বাঁধনের ঠিক মুখোমুখি বসে আছেন অভ্রের কোম্পানির এক মধ্যবয়স্ক ও বিশ্বস্ত কর্মকর্তা। তাঁর ঠোঁটের কোণে হাসি— যেন বহু প্রতীক্ষিত কোনো পরিকল্পনার পরিণতি তিনি আগেই নিশ্চিত করে ফেলেছেন।
অন্যদিকে, তাঁর বিপরীতে বসে থাকা বাঁধনের মুখে ক্রোধ, অপমান ও অবিশ্বাস একসঙ্গে ফুটে উঠেছে। রাগে তাঁর মুখমণ্ডল রক্তিম, চোখদুটি জ্বলছে তীব্র অগ্নিশিখার মতো। মনে হচ্ছে, যেকোনো মুহূর্তে সে নিজের সংযম হারিয়ে ফেলবেন।
চারপাশের সবাই তখন স্তব্ধ। বিস্ময়ে কারও চোখ কপালে উঠেছে, কারও মুখ হাঁ হয়ে গেছে। যেন কেউই নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না।
এ... এটা কীভাবে সম্ভব?
যেখানে অভ্র আর রাহার থাকার কথা ছিল, সেখানে বসে আছে বাঁধন আর অভ্রের কোম্পানির সেই মধ্যবয়স্ক কর্মকর্তা!
পুরো পরিবেশ মুহূর্তেই গভীর রহস্য আর চরম বিস্ময়ে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল।
ঠিক তখনই হাঁপাতে হাঁপাতে সেখানে এসে পৌঁছাল মাহাদী। সামনে দৃশ্যটি দেখেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। চোখেমুখে ফুটে উঠল তীব্র ক্ষোভ।
মনে মনে বিড়বিড় করছে,
— "রাহা! তুমি আজ যা করেছ, তার পরিণতি গুরুতর হবে। এই কাজটি তুমি একেবারেই ঠিক করোনি!"
— "আর তুই, অভ্র... অনেক নাটক হয়েছে! এবার সবার সামনে তোর আসল মুখোশ খুলে ফেলব। তোর প্রতিটি সত্য আজই সবার সামনে উন্মোচিত হবে!”
—————
ফ্ল্যাশব্যাক…
বিধ্বস্ত, ভগ্নদশায় পড়ে থাকা রাহাকে সেই অবস্থায় ফেলে মাহাদী আর বাঁধন যখন সেখান থেকে চলে গেল, অভ্র তখন তাদের প্রস্থানপথের দিকেই একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল।
পরমুহূর্তেই তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক শীতল, কুটিল, দুর্বোধ্য হাসি। যেন বহু আগেই আঁকা দাবার প্রথম চালটি নিখুঁতভাবে সফল হয়েছে।
কয়েক মুহূর্ত পর, হাতে দুটি বরফশীতল কোল্ড ড্রিংকস নিয়ে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে রাহার সামনে এসে দাঁড়াল সে।
অভ্রকে দেখেই রাহা ধীরে ভ্রু উঁচু করল। ক্লান্ত মুখেও ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক অর্থবহ বাঁকা হাসি। তারপর অভ্রের চোখে চোখ রেখে মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল—
— "কেমন ছিল... পুরো অভিনয়টা?”
অভ্র ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি টেনে কোল্ড ড্রিংকসটা রাহার দিকে বাড়িয়ে দিল।
— "একদম পারফেক্ট, ডার্লিং... পুরো প্ল্যানটাই নিখুঁতভাবে কাজ করেছে। নে, এটা খা। এতক্ষণ যে মরা কান্না করলি, গলা তো নিশ্চয়ই শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।"
কথা বলতে বলতেই তার দৃষ্টি গিয়ে আটকে গেল রাহার হাতে। লালচে দাগটা চোখে পড়তেই মুহূর্তের মধ্যে মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, চোখে নেমে এল তীব্র কঠোরতা।
সে এক ঝটকায় রাহার হাতটা নিজের হাতে তুলে নিয়ে কপাল কুঁচকে বলল—
— "হাতটা দেখি... এটা কে করতে বলেছে তোকে?"
দাগটার ওপর আঙুল বুলিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে বলল—
— "একদম থাপ্পড় মেরে মুখ ভেঙে দেব! আমার জিনিসের ক্ষতি করার অধিকার তোকে কে দিয়েছে?"
কথাটা বলেই এক টানে মেঝে থেকে রাহাকে তুলে বিছানায় বসিয়ে দিল সে।
কথা শেষ হতেই আর এক মুহূর্তও দেরি করল না অভ্র। দ্রুত অবন্তিকা ও সাফাকে ডেকে রাহাকে প্রস্তুত করার দায়িত্ব দিয়ে দিল । নিজেও ক্ষিপ্র হাতে পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে নিল।
সময় নষ্ট না করে জারিফকে কল করল। কল রিসিভ হতেই দৃঢ় কণ্ঠে বলে উঠল—
— "জারিফ, তাকে নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব চলে আয়। আমাদের হাতে একদম সময় নেই।"
আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই কলটি কেটে দিল অভ্র।
এবার রাহা অভ্রের দেয়া ফোনটি হাতে তুলে নিল। গভীর শ্বাস নিয়ে মাহাদীর নম্বর ডায়াল করল ।
অচেনা নম্বরটি স্ক্রিনে ভেসে উঠতেই এক সেকেন্ডও দেরি করল না মাহাদী। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কলটি রিসিভ করল , যেন এই একটি ফোনকলের অপেক্ষাতেই এতক্ষণ অধীর আগ্রহে প্রহর গুনছিল।
কলটি রিসিভ হলেও প্রথম কয়েক সেকেন্ড রাহা সম্পূর্ণ নীরব রইল। ওপাশে শুধু দু’জনের নিঃশ্বাসের শব্দ ভেসে আসছিল।
নীরবতা ভেঙে মাহাদী কোমল, অথচ ব্যাকুল কণ্ঠে ডেকে উঠল—
— “বলো... শুভ্র পরী।”
কথাগুলো বলার সময় তার শ্বাসপ্রশ্বাস ছিল দ্রুত ও ভারী। উত্তেজনা আর উৎকণ্ঠায় তার বুক যেন অবিরাম ওঠানামা করছিল। কারণ, সে নিশ্চিত ছিল—এই ফোনটা আসবেই। সত্য জানার পর রাহা কোনোভাবেই অভ্রকে বিয়ে করতে রাজি হবে না—এই বিশ্বাসেই সে এতক্ষণ অপেক্ষা করছিল।
কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকার পর অবশেষে রাহা শান্ত, কণ্ঠে বলে উঠল—
— “আমি এক্ষুনি আপনার সঙ্গে দেখা করব। ঠিক দশ মিনিটের মধ্যে।”
একটু থেমে আরও কঠোর স্বরে যোগ করল—
— “দশ মিনিটের মধ্যে না এলে... এরপর আর কোনোদিন আমাকে খুঁজেও পাবেন না।”
কথাটা বলেই রাহা কল কেটে দিল।
কথাগুলো বললেও রাহার মনের ভেতর চলছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পরিকল্পনা। মাহাদীকে বিয়ের আসর থেকে দূরে সরিয়ে নিতেই সে ইচ্ছাকৃতভাবে এই ফাঁদ পেতেছিল।
পরমুহূর্তেই সে অভ্র, অবন্তিকা আর সাফার দিকে তাকাতেই চারজনের চোখাচোখি হলো। এক নিমিষেই চাপা উত্তেজনা ভেঙে সবাই হো হো করে হেসে উঠল। এতক্ষণের নিখুঁত অভিনয় আর পরিকল্পনার সফল প্রথম ধাপ যেন তাদের হাসিতেই স্পষ্ট হয়ে উঠল।
হাসতে হাসতেই রাহা অভ্রের দিকে তাকিয়ে বলল—
— "তাহলে... আমি যাই?"
অভ্র কোনো উত্তর না দিয়ে আলতো টানে রাহার হাতটা নিজের মুঠোয় বন্দি করল। তারপর তাকে নিজের একদম কাছে টেনে এনে গভীর দৃষ্টিতে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল।
অবন্তিকা আর সাফা লজ্জায় মাথা নিচু করে আস্তে করে সেখান থেকে কেটে পরে।
অভ্র গম্ভীর অথচ স্নেহমিশ্রিত কণ্ঠে বলল—
— "খুব সাবধানে যাবি, জান। একটুও বেপরোয়া হবি না। আমি অলরেডি গাড়ির ব্যবস্থা করে রেখেছি। এখানে আমার কাজ শেষ হলেই তোকে এই ফোনে একটা নোটিফিকেশন পাঠাব। সেটা পেলেই আর এক মুহূর্ত দেরি করবি না। আর ওদিকের সব ব্যবস্থাও সম্পূর্ণ রেডি।"
কথা শেষ করে অভ্র স্নেহভরে রাহার কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। সেই ক্ষণিক স্পর্শে যেন তাকে নিঃশব্দে সাহস আর আশ্বাস দুটোই দিয়ে দিল।
রাহা মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
— "আচ্ছা।"
এরপর আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে সে নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল।
আর অভ্র ঘুরে দাঁড়াল। দাবার বোর্ডে বাকি চালগুলো নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করার পালা এবার ।
—————
রাহার ফোন কেটে যেতেই মাহাদীর মুখে বিজয়ের উচ্ছ্বাস স্পষ্ট হয়ে উঠল। এক মুহূর্তও দেরি না করে সে বাঁধনকে ফোন করল।
কলটি রিসিভ হতেই উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠল—
— "বাঁধন, এখনই কনের সাজে পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে যা। রাহা আর এই বিয়ে করছে না। আমার শুভ্র পরী... আমার কাছেই আসছে।"
কথাগুলো শুনে বাঁধনের আনন্দ যেন আর ধরে না। বহুদিনের লালিত স্বপ্ন বুঝি বাস্তবে রূপ নিতে চলেছে। উচ্ছ্বাসে তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। প্রায় নেচে নেচেই সে ছুটে গেল রাহার কক্ষে।
ঘরে ঢুকেই তার চোখে পড়ল—রাহার পরনের বিয়ের পোশাক, অলংকার এবং অন্যান্য আয়োজন।
ঠোঁটের কোণে আত্মতৃপ্তির হাসি ফুটিয়ে এক মুহূর্ত দেরি না করে সে সেই পোশাকগুলোই পরে নিল। তারপর মুখমণ্ডল প্রায় সম্পূর্ণ ঢেকে যায় এমনভাবে মাথার ওপর টেনে দিল বিশাল লাল ঘোমটা।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে বাঁধনের মনে হলো—আজ আর কেউ তাকে থামাতে পারবে না। সে-ই আজ কনের আসনে বসবে। অবশেষে অভ্র তার হবে।
—————
অন্যদিকে, পরিকল্পনামাফিক শহরের একটি নিরিবিলি রেস্তোরাঁয় মাহাদীর সঙ্গে দেখা করল রাহা।
দু'জন মুখোমুখি বসে আছে। বাইরে থেকে রাহাকে যতটা শান্ত দেখাচ্ছিল, ভেতরে ভেতরে সে ঠিক ততটাই অস্থির। মাহাদীর সামনে এক মুহূর্তও বসে থাকার ইচ্ছে তার ছিল না। কিন্তু নিজের পরিকল্পনা সফল করতে আপাতত ধৈর্য ধরা ছাড়া আর কোনো উপায়ও ছিল না।
মনে মনে সে একটাই কথা আওড়াচ্ছিল—
"আজ বাঁধনের খেলার ইতি টানবই সাথে তোর ও। এতদিন ধরে আমার অভ্র ভাইয়ের পেছনে লেগে থাকা আপদ গুলোকে আজ চিরতরে সরিয়ে দেব।"
কয়েক মুহূর্তের নীরবতা ভেঙে রাহা গম্ভীর দৃষ্টিতে মাহাদীর দিকে তাকিয়ে বলল—
— "পেনড্রাইভের ছবিগুলো আপনি কোথায় পেয়েছেন?"
মাহাদী ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি টেনে প্রশ্ন ছুড়ে দিল—
— "কেন? সেটা জানাটা কি এতই জরুরি?"
রাহার চোখেমুখ মুহূর্তেই কঠোর হয়ে উঠল।
— "জরুরি? অবশ্যই জরুরি। যে মানুষটা আমার বাবার খুনি,তাকে এতদিন না জানিয়ে লুকিয়ে রেখেছে সত্যিটা, তার পেছনে কে আছে, সেটা জানার অধিকার আমার আছে। মেয়ে হয়ে সত্যটা জানতে চাওয়া কি আমার অপরাধ?"
রাহার দৃঢ় কণ্ঠে মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল মাহাদী। তারপর মৃদু হেসে শান্ত স্বরে বলল—
— "না, রাহা... অপরাধ নয়। অবশ্যই বলব। তোমাকে না বললে আর কাকে বলব?”
মাহাদী শান্ত স্বরে বলতে শুরু করল—
— "কয়েক দিন আগে বাবার কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি খুঁজতে গিয়েই হঠাৎ ছবিগুলো আমার হাতে আসে। বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে হওয়ায় আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। কিন্তু তিনি এক মুহূর্তও দেরি না করে নথি সহ ছবিগুলো আমার হাত থেকে নিয়ে আবার আগের জায়গায় রেখে দেন।"
একটু থেমে সে গভীর দৃষ্টিতে রাহার দিকে তাকিয়ে বলল—
— "তবে ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। ছবির সেই দু’জন মানুষকে আমি ঠিকই চিনে ফেলেছিলাম।"
মাহাদীর মুখে একের পর এক সাজানো মিথ্যা গল্প শুনে টেবিলের নিচে রাহার দুই হাত শক্ত মুষ্টিতে পরিণত হলো। রাগে তার আঙুলের গাঁটগুলো সাদা হয়ে গেল। বুকের ভেতর ক্রোধের আগুন দাউদাউ করে জ্বলে উঠল।
মুহূর্তের মধ্যেই তার চোখ দুটো রক্তিম হয়ে উঠল। তবে সেই তীব্র রাগকে প্রাণপণে সংযত রেখে সে মুখে কৃত্রিম স্থিরতা টেনে আনল।
রাহার বদলে যাওয়া চেহারা লক্ষ্য করেই মাহাদী কপাল কুঁচকে উদ্বিগ্ন স্বরে জিজ্ঞেস করল—
— "কী হলো, রাহা?তোমাকে হঠাৎ এমন লাগছে কেন?”
রাহা মুহূর্তের মধ্যেই নিজেকে সংযত করল। চোখেমুখে জমে থাকা অস্থিরতার ছাপ আড়াল করতে সামনে রাখা পানির গ্লাসটি তুলে এক নিঃশ্বাসে পুরোটা পান করে ফেলল।
পরক্ষণেই ঠাস্ শব্দে গ্লাসটি টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখল। তার ভেতরের উত্তেজনা যদি সামান্যও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেত, তবে হয়তো সেই গ্লাসটিই সজোরে মাহাদীর মাথায় ছুড়ে মারত।
গভীর এক শ্বাস নিয়ে সে নিচু স্বরে বলতে শুরু করল—
— "আমার পক্ষে... অভ্র ভাইকে বিয়ে করা সম্ভব নয়। যে মানুষটিকে আমি এতদিন শ্রদ্ধা করেছি, তিনিই আমার বাবার খুনি ... তাহলে তার নামের সঙ্গে নিজের নাম জড়ানোর প্রশ্নই ওঠে না।"
কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে রাহা মাহাদীর চোখে চোখ রেখে দৃঢ় কণ্ঠে বলল—
— "আমি চাই... আজ, এই মুহূর্তেই আপনি আমাকে বিয়ে করুন। আর সবার সামনে অভ্র ভাইয়ের সেই তথাকথিত ভালো মানুষের মুখোশটা খুলে দিন। সবাই জানুক, তার আসল চেহারা আসলে কী।"
কথাগুলো বললেও রাহার চোখের গভীরে লুকিয়ে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক উদ্দেশ্য। প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি অভিব্যক্তি ছিল তার সুচিন্তিত অভিনয়েরই অংশ।
রাহার কথাগুলো শুনে মাহাদীর মনে হলো—মেঘ না চাইতেও বৃষ্টি।অপ্রত্যাশিতভাবে তার দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা যেন বাস্তবের রূপ নিয়েছে। যে স্বপ্নের পেছনে সে এতদিন ছুটে বেড়িয়েছে, সেটিই যেন আজ নিজে থেকেই তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। আনন্দে তার চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
এক মুহূর্তও বিলম্ব না করে সে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল—
— "অবশ্যই, রাহা। তুমি যা চাইবে, তাই হবে।"
রাহা শান্ত স্বরে বলল—
— "তাহলে চলুন... কাজী অফিসে যাই।"
— "চলো।"
এরপর আর সময় নষ্ট না করে তারা কাজী অফিসের উদ্দেশে রওনা দিল।
অল্প সময়ের মধ্যেই বিয়ের সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়ে গেল। কনের মুখ তখনও লাল উড়নার ঘোমটায় সম্পূর্ণ আবৃত ছিল।
বিয়ে শেষ হতেই আবেগে আপ্লুত মাহাদী আলতো করে ঘোমটার ওপর দিয়ে কনের কপালে একটি ক্ষণস্থায়ী চুম্বন এঁকে দিল।
হঠাৎ সেই স্পর্শে কনের পুরো শরীর কেঁপে উঠল। যেন অপ্রত্যাশিত সেই স্পর্শে সে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল।
মাহাদী মৃদু হেসে কনের মুখ দেখার জন্য ধীরে ধীরে ঘোমটা সরিয়ে দিল।
আর ঠিক পরের মুহূর্তেই...
তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
চোখ দুটো বিস্ফারিত হয়ে উঠল। বুকের ভেতর যেন বজ্রাঘাত হলো।
— "আ... আয়াত!"
এক ঝটকায় কয়েক কদম পিছিয়ে গেল মাহাদী। মুখজুড়ে অবিশ্বাস, আতঙ্ক আর হতবাক বিস্ময়।
— "এ... এটা কীভাবে সম্ভব? না... না! এটা হতে পারে না!"
সে প্রায় উন্মাদের মতো চারদিকে তাকাতে লাগল।
— "এখানে তো রাহা ছিল! ও তো শুধু ওয়াশরুমে যাওয়ার কথা বলে বাইরে গিয়েছিল... তাহলে... তাহলে তুই এখানে এলি কীভাবে মেয়ে?"
তার কণ্ঠে তখন স্পষ্ট আতঙ্ক আর ভেঙে পড়ার সুর। মুহূর্তের মধ্যেই সে বুঝতে শুরু করল—সে ভয়ংকর কোনো ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছে।
মাহাদী দু’হাতে নিজের চুল শক্ত করে মুঠোয় চেপে ধরল। ক্রোধ, হতাশা আর অবিশ্বাসে তার পুরো শরীর কাঁপছিল।
হঠাৎ উন্মত্তের মতো সামনে রাখা কাঁচের টি-টেবিলটিতে সজোরে লাথি মারল।
ঝনঝন!
বিকট শব্দে কাঁচের টেবিলটি চুরমার হয়ে চারদিকে ছিটকে পড়ল। মুহূর্তেই চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
পরক্ষণেই ঝড়ের বেগে আয়াতের সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে। কোনো সুযোগ না দিয়েই দুই বাহু শক্ত করে চেপে ধরল।
রাগে কাঁপতে কাঁপতে গর্জে উঠল—
— “তুই এখানে কেন? বল! আমার রাহা কোথায়? কোথায় ও? বল... চুপ করে থাকবি না!”
তার কণ্ঠে ছিল উন্মত্ততা আর মরিয়া অনুসন্ধানের আকুতি।
আয়াত আচমকা এমন আচরণে সামান্য ভয় পেলেও নিজের সাহস হারাল না। ব্যথায় মুখ বিকৃত হলেও দৃঢ় চোখে মাহাদীর দিকে তাকিয়ে শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল—
— “নিজের সদ্য বিবাহিত স্ত্রীর সামনে দাঁড়িয়ে আরেকটা মেয়ের খোঁজ করতেও আপনার একটুও লজ্জা করে না?”
কথাটা যেন বজ্রাঘাতের মতো আঘাত করল মাহাদীর বুকে।
সে সঙ্গে সঙ্গে আয়াতকে ছেড়ে দিয়ে কয়েক কদম পিছিয়ে গেল। তারপর মাথা নেড়ে উন্মাদের মতো চিৎকার করে উঠল—
— “কিসের বিয়ে? কিসের স্ত্রী? আমি এই বিয়ে মানি না... কিছুতেই মানি না! এটা প্রতারণা... আমার সঙ্গে প্রতারণা হয়েছে!”
আয়াত ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের এক ক্ষীণ হাসি টেনে শান্ত কণ্ঠে বলল—
— "আপনার অস্বীকৃতিতে বাস্তবতা বদলে যাবে না, মাহাদী সাহেব। অনুগ্রহ করে কাবিননামাটি ভালো করে দেখে নিন।"
কথাটি বলে সে কাবিননামার ফটোকপিটি মাহাদীর হাতে তুলে দিল।
কাগজটির দিকে চোখ পড়তেই মাহাদীর শরীর যেন হিম হয়ে গেল।
স্পষ্ট অক্ষরে লেখা ছিল—
বর: আইজান শিকদাদ মাহাদী
কনে: আয়াত মির্জা
কয়েক মুহূর্ত আগের ঘটনাগুলো বজ্রাঘাতের মতো তার মস্তিষ্কে ফিরে এলো।
সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। ঠিক তখনই রাহা হঠাৎ বলে উঠেছিল—
— "আমি একটু ওয়াশরুম থেকে আসছি।"
মাহাদীও উঠে দাঁড়িয়ে বলেছিল—
— "চল, আমিও যাই।"
রাহা তাড়াহুড়ো করে মাথা নেড়ে বলেছিল—
— "না, না... আমি একাই যেতে পারব। আপনি বসুন।"
ঠিক তখনই কাজী সাহেব হেসে বলেছিলেন—
— "মা, ফিরে এসে বড় করে ঘোমটা টেনে নিও। তুমি তো নতুন কনে। বিয়ের আগে ঘোমটা থাকবে, আর বিয়ের পর তোমার বরই তা তুলবে।"
রাহা শান্তভাবে মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়েছিল।
ওয়াশরুমের দিকে যাওয়ার পরই শুরু হয়েছিল আসল নাটক।
তখনই আয়াত মাহাদীর অগোচরে বড় একটি ঘোমটা টেনে ফিরে এসে কিছুক্ষণ মাহাদীর পাশে বসেছিল।
ঘোমটার আড়ালে মাহাদী বুঝতেই পারেনি—সে যাকে রাহা ভেবে বিয়ে করছে, সে আসলে আয়াত।
এক মুহূর্তেই সবকিছু তার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল।
এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়...
পুরোটাই ছিল সুপরিকল্পিত একটি ফাঁদ।
রাহা, অভ্র... এমনকি কাজী সাহেবও আগেই এই পরিকল্পনার অংশ হয়ে গিয়েছিলেন।
উপলব্ধি হতেই মাহাদীর চোখ রক্তবর্ণ ধারণ করল। ক্রোধে কাঁপতে কাঁপতে সে কাবিন নামাটি দু'হাতে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে মেঝেতে ছুড়ে ফেলল।
তারপর উন্মাদের মতো গর্জে উঠল—
— "আমি এই বিয়ে মানি না! কিছুতেই না! এই বিয়ে আমি কখনোই স্বীকার করব না!”
আয়াত ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটিয়ে শান্ত গলায় বলল—
— “আমি এখন আপনার লিগ্যালি ওয়াইফ। মাইজান অভিনন্দন আপনাকে। নিজের পাতা ফাঁদেই প্রথম শিকারটা আপনি নিজেই।”
কিছুক্ষণ থেমে সে চোখে চোখ রেখে আরও নিচু স্বরে বলল—
— "আর একটা কথা... গত রাতের ঘটনাটাও কি এত সহজে ভুলে গেছেন?"
মাহাদীর ভ্রু কুঁচকে উঠল।
— "মানে?"
আয়াতের ঠোঁটের বাঁকা হাসি আরও স্পষ্ট হলো।
— "মানে খুবই সোজা।"
এ কথা বলে সে নিজের মোবাইলটা মাহাদীর সামনে বাড়িয়ে দিল।
স্ক্রিনে চোখ পড়তেই মাহাদীর বুক ধক করে উঠল।
ছবিতে দেখা যাচ্ছে—সে আর আয়াত খুব কাছাকাছি অবস্থায় পাশাপাশি রয়েছে। ছবিগুলো এমনভাবে তোলা, যেন যে কেউ দেখলেই ধরে নেবে দু’জনের মধ্যে গভীর ঘনিষ্ঠতা রয়েছে।
আয়াত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মাহাদীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল—
— "এখন বলুন তো... মাইজান, আর কিছু বলবেন?"
কানে শব্দটা যেতেই মাহাদীর মাথায় যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল।
হঠাৎ করেই গত রাতের অস্পষ্ট স্মৃতিগুলো একে একে ভেসে উঠতে লাগল।
শেষবার... করিডোরে দাঁড়িয়ে সে রাহার চলে যাওয়ার দিকেই তাকিয়ে ছিল।
ঠিক তখনই...
পেছন থেকে কেউ আচমকা তার ঘাড়ে সূঁচ ফুটিয়ে দিয়েছিল।তারপর সবকিছু ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল।চেতনা আর অবচেতনার মাঝামাঝি এক অদ্ভুত অন্ধকারে তলিয়ে গিয়েছিল সে।
পরদিন ভোরে যখন জ্ঞান ফিরেছিল, তখনও সে রাহাদের বাড়িতেই ছিল। মাথা অসহ্য রকম ভারী লাগছিল, পুরো শরীর অবশ হয়ে ছিল। ভোরের নীরবতায় বাড়ির কেউ তাকে লক্ষ্য করার আগেই কোনো রকমে সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছিল।
এতক্ষণে মাহাদীর কাছে সবকিছু সম্পূর্ণ স্পষ্ট হয়ে গেল। যে খেলায় সে অন্যদের হারাতে নেমেছিল, সেই খেলাতেই আজ সে নিজেই সবচেয়ে বড় চালের শিকার হয়েছে।
ক্রোধে তার মুখমণ্ডল বিকৃত হয়ে উঠল। চোখের পলকে আয়াতের হাত থেকে মোবাইলটি কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করতেই আয়াত দ্রুত ফোনটি সরিয়ে নিল।
ঠোঁটের কোণে তৃপ্তিমিশ্রিত বিদ্রূপের হাসি টেনে সে বলল—
— "এই ফোনটা ছুঁয়ে কোনো লাভ নেই, স্বামীজান। বরং চলুন, শ্বশুরবাড়ি যাই। শাশুড়ি মাকে বলবেন যেন নতুন বউকে বরণ করার সব আয়োজন করে রাখেন।"
কথাগুলো শুনে মাহাদীর চোখে আগুন জ্বলে উঠল। রাগে আয়াতের দিকে এক পা এগোতেই—
আয়াত নাটকীয় ভঙ্গিতে দুই হাত আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে উঁচু করে মুখ কুঁচকে বলল—
— "উফফ... আমি তো ভয়ে একেবারে কাঁপছি!"
তার ঠোঁটের কোণে তখনও স্পষ্ট বিদ্রূপের হাসি।
মাহাদী রাগে দাঁতে দাঁত চেপে কয়েক মুহূর্ত ওর দিকে তাকিয়ে রইল। মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তেই সবকিছু তছনছ করে ফেলবে। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে কোনোমতে সংযত করে পিছিয়ে এল।
আঙুল তুলে হুমকির সুরে বলল—
— "তোকে আমি দেখে নেব, আয়াত। এর ফল তোকে ভোগ করতেই হবে।"
আয়াত নির্বিকার ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল।
— "আমিও দেখতে দেব। কোনো সমস্যা নেই, স্বামীজান।"
মাহাদী ঘৃণাভরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল—
— "নির্লজ্জ মেয়ে!"
কথাটা ছুড়ে দিয়েই ঝড়ের বেগে সেখান থেকে বেরিয়ে গেল সে।
মাহাদীর চলে যাওয়া দেখেই আয়াত আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না।
— "হা... হা... হা..."
পুরো কাজী অফিস তার প্রাণখোলা অট্টহাসিতে মুখরিত হয়ে উঠল। তার চোখেমুখে তখন একটাই তৃপ্তি—অবশেষে পরিকল্পনাটি নিখুঁতভাবে সফল হয়েছে।
মাহাদী দরজা পেরিয়ে বেরিয়ে যেতেই আয়াতের ঠোঁটের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
যে মেয়েটি একটু আগেও প্রাণখোলা হাসছিল, পরক্ষণেই সে যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মানুষে পরিণত হলো।
ধপ করে পেছনে রাখা চেয়ারটিতে বসে পড়ল সে।
এতক্ষণ নিজেকে শক্ত করে ধরে রাখলেও আর সামলাতে পারল না।
চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুগুলো একে একে গড়িয়ে পড়তে লাগল। বুকের ভেতর জমে থাকা যন্ত্রণা যেন নীরবে ভেঙে পড়ল।
নিজের দুই হাতের দিকে নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল—
নিজের হাতেই... নিজের পুরো জীবনটা শেষ করে দিলাম।
তবুও তার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত প্রশান্তি কাজ করছিল। কারণ, নিজের ভালোবাসাকে বিসর্জন দিয়েও সে অন্তত তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ দু’জনের জন্য কিছু করতে পেরেছে।
তার ছোট বোনের মতো রাহা—যে বাবাহারা হয়ে এতদিন শুধু কষ্টই পেয়েছে, সেই মেয়েটির মুখে যদি আজ একটুখানি হাসি ফোটে, তাহলেই তার এই আত্মত্যাগ সার্থক।
আর অভ্র...
যে মানুষটিকে রাহা প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে, তাকে হারাতে হবে না—এই ভাবনাটাই আয়াতের সমস্ত যন্ত্রণা কিছুটা হলেও লাঘব করছিল।
হয়তো আজ থেকে তার নিজের জীবন অন্ধকারে ডুবে যাবে।হয়তো তার পরিবার এই সিদ্ধান্তে ভেঙে পড়বে, অসীম কষ্ট পাবে।
তবুও...
সবকিছু জেনেশুনেই সে এই পথ বেছে নিয়েছে।
কারণ, কিছু ভালোবাসা নিজের করে পাওয়ার জন্য নয়—প্রিয় মানুষের সুখ নিশ্চিত করার জন্য নীরবে বিসর্জন দেওয়ার নামই হয়তো সত্যিকারের ভালোবাসা।
—————
অন্যদিকে...
জামাইয়ের বেশে অভ্র যখন সবার সামনে এসে দাঁড়াল, চারপাশে মুহূর্তেই উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ল।
ঠিক তখনই অবন্তিকা মুখে দুষ্টু হাসি ঝুলিয়ে এগিয়ে এলো। হাতে থাকা রুমাল আর পাগড়িটা অভ্রের সামনে ধরে মজা করে বলল—
— "এই যে দুলাভাই, এগুলো কিন্তু পরতেই হবে। আমাদের নিয়ম!"
অভ্রও ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি টেনে দুষ্টুমি ভরা সুরে বলল—
— "আচ্ছা শালি, তাহলে নিজের হাতেই পরিয়ে দেন।"
— "এই তো লাইনে আসছেন!"
হাসতে হাসতেই অবন্তিকা নিজের হাতে অভ্রের মুখে রুমাল দিয়ে, তারপর যত্ন করে পাগড়িটাও পরিয়ে দিল।
সব আচার-অনুষ্ঠান শেষে অভ্রের ঠিক সামনে এনে বসানো হলো নতুন কনেকে।
ভারী লাল ঘোমটার আড়ালে বসে থাকা বাঁধনের বুক যেন ধুকপুক করে কেঁপে উঠছিল। কপাল বেয়ে টপটপ করে ঘাম ঝরছে। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এসেছে। মনে হচ্ছিল, এই বুঝি সবাই তার ছদ্মবেশ ধরে ফেলবে।
বাঁধনের অস্বস্তি চোখ এড়াল না সাফার।
সে মুখ টিপে হেসে কনের কাঁধে আলতো ধাক্কা দিয়ে ফিসফিস করে বলল—
— "কিরে বানদুন্নি... থুক্কু! বান্ধবী, এত কাঁপছিস কেন? নাকি দুলাভাইকে সামনে দেখে বুক ধড়ফড় শুরু হয়ে গেছে?"
সাফার কথায় চারপাশে চাপা হাসির রোল উঠলেও, ঘোমটার আড়ালে বাঁধনের বুকের ধুকপুকানি যেন আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল।
বাঁধন কোনো কথা বলল না। শুধু মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিল—সব ঠিক আছে।
দৃশ্যটি দেখে সাফার ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি ফুটে উঠল। কারণ, শুরু থেকেই সে জানত ঘোমটার আড়ালে বসে থাকা মেয়েটি রাহা নয়—ওই চুন্নিটাই, অর্থাৎ বাঁধন।
মুখ বাঁকিয়ে সে মনে মনে বলল—
— "রাহার জায়গা দখল করার শখ না? আজ সেই শখের মূল্য হাড়ে হাড়ে টের পাবি। এমন শিক্ষা পাবি, সারাজীবনেও ভুলতে পারবি না।"
অন্যদিকে, অভ্র অনেক আগেই কাজী সাহেবকে পুরো পরিকল্পনা জানিয়ে দিয়েছিল। কখন কী বলতে হবে, কোথায় কীভাবে পরিস্থিতি সামলাতে হবে—সবকিছুই আগেভাগে নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল।
পরিকল্পনামতো ফুলে সাজানো মঞ্চের মাঝখানে, ফুলের দেয়ালের সামনে মুখোমুখি বসানো হলো বর-কনেকে।
কাজী সাহেব ধীর, স্থির কণ্ঠে বিয়ের খুতবা ও কাবিননামা পাঠ শুরু করলেন। পরিকল্পনামাফিক বর-কনের নাম উচ্চারণের সময় তিনি এমন দক্ষতার সঙ্গে বাক্যগুলো পড়ছিলেন, যাতে উপস্থিত কারও মনে সামান্যতম সন্দেহও না জাগে।
অবশেষে এল সেই বহুল প্রতীক্ষিত মুহূর্ত।
কাজী সাহেবের প্রশ্নের উত্তরে ঘোমটার আড়ালে বসে থাকা বাঁধন দৃঢ় কণ্ঠে তিনবার উচ্চারণ করল—
— "কবুল।"
— "কবুল।"
— "কবুল।"
উপস্থিত সবাই আনন্দে মুখর হয়ে উঠল।
কিন্তু কেউই তখন বুঝতে পারেনি—এই 'কবুল'-এর আড়ালেই লুকিয়ে আছে এমন এক পরিকল্পনা, যার পরিণতি মুহূর্তের মধ্যেই সবার ধারণা পাল্টে দিতে চলেছে।
অবশেষে অভ্রের কবুল বলার পালা এসে গেল।
চারপাশ তখন নিস্তব্ধ। উপস্থিত সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল একমাত্র বরের দিকে।
ঠিক সেই মুহূর্তেই—
ঝপ!
হঠাৎ পুরো হলরুম অন্ধকারে ডুবে গেল। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় চারদিকে হালকা চিৎকার আর গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল।
— "আরে, কারেন্ট গেল কেন?"
— "কিছুই তো দেখা যাচ্ছে না!"
অন্ধকারে উপস্থিত সবাই কিছুটা দিশেহারা হয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল। কেউ মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালানোর চেষ্টা করছে, কেউ আবার কী ঘটেছে তা বোঝার চেষ্টা করছে।
এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই অভ্র শেষবারের মতো নিচু স্বরে জারিফকে ডেকে বলল—
— "জারিফ... দ্রুত। সময় একদম নেই।"
— "ওকে, বস।"
এক মুহূর্তও নষ্ট না করে জারিফ পরিকল্পনামাফিক কাজ শুরু করে দিল।
অন্ধকারের সুযোগে অভ্র নিঃশব্দে নিজের আসন ছেড়ে সরে গেল।
আর ঠিক সেই জায়গায় নিঃশব্দে এনে বসিয়ে দেওয়া হলো অভ্রের কোম্পানির বিশ্বস্ত ক্যাশিয়ার—আলাউদ্দিনকে।
সবকিছু এতটাই দ্রুত ও নিখুঁতভাবে সম্পন্ন হলো যে উপস্থিত কেউই সামান্যতম টের পেল না।
কয়েক সেকেন্ড পরই বিদ্যুৎ ফিরে এলো।
চারপাশ মুহূর্তেই আলোয় ভরে উঠল।
কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই কাজী সাহেব আবার প্রশ্ন করলেন—
— "আপনি কি এই বিবাহে কবুল করছেন?"
একটুও দেরি না করে আলাউদ্দিন দৃঢ় কণ্ঠে উচ্চারণ করল—
— "কবুল।"
— "কবুল।"
— "কবুল।"
শব্দগুলো প্রতিধ্বনিত হতেই উপস্থিত সবাই আবারও একসঙ্গে বলে উঠল—
— "আলহামদুলিল্লাহ!"
আর সেই মুহূর্তেই, কারও অজান্তে, অভ্রের বহুদিনের সুপরিকল্পিত দাবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চালটি নিখুঁতভাবে সম্পন্ন হয়ে গেল।
আলাউদ্দিনের মুখে টানা তিনবার "কবুল" উচ্চারিত হতেই চারদিক আবারও মুখরিত হয়ে উঠল—
— "আলহামদুলিল্লাহ!"
উপস্থিত সবাই আনন্দে একে অপরকে অভিনন্দন জানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কারও মনেই তখন সামান্যতম সন্দেহের ছায়া ছিল না।
এরপর কাজী সাহেব মোনাজাতের জন্য সবাইকে হাত তুলতে বললেন।
সবাই যখন একযোগে দুই হাত তুলে দোয়ায় মগ্ন হতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ঘটল এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা।
হাত তুলতেই বরের মুখে ধরে রাখা রুমালটি আলগা হয়ে নিচে নেমে এলো।এক নিমিষেই তার মুখ সবার সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠল।
দৃশ্যটি চোখে পড়তেই চারপাশে যেন সময় থমকে গেল।কেউ হতবাক, কেউ স্তম্ভিত।
ঠিক তখনই আমান খান বিস্ফারিত চোখে নিজের আসন থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠে অবিশ্বাসভরা কণ্ঠে বলে উঠলেন—
— "আলাউদ্দিন...! তুমি এখানে?"
কয়েক মুহূর্ত থেমে চারদিকে ব্যাকুল দৃষ্টিতে তাকিয়ে তিনি আরও গর্জে উঠলেন—
— "তাহলে... অভ্র কোথায়?"
তার প্রশ্নে পুরো জায়গা টায় নেমে এলো পিনপতন নীরবতা।
সবাই এবার আতঙ্ক আর কৌতূহল নিয়ে একবার আলাউদ্দিনের দিকে, আরেকবার চারপাশে অভ্রকে খুঁজতে লাগল।
আমান খানের কথা শুনে উপস্থিত সবাই যেন মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল।
কয়েক সেকেন্ড আগেও যে পরিবেশ আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মুখর ছিল, তা হঠাৎই নীরব ও ভারী হয়ে উঠল। প্রত্যেকের চোখে ফুটে উঠল বিস্ময়।
সবাই কনের বেশে থাকা বাঁধনের দিকেই তাকাল।
অন্যদিকে, আমান খানের বলা কথা কানে যেতেই বাঁধনের বুক কেঁপে উঠল।
সে দ্রুত নিজের ভারী ঘোমটা সরিয়ে সামনে তাকাল।
আর ঠিক পরমুহূর্তেই...
তার মুখের সমস্ত রং ফিকে হয়ে গেল।
চোখ দুটি বিস্ফারিত, ঠোঁট কাঁপছে, পুরো শরীর যেন অবশ হয়ে গেছে।এতক্ষণ যে মেয়েটি আনন্দে আত্মহারা হয়ে ভবিষ্যতের রঙিন স্বপ্ন বুনছিল, মুহূর্তের মধ্যেই তার সেই স্বপ্নের প্রাসাদটা এমন ভেঙে পড়ল, যেন কেউ কার্ডবোর্ডের বাড়িতে হাঁচি দিয়ে দিয়েছে।
কিছুক্ষণ আগেও সে মনে মনে ভেবেছিল—
"অবশেষে অভ্রকে নিজের করে পেলাম। এবার হানিমুনে প্যারিস যাব... আইফেল টাওয়ারের সামনে ছবি তুলব, ক্রোসাঁ খাব, আর ইনস্টাগ্রামে লিখব—‘Love is in the air’...”
কিন্তু সামনে বসে থাকা মানুষটির দিকে ভালো করে তাকাতেই তার বুকের ভেতর যেন চাবুকের ন্যায় আঘাত হানলো
অভ্র নয়...
সেখানে বসে আছে অভ্রের কোম্পানির মধ্যবয়স্ক ক্যাশিয়ার—আলাউদ্দিন!
দৃশ্যটি বিশ্বাস করতে না পেরে বাঁধন বারবার চোখ মুছে তাকাল।
না...
এটি কোনো দুঃস্বপ্ন নয়।এটাই বাস্তব।
তার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল, চারপাশ যেন ঘুরে উঠল। মনে হলো, এই বুঝি জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়বে।
মুহূর্তের মধ্যেই সে উপলব্ধি করল—
সে নিজেই এমন এক সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ বহু আগেই নিখুঁতভাবে সাজিয়ে রেখেছিল অভ্র।
—————
বর্তমান...
ছাদের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে অভ্র ও রাহা নিচের পুরো দৃশ্যটি গভীর মনোযোগে পর্যবেক্ষণ করছে।
সামনে রাহা, আর তার ঠিক পেছনে অভ্র।
দুই হাতের দৃঢ় বেষ্টনীতে সে রাহাকে আগলে রেখেছে। নিজের থুতনি আলতো করে রাহার কাঁধে রেখে নিচের প্রতিটি মুহূর্ত নীরবে লক্ষ্য করছে।
নিচে মাহাদীর উন্মত্ত ছুটে আসা, বাঁধনের ভেঙে পড়া মুখভঙ্গি, আর উপস্থিত সবার বিস্মিত প্রতিক্রিয়া—সবকিছুই যেন তাদের সুপরিকল্পিত দাবার শেষ চালের সফল পরিণতি।
রাহা একবার নিচের দিকে তাকায়, একবার অভ্রের দিকে।
দু’জনের চোখাচোখি হতেই আর নিজেদের সংযত রাখতে পারল না।
ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল তৃপ্তির হাসি, যা মুহূর্তের মধ্যেই রূপ নিল প্রাণখোলা অট্টহাসিতে।
অন্যদিকে, অবন্তিকা আর সাফাও হাসতে হাসতে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। প্রায় ধপ করে পাশের চেয়ারে বসে পড়ল।
জারিফ আর জায়ানের অবস্থাও ভিন্ন নয়। দু’জনই একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে চাপা হাসি সামলানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে।
কিন্তু নিচে...
সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র। উপস্থিত প্রত্যেকেই হতবাক।
কারও মুখে কোনো কথা নেই।কারও চোখে বিস্ময়, কারও চোখে অবিশ্বাস, আবার কারও চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ।
মনে হচ্ছিল, মুহূর্তের মধ্যেই পুরো পরিবেশের হিসাব-নিকাশ পাল্টে গেছে।
কেউই বুঝে উঠতে পারছে না—আসলে এখানে হচ্ছে কী?
সেই মুহূর্তেই, যেন অদৃশ্য কোনো আকর্ষণে, মাহাদী ও বাঁধন একসঙ্গে মাথা তুলে ছাদের দিকে তাকাল।
পরমুহূর্তেই তাদের দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল অভ্র ও রাহার ওপর।
দু’জনই ছাদের রেলিংয়ের পাশে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে, মুখে বিজয়ীর আত্মতৃপ্ত হাসি।
তাদের মধ্যে কোনো বিচলিত ভাব নেই। কোনো অনুতাপও নেই।বরং নিচে ঘটে চলা প্রতিটি দৃশ্য যেন তারা উপভোগ করছে।
মাহাদী ও বাঁধনের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই অভ্র ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে ধীরে ধীরে মিডল ফিঙ্গার উঁচিয়ে দেখাল।
তার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা রাহাও একই ভঙ্গিতে মিডল ফিঙ্গার তুলে বিদ্রূপাত্মক হাসি ছুড়ে দিল।
দু’জনের চোখেমুখে তখন স্পষ্ট একটিই বার্তা—
"খেলা শেষ..। "
সেই এক মুহূর্তেই মাহাদী ও বাঁধনের মুখ আরও কঠোর হয়ে উঠল। অপমান, ক্রোধ ও অসহায়তায় তাদের চোখ রক্তিম হয়ে উঠল, আর অভ্র-রাহার বিজয়ী হাসি যেন তাদের পরাজয়ের ওপর শেষ সিলমোহর এঁকে দিল।
অভ্র নিচে নেমে, সবার সামনে বা মাহাদীর একেবারে কাছে গিয়ে বলবে—
— "দাবার বোর্ডে রাজাকে ধরতে এসেছিলি... শেষে নিজেই গুটি হয়ে গেলি।”
ঠিক সেই মুহূর্তে অভ্রের পেছন দিক থেকে ভেসে এলো এক সুপরিচিত, শীতল কণ্ঠ—
— “যতক্ষণ আমি বেঁচে আছি, অভ্র আর রাহার এই বিয়ে কোনোদিনও সম্পন্ন হবে না!”
আর তখনই মাহাদীর অধরে ফুটে উঠল এক নির্মম, বিজয়োচ্ছ্বাসে ভরা হাসি—যেন সে আগেই জানত, এই একটি কণ্ঠই মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু ওলটপালট করে দেবে।কেউ তখনও বুঝতে পারেনি—আসল ঝড়টা এখনই শুরু হতে যাচ্ছে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………