রাহা কয়েক কদম এগিয়েও হঠাৎ থেমে গেল। ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এল মাহাদীর ভারী কণ্ঠ
— "রাহা!"
সে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। আবারও সামনে এগোতেই মাহাদীর কণ্ঠ আরও দৃঢ় হয়ে উঠল।
— "তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে... খুব জরুরি।"
রাহা না ঘুরেই দাঁড়াল। চোখে-মুখে জমাট বাঁধা বিরক্তি আর শীতল অবজ্ঞা।
— "আপনার কাছ থেকে শোনার মতো আমার কিছুই নেই। তাই প্লিজ... লিভ মি অ্যালোন।"
মাহাদী এক পা এগিয়ে রাহার সামনে এসে দাঁড়ালো
— "জাস্ট পাঁচ মিনিট... মাত্র পাঁচ মিনিট। তারপর চাইলে আমি নিজেই তোমার জীবন থেকে সরে যাব। কিন্তু তার আগে একটা জিনিস তোমাকে দেখাতেই হবে।"
রাহার ভ্রু কুঁচকে গেল।
— "আমি কিছুই দেখতে চাই না। পথ ছাড়ুন।"
সে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে উদ্যত হতেই মাহাদীর কণ্ঠে মরিয়া আকুতি নেমে এল।
— "রাহা... গিভ মি ওয়ান চান্স, প্লিজ। শুধু একবার... এরপর সিদ্ধান্ত তোমার।"
কথা শেষ করেই মাহাদী ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে দিল।
এক হাতে ধরা ছিল রক্তিম, টকটকে একটি গোলাপ, আর অন্য হাতের মুঠোয় ছোট্ট একটি কালো পেনড্রাইভ।
রাহার দৃষ্টি মুহূর্তেই স্থির হয়ে গেল সেই পেনড্রাইভটির ওপর। অজানা এক শীতল অনুভূতি নিঃশব্দে তার বুকের ভেতর ছড়িয়ে পড়ল। অনিশ্চিত আশঙ্কা মনে শিকড় গাড়তে শুরু করলেও, মুখাবয়বে তার সামান্যতম প্রতিফলনও দেখা গেল না।
সে ভ্রু সামান্য কুঁচকে একবার গোলাপটির দিকে তাকাল, তারপর দৃষ্টি সরিয়ে স্থির করল কালো পেনড্রাইভটির ওপর। চোখেমুখে স্পষ্ট বিস্ময় আর নীরব প্রশ্নের ছাপ—
এর অর্থ কী? আর এই দুটি জিনিসই বা কেন?
ধীর ভঙ্গিতে চোখ তুলে মাহাদীর দিকে তাকাতেই রাহা থমকে গেল।
মাহাদী তখনও ঠোঁটের কোণে রহস্যময় এক মৃদু হাসি ঝুলিয়ে অপলক দৃষ্টিতে শুধু তার দিকেই তাকিয়ে আছে। সেই হাসির আড়ালে ঠিক কী লুকিয়ে আছে, তা বোঝার উপায় যেন রাহার কাছে ছিল না।
সেই হাসিটাই যেন রাহার রাগে আরও ঘি ঢেলে দিল।
এক মুহূর্ত দেরি না করে রাহা ঝটকা মেরে মাহাদীর হাত থেকে রক্তিম গোলাপটি কেড়ে নিল। পরমুহূর্তেই সেটিকে মাটিতে ছুড়ে ফেলে দিল। তারপর জুতোর নিচে নির্মমভাবে পিষে দিল ফুলটি।
মাহাদী নির্বিকার।
বরং আরও এক পা এগিয়ে এসে গভীর দৃষ্টিতে রাহার চোখে চোখ রেখে বলল,
— "রাহা... আমি তোমাকে ভালোবাসি। এই হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দনে, প্রতিটি নিঃশ্বাসে শুধু তোমারই অস্তিত্ব।"
— "এগুলো দিয়ে কী প্রমাণ করতে চান?"( রাহা)
মাহাদী ম্লান হেসে মাথা নাড়ল।
— "প্রমাণ না... সত্যিটা জানাতে চাই। যে সত্যটা এতদিন তোমার কাছ থেকে আড়ালেই ছিল।"
রাহার চোখ দুটো মুহূর্তেই ধারালো হয়ে উঠল।
— "আপনার কোনো সত্য জানার প্রয়োজন আমার নেই।"
কথাটা বলেই সে চলে যেতে উদ্যত হতেই মাহাদী কাঁপা গলায় বলে উঠল,
— "যদি এই পেনড্রাইভটা না নাও... তাহলে হয়তো সারাজীবন এমন একটা সত্যের অন্ধকারেই থেকে যাবে, যার জন্য একদিন নিজেকেই দোষ দেবে।"
রাহার পা থেমে গেল।কয়েক সেকেন্ড...
নিস্তব্ধতা যেন চারপাশটাকে গ্রাস করে নিল।
কথা শেষ করেই সে রাহার হাত ধরতে উদ্যত হলো।
ব্যস!
এতক্ষণে যেন রাহার ধৈর্যের শেষ বাঁধটুকুও ভেঙে গেল।
রাগে, অপমানে আর ঘৃণায় তার সমগ্র শরীর কাঁপতে লাগল। চোখদুটি জ্বলে উঠল দাউদাউ আগুনের মতো।
এক ঝটকায় নিজের হাত তুলে সজোরে মাহাদীর গালের দিকে চালিয়ে দিল সে।
মুহূর্তের ব্যবধান...
