আড়ালে আবডালে শুধুই তুই - পর্ব ৩৩ - রাহা ইসলাম - ধারাবাহিক গল্প

আড়ালে আবডালে শুধুই তুই
—কবুল বল, বান্দি। অনেক সুযোগ পেয়েছিস। অনেক উড়েছিস আর না। এবার তোর পায়ে শেকল পড়ানোর পালা। দাঁতে দাঁত পিষে বলছে অভ্র..

—না..বলব না।

—কেন বলবি না সালি? যখন তোকে ছুঁই তখন তো খুব ভালো লাগে, তাই না? আর কবুল বলতে বলায় এত কাহিনী শুরু করেছিস?

অভ্রের মুখে এমন নোংরা ইঙ্গিতপূর্ণ কথা শুনে রাহার পুরো শরীর ঘৃণায় কেঁপে উঠল। মনে হলো কেউ তার আত্মসম্মানের ওপর আঘাত করেছে। বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল অসহ্য অপমানে। রাগে, কষ্টে, ঘৃণায় তার চোখ দুটো লাল হয়ে উঠল। সে তাকাল অভ্রের দিকে। এমন এক দৃষ্টিতে, যেন এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে ঘৃণিত মানুষটাকে দেখছে।

অভ্র ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল,

—এভাবে তাকানোর কী আছে? সত্যিটাই তো বললাম। থাপ্পড় খেতে না চাইলে দ্রুত কবুল বল।

রাহার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। গলা শুকিয়ে এলো। এই মানুষটাই যে তার হাসির কারণ হয়ে উঠছিল ধীরে ধীরে যার জন্য বুকভরা স্বপ্ন সাজাচ্ছে।নাআর আজ? আজ সেই মানুষটাই তার চরিত্র, তার সম্মান, তার ভালোবাসাকে অপমান করছে। চোখ বেয়ে অনবরত জল গড়িয়ে পড়তে লাগল।কিন্তু সেই কান্নার মাঝেও তার কণ্ঠে ছিল আগুন।

সেও সেম ভাবে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

—শুনে রাখুন, আমি মরে গেলেও কবুল বলব না। আপনার মতো জঘন্য মানসিকতার মানুষকে আমি কখনো বিয়ে করব না। যাকে ভালোবেসেছিলাম সে মানুষটা অনেক আগেই মরে গেছে। আমার সামনে এখন শুধু একটা অহংকারী, নোংরা আর নিষ্ঠুর মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।

কথাটা শেষ হতেই অভ্রের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।চোখের রক্তিম দৃষ্টি আরও ভয়ংকর হয়ে উঠল।
এক ঝটকায় সামনে এগিয়ে এসে সে গর্জে উঠল,

—মরে যাবি?

রাহা চোখের পানি মুছে ফেলল।
ভয় নয়, তার চোখে তখন শুধুই তীব্র ঘৃণা।

—হ্যাঁ, মরে যাব।তবুও আপনাকে বিয়ে করব না। আপনার স্ত্রী হওয়ার চেয়ে আমার কাছে মৃত্যুও অনেক সম্মানের।

কথাটা শুনে অভ্রের ভেতরের রাগ যেন বিস্ফোরিত হলো।তার দু'হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেল।কপালের রগ ফুলে উঠল। সে ঝুঁকে রাহার মুখের সামনে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল,

— মরে যাওয়া এতো সোজা.? তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে।

কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে বলে উঠে,

–কথায় আছে, মানুষের কথা অন্তরে লাগাতে নেই, আর তোর কথা তো নয়ই,
মানুষ তো পেয়ারা কেনার সময় জিজ্ঞেস করে — মিষ্টি হবে কি না, পরে আবার সেটাই লবণ মাখিয়ে খায়! 

বলেই অদ্ভুত ভাবে হাসতে লাগলো..

–তা বিয়ে করবি কেনো? বিয়ে ছাড়া যখন উপভোগ করতে পারিস তাহলে বিয়ের কি দরকার তাই না.।
মাই লেডি.!

 রাহা তৎক্ষণাৎ দুই হাত দিয়ে কান চেপে ধরে বলল,

–”চুপ করুন! একটা কথাও বলবেন না। অসভ্য লোক!”

রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে অভ্র কয়েক পা এগিয়ে এল। এক ঝটকায় রাহার চোয়াল দুটো শক্ত করে চেপে ধরল।

— চুপ! একদম চুপ! আমার সামনে সাধ্বী সাজার চেষ্টা করবি না। পরপুরুষের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা,নাচার সময় তোর এই ভদ্রতার মুখোশ কোথায় ছিল? এত পুরুষসঙ্গ ভালো লাগে তোর? একজনে মন ভরে না?

ব্যথায় রাহার চোখ ভরে উঠল জলে। কাঁপতে কাঁপতে সে অভ্রের হাত সরানোর চেষ্টা করল।

—অভ্র ভাই... প্লিজ... আমি আর সহ্য করতে পারছি না। আল্লাহর দোহাই লাগে, থামুন। আপনি ভুল বুঝছেন। যা ভাবছেন, তেমন কিছুই হয়নি।

একদম চুপ! কোনো এক্সপ্লেইনেশন শুনতে চাই না আমি। শুধু বল—কবুল! ব্যাস এটুকুই।

অভ্র রাগে রাহার দু'পাশে হাত রেখে দাঁড়িয়ে ছিল। তখনও রাহার নিশ্চুপ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকায় হঠাৎই চোয়াল শক্ত করে রাহার পাশের দেয়ালে সজোরে ঘুষি মারল।

ধাম!

বিকট শব্দে পুরো ঘর কেঁপে উঠল।
রাহাও ভয়ে কেঁপে উঠল। উপস্থিত সবাইও চমকে তাকাল অভ্রের দিকে। এক কোণায় দাঁড়িয়ে অবন্তিকা আর সাফা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেই চলেছে। শিফা ও ভয়ে ছিটিয়ে আছে আর ফুঁপিয়ে ফুপিয়ে কাদঁছে। বারবার ইচ্ছে করছে রাহার কাছে ছুটে যেতে, কিন্তু অভ্রের ভয়ঙ্কর রূপ দেখে সাহস এগোতে পাচ্ছে না।

জারিফ আর জায়ান এগিয়ে আসতে নিতেই অভ্র রক্তচক্ষু মেলে তাদের দিকে তাকায়।

— ডোন্ট ডেয়ার..কেউ সামনে আসবি না!। 

এবার ইভান আসতে নিলে

গর্জে উঠল সে।

—এটা আমার আর রাহার ব্যাপার। কেউ মাঝখানে আসার চেষ্টা করবি না।

অভ্রের কণ্ঠের কঠোরতায় তিনজনেই থমকে গেল।
এদিকে দেয়ালে পিঠ ঠেকে দাঁড়িয়ে আছে রাহা। চোখ বেয়ে অনবরত জল গড়িয়ে পড়ছে।
অভ্র আবারও তার দিকে ঝুঁকে এল।

—শেষবার জিজ্ঞেস করছি... কবুল বল।

রাহা কাঁপতে কাঁপতে মাথা নাড়ল।

—না…

শব্দটা খুব ছোট ছিল, কিন্তু যেন আগুনে ঘি ঢেলে দিল।অভ্রের বুক ওঠানামা করছে রাগে। চোখদুটো রক্তিম হয়ে উঠেছে।

—তাহলে আমার ধৈর্যেরও শেষ দেখে নিবি আজ…

রাহার হাত ধরে টেনে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো একটা চারকোনা সোফার উপর আর সাথে সাথে বলে উঠল..

গেট লস্ট, এভরিওয়ান!

কথাটা বজ্রকণ্ঠে বলে উঠতেই চারপাশ যেন থমকে গেল। কিন্তু কেউ নড়ল না। সবাই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। 
মনে একই প্রশ্ন
যাবো মানে..!

তাদের যেতে না দেখে অভ্রের ধৈর্যের শেষ বাঁধটুকুও ভেঙে গেল। পাশের একটি চেয়ার টেনে নিয়ে প্রচণ্ড শক্তিতে মেঝেতে আছাড় মারল সে।

ধড়াম!

বিকট শব্দে পুরো অফিস কেঁপে উঠল। উপস্থিত সবাই আতঙ্কে চমকে উঠল।রক্তিম চোখে সবার দিকে তাকিয়ে অভ্র গর্জে উঠল—

—যেতে বলেছি না?!এই সেইড গেট লস্ট , রাইট নাউ।

তার কণ্ঠের রুক্ষতা আর ক্রোধে যেন বাতাসও ভারী হয়ে উঠল।
চোয়াল শক্ত করে, বুকের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভ উগরে দিয়ে সে বলল—

—আজ এখানেই, এই মুহূর্তে, ওর সাথে আমার সব হিসাব শেষ হবে। বাসর হবে বাসর। এখানে আর এই মুহূর্তেই। লাগবে না কোনো বিয়ে... লাগবে না কোনো কবুল বলা! বারবার আমার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলা না? আজ আমার অধিকার কী এই বান্দির উপর, সেটা হারে হারে ওকে বুঝিয়ে দেব। একদম চিরতরে সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেব!

কথাগুলো বলার সময় তার চোখে-মুখে এমন এক উন্মত্ত রাগের ছাপ ফুটে উঠল, যা দেখে উপস্থিত সবার বুক কেঁপে উঠল। কেউ সাহস পেল না একটি শব্দও উচ্চারণ করার। ঘরের নীরবতা যেন আরও ভয়ংকর হয়ে উঠল।

আর অন্যদিকে কাজী সাহেব তো ভয়ে এক কোনায় গুটিয়ে আছে। জীবনের প্রথম এমন এমন ভয়াবহ অবস্থা দেখছে চোখের সামনে। কখন জানি সেও হার্টফেল করে। আল্লাহ আল্লাহ করছে শুধু।

—————

ফ্ল্যাশব্যাক...

দুলালপুর থেকে প্রায় আধা ঘণ্টার পথ পেরোলেই চোখে পড়ে জেলার অন্যতম স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দুলালপুর ইউনিভার্সিটি। বিশাল ক্যাম্পাসজুড়ে আজ যেন উৎসবের আমেজ। কারণ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুল প্রতীক্ষিত নবীন বরণ অনুষ্ঠান।

সকাল থেকেই শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছে পুরো ক্যাম্পাস সাজানোর কাজে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক থেকে শুরু করে একাডেমিক ভবন, অডিটোরিয়াম, খেলার মাঠ—সবকিছুই রঙিন ব্যানার, ফুল ও আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হচ্ছে। চারদিকে নতুন শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানিয়ে ঝুলানো হয়েছে আকর্ষণীয় ফেস্টুন ও শুভেচ্ছা বার্তা।

দুলালপুর ইউনিভার্সিটির নবীন বরণ অনুষ্ঠান প্রতি বছরই বেশ জাঁকজমকপূর্ণভাবে আয়োজন করা হয়। শুধু শিক্ষার্থী বা অভিভাবকরাই নয়, এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, সমাজের বিশিষ্ট মানুষদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয় এই অনুষ্ঠানে।

এবারের আয়োজনকে আরও বিশেষ করে তুলতে ঢাকা থেকে আমন্ত্রিত হয়েছেন দেশের সুপরিচিত ও খ্যাতনামা প্রফেসর আইজান শিকদার মাহাদী। তিনি একজন সম্মানিত একাডেমিক ব্যক্তিত্ব, যিনি শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। এছাড়াও উপস্থিত থাকবেন এলাকার মেম্বার, চেয়ারম্যান,কয়েকজন বিজনেসম্যান সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানগণ এবং আরও কিছু সম্মানিত অতিথি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে তৈরি করা হয়েছে বিশাল একটি সুসজ্জিত মঞ্চ। সেখানে চলবে নবীন শিক্ষার্থীদের বরণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, অতিথিদের বক্তব্য এবং নানা আয়োজন। পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে এখন একটাই আলোচনা—

"আজকের অনুষ্ঠানটা স্মরণীয় হতে চলেছে!"

নতুনদের পদচারণায় মুখরিত হবে দুলালপুর ইউনিভার্সিটি, আর তাদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত পুরো ক্যাম্পাস।

—————

নবীন বরণের দিন বলে কথা—সকালটা যেন অন্য সব দিনের চেয়ে একটু বেশি উজ্জ্বল, একটু বেশি প্রাণবন্ত হয়ে ধরা দিয়েছিল। আয়াত অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী তার ভার্সিটির প্রোগ্রাম আর যেহেতু রাহা রা এসেছে তাই সবাইকে তার ভার্সিটি এমনকি বন্ধু বান্ধবদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিবে এটাই তার ভাবনা। 

ভোরের প্রথম আলো জানালার কাঁচ ছুঁয়ে ঘরে ঢুকতেই সবাই আয়াত জেগে উঠল। 
আয়াত তো ভীষণ খুশি। সবাইকে ডেকে তুলল।
নাস্তা করে রেডি হতে হবে। তাড়াতাড়ি গেলে ঘুরিয়ে দেখাতে পারবে এখানকার জায়গাগুলো

সবাই ঢুলতে ঢুলতে ঘুম থেকে উঠে পড়ল..
আয়াত দ্রুত হয়ে বলে গেলো।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত ড্রেস কোড অনুযায়ী আয়াত পরেছিল পিঙ্ক কালারের সিল্কের শাড়ি। কোমল গোলাপি রঙের সেই শাড়িটা তার গায়ে এমনভাবে মানিয়ে গিয়েছিল, যেন ভোরের আকাশের লাজুক আভাটা এসে তাকে ছুঁয়ে গেছে। খোলা চুলের ফাঁকে ফাঁকে বাতাস খেলছিল, আর মুখের সেই স্বাভাবিক মায়াবী সৌন্দর্যটাকে আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে তুলছিল।

আয়াতের সঙ্গে মিল রেখে রাহা, শিফা, অবন্তিকা আর সাফা সবাই সফট বেবি পিঙ্ক শেডের পোশাক বেছে নিয়েছিল।
রাহা পরেছিল লম্বা সফট গাউন। গাউনের হালকা কাপড় বাতাসে দুলে দুলে তাকে যেন রূপকথার কোনো রাজকন্যার মতো লাগছিল। শিফা সাদামাটা কিন্তু ভীষণ এলিগ্যান্ট একটি চুড়িদারে নিজেকে সাজিয়েছিল। অন্যদিকে অবন্তিকা আর সাফা থ্রি-পিসে নিজেদের এমনভাবে গুছিয়ে নিয়েছিল যে, একসাথে দাঁড়ালে মনে হচ্ছিল গোলাপি রঙের কোনো সুন্দর ক্যানভাস জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

সবাইকে দেখে আয়াতের মুখেও অনেকদিন পর একটু স্বস্তির ছাপ ফুটে উঠেছিল। 

ইভানের ইন্টার্নশিপ থাকায় তাকে সকালেই বের হতে হবে। তবুও যাওয়ার আগে সে নিজেই সবাইকে গাড়িতে তুলে দিল। মুখে যতই স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করুক, চোখেমুখে স্পষ্ট ছিল অদ্ভুত এক অস্থিরতা।গাড়ির দরজা বন্ধ করার আগে সে একবার আয়াতের দিকে তাকাল, তারপর গম্ভীর গলায় বলল—

—বাইরে একদম একা বের হবি না। কিছু লাগলে আমাকে কল দিবি। আমি কাজ শেষ করে আসার সময় নিয়ে আসব। আর সবাই সাবধানে থাকিস।

আয়াত মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।

কিন্তু কথাগুলো বললেও ইভানের চোখ যেন বারবার শিফার দিকেই চলে যাচ্ছিল। মেয়েটাকে রেখে যেতে তার একদমই ইচ্ছে করছিল না। কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ তাকিয়ে থেকে শেষমেশ নিজেকে সামলে নিল সে। গাড়ি ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গেল।

প্রায় আধাঘণ্টা পর তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল গেটের সামনে পৌঁছাল।দূর থেকেই বিশাল ক্যাম্পাসটা দেখে সবার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।রঙিন ব্যানার, ফুলের সাজসজ্জা, গেটজুড়ে আলোকসজ্জা আর চারপাশের উৎসবমুখর পরিবেশ পুরো ক্যাম্পাসকে যেন নতুন রূপ দিয়েছে। মনে হচ্ছিল আজ শুধু নবীন বরণ নয়, পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ই নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে।

গেট পেরিয়ে ভেতরে পা রাখতেই রাহা, শিফা, সাফা, অবন্তিকা আর আয়াত কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল।চারপাশে সিনিয়রদের আনাগোনা, ব্যস্ত শিক্ষকদের চলাফেরা, নতুন ছাত্রছাত্রীদের উচ্ছ্বাস, স্টেজে মাইক টেস্টের শব্দ, বিভিন্ন বিভাগের ব্যানার, হাসি-আড্ডা আর ক্যামেরার ফ্ল্যাশ—সব মিলিয়ে পরিবেশটা ছিল অবর্ণনীয়।

সাফা বিস্মিত চোখে চারপাশ দেখছিল।
—আল্লাহ... জায়গাটা এত সুন্দর!

অবন্তিকা হেসে বলল,

—মনে হচ্ছে সিনেমার কোনো ক্যাম্পাসে চলে এসেছি।

ইতোমধ্যে কুমিল্লার বিভিন্ন গণমাধ্যম কর্মীরাও অনুষ্ঠান কাভার করার জন্য উপস্থিত হয়েছেন। ক্যামেরা ঘুরছে একদিক থেকে আরেকদিকে। স্টেজের সামনে ব্যস্ততা বেড়েই চলেছে।

রাহারা সবাই মিলে একটি সুন্দর জায়গা বেছে নিয়ে দাঁড়াল।শুরু হলো ছবি তোলা।
কেউ মোবাইল হাতে ভিডিও করছে, কেউ গ্রুপ সেলফি তুলছে, কেউ আবার একে অপরকে নিয়ে মজা করছে।হাসির শব্দে চারপাশ মুখর হয়ে উঠল।

ঠিক তখনই রাহা হঠাৎ চারপাশে তাকিয়ে বলল—

—আয়াত আপু! এইদিকে এসো! ছবি তুলবে না?

সবার চোখ একসঙ্গে ঘুরে গেল আয়াতের দিকে।
কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকার পর আয়াতের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল ছোট্ট একটা হাসি।
কিন্তু সেই হাসিটা ছিল একদম সত্যিকারের।

—আসছি…

বলেই সে ধীরে ধীরে তাদের দিকে এগিয়ে এলো।

—————

প্রায় এগারোটার কাছাকাছি আর মাত্র কিছুক্ষণ পরেই শুরু হবে নবীন বরণের মূল অনুষ্ঠান। তাই ভিড় বাড়ার আগেই আয়াতরা স্টেজের একদম সামনের দিক থেকে কয়েক সারি পেছনে গিয়ে বসে পড়ল। সেখান থেকে পুরো মঞ্চটা স্পষ্ট দেখা যায়—প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি আয়োজন চোখের সামনে ধরা পড়বে।

চারপাশে তখন উৎসবমুখর পরিবেশ। রঙিন সাজসজ্জায় সেজে উঠেছে পুরো ক্যাম্পাস। শিক্ষার্থী, শিক্ষক আর অতিথিদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে চারদিক।একে একে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে শুরু করলেন এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। বিশিষ্ট চেয়ারম্যান, সম্মানিত মেম্বারসহ আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ অতিথিকে ফুল দিয়ে বরণ করে নির্ধারিত আসনে বসানো হলো। করতালিতে বারবার মুখর হয়ে উঠছিল পুরো হলরুম।

সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই চলছিল।
হঠাৎ করেই মাইক্রোফোনে উপস্থাপকের কণ্ঠ ভেসে এলো—

—“এবার আমাদের মাঝে উপস্থিত হবেন সম্মানিত অতিথি, মিস্টার আইজান শিকদার মাহাদী...!”

নামটা কানে যেতেই যেন সময় এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।রাহা, সাফা আর অবন্তিকা একসাথে স্তব্ধ হয়ে গেল। তাদের চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠল। মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল, জায়গা নিল অবিশ্বাসের।বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা যেন হঠাৎ করেই কয়েকগুণ বেড়ে গেল।

এখানে...?

আইজান শিকদার মাহাদী এখানে কীভাবে?

তিনজনই হতবাক দৃষ্টিতে একে অপরের দিকে তাকালো। যেন নিজেদের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছে না।

একজন আরেকজনের মুখের দিকে তাকিয়ে অবিশ্বাসে বলল,

—আমি যা শুনলাম... তোরা কি ঠিক সেটাই শুনলি?

তিনজনই একসাথে মাথা নাড়ল। মুখে বিস্ময়, চোখে কৌতূহল। যেন এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না।ঠিক তখনই পুরো ক্যাম্পাসের পরিবেশ যেন মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ গেল।

সব চোখ একসাথে ঘুরে গেল প্রধান প্রবেশপথের দিকে।আলো, শব্দ, গুঞ্জন—সবকিছু যেন ধীরে ধীরে আরও শব্দহীন হয়েবাযাচ্ছে। কারণ যার নাম কিছুক্ষণ আগেই ঘোষণা করা হয়েছে, তিনি এখন বাস্তবেই প্রবেশ করছেন।ধীর, দৃঢ় আর অদ্ভুত এক আত্মবিশ্বাসে ভরপুর পদক্ষেপে

তিনি এগিয়ে আসছেন—মঞ্চের দিকে।
প্রতিটি পা ফেলার সাথে সাথে মনে হচ্ছে পুরো ক্যাম্পাসের বাতাসই বদলে যাচ্ছে।
চারপাশের মানুষের দৃষ্টি স্থির, কারও চোখ সরছে না এক সেকেন্ডের জন্যও।আর সেই মুহূর্তে দরজার ভেতর দিয়ে স্পষ্টভাবে দেখা গেল তাকে—
মাহাদী।

কালো রঙের নিখুঁত ফিটিং স্যুটে নিজেকে সাজিয়েছে সে। প্রশস্ত কাঁধ, তীক্ষ্ণ চোয়াল আর ব্যক্তিত্বে ভরা উপস্থিতি তাকে বাকিদের থেকে আলাদা করে তুলেছে। তার প্রতিটি পদক্ষেপে যেন অদৃশ্য এক কর্তৃত্ব ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে।
হলের অসংখ্য শিক্ষার্থী মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে। কেউ ফিসফিস করে কথা বলছে, কেউ আবার একদম হা করে তাকিয়ে আছে।

—উফ! মানুষ এত হ্যান্ডসাম হয় কীভাবে?

—সিরিয়াসলি, চোখ সরানোই যাচ্ছে না!

স্টেজে পা রাখার পর এক মুহূর্তের জন্যও তার চোখ চারপাশে ঘুরল না। আলো-আঁধারির ভিড়, মানুষের অসংখ্য দৃষ্টি—সবকিছু ছাপিয়ে তার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল এক বিন্দুতে।
মাঝখানে বসা সেই একমাত্র মানুষটির উপর।
রাহা।

যে তখনও বিস্ময়ে স্থির হয়ে তার দিকেই তাকিয়ে আছে।মাহাদীর তীক্ষ্ণ, গভীর দৃষ্টি সরাসরি এসে আটকালো রাহার চোখে। মুহূর্তেই রাহার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
শ্বাস যেন এক সেকেন্ডের জন্য আটকে গেল।

তার মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল—

"এই লোকটা এখানেও?"

অবাক হওয়ার মাত্রা এতটাই বেশি যে কয়েক সেকেন্ডের জন্য আশেপাশের সব শব্দ যেন তার কানে পৌঁছানোই বন্ধ হয়ে গেল। শুধু অনুভব করল মাহাদীর সেই স্থির দৃষ্টি, যা ভিড়ের হাজারো মানুষের মাঝেও অবলীলায় তাকে খুঁজে নিয়েছে।

—————

অফিসের ভেতরে হালকা শীতল এসি চলছিল, কিন্তু অভ্রের মাথার ভেতরে যেন আগুন জ্বলছে।
টেবিলের উপর রাখা ল্যাপটপটা অর্ধেক খোলা, চারপাশে ফাইল ছড়ানো—সবই যেন গুরুত্বহীন হয়ে গেছে এই মুহূর্তে।

“মাহাদী কুমিল্লায় এসেছে…”

খবরটা সে সকালে অফিসে ঢুকতেই শুনেছে।যখন কনফার্মড রিপোর্টটা পেল, তখনই বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুতভাবে চেপে ধরল।
আর ঠিককিছুক্ষণ পেরোতেই রাহার পেনডেন্টে থাকা জিপিএস ট্র্যাকারটা হঠাৎ সিগন্যাল দিল।
একবার… থেমে… আবার।
স্ক্রিনে লোকেশন ফ্ল্যাশ করল—একই জায়গা।
অভ্রের আঙুলটা অচেতনভাবেই টেবিলে শক্ত হয়ে গেল। চোয়াল কষে উঠল ধীরে ধীরে।

“ইউ ডোন্ট…” সে নিচু গলায় নিজেকেই থামিয়ে দিল।কণ্ঠটা ঠান্ডা, কিন্তু ভেতরে ঝড়।

কিন্তু চোখের সামনে শুধু একটা নামই ভাসছে—মাহাদী।
সে চেয়ারটা ঠেলে উঠে দাঁড়াল। পরের মুহূর্তেই ফোনটা তুলে নিল।

“লোকেশন ডাবল চেক করলো। 

স্ক্রিনের সেই ছোট্ট ব্লিপটা আবারও জ্বলজ্বল করছে।অভ্র আর এক মুহূর্তও দেরি করল না।
বারবার শিফাকে কল দিলো, কিন্তু সে ধরল না। প্রতিটা রিংটোন যেন তার ধৈর্যের শেষ সীমানাটাকে আরও একটু করে টেনে ছিঁড়ে দিচ্ছিল। অবহেলাটা এবার আর সাধারণ বিরক্তি রইল না—এটা ধীরে ধীরে রাগে পরিণত হলো, আর সেই রাগটা চোখের ভেতর জমে উঠল ঘন অন্ধকারের মতো।

হঠাৎই সে টেবিলের ওপরের সবকিছু এক ঝটকায় মেঝেতে ফেলে দিল।
কাঁচ, ফাইল, কলম—সবকিছু ছিটকে পড়ল চারপাশে। ঘরজুড়ে ভেঙে পড়ার শব্দে যেন বাতাসটাও কেঁপে উঠল।

এক মুহূর্তের জন্য পুরো অফিস থমকে গেল।
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন পর্যন্ত শব্দ শুনে স্থির হয়ে গেল।
ঠিক তখনই দৌড়ে এলো জারিফ।
সে একবার ঘরের ভেতরের অবস্থা দেখে থমকে গেল, কিন্তু পরের মুহূর্তেই বুঝে গেল—এটা প্রশ্ন করার সময় না।

অভ্র তখনও দাঁড়িয়ে, মুখ শক্ত, চোখ ঠান্ডা।
সে ঘাড় ঘুরিয়েই জারিফের দিকে তাকাল।
কণ্ঠটা নিচু, কিন্তু এতটাই ধারালো যে বাতাস কেটে গেল—

 “গাড়ি বের কর। এখনই কুমিল্লা যাব।”
ফাস্ট…..
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp