সাহিদ কাউন্সিল করছে, প্রতিবারের মতো বাধ্য হয়েই। আর ইসমাত বসেছে টেরেসে। শীতল বাতাস তাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। হাতে তার গরম কফি, সাথে ক্রস্যান্ট। ইসমাতের চুল ছাড়া, তা মৃদু বাতাসে দুলছে। কিন্তু ইসমাতের মনোনিবেশ ফোনের ভিডিওকলে। ইফরার সাথে কথা বলছে সে। ইফরার মুখ হাসি হাসি, যেটা ইসমাতকে অবাকই করছে।
--"হাসছিস কেন এভাবে?"
--"নতুন বিয়ে করেছি, তো হাসব না?"
--"সত্যিই বিয়ে করেছিস? কাকে? কীভাবে সম্ভব? এতদিন যখন দাদী বিয়ের কথা বলত, তখন তো খুব রাগারাগি করতি। ভাবিস না আমাকে যা-তা বলে ঘোল খাওয়াতে পারবি। তুই আমার বোন তো.. তোর স্বভাব-গতিক ভালো করেই জানি। এবার সত্যিটা ঝাড়।"
ইফরা হো হো করে হাসল,
--"সত্যি আর কি? প্রেমে পড়েছি তো বিয়ে করব না?"
ইসমাত বিরক্ত হয়ে বলল,
--"এবার কিন্তু চড় খাবি। আমি মোটেও মশকরা করছি না। তোর এত বড়ো নাটকে দাদী হাসপাতালে পৌঁছে গেছে, আর তুই আমাকে প্রেম বুলি শোনাচ্ছিস?"
শেষের দিকে ইসমাত কিছুটা চেতেই গেল। ইফরা বুঝল, দাদীর ওভাবে হাসপাতাল পৌঁছে যাওয়াটা নিয়ে ইসমাত খুব রেগে আছে, সাথে তার দুশ্চিন্তাও বেশ বাড়ছে। ইসমাত এখন দূর দেশে থাকছে, পরিবার থেকে দূরে। চাইলেই যখন তখন ছুটে যাওয়া সম্ভব না। এজন্য প্রবাসি মানুষদের দুশ্চিন্তা কারণে-অকারণে মাত্রাতিরিক্ত থাকে। সেখানে যখন থেকে শুনেছে তার দাদী হাসপাতালে সে আর শান্ত থাকতে পারছে না। ইফরার অতিরিক্ত যা-তা করাটাও সে মেনে নিতে পারছে না। ইফরার ভরসাতেই তো দাদীকে রেখে এসেছিল। এখন এই মেয়ে কী শুরু করে দিয়েছে?
ইফরা এবার ঠান্ডা গলায় বলল,
--"রিলেক্স! ক্রস্যান্ট না দিয়েছে? ওটাতে কামড় বসা, কান্ট্রোল!"
ইসমাত দাঁতে দাঁত চিপল। ক্রস্যান্টকে হাত না লাগিয়ে কফিতে চুমুক দিল। ইসমাত স্ক্রিনে তাকাতেই ইফরা আর ত্যাড়ামো করল না। বলতে শুরু করল,
--"আশিফ আর আমি একই ডিপার্টমেন্টে ছিলাম৷ একই সাথে ক্লাস, প্রেজেন্টেশন, এসাইনমেন্ট সবকিছু। কিন্তু আমি সেভাবে কখনো ওর সাথে মিশিনি। নোটসের ধান্দায়, পরীক্ষার আগের সাজেশন এগুলার জন্য পিছে পিছে ঘুরতাম। ও দিত আবার আমি স্বার্থপরের মতো চলে আসতাম। জানিসই তো তখনই আমি টুকটাক কাজ শুরু করেছিলাম মিডিয়ায়, প্রেম-টেমের সময় কোথায়? এজন্য অনুভূতি এড়াতে ছেলেদের থেকে দূরত্ব রাখতাম। একদম ফাইনালের আগে আশিফ আমাকে নোটস দিল, সাথে বলল তার নাকি আমাকে পছন্দ। আমিও হেসে উড়িয়ে দিলাম। বলেছিলাম, 'বিয়ে করতে করতে তো আমি বুড়ি হয়ে যাব, বুড়িকে কি পালতে পারবে?'