রাহার তালু আর মাহাদীর গালের মাঝখানে তখন মাত্র এক চুলের দূরত্ব।
মাহাদী বিস্ময়ে স্থির হয়ে রইল। তার চোখে স্পষ্ট অবিশ্বাস—যেন সে বিশ্বাসই করতে পারছিল না, এক মুহূর্ত আগেও শান্ত থাকা রাহা এভাবে হঠাৎ বিস্ফোরিত হতে পারে।
চারপাশে কয়েক সেকেন্ডের জন্য নেমে এলো এক গভীর, থমথমে নীরবতা।
নীরবতা ভেঙে মাহাদী মৃদু হেসে বলল,
— "থেমে গেলে কেন...? মারো। তোমার রাগ যদি এতেই প্রশমিত হয়, তাহলে মারো।"
রাহা দাঁতে দাঁত চেপে হাত নামিয়ে নিল। রাগে তার বুক ওঠানামা করছে, চোখদুটি জ্বলছে রক্তিম আভায়।
সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মাহাদীর দিকে তাকিয়ে বিষাক্ত কণ্ঠে বলে উঠল,
— "এটাই শেষবারের মতো সতর্ক করছি। আমার থেকে... আর আমার অভ্র ভাইয়ের থেকে শতহাত দূরে থাকবি। আমাদের জীবন নিয়ে আর একবারও নোংরা খেলা খেলার চেষ্টা করবি না।"
এক পা এগিয়ে গিয়ে আঙুল তুলে বলল,
— "যে আমাকে অসম্মান করার দুঃসাহস দেখিয়েছিল, তার মুখে ভালোবাসার কথা মানায় না। তোর এই তথাকথিত ভালোবাসাকে আমি ঘৃণা করি।"
প্রচণ্ড ক্ষোভে ফুঁসতে ফুঁসতে বলে উঠল,
— "আর একবার যদি আমার সামনে এসে 'ভালোবাসি' বলিস... তোর বুক চিরে হার্ট বের করে ডুগডুগি বাজাবো শালা। বুঝেছিস? এবার চোখের সামনে থেকে ফট!"
শেষ কথাটা প্রায় গর্জে উঠেই বলল রাহা।
একবারও পেছনে না তাকিয়ে সে মাহাদীকে পাশ কাটিয়ে দ্রুত হেঁটে চলে যেতে উদ্যত হতেই মাহাদী কোনো সুযোগ না দিয়ে জোর করে পেনড্রাইভটা তার মুঠোয় গুঁজে দিল। রাহা মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। রাগে সেটা ছুড়ে ফেলে দিতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত অদ্ভুত এক অজানা আশঙ্কায় সেটি ফেলে দিল না।”
আর মাহাদী...
সে যেন পাথরের মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। অপলক দৃষ্টিতে শুধু রাহার দূরে সরে যাওয়াটাই দেখছিল।
হঠাৎ করেই তার ঘাড়ের পেছনে তীব্র সূচ ফোটার মতো একটা যন্ত্রণা অনুভূত হলো।
সে চমকে উঠল।
পরমুহূর্তেই চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে এল। চারপাশের আলো যেন ধীরে ধীরে অন্ধকারে ডুবে যেতে লাগল।
দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিটুকুও যেন মুহূর্তেই হারিয়ে ফেলল।
—————
অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষা, বিস্তৃত প্রস্তুতি আর অসংখ্য স্বপ্নের পর বহু প্রতীক্ষিত সেই শুভক্ষণ এসে উপস্থিত হলো খান বাড়ির দোরগোড়ায়। ভোরের প্রথম আলো ফুটতেই পুরো বাড়ি যেন রাজকীয় প্রাসাদে রূপ নিল। বিশাল প্রবেশদ্বারজুড়ে ফুলের মনোমুগ্ধকর তোরণ, ঝলমলে আলোকসজ্জা, বাহারি অর্কিড, গোলাপ ও রজনীগন্ধার সুবাসে চারপাশ উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে।
বাড়ির সামনের বিশাল প্রাঙ্গণে নির্মিত রাজকীয় প্যান্ডেল, সুসজ্জিত মঞ্চ, অভিজাত বসার ব্যবস্থা ও দৃষ্টিনন্দন ডাইনিং জোনে ফুটে উঠছিল খান পরিবারের ঐশ্বর্য, রুচি ও আভিজাত্য। ঢাক-ঢোল, সানাইয়ের সুরে মুখরিত পরিবেশে আত্মীয়-স্বজন, গ্রামের মানুষ, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, ব্যবসায়ী, সাংবাদিকসহ অসংখ্য অতিথির পদচারণায় পুরো বাড়ি যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
রান্নাঘরেও চলছিল মহাযজ্ঞ। বিশাল ডেগে একসঙ্গে রান্না হচ্ছিল নানা পদের খাবার, আর বাড়ির প্রতিটি সদস্য ব্যস্ত ছিল অতিথি আপ্যায়ন ও অনুষ্ঠানের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে।সর্বোপরি, চেয়ারম্যানের একমাত্র পুত্রের এবং নিজের ভাতিজির শুভ পরিণয়—যেখানে সম্মান, মর্যাদা ও বংশীয় ঐতিহ্যের প্রশ্ন জড়িত, সেখানে আয়োজনও হতে হয় রাজকীয়, জাঁকজমকপূর্ণ এবং দীর্ঘদিন মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হওয়ার মতো স্মরণীয়।
খুব ভোরে বাড়ি ফিরেছিল অভ্র।
তখনও পূর্বাকাশে সূর্যের আলো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। চারদিক ছিল নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্ন। বাড়ির সবাই গভীর ঘুমে নিমগ্ন থাকায় তার ফিরে আসা কারও নজরে পড়েনি।
নিঃশব্দে ঘরে ঢুকেই অভ্রের দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল রাহার ওপর। ছোট্ট মেয়েটি নিশ্চিন্তে চোখ বুজে শুয়ে ছিল। কিন্তু কেন জানি অভ্রের তীক্ষ্ণ অন্তর্দৃষ্টি বারবার বলছিল, রাহা বোধহয় এইমাত্র চোখ বন্ধ করেছে—অথবা ইচ্ছে করেই ঘুমের অভিনয় করছে।
তবু সে বিষয়টি আর খুঁটিয়ে দেখার প্রয়োজন বোধ করল না। সারারাতের ক্লান্তি শরীরকে অবসন্ন করে তুলেছিল। তাই আর কোনো শব্দ না করে নিজের কক্ষে চলে গেল। ফ্রেশ হয়ে কিছুটা বিশ্রাম নেওয়ার উদ্দেশ্যে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই মুহূর্তের মধ্যে চোখে নেমে এলো ঘুম।
অভ্র কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যেতেই রাহার শক্ত করে বন্ধ করে রাখা চোখের পাপড়িগুলো নিঃশব্দে ভিজে উঠল। মুহূর্তের মধ্যেই অশ্রুধারা বাঁধভাঙা স্রোতের মতো গাল বেয়ে অনবরত ঝরে পড়তে লাগল।
তার কাঁপতে থাকা মুঠোর ভেতর শক্ত করে ধরা ছিল মাহাদীর দেওয়া সেই পেনড্রাইভটি—যেন সেটিই তার সমস্ত দুঃস্বপ্ন, সমস্ত সত্যের একমাত্র সাক্ষী।
হঠাৎই বুকের ভেতর জমে থাকা যন্ত্রণা বিস্ফোরিত হলো। এক তীব্র হেঁচকির সঙ্গে ফুঁপিয়ে নয়, যেন বুকফাটা আর্তনাদে কেঁদে উঠল রাহা। শ্বাস নিতে পর্যন্ত কষ্ট হচ্ছিল তার।
শূন্য দৃষ্টিতে চোখ মেলতেই মাথার ওপরের সাদা সিলিংটা ঝাপসা হয়ে ভেসে উঠল। কিন্তু তার চোখে সিলিং নয়, একে একে জীবন্ত হয়ে উঠতে লাগল অতীতের প্রতিটি বিভীষিকাময় দৃশ্য—রক্তাক্ত স্মৃতি, অসহায় মুহূর্ত, আর বাবাকে হারানোর সেই নির্মম বাস্তবতা।
অবিরাম কান্নায় তার দুটি চোখ রক্তিম হয়ে উঠেছিল। মনে হচ্ছিল, সামান্য স্পর্শ করলেই বুঝি রক্ত ঝরে পড়বে। সারা শরীর কাঁপছিল থরথর করে, ঠোঁট কাঁপছিল অবিরাম।
আর অস্ফুট, ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে বারবার শুধু একটাই শব্দ উচ্চারণ করে যাচ্ছিল সে—
"আব্বু... আব্বু... আব্বু…”
—————
সকালের শুরু থেকেই সাথী বেগমের মন অকারণ এক অজানা ভারে চেপে ছিল। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অস্থিরতা ক্রমেই দানা বাঁধছিল। কেন এমন লাগছে, তার কোনো ব্যাখ্যা তিনি খুঁজে পাচ্ছিলেন না। জীবনে কখনো এমন অকারণ শঙ্কা তাকে এভাবে গ্রাস করেনি। অথচ আজ মনে হচ্ছিল, যেন অদৃশ্য কোনো অমঙ্গলের ছায়া নিঃশব্দে তাকে ঘিরে ফেলেছে।
অন্যমনস্ক হয়ে কাজ করতে করতেই হঠাৎ তার হাতের ধাক্কায় ডাইনিং টেবিলের কাঁচের গ্লাসটি সজোরে মেঝেতে আছড়ে পড়ল।
ঝনঝন শব্দে মুহূর্তেই কাঁচের টুকরোগুলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।
তীক্ষ্ণ সেই শব্দে সাথী বেগম নিজেই প্রচণ্ড চমকে উঠলেন। আতঙ্কে তার পুরো শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল। বুকের ভেতর ধুকপুকানিটা যেন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেল।
ঠিক তখনই পাশ থেকে আফসানা বেগম উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন,
— "কিরে মেজো, তোকে এমন অস্থির দেখাচ্ছে কেন?"
সাথী বেগম শুকনো ঠোঁট জিভ দিয়ে ভিজিয়ে এক ঢোক লালা গিলে কাঁপা গলায় বললেন,
— "ক... কই আপা! আমি তো ঠিকই আছি।"
আফসানা বেগম ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
— "না, তুই ঠিক নেই। মুখটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। কী হয়েছে বল তো?"
সাথী বেগম জোর করে একটুখানি হাসি ফুটিয়ে বললেন,
— "হয়তো শরীরটা একটু খারাপ লাগছে... তাই এমন লাগছে।"
আফসানা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— "কাল রাত পর্যন্ত তোকে একদম স্বাভাবিকই দেখেছি। যাই হোক, আজ আর কোনো কাজ করতে হবে না। যা, নিজের ঘরে গিয়ে একটু বিশ্রাম নে।"
আজ আর কোনো আপত্তি করলেন না সাথী বেগম। অন্যদিন হলে শত অনুরোধ, এমনকি জোর করেও তাকে রান্নাঘর বা সংসারের কাজ থেকে সরানো যেত না। কিন্তু আজ তিনি নিঃশব্দে মাথা নত করলেন। কারণ বুকের ভেতর সেই অজানা আশঙ্কাটা যেন প্রতি মুহূর্তে আরও ভারী হয়ে উঠছিল।
সাথী বেগমের আচরণে আফসানা বেগমের মনেও এক অস্বস্তিকর অনুভূতি দানা বাঁধল। দীর্ঘদিনের পরিচয়ে তিনি জানতেন, সাথী বেগম এমন সহজে ভেঙে পড়ার মানুষ নন। আজ তার অন্যমনস্কতা, কাঁপা কণ্ঠস্বর এবং ফ্যাকাশে মুখ দেখে আফসানা বেগমের মনেও অকারণ এক আশঙ্কা জন্ম নিল।
ঠিক তখনই দূর থেকে আমান খানের কণ্ঠ ভেসে এলো,
— "আফসানা!"
ডাক শুনে তিনি আর কিছু ভাবলেন না। বুকের ভেতর অজানা অস্বস্তি নিয়েই দ্রুত সেদিকে পা বাড়ালেন।
সাথী বেগম নিজের কক্ষে না গিয়ে সোজা পা বাড়ালেন রাহার ঘরের দিকে।
দরজার সামনে এসে মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন তিনি। বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠল। আজকের পর থেকে তার আদরের মেয়েটা আর শুধু তার থাকবে না। নতুন এক পরিচয়, নতুন এক সংসার, নতুন এক জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যাবে তার নাম, তার পরিচয়, তার অস্তিত্ব।
ভাবতেই বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। এই তো সেদিনও ছোট্ট দু'হাত বাড়িয়ে "মা" বলে তার আঁচল আঁকড়ে ধরত রাহা। আর আজ! সময় যেন চোখের পলকে সেই ছোট্ট মেয়েটিকে বড় করে দিল। কখন যে নিষ্পাপ শিশুটি পূর্ণবয়স্ক এক তরুণীতে পরিণত হয়েছে, তা বুঝে ওঠার সুযোগই পাননি তিনি।
বাবাহীন মেয়েটাকে বুকে আগলে, হাজারো অভাব-অভিযোগ আড়াল করে বড় করেছেন সবাই। তবু পৃথিবীর কোনো ভালোবাসাই বাবার শূন্যস্থান পুরোপুরি পূরণ করতে পারে না। বাবার স্নেহ, নিরাপত্তা আর আশ্রয়ের সমতুল্য আর কিছুই হয় না।
তবুও খান পরিবারের প্রত্যেকটি মানুষ রাহাকে নিজের সন্তানের চেয়েও বেশি স্নেহ, মমতা আর ভালোবাসায় আগলে রেখেছে। ভালোবাসার সেই গভীরতা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
বিশেষ করে আমান খান... রাহা যেন তার প্রাণের টুকরো। তিনি রাহাকে শুধু ভালোবাসেন না, চোখে হারান। রাহার সামান্য কষ্টও যেন তার নিজের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায়। নিজের সন্তানের সঙ্গে কখনোই ভিন্নতা করেননি; বরং প্রতিটি মুহূর্তে তাকে আগলে রেখেছেন নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর অকৃত্রিম স্নেহের পরম মমতায়।
এই বিয়েটা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আনন্দিতও হয়েছেন তিনিই। তার বিশ্বাস, জীবনে যত দুষ্টুমি, একরোখামি কিংবা ভুল সিদ্ধান্তই নিক না কেন, এবার অন্তত তার ছেলে একটি যথার্থ ও প্রশংসনীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রাহার জন্য অভ্রের চেয়ে যোগ্য, নিরাপদ ও আপন মানুষ যেমন ছিল না, তেমনি অভ্রের জন্যও রাহার চেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয় আর কেউ হতে পারত না। এই সম্পর্কের কথা ভেবেই তার মন তৃপ্তিতে ভরে উঠছিল।
এসব ভাবনার মধ্য দিয়েই ধীর পায়ে রাহার কক্ষের সামনে এসে দাঁড়ালেন সাথী বেগম। দরজার কাছে পৌঁছাতেই তার পদক্ষেপ যেন মুহূর্তে থমকে গেল। বুকের ভেতরটা অকারণে কেঁপে উঠল। একবার গভীর শ্বাস নিয়ে কাঁপা হাতে দরজাটি আলতো করে ঠেলে খুললেন। তারপর নিঃশব্দ, ধীর পদক্ষেপে কক্ষে প্রবেশ করলেন।
দরজা খোলার মৃদু শব্দ কানে আসতেই রাহা দ্রুত চোখ দুটি আরও শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল। গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রুর শেষ চিহ্নটুকুও আড়াল করার ব্যর্থ চেষ্টা করল সে।
সাথী বেগম ধীর পায়ে এগিয়ে এসে মেয়ের পাশে বসে পড়লেন। অপলক দৃষ্টিতে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন নিজের একমাত্র প্রাণভোমরাটিকে। যেন চোখের পলক ফেললেই মেয়েটাকে আর দেখতে পাবেন না।
হঠাৎই স্মৃতির পাতা উল্টে ভেসে উঠল বহু বছরের পুরোনো সেই দিনটি—যেদিন প্রথম রাহা পৃথিবীর আলো দেখেছিল। সেদিন আনন্দে আত্মহারা হয়ে তার বাবা পুরো মহল্লায় মিষ্টি বিতরণ করেছিলেন। অসহায় মানুষের হাতেও তুলে দিয়েছিলেন খাবার, পোশাক ও উপহার। রাহা যেন জন্মের পর থেকেই শুধু পরিবারের নতুন সদস্য ছিল না, ছিল সবার আদর, ভালোবাসা আর স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দু।
স্মৃতির অতল থেকে ফিরে এসে সাথী বেগম স্নেহভরা হাতে আলতো করে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। মমতায় ভেজা কণ্ঠে ধীরে ধীরে ডাকলেন—
— "আমার রাহু মা... উঠ মা। আর কত ঘুমাবি, সোনা?"
কিন্তু রাহা নিস্পন্দ হয়ে রইল। চোখ বন্ধ করেই পড়ে থাকল, যেন গভীর নিদ্রায় তলিয়ে আছে। অথচ বুকের ভেতরটা তার নীরব কান্নায় ততক্ষণে তছনছ হয়ে যাচ্ছিল।
সাথী বেগম আলতো করে মেয়ের দিকে আরও একটু ঝুঁকতেই রাহার চোখের কোণে তাঁর দৃষ্টি আটকে গেল। বন্ধ চোখের পাপড়ির ফাঁক গলে টলমল অশ্রুবিন্দু নীরবে, অবিরাম গড়িয়ে পড়ছে।
দৃশ্যটি দেখে মুহূর্তের জন্য তাঁর বুক কেঁপে উঠল। তবে পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিলেন। মনে মনে ভাবলেন, আজ তো মেয়ের জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের দিন। হয়তো মাকে ছেড়ে অন্য ঘরে চলে যাওয়ার ভাবনাতেই মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে উঠেছে।
অগাধ মমতায় নিজের আঁচল দিয়ে রাহার চোখের কোণের অশ্রুগুলো সযত্নে মুছে দিলেন তিনি। তারপর স্নেহমাখা কণ্ঠে হালকা হেসে বললেন,
— "ঘুম তো দেখি অনেক আগেই ভেঙে গেছে। তাহলে আমার রাহু মা লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদছে কেন, শুনি?"
মায়ের কণ্ঠস্বর কানে আসতেই রাহা আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। ধীরে ধীরে চোখ মেলে এক মুহূর্তও দেরি না করে উঠে এসে মায়ের কোলে মুখ গুঁজে দিল। মাথাটা সাথী বেগমের উরুর ওপর উপুড় করে রাখতেই যেন বহুদিনের চেপে রাখা নিরাপত্তার আশ্রয় ফিরে পেল সে।
সাথী বেগমও আর এক মুহূর্ত দেরি করলেন না। দুই হাত বাড়িয়ে শক্ত করে আগলে নিলেন নিজের কলিজার টুকরোকে। স্নেহভরা আঙুলগুলো বারবার রাহার চুলে বিলি কেটে দিতে লাগল, যেন প্রতিটি স্পর্শে মেয়ের সমস্ত কষ্ট নিজের বুকে টেনে নিতে চাইছেন।
তিনি কিছু বলার আগেই রাহা ভারী, কাঁপা কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
— "মা... একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
সাথী বেগম স্নেহভরে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
— “হ্যাঁ মা, অবশ্যই বল। কী জানতে চাস?”
রাহা কিছুক্ষণ নীরব রইল। মাথা তুলে মায়ের চোখের দিকে তাকাল। কণ্ঠে জমে থাকা অভিমান ও দীর্ঘদিনের চাপা কষ্ট নিয়ে সে বলল,
— “প্রতিবারের মতো এবারও কি আমাকে এড়িয়ে যাবে, মা? এবারও কি সত্যিটা লুকিয়ে রাখবে?”
রাহার প্রশ্ন শুনে সাথী বেগমের বুকের ভেতরটা হঠাৎ ধক করে উঠল। মুহূর্তেই যেন মুখের রক্ত সরে গেল। এত বছর ধরে বুকের গভীরে চাপা দিয়ে রাখা সেই নির্মম অতীত আজ আবারও সামনে এসে দাঁড়াল।
রাহা মায়ের দুই হাত শক্ত করে ধরে কাঁপা, অনুনয়ভরা কণ্ঠে বলল,
— “প্লিজ, মা... আজ অন্তত আমাকে সত্যিটা বলো। তোমার মেয়ের কাছে এটাই হয়তো শেষ অনুরোধ... শেষ আবদার। আর না জেনে থাকতে পারছি না আমি।”
মেয়ের আকুতিভরা কণ্ঠ, ভেজা চোখ আর অসহায় মুখ দেখে সাথী বেগম আর নিজেকে কঠোর রাখতে পারলেন না। বুকের ভেতর দীর্ঘশ্বাস জমে উঠল। চোখের কোণও অশ্রুতে চিকচিক করে উঠল।
কয়েক মুহূর্ত নীরবে বসে থেকে তিনি নিজেকে সামলে নিলেন। তারপর ভারী, বিষণ্ন কণ্ঠে বহুদিন ধরে চাপা পড়ে থাকা অতীতের পর্দা সরাতে শুরু করলেন—
— “তোর তখন মাত্র চার বছর বয়স... ছোট্ট, অবুঝ একটা মেয়ে ছিলি তুই।
সাথী বেগম গভীর একটা শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলে আবার বলতে শুরু করলেন—
— "তোর বাবা সেদিন একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক মিটিংয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিল তোর ছোট আব্বু, মাহাদীর আব্বু... আর মাহাদীও।
অন্যদিকে, ঠিক সেদিনই অভ্র তার বাবা-মায়ের সঙ্গে চট্টগ্রামে গিয়েছিল তার নানাবাড়িতে। অভ্রের নানা গুরুতর অসুস্থ ছিলেন, তাই তাঁকে দেখতে যাওয়াটাও খুব জরুরি ছিল।
মিটিং শেষ হওয়ার পর তোর বাবা, তোর ছোট আব্বু, মাহাদীর আব্বু আর মাহাদী তোর বড় আম্মুর বাবাকে দেখতে তাঁদের বাড়িতে গিয়েছিলেন। সেখানে কিছুক্ষণ সময় কাটানোর পর সবাই মিলে পাশের পাহাড়ি এলাকায় একটু হাঁটতে বের হন।
তারপর...
সেই মুহূর্তটার কথা মনে পড়লেই আজও বুকের ভেতরটা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।
শোনা যায়, পাহাড়ের কিনারা দিয়ে হাঁটার সময় হঠাৎই তোর বাবার পা পিছলে যায়। এক নিমিষেই তিনি গভীর খাদে তলিয়ে যান। এতটাই দ্রুত সবকিছু ঘটেছিল যে, কেউ তাঁকে ধরে রাখারও সুযোগ পায়নি।
তারপর শুরু হয় উন্মত্ত খোঁজাখুঁজি। ফায়ার সার্ভিস, স্থানীয় মানুষ, উদ্ধারকারী দল—দিনের পর দিন সবাই মিলে প্রতিটি ইঞ্চি জায়গা তন্নতন্ন করে খুঁজেছিল। কিন্তু...
না...
তোর বাবাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। না তাঁর কোনো সন্ধান, না কোনো চিহ্ন...
কথাগুলো বলতে বলতেই সাথী বেগমের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এলো। বুকের ভেতর জমে থাকা বছরের পর বছর ধরে চাপা কান্না আর ধরে রাখতে পারলেন না। হাউমাউ করে ভেঙে পড়লেন তিনি। চোখ বেয়ে অবিরাম অশ্রুধারা ঝরতে লাগল, আর সেই কান্নায় যেন বহু বছরের দমিয়ে রাখা শোক একসঙ্গে বিস্ফোরিত হয়ে বেরিয়ে এলো।
রাহাও কিছুক্ষণ নীরবে চোখের জল ফেলল। তারপর ধীরে ধীরে উঠে বসল। মায়ের ভেজা চোখ দুটো নিজের হাতের তালু দিয়ে পরম যত্নে মুছে দিয়ে শান্ত, কাঁপা কণ্ঠে বলল,
— "বাবাকে ছাড়া থাকতে তোমার খুব কষ্ট হয়েছে... তাই না, মা?"
সাথী বেগম কোনো উত্তর দিলেন না। শুধু নীরবে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। চোখের কোণ বেয়ে আবারও নেমে এলো কয়েক ফোঁটা অশ্রু। সেই নীরবতাই যেন হাজারটা কথার চেয়েও বেশি ভারী ছিল।
রাহা কিছুক্ষণ মায়ের দিকে তাকিয়ে থেকে আবার ধীরে ধীরে বলল,
— "যদি... যদি কোনোদিন হঠাৎ বাবা আবার তোমার সামনে এসে দাঁড়ায়?"
কথাটা শুনেই সাথী বেগম চমকে উঠলেন। ভ্রু কুঁচকে তৎক্ষণাৎ বললেন,
— "কী সব আজেবাজে কথা বলছিস, রাহা? এতগুলো বছর পার হয়ে গেছে। মানুষটা কোথা থেকে ফিরে আসবে, বল?"
রাহা আর বিষয়টা বাড়াল না। ঠোঁটের কোণে জোর করে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
— "আচ্ছা, বাদ দাও মা। খুব ক্ষুধা লেগেছে। কিছু খাবার এনে নিজের হাতে খাইয়ে দাও না। তারপর আবার তো পার্লারে যেতে হবে।"
মেয়ের মুখে স্বাভাবিক সুর ফিরে আসতে দেখে সাথী বেগমও আর কিছু ভাবলেন না। চোখের জল আড়াল করে মৃদু হাসলেন। তারপর স্নেহভরা দৃষ্টিতে একবার রাহার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে খাবার আনতে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন।
দরজাটা বন্ধ হওয়ার শব্দ মিলিয়ে যেতেই রাহার মুখের হাসিটাও মুহূর্তে নিভে গেল।
ধীরে ধীরে মুঠো খুলে সামনে তুলে ধরল মাহাদীর দেওয়া সেই পেনড্রাইভটি। তার দৃষ্টি মুহূর্তেই কঠিন, দৃঢ় আর রহস্যময় হয়ে উঠল।
পেনড্রাইভটির দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত, দুর্বোধ্য হাসি ফুটিয়ে ফিসফিস করে বলল,
— "এবার... বাজিমাত আমার হাতেই।”
—————
গাঢ় লাল লেহেঙ্গায় সজ্জিত রাহাকে তখন যেন রক্তিম শিখার মতোই দীপ্তিমান লাগছিল। তবে তার সেই অপরূপ সাজ, গয়নায় মোড়া রূপ কিংবা কনের জৌলুস—কোনোটাই তার অন্তরে চলতে থাকা তীব্র ঝড়কে আড়াল করতে পারেনি।
হঠাৎই বুকফাটা আর্তনাদে চিৎকার করে উঠল সে—
— "আজ আর মিথ্যে বলবেন না, অভ্র ভাই... আমি সব জেনে গেছি।আমার আব্বুর মৃত্যুর জন্য আপনিই দায়ী!
"আপনি... আপনি আমার আব্বুকে মেরে ফেলেছেন, অভ্র ভাই...!"
কথাটা বলেই হাঁপিয়ে উঠল রাহা। বুকের ভেতর বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা যন্ত্রণা যেন এক নিমেষেই বিস্ফোরিত হয়ে বেরিয়ে এলো।
— "বলুন... আমার আব্বুর অপরাধটা কী ছিল? কী এমন দোষ করেছিলেন উনি?
একটা থাপ্পড়... হ্যাঁ, হয়তো আব্বু আপনাকে একটা থাপ্পড় মেরেছিলেন। কিন্তু সেটা তো আপনার ভালোর জন্যই! আপনাকে ভুল পথ থেকে ফিরিয়ে আনতেই করেছিলেন!
“তাই বলে আপনি...! আপনি আমার আব্বুকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিলেন, অভ্র ভাই? আমার মাথার ওপর থেকে বাবার ছায়াটাই কেড়ে নিলেন?"
শেষ কথাগুলো উচ্চারণ করতেই তার শরীরের সমস্ত শক্তি যেন নিঃশেষ হয়ে গেল। গাঢ় লাল লেহেঙ্গার ভার সামলাতে না পেরে টলতে টলতে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল সে।
দুই হাতে মুখ ঢেকে বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়ল রাহা। তার প্রতিটি আর্তনাদে যেন বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা শোক, ক্ষোভ আর বিশ্বাসভঙ্গের অসহনীয় যন্ত্রণা একসঙ্গে বিস্ফোরিত হয়ে বেরিয়ে আসছিল।
অভ্র একদম স্তব্ধ। কিন্তু রাহাকে এভাবে বুকভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখে অভ্র আর নিজেকে স্থির রাখতে পারল না। চোখেমুখে স্পষ্ট উৎকণ্ঠা নিয়ে দ্রুত তার দিকে এগিয়ে এলো। রাহাকে সামলে নেওয়ার জন্য দু'হাত বাড়াতেই—
রাহা যেন বিদ্যুতের গতিতে সরে গিয়ে চিৎকার করে উঠল,
— "একদম ছুঁবেন না আমাকে! আমার গায়ে হাত দেবেন না...! দূরে থাকুন... দূরে!"
কথাগুলো যেন তীক্ষ্ণ ছুরির ফলার মতো গিয়ে বিঁধল অভ্রের বুকে।
এক মুহূর্তের জন্য অভ্রের বাড়িয়ে দেওয়া হাত থমকে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই নিজের স্বভাবসিদ্ধ একগুঁয়েমিতে আবারও এগিয়ে এসে শক্ত করে রাহার দুই বাহু চেপে ধরল।
চোয়াল শক্ত করে, রুদ্ধ কণ্ঠে বলল,
— "তোকে ছুঁব না মানে? কী বললি তুই? আমার থেকে দূরে থাকবি? কিসের দূরত্ব, হ্যাঁ?"
তার চোখ দুটো তখন রাগ, কষ্ট আর অধিকারবোধে রক্তিম হয়ে উঠেছে।
— "খবরদার! আর একবার যদি এসব কথা মুখে আনিস... কসম খোদার, একদম জান মেরে দিবো। দূরে থাকার কথা আর কখনো বলবি না, জান!"
এই বলে অভ্র রাহাকে বুকের মধ্যে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করতেই রাহা যেন সমস্ত শক্তি একত্র করে দুই হাতে অভ্রের হাত ঝাঁকিয়ে সরিয়ে দিল।
ঘৃণা, অভিমান আর অসীম যন্ত্রণায় জ্বলতে থাকা দৃষ্টিতে অভ্রের দিকে তাকিয়ে রইল সে। সেই দৃষ্টিতে আর ভালোবাসার লেশমাত্র ছিল না—ছিল শুধু বিশ্বাসভঙ্গের তীব্র অভিযোগ আর ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়া এক হৃদয়ের নিঃশব্দ আর্তনাদ।
রাহা ঝটকা মেরে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতেই অভ্র আরও শক্ত করে তার দুই বাহু চেপে ধরল। যেন এক মুহূর্তের জন্যও তাকে নিজের নাগালের বাইরে যেতে দেবে না।
রাহা ব্যথায় মুখ বিকৃত করে ছটফট করতে করতে চিৎকার করে উঠল—
— "ছাড়ুন আমাকে! জানে মারা ছাড়া আর কী পারেন আপনি, হ্যাঁ? একটা জীবন শেষ করে দিয়েও কি আপনার মন ভরেনি?"
তার কণ্ঠ ক্রমশ ভারী হয়ে উঠল। বুকভরা ঘৃণা আর বিশ্বাসভঙ্গের যন্ত্রণায় কাঁপতে কাঁপতে সে আবার বলল—
— "আমি... আমি কোনো খুনির সঙ্গে এক ছাদের নিচে থাকতে পারব না! যে মানুষ আমার আব্বুকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে, তার নামের সঙ্গে নিজের নাম জড়াতে আমার ঘৃণা লাগে... শুনছেন? ঘৃণা লাগে!"
শেষ কথাগুলো প্রায় আর্তচিৎকার হয়ে বেরিয়ে এলো।
অভ্রের চোখ মুহূর্তেই বিস্ফারিত হয়ে উঠল। ঠোঁট কাঁপল, কিন্তু কোনো শব্দ বেরোল না। যেন অভিযোগটা তার সমস্ত অস্তিত্বকে এক মুহূর্তে স্তব্ধ করে দিয়েছে। পরক্ষণেই সে ছুটে এসে রাহার দুই বাহু শক্ত করে আগলে নিয়ে রুদ্ধ, কাঁপা কণ্ঠে বলল—
— "জান... প্লিজ! একবার... শুধু একবার শান্ত হয়ে আমার কথাটা শোন। তারপর যদি মনে হয় আমি অপরাধী, তুই নিজ হাতে যে শাস্তি দিবি, আমি মাথা পেতে নেব। কিন্তু আমার কথা না শুনে আমাকে ঘৃণা করিস না... প্লিজ, জান!"
অভ্রের কণ্ঠে সেই প্রথমবারের মতো ভেঙে পড়া এক মানুষের অসহায় আকুতি স্পষ্ট হয়ে ধরা দিল।
রাহা মাথা নেড়ে একরাশ ঘৃণা আর অভিমানে বলল—
— "আমি আপনার কোনো কথাই শুনতে চাই না। আমার নিজের চোখকে তো আর মিথ্যে বলতে পারি না। যা দেখেছি, সেটা কীভাবে অস্বীকার করব?"
অভ্র গভীর শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলে বলল—
— "সব সময় চোখে দেখা সত্যিই সত্য হয় না, জান। অনেক সময় চোখ যা দেখে, বাস্তব তার থেকেও অনেক আলাদা হয়। আমাকে অন্তত একবার সবটা বলার সুযোগ দে..."
রাহা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
— "না! কোনো সুযোগ দেব না। আপনি আমার জীবন থেকে চিরদিনের জন্য চলে যান।আমাকে ভুলে যান আর আমাকে ছেড়ে.."
বাকিটা আর শেষ করতে পারল না সে।
পরমুহূর্তেই অভ্র ঝড়ের বেগে তার সামনে এসে দাঁড়াল। এক ঝটকায় রাহার থুতনি শক্ত করে নিজের আঙুলের মুঠোয় আটকে ফেলল। তার দৃষ্টি তখন দাবানলের মতো জ্বলছে—রাগ, কষ্ট, অধিকার আর হারানোর ভয় একাকার হয়ে গেছে।
দাঁতে দাঁত চেপে, রুদ্ধ অথচ গর্জনময় কণ্ঠে বলল—
— "তোর সাহস তো কম নয়, বান্দি! আমাকে বলছিস তোকে ভুলে যেতে,ছেড়ে দিতে?"
আঙুলের চাপ আরও দৃঢ় হয়ে উঠল।
— "আমার বুকের ভেতরটা চিরে দেখবি? দেখবি সেখানে কার নাম লেখা আছে? এই কলিজার প্রতিটা স্পন্দনে শুধু তুই আছিস, রাহা!"
— "এই জিহাদ খান অভ্র একবার যাকে নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবেসেছে, তাকে ভুলে যাওয়া তো দূরের কথা—মৃত্যু ছাড়া সেই ভালোবাসা কেড়ে নিতে পারবে না।"
তারপর রাহার চোখে চোখ রেখে প্রতিটি শব্দ আলাদা করে বলল—
— "আর আমাকে তোকে ছেড়ে দিতে হবে? এই ভাবনাটা তোর মাথায় এল কী করে?"
অভ্রের কণ্ঠ যেন বজ্রের গর্জনে রূপ নিল।
— "মনে রাখিস, এই পৃথিবীতে যা-ই ঘটুক না কেন, আমার কাছ থেকে তোর নিস্তার নেই। তুই আমার ছিলি,আমারই আছিস,আর শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমারই থাকবি।”
রাহা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— "শুধু বাড়ির সম্মান আর বড় আব্বুর মান-সম্মান রক্ষা করার জন্যই আমি সবার সামনে যাব। সবাইকে দেখাব, যেন আমি আপনাকে মেনে নিয়েছি। কিন্তু ওটা শুধু অভিনয়... একটা নাটক। এর বাইরে আপনাকে মেনে নেওয়া আমার পক্ষে কোনো দিনও সম্ভব নয়।”
–”তোর সম্মানের মাইরে চু*দি…একটু পর সুন্দর মত চলে আসবি নিচে।”
অভ্র আর একটি শব্দও উচ্চারণ করল না। চোখেমুখে জমাট বাঁধা রাগ, অপমান আর অসহায়ত্ব নিয়ে কয়েক মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তারপর আচমকাই বিয়ের জন্য পরা স্যুটের কোটটি শরীর থেকে খুলে প্রচণ্ড ক্ষোভে ছুড়ে মারল পাশের সোফার ওপর।
পরক্ষণেই কোনো দিকে আর ফিরে না তাকিয়ে ঝড়ের গতিতে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল। তার ভারী পদচারণার শব্দ যেন পুরো ঘরের নীরবতাকে কাঁপিয়ে দিয়ে মিলিয়ে গেল করিডোরের গভীরে।
অন্যদিকে রাহা যেন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।
উন্মাদের মতো একের পর এক নিজের পরনের অলঙ্কার ছিঁড়ে, টেনে-হিঁচড়ে খুলে ফেলতে লাগল। কানের দুল, গলার হার, কপালের টিকলি, নাকফুল—কোনো কিছুর প্রতিই তার বিন্দুমাত্র মায়া রইল না। যেন প্রতিটি অলঙ্কারের সঙ্গে সে নিজের সমস্ত স্মৃতি, বিশ্বাস আর সম্পর্কও ছিঁড়ে ফেলতে চাইছে।
এরপর হাতভর্তি কাঁচের চুড়িগুলো নির্মমভাবে ভাঙতে শুরু করল। একটার পর একটা চুড়ি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ধারালো কাচের টুকরো তার নরম হাতের তালু আর কবজিতে গভীরভাবে বিঁধে যেতে লাগল।
তবুও তার কোনো হুঁশ ছিল না।
কক্ষের ঠিক বাইরে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ছিল মাহাদী আর বাঁধন। দরজার ফাঁক গলে ভেতরের প্রতিটি দৃশ্য ও প্রতিটি শব্দ তাদের দৃষ্টি এড়ায়নি।
রাহা আর অভ্রের তীব্র সংঘাত, কান্না, ভাঙন—সবকিছুই তারা নীরবে পর্যবেক্ষণ করছিল।
মাহাদীর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক তৃপ্ত, কুটিল হাসি। চোখেমুখে স্পষ্ট বিজয়ের উচ্ছ্বাস। দীর্ঘদিন ধরে সাজানো তার পরিকল্পনা যে সফলতার পথে এগোচ্ছে, তা ভেবেই বুকের ভেতর এক অদ্ভুত আত্মতৃপ্তি ছড়িয়ে পড়ল।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বাঁধনের মুখেও একই রকম পৈশাচিক আনন্দের ছাপ। দু’জনের চোখাচোখি হতেই ঠোঁটের কোণে আরও গভীর হয়ে উঠল সেই রহস্যময় হাসি।
মনে হচ্ছিল, এই ভাঙন, এই ভুল বোঝাবুঝি, এই কান্নাই যেন তাদের বহুদিনের প্রতীক্ষিত বিজয়ের সূচনা। রাহা আর অভ্রের সম্পর্ক যত বেশি ভেঙে পড়বে, তাদের উদ্দেশ্য ততই সফল হবে—আর সেই ভাবনাতেই দু’জনের চোখেমুখে ফুটে উঠল নির্মম তৃপ্তির ছাপ।
মাহাদী বাঁধনের দিকে তাকিয়ে বলল,
— "প্ল্যান এ সাকসেসফুল। এবার প্ল্যান বি এক্সিকিউট করতে হবে। তাড়াতাড়ি চল।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………