কালান্তরের কন্যা - পর্ব ১০ - ইলমা বেহরোজ - ধারাবাহিক গল্প

কালান্তরের কন্যা - ইলমা বেহরোজ
          মারিয়াম হড়হড় করে বমি করে ফেলল। ওর পুরো পেট ঘুলিয়ে আসছে। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত এগারোটা ছুঁইছুঁই। ভয়ের চোটে ঘরের সব দরজা-জানালা শক্ত করে বন্ধ করে রেখেছিল। ভেতরে এক ফোঁটা বাতাসও ঢুকতে পারছে না, দম বন্ধ হয়ে আসছে। ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা শরীর ওর। অন্য নারীদের মতো গর্ভকালীন সময়ে ওর এত বমি না হলেও, যখন শুরু হয় তখন আর সহজে থামতে চায় না। বুকের ভেতরটা হাঁসফাঁস করতে থাকায় নিরুপায় হয়ে মারিয়াম জানালাটা এক ঝটকায় হাট করে খুলে দিল। ঠিক তখনই, জানালার ওপাশে অন্ধকারের মধ্য থেকে আসিফ ওর মুখটা বাড়িয়ে দিল। আকস্মিক ঘটনায় মারিয়াম সজোরে চিৎকার করে উঠল।

হ্যাংলা-পাতলা গড়নের, সারাক্ষণ গাঁজার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা আসিফ মাত্র বিশ বছরের যুবক। অল্প বয়সেই সে ঠিক কয়টা মেয়ের জীবন ধ্বংস করেছে, শয্যাসঙ্গী করেছে তার নির্দিষ্ট কোনো হিসাব বস্তির কেউতো দূর আসিফ নিজেও দিতে পারবে না। উল্টো বস্তির কিছু সস্তা মেয়ে একটু দাপট নিয়ে চলার লোভে এই ছ্যাঁচড়া, লম্পটের পিছু পিছু ঘোরে। 

আসিফ জানালার গ্রিল ধরে দাঁত বের করে হেসে বলল, “ভয় পাইছেন?”

মারিয়াম ঘৃণায় নাক-মুখ কুঁচকে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। ওর ভেতরে খুব অস্বস্তি কাজ করছে। 

আসিফ বলল, “ভয় পাইয়েন না। খোঁজখবর নিতে আইলাম। কিছু খাইছেন? আপনার বইন কাজলী মরছে, না এখনো লড়তাছে?”

মারিয়াম কোনোমতে নিজের কণ্ঠ শক্ত করে বলল, “কী চাস তুই, এখানে আসছস কেন?”

“কইলাম ত খোঁজখবর নিতে আইছি। পেট ত অনেক উঁচু হইছে। কয় মাস চলে?”

আসিফের চোখ দুটো মারিয়ামের শরীরের ওপর সাপের মতো কিলবিল করতে লাগল।

অপমানে, ভয়ে মারিয়াম হুইলচেয়ারের চাকা ঘুরিয়ে পাশের অন্ধকার ঘরে চলে যেতে লাগল। আসিফ দমে যাওয়ার পাত্র নয়; সে জানালার গ্রিলটা শক্ত করে ধরে হাসতে হাসতে বলতে লাগল, “ভালোই তো মোটা হইছেন। সাইজ কি ৪০ নাকি ৪২? মাপতে দিবেননি? আমি কিন্তু ভালা মাপতে পারি।” 

বলেই খিলখিল করে পৈশাচিক হাসিতে ফেটে পড়ল। মারিয়ামের পুরো শরীর ভয়ে শিউরে উঠল। কতগুলো বছর ধরে পা দুটো অচল; হুইলচেয়ারের চাকার ওপরই বন্দি হয়ে আছে ওর সমস্ত পৃথিবী। কোনো বিপদ ঘটলে এক কদম হেঁটে পালানোর শক্তিটুকুও নেই। ও নিজের দুই হাত দিয়ে শক্ত করে কান চেপে ধরল, যাতে নরপশুটার একটা কুৎসিত শব্দও মগজে না ঢোকে। অবশ হয়ে আসা শরীরটা নিয়ে, কান্না চেপে মারিয়াম মনে মনে পরম করুণাময়কে ডাকতে লাগল।

রাত ঠিক বারোটায় কুঁজো হয়ে ঘরে ঢুকলেন জোহরা। দরজায় খটখট শব্দ হতেই হুইলচেয়ারের চাকা ঘুরিয়ে একপ্রকার ঝাঁপিয়ে পড়ল মারিয়াম। ওর চোখ দুটো এতক্ষণের কান্না আর আতঙ্কে লাল হয়ে আছে।

মায়ের হাত দুটো শক্ত করে খামচে ধরে ও আকুল হয়ে বলল, “আম্মা! কাজলী ভালা আছে? ওর শরীর কেমন আছে? ডাক্তার কী কইছে আম্মা? ওর জ্ঞান ফিরছে? মেডিকেলে ওরে একলা রাইখ্যা আইছো কেন? আম্মা, কও না... ও আম্মা!”

জোহরা কোনো উত্তর দিলেন না। ওনার শুকনো, ফ্যাকাশে ঠোঁট দুটো অবশ হয়ে আসছিল। বিছানার ওপর কোনোমতে ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দিয়ে নিস্তেজ গলায় বললেন, “একটু পানি দে।”

মারিয়াম কাঁপা কাঁপা হাতে পানির গ্লাসটা বাড়িয়ে দিল। ঢকঢক করে কয়েক ঢোক পানি গিলে জোহরা বুকভরে দীর্ঘশ্বাস নিলেন। তারপর কোনোমতে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব ঘটনা খুলে বললেন। কাজলীর শরীরে এখন স্যালাইন চলছে। ভোররাতের দিকে হয়তো ওর হালকা একটা ভাব আসতে পারে। তবে ডাক্তারের ধারণা, ওর শরীর যেভাবে জ্বরে ভেঙে পড়েছে, তাতে পুরোপুরি হুঁশ ফিরতে অন্তত ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা অর্থাৎ পাক্কা তিন দিন সময় লেগে যেতে পারে।

মারিয়াম ডুকরে কেঁদে উঠল, “ওরে অচেনা জায়গায় একলা রাইখা আইছো কেন? চলো, এহনি হাসপাতালে যাই।”

জোহরা চোখ দুটো বুজে অবশ গলায় বললেন, “যামু... একটু খাড়া, শরীরটা আর চলে না।”

বলতে বলতেই তিনি বিছানায় ধপাস করে শুয়ে পড়লেন। মারিয়ামের চোখ গেল বিছানার চাদরের দিকে। মায়ের পরনের মেক্সিটা কালচে রক্তে ভিজে সপসপ করছে! এতক্ষণের মানসিক চাপ, হাসপাতালের দৌড়াদৌড়ির ধকল, সিঁড়ি ভাঙার কারণে ওনার ভেতরের মরণব্যাধিটা ক্ষুধার্ত বাঘের মতো জেগে উঠেছে। সস্তার স্যানিটারি প্যাড সেই রক্তের স্রোত আর ধরে রাখতে পারছে না। 

মারিয়ামের বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। আজ যদি কাজলী ঘরে থাকত, কত নিপুণ হাতে, কত মায়ায় মাকে সামলে নিত! সে তো পঙ্গু, অচল। ওর নিজের বলতে শুধু চাকাওয়ালা চেয়ারটুকুই। আজ তো কাজলী নেই, আজ ওকেই শক্ত হতে হবে। 

মারিয়াম নিজের সমস্ত মানসিক শক্তি এক করে হুইলচেয়ারের চাকা ঠেলে ঘরের কোণের ঝুড়িটার দিকে গেল। সেখান থেকে হাত বাড়িয়ে কয়েক টুকরো পুরোনো সুতি কাপড় আর একটা নতুন প্যাড তুলে নিল। তারপর চাকা ঘুরিয়ে বিছানার পাশে এসে দাঁড়াল।

জোহরার শরীরটা একদলা মাংসপিণ্ডের মতো অসাড় হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। মারিয়াম নিজের অচল পা দুটোকে কোনোমতে টেনে-হিঁচড়ে বিছানার ওপর তুলল। পুরো শরীরের ভর দুহাতের ওপর ছেড়ে দিয়ে, ও কোমরটা টেনে মায়ের রক্তাক্ত মেক্সিটা আলতো করে ওপরের দিকে তুলতে লাগল।

জোহরার শরীর থেকে জমাট বাঁধা কালচে রক্তের চাকাগুলো পরিষ্কার করার সময় মারিয়ামের বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। ও নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে কান্না চাপার আপ্রাণ চেষ্টা করল, যাতে একটা গোঙানির শব্দও মুখ ফুঁড়ে বের হতে না পারে। দাঁতের কামড়ে ঠোঁট কেটে রক্ত বের হওয়ার উপক্রম হলো। এতদিন ধরে মায়ের দুর্গন্ধময় মলমূত্র, রক্ত ধৈর্য ধরে পরিষ্কার করত কাজলী। আজ মাত্র একবেলা সেই কাজ করতে গিয়েই ওর দম আটকে আসছে।

মারিয়াম দুহাতে সর্বশক্তি দিয়ে মায়ের ভারী শরীরটা টেনে সোজা করল। পরিষ্কার সুতি কাপড় দিয়ে ওনার উরু আর চারপাশের কালচে রক্ত মুছে নতুন প্যাডটা পরিয়ে দিল। তারপর ওনার ক্লান্ত, নগ্ন শরীরের ওপর বিছানার একটা চাদর টেনে দিল।

রক্তে ভেজা কাপড়ের টুকরোগুলো মেঝেতে ফেলে নিজের দুটো পায়ের দিকে তাকাল। এই পা দুটো যখন সচল ছিল, তখন কত অবহেলায় শুয়ে-বসে দিন কাটিয়েছে। আর আজ যখন পা দুটো বড্ড বেশি চলতে চাইছে, তখন তারা অবাধ্য, কোনো সায়ই দিচ্ছে না!

মারিয়াম চোখের জল মুছে ব্যকুল হয়ে মায়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, “ও আম্মা, কাজলীর কাছে যাইবা না? ও একলা, যদি কিছু হইয়া যায়?”

জোহরা অর্ধচেতন অবস্থায় জড়ানো গলায় ধীরে ধীরে বললেন, “সকালে যামু। সাহেব ভাই আছে ওহানে।”

মারিয়াম মায়ের বুকের ওপর মাথাটা এলিয়ে দিয়ে এবার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, “কাজলী বাঁচব ত আম্মা? ওরে ছাড়া আমরা কেমনে বাঁচুম? আল্লাহ ত আমগোর সব নিয়া নিছে। কাজলীডারেও কি উনি নিয়া যাইব?”

জোহরা কোনো উত্তর দিলেন না, শুধু কাঁপতে থাকা হাতটা তুলে মারিয়ামের মাথায় সান্ত্বনার পরশ বুলিয়ে দিলেন৷ ঘরের মেঝেতে তখনো পড়ে রইল বিকেলের বাসি বিরিয়ানি আর রক্তে মাখা কাপড়ের টুকরো, মেক্সি, পেটিকোট। কোনো সুস্থ মানুষ এই ঘরে ঢুকলে হয়তো দুর্গন্ধে মুহূর্তে বেরিয়ে যাবে। অথচ এক বুক যন্ত্রণার সাথে নিয়তিকে মেনে নিয়ে, কী অবলীলায় মা-মেয়ে সেই ঘরেরই বিছানায় জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে!

ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত বারোটা বিশ। জামিল আর ইউসুফ এসে দাঁড়াল বাড়ির দোরগোড়ায়। সন্ধ্যাবেলাতেই সাবিনা বেগম জামিলকে ফোন করেছিলেন। তখন জামিল বেশ গুছিয়ে বানিয়ে বলেছিল, “চাচি, আমরার এক বন্ধু এক্সিডেন্ট করছে, ওরেই দেখতে আইছি হসপিটালে। বেচারার দুনিয়াত কোনো আপনজন নাই। ইউসুফ আমার লগেই আছে। এখন বন্ধুটারে এই অবস্থায় থুইয়া চইলা আওয়াও তো ঠিক হইব না, চাচি। আপনি একদম চিন্তা কইরেন না, ইউসুফ ভালো আছে, আমার পাশেই বসা। একটু রাইত হইলেও সমস্যা নাই। এখন আপনিই কন, ইউসুফরে এই রাইতে একলা ছাইড়া দেওয়া কি ঠিক হইব? এমনিতেই ওর ওপর কত কিছুর কুনজর! আবার এইদিকে মরণের অবস্থায় বন্ধুটারে হসপিটালে একলা ফালায়া চইলা যাই ক্যামনে? আপনি আমার ওপর ভরসা রাখেন, আমি নিজের দায়িত্বে ওরে সহি-সালামতে এক্কেবারে ঘরের দুয়ারে পৌঁছায়া দিমু। জি চাচি জি, একটু পরেই ওরে ভালো কিছু কিনা খাওয়াইতেছি। আপনি একটুও টেনশন কইরেন না। বিপদে পড়া অনাথ বন্ধুর পাশে দাঁড়াইলে ইউসুফেরও তো ভালো হইব, দোয়া পাইব।” 

এমন হরেক রকম ভুজুংভাজুং দিয়ে জামিল সাবিনা বেগমকে কোনোমতে শান্ত করেছিল। এমনকি ওনাকে আশ্বস্ত করতে ভিডিও কলেও ইউসুফকে দেখিয়েছে। তাই বলে রাত বারোটায় ফেরা তো সাবিনা বেগম কিছুতেই মেনে নেবেন না। বাড়ি ফিরলে আজ আর ইউসুফকে নয়, ওনার সব রাগ গিয়ে পড়বে জামিলের ওপর। জামিল নিজের মুখে বলেছে, সে ইউসুফকে সঙ্গে করে নিয়ে গেছে!

ইউসুফের অবশ্য বাড়ি ফেরা নিয়ে কোনো চিন্তা কাজ করছে না, ওর পুরো মনটা পড়ে আছে কাজলীর ওপর। হাঁটতে হাঁটতে ও হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “কাজলী এমন হুট করে সেন্সলেস হয়ে গেল কেন?”

জামিল বেশ বিজ্ঞের মতো বুঝিয়ে বলল, “ জ্বরের মইধ্যে মেয়েটার ওপর দিয়ে কী পরিমাণ মানসিক টর্চার গেছে ক? ফেসবুকে ওরে নিয়া ট্রল হইতেছে, চারপাশের মানুষ কত আজেবাজে কথা শুনাইতেছে, তার ওপর আবার বস্তির ভেতরেও একগাদা ঝামেলা। এমন অল্প বয়সী একটা মাইয়া এত কলঙ্ক এত অপবাদ ক্যামনে সইব? শরীর যখন অসুখে পড়ে, তখন মগজ, মন এতো মানসিক চাপ নিতে পারে না। মূলত ব্রেইনের ওপর অতিরিক্ত প্রেসার পড়ার কারণেই ও সেন্সলেস হইয়া গেছে। ডেঙ্গুও কারণ হইতে পারে৷ কী জানি৷”

কথা শেষ হতে না হতেই খট করে দরজা খুলে গেল। চৌকাঠের ওপাশ থেকে চোখ দুটো বড় বড় করে জামিলের দিকে তাকিয়ে আছেন সাবিনা। ওনার অগ্নিমূর্তি দেখে ইউসুফ ভয়ে থতমত খেয়ে আমতা আমতা করে বলল, “আম্মা... জামিল আসতে দেরি করছে৷”

বলেই সে কোনোমতে মায়ের পাশ কেটে সুড়সুড় করে ঘরের ভেতর ঢুকে গেল। সাবিনা জামিলকে দাঁড় করিয়ে যা নয় তা বলে কটু কথা শোনাতে লাগলেন। কথায় কথায় ও যে তাদের বাড়িতে আশ্রিত, সেই খোঁটা দিতেও ছাড়লেন না। জামিল নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে হলেও বন্ধুর প্রেমের জন্য সমস্ত তিরস্কার নীরবে সয়ে গেল।

ইউসুফ নিজের ঘরে ঢুকেই থমকে দাঁড়াল। সিমরান খাটের ওপর থমথমে মুখে বসে আছে৷ ইউসুফকে দেখেই সিমরান কুটিল হেসে বলল, “ইদানীং দেখছি বেশ রাত করে ফেরা হচ্ছে ভোলা মিয়ার! ঘটনা কী?”

ইউসুফ অস্বস্তি লুকাতে হাতের হাতঘড়িটা খুলতে খুলতে বলল, “আপু, তুমি এখনো ঘুমাওনি?”

“তোর ওই খাতাটা আমি খুলে দেখেছি। হয়তো তাড়াহুড়োয় কোথাও লুকাতে ভুলে গেছিস!”

ইউসুফের বুকের ভেতরটা ছ্যাৎ করে উঠল। কোন খাতাটার কথা বলছে আপু? ও তো নিজের অসংখ্য ডায়েরিতে, খাতায় মনের খেয়ালে কত কিছু লিখে রাখে! সিমরান টেবিলের ওপর রাখা লাল কভারের খাতাটার দিকে ইঙ্গিত করে বলল, “কাকে নিয়ে একেক তারিখে, একেক দিনে একই চরণের লাইনগুলো বারবার লিখে রেখেছিস? হাওয়া কে?”

ইউসুফ চোখ সরিয়ে নিয়ে শুকনো গলায় বলল, “গান এটা আপু৷ গানটা আমার পছন্দের, তাই ডায়েরিতে লিখে রেখেছি।”

সিমরানের মুখটা এবার কঠোর হয়ে উঠল। সে তীক্ষ্ণ গলায় প্রশ্ন করল, “ঘর থেকে টাকা চুরি করেছিস কেন?”

মুহূর্তেই ইউসুফের হৃৎস্পন্দন থমকে গেল। ও একেবারে পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সিমরান খাট থেকে উঠে ঝড়ের বেগে এসে ইউসুফের গাল বরাবর সপাটে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিল। গর্জে উঠে বলল, “চোর একটা! ঘর থেকে টাকা চুরি করেছিস কেন? কথা বল।”

ইউসুফ মাথা নিচু করে ভাঙা গলায় বলল, “প্রয়োজন ছিল।”

“কীসের প্রয়োজন, হ্যাঁ? কথা বলিস না কেন? লুকিয়ে লুকিয়ে কী করছিস তুই? কুত্তা একটা, কথা বলছিস না কেন? থাপড়ে থাপড়ে আজ তোর চেহারার নকশা বদলে দেব! মুখ খোল!” 

ইউসুফ আর একটা শব্দও উচ্চারণ করল না৷ সিমরান মধ্যরাত অবধি হাজারো চেষ্টা করল, গালাগাল দিল, পিঠে গুটিকয়েক কিল-ঘুষিও বসাল; তবুও ইউসুফের মুখ থেকে একটা কথাও বের করতে পারল না। শেষমেশ রাত তিনটের দিকে ওপাশের রুম থেকে মেয়ের কান্নার আওয়াজ শুনে সিমরান রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে নিজের রুমে চলে গেল। 

চারপাশটা একদম নিঝুম হয়ে আসতেই ইউসুফ পা টিপে টিপে জামিলের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজার ফাঁক দিয়ে ভেতরে ঢুকে অন্ধকারেই ফিসফিসিয়ে ডেকে উঠল, “এই জামিল, জামিল? উঠ।”

জামিল ঘুমজড়ানো চোখে চোখ কচলাতে কচলাতে ধড়ফড় করে উঠে বসল, “কী হইছে? কী?”

“আমার ভালো লাগছে না ভাই৷ চল, কাজলীর কাছে যাই।”

জামিল সময় দেখে আঁতকে উঠে বলল, “মাথা খারাপ হইছে তোর? এই সময়ে?”

“প্লিজ, চল! ডাক্তার বলল না, শেষরাতের দিকে ওর হালকা জ্ঞান ফিরতে পারে? ও চোখ মেলল কি না শুধু একটু দূর থেকে দেখে আসি, প্লিজ!”