--"পরে?"
--"পরে হেসে খুবই চিন্তাহীন মুখে বলল, 'তুমি কখনো বড় হবে না ইফরা, বুড়ি হতে যাবে কেন?' বিশ্বাস করো আপা, ওটুকু কথাতে আমি অন্যরকম অনুভূতি পেয়েছিলাম। যেই আমি কোনো ছেলেকে সেভাবে নজর-আন্দাজ করতাম না সেই আমি পরীক্ষার সময় ওকে কয়েকবার করে দেখতাম, আফসোস করতাম কেন ফাইনাল ইয়ারেই ওকে আমি ভালো ভাবে দেখলাম? আগে কেন নোটসের বাহানায় একবারও চেয়ে দেখিনি?
এরপর আমরা দুজনই নিজেদের ক্যারিয়ারে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। দুজন দুই আলাদা পথে থাকলেও একজন অপরজনের আপস এন্ড ডাউন ঠিকই দেখতাম। আমি যখন প্রথম ড্রামা করে হিট খেলাম, তখন ও আমাকে ইনবক্সে অভিনন্দন জানিয়েছিল। একই ভাবে ওর শো যখন হিট করেছিল আমিও ওকে অভিনন্দন জানিয়েছি। মাঝেমধ্যে খুব হালকা-পাতলা কথা হতো, তখনও টের পেতাম ছেলেটা এখনো আমার অপেক্ষায়।"
--"প্রেম তাহলে কতদিনের?"
--"আট মাস। আমার তো ইচ্ছা ছিল এক বছরের মাথাতেই বিয়ে করব, এ নিয়ে তো চুপিচুপি আয়োজনও করছিলাম। তোমাদের সারপ্রাইজ দিব বলে কাউকে কিচ্ছু বলিনি।"
--"তা তো দেখাই যাচ্ছে। কত বড় গভীর জলের মাছ রে তুই ইফরা! সবাইকে ঘোল তো খাওয়ালি সাথে পরিবারকেও ছাড় দিলি না!"
ইফরা হো হো করব হাসতে হাসতে বলল,
--"লাইফ এতটাই প্রাইভেট ছিল যে নিজের সাথেও প্রাইভেসি মেইনটেইন করলাম!"
ইফরাকে "মিমস"-এর বিখ্যাত লাইনটা বলতে শুনে ইসমাত হাসল জোরে। ইফরাও তাল দিল। কখন যে দুই বোনের কথোপকথনে পেছন থেকে সাহিদ দাঁড়িয়েছে, কেউ টেরই পেল না।
--"আশিফ বেঁচে গেছে আমি দেশে নেই, নয়তো ওর ইন্টারভিউ আমি নিয়েই ছাড়তাম।"
--"ভালো হয়েছে তুমি নেই। এত ইন্টারভিউর সময় নেই, বিয়ে করেছি শ্যাষ! তুমি তোমার সাহিদ জুনিয়রকে নিয়েই থাকো। খবরদার সিনেমার ভিলেইন হতে আসবে না।"
--"তুই নামক বড়ো ভিলেইন থাকতে আশিফের অন্য কোনো ভিলেইনের দরকার নেই। কিছুদিন যাক, তোর জ্বালায় ও নিজেই কাঁদতে কাঁদতে আমার কাছে আসবে।"
ইফরা খুব ভাব নিয়ে বলল,
--"স্বপ্নই দেখে যাও। আমাএ আশিফ আমাকে চোখে হারায়।"
এবার সাহিদ এগিয়ে এলো। সাহিদকে দেখে ইফরা কিছুটা ভড়কে গেল বোধ হয়। আমতা আমতা করে হাসল, সালাম দিল। সাহিদ ভ্রু কুঁচকে বলল,
--"আমিও তোমার বোনকে চোখে হারাই, সিস্টার-ইন-লো! তাকে এসব শুনিয়ে লাভ নেই।"
ইফরা, ইসমাত দুজনেই হতভম্ভ। ইসমাত তো বিষম খেল, কিন্তু ইফরার চোখ কপালে। এই কথা কে বলছে? সাহিদ? যে দুইদিন আগেও ইসমাতকে সহ্য করতে পারত না? রোজ ইসমাতের মুখে তাদের ঝগড়ার কথা শুনত?
