আমার বড় হওয়া বস্তিতে। মাথার ওপর বাবা নামক ছায়া নাই, পাশে এসে দাঁড়ানোর মতো ভাই নাই। সম্ভবত এই অভিভাবকহীনতাই আমার সবচেয়ে বড় অপরাধ। আর তাই সমাজের কিছু পুরুষরূপী জানোয়ার ভেবে নিয়েছে আমি তাদের ব্যক্তিগত সম্পদ। খুব ছোটবেলা থেকেই হ্যারাসমেন্টের শিকার হয়ে আসছি। মাত্র সাত বছর বয়সে প্রথম ব্যাড টাচ চিনেছি। তারপর স্কুলে, কলেজে, বাজারে এমন কোনো জায়গা নাই যেখানে আমার অজান্তে কেউ আমার শরীরকে কলুষিত করার চেষ্টা করেনি। কখনো লোকলজ্জার ভয়ে প্রতিবাদ করতে পারিনি, শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সবকিছু ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করেছি।
কিন্তু আর কত? কবরে পৌঁছানোর আগ অবধি কি মেয়েদের মুক্তি নেই? এই অমানুষগুলোকে আমি আর বিন্দুমাত্র ছাড় দেব না। ভিডিওতে থাকা পশুটার নাম আশিক। বাপের নাম হাসেম মিয়া। কুলাঙ্গারটা সিলেট উপশহরের ঝিলপাড় বস্তিতে থাকে। আমিও ওখানেই থাকি। কলেজ লাইফ থেকেই ও আমাকে পশুর মতো তাড়া করে বেড়াচ্ছে। ওর প্রপোজাল রিজেক্ট করায়, মুখ এসিড দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছিল। চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের সময় একটা ঝামেলায় জড়িয়ে বছরখানেক জেল খেটেছে। কিছুদিন হলো জেল থেকে বেরিয়েছে। এসেই আবার আমার জীবনটা অতিষ্ঠ করে তুলেছে। ভিন্ন ভিন্ন নাম্বার থেকে কল করে গালিগালাজ করে। বিয়ে না করলে রেপ করে রাস্তায় ফেলে রাখবে বলে হুমকি দিয়েছে। (নিচে স্ক্রিনশট দেয়া আছে)
দুইদিন যাবৎ জামাকাপড় খুলে হোয়াটসঅ্যাপে ভিডিও কল দিচ্ছে। ক্যামেরা ঘুরিয়ে রাখে সামনের দিকে। অশ্লীল, বিকৃত অঙ্গভঙ্গি করে। ভয়ে, অপমানে গত দুটো রাত আমি এক ফোঁটাও ঘুমাতে পারিনি। আজ সকালে কাজের সূত্রে একটা জরুরি ফোন আসার কথা ছিল, তাই অপরিচিত নাম্বার দেখেও আমাকে কলটা রিসিভ করতে হয়। সঙ্গে সঙ্গে গা গুলিয়ে উঠেছে। সেই একই নোংরামি৷
কল কেটে দিলে আবার কল করে। ওর মতো জানোয়ারকে আর ছাড় দেয়া যায় না। তাই আমি স্ক্রিন রেকর্ড অন করে ওর কল রিসিভ করি৷ (শেষে ভিডিও রেকর্ডটা এড করে দিয়েছি)
এই সাইকোটার হাত থেকে আমি কীভাবে মুক্তি পাব? পুলিশের কাছে যাওয়ার সাহস বা সামর্থ্য কোনোটিই আমার নেই। টাকা খেয়ে ওরাই উল্টো এই বেজন্মাকে নিরাপত্তা দেবে। আমার নিরাপত্তা কে দেবে? এই পশু থেকে আমাদের মতো মেয়েদের কে রক্ষা করবে?
কাজলী নিজের মোবাইল স্ক্রিনের দিকে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে। গতকাল সন্ধ্যায় করা ফেসবুক পোস্ট পুরো নেট দুনিয়ায় ঝড় তুলেছে। চল্লিশ হাজার লাইক, পনেরো হাজার কমেন্ট আর ১৭ হাজার শেয়ার! ক্যাপশনের সঙ্গে কিছু স্ক্রিনশট আর একটা ছেলের নগ্ন হয়ে গালিগালাজ করার ভিডিও৷ গা শিউরে উঠা সেই দৃশ্য!
সকাল সকাল উঠেই কাজলী ভার্সিটি গিয়েছিল। ক্লাস শেষ করে সেখান থেকে উপশহরের সি ব্লকের এক অভিজাত ফ্ল্যাটে গেল স্টুডেন্ট পড়াতে। পড়ানোর মাঝখানেই মারিয়াম কল করল। কাজলীর বড় বোন। ওপাশ থেকে ফিসফিসিয়ে বলল, “কাজলীরে কাজলী, কী করছস তুই? কিছু পোলাপাইন আশিকরে জ্যান্ত পিটায়া গেছে। একটু আগে পুলিশও আসছিল ওর খোঁজে। তোরেও খুঁজতেছিল৷ আশিক এখন লাপাত্তা, কোথাও লুকায়া পড়ছে। আশিকের বাপের সাঙ্গোপাঙ্গরা বস্তিতে ঘুরঘুর করতাছে। তুই তাড়াতাড়ি বাড়িতে আয়!”
কাজলীর বুকটা ধড়ফড় করে উঠল। সে দ্রুত স্টুডেন্টের মায়ের ঘরে গেল বিদায় নিতে। ড্রয়িংরুমে সোফায় বসে কফি খাচ্ছিলেন ভদ্রমহিলা। কাজলী চলে যাবে শুনে ভ্রু কুঁচকে, মুখটা চরম অবজ্ঞায় বাঁকিয়ে বললেন, “পড়াও তো সপ্তাহে মাত্র পাঁচদিন। তার ওপর আজ বিশ মিনিট পড়িয়েই চলে যাচ্ছো? এভাবে কি ও গোল্ডেন এ-প্লাস পাবে? আজকালকার মেয়েদের কোনো দায়িত্ববোধ নেই।”
কাজলী হাত দুটো কচলে, গলার স্বর যতটা সম্ভব নিচু করে বলল, “আই অ্যাম এক্সট্রিমলি স্যরি আন্টি। আমার বাসায় একটা ভীষণ জরুরি সমস্যা হয়েছে। আমাকে এখনই বাড়ি ফিরতে হবে।”
ভদ্রমহিলা কফির কাপটা টেবিলের ওপর সশব্দে রাখলেন। কপালের ভাঁজ আরও চওড়া করে বললেন, “কী এমন জরুরি কাজ তোমার? আমার মেয়ের কাল ক্লাস টেস্ট। সিলেবাসের অর্ধেক বাকি।”
“আন্টি, ও সব পড়া পারে। শুধু একটু রিভিশন দিলেই হবে। আমি দরকার হলে কাল এসে এক্সট্রা টাইম দেব।”
ভদ্রমহিলা এবার একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললেন, “তোমাদের তো প্রতিদিনেরই একই বাহানা। কখনো মা অসুস্থ, কখনো বোন। টাকার দরকার হলে ঠিকই হাত পাতো, আর কাজের বেলায় ফাঁকিবাজি! যাও, কিন্তু এভাবে চললে পরের মাস থেকে আর আসতে হবে না।”
কথাগুলো তীরের মতো কাজলীর বুকে গিয়ে বিঁধল। মাত্র কয়েকটা টাকার জন্য, বেঁচে থাকার তাগিদে এই তথাকথিত ভদ্র সমাজের মানুষদের কত কথাই না মুখ বুজে সইতে হয়! নিজের ভেতরের কান্না চেপে কাজলী সালাম দিয়ে দ্রুত ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে রাস্তার দিকে পা বাড়াল।
বস্তির মুখে পা দিতেই টের পেল চায়ের দোকানদার থেকে শুরু করে গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা বখাটে সবার উৎসুক চোখ ওর দিকে। কাজলী কোনোদিকে না তাকিয়ে, ওড়নাটা মাথায় ভালো করে টেনে নিয়ে প্রায় দৌড়ে নিজেদের বাড়ির ভেতর ঢুকল।
ঝিলপাড় ঘিঞ্জি বস্তির মাঝে এটাই তাদের একমাত্র মাথা গোঁজার ঠাঁই। একটা ভাঙাচোরা, জরাজীর্ণ তিন রুমের একতলা টিনের বাড়ি। বহু পুরোনো এই ভিটেমাটি আর টুকরো জমিটুকুই তাদের জীবনের শেষ সম্বল। হয়তো এই নরকতুল্য বস্তিতে তাদের অন্য সবার মতো প্রতি মাসে ঘরভাড়া গুনতে হয় না, কিন্তু তাদের জীবনযাত্রার মান বস্তির বাকি দরিদ্র মানুষদের চেয়ে আলাদা কিছু নেই। একইরকম, নুন আনতে পান্তা ফুরানোর দিনলিপি। আর এই সমাজে তাদের মতো অভিভাবকহীন নারীদের জীবনের মূল্যও ঠিক ততটুকুই, যতটুকু একটা উচ্ছিষ্টের থাকে।
পায়ে পায়ে ঘরের ভেতর ঢুকতেই কাজলীর প্রথমে চোখে পড়ল চাকাওয়ালা জরাজীর্ণ হুইলচেয়ারে বসে আছে থাকা পঙ্গু বোনটা, মাথায় শক্ত করে ওড়না টানা। ওর নাম মারিয়াম। পাশের জরাজীর্ণ বিছানায় শুয়ে আছেন জোহরা। তাদের জন্মদাত্রী মা। বিছানার চাদরটার একটা বড় অংশ রক্তে ভিজে সপসপ করছে। বিগত তিন বছর ধরে একই দৃশ্য দেখে অভ্যস্ত কাজলী। ডাক্তার অনেক আগেই হাত তুলে দিয়েছেন; জরায়ুর এই জটিল সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান নেই। অন্যান্য শারীরিক দুর্বলতার কারণে অপারেশন করা সম্ভব নয়। তাই আজীবন দামি হরমোন ইনজেকশন আর চড়া দামের ব্যথানাশক বড়ি খাইয়েই শরীরটাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। প্রতি মাসে প্রায় ছয় হাজার টাকার ওষুধ লাগে। তার ওপর অন্তঃসত্ত্বা ও পঙ্গু বোনের হুইলচেয়ারের চাকা সচল রাখার দায়, সবটাই কীভাবে যেন উনিশ বছর বয়সী কাজলীর কচি কাঁধে এসে চেপে বসেছে। অথচ তাদের একটা ভাইও ছিল! সেই নিমকহারাম ভাইটা নিজের বউ-বাচ্চা নিয়ে শহরের অন্য প্রান্তে আলাদা রাজত্ব পেতেছে। বিশাল বড় এক কর্পোরেট কোম্পানির বড় কর্মকর্তা সে। কিন্তু সেই সুরম্য অট্টালিকায় বুড়ো মা আর বোনদের জন্য কোনো জায়গা হয়নি।
বিছানায় মরার মতো পড়ে থাকা জোহরা কাজলীকে দেখে যেন অলৌকিক শক্তিতে কাঁপা শরীরেই উঠে বসলেন। পাশেই পড়ে থাকা একটা ভারী চ্যালাকাঠ হাতে তুলে নিয়ে কোনো কিছু না ভেবেই হিংস্রভাবে আঘাত করতে লাগলেন কাজলীকে। কাজলীর পিঠ আর হাত চাবুকের মতো কেটে যেতে লাগল।
জোহরা হিংস্র চোখে তাকিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, “এতো বড় কাম করার আগে তুই আমারে একবার জিজ্ঞেস করছস? হারামজাদি, তুই আগুনে হাত দিছস! ওগো ক্ষমতা কত জানস তুই? তোরে ছিঁড়ে ওরা মোড়ে টানায়া রাখব। কি কাম করছস তুই!”
কাজলী চোখ দিয়ে জল পড়লেও চোয়াল শক্ত করে বলল, “আমি ওদের ছাইড়া দিব? ওরা আমার সাথে যা ইচ্ছা তাই করব আর আমি সহ্য করব? আমিও ওদের ছিঁইড়া ফেলব!”
জোহরা ঠাস করে কাজলীর গালে একটা চড় কষিয়ে দিলেন, “বড় কথা খালি মুখ দিয়াই কইতে পারবি। আসলে কিচ্ছু করতে পারবি না। নিজের লগে নিজের পঙ্গু বইনডারে আর অসুস্থ মারেও বিপদে ফেলছস, হারামজাদি!”
গালে হাত দিয়ে কাজলী এবার ডুকরে কেঁদে উঠল, ক্ষোভে ফেটে পড়ে বলল, “আমি না খাটলে, আমি না থাকলেই তোমরা আসল বিপদে পড়তা। রাস্তায় বসে ভিক্ষা করতে হইত।”
“খোঁটা দেস? এই জানোয়ারের বাচ্চা, তুই নিজের মারে খোঁটা দেস?”জোহরা বেগম চিৎকার করে উঠলেন।
“জানোয়ার আমি না, তুমি জানোয়ার! যে মা নিজের মেয়ের ওপর চলা এত বড় নোংরামির পাশে না দাঁড়ায়া অপরাধীর পক্ষ নেয়, সে হইতেসে আসল জানোয়ার!”
হুইলচেয়ারে বসা মারিয়াম এবার চিৎকার করে উঠল, “কাজলী! মুখে লাগাম দে! কী কইতেছস তুই? জাহান্নামেও তোর জায়গা হইব না। নিজের আম্মারে কেউ এমন কথা কয়?”
“তুই চুপ থাক আপা! মা যখন চ্যালাকাঠ দিয়া আমারে কুত্তার মতো মারতাছিল, তখন তুই ফিরাতে আসছিলি? পারোস নাই, কারণ তোর পা নাই! কিন্তু মুখটা তো ছিল? তোরা মা-মেয়ে দুইটাই এক!”
মারিয়াম বলল, “মায়েরা এমনি এমনি সন্তানদের মারে না কাজলী। তুই দোষ করছস।”
“হ, দোষ খালি আমার! এই কাজলীর জন্ম হওয়াই এই দুনিয়ার সবচেয়ে বড় দোষ!”
জোহরা ফ্যাসফ্যাসে গলায় বললেন, “তুই আশিকের এতো বড় ক্ষতি করছস কেন? নেটে ওর নেংটা ভিডিও ছাড়ার কি দরকার আছিলো? ওর বাপের সম্মান নষ্ট কইরা কী পাইছস?”
“ও যে আমারে প্রতিদিন থ্রেট দেয়? ও যে বলে আমায় রেপ করে রাস্তায় ফালায়া রাখব! ওইটা কি অন্যায় না তোমার চোখে? আমার ক্ষতি হইতে পারত না? আমি আর কী করতাম?’’
“মারিয়ামও তো এই বস্তিতেই থাকে, ওরে তো কেউ কখনো এমন হুমকি দেয় নাই! এমন খোলামেলা, সাইজাগুইজা বাইরে চলাফেরা করলে পোলারা খারাপ নজর দিবই। রাগে-ক্ষোভে পুরুষ মানুষ কত কি বইলা ফেলে। তাই বইলা কি সত্যি সত্যি সেটা কইরা ফেলে?”
কাজলী আর কিছু বলল না। বলতে পারল না। স্তব্ধ হয়ে গেল। যে মা নিজের মেয়ের ওপর চলা দীর্ঘদিনের মানসিক আর যৌন নির্যাতনকে হালকা চোখে দেখছে, তার সাথে আর কোনো যুক্তি চলে না। কাজলী ওড়নার খুঁট দিয়ে চোখের পানি মুছল। এই সংসারে যে সবচেয়ে বেশি ত্যাগ করে, দিনশেষে সেই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত আর দোষী সাব্যস্ত থাকে।
ও আর এক মুহূর্তও ওই ঘরে দাঁড়াল না। ফোনটা হাতে নিয়ে চুপচাপ ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ঝিলপাড় বস্তির ঘিঞ্জি গলি ছাড়িয়ে কিছুটা দূরে একটা বিশাল পরিত্যক্ত বিল আছে। সে গিয়ে সেই বিলের পাড়ে বসল৷
ওড়নার খুঁটে চোখের জল মুছে ফেসবুকে ঢুকল। মেসেঞ্জারে মানুষের মেসেজ আর কলের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। যার মেসেজের জন্য কাজলীর মনটা চাতক পাখির মতো তৃষ্ণার্ত হয়ে আছে, শুধু তারই কোনো খোঁজ নেই। ঈশান। তার অন্ধকার জীবনের একমাত্র আলো, যাকে ঘিরে কাজলী সুখের স্বপ্ন বুনেছে। যার জন্য খুব দ্রুতই এই নরক থেকে তার মুক্তি মিলবে। বুক ভরা আশা নিয়ে সে ঈশানকে একটা মেসেজ করল। মেসেজটি পাঠানোর সাথে সাথেই ওপাশে সিন হলো, কিন্তু কোনো উত্তর এলো না।
কাজলী ভ্রু কুঁচকে আবার মেসেজ করল। কিছুক্ষণ পর ওপাশ থেকে কোনো টেক্সট এলো না, বরং ঈশান কাজলীর করা সেই ভাইরাল ভিডিওটিই তাকে ইনবক্সে শেয়ার করল। তারপরই টেক্সট এলো,
‘ তোমার এই ভাইরাল ভিডিও স্ক্যান্ডাল এখন সবার ফোনে ফোনে ঘুরছে। It’s disgusting and utterly embarrassing for me and my family. আমাদের একটা স্ট্যাটাস আছে, সোসাইটিতে একটা রেপুটেশন আছে। আমার ফ্রেন্ড সার্কেল, বিজনেস সার্কেল সবাই এখন এটা নিয়ে হাসাহাসি করছে। আমার reputation নষ্ট হয়ে গেছে তোমার জন্য।’
মেসেজটা পড়া মাত্রই কাজলীর হৃৎস্পন্দন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলেও সে থম ধরা হাতে টাইপ করল, ‘আমি ভিক্টিম ঈশান!’
ঈশানের জবাব আসতে এক সেকেন্ডও দেরি হলো না, ‘তুমি নিজেকে ভিক্টিম দাবি করতেই পারো, বাট দ্য রিয়ালিটি ইজ, আননোন নাম্বার থেকে কল দিলে একটা মেয়ে কেন বারবার রিসিভ করবে? তুমি নিশ্চয়ই ভেতরে ভেতরে এনজয় করতে, তাই না? জাস্ট সস্তা পপুলারিটি আর ভাইরাল হওয়ার জন্য তুমি এখন এসব ড্রামা করছ।’
কাজলীর পায়ের তলা থেকে যেন আস্ত পৃথিবীটা সরে গেল। সে পাগলের মতো লিখল, ‘মাথা ঠিক আছে তোমার? কী বলছো এসব? আমি কেন সস্তা পপুলারিটি চাইব?’
‘কেন চাইবে না? তোমার অনলাইন বিজনেসের জন্য। আজকাল তো পেজের রিচ বাড়ানোর জন্য এসব চিপ ভাইরালিটিই চলছে।’
কাজলী আর কিছু বলতে পারল না। কয়েক মিনিট আগে নিজের জন্মদাত্রী মায়ের দেওয়া আঘাতের চেয়েও ঈশানের, তার ভালোবাসার মানুষের কুৎসিত অবিশ্বাস তাকে পুরোপুরি বাকরুদ্ধ করে দিল। সে এক হাতে মুখ চেপে ডুকরে কেঁদে উঠল। মাথাটা কেমন যেন ফাঁকা আর পাগল পাগল লাগতে শুরু করল। হাত-পা এতটাই অবশ হয়ে এলো যে সে আর টাইপ করতে পারল না; ফোনটা স্রেফ পাশের ভেজা ঘাসের ওপর নামিয়ে রাখল।
কিছুক্ষণ পর ফোনের স্ক্রিনটা আবার জ্বলে উঠল। ঈশান লিখেছে,
‘ আমার ফ্যামিলি কখনোই তোমার মতো একটা কন্ট্রোভার্সিয়াল মেয়েকে আমাদের বাড়ির বউ হিসেবে মেনে নেবে না। সো, এই বিয়েটা আর পসিবল না। আমার লেভেলের একটা ছেলের সাথে তোমার ম্যাচ হওয়াটাই একটা মিস্টেক ছিল। ডোন্ট ইভেন ট্রাই টু কনট্যাক্ট মি এগেইন। গুড লাক উইথ ইয়োর চিপ ভাইরাল লাইফ।’
মেসেজটা আসার সাথে সাথেই ঈশানের প্রোফাইল পিকচারটা হাওয়া হয়ে গেল। ব্লক করে দিয়েছে! কাজলী হতভম্ব হয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল। মাত্র কয়েকটা মিনিটে তার সাজানো দুনিয়াটা কীভাবে তাসের ঘরের মতো ভেঙে গেল? সে কাঁপা হাতে ঈশানের নম্বরে কল দিল। ওপাশ থেকে যান্ত্রিক কণ্ঠ বলে উঠল, 'নম্বরটি এই মুহূর্তে বন্ধ আছে।'
ইমু, টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ কিছু বাকি রাখল না। সবখানেই ব্লকড! শেষ ভরসা হিসেবে সে ঈশানের মায়ের নম্বরেও ডায়াল করল। ওপাশ থেকেও সাড়া পেল না। সেখানেও তাকে ব্লক করে দেওয়া হয়েছে।
ঝুপ করে নেমে আসা সন্ধ্যার অন্ধকারে বিলের পাড়ে বসে একলা কাজলী এবার পথহারা পথিকের মতো হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে তার বুক চেরা আর্তনাদ বের হতে লাগল। এসব কী হচ্ছে তার সাথে? কেন হচ্ছে? নিজের সম্মান বাঁচাতে গিয়ে সে কি তবে অপরাধ করে ফেলেছে?
চারিদিকে ঘন অন্ধকার নেমে আসছে। যেভাবে নিকষ কালো অন্ধকার এক নিমেষে গ্রাস করে নিয়েছে কাজলীর উনিশ বছরের ছোট্ট জীবনটাকে। ভ্যাপসা গরমে ওর কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে। যে ঈশানের জন্য ও সব কষ্ট হাসিমুখে সইত, সেই ঈশান কীভাবে এতগুলো কুৎসিত কথা তাকে বলতে পারল? না, এভাবে শেষ হতে দেওয়া যায় না। এখনই ঈশানের বাসায় যাবে, ওর কলার ধরে জবাব চাইবে।
কাজলী চোখের পানি মুছে শক্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল। ঠিক তখনই হাতের মুঠোয় থাকা ফোনটা তীব্রভাবে ভাইব্রেট করে উঠল। ঈশান ভেবে এক বুক আশা নিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে কাজলীর মনটা আবার দমে গেল। ডিসপ্লেতে মারিয়ামের নাম ভাসছে। কেটে দিতে গিয়েও কী ভেবে কলটা রিসিভ করল।
লাইনটা কানে নিতেই ওপাশ থেকে মারিয়ামের কান্নামাখা গলা ভেসে এলো, “কাজলী! তুই নাকি বিলের পাড়ে আছস? জয়নাল ভাই দেখছে তোরে। জলদি জঙ্গলটার দিকে দৌড় দে! সাহেব চাচা ওইদিকে যাইতেছে তোরে নিয়া আসার জন্য। কাসেম মিয়ার পোলাপাইন লাঠিসোটা নিয়া তোরে খোঁজার জন্য বিলের দিকে রওনা দিছে। আমার খুব ডর করতাছে কাজলী! তুই জলদি ওইখান থেকে সরে যা!”
মারিয়ামের কথা শেষ হওয়ার আগেই কাজলীর বুকটা কেঁপে উঠল। হিমশীতল ভয় তার শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল। সারা শরীরে কেমন যেন একটা অসাড়তা ভর করল। বিলের চারপাশের ঘুটঘুটে অন্ধকারের দিকে তাকাতেই ওর মনে হলো, দূরে অনেকগুলো কালো ছায়ামূর্তি লাঠিসোটা আর টর্চ নিয়ে ঠিক ওর দিকেই গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসছে। আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে, জুতোজোড়া হাতে নিয়ে কাজলী বিলের পেছনের ঘন অন্ধকার জঙ্গলটার দিকে জানপ্রাণ দিয়ে দৌড়াতে শুরু করল।
·
·
·
চলবে……………………………………………………