“সাহেব চাচারে একটা কল দিলেই তো জানতে পারবি।”

“না, আমি নিজের চোখে ওকে দেখতে চাই। প্লিজ চল আমার সাথে৷ সেজো দুলাভাই রাতে বাইক নিয়ে আসছে, ওনার বাইকটা গ্যারেজে লক করা আছে। এই দেখ, আমি ঘর থেকে চাবিটা নিয়ে আসছি৷ বাড়ির সবাই ঘুম থেকে ওঠার আগেই আমরা দেখে চলে আসব। প্লিজ ভাই, চল!”

যখন ভোরের প্রথম আলোর সাথে ফজরের আজান ভেসে এল, কাজলী তখন আধো-আধো চোখ মেলল৷ এতক্ষণ যাবত হাসপাতালের টিমটিমে আলোয় ওর দিকে ঠায় তাকিয়ে ছিল ইউসুফ। কাজলী চোখ মেলতেই দুজনের চোখাচোখি হয়ে গেল। সংকোচে ইউসুফ ঝট করে চোখ নামিয়ে নিল৷ কয়েক সেকেন্ড পার হওয়ার পর ও আবারও চোরা চোখে তাকাল। দেখল কাজলী ওর ক্লান্ত চোখ দুটো দিয়ে এখনো তারই দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে৷ ইউসুফের ভেতরটা কেমন ওলটপালট হয়ে গেল, ভীষণ উসখুস করতে লাগল৷ কাজলী কি হুঁশে আছে? সে কি তাকে চিনেছে? মনে মনে কি তাকে কোনো কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে? ওর নিজের চেহারাটা ঠিক আছে? কুৎসিত লাগছে না তো? মেয়েটা ওভাবে দেখছে কেন? দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগে ইউসুফ কয়েকবার চোখ তুলল, আবার পরক্ষণেই চোখ নামিয়ে ফেলল।

যতক্ষণ কাজলীর আধো-বোঁজা চোখ দুটো খোলা ছিল, সে যেন কোনো মোহে শুধু ইউসুফের দিকেই তাকিয়ে রইল৷ হয়তো ওটা ছিল ওর অবচেতন মন, হয়তো হুঁশ ফিরলে এই শেষ রাতের কোনো কথাই ওর মনে থাকবে না৷ কিন্তু ওই কয়েক মিনিটের চাহনি ইউসুফের বুকের ভেতরটা মারাত্মকভাবে নাড়িয়ে দিয়ে গেল৷ এতদিনের লালিত মনস্তাত্ত্বিক ভয়ে, দ্বিধায় ভাঙন ধরে সেখানে জেঁকে বসল কাজলীকে চিরতরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। ইউসুফ নিজের অজান্তেই একটা কঠিন প্রতিজ্ঞায় বাঁধা পড়ে গেল। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে এবং রাতে চোখ বোজার আগে, কাজলীর চোখের এই একটুখানি চাহনি ওর চাই-ই চাই। 

এতদিনের যাপিত জীবনে ও কখনোই বুঝতে পারেনি যে ওর আসলে কী প্রয়োজন, ওর জীবনের আসল লক্ষ্যটা কী। কিন্তু আজ এই শেষ রাতে ও খুব গভীরভাবে অনুভব করতে পারল, ওর একটা আস্ত মানুষকে চাই, ওর কাজলীকে চাই।

সেই ভোর থেকেই ইউসুফের ব্যক্তিত্বে অদ্ভুত পরিবর্তন এলো। সে খুব চতুরতার সাথে বাড়িতে একের পর মিথ্যা বলতে শুরু করল৷ জামিলকে আর বুদ্ধি দিয়ে নতুন কোনো অজুহাত শেখাতে হচ্ছিল না, ইউসুফ নিজেই বানিয়ে বানিয়ে কথা বলতে পারদর্শী হয়ে উঠল। বাড়িতে হরেক রকমের মিথ্যার জাল বুনে, সমস্ত বাধা ডিঙিয়ে সে রোজ ছুটে আসতে লাগল হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা কাজলীর কাছে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp