— "আমি আপনার জীবনের সেই ঝামেলা, যাকে আপনি নিজেই সাদরে আমন্ত্রণ জানিয়ে এনেছেন। এখন সেই ঝামেলাকেই হাসিমুখে সামলান।"
অন্যদিক ঘুরে রাগে রীরী করতে করতে বলছে রাহা।
অভ্র ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে বলল,
— "যদি ঝামেলা তোর মতো হয়, তবে আমি বারবার সাদরেই আমন্ত্রণ দিতে রাজি, জান।"
রাহা বিরক্ত মুখে ভ্রু কুঁচকে বলল,
— "সরুন! অত ঢং দেখাবেন না।"
অভ্র এক পা এগিয়ে মুচকি হেসে ফিসফিস করে বলল,
— "মেয়েদের 'সরুন' কথাটার আসল মানে কিন্তু 'আরও একটু কাছে আসুন'।
অভ্রের কথা শুনে রাহা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল।
— "ফালতু মানুষের ফালতু যুক্তি!"
কথাটা বলেই সে দ্রুত সামনে এগিয়ে যেতে উদ্যত হলো। ঠিক তখনই অভ্র আলতো করে রাহার শাড়ির আঁচল টেনে ধরল। হঠাৎ টানে রাহার পা থেমে গেল। কয়েক কদম এগিয়েও সে আর সামনে যেতে পারল না।রাহার চোখের সামনে ভেসে উঠল কালকের ঘটনাগুলো...
—————
সকালের নরম রোদ বারান্দাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। অভ্র এক হাতে কফির মগ, অন্য হাতে ল্যাপটপ নিয়ে কাজে ডুবে আছে।
ঠিক তখনই রাহা নিঃশব্দে এসে তার সামনে দাঁড়িয়ে দুই হাত বাড়িয়ে দিল।
অভ্র এক ঝলক তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল, —
"সুন্দর।"
কিন্তু রাহা হাত নামাল না। একই ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল।
ভ্রু কুঁচকে অভ্র কফির মগটা পাশে রেখে বলল, —
"কী হয়েছে, বউ?"
রাহা কোনো উত্তর দিল না। শুধু চোখের ইশারায় নিজের হাতের দিকে তাকাতে বলল।
অভ্র এবার আলতো করে রাহার দুই হাত নিজের হাতে তুলে নিল। মনোযোগ দিয়ে একবার, দু'বার খুঁটিয়ে দেখল ,আঙুলের ডগা থেকে তালুর প্রতিটি নকশা । মেহেদির নকশাগুলো নিখুঁত, রঙও গাঢ় হয়ে ফুটে উঠেছে।হঠাৎ তার দৃষ্টি গিয়ে থামল হাতের ঠিক মাঝখানে।একটা ফাঁকা জায়গা।
অভ্র বিস্মিত স্বরে বলল,
— সবই তো ঠিকঠাক আছে... কিন্তু মাঝখানটা ফাঁকা কেন?
একটু থেমে ঠোঁট বাঁকিয়ে দুষ্টু হাসি হেসে আবার বলল,
— এখানে কার মুণ্ডু আঁকবি যে এত যত্ন করে জায়গা খালি রেখেছিস?
রাহা ঠোঁট কামড়ে বিরক্ত চোখে তাকিয়ে বলল,
— আপনার মুণ্ডু! অসভ্য একটা!
অভ্র ভান করা বিস্ময় নিয়ে নিজের মুখে হাত বুলিয়ে বলল,
— “আমার এই সুদর্শন মুখটা এতটুকু জায়গায় ধরবে নাকি?”
রাহা এবার একেবারে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল।
— “আপনাকে বিয়ে করতে বলেছিল কোন মহাপুরুষ, শুনি?”
— আরে! মুণ্ডু আঁকার সঙ্গে বিয়ের আবার কী সম্পর্ক?
— হাতে কোনোদিন মুণ্ডু আঁকতে দেখেছেন?
অভ্র নির্বিকার ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল।
— আমি কি জীবনে আগে কোনোদিন বিয়ে করেছি নাকি, যে এসব জানব? তুই আঁক, আমি দেখি কেমন হয়!
রাহা কপালে হাত ঠেকিয়ে নাটকীয় সুরে বলে উঠল,
— হায় আল্লাহ! শেষমেশ আমার কপালে এমন একটা নির্লজ্জ মানুষই জুটল!
তারপর অভ্রের দিকে কটমট করে তাকিয়ে বলল,
— অসভ্য মানুষ! এখানে আপনার নাম লেখার জন্যই জায়গাটা খালি রাখা হয়েছে।
অভ্রের ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল।
— ওহ্... তাই বল! তাহলে আমার নামটা এখনও ফাঁকা কেন?
রাহার চোখেমুখে মুহূর্তেই অভিমান নেমে এল।
— নামটা যে লিখে দেবে, সে-ই তো গত রাতে অনুষ্ঠান মাঝপথে রেখে "একটু আসছি" বলে উধাও হয়ে গেল। তারপর আর ফেরারই কোনো খবর ছিল না…
রাহা নিঃশব্দে তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। সেই নীরব দৃষ্টিতেই যেন গত রাতের সমস্ত অপেক্ষা, অভিমান আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।
রাহা কোনো উত্তর দিল না। শুধু নিঃশব্দে অভ্রের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।সেই নীরব দৃষ্টিই যেন হাজারটা অভিযোগের চেয়েও ভারী।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অভ্রের মনে গত রাতের কথা ঝড়ের মতো ফিরে এল।
মেহেদীর অনুষ্ঠানে রাহার সেই শিশুসুলভ আবদার
— "আপনি নিজের হাতে আমার হাতে 'অভ্র' লিখে দিবেন, আর আমি আপনার হাতে 'রাহা'।"
আর সে?
"একটু আসছি" বলে বেরিয়ে গিয়েছিল। তারপর ফিরেছে গভীর রাত তিনটায়। ততক্ষণে অপেক্ষা করতে করতে রাহা নাম না লিখিয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিল।
সবটা মনে পড়তেই অভ্রের মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল। চোখেমুখে স্পষ্ট অপরাধবোধের ছাপ ফুটে উঠল।
অভ্র রাহার দুই হাত নিজের ঠোঁটে ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলল,
— "সরি, জান... আমি কথা দিয়ে কথা রাখতে পারিনি।"
রাহা মুখ ফিরিয়ে নিল,
— "সবার হাতে তাদের প্রিয় মানুষের নাম আছে। শুধু আমার হাতটাই খালি।"
কথাটা শুনে অভ্রের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
— "আসলে, জান।”
রাহা সঙ্গে সঙ্গেই তাকে থামিয়ে দিল।
— "আসলে-নকলের কোনো ব্যাখ্যা আমি শুনতে চাই না। একজন মানুষ যদি সত্যিই কাউকে ভালোবাসে, তাহলে তাকে এভাবে একা ফেলে রাখতে পারে? আপনার কাছে আমার কোনো গুরুত্বই নেই।আপনার- আমার জন্য কোনো ভাবনাই নেই। সেই যে আমাকে রেখে গেলেন, একবারও খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন মনে হলো না! জানেন? আমি কতটা অধীর হয়ে আপনার অপেক্ষা করেছি?"
— "একবার বলতে তো দে, বউ”।
কিন্তু রাহা এক মুহূর্তও থামল না।
— "না! আমি কিছুই শুনতে চাই না।"
কথাটা বলে অভিমানী ভঙ্গিতে সেখান থেকে চলে গেল রাহা।
অভ্র অসহায়ভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের চুলে হাত বুলিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
— "সবটাই তো তোর জন্য, জান। তোকে একটা সারপ্রাইজ দিতে গিয়েই এত দেরি হয়ে গেল। তোর মুখের সেই নির্মল হাসিটা দেখার জন্য আমি কতটা ব্যাকুল হয়ে আছি, সেটা যদি একবার বুঝতে পারতিস!"
মৃদু হেসে সে আবার নিজেকেই বলল,
— "বউটা ভীষণ অভিমানী। আজ যেভাবেই হোক সেই অভিমান ভাঙাতেই হবে। আগে কাজটা শেষ করি, তারপর সোজা ওর কাছে। আবার হলুদের অনুষ্ঠান আছে... এই দিনটা কোনোভাবেই অভিমানে নষ্ট হতে দেব না।”
—————
অভ্রের প্রতি অভিমানবশত রাহা আর নিচে নেমে সবার সঙ্গে খাবার খেতে যায়নি। বিষয়টি জানার পর তার জন্য খাবার কক্ষে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সবাই ধারণা করেছিল, টানা দুই দিনের অনুষ্ঠানের ক্লান্তিতেই হয়তো তার শরীরটা ভালো লাগছে না।
নাস্তা শেষ করেই সে নিজেকে ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে আটকে ফেলল। আর একবারও বের হলো না। বিছানায় আধশোয়া হয়ে অভিমান আর এলোমেলো ভাবনায় ডুবে থাকতে থাকতে একসময় ক্লান্ত চোখে ঘুম নেমে এলো। বাস্তবের কোলাহল পেছনে ফেলে সে কখন ঘুমের গভীরে হারিয়ে গেল, টেরই পেল না।
কিছুক্ষণ পর অভ্র রাহাকে খুঁজতে খুঁজতে কক্ষে প্রবেশ করতেই তার পদক্ষেপ যেন আপনাআপনি থমকে গেল। দৃষ্টিসীমায় ধরা দিল এক অপার্থিব প্রশান্তির দৃশ্য। অভিমান, ক্লান্তি ও অবসাদের ভারে নুয়ে পড়া রাহা গভীর নিদ্রায় নিমগ্ন। তার ঘুমন্ত মুখশ্রীতে ছড়িয়ে আছে এক নির্মল, নিষ্পাপ সৌন্দর্য—যেন সমস্ত গ্লানি উপেক্ষা করে শান্তি নিজেই তার চারপাশে নীরবে বিস্তার লাভ করেছে।
তার পাশেই অসাবধানভাবে পড়ে আছে একটি মেহেদির কোন।
সে আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। টেবিলের ওপর রাখা মেহেদির কোনটা হাতে নিয়ে রাহার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। আলতো করে রাহার হাতটা নিজের হাতে তুলে নিল। ঘুম ভাঙার ভয়েই নিঃশ্বাসটাও যেন আটকে রেখেছে সে। তারপর ধীর, যত্নশীল ছোঁয়ায় রাহার তালুতে লিখে দিল—
"অভ্রের বউ,
অভ্র ছাড়া পৃথিবীর সব পুরুষই আমার বাবা।
নামটা লেখা শেষ করে সে মেহেদির কোনটা নামিয়ে রেখে রাহার হাতের ওপর আলতো একটা চুমু এঁকে দিল।
— "এবার হয়েছে... এখন এই হাতটা সম্পূর্ণ আমার।”
বলে একটু মুচকি হাসি দিয়ে আর একবারও পেছনে না তাকিয়ে নিঃশব্দে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজা টানার ক্ষীণ শব্দ কানে আসতেই রাহা আস্তে করে চোখ মেলে তাকাল।
সে তো মোটেও গভীর ঘুমে ছিল না!
নিজের হাত দুটো চোখের সামনে তুলে অপলক দৃষ্টিতে দেখতে লাগল লেখাটা। অক্ষরগুলো হয়তো খুব নিখুঁত নয়, কোথাও একটু বাঁকা, কোথাও একটু কাঁপা। তবু রাহার চোখে এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর লেখা। কারণ এই কয়েকটা অক্ষরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটার স্পর্শ, যত্ন আর ভালোবাসা।
অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণে প্রশান্ত এক হাসি ফুটে উঠল। মুহূর্তের মধ্যেই সব অভিমান, সব মনখারাপ যেন মিলিয়ে গেল।
তবে না… এত সহজে অভ্রকে ছেড়ে দেওয়া যাবে না!
মন ঠিক হয়ে গেলেও সেটা অভ্রকে একটুও বুঝতে দেবে না রাহা। এবার হিসাবটা সমান করার পালা। যেমন করে অভ্র তার হাতে নিজের অধিকার লিখে দিয়েছে, ঠিক তেমনই অভ্রের হাতেও নিজের নাম লিখবে সে।
পশ্চিম আকাশে সূর্য ঢলে পড়তেই হলুদ ফুলের সাজে পুরো বাড়িটা যেন উৎসবের রঙে প্রাণ ফিরে পেল। চারপাশে ভেসে বেড়াচ্ছে গাঁদা ফুলের মিষ্টি সুবাস। একে একে অতিথিরা হলুদ শাড়ি, পাঞ্জাবি আর রঙিন পোশাকে এসে ভিড় জমাতে শুরু করেছে।
এদিকে অভ্র বাসায় এসে রাহার খোঁজ করলে জানতে পারে, সে এখনও পার্লার থেকে ফেরেনি। বুকের ভেতর অস্থিরতা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। আজ যেভাবেই হোক, স্টেজে ওঠার আগেই রাহার অভিমান গলাতে হবে— এটাই তার একমাত্র লক্ষ্য।
সন্ধ্যার আলো নেমে আসতেই রাহাদের গাড়ি বাড়ির সামনে এসে থামে। একে একে সবাই উচ্ছ্বসিত মুখে গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে। কিন্তু রাহার দৃষ্টি হঠাৎই অভ্রের চোখে আটকে যেতেই, মুহূর্তে তার ঠোঁটের হাসিটুকু মিলিয়ে যায়। মুখ ফিরিয়ে এমনভাবে এগিয়ে চলে, যেন অভ্র নামে কেউ তার সামনে দাঁড়িয়েই নেই।
সবাই যখন ভেতরে ঢুকে পড়েছে, রাহা ইচ্ছে করেই সবার শেষে পা বাড়ায়। অভ্রকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে উদ্যত হতেই—
হঠাৎই অভ্র তার কব্জিটা শক্ত করে মুঠোবন্দি করে ফেলে।
রাহা কিছু বুঝে ওঠার আগেই অভ্র চারপাশে একবারও না তাকিয়ে, বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে তাকে এক ঝটকায় কাঁধে তুলে নেয়।
রাহা অভ্রের এমন আকস্মিক কাণ্ডে চমকে উঠে মৃদু চিৎকার করে উঠল।
— "অভ্র ভাই! কী করছেন? নামান আমাকে!"
কিন্তু অভ্র যেন কিছুই শুনল না। শাড়ি পরে রাহার হাঁটতে অসুবিধা হবে—এই অজুহাতে তাকে শক্ত করে কাঁধে তুলে নিল।
হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনায় আশপাশের সবাই থমকে দাঁড়াল। বিস্মিত চোখে একবার তাদের দিকে তাকাতেই অভ্র ধীরে মাথা ঘুরিয়ে চারপাশে তাকাল। তার সেই শীতল, তীক্ষ্ণ, কর্তৃত্বময় দৃষ্টি যেন নীরব হুঁশিয়ারি ছুড়ে দিল।
এক নিমিষেই সবাই মুখ ফিরিয়ে নিল। কেউ আর একটি শব্দ বলারও সাহস পেল না। কারণ অভ্রের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করার দুঃসাহস কারও ছিল না।
রাহা লজ্জা, রাগ আর অস্বস্তিতে ছটফট করতে করতে বলল,
— "আমাকে নামান... সবাই দেখছে!"
অভ্র নির্বিকার।
এক হাতে রাহাকে আরও শক্ত করে আগলে নিয়ে সোজা ছাদের দিকে এগিয়ে গেল।
ছাদে পৌঁছেই ধীরে তাকে নামিয়ে দিল। কিন্তু নামানো মানেই মুক্তি নয়। মুহূর্তের মধ্যেই দুই হাত দেয়ালে রেখে রাহাকে নিজের মাঝে আটকে ফেলল।তার দৃষ্টি স্থির রাহার চোখে।
কণ্ঠে জমাট রাগ, অভিমান আর দখলদারির স্পষ্ট ছাপ। ঠোঁট দিয়ে বার বার গাল ঠেলতে ঠেলতে বলে উঠে,
— "আমাকে এড়িয়ে চলার সাহস তুই কোথায় পেলি?"
রাহা চুপ।মাথা নিচু।
আঙুল দিয়ে রাহার থুতনি উঁচু করে নিজের দিকে তাকাতে বাধ্য করল অভ্র।
— "আমার চোখের দিকে তাকিয়ে উত্তর দে।"
রাহা এবারও নিশ্চুপ।
অভ্র দাঁত চেপে বলল,
— "কথা বল... আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিবি না।"
রাহা আবারো নীরব
আর সেই নীরবতাই যেন অভ্রের রাগকে আরও উসকে দিল।
সে ঝুঁকে এসে গম্ভীর স্বরে বলল,
— "কথা বল, শালী!"
রাহা ধীরে ধীরে চোখ তুলে তাকাল। ঠোঁটের কোণে অভিমান মেশানো ক্ষীণ হাসি ফুটল।
খুব শান্ত, কিন্তু বুক কাঁপিয়ে দেওয়া দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
— "শালী না... বউ বলেন।"
এক মুহূর্তের জন্য অভ্র স্থির হয়ে গেল।
রাহা আবার বলল,
— "সম্পর্কটার নাম ভুলে গেলেন নাকি? শালী হলে দূরে থাকতাম... কিন্তু আমি তো আপনার বউ। তাই রাগও আপনার ওপরই করি, অভিমানও আপনার সাথেই করি।"
অভ্র আর নিজের রাগটাকে আটকে রাখতে পারল না। রাহার দু'হাত নিজের সামনে টেনে এনে দু'হাতের তালুতে গভীর ভালোবাসায় একের পর এক চুমু এঁকে ফিসফিসিয়ে বলল,
— ঠিকই বলেছিস, বউ... এই অভ্রের বউ।
শুধু নামের নয়, হৃদয়েরও।আমার একান্ত আপন নারী।আমার সমস্ত ভালোবাসার ঠিকানা।
আমার অহংকার, আমার শান্তি, আমার পৃথিবী।
রাহা ঠোঁট চেপে হাসল। তারপর ভান করা গাম্ভীর্যে বলল,
— তাই নাকি? তাহলে এবার আপনার হাতটা দেখান। যদি সেখানে "রাহার জামাই" লেখা না থাকে, তাহলে আজ থেকেই আপনি আমার শালা!
কিন্তু অভ্রের হাতে তো কিছু লেখা নেই ।তাই চুপসে গেলো।
রাহা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তাকিয়ে রইল।
অভ্র ঠোঁটের কোণে মেকী হাসি টেনে কপাল ভাজ করে বলে,
— জান,লিখে দেয় এখন প্লিজ।
পারবোনা বলে...
রাহা ও একটু ভাব নিয়ে চলে যেতে চায়।
—————
বর্তমান......
রাহার হঠাৎ থেমে যাওয়া পায়ের শব্দটুকুও যেন অভ্রের দৃষ্টি এড়াল না। কোনো কথা না বলে ধীরে তার কব্জিটা নিজের মুঠোয় আবদ্ধ করে কাছের একটি বেঞ্চের দিকে নিয়ে গেল। অদ্ভুত এক যত্নে তাকে বসিয়ে দিয়ে নিজেও হাঁটু গেড়ে বসল সামনে।
রাহা বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে আছে। বুঝতে চাইছে—এই মানুষটা এবার আবার কী করতে চলেছে!
অভ্র এক মুহূর্তও দেরি করল না। সীমাহীন প্রশান্তি আর নিঃশর্ত অধিকারের অনুভূতি নিয়ে নিজের মাথাটা আলতো করে রাহার কোলের ওপর রেখে দিল। যেন পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তি, সমস্ত যুদ্ধের অবসান ঘটে এই একটুকরো আশ্রয়েই।
রাহা নির্বাক। তার আঙুলগুলো অজান্তেই অভ্রের চুলে বিলি কাটতে শুরু করেছে।
অভ্র কোলে মাথা রেখেই গভীর মুগ্ধ দৃষ্টিতে রাহার চোখে চোখ রেখে মৃদু হেসে গেয়ে উঠল—
__এমন নিদানের দিনে বিনীত প্রার্থনা গো__
লক্ষ-কোটি ভুল আর ত্রুটি করিও মার্জনা গো
শোনাইবো তোমারে আজ, করেছি বাসনা গো
ঐরাবতের হৃদয় হতে ক্ষুদ্র এ রচনা
আমি কী করিবো, কোথায় যাবো
কোন সাধনে পাবো গো,,
আর একটিবার তোমারই দর্শন
কোন বাঁধনে বাঁধি আমি?
কেমনে তোমায় রাখি গো?
__তুমি ছাড়া হৃদয় অচেতন___
অভ্রের কণ্ঠে ভেসে আসা গান যেন রাহার সমস্ত অনুভূতিকে নিঃশব্দে বন্দি করে ফেলেছিল। সে একদৃষ্টে অভ্রের দিকে তাকিয়ে আছে। অভ্রও তার দৃষ্টি সরায়নি। চারটি চোখে তখন হাজারো অব্যক্ত বাক্যালাপ—ঠোঁট নিশ্চুপ, অথচ চোখের ভাষা যেন শত কবিতার চেয়েও স্পষ্ট। মুহূর্তটা এতটাই গভীর ছিল, যেন চারপাশের পৃথিবী থেমে গেছে; সময়ও তাদের ভালোবাসার সাক্ষী হয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে।
গান থামিয়ে অভ্র মৃদু হেসে বলল,
"জান, পৃথিবীর সবচেয়ে দামি বালিশটা কোথায় জানিস?"
রাহা ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই অভ্র নিজের গালটা আরও আরাম করে তার কোলে চেপে ধরে ফিসফিস করে বলল,
"এইখানে... আমার বউয়ের কোলেই। এখানে মাথা রাখলেই মনে হয়, আমার সমস্ত ক্লান্তি, সমস্ত অস্থিরতা মুহূর্তেই থেমে যায়।
হঠাৎ করেই সাউন্ড বক্সের কর্কশ আওয়াজ সেই মায়াময় নীরবতাকে ভেঙে দিল। দুজনেই চমকে বাস্তবে ফিরে এলো। নিচে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই ডাকার সাহস পাচ্ছে না। তাই স্পষ্ট বোঝাই যাচ্ছে—ওই বজ্জাত দলটাই ইচ্ছে করেই সাউন্ড বাড়িয়ে তাদের রোম্যান্টিক মুহূর্তে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে।
অভ্র ঠোঁটের কোণে দুষ্টু এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে পকেট থেকে একটি মেহেদির কোন বের করল। সেটি রাহার সামনে বাড়িয়ে দিয়ে চোখের ইশারায় নিজের হাতটা এগিয়ে দিল—কিছু লিখে দিতে বলল।
রাহার ঠোঁটেও লাজুক, তৃপ্ত এক হাসি ফুটে উঠল। এক মুহূর্তও দেরি না করে সে অভ্রের তালুতে নিখুঁত অক্ষরে লিখে দিল—
"রাহার একমাত্র জামাই।আমার বউ ছাড়া জগতের সব নারী আমার মা লাগে।”
অভ্র সেই অক্ষরগুলোর দিকে তাকিয়ে এমনভাবে মুচকি হাসল, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে দামী পরিচয়টি আজ তার হাতের তালুতেই লেখা হয়েছে।
লিখে শেষ করতেই রাহা হো হো করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে শরীরটাই যেন দুলে উঠছে, চোখের কোণ ভিজে এসেছে হাসির জলেই।
সারাদিন পর রাহার মুখে এমন নির্মল হাসি দেখে অভ্র অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দিকে। যেন পৃথিবীর সমস্ত প্রশান্তি এই এক টুকরো হাসিতেই লুকিয়ে আছে।
রাহা অভ্রের দিকে হাত ঘুরিয়ে বলল,— এবার পড়ুন তো।
অভ্র রাহার কথায় আবারও পড়ে ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি টেনে মাথা নাড়ল।—
"একদম পারফেক্ট, মাই লেডি। ওইদাউট ইউ, অল লেডিজ আর লাইক মাদার্স।"
রাহা মুচকি হেসে বলল,— আচ্ছা, এবার চলুন। সবাই আমার জন্য অপেক্ষা করছে।
— হুম।
অভ্র নিজের ফোনে দু'জনের হাতের ছবি তুলে মুহূর্তেই মাহাদীর নম্বরে পাঠিয়ে দিল। সঙ্গে লিখল—
"আমি ছাড়া পৃথিবীর সব পুরুষই রাহার বাবা— মনে রাখিস।"
একই বার্তা বাঁধমের ফোনেও গেল।
মেসেজটা দেখেই দুই জামাই একসঙ্গে উচ্চস্বরে হেসে উঠল।
অভ্র ঠোঁট বাঁকিয়ে বিজয়ীর ভঙ্গিতে বলল,— চল, এবার যাওয়া যাক।…..
চলুন…..
—————
বদ্ধ, অন্ধকারাচ্ছন্ন একটি কক্ষ। চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা দেশি-বিদেশি দামি মদের বোতল—কিছু খালি, কিছু অর্ধভর্তি। ভারী মদের তীব্র গন্ধে যেন পুরো ঘরটাই দমবন্ধ হয়ে আছে। ধোঁয়ায় আবৃত পরিবেশে একটার পর একটা সিগারেট জ্বালিয়ে চলেছে মাহাদী। অ্যাশট্রেতে আর জায়গা নেই; অসংখ্য পোড়া সিগারেটের অবশিষ্টাংশ মেঝেজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে।
লালচে, নিদ্রাহীন, নেশায় ঝাপসা চোখে সে সামনে ঝুলে থাকা বিশাল স্ক্রিনের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। সেখানে ভেসে আছে রাহার নিষ্পাপ, মায়াবী হাসিমাখা মুখ।
কাঁপা ঠোঁটে অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করে উঠল,
— "রাহা... আমার শুভ্রপরী... কেন? কেন আমাকে একবারও গ্রহণ করতে পারলে না? আমি কি এতটাই অযোগ্য? কোন দিক দিয়ে আমি অভ্রের চেয়ে কম? সম্পদ, ক্ষমতা, প্রতিপত্তি—এই পৃথিবীতে এমন কিছু নেই, যা আমি চেয়েছি আর অর্জন করিনি। অথচ... শুধু তোমাকেই নিজের করতে পারলাম না।শুধু তুমিই আমার নাগালের বাইরে রয়ে গেলে।"
শেষ কথাটুকু উচ্চারণ করতেই তার ভেতরে বহুদিন ধরে জমে থাকা দহন, ক্ষোভ, অপমান আর উন্মত্ততা একসঙ্গে বিস্ফোরিত হলো।
— "আআআআআআআআআ...!"
এক বিকট আর্তচিৎকারে কক্ষের নীরবতা বিদীর্ণ হয়ে গেল।
হাতে ধরা ভারী কাঁচের বোতলটি সমস্ত শক্তি দিয়ে সামনে ছুড়ে মারল সে। মুহূর্তেই বিকট শব্দে বোতলটি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে অসংখ্য কাঁচের টুকরো চারদিকে ছিটকে পড়ল।
প্রচণ্ড হাঁপাতে হাঁপাতে শরীরটাকে পিছনে এলিয়ে দিল মাহাদী। পরমুহূর্তেই নিথর, টানটান দেহ নিয়ে ঠান্ডা মার্বেলের মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। নিভু-নিভু চোখদুটো ধীরে ধীরে বুজে আসতে লাগল।
নেশায় অবশ হয়ে আসা চেতনার পর্দাজুড়ে একে একে ভেসে উঠতে লাগল অতীতের প্রতিটি অধ্যায়।
যেখানে অভ্র আর মাহাদী ছিল অবিচ্ছেদ্য বন্ধু।
যেখানে প্রতিযোগিতা ছিল শুধুই স্বপ্ন ছোঁয়ার।
যেখানে ভালোবাসা এখনো কারও জীবনে প্রবেশ করেনি।
আর যেখানে কেউই জানত না...
একদিন একটি মেয়েই বদলে দেবে তাদের তিনজনের পুরো জীবন।
ফ্ল্যাশব্যাক…
·
·
·
চলবে……………………………………………………