তীক্ষ্ণভাবে তাকিয়ে বলে উঠল—
“তোকে আমি ছাড়বো না…”
অভ্র ঠোঁটটা পাউট করে বলল,
“হুম, তা ছাড়বি কেন? তুই তো হিজড়া।ছেলে দেখলে চিপকে থাকতে চাস।
আর তোর তো আমার এবং আমার জিনিসের ওপর বরাবরই কুনজর থাকে।সেই একদম ছোটবেলা থেকে।যাই হোক, তুই আমার সেদিন অনেক বড় একটা উপকার করেছিস, তাই তোকে বাদ রাখতে মনটা সায় দিচ্ছিল না।”
অভ্রের কথায় মাহাদীর কপালে কয়েকটা ভাঁজ পড়ল,
“উপকার করেছি মানে?”
অভ্র শান্তভাবে বলল,
“তোর বুঝতে হবে না…”
তারপর কাঁধ ঝাঁকিয়ে,একটি কার্ড বাড়িয়ে দিল মাহাদীর দিকে। মাহাদী কার্ডটা হাতে নিয়ে নামগুলো দেখতেই চোয়াল শক্ত করে ফেলল। চোখে আগুনের মতো ক্ষোভ ভেসে উঠছে। কপালের রগ গুলো ফুলে উঠছে।
অভ্র তখন হালকা হেসে বলল,
“আমার না-হওয়া সতীন, সুন্দর করে বিয়ের দাওয়াতে যাস। তোর জন্য সব ফ্রি।”
অভ্রের তো সেই মজা লাগছে, সাথে রাহারও।
অভ্র ধীর গলায়, কিন্তু কেটে যাওয়া ধারালো স্বরে বলল,
“বদনাম করে নয়, সম্মান দিয়ে গ্রহণ করতে হয়—এইটা এই অভ্রের থেকে শিখে নে।”
মাহাদীর বুকের ভেতর রাগ যেন দাউ দাউ করে জ্বলতে লাগল। অভ্র সেটা খুব ভালোভাবেই টের পাচ্ছিল—তার চোখে ছিল ঠান্ডা, স্থির এক বিজয়ী ভঙ্গি।
আলবিদা, বলে রাহার হাত শক্ত করে ধরে বেরিয়ে যাওয়ার সময় অভ্র ঘাড় ঘুরিয়ে মাহাদীর দিকে আরেকবার তাকাল।ঠোঁটের কোণে টানটান বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে হালকা কটাক্ষ মেশানো স্বরে হাঁটতে হাঁটতে গাইতে লাগলো,
“জ্বলে আগুন বুকেতে,
দে আগুন দে—নিভাইয়া দে!”
·
·
·
চলবে……………………………………………………