গেট অতিক্রম করে ধীর, কিন্তু দৃঢ় পদক্ষেপে ভেতরে প্রবেশ করলেন লোকটি। তাঁর দৃষ্টি আগের মতোই শীতল ও ক্রোধে দীপ্ত— যেন চোখের আগুনেই চারপাশ ভস্ম করে দিতে চান। প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে চারদিকে নেমে এলো এক অদৃশ্য, চাপা উত্তেজনা।
মুহূর্তেই উপস্থিত সবার দৃষ্টি তাঁর দিকেই নিবদ্ধ হয়ে গেল। বিস্ময়ে আমান খান প্রায় চিৎকার করে বলে উঠলেন—
— "আরমান...!!!"
নামটি উচ্চারিত হতেই যেন খানবাড়ির আকাশে পরপর বজ্রপাত শুরু হলো। একের পর এক বিস্ফোরক সত্যের অভিঘাতে পুরো পরিবেশ স্তব্ধ হয়ে গেল। মনে হচ্ছিল, সবাই যেন বিয়ের অনুষ্ঠানে নয়, বরং এক রুদ্ধশ্বাস নাটকের চূড়ান্ত পর্বের সাক্ষী হতে এসেছে।
চোখের পলকে দাবানলের মতো খবর ছড়িয়ে পড়ল—তেরো বছর আগে মৃত ঘোষিত আরমান খান ফিরে এসেছেন। খবর শুনে আশপাশের মানুষ দলে দলে খানবাড়িতে ভিড় জমাতে লাগল। অল্প সময়েই প্রধান ফটক ও আঙিনা উৎসুক জনতায় উপচে পড়ল। সবার চোখে একই প্রশ্ন—
একজন মৃত মানুষ কি সত্যিই তেরো বছর পর ফিরে আসতে পারে?প্রশ্নটা যেন বাতাসে ঝুলে রইল। কারও কাছে এর উত্তর নেই।
ক্যামেরাম্যানরাও দ্রুত ক্যামেরা, ট্রাইপড ও লাইটিং প্রস্তুত করল। যেন ইতিহাসের এই অবিশ্বাস্য মুহূর্তটি কেউই হাতছাড়া করতে চাইছিল না।
আমান খান ধীরে ধীরে কাঁপা পায়ে সামনে এগিয়ে এলেন। অপলক দৃষ্টিতে ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। বুকের ভেতর জমে থাকা তেরো বছরের স্মৃতি, বেদনা আর অপেক্ষা একসঙ্গে ঝড় হয়ে আছড়ে পড়ল।
ঠিক তখনই, রাহা যে বিয়ের সময় উপস্থিত ছিল না—এই খবর শুনে সাথী বেগম ছুটে আসছিলেন। কিন্তু আরমান খানের কণ্ঠস্বর কানে পৌঁছাতেই তাঁর পদযুগল থমকে গেল।
এ কণ্ঠস্বর...
তাঁর স্বামীর!
চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠল। ঠোঁট কাঁপছে, শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হয়ে গেছে। তিনি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন, যেন এক পা এগোলেই বাস্তব আর স্বপ্নের সীমারেখা ভেঙে যাবে।
চারপাশে এমন নীরবতা নেমে এলো যে মানুষের চাপা নিশ্বাস আর ক্যামেরার রেকর্ড বাটন চাপার ক্ষীণ শব্দও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল।
সেই নিস্তব্ধতার মাঝেই আমান খান কাঁপতে থাকা হাতে ধীরে ধীরে আরমান খানের মুখ স্পর্শ করলেন।
উষ্ণ...!
রক্ত-মাংসের জীবন্ত একজন মানুষ!
কাঁপা কণ্ঠে তিনি ফিসফিস করে বললেন—
— "তুই...! সত্যিই তুই... আরমান?"
পরক্ষণেই আর কোনো বাধা মানলেন না তিনি। ঝাঁপিয়ে পড়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন নিজের বহুদিনের হারিয়ে যাওয়া ভাইকে।
আরমান খানের দৃষ্টি ধীরে ধীরে সরে গিয়ে স্থির হলো স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে থাকা সাথী বেগমের ওপর।
সাথী বেগমও অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তাঁর স্বামীর দিকে। চোখের পলক ফেলতেও যেন ভয় পাচ্ছেন। মনে হচ্ছে, একবার চোখ বন্ধ করলেই মানুষটি আবার হারিয়ে যাবেন—যেমন তেরো বছর আগে হারিয়ে গিয়েছিলেন।
দু’জনের মাঝখানে তেরো বছরের বিচ্ছেদ, অসংখ্য না-বলা কথা আর পাহাড়সম অভিমান নীরবে দাঁড়িয়ে রইল।
"অন্যদিকে তাঁর দৃষ্টি গিয়ে থামল অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা তাঁর মেয়ে রাহার ওপর।”
তেরোটি দীর্ঘ বছর—অসংখ্য প্রতীক্ষা, অসহনীয় বিচ্ছেদ, গভীর বেদনা এবং না-পাওয়ার নির্মম যন্ত্রণার পর অবশেষে বাবা ও মেয়ে মুখোমুখি হলেন।
মুহূর্তটি যেন সময়ের বুকে স্থির হয়ে রইল। মনে হলো, পৃথিবী যেন তাদের দুজনকে কেন্দ্র করেই থমকে দাঁড়িয়েছে।
দুজনের দৃষ্টি একে অপরের চোখে স্থির। সেই চোখে জমে আছে হাজারো অব্যক্ত অনুভূতি, অগণিত অশ্রুবিন্দু, সীমাহীন আকুলতা এবং বছরের পর বছর ধরে হৃদয়ের গভীরে চাপা পড়ে থাকা না-বলা আবেগের স্তূপ।
একসময় যে ছোট্ট মেয়েটি বাবার কাঁধে চড়ে আকাশ ছুঁতে চাইত, বাবার আঙুল শক্ত করে ধরে পৃথিবী চিনতে শিখেছিল, আজ সে পূর্ণবয়স্ক এক তরুণী। আর যে বাবা একদিন সন্তানের হাসিতে নিজের পৃথিবী খুঁজে পেতেন, আজ তাঁর কপালে সময়ের গভীর রেখা, চুলে শুভ্রতার ছোঁয়া; তবু বুকের ভেতর আজও অক্ষুণ্ণ সেই একই অবিনশ্বর পিতৃস্নেহ।
কাঁপতে থাকা হাতে বাবা ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে দিলেন। কিন্তু মাঝপথেই থেমে গেলেন। যেন বুকের ভেতর একটাই প্রশ্ন—এই তেরো বছরের নির্মম ব্যবধান কি তাঁর সেই স্পর্শের অধিকারটুকুও কেড়ে নিয়েছে?
মেয়েটির ঠোঁট কাঁপছিল। বুকের ভেতর জমে থাকা শত সহস্র আর্তনাদ গলায় এসে আটকে গেছে। শেষ পর্যন্ত সমস্ত নীরবতা ভেঙে সে ফিসফিস করে উচ্চারণ করল—
"বাবা..."
শুধু একটি শব্দ।
কিন্তু সেই একটি শব্দ যেন বজ্রাঘাতের মতো আঘাত হানল বাবার হৃদয়ে। মুহূর্তের মধ্যেই তেরো বছরের জমে থাকা অভিমান, বিচ্ছেদ, অপেক্ষা, শূন্যতা, আকুতি আর নিঃসঙ্গতার প্রাচীর ভেঙে পড়ল।
বাবা আর নিজেকে সংযত রাখতে পারলেন না। ছুটে এসে মেয়েকে এমনভাবে বুকে জড়িয়ে ধরলেন, যেন এই আলিঙ্গন ভেঙে দেওয়ার মতো শক্তি পৃথিবীতে আর কিছুই নেই।
দুজনেই অঝোরে কাঁদছিলেন। সেই কান্না দুর্বলতার নয়—এটি ছিল পুনর্মিলনের, হারিয়ে যাওয়া শৈশব ফিরে না পাওয়ার বেদনার, অপূর্ণ সময়ের শোকগাথার এবং রক্তের টানে অবশেষে ফিরে পাওয়া আপনজনের অমোঘ স্বীকৃতির কান্না।
সেদিন উপস্থিত প্রত্যেকের হৃদয় নিঃশব্দে ভারী হয়ে উঠেছিল। কারণ তারা প্রত্যক্ষ করছিলেন শুধু একটি সাক্ষাৎ নয়—তেরো বছরের বিচ্ছেদের অবসান, এক পিতার অবিনাশী ভালোবাসার পুনর্জন্ম এবং এক কন্যার জীবনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত আশ্রয়ে ফিরে আসার এক অনন্য মুহূর্ত।
মেয়েকে রেখে আরমান খান ধীর, ভারী পদক্ষেপে তাঁর স্ত্রীর দিকে এগিয়ে এলেন। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন তেরো বছরের দূরত্ব মুছে দিচ্ছে।
স্বামীকে এত কাছে, এত বছর পর নিজের চোখের সামনে জীবিত দেখে সাথী বেগম আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। তাঁর শরীর হঠাৎই নিস্তেজ হয়ে এলো। চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে গেল।
— “মা...!”
রাহার আতঙ্কিত চিৎকারে চারপাশ কেঁপে উঠল।
মাটিতে লুটিয়ে পড়ার আগেই আরমান খান দ্রুত এগিয়ে এসে দু’হাতে আগলে নিলেন নিজের স্ত্রীকে। পরম যত্নে তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরে ধীরে ধীরে মাটিতে বসিয়ে দিলেন।
সাথী বেগম আধবোজা চোখে কাঁপা কাঁপা দৃষ্টিতে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কাঁপতে থাকা ঠোঁট দুটো অস্ফুটে নড়ে উঠল—
— “আপনি... সত্যিই ফিরে এসেছেন...?”
একফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল তাঁর চোখের কোণ বেয়ে।
— “নাকি... আমি কোনো স্বপ্ন দেখছি? যদি স্বপ্ন হয়... তবে আল্লাহ, এখনই এই স্বপ্নটা ভেঙে দিন। আর যদি এ বাস্তব হয়... তবে বলুন... এবারও কি আমাকে ফেলে চলে যাবেন না তো? আবার... আরেকবার ভেঙে দেবেন না তো আমার পৃথিবী?”
আরমান খান ধীরে ধীরে সাথী বেগমকে পাশের একটি চেয়ারে বসিয়ে দিলেন। এরপর তিনি নিজেই তাঁর সামনে হাঁটু গেড়ে বসলেন। তাঁর চোখেমুখে অপরাধবোধ, গভীর ভালোবাসা এবং দীর্ঘ বছরের বিচ্ছেদের বেদনা স্পষ্ট হয়ে উঠল।
ঠিক তখনই রাহা কাঁপা হাতে একটি গ্লাস পানি এগিয়ে দিল। আরমান খান গ্লাসটি নিয়ে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে নিজের হাতে সাথী বেগমকে পানি পান করালেন।
পানি পান করানোর পর তিনি আলতো করে স্ত্রীর দুই হাত নিজের মুঠোয় নিলেন। সেই হাত দুটো তখনও কাঁপছিল।
গভীর, আশ্বস্তকারী কণ্ঠে তিনি বললেন—
— "আমি আর ধোঁকা দিতে আসিনি, রাহার আম্মু...। আমি সত্যিই ফিরে এসেছি, বেগম। এবার আর কোথাও যাব না।"
কথাগুলো কানে যেতেই সাথী বেগম আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। স্বামীর শক্ত হাতের মুঠো আরও দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে তিনি হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। তেরো বছরের বুকচাপা কান্না যেন সঙ্গে সঙ্গে বাঁধভাঙা স্রোতের মতো বেরিয়ে এলো।
আরমান খান পরম মমতায় তাঁর চোখের অশ্রু মুছে দিয়ে কপালে আলতো করে হাত রাখলেন।
— "আর কান্না নয়, বেগম। অনেক কেঁদেছ তুমি... অনেক অপেক্ষা করেছ। দেখো, আমি ফিরে এসেছি। আল্লাহর রহমতে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে তোমাদের কাছেই ফিরে এসেছি।"
বাবার কণ্ঠ শুনেই রাহাও আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সেও হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তখনই আরমান খান এক হাতে স্ত্রীকে এবং অন্য হাতে রাহাকে নিজের বুকে জড়িয়ে নিলেন।
তেরো বছরের বিচ্ছেদের পর সেই পরিবার আবার এক আলিঙ্গনে মিলিত হলো।
চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা অনেকের চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠলেও সবার অনুভূতি এক ছিল না।
এক কোণে দাঁড়িয়ে আফসানা বেগম ও আমান খানের বুকের ভেতর যেন অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। হৃদস্পন্দন ক্রমেই ভারী হয়ে আসছিল।
এবার কী হবে?
তেরো বছর পর ফিরে আসা আরমান খানের এই প্রত্যাবর্তন কি দুই ভাইয়ের সম্পর্কের ভিত্তিই নাড়িয়ে দেবে?
আর অভ্র...?
যদি আরমান খান রাহাকে অভ্রের হাতে তুলে দিতে অস্বীকৃতি জানান, তবে ছেলেটির কী হবে?
রাহাকে ছাড়া অভ্র যে নিজের অস্তিত্বই কল্পনা করতে পারে না। আর আজকের এই ঝড়, এই জটিল পরিস্থিতির কেন্দ্রবিন্দুতেও তো রয়েছে রাহাকে ঘিরে তৈরি হওয়া সেই অসমাপ্ত অধ্যায়।
তাহলে কি এতদিন ধরে মাটিচাপা দিয়ে রাখা অতীতের প্রতিটি গোপন সত্য আজ প্রকাশ্যে এসে যাবে?
যে সত্যকে আড়াল করে রাখতে গিয়ে নিজেদের ছেলেকেও রাহার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছিল... এত বছরের সব ত্যাগ, সব পরিকল্পনা, সব অভিনয়—তবে কি আজ এক মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে?
না... না, এটা হতে দেওয়া যাবে না।
মনে মনে আতঙ্কে কেঁপে উঠলেন আফসানা বেগম।
কিন্তু তিনি এখন কী করবেন?
যদি আরমান খান সবার সামনে তেরো বছরের চাপা পড়ে থাকা প্রতিটি সত্য উন্মোচন করে দেন... তবে তো সব শেষ। শুধু একটি সম্পর্ক নয়, ভেঙে পড়বে বহু বছরের বিশ্বাস, সম্মান আর সাজানো সংসার।
এদিকে আরমান খান ধীরে ধীরে রাহার সামনে এসে দাঁড়ালেন। স্নেহভরা হাতে মেয়ের মাথায় হাত রেখে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বললেন—
— "বাবার ওপর বিশ্বাস আছে তো, মা?"
রাহা কোনো কথা বলল না। শুধু নিঃশব্দে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
আরমান খান মৃদু নিঃশ্বাস ফেলে বললেন—
— "আমি যে সিদ্ধান্তই নিই... তুই রাজি থাকবি তো?"
রাহা আবারও মাথা নাড়ল।
কিন্তু পরের প্রশ্নটি যেন মুহূর্তেই তার বুকের ভেতর বজ্রাঘাত করল।
কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে আবার বললেন,
— "যদি এবারও তোকে নিজের ভালোবাসা ত্যাগ করতে বলি... পারবি?"
রাহা স্তব্ধ হয়ে গেল।মনে হলো তার সমস্ত পৃথিবী যেন থেমে গেল। ঠোঁট নড়ল, কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না।
অভ্রকে ছেড়ে দেওয়া?
এটা কীভাবে সম্ভব?
যে মানুষটাকে সে নিজের নিঃশ্বাসের মতো ভালোবাসে, তাকে ছাড়া বেঁচে থাকার কথাও তো কখনো কল্পনা করেনি।
বাবা এমন কথা বলছেন কেন?
আরমান খান মেয়ের নীরবতা বুঝতে পেরে শান্ত স্বরে বললেন—
— "বাবারা কখনো সন্তানের অমঙ্গল চায় না, মা। যা করি, সন্তানের ভালোর জন্যই করি। প্রয়োজন হলে তোকে এমন একটা ঘরে বিয়ে দেব, যেখানে তোর ভবিষ্যৎ নিরাপদ থাকবে... যেখানে তোকে কোনো কষ্ট ছুঁতে পারবে না।”
মাহাদী যেন এতক্ষণ এই একটি কথাই শোনার অপেক্ষায় ছিল। কথাগুলো কানে পৌঁছাতেই তার ঠোঁটের কোণে অদৃশ্য এক তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল।
অন্যদিকে অভ্র সম্পূর্ণ নীরব।
তার মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। কিন্তু যে তাকে ভালোভাবে চেনে, সে-ই বুঝবে—এই নীরবতার আড়ালে ভয়ংকর কোনো হিসাব চলছে। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি একবার আরমান খানের দিকে, আবার আরাফ শিকদারের দিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
আরাফ শিকদারের দৃষ্টি আরমান খানের ওপর পড়তেই তাঁর সমগ্র শরীর যেন মুহূর্তেই পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল। মুখের রং ফ্যাকাশে হয়ে গেল, আর বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিকভাবে দ্রুততর হয়ে উঠল। চোখ দুটো বিস্ফারিত হয়ে গেল—যেন তাঁর সামনে কোনো জীবিত মানুষ নয়, বরং তেরো বছর আগে কবরস্থ এক দুঃস্বপ্ন ফিরে এসে দাঁড়িয়েছে।
'এ... এটা কীভাবে সম্ভব...? আমি তো নিজের চোখে দেখেছি...! তাহলে সে বেঁচে ফিরল কীভাবে?'
মনের ভেতর একের পর এক প্রশ্ন বিষের মতো ছোবল মারতে লাগল। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠল। অজান্তেই তাঁর আঙুল কেঁপে উঠল, গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল।
এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো—সব শেষ! তেরো বছর ধরে যে সত্যকে মাটিচাপা দিয়ে রেখেছিলেন, আজ বুঝি সেই অতীতই রক্তমাংসের মানুষ হয়ে তাঁর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
তবে বহু বছরের অভিজ্ঞতা তাঁকে দ্রুত নিজেকে সংযত করতে বাধ্য করল।
'না... শান্ত হও। যদি সবকিছু ওর মনে থাকত, তাহলে এতক্ষণে নিশ্চয়ই আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত। সম্ভবত দুর্ঘটনার পর সবকিছু ভুলে গেছে...।'
এই ভেবেই তিনি গভীর একটি শ্বাস নিলেন। পরমুহূর্তেই আতঙ্ককে বুকের গভীরে চেপে রেখে ঠোঁটে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে তুললেন। চোখেমুখে বিস্ময় ও আনন্দের অভিনয় এনে দ্রুত এগিয়ে এসে দুই হাত প্রসারিত করলেন।
— "আরে! বিজনেস পার্টনার...! আপনাকে এভাবে ফিরে পাব, ভাবতেই পারিনি!”
কিন্তু আরমান খান একচুলও নড়লেন না।
বরং ঠোঁটের কোণে রহস্যময় এক হাসি ফুটিয়ে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে ধীরস্বরে বললেন—
— "বিজনেস পার্টনার বললে বোধহয় ঠিক হবে না...। তার চেয়ে আপনাকে 'মার্ডার পার্টনার' বললে কেমন হয়, মিস্টার আরাফ শিকদার? যেখানে একজন মারে আর আরেকজন মরে।"
কথাটা শুনতেই আরাফ শিকদারের মুখের রক্ত একদম উধাও হয়ে গেল।
গলা শুকিয়ে কাঠ।
তিনি ঢোক গিলে কাঁপা কণ্ঠে বললেন—
— "কী... কী বলছেন আপনি? এসব কেমন কথা?"
আরমান খান মৃদু হেসে বললেন—
— "আরে বেয়াই সাহেব...! এত সিরিয়াস হচ্ছেন কেন? মজা করলাম।"
— "বে... বেয়াই?"
আরাফ শিকদার বিস্ময়ে প্রায় চিৎকার করে উঠলেন।
আরমান খান শান্ত গলায় বললেন—
— "হ্যাঁ। আমার মেয়েকে তো আপনার ছেলের হাতেই তুলে দেব। তাহলে আপনি আমার বেয়াইই তো।"
কথাটা শুনে আরাফ শিকদার যেন বুকভরা এক দীর্ঘ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। এতক্ষণ বুকের ওপর চেপে থাকা বিশাল পাথরটা যেন হঠাৎ সরে গেল।
মুখভরা হাসি নিয়ে বললেন—
— "আলহামদুলিল্লাহ! এ তো দারুণ সুখবর। রাহা মামণি তাহলে আমাদের বাড়ির বউ হবে!"
আরাফ শিকদার ও মাহাদীর মুখে তখন স্পষ্ট স্বস্তির ছাপ। মনে হচ্ছিল, বহু বছরের পরিকল্পনা অবশেষে সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে।
তাদের সেই আত্মতৃপ্তির হাসি নীরবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন আরমান খান। তাঁর ঠোঁটের কোণেও ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক রহস্যময়, দুর্বোধ্য হাসি—যার প্রকৃত অর্থ উপস্থিত কেউই অনুধাবন করতে পারল না।
চারপাশে একবার ধীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে তিনি কয়েক মুহূর্ত নীরব রইলেন। সেই নীরবতাই যেন উপস্থিত সবার হৃদস্পন্দন আরও তীব্র করে তুলল।
হঠাৎ তাঁর মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। চোখ দুটো ইস্পাতের মতো কঠোর হয়ে উঠল। ধারালো কণ্ঠে তিনি উচ্চারণ করলেন—
— "এই বিয়ে কোনোভাবেই হবে না! কোনো খুনির হাতে আমি আমার মেয়েকে তুলে দেব না। আমি বেঁচে থাকতে—কখনোই না!”
আরমান খানের এমন কঠিন ঘোষণায় মুহূর্তেই পুরো পরিবেশ স্তব্ধ হয়ে গেল। যেন উৎসবমুখর আসরে হঠাৎ নেমে এলো এক গভীর, শ্বাসরুদ্ধকর নীরবতা। উপস্থিত সবার মুখ থেকে রঙ উধাও হয়ে গেল।
আমান খান ও আফসানা বেগমের অবস্থা তখন প্রায় শোচনীয়। বুকের ভেতর ধুকপুকানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেল, আর চোখেমুখে স্পষ্ট হয়ে উঠল চরম আতঙ্ক, অসহায়ত্ব ও ভেঙে পড়ার ছাপ।
পরক্ষণেই আফসানা বেগম দ্রুত এগিয়ে এসে দেবরসম ছোট ভাই আরমান খানের সামনে দাঁড়ালেন। দু’হাত জোড় করে কাঁপা কণ্ঠে আকুতি জানিয়ে বললেন—
— "ভাই... অনুগ্রহ করে এমন কথা বলো না। আমার ছেলেটা রাহাকে ছাড়া বাঁচবে না... একেবারেই বাঁচবে না। যা হয়েছে, তা তো অভ্র ইচ্ছাকৃতভাবে করেনি। পরিস্থিতি, সময় আর ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সবকিছু ঘটে গেছে। দয়া করে ওর জীবনটা এভাবে শেষ করে দিও না।"
এদিকে সাথী বেগম যেন সম্পূর্ণ কিংকর্তব্যবিমূঢ়। চারপাশে কী ঘটছে, কে কী নিয়ে কথা বলছে—কিছুই তাঁর বোধগম্য হচ্ছিল না। বড় জায়ের প্রতিটি কথাই তাঁর কানে রহস্যের মতো আঘাত করছিল।
তিনি বিস্মিত ও শঙ্কিত কণ্ঠে বললেন—
— "আপা... এসব কী বলছেন? অভ্র আবার কী করেছে?"
জবাবে আরমান খান একগুচ্ছ ছবি সাথী বেগমের হাতে তুলে দিলেন।
কাঁপতে থাকা আঙুলে ছবিগুলো ধরতেই তাঁর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। একটির পর একটি ছবি দেখার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মুখের রক্ত যেন শুকিয়ে গেল। চোখদুটি বিস্ফারিত হয়ে উঠল অবিশ্বাসে, ঠোঁট কাঁপতে লাগল তীব্র অভিঘাতে।
হঠাৎ তিনি মাথা নেড়ে ভাঙা, কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠলেন—
— "না...! না, এটা সত্যি হতে পারে না! আমার অভ্র...এমন জঘন্য, নৃশংস কাজ কখনোই করতে পারে না! আমি কিছুতেই এটা বিশ্বাস করব না... কখনোই না!”
সাথী বেগমের কথায় মাহাদী তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে উঠলেন।
— "বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে ছবিগুলো আরও মনোযোগ দিয়ে দেখুন। আপনার অভ্রের প্রকৃত চেহারা আজ আর আড়াল করে রাখার কোনো অর্থ নেই।"
কথাগুলো ছুরির ফলার মতো সাথী বেগমের বুকে গিয়ে বিঁধল।
ঠিক তখনই এতক্ষণ নীরব থাকা মাহাদী এক পা সামনে এগিয়ে এলো। তার চোখেমুখে বিজয়ের স্পষ্ট তৃপ্তি।
শীতল, কঠোর কণ্ঠে সে বলল—
— "আঙ্কেল, এখনো সময় আছে। একজন খুনির হাতে রাহার জীবন নষ্ট হতে দেবেন না। যে মানুষ একটি প্রাণ কেড়ে নিতে পারে, সে আর যাই হোক—কাউকে সুখী রাখতে পারে না।"
— "তাহলে সত্যিই অভ্র খুনি?"— "ছবিগুলো তো সেটাই বলছে!"— "এতদিন তাহলে সবাইকে ধোঁকা দিয়েছে?"
একটার পর একটা ফিসফাস অভ্রকে ঘিরে বিষাক্ত তীরের মতো ছুটে আসতে লাগল।
আমান খান দাঁতে দাঁত চেপে চারপাশের মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর মুঠো শক্ত হয়ে গেছে, চোখ দুটো রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। অথচ এই মুহূর্তে বলার মতো কোনো ভাষাই যেন তাঁর কাছে নেই।
অন্যদিকে অভ্র এখনও নিশ্চুপ। তার মুখে ভয় নেই, অস্থিরতাও নেই।
রাহা কিছু বলার জন্য ঠোঁট খুলতেই অভ্র তার দিকে এমন এক শীতল, কঠোর দৃষ্টি নিক্ষেপ করল, যেন সেই দৃষ্টিই নিঃশব্দে জানিয়ে দিচ্ছিল—“একটি শব্দও নয়।”
অভ্রের সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে রাহার সমস্ত সাহস মুহূর্তেই ভেঙে পড়ল। তার গলায় কথা আটকে গেল। সে নীরবে ঠোঁট বন্ধ করে মাথা নিচু করল।
মাহাদী আর আরাফ শিকদারের মুখে তখন স্পষ্ট বিজয়ের ছাপ। বহুদিনের সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র যেন সফলতার একেবারে দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে।
কিন্তু ঠিক তখনই আরমান খান চারপাশে দৃষ্টি বুলিয়ে শেষ পর্যন্ত মাহাদী ও আরাফ শিকদারের ওপর চোখ স্থির করলেন। ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময়, দুর্বোধ্য হাসি ফুটিয়ে তিনি ভারী, বজ্রকঠিন কণ্ঠে বলে উঠলেন—
— " তোরা তো এটাই চেয়েছিলি তাই না?
রাহার বাবার এই কথাটি শুনে অভ্রের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক শীতল, দুর্বোধ্য হাসি। যেন এতক্ষণ ধরে সে ঠিক এই মুহূর্তটিরই অপেক্ষায় ছিলো।
সেই হাসিটাই মাহাদী আর আরাফ শিকদারের বুকের ভেতর অজানা আশঙ্কার ঝড় তুলে দিল।
·
·
·
চলবে……………………………………………………