ইফরা থেমে নেই, সে নির্লজ্জ স্বরে জিজ্ঞেস করল,
--"সেটা কবে থেকে?"
সাহিদ ভাবনায় পড়ে গেল। তারিখ তো মনে নেই। ইদানীং তো তার ইসমাতকে একটু বেশি বেশিই ভালো লাগে। কতজনের সাথে জেলাসির জন্য লাগালাগিও করল। যা তার ব্যক্তিত্বের সাথে যায় না। তবুও এসব করছে সে। মাথা চুলকে বলল,
--"ডেট তো জানি না। জানাটা দরকার?"
ইফরা এবার হাসল,
--"প্রুভ দিন, এত সহজে বিশ্বাস করছি না।"
প্রুভ? ব্যাপারই না! কিন্তু তৎক্ষণাৎ ইসমাত কল কেটে দিল। দাদীর ব্যাপারে পরে শুনবে। এখন কান দিয়ে ধোঁয়া বেরুচ্ছে। সাহিদ ভ্রু কুঁচকে বলল,
--"কল হার এগেইন! আই নিড টু প্রুভ হার!"
ইসমাত দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
--"হয়েছে, অনেক করেছ। আমার বোন একটা নির্লজ্জ আর এ আরেক নির্লজ্জ, জুটেছে একসাথে কপালে।"
সাহিদ ঝুঁকে এলো ইসমাতের দিকে। ইসমাতের পিঠ ঠেকল চেয়ারে, কিছুটা অপ্রস্তুত সে। সাহিদ ভারী গলায় বলল,
--"আপনার জন্য হলাম নাহয় একটু.. শেইমলেস।"
ইসমাতের হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল, মাথা আরও কিছুটা দূরে এলিয়ে আনল। এটা দেখে সে বাঁকা হাসল।
--"ভয় পাচ্ছেন কেন?"
--"কি-কি-কিসের ভয়?"
--"এইযে, ভয় পাচ্ছেন। দ্য ফেয়ার ইন ইওর আইস.. সো এডোরেবল। ইচ্ছে করে আরও ভয় দেখাই। চলবে না?"
--"শাট আপ সাহিদ। দূরে সরো।"
সাহিদ দূরে সরার বদলে আরও কিছুটা ঝুঁকে এলো। কানটা এগিয়ে বলল,
--"কি বললেন, শুনিনি।"
ইসমাত সাহিদের কানের লতিতে নখ দিয়ে খামচি দিল। সাহিদ সরে এলো কানে হাতে দিয়ে।
--"আপনাদের মেয়েরা এই খামচি ছাড়া আর কিছু পারেন না?"
--"কেন? আগে কোন মেয়ের খামচি খেয়েছ?"
সাহিদ তাকাল ইসমাতের দিকে। ইসমাতের চোখ-মুখ অন্য রকম দেখাচ্ছে। সব বয়সী মেয়েরাই বুঝি এভাবেই অন্য মেয়েদের কথা শুনে ঈর্ষাম্বিত হয়? এই রূপ তার এত ভালো লাগছে কেন? আবারও কাছে এগিয়ে আসল,
--"জেলাস হচ্ছেন?"
--"না।"
--"লাই!"
সাহিদ আর ইসমাতকে জ্বালাতে পারল না। মেইড এসে লাঞ্চের ব্যাপারে ডাকতেই ইসমাত বাহানা করে চলে গেল। যাওয়ার সময়ে সাহিদ স্পষ্ট ইসমাতের মুখে লাজ দেখল। এতে তার অদ্ভুত অনুভূতি হলো। ইসমাত লজ্জা পাচ্ছে, রিয়েলি?
লাঞ্চের পর সাহিদ অসময়ে ঘুমিয়েছে। ইসমাত এই ফাঁকে গিয়েছিল বাড়িওয়ালীর মেয়ের ক্যাফেতে। ওখানেই জানতে পারে ওদের সামনের রবিবারে পার্টি আছে। এই পার্টিতে ওরা ওদের সাংস্কৃতিক কোনো ব্যাপার উদযাপন করবে বোধ হয়। উদযাপনের নামে শুধু কাছের মানুষদের মাঝে নতুন করে দেখা-সাক্ষাৎ.. এটাই মূল ধান্দা। বৃদ্ধা তাদেরও দাওয়াত করেছেন। বলেছেন যেন দেশী সংস্কৃতির কিছু পরে আসতে। নিজস্ব দেশীয় পোশাকই সেদিনের ড্রেসকোড। এতে ইসমাত চিন্তায় পড়ে গেল। বাঙালির সবচেয়ে বড়ো সংস্কৃতি তো শাড়ি। সে শাড়ি পাবে কোথায়? সে খুব একটা শাড়ি পছন্দ করে না। কখনো ঘটা করে পরা হয়নি। অবশ্য আজ সোমবার, রবিবার আসতে বেশ দেরী।
এসব চিন্তার মাঝে সে বাইরে থেকেই খাবার আনিয়েছে, আজ ডিনারে কিছু রান্নার ইচ্ছা নেই। হাতে সে খাবারের প্যাকেট ডাইনিং এ রাখতেই দেখল রুমের আলো বন্ধ! কপালে ভাজ পড়ল তার, সাহিদ কি এখনো ঘুম থেকে উঠেনি? নয়টা বাজছে তো! এত লম্বা ঘুম তো সাহিদ দেয় না। ইসমাত ভেতরে গিয়ে পরখ করল, বাইরের আলোতেই দেখল বিছানা খালি। ইসমাত এগিয়ে গিয়ে দেখল বিছানার অন্যদিকে ভূতের মতো সাহিদ মেঝেতে বসা। তার পিঠ বিছানার সাথে লেপ্টে আছে। ইসমাত ভড়কে গেল। এগিয়ে যেতেই দেখল কতগুলো বিয়ারের ক্যান এদিক ওদিক ছিটানো। ইসমাতের মাথায় রাগ চাপল। এই ছেলে আবার এলকোহল কোথায় পেয়েছে? সে তো শাবাবকে সেদিনও নিষেধ করেছিল, এমনকি কতগুলা ঘর থেকে সরিয়েও দিয়েছিল।
ইসমাত দেখল চোখ-মুখ লাল। এক ধ্যানে সে মাটির দিকে চেয়ে আছে। চিন্তিত হলো সে, কিছুটা এগিয়ে গিয়ে খালি ক্যানগুলো তুলতে শুরু করল। সাহিদ তখনো স্থির, কোনো নড়চড় নেই। ইসমাত সেগুলো নিয়ে উঠে দাঁড়াতেই সাহিদ বাঁধা দিল। মিনমিন করে মাতাল কণ্ঠে বলল,
--"ডোণ্ট গো!"
কত নিরুপায় এবং অসহায় শোনাল সেই কণ্ঠস্বর। কথাও কেমন জড়িয়ে যাচ্ছে। ইসমাত নিচে চেয়ে শান্ত গলায় বলল,
--"যাচ্ছি না কোথাও।"
সাহিদ শুনল না, সেভাবেই ওর হাত শক্ত করে ধরে রইলো। যেন তাকে ছেড়ে দিলেই হারিয়ে যাবে। ইসমাত হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করলে এবার তার কোমর জড়িয়ে ধরল। ইসমাত অস্ফুট স্বরে বলল,
--"সাহিদ.."
--"ড..ডোণ্ট গো, প..প্লিজ!"
ইসমাত আর ছাড়াতে পারল না। কিছুক্ষণ সেভাবেই দাঁড়িয়ে ক্যানগুলো হাত থেকে ফেলে দিল। পরপর নিজেই বসে গেল সাহিদের পাশে। সাহিদের চোখ আবারও লাল হয়ে আসছে। সাহিদ করুণ চোখে তার চোখে তাকিয়ে। ভাঙা গলায় কটা শব্দ উচ্চারণ করল,
--"হোয়াই ডু আই অলয়েজ মেস আপ, ইসমাত?"
বলেই বাচ্চাদের মতো কাঁদতে শুরু করল। ইসমাত ভড়কে গেল। দু'হাতে সাহিদের গাল চেপে নুইয়ে পড়া মুখটা তোলার চেষ্টা করল,
--"এই, কাঁদছ কেন? টক টু মি! কি হয়েছে সাহিদ?"
সাহিদ নিমিষেই বাচ্চা হয়ে গেছে। তার আহ্লাদে আরও অস্থিরতা বেড়েছে। সাহিদ জড়ানো গলায় বলল,
--"আমি এখন আর সাব্বিরকে দেখতে পাই না ইসমাত। আমি কয়েকদিন ধরে ওকে সব জায়গায় খুঁজি, কিন্তু ও আসে না। আমি কত ডাকি। শেষবার এসেছিল অফিসে, যেদিন ফার্স্ট টাইম গেছিলাম। আজ স্বপ্ন দেখলাম, ও হারিয়ে যাচ্ছে ধুলোর সাথে। সাব্বিরকে ফিরিয়ে দিন, ইসমাত।"
এতক্ষণে ইসমাত ওর অস্থিরতার কারণ বুঝল। সঙ্গে এটাও নিশ্চিত হলো যে সাহিদ সত্যিই সাব্বিরকে হ্যালুসিনেশন করত— যা সে কাউকে বলতে চাইত না। মিথ্যেই হোক, তবুও সে ওই মিথ্যেকেই আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছিল। কিন্তু এভাবে চলত কতদিন? সাহিদকে যে আগাতেই হতো। সাহিদ আবারও বলল,
--"ও আমাকে সব ধরণের সলিউশন দিত ইসমাত, আমার দুঃখে মোটিভেট করত, আমার সুখে হাসত। আপনাকে নিজের মনে করার আকাঙ্খাটাও সাব্বিরই জাগিয়েছিল।"
ইসমাত ওকে নিজের সাথে জড়িয়ে নিল। সাহিদ ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে। এক বিন্দু ছাড় দিতে রাজি নয় সে। ইসমাত তার এলোমেলো চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
--"সাব্বির ছিল তোমার হ্যালুসিনেশন, সাহিদ। ওটা তোমার মস্তিষ্কেরই একটা অংশ। ও কখনো তোমায় সমাধান দেয়নি, তুমি সবসময় নিজের সমাধান নিজে করেছ। সাব্বির তো একটা বাহানা শুধু। সাব্বির আর ফিরবে না, এটা তোমাকে মেনে নিতে হবে সাহিদ। ও ওর স্থায়ী ঠিকানায় চলে গিয়েছে। কিন্তু আমরা সবাই বেঁচে আছি। তোমার নিজের জন্য, আমাদের জন্য মন খুলে বাঁচতে হবে। অন..অন্তত আমার জ..জন্যে।"
শেষের কথাগুলো বলতে গিয়ে সে কিছুটা তোতলে গেল। সাহিদ বরফ বনে তার বুকে লেপ্টে। কিছু সময় গড়াতেই সাহিদ তাকে আরও শক্ত করে চেপে ধরল। মিনমিন করে জড়ানো গলায় আওড়াল,
--"সাব্বিরের মতো আপনি আমাকে ছেড়ে যাবেন না প্লিজ, আমার নিভৃতে বেঁধে রাখবেন প্লিজ! প্লিজ ইসমাত। আই..আই..আই নিড ইউ। আমি আপনাকে ছাড়া কিছুই ভাবতে পারি না। মর্নিং লাইটে আপনার স্লিপিং ফেস, এংগ্রি ফেস, ব্লাশিং ফেস আই লাভ অল দ্য ফেসেস ইউ হেভ। আমাকে বকুন মারুন যা করুন, সাব্বিরের মতো হারাবেন না। একজনকে হারিয়ে আরেকজনকে হারানোর মতো শক্তি আমার নেই। খুব ব্যথা করে বুকের বা পাশটায়.."
ইসমাতের চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। এই প্রথম বুঝি সাহিদ তাকে এভাবে বলল, প্রকাশ করল তার অনুভূতিগুলো। সাহিদ মাতাল অবস্থাতেই অনুভব করতে পারছে সে কতটা নির্ভরশীল ইসমাতের উপর। তাকে ছাড়া ছেলেটা এক পাও এগোতে পারে না। এই ছেলেটাকে ইসমাত কি করে বোঝাবে, সে নিজেও এই ছেলেটাকে ছাড়া চলতে পারে না। ভাবতে পারে না, থাকতে পারে না। যেখানেই যায় এই ছেলেটার চিন্তা মাথায় চেপে ধরে। ইসমাত নিজের অজান্তেই সাহিদের কপালে একটা চুমু দিব, খুবই গভীর সেই চুমু। যার অর্থ, ইসমাত এই পাগলটাকে ফেলে কোথাও যাবে না।
—————
রবিবার আসতে বেশি দেরী নেই। আর মাত্র দুদিন, সাহিদ এখনো পার্টির খবর জানে না। ইসমাতই বলতে পারে না, ভুলে যায়। এখন তো দুইদিন ধরে সাহিদের সাথে বেশ রাগারাগি চলছে তার। সাহিদ তার দাদীকে রিনা খান বলে ডেকেছে সেদিন। যখন ইসমাত বলেছিল মমতাজ বেগম অসুস্থ ছিলেন ইফরার জন্য তখন সে আপেল কামড়াতে কামড়াতে বলেছিল,
--"ভাগ্যিস ম রেনি!"
ওতেই ইসমাত চোখ পাকায়। সাহিদ অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
--"আরে, এই ধরণের মানুষের কোনো গ্যারান্টি আছে বলুন? আজকাল কেউ অসুস্থ শুনলেই তো মনে হয় এই বুঝি ম রে গেল!"
--"সাহিদ!"
--"ভুল কি বলেছি? নাতজামাইয়ের আদরের নামে পটপট করতে করতে প্রতিবার আমার কান খেয়ে ফেলত। সাথে তেল-মশলার খাবার তো ছিলই। মায়েরা বলে সিনেমায় রিনা খান নামে কে নাকি মেইন লীডদের সাথে ঝামেলা করত। আর আপনার দাদী ভিলেইন না হয়েও আমাকে গরুর মতো খাওয়াত। যেন কত বছরের রাগ পুষে রেখেছেন আমার ওপর।"
ব্যাস! ওতেই ইসমাত তর্ক লাগিয়ে দিল। এরপর থেকে কথা বলাই বন্ধ করে দিল। এতে আবারও সাহিদ বেশ ডিস্টার্ব ফিল করছে। এই মেয়েটা তার দূর্বলতা ধরে ফেলেছে। এজন্যই তো রাগারাগি হলেই কেমন বিনা নোটিশে কথা বলা বন্ধ করে দেয়! অসহ্য লাগে! ধ্যাত, উচিতই হয়নি বুঝতে দেওয়া। রাগে সে এই শীতে দিয়েও কোল্ড শাওয়ার নিচ্ছে। সেদিন যেই মেয়ে তার কপালে চুমু খেয়েছে এখন সেই মেয়ে তাকে পিঠ দেখিয়ে বেড়াচ্ছে। কত বড় সাহস!
ইসমাত তখনই অফিস থেকে বাড়ি ফিরেছে। সাহিদের আজকে যাওয়ার কথা থাকলেও ইসমাতের সাথে রেগেই যায়নি। সাহিদ যখন আকাশ পাতাল ভাবছিল তখন ইসমাত বাথরুমে ঢুকে পড়ে। গ্লাসে দেখতে পায় সাহিদের পেশিবহুল শরীর। সে আবারও জিম শুরু করেছে ফ্রান্সে এসেই। ইসমাত তাকে দেখেই দ্রুত ফিরে দাঁড়াল। চেঁচাল,
--"ইডিয়েট.. দরজা লক করোনি কেন?"
সাহিদ শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়েই ইসমাতের দিকে তাকাল।
--"ডোন্ট প্লে কয়! আমি জাস্ট শার্টলেস। আগেও বহুবার দেখেছেন আমায়!"
--"দরজা লাগানোটা ম্যানার্স!"
--"ম্যানার্স? কিন্তু আমি তো অভদ্র হাসবেন্ড, ইসমাত। এদিকে আসেন.. বউয়ের কাছে কিসের লজ্জা? এন্ড প্লিজ, তোয়ালটা দিয়ে যাবেন!"
--"ছি! নিজেরটা নিজে নিতে পারো না?"
--"পারব কীভাবে? আপনিই তো গাল ফুলিয়ে রেখেছেন। আর কিছুই মাথায় আসছে না।"
ইসমাত রাগ করে বেরিয়ে গেল। সাহিদ হতাশ হলো না। ইসমাতকে সে তো একটা শিক্ষা দেবেই। সাহিদের অনুভূতি বদলেছে ঠিকই, কিন্তু ত্যাড়ামি আগের মতোই আছে। তাকে দিয়ে সহজ-সরল ভালোবাসা হয় নাকি? তার নিজস্ব একটা স্টাইল আছে না?
গোসল সেরেই সাহিদ গেল তার আলমারির দিকে। খুঁজে খুঁজে কিছু একটা বের করল। এটা সেই জামদানি শাড়িটা, যেটা সাব্বিরের সাথে কিনেছিল। ইসমাত তখন রান্নাঘর থেকে ফিরেছে। মেইডদের কিছু কাজ বুঝিয়ে দিল। ডিনারে দেরী হয়ে গেছে আজ। দ্রুত রাঁধতে হবে।
কিন্তু দেখা গেল সাহিদ ওদের রান্নার আগেই ছুটি দিয়ে দিয়েছে। ইসমাত ভ্রু কুঁচকে বলল,
--"কী হচ্ছে কি? ডিনার করবে না? খুদাও কি মাথার সাথে গেছে নাকি?"
--"রাগ করছেন কেন? ডিনার অর্ডার করেছি।"
--"মতলব আছে কোনো?"
সাহিদ বাঁকা হেসে ইসমাতকে প্যাকেটটা ধরিয়ে দিল।
--"এটা কি?"
--"খুলেই দেখুন!"
ইসমাত প্যাকেট খুলতেই চমকে গেল। একটা খুবই দামী লাল রঙের জামদানি। বিস্মিত স্বরে বলল,
--"কবে কিনেছ?"
--"সাব্বির থাকতে.."
ইসমাত আপনমনে হাত বুলালো শাড়িটায়। বারবার তার বিয়ের দিনের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। এই শাড়ি পরলে নির্ঘাত তাকে সদ্য বিয়ে হওয়া নতুন বউ লাগবে? ইসমাত কিছু একটা ভেবে শাড়িটা রেখে দিল। সে এখনো শাড়ি পরা নিয়ে দোটানায় আছে। মৃদু স্বরে শুধু ধন্যবাদ বলল। সাহিদ এতে ভ্রু কুঁচকে ফেলল,
--"রেখে দিচ্ছেন কেন?"
--"তো কি করব?"
--"অফ কর্স পরবেন! এখনই!"
--"আর ইউ কিডিং মি?"
--"তো আপনি কি ভেবেছেন, আমি আপনাকে শাড়ি দিয়েছি রাগ ভাঙানোর জন্য? নাহ, আপনাকে শাড়িতে দেখার জন্য। এন্ড ইউ উইল ডু ইট, নাও!"
ইসমাত হতভম্ভ! এই ছেলে রাগ ভাঙানোর বদলে আদেশ দিচ্ছে? সে রাগ করে থাকবে কি, উলটো চিন্তায় পড়ে গেল এমন আজব ছেলে কেন তার স্বামী?
--"আমি পরব না, ব্যাস!"
--"আমি তাহলে ইউটিউব থেকে টিউটোরিয়াল দেখে পরিয়ে দিব!"
ইসমাত ভড়কে যায় সাহিদের ঘাড়ত্যাড়ামি দেখে। এই ছেলে কি পাগল? এমন উদগ্রীব হয়েছে কেন? সাহিদ যখন ধৈর্যহারা হয়ে ইসমাতের দিকে এগিয়ে আসছিল তখনই ইসমাতের ফোনটা বেজে উঠল। সাহিদ এতে চরম বিরক্ত হলো, ইসমাত ইতিমধ্যেই কলের অযুহাতে পালিয়েছে। সাহিদ চোখ-মুখে অবাধ বিরক্তি। অস্ফুট স্বরেই চেঁচাল, "ফা*।"
ইসমাত মোবাইল হাতে নিতেই দেখল ইফরার কল। অসময়ে কল দিয়েছে দেখে চিন্তিত হলো। কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ইফরার হাস্যোজ্জ্বল মুখটা ভেসে উঠল। ইফরা খুবই উচ্ছ্বাসের সাথে বলছে,
--"আপুউউ! একটা গুড নিউজ আছেএ। আমরা আগামী মাসের শুরুতেই ফ্রান্স আসছি, হানিমুনে! তোমাদের সাথে থাকব, তোমাদের সাথেই ঘুরব। আমার যে কি আনন্দ হচ্ছে না! আশিফ খুব সুন্দর একটা সারপ্রাইজ দিয়েছে আমাকে। আই লাভ হিইইম।"
ইসমাতও খুশি হলো এই সুসংবাদে। কতদিন পর বোনকে দেখতে পারবে। কিন্তু খুশি দেখা গেল না সাহিদকে। সে অসন্তুষ্ট হয়ে একপাশে সোফায় চুপ করে বসা। একে তো ইসমাত তার থেকে লুকোচুরি খেলেছে এখন নতুন খবর। তাদের প্রেম শুরু হতে না হতেই শালী আসবে ফ্রান্সে? তাও তাদের সাথে থাকবে? প্রশ্নই ওঠে না। কই ভেবেছে ইসমাত তার সাথে সহজ হচ্ছে, সাংসারিক জীবনে বন্ডিং বাড়াবে, প্রেম করবে, ক্লোজ হবে.. তা না! আসছে বিরিয়ানির এলাচি! ইফরা আসলে বুঝি সাহিদ এখানে থাকবে? সাহিদ কপালে হাত চেপে ওভাবেই তাকিয়ে রইলো ইসমাতের হাতের ফোনের দিকে। ইসমাত ভুল করেও তাকাচ্ছে না। সাহিদ আরেক পলক তাকাল ইসমাতের দিকে, পরপর তাকাল ওর ঠোঁটের দিকে।
নাহ! শালিকে যে এত সহজে জিততে দেওয়া যায় না। এর হেস্তনেস্ত না করলে সেও 'সাহিদ মুস্তাহাব' না! চিনে তাকে?
·
·
·
চলবে……………………………………………………